সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
এই তো সেই ঠাকুরদালান৷ উঠান থেকে প্রায় এক মানুষ উঁচু৷ পরপর ছ’টি ধাপ উঠোন থেকে উঠে গেছে ঠাকুরদালানে৷ উলটো দিকে সময়ের কাঁটা ঘোরাই৷ কাঁটায় কাঁটায় দুপুর দুটো তিরিশ মিনিট৷ ১৮৭০ সাল৷ সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য৷
সর্বোচ্চ সোপানে সদর্পে যে-বালকটি বসে আছে, তার নাম নরেন্দ্র৷ আরও নাম আছে, বীরেশ্বর, বিলে৷ শুরু হোক খেলা৷ সর্বোচ্চ ধাপে রাজা নরেন্দ্র৷ সিমুলিয়ার বালক রাজা৷ মোগল সম্রাট আকবরের মতো সদ্য সিংহাসন লাভ করেছেন৷ রাজপ্রাসাদের ঠিকানা, তিন নম্বর গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিট৷ রাজার পিতার নাম, শ্রীযুত বিশ্বনাথ দত্ত৷ আপাতত তিনি প্রাসাদে নেই৷ আছেন আইনের জগতে৷ কলকাতার বাঘা অ্যাটর্নি৷ এই রাজ্যের যাবতীয় খাজনা আসে আইন ব্যবসা থেকে৷ প্রাসাদের প্রজাগণ সেই অর্থে রাজার হালেই প্রতিপালিত হন৷ বালকরাজার মাতার নাম ভুবনেশ্বরী৷ এই বালকরাজার প্রবল দুঃশাসনে অস্থির হয়ে তিনি এখন রাজ অন্তঃপুরে সামান্য বিশ্রামে আছেন৷
রাজসভা শুরু৷ নকিব ফুঁকারে৷ নীচের ধাপ দেখিয়ে রাজা তাঁর দুই সঙ্গীকে বললেন, ‘তুই মন্ত্রী, তুই ওখানে দাঁড়া৷ আর, তুই সেনাপতি, তুই দাঁড়া ওখানে৷’ আর এক ধাপ নীচে সভাসদদের স্থান৷ ঘোষণা হল, ‘সভার কাজ শুরু৷’ সঙ্গে সঙ্গে রাজকর্মচারীরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজাকে প্রণাম জানাল৷
রাজার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন, ‘মন্ত্রী, রাজ্যের খবর কী?’
‘আজ্ঞে মহারাজ, প্রজারা পরম সুখে আছে৷’
পরম সুখে থাকলে কোনও সমস্যা নেই৷ মন্ত্রী যেদিন জানাত, ‘মহারাজ! একজন দস্যু ভীষণ উৎপাত করছে’, সেদিন শুরু হত দক্ষযজ্ঞ৷
রাজার আদেশ, ‘দুরাত্মার মুণ্ডচ্ছেদ কর৷’
আদেশ পাওয়ামাত্রই দশ-বারো জন সান্ত্রি হে রে রে রে করে দস্যুটিকে ধরার জন্যে তাড়া করল৷ দস্যু কেন সহজে আত্মসর্ম্পণ করবে৷ সে সদর দরজার দিকে ছুটছে৷ পেছনে ছুটছে রাজার সান্ত্রিবাহিনী৷ তারা কণ্ঠস্ত্রধারী৷ চিৎকারে বাড়ি ভেঙে পড়ে আর কি! সকলের দিবানিদ্রা ছুটে গেল৷ দেউড়িতে শুয়েছিলেন ভৃত্যবর্গ৷ কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল৷ সান্ত্রিবাহিনীকে ধরে দু-চার ঘা দেওয়ার জন্যে তাঁরাও ছুটছেন৷ সর্বোচ্চ সোপানে বসে রাজা নরেন্দ্র মৃদু মৃদু হাসছেন৷
এই উঁচু দালান থেকে বালক নরেন্দ্রনাথ একদিন নীচের উঠোনে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷ বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিলেন ঠাকুরদালানে৷ জ্ঞান ফিরে আসতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগল৷ ডাক্তারবাবু বললেন, আঘাত অবশ্যই গুরুতর৷ তবে প্রাণের ভয় নেই৷ নরেন্দ্রনাথের ডান চোখের ভুরুর ওপরটা কেটে গিয়েছিল৷ সেই ক্ষতচিহ্ণ আজীবন ছিল৷ পরবর্তীকালে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘সেদিন ওইভাবে কিছুটা শক্তি বেরিয়ে না গেলে, ও পৃথিবীটাকে একেবারে ওলট-পালট করে দিত৷’
এই সেই দেয়াল, যে-দেয়ালে ঝুলত হুঁকোর জাতিভেদ৷ ব্রাহ্মণ হুঁকো, কায়স্থ হুঁকো, কৈবর্ত হুঁকো, মুসলমান হুঁকো৷ পিতা বিশ্বনাথ দত্তের কাছে নানা জাতের মক্কেলরা আসতেন৷ একদিন নরেন্দ্রনাথ প্রতিটি হুঁকোয় পরপর মুখ ঠেকিয়ে পরীক্ষা করতে চাইলেন, জাত যায় কি না! পিতা বিশ্বনাথ ঘরে এসে অবাক হয়ে পুত্রের কাণ্ড দেখছেন৷ জিগ্যেস করলেন, ‘এটা কী হচ্ছে?’
নরেন্দ্রনাথের স্পষ্ট উত্তর, ‘দেখছি, জাত না মানলে কী হয়!’
