সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বিশ্ববন্ধু লেনের চওড়া রাস্তায় দত্তদের বিশাল ভাগলপুরী গোরু পাগলের মতো চার-পা তুলে একবার এদিকে ছুটছে একবার ওদিকে ছুটছে৷ গাড়ি-ঘোড়া লোক চলাচল সব বন্ধ৷ ষাঁড় হলে কথা ছিল না, গোরু তো লক্ষ্মী প্রাণী৷ সাতসকালে শান্ত একটা গোরু এমন করবে কেন?
মুকুজ্যে বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট দুটো ছেলে, সন্টে আর নন্টে৷ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে৷ সন্টে বড় ভাই, নন্টে ছোট ভাই৷ দত্তবাড়ির এই গোরুটা রোজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে৷ গোয়ালে ব্রেকফাস্ট সেরে মুকুজ্যে বাড়ির বিশাল গেটের সামনে প্রতিদিন বড় বাইরে আর ছোট বাইরে করে যায় রোজ৷ একটা দিনও কামাই নেই৷ হ্যাট্-হ্যাট্ করলে শোনে না৷ ন্যাজ মলে তাড়িয়ে দিতে চাইলে তেড়ে-তেড়ে আসে৷ দত্তদের বলেও কোনও লাভ হয় না৷ সুভাষ দত্ত, সুমিত মুকুজ্যে প্রায়ই মুখোমুখি হয়৷ বাজারে, দোকানে, ট্রেনে৷ সুমিতের একটাই কথা সুভাষ তোমার গোরুটাকে একটু শিক্ষিত করার চেষ্টা করো৷ একটু ট্রেনিং দাও৷ রোজ-রোজ, বাড়ির গেটের সামনে, আর যে সহ্য করা যায় না৷ সুভাষের সেই একই উত্তর, আরে ভাই, ভাবতে পারো, আমারও কি কম লোকসান! রোজ অতটা করে গোবর লস৷ অন্তত একশো পিস ঘুঁটে হতো৷ আমার মনে হয় পূর্বজন্মে তোমাদের কাছে ওর অনেক ঋণ ছিল৷ এ জন্মে শোধ করে যাচ্ছে৷
সুমিত বলে, তোমার কি মনে হয় পূর্বজন্মে ও মানুষ ছিল?
অবশ্যই৷
মানুষ গোরু হয়ে গেল?
কী বলছ তুমি? মানুষ গাধা হয়, পাঁঠা হয়, গোরু হতে পারে না! মানুষ সব পারে৷ মানুষ যে কী সাংঘাতিক জীব তোমার ভাই ধারণা নেই৷
তা ঠিক৷ তোমাকে দেখে আর তোমার কথা শুনে মালুম হচ্ছে৷ তোমার গোরু দুধ দিয়ে শোধ করছে তোমার ঋণ, আর নাদা-নাদা গোবর দিয়ে শোধ করছে আমার ঋণ৷ এবার একদিন ধরে বেধড়ক পেটাব তখন ঠিক হবে৷
ছি-ছি-ছি, গোরু হল মা ভগবতী, বামুনের ছেলে হয়ে তাকে পেটাবে?
এই চলে আসছে গত ছ’মাস ধরে৷ দুধ খায় দত্তরা আর গোবর সাফা করে মরে মুকুজ্যেরা৷ সুমিত ভাবে পেটাবে, পারে না৷ সাদা ধবধবে নধর চেহারার গোরু৷ কাছে গেলেই মন দুর্বল হয়ে যায়৷ শাসন-টাসন যা করার ওই বিচ্চু দুটোই করে, সন্টে আর নন্টে৷ ছোট-ছোট ঢিল ছুঁড়ে মারে৷ ছিপটি দিয়ে পেটায়৷ হুট হাট করে৷ গোরু গ্রাহ্যই করে না৷ ভাবে আদর৷
সেই গোরু আজ ঘোড়ার মতো ছুটছে৷ রাস্তার এ-মাথা থেকে ও-মাথা, ও-মাথা থেকে এ-মাথা৷ বৃদ্ধ প্রসন্নবাবু পথের পাশের খুপরি জানলা থেকে বললেন, এ মনে হয় অলিম্পিকে যাবে, তাই একটু প্র্যাকটিস করে নিচ্ছে৷
সুভাষ দত্তও সমানে ছুটছে পিছন-পিছন৷ সুবিধে করতে পারছে না৷ একবার তো উলটে পড়েই গেল৷ খেলা খুব জমে উঠেছে৷ দুধারের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে৷ কেউ আর সাহস করে বেরোচ্ছে না৷ ছাদে না হয় বারান্দায় সব ভিড় করেছে৷
হঠাৎ সুমিতের মনে হল এর পিছনে নিশ্চয় সন্টে নন্টের হাত আছে৷ সকালে গেটের সামনে দুটো বিটলে আর ওই গোরু আজ ছমাস দেখে আসছে৷ বারান্দায় অমন চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকার কথা তো নয়! এর পিছনে রহস্য আছে৷ সুমিত বারান্দায় গেল৷ দু-ভাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে৷ কী ভালোমানুষের মতো মুখ যেন কিছুই জানে না৷
বড়টা বললে, কাকা, কী হয়েছে বলো তো? অমন করছে কেন?
—কেন অমন করছে, জানিস না? তাই না?
—না গো৷ সত্যিই আমরা জানি না৷
সুমিত বললে, সত্যি কথা বল৷ মরেটরে গেলে ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে৷
নন্টেটা সন্টের চেয়ে একটু ভীতু৷ সে জিগ্যেস করলে, কাকা মরে যেতে পারে?
পারেই তো৷
—কেন গলে যাবে না৷
—কী গলে যাবে? গোরু?
—না গো বরফ৷
—বরফ৷ এর মধ্যে বরফের কথা আসছে কী করে?
—ওর গলায় বরফ আছে৷
—সে কী রে? বরফ পেল কোথা থেকে?
রহস্য ফাঁস হয়ে গেল৷ বিচ্চু দুটোর বাবা সকালে ফ্রিজ পরিষ্কার করছিলেন৷ সেই সময় ফ্রিজ থেকে সাতদিনের জমা বরফের একটা চাংড়া বেরিয়েছিল৷ সেটা তিনি উঠোনে ফেলে দিয়েছিলেন৷ গলে-গলে একটু ছোট হয়ে এসেছিল৷ বড় বিচ্চুর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল৷ বেশ বড় মাপের সেই টুকরোটাকে দুই ভাইয়ে মিলে বেশ করে ঘাস, পাতা জড়িয়ে গোরুটার মুখের সামনে ফেলে দিয়েছিল৷ পেটুক গোরু৷ মুখে পুরেই গিলেছে৷ গোরুর সব খাদ্য প্রথমে গিয়ে জমা হয় গলকম্বলে৷ গোরু পরে আরাম করে কোথাও শুয়ে-শুয়ে জাবর কাটে৷ সেই বরফের থান গলকম্বলে যত গলছে, গরু তত লাফাচ্ছে৷
সন্টে বললে, তুমি দ্যাখো কাকা, আজ আর গেটের সামনে কিছু করেনি৷ আর কোনওদিনও করবে না৷
ঘণ্টা তিনেক ছোটাছুটির পর গোরু শান্ত হল৷ তার মানে বরফ সব গলে গেছে৷ যাক বাবা মরেনি৷ এসে দাঁড়িয়েছে মুকুজ্যেবাড়ির গেটের সামনে৷ এখনও হাঁপাচ্ছে৷ হঠাৎ ন্যাজ তুলে অন্যদিন যতটা করে প্রায় তার ডবল নামিয়ে দিয়ে, হাম্বা বলে ডাক ছাড়ল৷ যার মানে, কর্তব্যকর্মে কখনও অবহেলা করো না৷ জীবনের ব্রতই হল, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে৷
পরিমাণ দেখে সুমিত বললে, আজ একবারে ডবল ঋণ শোধ৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন