সাগর

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শঙ্কর আমার বন্ধু৷ স্কুলের বন্ধু৷ সেই ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা দুজনে সমান তালে বড় হয়ে চলেছি৷ ইঞ্চি, ইঞ্চি করে বড় হচ্ছি৷ একেবারে সমান, সমান মাপ৷ কাঁধে কাঁধ মিলে যাবে৷ মাথা দুটো নিয়ে সামান্য সমস্যা৷ ওর মাথাটা ডাবের মতো, আমারটা নারকোল৷ ও চিঁড়ে ভাজা খেতে ভালোবাসে, আমি বাসি চিঁড়ে ভিজে৷ সে কোনো ব্যাপার নয়৷ কেউ ভালোবাসে মিষ্টি, কেউ বাসে ঝাল৷ তাতে বন্ধুত্বের কোনো সমস্যা হয় না৷ একটা, দুটো ব্যাপারে তো আমাদের অসম্ভব মিল, যেন, ‘একই বৃন্তে ফুটে আছি আমরা দুটি ফুল—বন্দে মাতরম্’৷ ‘বন্দে মাতরম্’—বলার কারণ, এই লাইনটার সঙ্গে বলতে হয়৷ আমরা দুজনেই ভূত ভালোবাসি৷ ভয় তো করেই; কিন্তু ভয়টাকেই ভালোবাসি৷ বেশ জেনে-শুনেই সেইসব জায়গায় যাই, যেখানে ভূত থাকতে পারে৷ ভূত অনেকটা পাখির মতো৷ উড়ে, উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেড়ায়৷ মাঝে মাঝে ডালে এসে বসে৷ ভূতের তো আরো সুবিধে৷ মনে করলেই মনের মতো জায়গায় হাজির৷

আসলে আমরা সেই ভূতের রাজাকে খুঁজছি, যে গুপী আর বাঘাকে দিয়েছিল, ‘জবর-জবর-তিন বর’৷ একটু অন্যরকমের বর৷ রাজার জামাই হতে চাই না৷ আগে জখবদস্ত লেখাপড়া৷ সবকটা ডিগ্রি আমাদের চাই—ফার্স্ট ক্লাস৷ শঙ্কর বলছে, ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ার হবে৷ প্রথমে জলের ওপরে, তারপরে জলের তলায়৷ কী জানি কেন, ওর সাবমেরিনটাই বেশি পছন্দ৷ ডুবে ডুবে চলে যাবে এক দেশ থেকে আর এক দেশে৷ হঠাৎ ভুস্ করে ভেসে উঠবে৷ কায়রো, আলেকজেন্ড্রিয়া৷ যে-সব রাজ্য জলের তলায় তলিয়ে আছে সেই সব দেখবে৷ সমুদ্রের তলায় কত ধনরাশি—সেই সব দেখবে৷ আমাকে না জানিয়ে ও সমুদ্র নিয়ে প্রচুর লেখাপড়া করেছে, আরো করবে৷ গুরু পেয়ে গেছে, আমাদের ‘ছাত্রবন্ধু পাঠাগারের’ গ্রন্থাগারিক ভবেশদাকে৷ যেখন লেখাপড়া, সেইরকম দুঃসাহসী৷ ইয়েতির খোঁজে তিব্বত যাবেন৷ সেদিনে বিকেলে শঙ্করদের বাড়িতে এসেছিলেন৷ শঙ্কররা বেশ ‘রিচ ম্যান’; তবে ‘রিচ’ হলেও ‘নীচ’ নয়৷ সবাই বেশ খোলামেলা, হাসি, গল্প, গান৷ বাইরে কোনো শো নেই৷ ধবধবে চুললা ধবধবে দাদু৷ দাদুর বাবা ছিলেন ইংরেজ আমলের ‘রায়বাহাদুর’—খেতাব পেয়েছিলেন—‘নান্যসর্দার’৷ তাঁর নামেই রাস্তার নাম৷ তিনখানা তিনতলা বাড়ি৷ গোপাল মন্দির৷ রথ আছে৷ আবার দুর্গাপুজো হয়৷ সন্ধিপুজোর শুরু হয় তোপ দেখে৷ ধাঁই করে শব্দ৷ সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের বোল, যুদ্ধের বাজনা গিজতা গিজাং, গিজতা গিজাং৷ তোপ দাগার যন্ত্রটা দেখেছি, তিনতলার ছাতে৷ গান-মেটাল দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটা কামান৷ চাকা ফিট করা৷ বারুদ গেদে আগুন দিলেই বিকট শব্দ৷ কামানটা গড়গড়িয়ে পেছন দিকে চলে যাবে হাত দশেক৷ এই বাড়িতেও ভবেশদা ছোট একটা লাইব্রেরি তৈরি করে দিয়েছেন৷ তাঁর পরামর্শে প্রত্যেক মাসে নতুন বই কেনা হয়৷ মোটা একটা রেজিস্টারে ক্যাটালগ—প্রত্যেকটা বইয়ের মলাটে নম্বর লাগানো গোল টিকিট৷ ভবেশটা আজে-বাজে কথা পছন্দ করেন না৷ কেবল বলতে থাকেন, কাজের কথা বল, কাজের কথা৷ প্রত্যেকের সময় ফুরিয়ে আসছে৷ আমরা সবাই এক-একটা প্রদীপ৷ এ-প্রদীপ শুধু জ্বলতে জানে, তেল ঢালতে পারে না৷ জ্বলতে, জ্বলতে একদিন দপ করে নিবে যাবে, তাই যতটা পারো, পড়ে যাও, জেনে যাও, শিখে যাও—এমন মানব-জনম আর পাবে না৷ মন যা চায় ত্বরায় কর এই ভবে৷ গঙ্গার ধারে ছোট্ট একটা দোতলা বাড়িতে একেবারে একা থাকেন৷ সেই বাড়ির ছাতে একতারা বাজিয়ে লালনের এই সব গান তিনি করেন৷ বাড়িটায় দুপাশে দুটো গাছ, পাকুড় আর নিম৷ গাছ দুটোর গা বেয়ে ছমছমে একটা অন্ধকার নীচের দিকে গড়িয়েছে৷ সেই জায়গাটায় ভবেশদা নানা রঙের নুড়ি বিছিয়ে রেখেছেন৷ শিল্পীমনের মানুষ৷ গঙ্গা থেকে মাঝে মাঝে সাপ উঠে আসে৷ একবার একটা ময়াল সাপ এসে তিন দিন ধরে এই জায়গাটায় বিশ্রাম নিয়েছিল৷ কতরকমের পাখি গাছের ডালে, ডালে৷ তাদের আলাপ-আলোচনার শেষ নেই৷ একটু বেশি রাতে একজোড়া প্যাঁচা এসে পাকুড়ের ডালে বসে, কর্কশ স্বরে রাতের অন্ধকারকে ধমক দেয়৷ ধারালো ছুরি দিয়ে অন্ধকার ফালা ফালা করে৷ নিমগাছের তলায় মা শীতলার একটি মূর্তি কারা রেখে গেছে; পুজোর পর মা শীতলাকে বিসর্জন দিতে নেই, গাছের তলায়, ঘাটের একপাশে ফেলে রাখতে হয়৷ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় চরাচর যখন ভেসে যায় আলোর বানে, তখন মা শীতলাকে মনে হয় জীবন্ত৷ শঙ্কর আমাকে বলেছিল, দিনের বেলা যে সব বস্তু জড়, প্রাণহীন, রাত বারোটার পর সেই সব বস্তু জীবন্ত, যেমন—টেবিল, চেয়ার, মন্দিরের মূর্তি, ঘরে যেসব পুতুল ও ছবি থাকে৷

শঙ্কর সমুদ্রপথে যাবে, আমি উড়ব আকাশে৷ বিমানচালক হব৷ পাইলট৷ ককপিটে বসে থাকব, পাইলটের পোশাকে৷ প্লেন ঢুকে যাবে মেঘের মধ্যে৷ নীচের পৃথিবীকে দেখা যাবে না৷ মেঘের ঘর, মেঘের প্রাসাদ, মেঘের সমুদ্র, ঢেউ৷ সূর্যটা নেমে আসবে নীচে৷ কোনোদিন রকেটে চড়ে পৌঁছে যাব চাঁদে৷

ভাবেশদা বললেন, ‘জানিস তো, পৃথিবীকে ‘‘আর্থ’’ না বলে ‘‘ওশান’’ বলাই উচিত ছিল৷ এর ৭০.৮ ভাগই হল জল৷ স্থল আর কতটুকু? তিরিশ ভাগেরও কম৷ সৌরজগতে এমন জলময় গ্রহ আর দ্বিতীয় নেই৷ জলের মতো এমন দ্রাবক জগতে আর দুটি নেই৷ জলে প্রায় সব কিছুই গুলে যায়, ডিজলভ মোর সাবস্ট্যান্সেস দ্যান এনি আদার লিকুইড নোন৷ বুঝলি কিছু!’

ইয়েস স্যর৷ শঙ্কর আসছে, ‘ইংরিজি থোড়া থোড়া বুঝতা হ্যায়৷’

‘তোর হিন্দিটা সাংঘাতিক৷ চেষ্টা না করাই ভালো৷’

‘ভবেশদা, আমি তেইশটা ভাষা শিখব—ল্যাটিন, গ্রিক, হিস্পানি, অ্যারেবিক, টিবেটান৷ আমি সারমেরিনের ক্রু হব জলের তলা দিয়ে, তলা দিয়ে বিরাট একটা তিমি মাছের মতো পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে৷ দুঃসাহসী শঙ্কর৷ আমার গায়ের রং হয়ে যাবে রুপোলি, চুলগুলো শরতের মেঘের মতো সাদা, চোখ দুটো নীলচে সবুজ—আই উইল বি আ গ্রেট নেভিগেটর৷’

‘বুঝবি, যখন ক্র্যাকেনের পাল্লায় পড়বি৷’

‘ক্র্যাকেন?’

ইয়েস সি! নরওয়ের সমুদ্রে তলে তলে চক্কর দিয়ে ফিরছে৷ ক্র্যাকেন, সে এক ভয়ংকর প্রাণী৷ দেড় মাইল জায়গা জুড়ে বিরাট একটা চাকার মতো প্রাণী৷ সেই চাকাটা থেকে বেরিয়ে এসেছে লম্বা লম্বা শুঁড়৷ ইলি-বিলি-কিলি-কিলি৷ এইগুলোই হল প্রাণীটার বাহু; মানে অক্টোপাসের বিশাল সংস্করণ৷ লোহার মতো শক্ত, করাতের মতো দাঁত কাটা৷ গোটা একটা জাহাজকে পাশ থেকে জাপটে ধরে মড় মড় করে ভেঙে দিতে পারে৷ একেবারে তালগোল৷ ১৭৫২ সালের একটি ঘটনা, এক বিশপ লিখে রেখে গেছেন৷ সমুদ্রের দেড় মাইল এলাকার জল হঠাৎ কালো হয়ে গেল—একেবারে কালির মতো ঝুল কালো৷ বিশাল একটা চাকার মতো প্রাণী, লম্বা, লম্বা, ইস্পাতের মতো অজস্র শুঁড়, জাহাজটার দিকে এগিয়ে আসছে৷ ওটা কী? ওটা কী? করতে করতেই জাহাজটাকে, যাত্রীসমেত সমুদ্রের গভীরে টেনে নিয়ে গেল৷ বিশপ ও আরো কয়েকজন যাত্রী সেই থকথকে কালো জলে, প্রভুর কৃপায় কোনোরকমে বেঁচে গেলেন৷ কালো একটা তরল ওই প্রাণীটার শরীর থেকে বেরোচ্ছিল৷ শ্রদ্ধেয় বিশপ জলজন্তুটার নাম রাখলেন, ‘‘ক্র্যাকেন’’৷’

ভবেশদা বললেন, ‘আজ থেকে তিন-চারশো বছর আগে মানুষ সমুদ্রের কতটাই বা জানত? স্থলচর প্রাণী মানুষ শত, শত বছর ধরে ধারণা পোষণ করত—পাথর আর মাটির উপাদানে তৈরি এই পৃথিবীর প্রায় সবটাই ডাঙা৷ জায়গায়, জায়গায় সামান্য পরিমাণ জল আছে৷ যেমন ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর (Black Sea)৷ অতলান্তিক সাগরের কথাও জানত, তবে ধারণাটা ছিল অদ্ভুত৷ একটা নদী, পৃথিবীটাকে গোল করে বেড় দিয়ে রেখেছে৷ জলের বর্ডার পাড়৷

সেকালের জ্ঞান সেকালের মতো৷ পৃথিবীর চারপাশে সূর্য ঘুরছে৷ পৃথিবী একটা গোল চাকতি৷ তিনের চারভাগ জল জেনেছে অনেক পরে৷ জলই জীবন, জীবনই জল৷ জল থেকেই জীবন উঠে এসেছে স্থলে, ভাগ হয়েছে এইভাবে—জলচর, স্থলচর, উভচর, নভোচর৷ আর বড়, ছোট সমস্ত প্রাণী এক একটি কেমিকেল ফ্যাকট্রি৷ জীবন কাণ্ডে যে কত কাণ্ডই হয়৷ আমাদের শরীরের সত্তর ভাগই জল৷ জলময় এই পৃথিবী৷ বুঝলে ভায়া, প্রশান্ত মহাসাগর কতটা গভীর জানো কি? পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে একটা খাদ আছে, যাকে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’ (Mariana Trench)৷ যার মধ্যে এভারেস্টকে ফেলে দিলে তলিয়ে যাবে৷ এভারেস্টের উচ্চতা উনত্রিশ হাজার আঠাশ ফুট, আর এই খন্দটার গভীরতা ছত্রিশ হাজার দুশো চার ফুট৷ তোর সাবমেরিনের ক্ষমতাই হবে না ওই ট্রেঞ্চটার মধ্যে ঢোকার৷

সূর্যের আলো সমুদ্রের জলে প্রবেশ করে৷ ঢেউয়ের ফেনায় দুধ ঢেলে দেয়৷ জলস্তরকে দু-ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে হাজার ফুট গভীরেও আলো আছে, তারপরেই গভীর ঘন অন্ধকার৷ আলো কমতে কমতে শেষে চির-আঁধার, শুধু জল আর জল, তরল অন্ধকার৷ কালো জলে পড়ে আছে আঁধার জীবন৷ মানুষ কতটুকু জানে, জানতে পারবেই বা কতটুকু! চোখের দেখা না হলে, শুধু জেনে কি মন ভরবে? ডুবুরি-যান ‘ট্রিয়েস্ট’ (Trieste) হাজার ফুট পর্যন্ত নেমেছিল৷ মাত্র হাজার ফুট৷ পোর্টহোল দিয়ে যতটুকু দেখা যায় দেখেছিল অজানা সেই মায়া জগতের রূপ৷ কুবেরের ঐশ্বর্য ভাণ্ডার৷ বরুণদেবের রাজ্যপাট৷ এই দুঃসাহসী অভিযানে সাত মাইল গভীরে পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়েছিল৷ ৫০০ ফুটের পরে স্তিমিত আলোর দেশ৷ সেখানে আছে—‘সামুদ্রিক ঘাস’৷ সবুজ, এককোশী অদ্ভুত ধরনের সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম তৃণ৷ জলজ৷ এই ঘাস তৈরি করেছে চিনি আর শ্বেতসার৷ জীবনের প্রধান দুটি উপাদান—বিজ্ঞানীরা বলছেন—

গ্রেট ফুড পিরামিড অফ দ্য ওশান৷ সমুদ্রের ওপরে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে, দুলতে জাহাজে ভ্রমণ করলে কিছুই তেমন জানা যাবে না বন্ধু, গভীরেই আছে সৃষ্টির যত রহস্য৷ তলদেশ সদাচঞ্চল৷ ভূমিস্তর অনবরতই পিছলে পিছলে যাচ্ছে৷ পরস্পর সংঘর্ষ হচ্ছে৷ আগ্নেয়গিরি আছে৷ সাগরেও অগ্নি আছে৷ কত শত ক্ষুদ্র-বৃহৎ প্রাণী৷ বিশাল, বিশাল জলচর৷ ক্ষুদ্র, রঙিন মাছ৷ ঝিনুক, মুক্তো৷ সি-হর্স, সি-লায়ন, মারমেড, শংকর মাছ, নীল তিমি, হাঙর৷ কতরকমের ক্ষুদ্র কীট, তারার মতো, করাতের মতো৷ জলে আছে প্রাণের খেলা৷ যারা জল থেকে ডাঙায় উঠেছিল, তারাই ক্রমে মানুষ হল৷’

গ্রন্থাগারিক ভবেশদা৷ তাঁর লেখাপড়ার শেষ নেই৷ জ্ঞানের সমুদ্র৷ শঙ্কর বললে, ‘আমার ভেতরে আমি সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ শুনতে পাই৷ স্বপ্ন দেখি, বেলাভূমিতে বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ে ফিরে গেল সমুদ্রে, ছড়িয়ে রেখে গেল মুঠো মুঠো মুক্তো৷ একঝাঁক শঙ্খচিল উড়ে যাচ্ছে সবুজ জল ছুঁয়ে নীল আকাশে৷ ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলানের কাছে তাঁর অভিযানের গল্প শুনি৷ ক্যাপটেন কুক এসে বলেন, চল, আর একবার মেরু অভিযানে যাই৷’

ভবেশদাকে খুব সুন্দর দেখতে৷ আমার মা বলেন, ‘টুলটুলে মুখ, ঢুলঢুলে চোখ৷’ ঘুম আসার আগে মানুষের চোখ দুটো যে-রকম হয়ে যায়৷

ফর্সা রং৷ কোঁকড়া চুল৷ আমার মনে হয় যেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু৷ ভবেশদা বললেন, ‘সেই একটা সময়৷ চোদ্দোশো, পনেরোশো, ষোলোশো যে যেখানে জন্মেছে, সেই জায়গাটাই সে জানে, তার দেশের বাইরে, ওই দিগন্তছোঁয়া জলরাশির পারে, কিছু কি আছে? ওই দিকেই কি স্বর্গ? দেবতাদের বাস, অজানা মেঘলোক! দুঃসাহসী মানুষ, স্বপ্ন দেখা মানুষ আকাশকে জয় করার আগে, সমুদ্র জয় করে ফেলল৷ জাহাজ এল৷ কতরকমের জাহাজ৷ প্রথমে বাতাস চালিত৷ বড় পাল, মাঝারি পাল, ছোট ছোট পালের বাতাস ধরা আর ছাড়ার কেরামতি৷ আকাশের নক্ষত্র দিক বলে দেবে৷ একটা চোঙা দূরবীন৷ বিজ্ঞান তখন যতটা এগিয়েছে, ততটাই৷

ম্যাগেলানের অভিযানের কথা ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে৷ প্রথম এক ইয়োরোপীয়৷ স্বপ্ন দেখেছিলেন, প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেবেন, দেখবেন ওপারে কী আছে, কারা আছে৷ নিজে পর্তুগিজ কিন্তু পর্তুগালের রাজা তাঁকে কোনোরকম সাহায্য করলেন না৷ সাহায্য করলেন স্পেনের রাজা প্রথম চার্লস৷ পাঁচটি জাহাজের এক বহর নিয়ে অভিযান শুরু করলেন স্পেনের বারামেজ বন্দর থেকে, ১৫২০ সালের অক্টোবর মাসে৷ প্রথমে তিনি আবিষ্কার করলেন একটি প্রণালী; Strait, সমুদ্রের আর-একটি সমুদ্রের যোগাযোগের জলপথ৷ এই প্রণালীটি আজ তাঁরই নামে বিখ্যাত৷ প্রশান্ত মহাসাগরের নাম প্রশান্ত, তিনিই রেখেছিলেন৷ সাগরের সঙ্গে সাগর যুক্ত হয়ে আছে অজস্র প্রণালী সংযোগে৷ সাগর তৈরি করেছে উপসাগর৷ কোনো দেশ, মহাদেশ বিচ্ছিন্ন নয়৷ স্থলপথে, জলপথে, পর্বতের গিরিসংকট, মহাসাগর, সাগর, উপসাগর, নানাভাবে সাহসী মানুষের দুঃসাহসী অভিযানের জ্ঞানে পৃথিবী মধ্যযুগের সংকীর্ণ ধারণা থেকে বর্তমানে মুক্তি পেয়েছে৷ জলের ওপরে সৃষ্টিকর্তা ভাসিয়ে দিয়েছেন স্থলের ‘নেকলেস’, ‘মুক্তোমালা’৷

তোমাদের বলি, কলম্বাস, ম্যাগেলান, কুক—এঁরা আমার হিরো৷ জলের সমুদ্র নয়, জ্ঞানের সমুদ্রে এঁরা বেপরোয়া সাহসের জাহাজ ভাসিয়েছিলেন৷ ম্যাগেলানকে খুন করা হল, ১৫২০ সালের অক্টোবর মাসের কোনো এক তারিখে ম্যাকটান দ্বীপে৷ সম্ভবত সেই দ্বীপের মানুষরা এই আগন্তুকদের নিরাপদ ভাবেননি৷ ভেবেছিলেন লুণ্ঠনকারী৷ পাঁচটি জাহাজের মধ্যে চারটিই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ফিরতে পেয়েছিল মাত্র একটি জাহাজ, সেটির নাম ছিল, ‘ভিকটোরিয়া’৷ এই পরিক্রমাই ছিল প্রথম ‘বিশ্ব পরিক্রমা’—অবশ্যই জলপথে—ফার্স্ট ‘Voyage’ অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড৷ নায়ক কিন্তু ফিরলেন না৷ বিশ্ব পরিক্রমার স্বপ্ণ নিয়ে যে-বন্দর পরিত্যাগ করেছিলেন মহা সমারোহে, সেই বন্দরে প্রত্যাবর্তন করল একটি মাত্র বিধ্বস্ত জাহাজ৷

ক্যাপটেন কুকের কথাও ভাবি৷ সমুদ্র তাঁকেও ঘরছাড়া করেছিল৷ তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন ম্যাগেলানের অনেক পরে ১৭২৮ সালে৷ যখন তাঁর বয়েস মাত্র বারো, তখন থেকেই সমুদ্র৷ সমুদ্র ভীষণ মায়াবী৷ সাগরের টান৷ নীলের বুকে সবুজ ঢেউ, ফেনার হাসি, শিশুদের কলকণ্ঠ, খল্খল্, কলকল, নোনা-নোনা, ভিজে ভিজে গন্ধ৷ ম্যাগেলান ছিলেন পর্তুগিজ৷ কুক খাঁটি ইংরেজ৷ বারো বছর বয়সেই এক জাহাজ কোম্পানির খালাসি৷ যে বড় হবে, বিখ্যাত হবে, তাকে কে আটকাবে? ভাগ্য তো তার হাতের মুঠোয়৷ বত্রিশ বছর বয়সে ১৭৫৯ সালে তিনি ‘মেট’ থেকে ‘মাস্টার’ হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে নৌবাহিনীর জাহাজ ‘মার্কারি’-র পোতাধ্যক্ষ নিযুক্ত হলেন৷ নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্র্যাডর শহরটি সম্পর্কে দুটি ‘পেপার’ প্রকাশ করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন৷ ১৭৬৯ সালে ‘রয়্যাল সোসাইটি’ তাঁকে একটি অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে তাহিতিতে পাঠান৷ ফেরার পথে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার তটভাগ পরিদর্শন করে, সংগ্রহ করলেন প্রচুর অজানা তথ্য৷ ১৭৭১ সালে উন্নীত হলেন কম্যান্ডারের পদে৷ এইবার তিনি অবতীর্ণ হবেন তাঁর বিখ্যাত কুমেরু অভিযানে৷ পদোন্নতি হয়েছে, কম্যান্ডার থেকে ‘ক্যাপটেন’৷ জাহাজটির নাম ‘Resolution’৷ ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৭৮ এই দু-বছর তাঁর নাবিক জীবনে তিনি অসাধ্য সাধন করবেন৷ নিউজিল্যান্ড থেকে কেপ হর্ন, পুনরাবিষ্কার করবেন ‘স্যান্ডউইচ আইল্যান্ড’—যার নাম পরবর্তীকালে হবে ‘হাওআই’৷ আমেরিকার উত্তর তটভাগ ছুঁয়ে বেরিং স্ট্রেট৷ এই স্যান্ডউইচ দ্বীপটি বিতর্কিত ‘ফকল্যান্ডের’ অন্তর্ভুক্ত৷ সাগরে এইরকম অনেক ছেঁড়াখোঁড়া ভূমির টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠীর অধিকারে৷ সশস্ত্র একটি দল কুক ও তাঁর সঙ্গীদের আক্রমণ করল৷ রক্তাক্ত যুদ্ধে ক্যাপটেন জেমস কুকের মৃত্যু হল—১৭৭৯ সালে৷ ঝোড়ো সমুদ্রে উত্তাল জলরাশির সঙ্গে জীবন-মরণ সংগ্রাম, ভাঙা মাস্তুল, ছেঁড়া পাল, মিশকালো অন্ধকার রাত, ঢেউয়ের মাথায় ফসফরাসের বাতি হাতে জলকন্যাদের নৃত্য, মুখোশধারী ঘাতকদের নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত তির, নরখাদক ক্যানিবল, বেপরোয়া জলদস্যু, টাইফুন—জলই জীবন, জলই মৃত্যু৷

এইবার আমার সমুদ্র-অভিজ্ঞতার কথা শোনো, তখন আমি বড় একটি কাগজে সাংবাদিক; আদেশ হল, কিছুদিনের জন্যে তোমাকে জলে যেতে হবে৷ আন্দামানের চিফ কমিশনার ভারতবর্ষের প্রথম সারির কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিনিধিদের তিনি আহ্বান করেছেন—তাঁর নিজস্ব জাহাজে চড়ে আন্দামান সাগরে দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে ঘুরতে হবে, তারপর সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে হবে বেশ বড় আকারে৷ যাত্রা শুরু হবে পোর্টব্লেয়ার থেকে, শেষ হবে নিকোবরে৷ জাহাজই হবে আমাদের ভাসমান, চলমান ঘরবাড়ি৷ আনন্দে লাফিয়ে ওঠার মতো একটা ব্যাপার৷ পুরীর তটে বসে সাগরের লাফালাফি দেখেছি৷ জলকণায় চশমার কাচ থেকে থেকে ঝাপসা হয়েছে, জামা ভিজে ভিজে, চুল সাগরের নোনা বাতাসে চিটচিটে৷ এ একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা হবে৷ ঢেউয়ের মাথায় দোল খাব৷ আন্দামানের চারপাশে বঙ্গোপসাগরের জল কালো৷ আন্দামানেই আছে সেই কুখ্যাত সেলুলার জেল৷ সেখানে বন্দি করে রাখা হত বিপ্লবীদের, বলা হত কালাপানির পারে চির নির্বাসন, অকথ্য অত্যাচার৷

আন্দামান সম্পর্কে বলা হত, ‘মাইটি ওশান, মাইটি গর্জন (গর্জন গাছ), মাইটি সি.সি (চিফ কমিশনার)৷ ‘কমিশনারের জাহাজটি খুব একটা পেল্লায় নয়, ছিমছাম সুন্দর৷ অনেক বড় করে বলব না, তোদের ধৈর্য থাকবে না৷ আমি বলব, একটি ঝড়ের রাতের কথা৷ শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্তে’ পড়েছিস ‘কাপ্তেন কইসে, সাইক্লোন হতি পারে৷’ সেই একই সমুদ্র বঙ্গোপসাগর সেই একই সাইক্লোন৷ আমাদের জাহাজের কাপ্তেন যেন এক দেবদূত৷ ছ-ফুট লম্বা, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, টানা টানা চোখ৷ চোখে যেন সাগর লেগে আছে৷ কম কথা, মিষ্টি হাসি৷ সাগর মনে হয় মানুষকে এইরকমই শান্ত, গম্ভীর করে দেয়৷

কাপ্তেনের সঙ্গে ভাবটা আমার একটু বেশিই হল কারণ আমি হয়ে গেলুম তাঁর ছাত্র; আমাকে সমুদ্র শেখান, জল কেন কালো৷ মাঝে, মাঝে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক, লাফ মেরে জাহাজের ডেকে এসে পড়ছে ঠকাস ঠকাস শব্দে—এরা কেন এত চঞ্চল! এক এক রকমের প্রাণী এক এক এলাকায়! বোকার মতো এক একটা প্রশ্ন৷ তিনি কিন্তু স্মিত হেসে সব কিছু বোঝাবার চেষ্টা করতেন৷ একদিন বললেন, আজ বেলা তিনটের মধ্যে রাতের খাবার খেতে হবে৷ রাত আটটার সময় আমাদের জাহাজ টেন ডিগ্রি চ্যানেল ক্রস করবে—ওয়ার্স্ট চ্যানেল ইন সি৷ উত্তাল, বিক্ষুব্ধ সমুদ্র৷ জাহাজ দু-রকম দোলায় দুলবে৷ একই সঙ্গে ‘রোলিং’ আর ‘পিচিং’৷ এপাশে-ওপাশে দুলবে৷ দুলবে সামনে, পেছনে৷ বাসনপত্র, গেলাস-প্লেট, টুকরো-টাকরা সমস্ত জিনিস ক্যাবিনেটে ঢুকিয়ে, কাপড় গুঁজে প্যাক করে রাখতে হবে, নইলে ভেঙে চুরমার৷ এই অবস্থায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না৷ বাংকে শুয়ে থাকতে হবে৷ তাও সাবধানে৷ জাহাজের নৃত্যে ছিটকে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা৷ আমাকে একটা সমুদ্রের ম্যাপ খুলে দেখালেন, ‘এই দ্যাখো ডানকান প্যাসেজ৷ এই জলপথ দিয়ে পূর্বদিকে গেলে থাইল্যান্ড, আর পশ্চিমে গেলে মাদ্রাজ, আর সোজা দক্ষিণে সেই টেন ডিগ্রি চ্যানেল; এই দ্যাখো আরো দক্ষিণে নিকোবর৷

ভরদুপুরে ডিনার শেষ করে, বসার কেবিনে সবাই বসে আছি গম্ভীর মুখে—কী জানি কী হয়! যেদিকে তাকাই শুধু জল আর জল, আর বিরাট আকাশ৷ দুটোই সীমাহীন৷ জাহাজের তো থামার উপায় নেই৷ জল কেটে চলেছে তো চলেছে৷ কোনো দিকে তীর নেই, ঘাট নেই৷ কী মুশকিল! চট করে নেমে শক্ত ডাঙায় এক চক্কর ঘুরে আসব, সে উপায় নেই৷ বসে বসে দোল খাচ্ছি৷

কাপ্তেন সাহেব এসে ভারি একটা সুখবর দিলেন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আসছে বিশাল ঝড়৷ তুফান আসছে, তুফান৷ ঝড়ের গতিবেগ দুশোর কাছাকাছি৷ আসছে পশ্চিমদিক থেকে৷ ভয়ের কিছু নেই৷ লাইফ জ্যাকেট আছে৷ জাহাজ ডুবে গেলেও আপনারা ভেসে থাকবেন৷ পশ্চিমদিক থেকে বড় একটা জাহাজ আসছে, যাচ্ছে থাইল্যান্ড৷...

কাপ্তেনের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে৷ আমাদের কাছাকাছি থাকবে৷ ওদের জাহাজে এখন নাচ-গান হচ্ছে৷ আমাদের জাহাজটাই নাচছে, আর আমাদের নাচাচ্ছে৷

রাত আটটার কাছাকাছি সময়ে এল সেই তুফান! জাহাজটা যেন মোচার খোলা৷ মাঝে মাঝে পোর্টহোলগুলো চলে যাচ্ছে জলের তলায়৷ ডেকের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে৷ বাতাসের কী ভয়ংকর গতি! চেন দিয়ে বাঁধা ডেক চেয়ারগুলো সমুদ্রে উড়ে যাওয়ার জন্যে ছটফট করছে৷

সঙ্গীদের কয়েকজন এতটাই ভয় পেয়েছেন যে কথা বলতে পারছেন না৷ মিশকালো আকাশ৷ আকাশের অনেকটা জুড়ে ফালাফালা বিদ্যুতের রেখা৷ এতখানি আকাশ তো ডাঙায় দেখা যায় না৷ এখানে মাথার ওপর শুধুই আকাশ, আর নীচে শুধুই জল৷ মনে হচ্ছিল, মানুষের জন্যে ভগবানের কোনো ভাবনা নেই৷ পারলে আমাদের জাহাজটা উড়িয়ে নিয়ে যাবেন, কোথায় কোন অকূলে ঠিক-ঠিকানা নেই৷ ভগবানের কেন এত রাগ? হঠাৎ তীব্র একটা কান্নার শব্দ সমুদ্রের ওপর দিয়ে ছুটে চলে গেল, দূর থেকে দূরে যেন কোনো নারী! অভিজ্ঞ একজন বললেন, ‘বাতাস৷ হাউলিং উইন্ড!’

আর একজন বললেন, ‘প্রেতের হাহাকার৷ এখন প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই৷ কী জীবন!

অসহায় আমরা এই মানুষ!’

একজন বললেন, ‘কার কাছে প্রার্থনা?’

সেই মুহূর্তে জাহাজ এতটাই ঝটকা খেল যে আমাদের সব কথা বন্ধ হয়ে গেল৷ মুখে মুখে মৃত্যুর ছায়া৷ বাঁচার কোনো আশা আছে বলে মনে হল না৷

হঠাৎ মনে হল, আমরা ভীষণ স্বার্থপর৷ নিজেদের কথাই ভাবছি, এতক্ষণ একবারও ভাবিনি, আমাদের কাপ্তেন কী করছেন, তাঁর কন্ট্রোল কেবিনে৷ কারোকে কিছু না বলে বেরিয়ে এলুম লোয়ার ডেকে৷ বাতাসের দাপটে মাথাটা শরীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে মনে হল৷ বৃষ্টির ছাঁটে নিমেষে ভিজে গেলুম৷ লোয়ার ডেক থেকে আপার ডেকে ওঠার ঘোরানো লোহার সিঁড়ি৷ হামাগুড়ি দিয়ে উঠছি৷ যে-কোনো

মুহূর্তে খড়কুটোর মতো উড়ে উজান সমুদ্রে গিয়ে পড়তে পারি৷

কাচের ঘর৷ তিনি সামনের উইন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ সামনের টেবিলে বিরাট একটা ম্যাপ৷ সেক্লট্যান্ট, কম্পাস, লেন্স, দূরবিন, সেইটুকু জায়গাই আলোকিত৷ দু-হাতে ন্যাভিগেটিং হুইলের হাতল দুটো ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, ধ্যানমূর্তি৷ চতুর্দিকে অন্ধকার, রাগি সমুদ্র৷ আমাকে দেখে চমকে উঠেছেন, ‘এ কী? এতটা রিস্ক নিয়ে এসেছেন?’

‘আপনার জন্যে খুব উদ্বেগ হল৷ পাগলা সমুদ্রের সঙ্গে একা লড়াই করছেন৷ থাকতে পারলুম না৷’

ঘরের সবটাই অন্ধকার৷ অন্ধকার না হলে বাইরেটা দেখা যাবে না, শুধু সি-চার্টটার ওপর একটু আলো৷ মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন, সামনে ঘন অন্ধকার৷ যারা সমুদ্রকে তীরে বসে দেখেছে, তারা জলরাশির এই ভয়ংকর অপরিচিত আকৃতি দেখে আঁতকে উঠবে৷ শীতল রাত, সারা শরীর বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে, এমনিই শীত করছে, সমুদ্রের এই রূপ দেখে ভেতরটা গুড়গুড় করে কেঁপে উঠল৷ কে বলেছে, মানুষ ক্ষুদ্র, প্রকৃতির কাছে অসহায়৷ এই তো আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন মানুষ, বিশালের সঙ্গে লড়াই করছেন৷ দূর ঢেউয়ের মাথায় কে হঠাৎ যেন গলানো পেতল ঢেলে দিল; কী ওটা? কী হচ্ছে সমুদ্রে? সারি, সারি ঢেউয়ের মাথায় সোনার তবক! কাপ্তেন বললেন, দুটো ব্যাপার হতে পারে, হয় মাছচোরদের ট্রলার, নাহয় দূরপাল্লার কোনো লাইনারের সার্চলাইট৷ আড়াআড়ি পুব থেকে পশ্চিমে চলেছে৷ সে এক অলৌকিক দৃশ্য! অন্ধকারের বুক চিরে একটা আলোর রেখা৷ সমুদ্রের ঢেউ বিরাট বিরাট ময়াল সাপের মতো একটার সঙ্গে আর একটা জড়াজড়ি করছে, পাকিয়ে পাকিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে৷ ঝড়ের গোঁ-গোঁ শব্দ৷ চাপ চাপ অন্ধকার৷ একসঙ্গে অনেক রাক্ষসীর চিৎকার৷ কাপ্তেন জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়েছেন৷ চালাবার চেষ্টা করলেই ডুবে যাবে৷ নৌকোর মতো স্রোতের টানে ভেসে চলেছে থাইল্যান্ডের দিকে৷

ভয়ংকর সেই রাত৷ কে যেন কানে, কানে বলেছে—জীবনটাকে কোলে করে সাবধানে রাখো৷ অন্ধকারে তাকিয়ে দ্যাখো—মৃত্যু কেমন নাচছে৷ স্থলের জীবন জলে বড় অসহায়৷ ওই দ্যাখো আকাশ—মেঘ লেপে দিয়েছি৷ বিদ্যুতের করাত দিয়ে আকাশ চিরে ফেলছি৷ জীবন যেন টেবল্ টেনিসের বল, সাবধান! লাফাতে লাফাতে রেলিং টপকে ‘ডেক’-এর বাইরে জলে গিয়ে পড়ো না, আর তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না৷

হঠাৎ দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে বিরাট স্তম্ভের মতো অন্ধকার একটা বস্তু সোজা আকাশের দিকে উঠে গেল৷ মাথাটা যেন ‘সহস্রশীর্ষ’ নাগের মতো, হেলছে, দুলছে, মাঝে মাঝে চিকমিক করে উঠছে৷ এ কোন জলজন্তু!

কাপ্তেন বললেন, ‘এই প্রথম দেখছেন, ভীষণ ভয় পেয়েছেন, তাই তো? ওটা জলস্তম্ভ, যেখানে আছে, সেইখানেই থাকবে, তেড়ে আসবে না৷ হঠাৎ একসময় ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে৷ কয়েক টন জল৷ মাছও আছে অনেক৷ সব উঠে গেছে আকাশের দিকে৷ কী মজা, তাই না!’

ভবেশদা বললেন, ‘বুঝলে, আমার সাগরের অভিজ্ঞতা অনেক, এই একটু তোমাদের বললুম—এ তো সব ওপরের কথা৷ ভেতরের রহস্য কীভাবে জানা যাবে? বিজ্ঞান এগিয়ে এসেছে৷ ‘‘স্টেট অফ আর্ট’’ সাবমেরিন তৈরি হয়েছে৷ যুগ, যুগ ধরে সাগর কত কী গিলে বসে আছে৷ কত শহর, রাজ্য, সভ্যতা৷ আটলান্টিস, দ্বারকা! আমারও ইচ্ছে করে সাগরে যেতে৷ আকাশটাকে উলটে নিলেই তো সাগর! সেই কতকাল আগে পড়েছিলুম ‘‘মেসফিল্ড’’-এর কবিতা, আজও আমার মনে আছে,

I must down to the seas again,

to the lonely sea and the sky.

And all I ask is a tall ship

And a star to steer her by.

নির্জন সমুদ্রের মাথায় নির্জন আকাশ, চলো যাই, বারে বারে যাই, শুধু চাই একটি উঁচু জাহাজ আর আকাশে ধ্রুবতারা, আর সেই তারাটাই পথ বলে দেবে৷

নাবিক, তুমি পথ হারাবে না৷’

ভবেশদা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ মস্ত বড় এক মানুষ৷ ছ-ফুটেরও বেশি লম্বা৷ হাসতে, হাসতে বললেন, ‘আজ তবে এতটুকু থাক, বাকি কথা হবে সাগরে৷’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%