উঠোনের এই জায়গাটায় বালক নরেন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন তাঁর গ্যাসঘর৷ কলকাতায় সবে গ্যাসের আলো এসেছে৷ সোডা-লেমনেডের দোকান বসেছে৷ বোতলের মুখে গুলি৷ চাপ দিয়ে গুলিটাকে ভেতরে ঢোকালেই জলের বুজবুজি৷ ঠাকুর বলতেন, ‘কাক খুললেই...’৷ এই সব বৈজ্ঞানিক ব্যাপার-স্যাপার দেখে নরেন্দ্রনাথ কারখানা বসালেন৷ এই উঠোনের এক পাশে৷ ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির মতো গ্যাস তৈরি হবে৷ তৈরি হবে সোডা আর লেমনেড৷ কতকগুলো পুরোনো দস্তার নল, মাটির হাঁড়ি আর খড়—এই হল সেই কারখানার যন্ত্রপাতি৷ খড় জ্বালালেই ধোঁয়া৷ সেই ধোঁয়া ওই নল বেয়ে উঠত ওপরে৷ সুপারভাইজার নরেন্দ্রনাথের কোমরে হাত৷ দাঁড়িয়ে আছেন৷ গম্ভীর৷ দেখছেন কেরামতি৷ সঙ্গে সঙ্গীরা৷ উঃ! কী আবিষ্কার৷ রেলগাড়িও চলতে লাগল৷ সঙ্গীরা তাঁর কর্মী৷ আদেশ করছেন, ‘না, কিচ্ছু হচ্ছে না, আরও আগুন দে, খুব ফুঁ লাগা৷ গ্যাস বড় কম বেরোচ্ছে৷’ এই সেই উঠোন!
‘নারায়ণ হরি, নারায়ণ হরি’৷ সদরে এক সাধু ভিখারি৷ বালকের কানে গেছে সেই ডাক৷ ছুটছেন বালক বিলে৷ ধর, ধর৷ কে আটকাবে! সাধুর ডাক শুনেছেন—নারায়ণ হরি৷ আরে, ওকে আটকা। এখুনি সব দিতে শুরু করবে৷ হাতের কাছে যা পাবে৷
সাধু বললেন, ‘একটা কাপড় দাও না বাবা৷’
নরেন্দ্রকে মা ভুবনেশ্বরী সেদিন পরিয়ে দিয়েছিলেন নতুন একখানি ধুতি৷ সেই ছোট্ট ধুতিখানি সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে খুলে সাধুকে দিয়ে দিলেন৷ সেই ছোট্ট ধুতিতে লজ্জা নিবারণ তো হবে না! ধুতিখানি মাথায় জড়িয়ে সাধু চলে যাচ্ছেন, সদরে দাঁড়িয়ে সানন্দে দেখছেন নরেন্দ্রনাথ, তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩৷ এখনও তেইশ বছর দূরে৷ শুয়ে শুয়ে ভাবতেন নরেন্দ্রনাথ—আমি রাজা হব, না আমি সন্ন্যাসী হব৷ ইচ্ছে করলে রাজা আমি হতে পারি, কিন্তু আমি সন্ন্যাসীই হব৷ ওই যে ডাক দিয়ে যায় আমার ভবিষ্যৎ, হরি নারায়ণ৷ এই ক্ষুদ্র নরেনে তৈরি হচ্ছে জগতকাঁপানো সেই বৃহৎ বিবেকানন্দ৷
‘আপাতত, তুই এই ঘরে তালা বন্ধ থাক৷’
সেই একই লীলা—যশোদা, নন্দলালা৷ মাতা ভুবনেশ্বরী, পুত্র নরেন্দ্র৷ দুর্দান্ত বালক বন্দি থাক কিছুক্ষণ৷ একটু আগে দিদিরা ধরার চেষ্টা করেছিলেন৷ তাড়া খেয়ে নরেন্দ্র আঁস্তাকুড়ে গিয়ে উঠলেন৷ নানাভাবে মুখ ভেঙচাতে ভেঙচাতে বলতে লাগলেন, ‘ধর না, ধর না৷’
সেই ঘর, বন্দি বীরেশ্বর৷ ঘরে অনেক জিনিসপত্র৷ বীরেশ্বর মুচকি মুচকি হাসছেন৷ তাহলে কাজ শুরু করা যাক৷ রাস্তা দিয়ে সাধু, ভিখারি অনবরতই যাওয়া-আসা করছেন৷ ঘরের যাবতীয় জিনিস তাঁদের ডেকে ডেকে জানলাপথে দান করতে লাগলেন৷ নিয়ে যাও, নিয়ে যাও৷ সব নিয়ে যাও৷
ঝনঝন শব্দে প্রতিবেশীরা চমকে উঠলেন৷ দত্তবাড়িতে ভাঙচুর শুরু হয়েছে৷ বীরেশ্বর আজ রেগে গেছে৷ রেগে গেলে আর রক্ষা নেই৷ মা বলছেন, ‘অনেক মাথা খুঁড়ে শিবের কাছে একটা ছেলে চেয়েছিলুম, তিনি পাঠিয়ে দিলেন একটি ভূত!’ বারান্দার এই সেই স্থান! এইখানেই নরেন্দ্রনাথের রাগের চিকিৎসা হত৷ ছেলের মাথায় মা বালতি বালতি জল ঢালছেন আর জপ করছেন, শিব, শিব৷
জলস্নাত জীবন্ত বালক শিব, জ্যোতির্ময়৷ ভিজে চুল কপাল বেড়েছে৷ তাণ্ডব শেষ করে নটরাজ প্রশমিত শিব৷ জলমগ্ন৷ ধ্যানস্থ৷ চারপাশে প্রবাহিত জাহ্নবী ধারা৷ এই সেই বারান্দা যেটি রূপান্তরিত হত শিবভূমিতে৷
ওই ওখানে কে দাঁড়িয়ে গোয়ালের সামনে? আমাদের বীরেশ্বর৷ কী করছে? দেখে এসো৷ গাভীর গলায় মালা পরিয়েছে৷ কপালে দিয়েছে সিঁদুরের ফোঁটা৷ গায়ে হাত বুলিয়ে কেমন আদর করছে! দুজনে ভীষণ বন্ধুত্ব, ভীষণ ভাব-ভালবাসা!
আর ওই ছাগল তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে?
ওটিও নরেন্দ্রের ক্রীড়াসঙ্গী৷ শুধু কি তাই, এই খাঁচা-বন্দি বিলিতি ইঁদুর, কাকাতুয়া, পায়রা, সবই ওর চিড়িয়াখানার অতিথি৷
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে, আরও ওপরে, একেবারে ছাদে৷ এই সেই ঘর৷ এই ঘরে অতীত বসে আছে৷ সমবয়স্ক ব্রাহ্মণ বালক হরিকে নিয়ে ধ্যানে বসেছেন নরেন্দ্র৷ দরজা ভেতর থেকে খিল আঁটা৷ সামনে মেলা থেকে কিনে আনা মাটির যুগলমূর্তি—রাম-সীতা৷
বহুক্ষণ বালকের কোনও সন্ধান নেই৷ কোথায় গেল বীরেশ্বর! খোঁজ খোঁজ৷ চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল৷ শেষে একজনের মনে হল, ছাদের ওপরটা একবার দেখলে হয় না! চিলেঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ৷ অনেক ঠেলাঠেলিতেও খুলল না৷ তখন দরজা ভাঙার ব্যবস্থা হল৷ ভাঙা দরজা দিয়ে ছুটে পালাল হরি৷ ধ্যানস্থ নরেন্দ্র৷ দরজা ভাঙার শব্দ, এত হইচই, তবু ধ্যান ভাঙেনি৷ ধীর, স্থির, মুদিত নয়ন৷ অবশেষে অনেকবার ঝাঁকুনি দিয়ে তাঁর চৈতন্য ফেরানো হল৷
দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরকে পাগল করে দিয়েছিলেন, সমাধি, সমাধি, সমাধি৷ সমাধি তো সঙ্গে করেই এনেছিলেন৷ এই চিলেকোঠার ঘরেই একদিন ধ্যানখেলা চলছে৷ সঙ্গীসাথীদের নিয়ে৷ নরেন্দ্র চলে গেছেন গভীর ধ্যানে৷ এমন সময় মেঝেতে এক গোখরো সাপ৷ ছেলেরা ছুটে গিয়ে বড়দের ডেকে আনল৷ তাঁরা এসে দেখলেন, সেই ভয়ংকর অপূর্ব দৃশ্য—ধ্যানস্থ বালক শিব, সামনে ফণা বিস্তার করে আপন ভাবে দুলছে গোখরো সাপ৷ এই চিলেকোঠাটি সেই শিবক্ষেত্র৷
বাবার গাড়ির সহিসের সঙ্গে ভীষণ ভাব৷ রাত্তিরবেলা দালানের এই পাশটায় বসে দুজনের যত গল্প৷ বাবাকে তো বিলে বলেই দিয়েছে, বড় হলে সে সহিস কিংবা কোচওয়ান হবে৷ মাথায় পাগড়ি, হাতে চাবুক, গাড়ির মাথায় উচ্চাসনে বসে চাবুক ঘোরাতে ঘোরাতে, বলিষ্ঠ, দুরন্ত ঘোড়াকে বাগ মানিয়ে শহরের জানা, অজানা পথে শকট চালনা করবে৷ বীরেশ্বর রোজ সীতারামের পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন৷ একদিন পুজোর শেষে আস্তাবলে গেছেন৷ সহিসের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে৷ দুজনেই যেন সমবয়সি৷ যৌবনে দক্ষিণেশ্বরে যেমন ছিলেন হাজরামশাই, বাল্যে সেইরকম এই সহিস৷ সহিস আজ খুব জোর দিয়ে বললে, ‘বিয়ে করা খুব খারাপ, ভীষণ খারাপ৷’
নরেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কবিতর্ক৷ সহিসের অকাট্য যুক্তি নরেন্দ্রনাথ ফেলতে পারছেন না৷ অবশেষে তাঁকে স্বীকার করতে হল, বিয়ে করা খুবই খারাপ৷ চোখে জল নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন৷ মা কোলের কাছে টেনে নিয়ে জিগ্যেস করলেন, কীসের দুঃখে চোখের জল! প্রথমে কিছুই বললেন না, কিন্তু চোখে আরও জল, টইটম্বুর৷ শেষে বললেন, রামসীতাকে পুজো করা আর সম্ভব হবে না৷ বিয়ে করা খুবই খারাপ, আর রামচন্দ্র সেই অপরাধে অপরাধী৷ অপরাধীকে আর আমি দেবতার আসনে বসিয়ে পূজা করতে পারব না৷
মা বললেন, ‘তাতে কী হয়েছে, শিবপূজা কর৷’
সেদিন রাতে এই বাড়ির ছাদে সেই বেদনাদায়ক বিচ্ছেদ-দৃশ্য৷ যুগলমূর্তিটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বীরেশ্বর৷ অনেকদিন পূজা করেছি৷ ধ্যান লাগিয়েছি সামনে৷ না, দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে না৷ কেন তুমি বিয়ে করলে শ্রীরামচন্দ্র! তবে যাও৷
পথের ওই জায়গাটিতে যুগলমূর্তি ছিটকে পড়ে চুরমার হয়ে গেল৷ সময় গেল, না সময় এল! সময় কোন দিকে যায়৷ আগে না পিছে!
‘যাঃ, বিয়ে করে ফেলেছে!’ প্রথম পরিচয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মাস্টারমশাইয়ের মুখের ওপর এই কথাই বলেছিলেন৷ মা কালীর কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘দেখো মা, নরেন যেন বিয়ে করে না ফেলে৷’ শ্রীরামের প্রতি বিরূপ হলেও গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ ও শিষ্য নরেন্দ্রনাথ, দুজনেই আজীবন সীতার ভক্ত ছিলেন৷ পঞ্চবটীতে শ্রীরামকৃষ্ণ সীতাকে দর্শন করেছিলেন৷ শুধু দর্শন নয়, সীতা তাঁর শরীরে প্রবেশ করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে ঠাকুর প্রায়ই বলতেন, জনমদুখিনি সীতাকে যে প্রথমেই দেখেছে, সে কেমন করে সুখের আশা করে!
ঠাকুরদালানের দক্ষিণ দিকে এই যে ঘরটি, এই ঘরটির একটি নাম আছে, ‘বোধন ঘর৷’ বিশ্বনাথ দত্তের পিতা দুর্গাপ্রসাদ, অর্থাৎ নরেন্দ্রনাথের পিতামহ বিশ-বাইশ বছর বয়সে প্রব্রজ্যা অবলম্বন করে চিরকালের জন্যে গৃহত্যাগ করেছিলেন৷ বিশ্বনাথ দত্তের বয়স তখন ছয় কি সাত মাস৷ অন্নপ্রাশন হবে৷ বিশ্বনাথ দত্ত ১৮৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সম্ভবত৷ গৃহত্যাগের পর গঙ্গাসাগর দর্শনের পথে দুর্গাপ্রসাদ একবার কলকাতায় এসে এক পরিচিত ভদ্রলোকের বাড়িতে উঠেছিলেন৷ তাঁর ভাই কালীপ্রসাদ খবর পেয়ে দুর্গাপ্রসাদকে পালকিতে বসিয়ে প্রহরী বেষ্টিত করে বাড়িতে নিয়ে এলেন৷ এনে, এই বোধন ঘরে সন্ন্যাসীকে বন্দি করে রাখলেন৷ দুর্গাপ্রসাদ অন্নজল গ্রহণ করলেন না৷ টানা তিন দিন জপের ওপর থাকলেন৷ সকলে ভয় পেলেন যদি দেহ চলে যায়! দুর্গাপ্রসাদ মুক্তি পেয়ে সেই যে চলে গেলেন, তারপর একবার মাত্র তাঁর দর্শন পাওয়া গিয়েছিল কাশীতে৷ এই বোধনঘরে সঞ্চিত আছে পিতামহের লক্ষ কোটি জপ৷ নরেন্দ্রনাথ দেখতে হয়েছিলেন ঠিক তাঁর পিতামহের মতো৷ সবাই বলতেন, দুর্গাপ্রসাদ ফিরে এসেছেন৷
এই এত রাতে ওই শোওয়ার ঘর থেকে কলকল করে এত হাসি ভেসে আসছে কেন? ওই যে ভাইবোনদের নিয়ে নরেন্দ্রনাথ শুতে গেছেন৷ রোজ রাতে ঘুমোবার আগে নরেন্দ্রকে গল্প বলতে হয়৷ মজার মজার গল্প৷ আজকের গল্পটা কী? থেকে থেকে এত হাসি!
ব্যাঙের বাড়িতে বিরাট যজ্ঞী৷ কিন্তু তাদের পয়সা ফুরিয়ে গেছে৷ ব্যাঙ-কর্তা গেছে মশাদের বাড়িতে, ‘ভাই! আমাদের বাড়িতে বিরাট যজ্ঞী৷ খুব খাওয়াদাওয়া, তোমাদেরও নেমন্তন্ন৷ তা তোমরা আমায় কিছু কড়ি ধার দাও, কিছুদিন পরেই শোধ করে দেব৷’ মশারা ব্যাঙ-কর্তাকে কিছু কড়ি ধার দিলে৷ ব্যাঙের যজ্ঞ হয়ে গেল৷ এল শ্রাবণ মাস৷ শুরু হল বর্ষা৷ মশারা ঝাঁক বেঁধে ব্যাঙ-কর্তার বাড়িতে এসে বলতে লাগল, ‘কঁড়ি দাঁও ভাঁই, কঁড়ি দাঁও ভাঁই৷’
নরেন্দ্রের মশার গলা শুনে ভাইবোনদের কলকল হাসি৷
‘ব্যাঙ তখন খেয়েদেয়ে কেঁদো মোটা৷ বর্ষার জলে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে আরামসে বসে আছে৷ মশারা সেখানে যেতে পারে না৷ তাই অনেকটা ওপর থেকে বলছে, ‘কঁড়ি দাঁও ভাঁই৷’ ব্যাঙ-কর্তা পেটটা ফুলিয়ে ফুলিয়ে বলতে লাগল, ‘কে কার কড়ি ধারে, কে কার কড়ি ধারে!’
নরেন্দ্রের এবার ব্যাঙের গলা৷ আবার কলকল হাসি৷
‘মশারা হতভম্ব৷ এ বলে কী? তারা গাছের ডালে ডালে বসে রইল৷ অপেক্ষা করতে লাগল৷ কিছুক্ষণ পরে এল একটা সাপ৷ কপ্৷ ব্যাঙটাকে গিলছে৷ একটু একটু করে৷ ব্যাঙটার দমবন্ধ হয়ে আসছে৷ তার পরিত্রাহি চিৎকার—‘কড়ি নাও, কড়ি নাও৷’ মশারা গাছে বসে শুনছে, আর বলছে, ‘এঁখন সাপের পেঁটে যাঁও৷ এঁখন সাপের পেঁটে যাঁও৷’
শিশুদের হাসির কলরোল৷ তারপর ঘুম এল৷ শান্তির ঘুম৷ নীল স্বপ্ন৷ তিন নম্বর বাড়ির সারাদিনের কলকোলাহল স্তব্ধ৷ নিভে গেছে সব আলো৷ নরেন্দ্র চিত হয়ে শুয়ে আছেন৷ ভুরুর মাঝখানে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে সেই জ্যোতির্ময় ত্রিভুজ! নরেন্দ্রনাথ ভাবতেন, সকলেরই বুঝি এইরকম হয় ঘুমোবার সময়৷ দক্ষিণেশ্বরে নরেন্দ্রনাথ প্রথম গেছেন ভক্ত সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে৷ পশ্চিমের দরজা দিয়ে ঠাকুরের ঘরে ঢুকলেন৷ দুটি গান শোনালেন ঠাকুরকে৷ ঠাকুর হঠাৎ জিগ্যেস করলেন, ‘তুই কি ঘুমোবার আগে একটা জ্যোতি দেখিস?’ নরেন্দ্র উত্তর দিলেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
ঠাকুর বললেন, ‘বাঃ, সব মিলে যাচ্ছে৷ এ ধ্যানসিদ্ধ--জন্ম থেকেই ধ্যানসিদ্ধ৷’ স্বামী বিবেকানন্দ বর্ণনা করছেন, ‘আজীবন ঘুমোব বলে চোখ বুজলেই ভুরুর মাঝখানে অপূর্ব এক জ্যোতির্বিন্দু দেখতে পেতুম৷ একমনে সেই অপূর্ব বিন্দুর নানারকম পরিবর্তন লক্ষ করতে থাকতুম৷ দেখবার সুবিধের জন্যে লোকে যেভাবে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে আমি সেইভাবে বিছানায় শুয়ে থাকতাম৷ ওই অপূর্ব বিন্দুতে চলত নানা রঙের খেলা৷ বিন্দুটি ক্রমশ বড় হতে হতে একসময় ফেটে যেত৷ সারা শরীর ঢেকে যেত সাদা তরল জ্যোতিতে৷ আর তখনই আমার চেতনা লুপ্ত হত৷’
নরেন্দ্রনাথ প্রণামের ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে আছেন৷ ভাইবোনরা গল্প শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে৷ গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের তিন নম্বর বাড়িটি রাতের চাদরের তলায় নিস্তব্ধ৷ নীচের অফিসঘর অন্ধকার৷ অ্যাটর্নি বিশ্বনাথ দত্ত বিশ্রাম করছেন৷ সার সার আইনের বই৷ ধারার পর ধারা৷ জল নেই এক ফোঁটা৷ বিরাট টেবিলে গাদা দলিল-দস্তাবেজ৷ মামলার আর্তনাদ৷ আর বিলিতি দোয়াত৷ হার্ডমুথ কোম্পানির কলম৷
দাতা বিশ্বনাথের পেনশনে পালিত একদল নিষ্কর্মা পড়ে পড়ে নাক ডাকাচ্ছে৷ কেউ আছে গাঁজায়, কেউ আফিমে, কেউ চরসে৷ হেদোর ধারেই গুলির আড্ডা৷ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ওপর হিন্দুমেলার প্রবর্তক নবগোপাল বাবুর জিমন্যাস্টিকের আখড়ায় বারবেল, ডাম্বেল বিশ্রাম করছে৷ প্যারালাল বার ঘামছে না৷ একজোড়া রিং দুলছে না৷ নরেন্দ্রনাথ এই আখড়ার উৎসাহী সভ্য৷ লাঠিখেলা, ফেনসিং, রোয়িং, সুইমিং, কুস্তি সবেতেই তিনি পারদর্শী৷
সেই রুপোর প্রজাপতিটা কোথায় গেল! কোন দেয়ালে আটকে ছিলেন! মুষ্টিযুদ্ধে প্রথম হওয়ার পুরস্কার! বাড়ির উঠোনে ব্যায়ামের আখড়া করেছিলেন৷ বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত শরীরচর্চার ব্যবস্থা৷ বেশ ভালোই চলছিল৷ একদিন ব্যায়াম করতে গিয়ে খুড়তুতো ভাইয়ের হাত ভাঙল৷ কাকার আদেশে আখড়া উঠে গেল৷
শখের থিয়েটার দল করেছিলেন৷ স্টেজ বেঁধে কয়েকবার অভিনয়ও হল৷ আর এক কাকার আপত্তিতে থিয়েটার বন্ধ হল৷ স্টেজ খুলে ফেলা হল৷ থিয়েটারের পরিবর্তেই ব্যায়ামের আখড়া হয়েছিল৷
নবগোপালবাবুর আখড়া ছাড়াও কয়েকজন মুসলমান ওস্তাদের কাছে লাঠিখেলার বিশেষ তালিম নিয়েছিলেন৷ বয়স মাত্র দশ৷ মেট্রোপলিটন স্কুলের ছাত্র৷ একটি মেলা উপলক্ষ্যে জিমন্যাস্টিকের আয়োজন করা হয়েছে৷ নরেন্দ্রনাথ দর্শক৷ সবশেষে লাঠিখেলা৷ হচ্ছে৷ কিন্তু কিছুক্ষণ চলার পর সব যেন কেমন ঝিম মেরে গেল৷ তখন নরেন্দ্রনাথ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ জানালেন৷ সবচেয়ে বলবান এক যুবক সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে এলেন৷ শুরু হল প্রবল লড়াই৷ দর্শকদের সকলেই অনুমান করে নিতে পেরেছিলেন, এই অসম লড়াইয়ের ফলাফল কী হতে পারে৷ তবু বালক নরেন্দ্রনাথের কৌশল আর সাহস দেখে ক্ষণে ক্ষণে হাততালি৷ হঠাৎ একসময় পাঁয়তাড়া কষতে কষতে হঠাৎ নরেন্দ্রনাথ সুকৌশলে ও সশব্দে প্রতিপক্ষকে এমন এক প্রচণ্ড আঘাত করলেন যে, তাঁর হাতের লাঠি দু’টুকরো হয়ে গেল৷ নরেন্দ্রনাথ জিতলেন৷ সিমুলিয়ার দুর্দান্ত সাহসী, একরোখা, একগুঁয়ে ছেলেটি একটি আবির্ভাব৷ বুঝেছিলেন সকলে৷
বাবা একটি টাট্টু ঘোড়া কিনে দিয়েছিলেন৷ বালক নরেন্দ্রনাথ ঘোড়ায় চড়া রপ্ত করলেন৷ কোনও কিছু শিখতে তাঁর বেশি দিন সময় লাগত না৷ গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের তিন নম্বর বাড়ি থেকে রোজ সকালে আর বিকেলে একটি টাট্টুঘোড়া নিষ্ক্রান্ত হত৷ আরোহী এক রাজপুত্র৷ টগবগিয়ে ছুটত ঘোড়া কলকাতার পথে পথে৷
বাড়িতে আজ কীসের উৎসব! একের পর এক ঘোড়ার গাড়ি আসছে৷ বিশিষ্ট পোশাকে বিশিষ্ট চেহারার ভদ্রলোকরা আসছেন! সঙ্গীতপ্রেমী বিশ্বনাথবাবুর গানের আসর৷ জলসা৷ বিশিষ্ট সঙ্গীতগুণীরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিবেশন করবেন৷ সঙ্গীত শেষে দত্তমশাই প্রত্যেককে পরিতুষ্ট করবেন মোগলাই-খানায়, পোলাও, মাংস ইত্যাদিতে৷ নিজেই রাঁধবেন৷ পুত্র নরেন্দ্র সহকারী৷ পিতা বিশ্বনাথ সপরিবারে দেড় বছর রায়পুরে ছিলেন৷ দত্তমশাই সেই সময় পুত্রকে রন্ধনবিদ্যায় পারদর্শী করেছিলেন৷ শিখিয়েছিলেন দাবা খেলা৷
কলকাতা ডোবা, পুকুর, জঙ্গল থেকে বেরিয়েছে৷ মাঝেমধ্যে সুন্দরবনের বাঘও চলে আসত৷ ১৮১৯ সালের ‘সমাচার দর্পণে’র খবর—গৌরীপুরে বাঘ৷ কোথা থেকে এল! গঙ্গাসাগরে জঙ্গল সাফ করে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে৷ বাঘ গঙ্গাসাগর থেকে উৎখাত হয়ে শুড়িটোলা, বাগমারি, বেলগাছি হয়ে গৌরীপুরে৷ সেখানে তার প্রথম আহার এক মহিলা৷ তারপর এক খোড়ো ঘরে ঢুকে একজন পুরুষকে ভোজনের চেষ্টা করে ঘরবন্দি হয়ে দমদমার সাহেবের গুলিতে প্রাণ হারাল৷
দত্ত পরিবারের উৎস সন্ধানে অবশ্যই আমাদের দূর অতীতে যেতে হবে৷ মোগল সাম্রাজ্যের শেষ পাদে৷ বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁর শাসন কায়েম হয়েছে৷ সেই সময়ের বর্ধমানের কালনা সাবডিভিশনের একটি গ্রাম, দত্ত-দারিয়াটোনা৷ চলতি নাম ‘ডেরেটোনা৷’ ডেরেটোনার জমিদার রামনিধি দত্ত, তাঁর পুত্র রামজীবন ও পৌত্র রামসুন্দর দত্তের সঙ্গে ইংরেজ আমলের একেবারে প্রথম ভাগে গড়-গোবিন্দপুরে বসতি স্থাপন করলেন৷ গোবিন্দপুর ছাড়তে হল৷ ইংরেজদের কেল্লা হবে সেখানে৷ দত্তপরিবার চলে এলেন কলকাতার শিমলা অঞ্চলে৷ মধু রায়ের গলিতে তৈরি হল নতুন বাড়ি৷
সে তো অনেক কাল আগের কথা, ১৬০০ শেষ হয়ে ১৭০০ শুরু হচ্ছে৷ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জোব চার্ণক হুগলি নদীর পূর্ব কূলে তিনটি গ্রাম ইজারা নিলেন৷ কলিকাতা, সুতানুটি আর গোবিন্দপুর৷ ওই সময় মুঘল ভারতে বাংলার সুবেদার ছিলেন মান সিং৷ রামনিধি আর রামজীবন উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন৷ রামসুন্দর ছিলেন এক জমিদারের দেওয়ান৷
রামসুন্দরের বড় ছেলের নাম রামমোহন দত্ত৷ ভালো ফার্সি জানতেন৷ সুপ্রিম কোর্টের জনৈক ইংরেজ অ্যাটর্নির অফিসে ম্যানেজিং ক্লার্কের কাজ করতেন৷ প্রচুর উপার্জন৷ তিন নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের এই বাড়িটি তাঁর নির্মাণ৷ দেড় বিঘা জমি৷ দক্ষিণমুখে নেপালশালে তৈরি বিশাল প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই প্রশস্ত প্রাঙ্গণ৷ প্রাঙ্গণের পূর্বদিকে পশ্চিমমুখী ‘পাঁচফুকুরী’—অর্থাৎ ঘষা গোল ইটের থামের ওপর পাঁচটি খিলানযুক্ত ঠাকুরদালান৷ ঠাকুরদালানের দোতলায় দক্ষিণদিকে বড় বড় হলঘর৷ উত্তরদিকের ঘরটিকে বলা হত ‘বড় বৈঠকখানা’, আর দক্ষিণের ঘরটি ‘ঠাকুরঘর’৷ বাইরের উঠানের পশ্চিমে চকমেলানো দালান আর গোয়ালঘর৷ অন্দরমহলের দুদিকে দুটি প্রাঙ্গণ আর পেছন দিকে ‘কানাচ’ বা অন্দরমহলের মহিলাদের ব্যবহারের জন্যে পুকুর ছিল৷ তিন নম্বর বাড়ির বাইরে, দু’নম্বরে ছিল রামমোহন দত্তের ‘অশ্বশালা’৷ জমির পরিমাণ চারকাঠা৷ বৈঠকখানা ঘরে সেকালের প্রথানুসারে দেওয়ালগিরি, বেল লণ্ঠন, হাঁড়ির-লণ্ঠন সাজানো ছিল৷ দেয়ালে ঝোলানো ছিল ভালো ভালো ছবি৷
অন্ধকার রাত নামত যখন বাইরে তখন অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় গা-ছমছমে পরিবেশ৷ মাঝে মাঝে লণ্ঠনধারী পথিক দু’একজন৷ ‘চিত্রেশ্বরী’ মন্দির থেকে একটি রাস্তা গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাত্রীপথরূপে এগিয়ে গেছে কালীঘাটে৷ সাহেবরা এই পথটিকে বলত Pigrims track ৷ এই রাস্তাই পরবর্তীকালের চিৎপুর রোড৷ বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের পরেই ছিল একটি খাল, ‘গোবিন্দপুর-ক্রিক’৷ পথ খাল পেরিয়ে প্রবেশ করল চৌরঙ্গির জঙ্গলে৷ ভবানীপুর ভেদ করে কালীঘাটে৷ চিত্রেশ্বরীতে অমাবস্যার রাতে কাপালিকরা নরবলি দিত৷ এদিকে বিশে ডাকাত, ভবানীপুরের বিখ্যাত ডাকাত রসা পাগল৷
পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে চেহারা পালটাতে লাগল৷ ইংরেজ আর বণিক নয়, শাসক৷ কলকাতার সায়েবরা তখন একটি জ্বরকে যমের মতো ভয় পেতেন৷ যমই বটে৷ ধরলে অবধারিত মৃত্যু৷ তাঁরা এই জ্বরের নাম রেখেছিলেন ‘পাক্বা জ্বর’৷ লর্ড ক্লাইভের সুযোগ্য সহযোগী অ্যাডমির্যাল ওয়াটসন এই জ্বরে অকালে চলে গেলেন৷
স্যাঁতসেঁতে জমি, যত্রতত্র জঙ্গল আর কলা ঝোপ৷ ‘বোর্ড’-এর নির্দেশ হল, ‘কলকাতাকে কলাগাছ ও জঙ্গলশূন্য করতে হবে৷ তা না করলে শহরের স্বাস্থ্য রক্ষা অসম্ভব৷ সারভেয়ার সাহেবকে আদেশ করা যাচ্ছে—মহারাষ্ট্র-খাতের সীমার মধ্যে জঙ্গলময় সমস্ত স্থান তিনি পরিষ্কার করতে আরম্ভ করবেন৷’ এই হুকুমের একশো বছর পরে নরেন্দ্রনাথ এলেন৷ তখনও সিমুলিয়ার আশেপাশে কলাঝোপ৷
সেই ঝোপটি ঠিক কোন জায়গায় ছিল! বীরেশ্বর বিবাহ করার অপরাধে রাম-সীতাকে পরিত্যাগ করলেও মহাবীর হনুমানের অনুরাগী৷ হৃদয়ে মহাবীরের আদর্শ জ্বলজ্বল করছে৷ একবার যদি তাঁর দেখা পাই! বীরেশ্বর শুনেছিলেন, যেখানে রামায়ণ পাঠ হয় সেখানে মহাবীর হাজির থাকেন৷ কোথাও রামায়ণ গান হবে জানতে পারলেই বীরেশ্বর ছুটে যেতেন৷ একদিন এই রকমই এক আসরে গেছেন৷ কথক ঠাকুর যখন বললেন, ‘হনুমান কদলীবনে থাকেন’, তখন বীরেশ্বর জিগ্যেস করলেন, ‘সেখানে গেলে কি তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়?’ কথক ঠাকুর একটু ঠাট্টা করলেন, ‘হ্যাঁ গো, গিয়েই দেখো না৷’
বালকের বিশ্বাস! বাড়ির কাছেই কলাগাছের ঝোপ৷ ভয়-ডর নেই৷ ফণা তোলা গোখরোর সামনে ধ্যানে স্থির৷ ঢুকে গেলেন কলা ঝোপে৷ মশার কামড়৷ বসে আছেন মহাবীরের অপেক্ষায়৷ রাত বাড়ছে৷ ঝিম ঝিম রাত৷ ঘণ্টা পার৷ মহাবীর কোথায়! হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন৷ ছলছল চোখে বড়দের জানালেন, মহাবীর তো এলেন না৷ তাঁরা প্রবোধ দিলেন, ‘ওরে বিলে, বোধহয়, আজ প্রভুর কাজে হনুমান অন্য কোথাও গেছেন, তাই তাঁর দেখা পাসনি৷’
এই সেই দেয়াল৷ এই দেয়ালেই ছিল সেই বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না৷ পিতার অমিতব্যয়িতায় ক্ষুব্ধ যুবক নরেন্দ্রনাথ একদিন বড় স্পষ্ট করে বললেন, ‘আপনি আর আমার জন্যে কী করেছেন?’
ধীর স্থির পিতা বিশ্বনাথ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পুত্রকে বললেন, ‘ওই যে আয়না, সামনে গিয়ে দাঁড়া, নিজের চেহারাটা দেখলেই বুঝতে পারবি৷’ এই সেই ঘর, নরেন্দ্রনাথ পিতার সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘তোমার নির্বিচার দানে কিছু নেশাখোর পালিত হচ্ছে, তা কি তুমি বোঝো?’ তখন বিশ্বনাথ দত্ত যা বলেছিলেন, তার থেকেই প্রস্ফুটিত হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের জীবন-মন্ত্র৷ তিনি বলেছিলেন, ‘জীবনটা যে কত দুঃখের তা তুই এখন কী বুঝবি? যখন বুঝতে পারবি, তখন এ দুঃখের হাত থেকে ক্ষণিক নিস্তার লাভের জন্যে যারা নেশাভাং করে, তাদের পর্যন্ত দয়ার চোখে দেখবি৷’
এই সেই ঘর৷ সেই রাত, গভীর৷ ধ্যান শেষ৷ ভাসছেন আনন্দে৷ হঠাৎ দিব্যজ্যোতিতে ঘর ভরে গেল৷ এক অপূর্ব সন্ন্যাসী দক্ষিণের দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে এলেন৷ সৌম্য, সুন্দর, জ্যোতির্ময়৷ গেরুয়া বসন, হাতে কমণ্ডলু৷ সেই আবির্ভাব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন নরেন্দ্রনাথের দিকে৷ নরেন্দ্রনাথ ভয়ে দরজা খুলে ঘরের বাইরে চলে এলেন৷ পরমুহূর্তেই ফিরে গেলেন ঘরে৷ সন্ন্যাসী কী বলতে চাইছেন? ঘর শূন্য৷ নরেন্দ্রনাথের কাছে সে-রাতে এসেছিলেন তাঁর ধ্যানের দেবতা—গৌতম বুদ্ধ! ওই ঘরে!
এই সেই বাড়ি৷
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তিনবার এসেছিলেন এই বাড়ির দুয়ারে৷ মিষ্টি কণ্ঠের মধুর ডাক—‘নরেন আছিস! বেরিয়ে আয়, জগৎ যে তোকে ডাকছে৷ ঘরে বাইরে শিক্ষা দিতে হবে যে! মা যে তোকে এই লীলাভূমি থেকে একেবারে বের করে দেবেন, ও আমার রাজা৷ মা যে তোকে তাঁর কাজ করবার জন্যে সংসারে টেনে এনেছেন৷ আমার পেছনে তোকে ফিরতেই হবে৷ তুই যাবি কোথায়!’ ১৮৮৬ শেষ হয়ে এল৷ শেষবারের মতো একবার তাকালেন, মামলা-মকদ্দমায় দীর্ণ, শরিকী সঙ্কীর্ণতায় ক্ষতবিক্ষত ভিটেটির দিকে৷ সিমুলিয়ার উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত হল সেই জ্যোতিষ্ক—শ্রীরামকৃষ্ণ যাঁকে চিনেছিলেন—সপ্তঋষির এক ঋষি৷ নিবেদিতা বললেন—He became India.
২০০৪৷ এই শরৎ৷ রাত গভীর৷ কর্কশ কলকাতার কোলাহল বুঝি ঘুমোল! গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিট৷ সেই তিন নম্বর৷ কে আপনি এই সন্ন্যাসী? নরেন্দ্র৷ নো এনটি৷ আমি স্বামী বিবেকানন্দ৷ আসুন, আসুন৷ এ কী? এ যে প্রাসাদ! ঠাকুর যে বললেন, ‘নরেন, রাজার প্রাসাদ তৈরি কর—জ্ঞান, ভক্তির মশলায় কর্মের ইট দিয়ে৷ আমরা সবাই বসব৷ শুরু হবে নতুন শতাব্দীর নবযাত্রা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন