সোনার হরিণ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেকক্ষণ ল্যাম্পপোস্টের মতো ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছি ট্যাক্সির আশায়৷ দেখা নেই৷ উল্টোদিকের ফুটপাথের দোকানে বিকেলের খদ্দেররা আসতে শুরু করেছেন৷ চাওমিন তৈরি হচ্ছে৷ পরপর দোকান৷ আষ্টেপৃষ্ঠে আয়না আঁটা একটা গয়নার দোকানও রয়েছে৷ এই মাত্র পতাকা উড়িয়ে একটা ধর্মীয় মিছিল চলে গেল৷ একদল বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ৷ একটা ম্যাটাডোরে কোনো ধর্মগুরুর বিরাট একটা ছবি৷ ট্যাক্সির দেখা নেই৷ কি হল আজ, কে জানে৷ শহর কলকাতায় এক একদিন, এক এক রকম৷

অবশেষে একটা সাদা ট্যাক্সি৷ নো রিফিউজ্যাল৷ খালি, যাত্রী নেই৷ দয়া করে থেমেছেন৷

‘কোথায় যাবেন?’

‘তালতলা৷’

‘উঠুন৷’

মধ্যবয়সি একজন মানুষ৷ বেশ ভালো চেহারা৷ কথা বলতে ভালোবাসেন৷ বেশিরভাগ চালকই গম্ভীর৷ তিরিক্ষি মেজাজ৷ কখন কি করে বসবেন কেউ জানে না৷ চালক জিগ্যেস করলেন, ‘তালতলা নামটা হল কেন?’

‘কোনোকালে হয়তো অনেক তাল গাছ ছিল৷ কলকাতায় তো একসময় অনেক বনবাদাড় ছিল, সুন্দরবনের অংশ৷ বাঘ-টাঘ বেরোত৷ এখনকার গড়ের মাঠে হাওয়া খেত৷’

‘বেলতলায় একটাও বেলগাছ নেই৷ আমি নারকোলডাঙ্গায় থাকি, মরা মরা তিনটে নারকোলগাছ আছে৷ তালতলায় চটি জুতো তৈরি হয়, তালতলার চটি৷’

আমাদের সামনে সেই ধর্মীয় মিছিলটা৷ গাড়ির চালক বললেন, ‘কলকাতায় দশটা লোক এক জায়গায় হলেই একটা মিছিল৷ সারাদিনে কত রকমের মিছিল৷’

বড্ড বক বক৷ এইবার বিরক্তি লাগছে৷ গাড়ি চালাতে চালাতে এত কথা ভালো নয়৷ পা দুটো জুতসই করে রাখতে গিয়ে, কি একটা ঠেকল৷ নিচু হয়ে দেখলাম৷ মনে হচ্ছে, একটা মানি ব্যাগ৷ কি করব? দু-দণ্ড ভেবে সামান্য নিচু হয়ে ব্যাগটা তুললাম৷ আশ্চর্য মানুষের মন৷ খুব সাবধান! চালক যেন দেখতে না পায়৷ বেশ মোটাসোটা৷ একটু খুলতেই অনেক টাকা৷ ইংরিজিতে যাকে বলে ‘ফ্যাট পার্স৷’ চালক বকবক করেই চলেছে, আমি শুনছি না৷ ভাবছি, আমার কি করা উচিত হবে! চালককে বলব? দিয়ে দোবো? মেরে দেবে হয়তো৷ থানায় জমা দেবো? অবশ্যই সেইটাই নিয়ম৷ কি দরকার? ফেলে দি পায়ের কাছে৷ যেমন পড়েছিল সেই রকম পড়ে থাক৷ তারপর? পরে যে উঠবে, সে পাবে৷ আচ্ছা, আমি চালককে কেন বলছি না? হিংসে হচ্ছে, অতগুলো টাকা মুফতে পেয়ে যাবে? যদিও খবরের কাগজে সৎ ট্যাক্সিচালকের সংবাদ পড়েছি৷ কিন্তু আমার মন চাইছে টাকার অঙ্কটা আমার জানা দরকার৷ ব্যাগটা পরীক্ষা করলে মালিকের নাম ঠিকানা পাওয়া যাবে৷ তবে এই গাড়িতে বসে দেখা যাবে না৷ চালকের মাথার ওপর আয়না৷ তাকালেই দেখে ফেলবেন৷ তা দেখে ফেললে ক্ষতিটা কি? ব্যাগটা তো আপাতত আমার৷ আমার ব্যাগ আমি অবশ্যই দেখতে পারি৷ কিন্তু নিজেকে কেমন যেন পকেটমার পকেটমার মনে হচ্ছে৷ পিক পকেট৷ ব্যাগের ভেতর কাগজপত্র, নামের কার্ড, ইত্যাদি থাকতে পারে৷ যদি থাকে, তাহলে মালিককে ফেরত দেওয়া যাবে৷ পেয়েছি যখন তখন রক্ষা করার দায়িত্ব আমার৷ আমি একজন সৎ নাগরিক৷ চোর, বাটপাড় নই৷ ছেলেবেলা থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছি, পথেঘাটে টাকা পয়সা, সোনা দানা, যাই পড়ে থাক, ফিরে তাকাবে না, তোলা তো দূরের কথা৷ কিন্তু তুলে যে ফেলেছি, আবার সামান্য ফাঁক করে দেখেও ফেলেছি৷ এক তাড়া নোট৷ টাটকা টাকা৷ টাকা কার না ভালো লাগে! দেখলেই ভেতরে একটা লাফালাফি শুরু হয়৷ অনেকদিন থেকে ভাবছি দামী একটা মোবাইল কিনব৷ বড় পর্দার টিভি৷ গোটা কতক ইনস্টলমেন্ট অবিলম্বে দিতে হবে৷ আমি ভগবানে বিশ্বাস করি৷ কালীবাড়িতে নিয়মিত গিয়ে মাকে প্রণাম করে মনের কথা বলি৷ কথা তো একটাই, অবস্থাটা একটু ফিরিয়ে দাও মা৷ ভীষণ টানাটানি৷ প্রাণ খুলে, মন খুলে এক রাউন্ড বাঁচি৷ এতদিনে মা শুনতে পেয়েছেন৷ আমার পায়ের কাছে একগোছা নোট ফেলে রেখেছেন—বাছা, সাবধানে বাড়ি নিয়ে যাও৷ শুনেছি, অনেকে অনেক কিছু কুড়িয়ে পায়৷ আমি সেই কবে কোন ছেলেবেলায় আস্ত একটা টাকা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম৷ সঙ্গে সঙ্গে সদ্ব্যবহার, গরম গরম চারটে জিলিপি৷ আমার বন্ধু সুমন, একটা পার্কার কলম কুড়িয়ে পেয়েছিল৷ আমার ভাগ্য এতকাল ওই এক টাকাতেই আটকে থেকে এতদিনে খুলল৷ কিন্তু৷ ভেতরে একটা কিন্তু কিন্তু৷ এ টাকা তো আমার পরিশ্রমের রোজগার নয়৷ পড়ে পাওয়া সাতগণ্ডা৷ আমি সৎ, আদর্শবান—এই একটা অহংকার আমার অলংকার৷ ঠিক আছে—টাকাটা আমি নেবো না কিন্তু রক্ষা করার দায়িত্বটা ভগবান আমাকে দিয়েছেন৷ বেহাত না হয়ে যায়৷ ভালো কথা তবে যার টাকা তার হাতটা কোথায়! জ্যাম! আটকে গেল গাড়ি৷ জ্যাম-জেলির শহর কলকাতা৷ সব সময় পথে তাণ্ডব৷ চালক বললেন, ‘কদিন পরে গাড়ি আর চলবে না৷ হু হু করে গাড়ি বাড়ছে৷ যে পারছে সে-ই একটা গাড়ি কিনে ফেলছে৷ রাস্তা তো চওড়া হচ্ছে না৷’

মানুষটি কেমন বোঝার জন্যে প্রশ্ন করলুম, ‘কতদিন গাড়ি চালাচ্ছেন?’

‘আমাদের পরিবারটাই তো গাড়ি পরিবার, বাবার বাবা, বাবা, আমি, তিন পুরুষে ড্রাইভার৷ গাড়ি ছাড়া কিছু বুঝি না৷ গাড়িতেই জীবন কেটে গেল৷ অনেকের অনেক রকম গাড়ি চালিয়েছি৷ শেষে এইটা৷’

‘কেমন রোজগার হয়?’

‘চলে যায়৷ নেশা-ভাঙ করি না৷ ছোট পরিবার৷ মেয়েটা লেখাপড়ায় খুব ভালো৷ সেইটাই এক বিশাল খরচ৷ ও ম্যানেজ হয়ে যাবে৷ বাবা আছেন মাথার ওপর, ভোলানাথ৷ বছরে একবার তারকেশ্বরে যাই৷ বেশি ভাবি না৷ ভেবে কি হবে! যা হবে, তা হবে৷’

জ্যাম খুলে গেছে৷ না, মানুষটা ভালো৷ টাকাটার কথা বলা যেতে পারে৷ তবে আমার টাকার ভীষণ প্রয়োজন৷ আমার মেয়েটাকে ভালো একটা কলেজে ভর্তি করার জন্যে মোটা টাকা লাগবে৷ ব্যাগটা টিপে মনে হচ্ছে, সেই টাকাটাই আছে৷ আমিও তো একবার তারকেশ্বরে গিয়ে বাবার মাথায় বেলপাতা চাপিয়ে এসেছি৷ বাবা কি শুধু ওর একার! বাবা সকলের! ডাকার মতো ডাকলে কাজ হবেই৷ ব্যাপারটা চেপে যাই৷ টাকাটাকে সহ্য করি৷ বলব না৷ বাবা আমাকে কৃপা করেছেন৷ আমি চুরি করিনি, ছিনতাই করিনি৷ আমি পেয়েছি৷ এটা এখন আমার৷ গাড়িটা তো আমার নয়৷ গাড়ি যার, সম্পত্তি তার৷ এই যুক্তিতে টাকাটা তো ওর৷ গাড়িটাকে যদি একটা ঘর ভাবি তাহলে ঘর যার ধন তার৷ এ যুক্তিও আমি খণ্ডন করে দিতে পারি এইভাবে, আপতত এই ঘরের আমি ভাড়াটে, অতএব এই ব্যাগটায় আমার অধিকার৷ নাঃ, হচ্ছে না৷ মন কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না৷ জিনিসটা তো অন্যের৷ এটার মালিক অন্য কেউ৷ অনেকদিন থেকে ভাবছি সপরিবারে সিমলা যাব৷ এই টাকায় সেই টুরটা হয়ে যেতে পারে৷ আচ্ছা, নিজের কথা ছেড়ে দি, পরোপকারের কথাও তো ভাবতে পারি৷ শ্যামলের বাবার টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না, তাকেও তো কিছুটা দেওয়া যেতে পারে৷ পুণ্য কর্মে খরচ৷ টাকাটা শুদ্ধ হয়ে যাবে, বাকিটায় নিজের সখ মেটাব৷ মোবাইল, বড়পর্দার টিভি, একটা মাইক্রো ওভেন, এক জোড়া ব্র্যান্ডেড জুতো, একটা সেই ঘড়ি, প্রেশার মাপা যায়, কতটা হেঁটেছি, কিলোমিটার, ঘড়ি জানিয়ে দেয়৷ বাজার ভর্তি কত কি! শপিং মলে গেলে মন ছোঁক ছোঁক করে৷ সেই সব এই মুহূর্তে আমার হাতের মুঠোয়৷

সামনে রাস্তা একটু ফাঁকা৷ চালক আবার কথা শুরু করলেন, ‘সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে এক মহিলা উঠলেন, শ্যামপুকুরে নেমে গেলেন একটা ব্যাগ ফেলে৷ ব্যাগে গয়না, মোবাইল৷ আমি ফিরে এসে ফেরত দিতে ভীষণ খুশি৷ বললেন, আপনি ভগবান৷ পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে দিতে এসেছেন, আমি বললুম, ম্যাডাম! মন্দিরে আছেন আসল ভগবান, আপনি তাঁকে দিন৷ আমি ড্রাইভার, ভগবান একবারই অর্জুনের রথ চালিয়েছিলেন৷ ফ্ল্যাটে থাকতে থাকতে মানুষের মন কতটা ছোট হয়ে গেছে৷ সব ফুচকা, ভেতরে এতটুকু পুর আর তেঁতুল গোলা জল৷ কত্তা গিন্নি একটা বাচ্চা৷ একজন তার বুড়ি মাকে ফেলে পালাচ্ছিল৷ মতলব বুঝে চিৎকার করে লোক জড়ো করলুম৷ যুগ খুব খারাপ পড়েছে স্যার৷ মোড়ে মোড়ে বিপদ৷ ট্যাক্সি চালাতে গিয়ে কত অভিজ্ঞতাই যে হল৷ রাত্তিরে মাতালদের উৎপাত খুব বেড়েছে৷ কাল একজন গাড়িতে উঠে বসলেন৷ জিগ্যেস করলুম, যাবেন কোথায়! বললেন, বৃন্দাবনে! শ্রীকৃষ্ণ ডিনারে ডেকেছেন৷ থানার সামনে গাড়ি রেখে বললুম, নামুন, বৃন্দাবন এসে গেছে৷ কে নামবে! একপাশে কাত৷ ঠ্যালাঠেলি করায় একবার কোনো রকমে বললেন, ডোন্ট ডিস্টার্ব৷ শেষে পুলিশ এসে চ্যাংদোলা করে নামাল৷’

আমি শুনছি, আবার শুনছি না৷ কি করব বুঝতে পারছি না৷ জিগ্যেস করলুম, ‘থানার জমা দিলে, যার জিনিস তিনি ফিরে পান!’

‘সে বলতে পারব না, তবে আমি একবার একটা সুটকেস জমা দিয়ে খুব বিপদে পড়েছিলুম৷ বাড়িতে পুলিশ এসে হাজির৷ স্যুটকেসে জাল নোট ছিল৷ অনেক কাণ্ড করে রক্ষা পাই৷ এই ঘটনার পর থেকে আমি খুব সাবধান৷ থানা পুলিশ, বাপরে! বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা৷’

সিগন্যাল৷ গাড়ির পর গাড়ি৷ সামনে কি একটা ঝামেলা হয়েছে৷ সারা দিনে কলকাতায় কটা মারামারি হয়, তার কোনো হিসেব আছে কি? চালকের কথায় একটু ঘাবড়ে গেলুম, এই নোটগুলো জাল নয় তো!

‘আপনি জাল নোট চিনতে পারেন?’

‘একালের জাল নোট সহজে চেনা যায় না, ও মনে হয় ব্যাঙ্কের লোকেরাই পারেন৷ আমি নিজে বেশ কয়েকবার ঠকেছি৷ ক্রাইম খুব বেড়েছে৷ এক প্যাসেঞ্জার ড্রাগস নিয়ে উঠেছিল৷ পুলিশ চেজ করে ধরলে৷ গাড়িটা থানায় পড়ে রইল কয়েকদিন৷ বয়েস হয়ে গেছে, আর পারছি না৷ গাড়ির ভেতরে কত কাণ্ডই যে হয়৷ আর ভালো লাগে না৷ আজকাল আমি আর রাতে চালাই না৷’

‘আচ্ছা, ধরুন আমাকে কেউ জাল নোট দিয়েছে, এইবার না জেনে সেই নোট আমি শপিং মল, কি ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছি, কি হবে?’

‘ঝামেলা হবে৷ সন্দেহ করবে৷ এক সঙ্গে অনেক নোট থাকলে, থানা পুলিশ তো হবেই৷ এই যুগটাই তো অশান্তির যুগ৷ সংসারে টাকা না হলে চলে না, কিন্তু টাকা এক মহা অশান্তি৷ হাতে বেশি টাকা এলেই ওড়াতে ইচ্ছে করবে৷ দামী দামী জিনিস কিনবে, আর প্রতিবেশীর চোখ টাটাবে৷ বলাবলি করবে৷ টাকা এল কোথা থেকে? ঘুষের টাকা! আমি দেখেছি, এই দুনম্বরি টাকা সহ্য হয় না, পরিবারটা শেষ হয়ে যায়৷’

চালক জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি কোথায় নামবেন?’

‘চলুন না আর একটু৷ আমি বলব৷ আজ দিনটা খুব ভালো, বেড়াতে ইচ্ছে করছে৷’

ব্যাপারটা খুব জটিল হয়ে গেল৷ একটা ভয়! অনেক আগের একটা ঘটনা মনে পড়ল৷ স্কুলের বন্ধু আশু বাবার টাকা চুরি করে আমাদের খুব খাওয়ালে৷ ঘুড়ি, লাটাই, মাঞ্জার সুতো কিনে দিলে৷ তারপর আশু ধরা পড়ল৷ আশুর বাবা আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে বললেন, চুরির টাকায় কি কি হয়েছে৷ উত্তম মধ্যম যা হওয়ার তাই হল৷ জোয়ারের জল, থাকে না, বেরিয়ে যায়৷ ঘুষের টাকা, জুয়ার টাকা৷ না, এইবার একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে৷ অনেক আগেই আমার নেমে যাওয়ার কথা৷ অকারণে ভাড়া বাড়ছে৷ সিদ্ধান্ত এই, ব্যাগটা পায়ের কাছে যেখানে পড়েছিল, সেইখানেই পড়ে থাক৷ ছেলেবেলায় এই উপদেশই পেয়েছিলুম, পর দ্রব্যেষু লোষ্ট্রবৎ৷ একটা বড়সড় হীরে পড়ে থাকলেও ভাববে, ওটা সামান্য একটা পাথর৷ চালককে বলছি না কেন? ওইটাই আমার মনের খোঁচ৷ মুফতে এতগুলো টাকা পেয়ে যাবে, যা আমারই পেয়ে যাওয়ার কথা৷ আমার বাল্যবন্ধু নিরঞ্জনের পিতা অসুস্থ৷ টাকার অভাবে, ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে না৷ কাজের মেয়েটির মায়ের চোখে ছানি অপারেশান করাতে হবে৷ কিছু টাকার প্রয়োজন৷ নানা প্রয়োজনের দীর্ঘ একটা তালিকা মনের কম্পিউটার থেকে বেরিয়ে আসছে৷ সব মধ্যবিত্তের জীবনেই অর্থের সমস্যা৷ কোনো রকমে চলছে৷ কটা টাকাই বা আছে ব্যাগটায়! দমকা বাতাস চিরকাল তো বইবে না৷ নাঃ, ফেলেই দিই৷ ফেলে দিতে গিয়েও থেমে গেলুম৷ খুব লোভ হচ্ছে৷ এমন ঘটনা জীবনে আর ঘটবে না৷ সুযোগ একবারই আসে৷ আচ্ছা, যদি এইভাবে ভাবি, এই গাড়িটায় আমি উঠিনি৷ না, ভাবতে পারছি না৷ আমার ভাগ্য আমাকে উঠিয়েছে৷ ভাগ্যকে বিশ্বাস করতেই হবে৷ আর এসব ব্যাপারে অন্যের পরামর্শ নিতে যাওয়াটা বোকামি৷ টাকার ব্যাপারে কারোকে বিশ্বাস করা উচিত নয়৷

না, আর ভাবব না৷ টাকা একটা বিশ্রী চ্যাট চ্যাটে জিনিস৷ আমি ছাড়তে চাইলেও আমাকে ছাড়ছে না৷ সামনে বাঁ পাশে বেশ বড় একটা জুয়েলার্সের দোকান৷ কাগজে খুব বিজ্ঞাপন দেখি৷ ‘আমাকে ওই দোকানটার সামনে নামিয়ে দিন৷’

গাড়ি দাঁড়াল৷ দোকান থেকে স্মার্ট এক ভদ্রমহিলা দ্রুত বেরিয়ে এসে গাড়ির পাশে দাঁড়ালেন৷ ভীষণ তাড়া, ‘নামুন, নামুন, দেরি হয়ে গেছে৷ গড়িয়াহাট যাব৷ কনে সাজাতে হবে৷’

গাড়ির বাইরে একটা পা বাড়িয়েছিলুম৷ টেনে নিয়ে শরীরটা ভেতরে টেনে নিলুম৷

‘কি হল? নামবেন না?’

‘এক সেকেন্ড৷’

ব্যাগটা ফেলে দিয়েছিলুম৷ নিচু হয়ে তুলে নিলুম৷ এটা আমার৷ গয়না কিনব, ওই যে সাজানো রয়েছে ভালো ভালো গয়না৷ আজ রাতে আমারে স্ত্রীকে সাজাব৷ তুমি কনে সাজাবে, আমি আমার বউকে সাজাব৷ ভদ্রমহিলার ভীষণ তাড়া৷ ‘কি হল কি?’

‘এক সেকেন্ড৷’

রাস্তায় নেমে, চালকের পাশে গিয়ে দাঁড়ালুম৷ কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বললুম, ‘অনেক টাকা৷ পেছনে আমার পায়ের কাছে পড়েছিল৷ একটা ব্যাগ—প্রচুর টাকা৷ এই নিন৷’

ভদ্রলোকের মুখের চেহারাটা পালটে গেল৷ লোভ৷ দগদগে লোভ৷ হাতটা বাড়ালেন৷ লোমশ একটা মোটা হাত৷ খপাত্ করে ব্যাগটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইলেন৷ আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে৷ জিগ্যেস করলুম, ‘মালিককে খুঁজে বের করে ফেরত দেবেন তো! আপনার দায়িত্ব৷’

পেছনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা উত্তেজিত, ‘আপনারা কি শুরু করলেন?’

জগৎসৃষ্টির পর গোল গোল টাকা সৃষ্টি করলেন শয়তান৷ টাঁকশালটা তাঁর৷ সোনা রুপো, চাঁদনি, মুদ্রা, সব শয়তানের৷ আমিও একটু শয়তানি করলুম, ভদ্রমহিলাকে বললুম, ‘ম্যাডাম, প্রচুর টাকা ভর্তি ব্যাগ কেউ ছেড়ে গিয়েছিলেন৷ পড়ে ছিল আমার পায়ের কাছে, উদ্ধার করে ওঁর হাতে তুুলে দিলুম৷ নিলে নিতে পারতুম, নিলুম না৷ অনেক টাকা৷ গাড়ির চালক আমার দিকে এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালেন, পারলে আমাকে খেয়ে ফেলেন, কিন্তু পারবেন না৷ এইবার বোঝাপড়া হোক এই স্মার্ট মহিলার সঙ্গে৷ আমি ব্যাপারটাকে একটু ঘেঁটে দিয়ে গেলুম৷ ছোট্ট একটু শয়তানি৷ টাকা কি সহজে হজম করা যায়! অর্থ তো যত অনর্থের মূল!

ট্যাক্সিটা চলে যাচ্ছে৷ ওই যাচ্ছে দূর থেকে দূরে৷ চলে যাচ্ছে আমার দামী মোবাইল ফোন, সর্বাধুনিক টিভি, দামী ব্র্যান্ডের জুতো, আরো কত কি! দোকানের জানালায় কত গয়না, হার, ব্রেসলেট, চুড়ি, বালা, ঝিলিক মারা-পাথর বসানো আংটি৷ সব চলে গেল, চলে গেল আমার সোনার হরিণ৷ ধরেও ছেড়ে দিলুম৷ আঃ, কি শান্তি! এইবার আরাম করে এক ভাঁড় চা খাই৷ একজন মধ্যবিত্তের দৌড় ওই পর্যন্তই৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%