রাবণবধ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভীষণ উত্তেজনা, হইহই কাণ্ড৷ স্কুলের ‘অ্যানুয়েল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনি’ এসে গেছে৷ এবারে খুব ঘটা হবে৷ স্কুলের মাঠে প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হয়ে গেছে৷ হেডমাস্টারমশাই আর স্কুল সেক্রেটারি কেবল বলছেন, ‘অ্যাটলিস্ট থাউজেন্ড, মিনিমাম হাজার লোকের অ্যাকোমোডেশন চাই৷ তার কমে হবে না৷ গভর্নর আসছেন৷ এই স্কুলের ইতিহাসে এই প্রথম৷ রেড কার্পেট চাই৷ মিনিমাম এক মণ ফুল৷’

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারমশাই খুব স্পষ্টবক্তা৷ পান খান দোক্তা দিয়ে, সেই কারণে জিভ অতিশয় ধারালো৷ জমিদারের ছেলে৷ কারও পরোয়া করেন না৷ বাড়িতে রাধাগোবিন্দের মন্দির৷ অষ্টধাতুর যুগল মূর্তি৷ মাথায় ছাতা৷ দুই সের মিনিমাম৷ কমসে-কম তিনশো ভরি সোনা৷ পূর্বপুরুষের কেরামতি৷ সারারাত লাঠি হাতে মন্দির-চাতালে জেগে থাকেন৷ ঘুমোলেই ছাতাসমেত মূর্তি হাওয়া হয়ে যাবে৷ ভগবান বড়, না সোনা বড়৷ অবশ্যই সোনা৷ এ শোনা কথা নয়৷ প্রত্যক্ষ সত্য৷

অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড পানঠাসা মুখে, ফোলা-ফোলা শব্দে বললেন, ‘এক মণ ফুল! ইউ আর এ ফুল৷ এখানে কি শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা হবে! এই স্কুল আমার পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত৷ প্রতিটি নয়াপয়সা হিসেব করে খরচ করতে হবে৷ হার্ড ডেজ৷ মানুষের হাঁড়ি চড়ছে না৷ এক মণ ফুল!’ বলেই, সেই কোটেশনটা হাঁকড়ে দিলেন, যেটা আমি রচনা লিখতে গেলেই কায়দা করে ঢুকিয়ে দি, ‘লাইফ ইজ নট এ বেড অব রোজেস৷ এক মণ ফুল কী করবেন?’

হেডমাস্টারমশাই সাহিত্যের মানুষ৷ কল্পনার জগতে বিচরণ করেন৷ তাঁর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে গেল৷ তিনি বলতে লাগলেন, ‘ফ্লোর‌্যাল ওভেশন টু হিজ একসেলেন্সি৷ লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে দু-দিকে দাঁড়িয়ে থাকবে দু-সার মেয়ে, হাতে শঙ্খ৷’

‘শাঁখ বলতে পারেন না?’

খিঁচিয়ে উঠলেন সহপ্রধান, ‘সবসময় শুদ্ধ ভাষা৷ যেন বিশুদ্ধ গব্যঘৃত! শঙ্খ, লম্ফ, ঝম্ফ৷ শুদ্ধ বলবেন তো পুরোটাই শুদ্ধ বলুন, দুই পার্শ্বে রমণীগণ শঙ্খ হস্তে দণ্ডায়মান থাকিবে৷’

‘আপনার মশাই অত্যন্ত ইরেশেবল টেম্পারামেন্ট৷’

‘অ্যায়, আবার ওয়েবস্টার থেকে একটা পটকা ছাড়লেন৷ ইংরেজিতে, বাংলাতে, সংস্কৃতে জগাখিচুড়ি৷ হিন্দিটা বাকি থাকে কেন! কিশমিশের মতো ঢুকিয়ে দিন৷’

হেডমাস্টারমশাই আবার তাঁর নিজের ভাবে ফিরে গিয়ে বলতে লাগলেন, ‘এধারে কুড়িজন বালিকা, ওধারে কুড়িজন বালিকা৷ লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে মাননীয় রাজ্যপাল এগিয়ে আসছেন৷ চল্লিশটা শাঁখ একসঙ্গে বাজছে, পুঁউউউ৷’

‘চল্লিশটা শাঁখ একসঙ্গে বাজতে পারে না, অসম্ভব৷’

‘কেন পারে না৷ চল্লিশটা শাঁখ, চল্লিশজোড়া ঠোঁট৷ ফুঁউউউ৷’

‘অতই সোজা! শাঁখ কোনওদিন বাজিয়েছেন নিজে৷ মোস্ট ডিফিকাল্ট ইনস্ট্রুমেন্ট অন আর্থ৷ আমার স্ত্রী একদিন বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ক্রশওয়ার্ড পাজল নিয়ে বসে আছ থাকো, তাতে তোমার খাই-খাইটা একটু কমবে, তবে ঠাকুরঘরে ঠিক সময়ে সন্ধেটা যেন পড়ে৷ তিনবার শাঁখ বাজাবে৷ অতঃপর সন্ধ্যাকালে মধ্যগগনে তারার চক্ষু ফুটিবামাত্র ঠাকুরঘরে প্রবেশ করিলাম, দ্বারদেশে গঙ্গাজল ছিটাইলাম, তিনবারের প্রচেষ্টায় দীপ জ্বলিল, বাতাস কম্পমান, মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধার মতো খাবি খাইতেছে দেখিয়া দক্ষিণের গবাক্ষ বন্ধ করিলাম, একজোড়া ধূপ জ্বালাইয়া, নৃত্য করিতে-করিতে চিত্রপটসমূহে আরতি করিলাম৷ তাহার পর ওষ্ঠে তুলিলাম সিন্দুরচর্চিত শঙ্খ৷ ভাবিয়াছিলাম সহজ হইবে৷ মহাশয়, প্রথমে মৃদু ফুঁ মারিলাম৷ ফুস করিয়া তাহা পশ্চাদ্দেশ দিয়া বাহির হইয়া গেল৷ নির্গমপথ হস্তদ্বারা আচ্ছাদন করিয়া আবার মারিলাম, এইবার সবেগে৷ পুঁ শব্দ নির্গত হইল না৷ মুখে গঙ্গাজল ঢালিলাম৷’

‘কাহার মুখে?’

‘অবশ্যই শঙ্খের মুখে৷ এমত মূর্খ আমাকে ভাবিবেন না, যে নিজের মুখে দূষিত গঙ্গাজল ঢালিব৷ জলের ব্যাপারে আমি অতিশয় সতর্ক৷ জলই সকল রোগের উৎস৷ শঙ্খের ছিদ্রে জল দিয়া হাতের তালু তাহার উপর বারকয়েক ঠুকিলাম৷ পুঁত-পুঁত করিয়া শব্দ হইল৷ ভাবিলাম, শঙ্খ এইবার আর্তনাদ করিবে৷ গণ্ডদেশ স্ফীত করিয়া সবেগে ফুঁ মারিলাম৷ ফুঁ ফসকাইয়া গেল৷ শঙ্খ শব্দ করিল না৷ আমার মেজাজ ক্ষীপ্ত হইল৷ স্বাধীনতাসংগ্রামীর মতো মনে-মনে বলিলাম, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে৷ প্রতিবেশীর আলয়ে-আলয়ে শঙ্খ বাজিয়া গেল৷ আমার শঙ্খ নীরব৷ কেবল আমার ফুৎকারের শব্দ৷ শঙ্খের পরিবর্তে নিজেই ফুঁ-ফুঁ করিয়া বাজিয়া চলিলাম৷ রক্তের চাপ বাড়িয়া গেল৷ চক্ষুদ্বয় রক্তগোলক হইল৷ মানসলোকে অশ্লীল শব্দসমূহ ঘুরপাক খাইতে লাগিল৷ গণ্ডদেশ টাটাইয়া উঠিল৷ রাত্রি নয় ঘটিকার সময় আমার স্ত্রী আসিয়া আমাকে উদ্ধার করিলেন৷ বৈদ্য আসিয়া বিধান দিলেন, দুই গণ্ডে বরিক কম্প্রেস৷ গাল ফুলিয়া গোবিন্দর মা হইয়া তিন দিবস চিতপাত৷ আমার ন্মপত্নী কহিলেন, পাপীরা শঙ্খ বাজাইতে পারে না৷ উহা পুণ্যবানের কর্ম৷ অতএব মহাশয়, ওয়ান, টু, থ্রি চল্লিশটি শঙ্খ একই সঙ্গে বাজিবে, এমন উচ্চাশা করিবেন না৷ অতিশয় বিপাকে পড়িবেন৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘দুশ্চিন্তা অথবা আনন্দের কোনও কারণ নাই৷ আমি প্রতিদিন অনুশীলন করাইব৷ অনুশীলনে পণ্ডিতও মূর্খ হইয়া যায়৷ বোধ হয় ভুল করিলাম৷ অনুশীলনে অপটুও পটু হয়ে যায়৷ এইবার কল্পনা করুন সেই অনির্বচনীয়, স্বর্গীয় দৃশ্য৷ মহামান্য রাজ্যপাল ধীরে-ধীরে আসিতেছেন৷ শঙ্খ নির্ঘোষে আকাশ-বাতাস কম্পিত হইতেছে৷ চতুর্দিক হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতেছে৷ নেপথ্যে গীত হইতেছে, আগমনী সঙ্গীত, শঙ্খে-শঙ্খে মঙ্গল গাও, জননী এসেছে দ্বারে৷’

সহপ্রধান গলা বিকৃত করে বললেন, ‘রাজ্যপাল যদি জননী হন তাহা হইলে আপনার ব্যাকরণ জ্ঞান সম্পর্কে আমার সন্দেহ হইতেছে৷ মুগ্ধবোধ ব্যাকরণখানি পড়িবার অনুরোধ জানাইতেছি৷ বৃদ্ধ হইলেও শিক্ষা করিবার কোনও বয়স নাই৷ পুত্রের সহিত মূর্খ পিতাও একই শ্রেণিতে জ্ঞানলাভ করিতে পারেন৷’

‘মহাশয়, জ্ঞান আপনারই লাভ করা উচিত৷ যিনি পালন করেন, তিনিই পাল, তিনিই জননী৷’

‘আপনার মুন্ডু৷ যিনি পালন করেন, তিনি পিতা৷ পালের স্ত্রীলিঙ্গ পালিকা৷ গান বন্ধ করুন৷ রাজ্যপাল অপমানিত হইলে বিদ্যালয়ের ‘এড’ বন্ধ হইয়া যাইবে৷ আমাদের হাঁড়িসকল শিকায় উঠিবে৷ আর এক মণ অক্ষত পুষ্প ভদ্রমহোদয়ের মস্তকে বর্ষিত হইলে আনন্দোৎসব শোকসভায় পর্যবসিত হইবে৷ পতাকা অর্ধনমিত হইবে৷ হত্যার অপরাধে কারারুদ্ধ হইবেন৷ এক মণ পুষ্প নহে, এক সের পুষ্পচূর্ণ ক্রয় করিলেই যথেষ্ট হইবে৷ সর্ব বিষয়ে বাড়াবাড়ি করাই আপনার চিরকালের অভ্যাস৷ রাজপুরুষদের তৈলমর্দন করিয়াই আপনি আখের গুছাইয়াছেন৷ আপনার কোনও তুলনা নাই৷’

প্রধান শিক্ষকমশাই রেগে ঘরের বাইরে উঠে গেলেন৷ সহ-প্রধানশিক্ষক হা-হা করে হাসতে লাগলেন৷ আমরা ছাত্ররা বোকার মতো বসে রইলুম৷ মিটিং-এ আরও অনেক আলোচনার বিষয় ছিল৷ ছেলেরা নাটক মঞ্চস্থ করবে৷ কী নাটক, কোন নাটক, কে-কে অভিনয় করবে, এইসব আলোচনা হলই না৷ বাংলার স্যার ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘যে-কোনও সভা পণ্ড করার প্রতিভা আপনার অসীম৷ বয়েস বাড়ছে, না কমছে৷ ছাত্রদের উপস্থিতিতে এই আচরণ শ্লাঘার নয় মোটেই৷ লজ্জিত হওয়া উচিত৷’

সহপ্রধান হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আপনাদের এই বাংলার টিচারদের স্টকে ওই একটা শব্দই আছে, শ্লাঘা৷ শুনলেই কুঁই-কুঁই করে হাসতে ইচ্ছে করে৷ শ্লাঘা, বল্যা, বল্কল, গালা৷ সহজ ভাষায় কথা বলতে পারেন না৷ শুনুন, জীবনের সবকিছুকে লঘু করে নিতে শিখুন৷ আনন্দ, আনন্দ৷’

তিনি হাঁক পাড়লেন৷ ‘কী হল৷ কোথায় গেলেন মশাই৷ পুরুষের রাগ পাঁচ মিনিটের বেশি থাকা উচিত নয়৷ চলে আসুন৷ গরম ফুলকপির শিঙাড়া খাওয়াব৷’

ঘরের বাইরেই স্কুলের দোতলার ছোট ছাত৷ ইংরেজ আমলের বাড়ি৷ সেই কারণেই আলসের খুব শোভা৷ অনেকটা গড় মান্দারণের মতো৷ ফুলগাছের টব সাজানো৷ গাছ নেই, ফুলও নেই৷ খটখটে শুকনো মাটি৷ কে যত্ন করবে? হেডমাস্টারমশাই ছাত থেকে বললেন, ‘আমার খুব নস্যি নিতে ইচ্ছে করছে৷ ডিবে ফেলে এসেছি৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘সে-ব্যবস্থা হবে৷ দয়া করে ঘরে আসুন৷ মিটিং বন্ধ হয়ে আছে৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘যাঃ, সর্বনাশ হয়ে গেল!’

‘কী আবার হল!’

‘করে দিয়েছে৷’

‘কী করে দিয়েছে৷’

‘তিনতলার আলসেতে কাক বসে ছিল, একেবারে ডাইরেক্ট হিট৷’

‘কোথায়?’

‘পাঞ্জাবির পিঠে৷’

‘চলে আসুন৷ শুভ লক্ষণ৷ আগাম জানিয়ে দিয়ে গেল, আপনি স্ট্যাচু হবেন৷ সারা বছর ধরে কাক পার্কে-পার্কে স্ট্যাচু হোয়াইটওয়াশ করে৷ মশাই, আপনার যশ খ্যাতি এমনই সুবিস্তৃত হবে যে, আপনার মূর্তি স্থাপন করবেন সরকার৷’

হেডমাস্টারমশাই ঘরে এলেন, ‘গা ঘিনঘিন করছে, কারণ, কাক বড় কুখাদ্য খায়৷’

‘খেলেই বা, পেটে গিয়ে সব চুন হয়ে যায়৷ ওদের পেটে এক ধরনের কেমিক্যাল থাকে, ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড৷ ঘিনঘনি করার কোনও কারণ নেই৷ দেখেননি বিদ্যাসাগর, রামমোহন, স্যার আশুতোষ, গিরিশচন্দ্র, সব সাদা হয়ে বসে আছেন৷ তাঁদের গা ঘিনঘিন করছে কি! ছটফট না করে স্থির হয়ে চেয়ারে বসুন৷

হেডমাস্টারমশাই চেয়ারে সিঁটিয়ে বসলেন৷ বাংলার স্যার কনভেনার৷ তিনি বললেন, ‘কাজের কথায় আসা যাক৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘আসা যাক৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘নস্যি আর শিঙাড়া!’

অঙ্কের স্যার ডিবেটা এগিয়ে দিতে-দিতে বললেন, ‘নস্যিটা দিতে পারছি৷ শিঙাড়া আমার দায়িত্ব নয়৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘দোকানের শিঙাড়া খাওয়া উচিত নয়৷ খেলেই অম্বল৷ আজ সকালে গ্যাস লিখিয়ে এসেছি৷ দশ-বারো দিন পরে এসে যাবে, তখন একঝুড়ি ভেজে এনে খাওয়াব৷ বড়-বড় ফুলকপি, কড়াইশুঁটি, বাদাম৷ সে-জিনিস খেলে তুরীয় অবস্থা হবে৷’ হেডমাস্টারমশাই শাঁ করে নস্যি নিয়ে বললেন, ‘জানতুম৷ ওয়ান পাইস ফাদার-মাদার৷ তা না হলে বড় রাস্তার ওপর অত বড় বাড়ি এই বাজারে করা যায়৷’

অবশ্যই যায়৷ সিগারেট, নস্যি, চা, তিনটেই খাই না৷ বিয়ে, পৈতের নেমন্তন্ন অ্যাটেন্ড করি না৷ বাড়িতে কোনও কাজের লোক রাখিনি৷ শ্যাম্পু ব্যবহার করি না৷ ট্যাক্সি চাপি না৷ রেস্তোরাঁয় ঢুকে চপ-কাটলেট খাই না৷ সেইজন্যে আমার অসুখ করে না, কথায়-কথায় ডাক্তার ডাকতে হয় না৷ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ি না৷ পছন্দ হয়েছে বলেই জিনিস কিনে ফেলি না, প্রয়োজন হলে তবেই কিনি৷ ভাত-ডাল, ডাল-রুটি এই আমার খাদ্য৷ দু-বেলা দু-বার পেট ঠুসে খেয়ে নিই৷ খুচুর-খুচুর জলখাবার আর খেতে হয় না৷ ফলে, আমার একের-চার খরচ, তিনের-চার সঞ্চয়৷’

বাংলার স্যার বললেন, ‘এইরকম একটা জীবনকেই বলে, আমার জীবনই বাণী৷ করমবীর, ধরমবীর৷’

‘সভার কাজ শুরু করুন৷’ গম্ভীর গলায় আদেশ করলেন অঙ্কের স্যার৷

সহপ্রধান বললেন, ‘রাজ্যপালকে আনার কী দরকার শুনি৷ পুলিশে-পুলিশে সব ছয়লাপ৷ সিকিউরিটি৷ কম্যান্ডো৷ স্বাভাবিক অবস্থা বিপর্যস্ত৷ আমার মনে হয় এই জায়গাটা আমরা আর-একবার রি-কনসিডার করতে পারি৷’

প্রধানশিক্ষক বললেন, ‘হরিনারায়ণ বিদ্যাপীঠ গভর্নরকে এনেছিল৷’

‘এনেছিল এনেছিল, সো হোয়াট৷ ওরা এনেছিল বলে আমাদেরও আনতে হবে!’

‘ম্যাটার অব প্রেস্টিজ৷’

‘বারোয়ারি পুজোর মেজাজ নিয়ে স্কুলের অ্যানুয়াল করবেন৷ প্রতিষ্ঠানের কথা, নিজেদের বয়েসের কথাটা একবার ভাববেন না৷’ মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘হরিনারায়ণ এনেছিল৷ তা হলে তো আমাদের প্রেসিডেন্টকে আনতে হয়৷’

বাংলার স্যার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘কী যন্ত্রণা মশাই৷ এইভাবে মিটিং চালানো যায়!’

‘খুব যায়৷ মিটিং মানেই দু-দশ কথা৷ তর্কাতর্কি৷ পড়েননি৷ অ্যাসেম্ব্‌লিতে কী হয়! জুতো ছোড়াছুড়ি, ওয়াকআউট! এসব যদি না-ই হল, তো মিটিং হল কী!’

‘হেডমাস্টারমশাই একবার ওয়াকআউট করেছেন, করে এই মিটিং-এর গর্ব বাড়িয়েছেন৷ এইবার নেক্সট আইটেম৷ কন্চসেল ব্লোয়িং রাজ্যপাল ধীরে-ধীরে কামিং, সামনে ভগীরথ, হাতজোড়৷ কে ভগীরথ হবে!’

‘অবশ্যই হেডমাস্টারমশাই, কারণ তিনি এই বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানের হেড৷’

‘বেশ, ভালো কথা, কিন্তু দেয়ার ইজ এ বাট৷ সেটা হল পায়ে আর্থারাইটিস৷ হাঁটার সময় একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন৷ দৃশ্যটা অবলোকন করুন৷ সামনে খোঁড়া ভগীরথ লিম্পিং, পেছনে স্ট্রেট রাজ্যপাল গ্যাটম্যাট৷ কেমন দেখাবে!’

‘ভগীরথের বয়েস হয়েছে, বাত অবশ্যই হতে পারে৷’

‘আমার সাজেশান, হেডমাস্টারমশাই পেছনে থাকুন৷ তিনি পেছন দিক থেকে গঙ্গাকে পুশ করবেন৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘যদি গ্রেস আর ডিগনিটির কথা বলেন, তা হলে সামনে থাকবেন আমাদের গেমটিচার৷ পারফেক্ট হেল্থ, মিলিটারি-চলন৷ আর আমরা সব ফুটকড়াইয়ের মতো পেছনে-পেছনে গড়াতে-গড়াতে আসব৷’

‘হেডমাস্টারমশাই কী বলেন?’

‘নট এ ব্যাড প্রোপোজাল৷ অ্যাকসেপ্টেড৷’

‘রাজ্যপাল সিঁড়ি দিয়ে মঞ্চে উঠছেন৷’

‘ওয়েট৷ সিঁড়িটা কেমন হবে৷ গেল-গেল মচকে গেল টাইপ!’ সহপ্রধান বাধা দিলেন, ‘রাজ্যপালকে দাঁড় করিয়ে রাখুন৷ আগে মঞ্চটা পাকা হোক৷ মঞ্চটা হচ্ছে কোথায়! সাইজ কী! ডেকরেশান কেমন?’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনি টেজারার৷ দ্যাট ইউ আর টু ডিসাইড৷ কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ৷’

‘বাঃ, বেশ কথা! রাজ্যপাল আপনার, আর মঞ্চ আমার! সাধারণ কোনও লোক হলে আমি যেমন-তেমন তক্তা ফেলে যা হোক না হোক একটা কিছু বানিয়ে দিতুম৷ একটা বেঞ্চ রেখে বলতুম যা হোক কাঁধে ভর রেখে উঠে যান৷ আমার কম খরচে হয়ে যেত৷ এ এক ভি ভি আই পি-কে এনে ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন! এ তো এখন রীতিমতো ডায়াস চাই৷ শুধু তাই নয়, আগের দিন সিকিউরিটির সাতজন এসে নেচেকুঁদে শক্তি পরীক্ষা করে যাবে৷ যতক্ষণ রাজ্যপাল ডায়াসে থাকবেন, ততক্ষণ সিকিউরিটির দু-জন তলায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে থাকবে৷ মঞ্চটাকে সেইজন্যে রীতিমতো উঁচু করতে হবে৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনার আবার বেশি-বেশি৷ অতসব করতে হয় না!’

‘কিসুই জানেন না, চুপ করুন৷ রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, এঁদের জীবনের কোনও দাম আছে! একটু আলগা দিলেই সন্ত্রাসবাদীরা নির্মমভাবে মেরে ফেলবে৷ মনে নেই, রাজীব গান্ধীকে কীভাবে মারল আর ডি এক্স দিয়ে!’

‘এখানে সন্ত্রাসবাদী কোথায়!’

‘মাথামোটা! এখানে এখন কোনও মাছি আছে? নীল-নীল ডুমো-ডুমো মাছি?’

‘নেই৷’

‘একটা আম আনুন, আমি ছুরি দিয়ে কাটছি৷ দেখি মাছি আছে কী নেই৷ সন্ত্রাসবাদীরা গন্ধে-গন্ধে উড়ে আসে৷’

‘একটা নিরীহ রাজ্যপালকে মেরে লাভ?’

‘আপনার ওই পোস্ত আর ডাঁটাচচ্চড়ি খাওয়া মাথায় ঢুকবে না৷ এটা একটা বাদ, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, সমাজবাদ, বহুজন সমাজবাদের মতোই সন্ত্রাসবাদ৷ বড়-বড় কিছু লোককে বাদ দেওয়াই যাদের কাজ৷ উইবাদ, ইঁদুরবাদের মতো৷’

‘শেষের দুটো কী বললেন?’

‘ইঁদুর আর উই, জিগ্যেস করে দেখবেন তো, রবীন্দ্র রচনাবলী খেলে কেন? দাঁত বের করে হাসবে, জানি না তো স্যার৷ এইটাই আমাদের বাদ, ইজ্ম৷ ইঁদুরিজ্ম৷ আপনি মশাই বহুত খরচের ধাক্কায় ফেলে দিলেন৷ রীতিমতো একটা মঞ্চ চাই৷ লাল কার্পেট পাততে হবে৷ রাজার সিংহাসনের মতো চেয়ার৷ গলায় গোড়ের মালা দিতে হবে৷’

বাংলার স্যার বললেন, ‘দ্যাট্স নো প্রবলেম৷ আমার নাতনিটা একেবারে ফুটফুটে, জাস্ট এ ডলপুতুল, সেই নাচতে-নাচতে এসে মালাটা পরিয়ে দেবে৷’

‘বাংলার শিক্ষক যখন ইংরেজি বলেন, তখনই জানবেন রিয়েল প্রব্লেম৷ গভর্নরের গোড়ের মালা৷ এ আপনার দু-দশ টাকার কর্ম নয়৷ মিনিমাম টু হান্ড্রেড৷ বাঘের লেজের মতো ইয়া মোটা৷ সব টাকা তো আপনার ফুল আর প্যান্ডেলেই ফৌত হয়ে যাবে৷ ছেলেদের পুরস্কার আর দেবেন কী করে!’

হেডমাস্টারমশাই কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, ‘রাজ্যপালকে তা হলে বাদই দিয়ে দিন৷’

‘কী করে দেবেন! তাঁর অ্যাকসেপ্‌টে চিঠি এসে গেছে৷ তাঁর ডায়েরিতে এন্ট্রি হয়ে গেছে৷’

‘পরিষ্কার একটা রিগ্রেট লেটার, অনারেবল স্যার, ডিউ টু শর্টেজ অফ ফান্ড, উই আর আনব্‌ল টু হ্যান্ডল টু ইউ৷ ইউ আর টু কস্টলি ফর আওয়ার পুয়োর স্কুল৷’

সহপ্রধান চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সাধে মাথামোটা বলি! আমাদের একটা প্রেস্টিজ আছে তো! মানসম্মান! টাকা তুলতে হবে৷ ডাইভ দিন৷ ডোনার্স, অভিভাবক৷ দোরে-দোরে ঘুরতে হবে৷ কত বড় কথা, রাজ্যপাল আসছেন! রোমাঞ্চ হচ্ছে৷ আজি পুলকিত ধরণী আনন্দে৷’

অঙ্কের স্যার বললেন, ‘এতক্ষণে মনে হচ্ছে জিনিসটা আপনাকে ধরেছে৷ গ্রিপ করেছে৷ আপনি একবার ধরে নিলে কোনও ভাবনা নেই৷ স্ট্রেট বেরিয়ে যাব, উইথ ফ্লাইং কলার্স৷’

সহপ্রধান সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘দেখি, প্যাডটা এগিয়ে দিন৷’

হেডমাস্টারমশাই তড়িঘড়ি প্যাডটা এগিয়ে দিলেন৷

‘এ ডটপেন প্লিজ৷ আমারটা গেছে৷ কে যে মেরে দিল!’

হেডমাস্টারমশাই ডটপেন দিলেন৷ সহপ্রধান প্যাডের কাগজে নকশা আঁকছেন আর বলছেন, ‘মঞ্চটা ইস্ট-ওয়েস্ট লম্বা হবে, ফেসিং সাউথ৷ পুব দিকে তিনধাপ, সিঁড়ি, নট মোর দ্যান দ্যাট৷ বৃদ্ধ মানুষ৷ হার্টে চাপ পড়ে যাবে৷ সিঁড়ি বেশ চওড়া, উইথ হাতল৷ হ্যান্ড রেল থাকা উচিত, ফর প্রোটেকশন৷ তিনজন পাশাপাশি উঠতে পারে এতটাই চওড়া৷ দু-পাশে দু-জন সিকিউরিটি, মাঝখানে রাজ্যপাল৷ পেছনে তিনজন৷ রাজ্যপালকে ঘিরে থাকবে হিউম্যান ওয়াল৷ মঞ্চের মাঝখানে রেড কার্পেট৷ সেন্টারে সিংহাসন চেয়ার, দু-পাশে সাধারণ চেয়ার৷ সামনে একটা লম্বা টেবিল৷ শক্তপোক্ত৷ লড়বড়ে লয়৷ সরি! নড়বড়ে নয়৷ গর্জাস টেবিলক্লথ৷ ড্রয়িং পিন দিয়ে ফিক্স করা৷ নয়তো বারেবারে গুটিয়ে যাবে, ঝুলে যাবে, এলোমেলো হয়ে যাবে৷ যা অন্যসব সভায় হয়৷ মশাই! দেখে শিখতে হয়৷ যদি শিখতেই না পারলেন, তা কীসের শিক্ষক!’

‘ফুলদানি সম্পর্কে কিছু ভেবেছেন? সবার আগে তো ওই দুটোই উলটে কিছুক্ষণের জন্য সভা পণ্ড করবে৷ অথচ দুটো ফুলদান তো টেবিলে রাখতেই হবে৷ টেবিলের শোভা৷’

‘নো ফুলদান৷ অত্যন্ত ছেঁচড়া জিনিস৷ দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই, ফুলের ভারে টলে পড়ে যায়৷ মুখ আড়াল করে৷ দর্শকদের চিৎকার৷ ফুলদান আমরা রাখবই না৷ তার বদলে থাকবে ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট, যাকে বলে ইকেবানা৷ পোর্সিলেনের একটা গামলি৷ তাইতে নানারকম ফুলের ফ্যাঁসফোঁস৷ ঝাঁটাকাঠি, মাথায় আলু গোঁজা৷ একেবারে ফ্ল্যাট৷ কেতরে যাওয়ার ভয় নেই৷’

‘কে করবে ওই ইবেকানা?’

‘আঃ, ইবেকানা নয়, ইকেবানা৷ কে আবার করবে? আমি করব৷ কসমস, অ্যাস্টার, গ্ল্যাডিওলি, নস্ট্রাসিয়ান কিনে আনব৷ দেখবেন, সে যা হবে না! ফ্যান্টাস্টিক৷ আচ্ছা, ডায়াস প্ল্যানিং হয়ে গেল!’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘মনে থাকে যেন, সবশেষে ওই মঞ্চে থিয়েটার হবে, রাবণবধ৷’

‘ওববাবা, গোদের ওপর বিষফোঁড়া৷ থিয়েটার ঢুকিয়েছেন!’

‘ঢোকাব না! ছেলেরা সব মুখিয়ে আছে৷ থিয়েটার করবে৷ একটু বিচিত্রানুষ্ঠান মতো হবে৷’

‘তা হলে তো স্টেজ করতে হবে৷ ড্রপসিন লাগাতে হবে৷ উইংস রাখতে হবে৷ হয়ে গেল! ডবল খরচ৷ একটা সেটেই হবে, না দৃশ্য পালটাতে হবে?’

বাংলার স্যার বললেন, ‘দৃশ্য তো পালটাতেই হবে৷ পালাটা তো আমিই লিখছি৷’

‘সে আপনি একটা কেন, দুশোটা লিখুন কিন্তু সেট সেটিংস, ড্রেস, মেকআপ, এইসবের খরচ কে জোগাবে?’

‘সেটা তো আমার জানার কথা নয়৷ আমি নাট্যকার, ডিরেক্টর৷ আপনারা আমাকে স্টেজ দেবেন, আমি দর্শকদের ভালো পালা দেব৷ টাকার চিন্তা আপনার৷’

‘আপনারা প্রত্যেকেই তা হলে আপনাদের স্ত্রীর একটা করে গয়না এনে জমা দিন৷ বিক্রয়লব্ধ অর্থে আমাদের ফাংশান হবে৷ তা না হলে এত টাকা আসবে কোথা থেকে!’

‘কেন আসবে না! কিশোর সঙ্ঘের কালীপুজোর বাজেট কত টাকা জানেন? পাঁচ লাখ৷’

‘তা হলে এক কাজ করুন৷ কিশোর সঙ্ঘের সেক্রেটারিকে ডেকে আনুন৷ একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে কোন মূর্খ হাজার-হাজার টাকা চাঁদা দেবে শুনি! না দিলে প্রাণের ভয় আছে কী! ভয় না দেখালে মানুষ দান করে না৷ আপনারা পারবেন ছোরাছুরি নিয়ে চাঁদা আদায় করতে? জেনে রাখুন, এ-দেশে এখন স্কুলের চেয়ে ক্লাব বড়৷’

বাংলার স্যার বললেন, ‘আপনার কাছে আমি স্যারেন্ডার করছি স্যার, যেভাবেই হোক আমাদের নাটকটা তুলে দিন স্যার৷ ছেলেরা আশা করে আছে৷’

সহপ্রধান একটু যেন খুশি হলেন, কারণ পকেট থেকে পানের ডিবে আর জর্দার কৌটো বের করলেন৷ প্রধানশিক্ষক করুণ গলায় বললেন, ‘এখন আবার পান কেন, অনেকক্ষণ যে কথা বলতে পারবেন না, পানঠাসা মুখে কেবল উ-উ করবেন৷ এখন আমাদের ঘোর সঙ্কট, এই সময় আপনার কথা বন্ধ হয়ে গেলে কেমন করে চলে৷’

‘দ্যাটস টু’ সহপ্রধান ডিবে স্পর্শ করলেন না৷ বাংলার স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার দৃশ্য ক’টা? নাটকটার কাঠামো সংক্ষেপে বলুন৷’

বাংলার স্যার উৎসাহিত হয়ে বললেন, পুরোটা শুনবেন? খাতাটা আমার কাছেই আছে৷’

‘না-না, পুরো নাটক শোনার মতো মনের অবস্থা এখন নেই৷ এখন শুধু টাকা আর টাকা৷ ইন এ নাটশেল দৃশ্যগুলো বলুন৷ সেইটাই মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান ইয়োর নাটক৷’

বাংলার স্যার শুরু করলেন, ‘অযোধ্যার রাজপ্রাসাদ৷ সিংহাসনে রাজা দশরথ৷ চারপাশ একেবারে ঝলমল-ঝলমল করছে৷’

‘কীসে ঝলমল করছে! ঝলমল করবে কেন?’

‘রাজঐশ্বর্যে ঝলমল করবে৷ অযোধ্যা ছিল গোল্ডেন সিটি৷’

‘আপনার ঐশ্বর্য কোথায়? ঝলমলটা করবেন কী দিয়ে? হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারটা হবে সিংহাসন৷ বাকি ঝলমলের পয়সা নেই৷ বরং ফুটনোটে লিখে দিন, রাজা দশরথের আর আগের অবস্থা নেই৷’

‘এই ঝলমলের ব্যাপারে আমার একটা প্ল্যান আছে, রোলেক্সের লম্বা-লম্বা রিবন চারপাশে ঝুলিয়ে দেব৷ বাতাসে দুলবে আর ঝকমক-ঝকমক করবে৷ যে-কোনওরকম একটা ঝকমক হলেই হল৷’

‘সে রোলেক্স রিবনের দাম কত?’

‘ও আপনার সামান্যই দাম৷’

‘পরে কী কাজে লাগবে?’

‘ও আর কী কাজে লাগবে! ঠিকমতো রাখতে পারলে, পরে সরস্বতী পুজোর ডেকরেশনে ব্যবহার করা যাবে৷ হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারটাকে একটু সিংহাসনের মতো করে সাজাতে হবে৷ সে আপনার ছেলেরাই করে নেবে৷ কিন্তু পেছনে একটা সিন চাই৷ একটু থামটাম, খিলান, রাজপ্রাসাদে যেমন থাকে আর কী!’

‘সিন আমি ভাড়া করতে পারব না, অনেক খরচ৷ কাগজে বড়-বড় করে লিখে পেছনে টাঙিয়ে দেবেন রাজপ্রাসাদ৷ সবাই বুঝে নেবে৷’

‘ওটা রবীন্দ্রনাটক হলে হতো৷ অ্যাবস্ট্র্যাক্ট স্টেজ৷ আমাদের এই পৌরাণিক পালায় একটু গর্জাস ব্যাপারস্যাপার দরকার৷ ঝলমলে স্টেজ, ঝলমলে পোশাক৷ পেছনে অন্তত দুটো সিন আপনি অ্যালাউ করে দিন৷ একটা রাজসভা, সেটা আমরা দশরথে লাগাব, রাবণেও লাগবে৷ আর-একটা বনের সিন৷’

‘দুটোতে হবে না, আপনার তিনটে চাই৷ একটা সমুদ্র না হলে হনুমান লাফ মারবে কোথায়!’

‘সমুদ্রটা যদি আমরা উহ্য রাখি৷ বানরসেনাদের একেবারে সোজা লঙ্কায় ল্যান্ড করিয়ে দিলুম৷ দু-চার ডায়লগের পরই যুদ্ধ৷ এক রাউন্ড কী দু-রাউন্ডের পরই রাবণবধ৷ ছেলেরা অবশ্য যুদ্ধটাকে একটু বাড়াতে চাইছে৷ আসলে ওইটাই তো মেন অ্যাট্রাকশন ওদের৷’

‘সেটা আমিও বুঝি কিন্তু বানরসেনা কি হেলিকপ্টারে ল্যান্ড করবে! একটা সিন চাই, সমুদ্র, তার ওপর দিয়ে হনুমান উড়ে যাচ্ছে, ‘তাই এয়ারওয়েজ’-এর বিমানের মতো স্টেজে তখন সমুদ্রের দিকে মুখ করে আপনার ছেলে-হনুমানেরা খড়ের লেজ খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকবে স্যার-স্যার৷ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন৷’

‘পিকচারেক্স, পিকচারেক্স৷ আপনি স্যার নাটকের লাইনে এলেন না৷ কেন?’

‘ওই যে একটাই কারণ, কম বয়েসেই মাথায় টাক পড়ে গেল৷’

‘কেন, পরচুল?’

‘অ্যালার্জি৷ পরামাত্রই ফ্যাঁচ-ফোঁচ হাঁচি৷ হাঁচব, না অভিনয় করব৷ যাক, এখন দেখা যাচ্ছে মিনিমাম তিনটে সিন লাগবে৷ না, না, না, তিনটেতে হবে না৷ চারটে লাগবে৷ লাস্ট সিন, লঙ্কা জ্বলছে৷ আকাশ লাল, দাউদাউ আগুন৷ সামনে রাবণবধ৷

হনুমানরা ধিতিংধিতিং নাচছে৷ আচ্ছা, সীতার পাতালপ্রবেশ হবে না?’

‘না, স্যার! অতদূর আর টানছি না৷ কনডেন্স করে দিচ্ছি৷’

‘কনডেন্সড মিল্কের মতো! তবে কী জানেন, পাতালপ্রবেশটা দেখাবার খুব স্কোপ ছিল৷ স্টেজের একটা পাটাতন খুলে যেত, সীতা ঝপাং করে নেমে যেত নিচে, আর সেই সময় স্টেজের তলায় রাখা ধুনুচি থেকে স্টেজের ওপরে ভলভল করে ভেসে উঠত ধোঁয়া৷ দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন৷ একটা স্কুল ড্রামায় এইরকম পাকা দৃশ্য অভূতপূর্ব!’

‘কিন্তু আমরা যে স্যার রাবণবধেই ফিনিশ করে দিচ্ছি৷ ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়৷’

‘কেন, কাহিনিটা আপনি ফ্ল্যাশব্যাকে টানতে পারেন৷ প্রথম দৃশ্যেই সীতা স্টেজের ফুটো দিয়ে তলায় পড়ে গেল৷ এইবার ধুনোর ধোঁয়ায় রামায়ণের ফ্রন্টপার্ট ভেসে উঠল৷ হেডমাস্টারমশাইয়ের চেয়ারে রাজা দশরথ৷ দশরথ, মনে করুন চোখ বুঝিয়ে ঘুমোচ্ছে৷ দূতী গাইছে, জাগো দশরথ, জাগো জাগো রামায়ণ৷ অ্যান্ড ইয়োর নাটক স্টার্টস্৷ ব্যাপারটা গতানুগতিক হল না৷ একেবারে নতুন দৃষ্টিকোণ৷’

‘আপনার প্রস্তাব আমি অবশ্যই বিবেচনা করে দেখব৷’

‘আরে মশাই, নতুন কিছু করুন, নতুন লাইনে ভাবুন৷ এটা জি টিভি, স্টার টিভির যুগ৷ আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এমন কায়দার স্টেজ করিয়ে দেব, একেবারে ফার্স্ট সিনেই মারমার-কাটকাট৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আমার মনে হয়, আজকের মিটিং এইখানেই শেষ করা ভালো কারণ অনেকক্ষণ ধরে হচ্ছে৷ সকলেরই অন্য কাজকর্ম আছে৷ আমাকে আবার মাদার ডেয়ারির দুধ আনতে হবে৷’

‘কেন বাড়িতে আর কেউ নেই৷ ছেলেরা কী করছে?’

‘বড় ছেলেটা ভাবুক৷ সে কবিতা-টবিতা লেখে৷ সংসারের কাজকর্ম তেমন ভালো লাগে না৷ ছোটটা সন্ধের সময় তবলা শিখতে যায় ওস্তাদের কাছে৷’

‘তবলা! আর কিছু শেখার পেল না!’

‘তবলার এখন খুব ফিউচার৷ একটু নাম করতে পারলেই ইউরোপ, আমেরিকা৷ ওর গুরু এ-দেশে ক’মাস থাকে!’

‘লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে?’

‘না, তা কেন! লেখাপড়া আর তবলা একসঙ্গেই চলছে৷ আজকাল তো অ্যাকাডেমিক লাইনে কোনও চাকরি নেই৷ বড় ছেলেটার তো তাই হল৷ এখন হতাশায় ভুগছে৷’

‘বেশ, আজকের মতো এই থাক৷ সামনের সপ্তাহে আবার আমরা বসব৷’

মাস্টারমশাইরা উঠে পড়লেন৷ আমাদের মধ্যে থেকে শিবাঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার! কমিটির মধ্যে আমরাও আছি৷ আমাদের কিছু দায়িত্ব দেবেন৷ আমি খুব ভালো স্টেজ সাজাতে জানি৷ আমি ওই রাজপ্রাসাদ, জঙ্গল, সমুদ্র সব করে দেব৷ শুধু দু-একটা মেটিরিয়াল কিনে দিলেই হবে৷ এই যেমন, কাগজ, থার্মোকল, আঠা৷

সহপ্রধান বললেন, ‘সে তো ভালোই৷ তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিভা আমরা কাজে লাগাব৷’

তিনদিন পরে বাংলার স্যার আমাদের নাটক কমিটির মিটিং ডাকলেন৷ নাটক লেখা শেষ৷ নাটক পড়া হবে৷ কে কোন ভূমিকা করবে, সেসব ঠিক হবে৷ স্কুল ছুটির পর আমরা হলঘরে সমবেত হলুম৷ স্যার এলেন৷ সবসময় তিনি ফিটফাট সেজে থাকেন৷ ফিনফিনে ধুতি, পাঞ্জাবি৷ শ্যাম্পুকরা ফুরফুরে চুল৷ খুব শৌখিন মানুষ৷ আমাদের খুব প্রিয় স্যার৷ বন্ধুর মতো মিশতে পারেন৷ হাসি, ঠাট্টা, মজা, সবই চলে৷ ভীষণ ভালো পড়ান৷

স্যার বললেন, ‘বুঝলি, অ্যাসিস্ট্যান্ট এইচ এম-এর আইডিয়ায় জিনিসটা মন্দ দাঁড়াল না, এখন তোদের করার ওপর নির্ভর করছে৷ প্রথম দৃশ্যে আমি একটু কায়দা করেছি৷ দেখ, রাম, রামায়ণ করতে-করতে আমরা বাল্মীকিকে প্রায় ভুলেই বসে আছি৷ সেই কারণেই আমি ফার্স্ট সিনে কবিকে টেনে এনেছি৷ এটা আমাদের কর্তব্য৷ ড্রপসিন উঠল৷ স্টেজ৷ বাঁদিকে একটা বটগাছ৷ তলায় বসে আছেন বাল্মীকি৷ ওপর থেকে তাঁর সামনে ধপাস করে পড়ল তীরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চ৷ বাল্মীকি চোখ মেলে তাকালেন, মিউজিক, সঙ্গে-সঙ্গে শ্লোক,

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং

ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ৷

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমধ

কাম মোহিতম্৷৷

এ কী! এ কী নির্গত হল আমার কণ্ঠ হইতে! দৈববাণী! ঋষি! এর নাম কবিতা৷ পৃথিবীর প্রথম কবিতা৷ তুমি আদিকবি৷ এই দৈববাণীর সঙ্গেই আমি পাঞ্চ করে দিয়েছি রবীন্দ্রসঙ্গীত৷ সুযোগ যখন পেয়েছি, ছাড়ি কেন! আর তোদের মধ্যে যখন ট্যালেন্ট রয়েছে৷ কোরাস—

প্রথম আদি তব শক্তি—

তুমি আদিকবি, কবিগুরু তুমি হে,

গানে মেন ভয়েস থাকবে মৃণালের৷ এই একটাই গান, এর পর আর গানের কোনও স্কোপ নেই৷ তোরা যে গানও গাইতে পারিস সেটা দেখাবি না! এইবার স্টেজে একটা টেকনিক্যাল ব্যাপার ঘটবে৷ ঠিকমতো জমাতে পারলে তাক লেগে যাবে৷ স্টেজের তলা থেকে ধীরে-ধীরে সীতা জেগে উঠবে৷ মুকুট, কপাল, গলা, গোটা শরীর৷ ধোঁয়ার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে সীতার উত্থান৷ সীতা বাল্মীকির সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘কবি! তুমি আমার জীবন-কাহিনি লেখো৷ দেবী! তুমি কে? আমি সীতা, আমার প্রভু, শ্রীরামচন্দ্র৷ আমার কাহিনি লেখার শক্তি তোমাকে আমি দিয়ে গেলুম৷ তুমি অতীতে চলে যাও, দূর অতীতে, অযোধ্যা নগরীতে, রাজা দশরথের রাজসভায়৷’ এই কথা বলেই সীতা আবার স্টেজের ফুটো দিয়ে নিচে নেমে যাবে৷ ভলকে-ভলকে ধোঁয়া৷ ড্রপসিন৷’

রাজা বলল, ‘স্যার! সীতাকে কেমন করে ওঠাবেন ওইভাবে?’

‘আমার সঙ্গে রাজেনবাবুর কথা হয়েছে৷ তিনি বলেছেন সীতাকে হাইড্রলিক প্রেসারে তুলে দেবেন৷’

‘সেটা কীরকম স্যার!’

‘স্টেজের মাঝখানে একটা গোল গর্ত৷ গর্তের তলায় বিশাল একটা ড্রাম৷ ড্রামের ভেতরে মাপমতো গোল একটা বারকোশ৷ সীতা ড্রামে ঢুকে সেই বারকোশে দাঁড়াবে৷ ড্রামের একেবারে তলায় একটা ফুটো৷ সেখানে পাইপ৷ এইবার জল ঢোকানো হবে৷ জলের চাপে বারকোশসমেত সীতা ওপরদিকে ঠেলে উঠবে৷ অতি সহজ বিজ্ঞান৷’

রাজা বলল, ‘স্যার, ওই বিজ্ঞানে কাজ হবে না৷ সীতার যা ওজন, ও বারকোশ-মারকোশ নিয়ে ওই ড্রামের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে৷ একটা ছোট বল হলে ওই থিয়োরি খাটত৷ আপনি বিজ্ঞানের স্যারের কথা শুনবেন না৷’

‘তা হলে সীতা পাতাল থেকে উঠবে কী করে?’

‘আমরা ঠেলে তুলে দেব৷ একটা তক্তা দুটো বাঁশে বেঁধে চারজনে মিলে চাগাড় দিয়ে তুলে দেব৷’

‘সীতা আবার পাতালে প্রবেশ করবে কীভাবে?’

‘ও ওইটার ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকবে, আমরা আবার ধীরে-ধীরে নামিয়ে নেব৷’

‘অনেক সহজ হবে, তাই না, তবে বিজ্ঞানটা বাদ গেল৷’

‘বিজ্ঞান বাদ যাক স্যার৷ গর্ত দিয়ে সীতা যদি না-ই উঠল, আমাদের নাটকটাই তো ভেস্তে যাবে৷ যে কায়দাটা বলছি, সেটাও খুব সহজ হবে না, রিহার্সাল দিতে হবে৷’

‘তা হলে প্ল্যানটা কি বাতিল করে দেব!’

‘না, স্যার, জিনিসটা করতে পারলে দারুণ জমে যাবে৷ চেষ্টা করে দেখাই যাক না৷’

‘শিবাঞ্জন, তুই একটা বটগাছ সাপ্লাই করতে পারবি তো!’

‘ওটা কোনও ব্যাপার নয় স্যার৷ পিচবোট কেটে খাড়া করে দেব৷ রংটং মাখিয়ে এমন করে দেব মনে হবে রিয়েল গাছ৷’

‘রাজপ্রাসাদের থাম কীভাবে করবি?’

‘বাহাত্তর ইঞ্চি জলের পাইপ রাস্তার ধারে বেওয়ারিশ পড়ে আছে৷ দুটো এনে দুধারে খাড়া করে দেব৷’

‘পাগল হয়েছিস, স্টেজ ভেঙে পড়ে যাবে, আর কে তুলবে অত ভারী! ওই প্ল্যানটা ছাড়৷’

‘খুব রিয়ালিস্টিক হতো৷’

‘রিয়ালিস্টিকের দরকার নেই৷ তুই ওই প্লাইউড কেটেই করে দিস৷ তবে ওই তীরবিদ্ধ ক্রৌঞ্চটা একটু ভালো করে করিস৷ যেন বেশ জীবন্ত মনে হয়৷’

‘ওটা ভাবছি স্যার একটা সাদা মুরগিকে ওপর থেকে ফেলে দেব৷’

‘মুরগি কী রে! ক্রৌঞ্চ মানে সাদা বক৷’

‘বক কোথায় পাব স্যার! কে আর বুঝবে বক কি মুরগি!’

‘কী বলছিস, বকের স্ট্রাকচার আর মুরগির স্ট্রাকচার এক হল! তুই বাবা ওটা কাপড়টাপড় জড়িয়ে করে দিস৷ বকের গলা আর ঠ্যাং চোখে পড়ার মতো৷ ও মুরগি দিয়ে হবে না৷ এখন আমি পার্টগুলো ডিস্ট্রিবিউট করে দিই৷ বাল্মীকি হব আমি৷ সুরেশ, দশরথ৷’

সুরেশ মাথা চুলকে বলল, ‘স্যার, আমার যে খুব রাম হওয়ার ইচ্ছে৷’

‘ইচ্ছে হলেই তো হবে না বাবা৷ তুমি যে একটু বেশি হৃষ্টপুষ্ট৷ তার ওপর একটা ভুঁড়ি নামিয়েছ৷ রাম হব বললেই তো হওয়া যায় না! রাম হবে রাজেন৷’

‘সুরেশ ছাড়ার পাত্র নয়৷ সুরেশ বলল, ‘দশরথ স্যার রোগা ছিলেন৷ খুবই অসুস্থ৷ পাণ্ডুর৷’

‘এই মরেছে, এ রামায়ণ-মহাভারত গুলিয়ে ফেলেছে৷ পাণ্ডুর ছিলেন পাণ্ডু রাজা৷ দশরথ ছিলেন লম্বা-চওড়া দশাসই মানুষ৷’

‘সে প্রথমদিকে ছিলেন, পরে টিবি হয়েছিল৷’

‘এসব তথ্য তুই কোথায় পেলি?’

‘আমার নিজের ধারণা স্যার৷’

‘তোমার ধারণায় তো হবে না৷ দশরথ হতে তোর আপত্তি কীসের?’

‘মাত্র একটা সিন স্যার, তিনটে মাত্র ডায়লগ, রাম, তোমার ছোট মায়ের ইচ্ছে, তুমি বনবাসে যাও৷ একটা অ্যাপিয়ারেন্স আর একটা কথার জন্য অত মেকআপ পোষাবে না স্যার, আমাকে তা হলে রাবণটা দিন৷’

‘অসম্ভব! রাবণের জন্য স্ট্রং অ্যাক্টিং চাই৷ রাবণ হবে প্রসূন৷ ওর অভিনয় আমি দেখেছি৷ খুব ভালো৷ এ-ক্লাস৷ রাবণের রোলে প্রসূন ছাড়া আর কাউকে ভাবাই যায় না৷’

প্রসূন বলল, ‘স্যার, আমাকে রাম দিলেই ভালো হয়৷ রাবণ তো শেষকালে বধই হয়ে যাবে স্যার৷ রাম আমি খুব ভালো পারব স্যার৷ পাওয়ারফুল অ্যাক্টিং৷’

‘রাম হয়ে নিজের সর্বনাশ নিজেই কেন করবি৷ রামের অ্যাক্টিংই নেই৷ কাঁধে ধনুর্বাণ নিয়ে কেবল ঘুরে বেড়ানো৷ চড়া কোনও ডায়লগই নেই৷ রাম, সীতা, লক্ষণ, সার বেঁধে স্টেজে তিনপাক ঘুরবে৷ রাম কোনওকালেই তেমন স্ট্রং ছিল না, স্রেফ স্টাইল৷ হাঁটা, চলা, তাকানো৷ ধার্মিক মানুষের কি তেমন লম্ফঝম্প থাকে! রাম বনে যাও, বনে চলে গেল৷ গোটাকতক রাক্ষস খতম করল৷ সীতা বলল সোনার হরিণ ধরে দাও৷ সোনার হরিণ হয় না জেনেও পেছন-পেছন দৌড়ল৷ সারাটা জীবন তো দৌড়েই গেল৷ আসল খেল তো রাবণের৷ সীতা হরণের সময় তুই হাসির খেল দেখাবি, মারীচের নাক-কান কেটেছিলিস ভিখারি রাম৷ এইবার খেলাটা দ্যাখ তবে৷ সারা স্টেজ সর্বক্ষণ তুই-ই দাপিয়ে বেড়াবি৷ আমি লঙ্কেশ্বর রাবণ৷’

মোটামুটি সব রোলই ঠিক হয়ে গেল৷ বানরসেনার সংখ্যা অনেক হবে৷ স্টেজ ভরে যাবে৷ তাদের মধ্যে বারোজনের লম্বা পাকানো লেজ থাকবে৷ লেজ তৈরি করবে শিবাঞ্জন৷ পেছন দিক থেকে মাথার ওপর যেন উঁচিয়ে থাকে৷ স্যার জিগ্যেস করলেন, ‘ওটা কীভাবে করবি? মাথার দিকে উলটে থাকা বাঁকা লেজ!’

শিবাঞ্জন বলল, ‘কতটা মোটা করব স্যার?’

‘সাধারণ হনুমানের লেজ যেমন হয় আর কী! একটা হনুমান দেখে নিস না!’

‘গাছের হনুমান আর রামায়ণের হনুমান কি এক হবে স্যার!’

‘মোটামুটি একই হবে৷ ওরই মধ্যে একটু মোটা করে দিবি৷ বেশি মোটা করলে ছেলেরা কোমরে রাখতে পারবে না৷ তা হলে কী কায়দাটা করবি?’

‘মোটা তার কিনে আনব? তারপর খড় জড়াব, তার ওপর লাল কাপড়৷’

‘কোমরে আটকাবে কী করে! তার একটা ব্যবস্থা রাখিস৷ টেকনিক্যাল দিকটা তোর দায়িত্ব৷ আমি কিন্তু নিশ্চিন্ত রইলুম৷ কাল থেকে আমাদের রিহার্সাল৷’

শিবাঞ্জন বলল, ‘এই টেকনিক্যাল ব্যাপারে তুই আমাকে একটু সাহায্য করিস৷ তোর কারিগরি মাথাটা খুব একটা খারাপ নয়৷ আমি কী ভেবেছি বল তো, কাগজের পিলার তৈরি করব৷ মোটা কাগজ গোল করে জড়িয়ে-জড়িয়ে, তার ওপর ময়দার লেই পরতে-পরতে৷ তার ওপর পোস্টার কালার৷ সোনালি রঙের লতাপাতা৷ কেমন হবে?’

‘হবে না৷ বাঁশের ফ্রেম ছাড়া ও-জিনিস দাঁড়াবে না৷ একটা স্ট্রাকচার চাই৷ এ তোর ধূপের প্যাকেট নয়৷’

‘তা হলে থাম আমি কী করে করব!’

‘দায়িত্ব নেওয়ার সময় মনে ছিল না! গরম কচুরি খাওয়া নেপালদার দোকানের, তা হলে বলব৷’

‘ক’টা খাবি?’

‘মিনিমাম চারটে, ম্যাক্সিমাম ছ’টা৷’

‘দাঁড়া, লক্ষ্মীর ভাঁড় ভাঙি৷ বিকেলে শিওর খাওয়াব৷’

বিকেলের দিকে নেপালদার দোকানে ফাটাপাটি ব্যাপার৷ হিংয়ের কচুরি কড়ায় ফুলছে৷ পাতলা বাদামি রং৷ পাশেই গামলাতে গোটা-গোটা মটরের ঝাল-ঝাল ঘুগনি৷ সেই কলতলা থেকেই গন্ধ পাওয়া যায়৷ শিবাঞ্জনই আমাকে এসে ডাকল, ‘তোর একটা কোনও চাড় নেই! পড়ে-পড়ে বেলা পাঁচটা অবধি ঘুমোচ্ছিস! চল, চল৷’

‘ভাঁড় ভেঙেছিস?’

‘হ্যাঁ, তিনটে নাগাদ৷ তক্বে-তক্বে ছিলুম৷ মা যেই ঘুমিয়েছে, প্যাঁচার মুন্ডু উড়িয়ে দিলুম৷’

‘কতটা বেরোল?’

‘নেহাত খারাপ নয়৷ সাতচল্লিশ টাকা ষাট পয়সা৷’

‘ভালোই জমেছে৷ তা হলে চ, কচুরির বদলে ‘খাইখাই’-তে গিয়ে ব্রেস্ট কাটলেট খাওয়া যাক৷ কাটলেটে বুদ্ধি আরও ভালো খোলে৷’

ছ’টার সময় খাইখাই খোলে৷ বনেদি ব্যাপার৷ দরজার পাশে মালিক সিল্কের পাঞ্জাবি পরে ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে আছেন৷ দুপুরের ঘুমটা ভালোই হয়েছে৷ চোখমুখ ফোলা-ফোলা৷ খুব গম্ভীর চেহারা৷ আমরা ঢুকছি, একনজরে দেখে নিয়ে বললেন, ‘সৎপথের পয়সা, না অসৎ পথের?’

শিবাঞ্জন যেন শুনতে পায়নি, বলল, ‘আজ্ঞে৷’

‘বলি, বাপের পকেট সাফ করেছ, না তাঁরা দিয়েছেন?’

শিবাঞ্জন একটু রাগের চোখে তাকিয়েছে৷ ভদ্রলোক বললেন, ‘বড়-বড় চোখে তাকালে কী হবে৷ এইরকমই আজকাল হচ্ছে৷ দেশের মরালটা তো একেবারে শেষ হয়ে গেছে৷ স্কুল, কলেজে তো আর এসব শেখানো হয় না৷ শেখানো হয়?’ ভদ্রলোক ইয়া বড়-বড় চোখে শিবাঞ্জনের দিকে তাকালেন৷

শিবাঞ্জন ছেলেটা এমনই খুব ভালো৷ সহজ, সরল৷ কোনও ওপরচালাকি, ওস্তাদি এসব নেই৷ নিভাঁজ ভালো মানুষ৷ সেই তুলনায় আমি অনেক শয়তান৷ মনে জিলিপি প্যাঁচ৷ নিজেকে খুব ওস্তাদ আর বুদ্ধিমান ভাবি৷ মাঝে-মাঝে দুঃখ হয়, আমি কেন শিবাঞ্জনের মতো হতে পারি না!

শিবাঞ্জন ভদ্রলোকের কথা শুনে কেমন যেন হয়ে গেল৷ একটু থমকে থেকে বলল, ‘আপনি যথার্থই বলেছেন৷ তবে আমরা ওসব করি না৷ যখন-তখন কাটলেটও খাই না৷ আজ লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙে সাতচল্লিশ টাকা পেয়েছি৷’

‘ভাঁড় ভরতি হয়েছিল?’

‘আজ্ঞে না৷’

‘তা হলে ভাঙলে কেন?’

‘এই যে আমার বন্ধু পলাশ, ওর কাছে থেকে বুদ্ধি কিনতে হবে বলে ভাঁড়টা ভাঙতে হল৷’

‘খুবই রহস্যময় ব্যাপার! বুদ্ধি কিনতে হবে মানে? ওকে তুমি টাকা দেবে আর ও ওর মাথার ঢাকনা খুলে তোমাকে বুদ্ধি দেবে?’

‘টাকা নয়, ওকে একজোড়া কাটলেট খাওয়ালে ও বলবে৷’

‘কী বলবে?’

‘তা হলে আপনাকে সবটা বলতে হবে৷ গোড়া থেকে৷’

‘বলো শুনি৷ খুব শুনতে ইচ্ছে করছে৷’

শিবাঞ্জন সব বলল, ‘একজোড়া কাটলেট খাওয়ালে ও আমাকে বুদ্ধিটা দেবে৷’

ভদ্রলোক বললেন, ‘অতিশয় ধুরন্ধর ছেলে৷ তোমার বুদ্ধিটা শুনি৷’

শিবাঞ্জন বলল, ‘ওকে ধুরন্ধর বলবেন না, ও ভীষণ ভালো ছেলে৷ আমার প্রাণের বন্ধু৷ ও পেটুক নয়৷ এমনই মজা করে বলেছিল৷’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ঠিক আছে৷ ধুরন্ধর বলছি না৷ বলো হে ভালো ছেলে৷’

‘আজ্ঞে ভেবেছি, চারটে ছ’ফুট লম্বা মোটা রেনওয়াটার পাইপ কিনে স্টেজে খাড়া করে দেব৷ বেশ কালো চকচকে৷’

‘বুদ্ধিটা খারাপ নয়, কিন্তু খাড়া করবে কী করে!’

‘চারটে বড় ফুলগাছের টবে মাটি দিয়ে পুঁতে দেব৷’

‘হবে না, হবে না, উলটে যাবে৷ আর-একটু ভাবো৷ বুদ্ধিটা যখন তোমার, তখন তুমিই আর-একটু খেলাও৷’ হঠাৎ ঝাঁ করে বুদ্ধিটা খেলে গেল, ‘স্যার, একটা কাজ করলে হয়৷ প্যান্ডেল তো হবেই, ওর মধ্যে বাঁশ পুরে একেবারে ওপরের আড়ার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেব৷’

‘দ্যাটস্ রাইট৷’ ভদ্রলোক ক্যাশ বাক্সের ওপর একটা চাপড় মারলেন, ‘দ্যাট্স রাইট, আমিই তোমাদের কাটলেট খাওয়াব৷ যাও, ভেতরে গিয়ে বোসো৷ একটা কথা, হরেনদার নাম শুনেছ!’

‘আজ্ঞে না৷’

‘সে কী, শ্যামপুকুরে বিখ্যাত সিন পেন্টার হরেন মিত্তিরের নাম শোনোনি৷ জমিদারের ছেলে ছিলেন৷ বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেবেলা থেকেই ফ্যামিলির বাইরে৷ নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করেছেন৷ থিয়েটার ছিল ধ্যানজ্ঞান৷ বড়-বড় অভিনেতারা তাঁর স্টুডিয়োয় এসে বসে থাকতেন৷ নতুন নাটকের সিন বলতেন৷ হরেনদা এঁকে দিতেন৷ তাকিয়ে দেখার মতো সেসব কাজ৷ এখন বৃদ্ধ হয়েছেন, আর আঁকতে পারেন না৷ তবে ভীষণ ভালো মানুষ৷ রামায়ণের কয়েকটা সিন এখনও আছে মনে হয়৷ যদি ধরতে পারো ফ্রি অফ কস্ট পেয়ে যাবে৷ হরেনদা আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়, বুঝলে তো! তবে আমার নাম কোরো না৷ আমার ওপর খুব রাগ৷ ওই যে আমি গানের লাইন ছেড়ে কাটলেটের লাইনে চলে এলুম৷ সে আবার আর-এক কাহিনি৷ পরে বলব৷ ইচ্ছে করলে একটা বই লিখতে পারবে৷ যাও, ভেতরে গিয়ে বোসো৷ অ্যায়, মেধো!’ ভদ্রলোক হাঁক পাড়লেন৷

বেশ জমিয়ে, স্যালাড দিয়ে খোলতাই দুটো কাটলেট খাওয়া হল৷ ভদ্রলোককে নমস্কার জানিয়ে রাস্তায় নেমে শিবাঞ্জন বলল, ‘চল না, হরেনবাবুর স্টুডিয়োটা খোঁজ করে যাই৷’

‘চল৷ আমার কোনও আপত্তি নেই৷’

শ্যামপুকুরে এসে একটু খোঁজ করতেই, আর্ট স্টুডিয়ো, সিন পেন্টার অব রেপুট, প্রোঃ হরেন মিত্র, ইএসটিডি—১৯৩০ পাওয়া গেল৷ সাইনবোর্ডটা অস্পষ্ট৷ স্টুডিয়োর রাস্তার দিকের দরজা বন্ধ৷ পাশের দিকের দরজা ঠেলামাত্রই খুলে গেল৷ সরু প্যাসেজ৷ দোতলার রেনওয়াটার পাইপ ঢাকা একটা নর্দমায় পড়েছে৷ আমরা ভয়ে-ভয়ে এগোচ্ছি৷ সিমেন্ট বাঁধানো পথ৷ হঠাৎ কাশির শব্দ৷ কাশতে-কাশতেই একজন প্রশ্ন করছেন, ‘কে? কাকে চাই?’

ডানপাশে ঘর৷ খোলা জানলা৷ এক বৃদ্ধ বসে আছেন৷ লম্বা-লম্বা সাদা চুল৷ দেখলেই মনে হচ্ছে শিল্পী৷ শিবাঞ্জন বলল, ‘জ্যাঠামশাই! আপনার কাছেই এসেছি৷’

‘আমার কাছে? আমার কাছে তোমাদের কী প্রয়োজন বাবা!’

‘ভেতরে যাব?’

‘এসেছ যখন, নিশ্চয়ই আসবে৷ তবে কেন আসবে সেইটাই বুঝতে পারছি না৷’

ভদ্রলোক কাশছেন৷ ঘরে কম পাওয়ারের আলো৷ চাদরপাতা চৌকি৷ তার ওপর শিল্পী বসে আছেন৷ মেঝের ওপর একটা আলবোলা৷ নলটা খাটের পাশে৷ দুটো বেতের মোড়া৷ ঘরের ডান পাশের দেওয়ালটা পুরো ঢাকা৷ সেখানে একটা সিন৷ নীল আকাশ৷ বন৷ একটা সোনালি হরিণ ছুটে পালাচ্ছে৷

শিবাঞ্জন মোড়ায় বসতে যাচ্ছিল৷ ‘মারীচ, পলাশ, মারীচ’, বলে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল৷ প্যাঁক করে একটা শব্দ৷ শিবাঞ্জন ভ্যাবাচাকা খেয়ে উঠল৷ দেখছে, শব্দটা হল কোথায়! মেঝেতে একটা পুতুল পড়েছিল৷

ভদ্রলোক বললেন, ‘ওটা আমার নাতনির৷ তোমাদের ব্যাপারটা তো বুঝতে পারছি না৷ পাগল নাকি!’

শিবাঞ্জন ছুটে এসে ভদ্রলোকের পা জড়িয়ে ধরল, ‘শিল্পী, শিল্পী, উঃ, আপনি শিল্পী!’

ভদ্রলোক বললেন, ‘দেখো, কামড়ে-টামড়ে দিয়ো না যেন৷ শান্ত হও, শান্ত হও৷’

শিবাঞ্জন কেঁদে ফেলেছে৷ আমিও সিনটা দেখছি, তবে আমার অত আবেগ আসছে না৷ আমি ঘোর বিষয়ী৷ দুর্দান্ত আঁকা৷ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ মানুষ যে কী করে এমন আঁকে!

ভদ্রলোক বলছেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার, তুমি কাঁদছ কেন?’

শিবাঞ্জন কথা বলবে কী, সে তো কেবল ফ্যাঁসফ্যাঁস করছে৷ আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে দিলুম, ‘জানেন তো, ও ভীষণ ভালো ছবি আঁকে, দুর্দান্ত ভালো ওর হাতের কাজ, তাই ও আপনার প্রতিভা দেখে আবেগ চাপতে পারছে না৷ ভাবছে, ও কেন আপনার মতো হতে পারছে না৷’

বৃদ্ধ এইবার একটু হাসসেন, ‘সে কী, এখনও এমন ছেলে এই শহরে আছে নাকি! এত সূক্ষ্ম মনের ছেলে৷ এ তো বহুদূর যাবে৷ মনে হচ্ছে জীবনে খুব বড় হবে৷ টাকাপয়সা হয়তো হবে না, তবে একটা মানুষের মতো মানুষ হবে৷ তা তোমরা এই পরিত্যক্ত বৃদ্ধের কাছে হঠাৎ এলে কী মনে করে! সন্ধানই বা পেলে কার কাছে?’

শিবাঞ্জন একটু সামলাতে পেরেছে, সে-ই বলল, ‘আমরা জুবিলি স্কুলের ছাত্র৷’

‘জুবিলি! জুবিলি ওয়াজ মাই স্কুল৷ ও কি আজকের স্কুল! ওয়ান অব দ্য বেস্ট স্কুলস ইন বেঙ্গল৷ তোমরা সেই স্কুলের ছাত্র! তার মানে, বার্ডস অব এ ফেদার৷ দেখি, ওই কৌটোটা আনো৷ অন দ্য টপ অব দ্যাট ড্রয়ার৷’

শিবাঞ্জনই এগিয়ে গেল৷ ঘরটা বেশ বড়৷ একেবারে শেষ মাথায় একটা দেরাজ৷ তার ওপর সুদৃশ্য একটা কৌটো৷ কৌটোটা এনে বৃদ্ধের হাতে দিল৷ তিনি কৌটো খুলে একমুঠো লজেন্স বের করলেন৷ কোনওটা হালকা কমলালেবু রঙের, কোনওটা পিঙ্ক, কোনওটার রং ডিপ চকোলেট৷ শিবাঞ্জনের হাতে দিয়ে বললেন, ‘ভাগ করে নাও৷’ নিজে একটা নিলেন৷

মোড়ক খুলে মুখে পুরে বললেন, ‘খুব সুন্দর, টেস্ট করে দ্যাখো, যে-কোনও দোকানে পাবে না! স্পেশ্যাল৷’

ভদ্রলোকের মুঠোয় এগারোটা লজেন্স উঠেছিল, শিবাঞ্জন পাঁচটা রেখে ছ’টা আমাকে দিল৷

ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, কী, সমান ভাগে হয়েছে?’

শিবাঞ্জন চুপ করে আছে দেখে আমি বললুম, ‘হয়নি স্যার, ও পাঁচটা রেখে ছ’টা আমাকে দিয়েছে৷’

কিছুক্ষণ শিবাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তোমার পরিচয় জানি না, কিন্তু এইটা বুঝতে পারছি, তুমি খুব ভালো বংশের ছেলে, তোমার সংস্কার খুব ভালো৷ তুমি জীবনে অনেক বড় হতে পারবে৷ তোমার ভেতর ক্ষুদ্রতা নেই৷ আচ্ছা বলো তো, কেন তোমরা এসেছ?’

শিবাঞ্জনই বলল, ‘আমাদের স্কুলের ফাংশান৷ আমরা থিয়েটার করছি রাবণবধ৷ আমাদের তো তেমন পয়সা নেই, তাই স্টেজটা ঠিকমতো করতে পারছি না৷ আপনার কাছে আগের আঁকা কিছু সিন থাকতে পারে ভেবে এসেছি৷ যদি আপনি অনুগ্রহ করে দেন!’

‘রাবণবধ! তা হ্যাঁ রামায়ণের কিছু সিন তো আমার গোডাউনে থাকার কথা৷ তেমন যত্নে নেই৷ হয়তো ধুলো পড়েছে৷ ইঁদুরে একটু কাটতেকুটতেও পারে৷ তা হলেও তোমাদের কাজ চলে যাবে৷’

শিবাঞ্জন প্রায় লাফিয়ে ওঠে আর কী, ‘অযোধ্যার রাজপ্রাসাদ আছে?’

‘থাকার তো কথা! সেবার খুব যত্ন করেই এঁকেছিলুম৷’

‘অরণ্য?’

‘অরণ্য তো থাকবেই৷ চিত্রকূট পাহাড়৷’

‘সমুদ্র? হনুমান মেরেছে লাফ৷’

‘সমুদ্র আছে৷ হনুমান তো নেই৷’

‘ঠিক আছে, হনুমান ছাড়াই হবে৷ লঙ্কা আছে?’

‘অবশ্যই আছে৷ লঙ্কায় অগ্ণিকাণ্ড আছে৷’

যতই শুনছে, শিবাঞ্জন যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে৷ জিগ্যেস করল, ‘অরণ্যে সীতার কুটির৷ রাবণ যেখান থেকে ধরেছিল?’

‘সেটা না থাকলে রামায়ণের থাকলটা কী? ওইটাই তো রামায়ণের কেন্দ্রবিন্দু৷’

শিবাঞ্জনের আবেগ এসেছে, আবার চোখ ছলছলে৷ কথা আটকে গেছে৷

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘কীভাবে পাব?’

‘দ্যাখো বাবা, আমি অথর্ব৷ এক-পাও হাঁটতে পারি না৷ আগামীকাল বহরমপুর থেকে আমার ম্যানেজার গুপি আসবে৷ গুপি তোমাদের নিয়ে যাবে গ্রে স্ট্রিটের গোডাউনে৷ তোমরা সেইখান থেকে তোমাদের লোক দিয়ে বের করে নেবে৷ প্রথমে নরম বুরুশ দিয়ে আগাপাশতলা ঝাড়বে৷ যদি দ্যাখো, খুব ময়লা হয়েছে, তা হলে সাবানজলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে একটু মুছে নেবে৷ তোমাদের একটু খাটতে হবে৷ পারবে তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা খুব-খাটতে পারি৷’

‘ভেরি গুড, তা হলে এসো৷ এইবার আমি শুয়ে পড়ব৷ বয়েস হয়েছে তো সন্ধের মুখেই ঘুমটা ধরতে না পারলে, ট্রেন বেরিয়ে যাবে, আমি সারারাত প্ল্যাটফর্মেই পড়ে থাকব একা৷’

আমরা নমস্কার করে বেরিয়ে এলুম৷ শিবাঞ্জন নাচছে৷ ‘দেখেছিস, ভগবান আছেন৷ যা চাইছি তাই পেয়ে যাচ্ছি সঙ্গে-সঙ্গে৷ চল খাইখাই-এর ভদ্রলোককে বলে আসি৷ ভাগ্যিস তুই কচুরির বদলে কাটলেট খেতে চাইলি৷ এখনও কত ভালো লোক বেঁচে আছেন বল?’

‘আগের মানুষরা বেশিরভাগই ভালো৷’

খাইখাই-তে তখন রাতের ভিড় লেগে গেছে৷ দপাদ্দপ কাটলেট উড়ে যাচ্ছে৷ স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা আহত মানুষের মতো লম্বা-লম্বা ফিসফ্রাই প্লেটে চেপে রান্নাঘর থেকে সোজা চলে যাচ্ছে খদ্দেরদের টেবিলে৷ বয়রা সব মাকুর মতো ছোটাছুটি করছে৷ নামতা পড়ার মতো একঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছে, তিন নম্বরে ফিশফ্রাই, একটা ডবল হাফ৷ পাঁচ নম্বরে, একটা কবিরাজি৷

ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন, ‘কী হল আবার?’

শিবাঞ্জন বলল, ‘আপনার কথায় খুব কাজ হয়েছে৷ সেই কথাটাই জানাতে এলুম৷’

‘হবেই তো, হবেই তো! একেবারে দিলদরিয়া মানুষ৷ তা, তোমাদের লেখাপড়া নেই, এখনও বাইরে-বাইরে ঘুরছ?’

‘না, আমাদের তো পরীক্ষা হয়ে গেছে৷’

‘হয়ে গেলেও, তোমাদের বয়সে সন্ধের পর বাইরে থাকা উচিত নয়৷ পড়ার বই ছাড়াও অন্য অনেক বই আছে, যা তোমরা এই সময় পড়ে ফেলতে পারো৷ এই সময়টাকে কাজে লাগাও৷ পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি কী বলো তো? সময়৷ আমরা সেই কোন ছেলেবেলায় পড়েছিলুম, টাইম অ্যান্ড টাইড ওয়েট ফর নান৷’

আমরা দোকান থেকে বেরিয়ে এলুম৷ শিবাঞ্জন বলল, ‘কথাটা উনি ঠিকই বলেছেন৷ আমরা এখনও অতটা বড় হইনি যে, রাত আটটা পর্যন্ত রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরব৷ দেখেছিস পলাশ, সব ভালো মানুষের মধ্যেই একজন করে শিক্ষক বসে আছেন৷ চল, বাংলার স্যারকে সুখবরটা দিয়েই আমরা বাড়ি চলে যাই৷’

স্যার তাঁর বাড়ির সামনের রকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে পায়চারি করছিলেন৷ আমাদের দেখে বললেন, ‘কী! তোমরা দুটোতে এত রাতে!’

‘আপনি স্যার এখানে ঘোরাঘুরি করছেন?’

‘কী করব বলো, দরজায় তালা দিয়ে আমার স্ত্রী চলে গেছেন৷ এই একঘণ্টায় আমার প্রায় চার মাইল হাঁটা হয়ে গেল৷ তোমাদের কী খবর বলো!’

‘একটা ভীষণ সুখবর এনেছি স্যার৷ আমরা প্রায় সমস্ত দৃশ্যের সিন পেয়ে গেছি৷’

‘সে কী! আঁকা সিন?’

‘হ্যাঁ স্যার, আঁকা সিন৷ অসাধারণ সুন্দর৷’

শিবাঞ্জন পুরো অভিযানের একটা বর্ণনা দিল৷ স্যার একবার এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছেন, আমরাও যাচ্ছি পেছনে-পেছনে৷ তিনি ওপাশ থেকে এপাশে আসছেন, আমরাও আসছি৷ অনেকটা লেজের মতো৷ সব শুনে তিনি বললেন, ‘পৃথিবীর সমস্ত আবিষ্কারই প্রায় অ্যাক্সিডেন্ট! তোমার ওই এক্সরেই বলো আর পেনিসিলিনই বলো৷’ পলাশ বলল, ‘খাওয়াতে হবে৷ কী খাওয়াতে হবে, না কচুরি৷ হঠাৎ মতের পরিবর্তন—কাটলেট খাব৷ সেই কাটলেট থেকে এই আবিষ্কার৷ এর নাম লাক৷’

‘কালই তোমরা সিনগুলো এনে স্কুলের হলঘরে ডাম্প করে ফ্যালো৷ শুভস্য শীঘ্রম, অশুভস্য কাল হরণম্৷ একদম দেরি কোরো না৷’

স্যারের স্ত্রী চটির ফটাস-ফটাস শব্দ তুলে এলেন৷ হাতে একটা বাজারের থলে৷ তাঁকে দেখেই স্যার আমাদের বললেন, ‘তোমরা যাও৷ আমার রক্ত চড়ছে৷ এখন ধুম ঝগড়া হবে৷ তোমাদের না শোনাই ভালো৷’

আমরা লাফিয়ে রাস্তায়৷ শুনতে পেলুম তিনি চিৎকার করে বলছেন, ‘এতক্ষণ ছিলে কোথায়?’

ঠিক সেইরকম জোরেই উত্তর, ‘যমের বাড়ি৷’

শিবাঞ্জন আপন মনে বলল, ‘ঠিকই করে ফেলেছি, জীবনে বিয়ে করব না৷ বিয়ে মানেই অশান্তি৷’

‘ঠিক বলেছিস! আমি তো ঠিক করেছি, সারাজীবন ছাত্রই থাকব৷’

‘মানে কী, প্রত্যেক বছর ফেল করবি!’

‘তা কেন, একের পর এক পাশ করে যাব, এম এ, এল এল বি, ডি লিট, ডি ফিল, আবার এম এ৷ চালিয়েই যাব, চালিয়েই যাব৷’

‘আমি পেন্টার হব৷ ছবির পর ছবি এঁকে যাব৷’

‘টাকা?’

‘ও ম্যানেজ হয়ে যাবে৷ খুব কম খাব৷ খাটিয়াতে শোব৷ পায়ে হেঁটে সবজায়গায় ঘুরব৷ একটা-দুটো ছবি নিশ্চয় বিক্রি হবে৷ খুব কষ্ট করব৷ কষ্ট করলে মানুষ খাঁটি হয়৷ দেখবি সব পশুর মধ্যে বলদ আর গাধাই সৎ৷’

‘কেন, কুকুর?’

‘নিজেদের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া করে৷’

‘ঘোড়া?’

‘ঘোড়ার খুব ডাঁট৷ অহঙ্কারী৷ বড়লোকেরা পিঠে চাপে তো৷’

‘পাখি?’

‘অমিশুক৷ মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না৷ উড়ে পালায়৷’

‘মাছ?’

‘মানুষের মনে লোভ জাগায়৷’

শিবাঞ্জন আর আমি এক পাড়ায় থাকি৷ শিবাঞ্জনের বাড়ির একতলায় একঘর ভাড়াটে আছে৷ ভদ্রলোক পোস্টাপিসে চাকরি করেন৷ অবসর পেলেই তাঁর কাজ হল শিবাঞ্জনদের সঙ্গে ঝগড়া করা৷ সকাল, বিকেল, সন্ধে—সবসময় ঝগড়া৷ শুনতে পাচ্ছি, আজও হচ্ছে৷

শিবাঞ্জন থেমে পড়ল, ‘বাড়ি যাব কি না ভাবছি রে পলাশ!’

‘এখন আর কোথায় যাবি এত রাতে বাড়ি ছাড়া!’

‘যতক্ষণ না ঘুমোচ্ছে ততক্ষণই তো চালাবে৷’

‘তোরা চুপ করে গেলেই তো পারিস৷’

‘মা শুনবে না, সমানে চালিয়ে যাবে৷’

‘কী নিয়ে হয়?’

‘কোনও ঠিক নেই, যা হয় একটা কিছু বেধে গেলেই হল৷ কাল হচ্ছিল আরশোলা নিয়ে৷ দোতলার আরশোলা কেন একতলায় নেমেছে?’

‘তা তোরা কী করবি?’

‘আমরা কেন আরশোলা কােল করছি না!’

আমাদের বাড়িতে এই সময় একটা কাণ্ড হয়৷ সেটা হল দিদির গলা সাধা৷ উচ্চাঙ্গ শিখছে৷ তানের ঠেলায় পাড়া কাঁপছে৷ সবাই বলে মারাত্মক গলা৷ আমার ভেতরটা কেমন যেন অস্থির-অস্থির করে৷ গলগল করে তান বেরোচ্ছে৷ সে আর থামে না৷ আমিও বাড়ি ঢুকব কি না ভাবছি৷ শেষে দুজনেই ঢুকলুম৷

এই সময় আরও একটা কাণ্ড হয় আমাদের পাড়ায়৷ সেটা হল আমতলায় যে বস্তি আছে, সেইখানকার একটা ছেলে বলা নেই কওয়া নেই, অকারণে দুমদাম করে পটকা ফাটাতে থাকে৷ তার বাবা নাকি বাজির কারখানায় কাজ করেন৷ সেই পটকার আওয়াজও শুরু হয়ে গেল৷ আমার মাঝে-মাঝে মনে হয় আমার দিদিটাকে হারমোনিয়াম সমেত শিবাঞ্জনদের বাড়ির দোতলার দক্ষিণের ঘরে বসিয়ে দিয়ে এলে হয়৷ ওদিকে ঝগড়া, এদিকে তেড়ে-তোড়ে মাপা, ধাপা, গামা, মাগা৷ হয়তো একদিন তাই হবে, কারণ যা শুনছি তাতে মনে হচ্ছে, শিবাঞ্জনের দাদার সঙ্গে আমার দিদির বিয়ে হবে৷ দুজনের নাকি খুব ভাব হয়েছে৷ মা গয়না-টয়না সব গড়াতে শুরু করেছে৷ বাবা বলে, শিবাঞ্জনের দাদা নীলাঞ্জন ফার্স্টক্লাস ছেলে, জেম অব এ বয়৷ অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো পেয়ে এসেছে সব পরীক্ষায়৷ আমি বিয়ে-টিয়ে বুঝি না৷ আমি বুঝি খাওয়া৷ ফিশ ফ্রাই, ফিশ রোল, মাটন চাঁপ৷ ঘুরব, ফিরব, গপাগপ খাব৷ দিদি ভাইফোঁটায় আমাকে জামা-প্যান্ট দেবে৷’

আমাদের স্কুলের নিউ হলে আজ নাটকের মহলা৷

বাংলার স্যার নির্মলবাবু মাঝখানে বসেছেন স্ক্রিপ্ট হাতে৷ হাতে পেন্সিল৷ কোন-কোন জায়গায় এফেক্ট মিউজিক ঢুকবে, সেইসব ঠিক করবেন৷ চরিত্রদের প্রবেশ, প্রস্থান৷ ছেলেদের আর আসল নামে এখন ডাকছেন না৷ বলছেন, ‘রাম কই, রাবণ কোথায়, সীতাকে কান ধরে মাঠ থেকে টেনে আন৷

জাম্বুবানের ঠান্ডা লেগে তিনটেই একসঙ্গে হয়েছে৷ সর্দি, কাশি, জ্বর৷ একটা খদ্দরের চাদর মুড়ি দিয়ে কোণে বসে ক্রমান্বয়ে কেশে চলেছে৷

স্যার বলছেন, ‘মানুষমাত্রেরই কাশি হয়, কিন্তু সে-কাশিতে একটা কমা, ফুলস্টপ থাকে৷ এইরকম ননস্টপ কাশি কম দেখেছি৷ এত ইরিটেশান হচ্ছে, মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছে, রাবণবধের বদলে হনুমানবধ করে ফেলি৷’

রাবণ বলল, ‘স্যার, হবে না কেন কাশি! কাল দুপুরে আমাদের ছাতে বসে তেঁতুলের আচার খেয়েছে৷’

‘তেঁতুল!’ স্যার আঁতকে উঠলেন, ‘একে রোদে রক্ষে নেই তার ওপর তেঁতুল৷ তেঁতুল এল কোথা থেকে?’

রাবণ বলল, ‘মা বাসন মাজার জন্যে আনিয়েছিল, ও দুপুরে এল৷ রোজই আসে৷ মা ওকে খুব খাতির করে তো!’

স্যার খুব রেগে গেলেন, ‘আই ওয়ার্ন ইউ৷ টেলিভিশনের ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহার করবে না৷’

রাবণ বলল, ‘টেলিভিশন নয় স্যার৷ আমরা তো ইউ পি-তে ছিলুম, তাই কিছু হিন্দি ঢুকেছে৷’

জাম্বুবান কাশতে-কাশতে বলল, ‘স্যার, আমি জানতুম না, তেঁতুলের সন্ধানটা ও-ই দিয়েছিল, বললে, মা ঘুমোচ্ছে৷ চল এই ফাঁকে তেঁতুলটা সাবাড় করি৷’

রাবণ বললে, ‘স্যার, তেল, লঙ্কা আর চিনি দিয়ে জিনিসটা ও-ই তৈরি করেছিল৷ আমাকে একটুখানি দিয়ে সবটা নিজেই সাবড়ে দিল৷’

‘এটা তোর চক্রান্ত৷ তুই আগেই রামকে উইক করে দিতে চাইছিস৷ হনুমান অসুস্থ হলে তোরই তো পোয়াবারো৷’

রাবণ হতাশ হয়ে বলল, ‘রামায়ণ তো আগেই লেখা হয়ে গেছে স্যার, আমি যাই করি না কেন, আমাকে মরতেই হবে, নতুন রামায়ণ তো লেখা হবে না৷’

স্যার আর-এক প্রস্থ রেখে গিয়ে বললেন, ‘জাম্বুবানকে ঘর থেকে বের করে দাও৷ কেশো হনুমান আমি চাই না৷ বাড়িতে গিয়ে নুনজলের গার্গল কর৷ থ্রোট পেন্ট লাগা৷ তেঁতুলের আচারে যার লোভ, সে কোনওদিন পারফেক্ট হনুমান হতে পারে না৷ ইম্পসিবল্৷ রামায়ণে এমন কোনও দৃষ্টান্ত নেই৷’

জাম্বুবান কাশতে-কাশতে নিজেই দরজার দিকে এগোচ্ছে, স্যার একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘কালকের মধ্যে তোর কাশি না সারলে হনুমানের লিস্ট থেকে তোর নাম কাটা যাবে৷’

জাম্বুবান মনের দুঃখে বেরিয়ে গেল৷ স্যার এইবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি এ-ক’দিন একটু সংযমে থাকতে না পারো, আমি নাটক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব৷’

আমরা সবাই সমস্বরে বললুম, ‘ইয়েস স্যার৷’

‘খুব লাইট ঝোল-ভাত খাবে৷ ঝোলে গাঁদালপাতা দিতে বলবে৷ যখন-তখন চান করবে না৷ দই, টক খাবে না৷ চানাচুর, ফুচকা ছোঁবে না৷ রাত দশটার মধ্যে শুয়ে পড়বে৷’

‘ইয়েস স্যার৷’

‘আচ্ছা, এইবার সব হনুমান একপাশে ফল-ইন করো৷’

বারোটা হনুমান একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল৷

‘তোমাদের আমি সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করাব৷ সামরিক বাহিনীতে যদি ডিসিপ্লিনের অভাব হয় যুদ্ধ জয় করা অসম্ভব! আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে৷ রামের সামনে তোমরা যখন প্রথম আসবে, তখন তোমরা হাতজোড় করে রামের বন্দনা গাইবে৷ তখন তোমাদের লেজ মাটির দিকে নিচু হয়ে থাকবে৷ পয়েন্টিং ডাউনওয়ার্ডস৷’

শিবাঞ্জন বলল, ‘সেটা কী করে হবে স্যার৷ লেজগুলো তো ওদের ওরিজিন্যাল নয়৷ আমি তো সব মাথা-ওঁচানো লেজ করছি৷’

‘সে আমি জানি না৷ করতেই হবে৷ ভগবান মাথা দিয়েছেন, মাথা খাটাও৷’

হনুমানরা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, মানুষরা বসে-বসে মাথা খাটাতে লাগল৷ শিবাঞ্জন বলতে গিয়েছিল, ‘স্যার একমাত্র বেড়ালের লেজ আপ অ্যান্ড ডাউন করে৷’ এক দাবড়ানি, ‘তোর কোনও অবজারভেশন নেই৷ মানুষ হয়ে হনুমানের মর্ম বুঝবি কী! হনুমানের লেজ যেমন লতিয়ে থাকে, সেইরকম খাড়া হয়ে মাথার দিকেও উঠে যায়৷ হ্যান্ডপাম্পের হাতলের মতো৷ একশো আশি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের যে-কোনও অ্যাঙ্গেলেও ওঠানামা করে৷’

শেষে একজন হনুমানের মাথা থেকেই বুদ্ধিটা বেরোল৷

‘স্যার হবে৷’

‘কী হবে?’

‘লেজ অধোমুখ হবে৷ আমরা প্রথমে লেজটা ঘুরিয়ে পরব৷ বাঁকা দিকটা মাটির দিকে ফেরানো থাকবে৷ পরে সেইটা ঘুরে যাবে মাথার দিকে, পরার কায়দায়৷’

স্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘আঃ দেখেছ, ঠিক বের করে ফেলেছে সমাধান৷ এই না হলে হনুমান৷ আচ্ছা, আমরা তা হলে বন্দনাটা ঝালিয়ে নিই৷ সুর করে আমার সঙ্গে বলো, হাতজোড় করে—

ভজে বিশেষসুন্দরং সমস্তপাপখণ্ডনম্‌৷

স্বভক্তচিত্তরঞ্জনং সদৈব রামমদ্বয়ম্৷৷

জটাকলাপশোভিতং সমস্তপাপনাশকম্৷

স্বভক্তভীতিভঞ্জনং ভজে হ রামমদ্বয়ম্৷৷

এই দুটো স্তবক আগে হোক৷ হনুমানদের মধ্যে কে একজন ‘স স’ করছে৷ হনুমানের স-এর দোষ থাকে না৷ স-এর উচ্চারণ ঠিকমতো করো, নয়তো নাম কেটে দেব৷ সুর যেন ঠিক থাকে৷ সুরট মল্লার৷ আবার বলো, রিপিট, ভজে বিশেষসুন্দরং৷ আবার বলছি, বিশেস নয়, বিশেষ, বিশেষ৷ সমস্তপাপখণ্ডনম্‌৷ সমস্ত নয়, স স, সমস্ত, সমস্ত৷ কে একজন গাঁক-গাঁক করে গাধার মতো চেল্লাচ্ছ৷ মনে রাখো, হনুমান স্তোত্রপাঠ করছে৷ গাধা নয়৷ হনুমানের দলে গাধার কোনও স্থান নেই৷’

সে এক হিমশিম অবস্থা! একটাও সুরেলা হনুমান নেই৷ যাই হোক, হনুমানদের প্যারেড শুরু হল৷ লেফ্ট রাইট, রাম সীতা, রাম সীতা, অ্যাবাউট টার্ন৷ হল্ট৷ স্ট্যান্ড অ্যাট ইজ৷ আবার লেফ্ট রাইট৷

শিবাঞ্জন হঠাৎ বলে উঠল, ‘প্যারেড হবে না স্যার৷’

‘কেন? কেন হবে না৷ হওয়ালেই হবে৷’

‘তা হলে সব হনুমানকে বেঁড়ে হতে হবে৷ লেজ থাকলে চলবে না৷ এক-একটা হনুমানের পেছনে মিনিমাম দু-থেকে তিন ফুট ক্লিয়ারেন্স রাখতে হবে লেজের বাঁকের জন্যে৷ সেটা কি সম্ভব হবে!’

স্যার একটু চিন্তায় পড়লেন৷ শিবাঞ্জন ধরেছে ঠিক৷ আবার এক সমস্যা৷

স্যার বললেন, ‘ঠিক বলেছিস! আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়?’

‘কী কাজ স্যার?’

‘সাঁওতালি নৃত্যের মতো, হনুমানরা সার বেঁধে সামনে এগিয়ে যাবে, মাথা নিচু করে আবার পেছিয়ে আসবে৷ মাথা যখন নিচু করবে, মাথার ওপরে লেজটা নেচে উঠবে৷ কী বলিস, আইডিয়াটা কেমন?’

শিবাঞ্জন বলল, ‘খুব ভালো৷ পিকচারেস্ক৷’

‘তা হলে সেইভাবেই হোক৷ হনুমানস্‌ গেট রেডি৷ সামনে এগোও, মাথা নিচু, পেছিয়ে এসো৷ মাথা তোলো, আবার এগোও৷ মাথা নিচু, মাথা নিচু৷ পেছোও৷’

এই চলল বেশ কিছুক্ষণ৷ হনুমানরা ঘর্মাক্ত৷

স্যার বললেন, ‘এইবার বিশ্রাম তোমাদের, এইবার আমি মেন ক্যারেক্টারদের নিয়ে পড়ি৷ রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, রাবণ এগিয়ে এসো৷’

রিহার্সালের পরেই স্কুলের মাঠে সীতার সঙ্গে রাবণের এক হাত খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেল৷ রাবণ তিন-চারদিন ধরেই সীতার সঙ্গে ঠুসঠাস চালাচ্ছিল, ‘তোকে আমি হরণ করব৷ আমার অশোক কাননে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখব৷ রামকে মেরে তোকে শিক্ষা দেব৷ সীতা দেবী তোকে কে রক্ষা করবে৷ ম্যায় হুঁ, ম্যায় হুঁ, ম্যায় হুঁ রাবণ৷’ মাঝে-মাঝে মাথায় গাঁট্টা-টাট্টাও মারছিল৷ রিহার্সালের পর মাঠে নেমে, যেই ‘সীতা দেবী’ বলে হাত ধরেছে অমনই সীতা দেবী সোজা ঝেড়ে দিয়েছে এক ঘুসি রাবণের চোয়ালে৷ সীতা মারামারিতে ওস্তাদ৷ হালকা শরীর৷ কিছুদিন ক্যারাটে শিখেছিল৷ রাবণটা গোদা৷ নড়তেচড়তেই পারে না৷ সীতা পাকা বক্সারের কায়দায় ঝড়াঝন এক রাউন্ড ঘুসি ঝেড়ে দিল৷ প্রায় দশ-বারোটা৷ রাবণের ঠোঁট কেটে গেছে৷ আমরা সবাই মিলে ছাড়িয়ে দিলুম৷

শিবাঞ্জন বলল, ‘এই সীতাকে রাবণ হরণ করবে কী করে! এ-ই তো রাবণকে হরণ করে নিয়ে যাবে৷ এ তো ইচ্ছে করলে রামকেও ফ্ল্যাট করে দিতে পারে৷’

আমাদের সীতার অনেক গুণ৷ লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো৷ ভালো ফুটবলার৷ ফরওয়ার্ডে খেলে৷ বিদ্যুৎগতিতে লেফট্ উইং দিয়ে ছোটে৷ ফাঁক পেলেই জোর শটে বল জড়িয়ে দেয় নেটে৷ সীতা আমাদের স্কুল টিমের নাম্বার ওয়ান স্কোয়ার৷ সেই সীতাকে রাবণ গেছে খোঁচাতে৷ বাল্মীকির ব্যাকিং না থাকলে পারবে সীতা হরণ করতে! রাবণ সেই কথাটা বুঝে কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলে সোজা বাড়ি চলে গেল৷

রাম আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়৷ সে শুধু লেখাপড়া নিয়েই থাকে৷ চোখ দুটো বড়-বড়৷ বেশ লম্বা৷ সাতেও থাকে না, পাঁচেও থাকে না৷ ঠাকুরদা নামকরা পণ্ডিত৷ বয়স প্রায় নব্বই৷ টকটকে ফরসা, ঋজু চেহারা৷ এখনও সোজা হাঁটেন৷ নিজে রান্না করে খান৷ কেউ তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না৷ রামের মধ্যেও সেইরকম একটা সাত্ত্বিক, তেজী ভাব৷ ভীষণ সিরিয়াস৷ এই রামের ওই সীতা, ভাবাই যায় না! স্যারের যেমন নির্বাচন!

শিবাঞ্জন বলল, ‘দেখবি, এই হয়ে রইল৷ অভিনয়ের যে কী হবে কে জানে!’

পরের দিন সকালে হেডস্যার আর অ্যাসিস্ট্যান্ট স্যার প্যান্ডেল, স্টেজ আর তোরণ নিয়ে পড়লেন৷ ‘তোরণ ইজ এ মাস্ট হোয়েন রাজ্যপাল ইজ কামিং৷’ এই কথাটা সহপ্রধান পানঠাসা মুখে বারেবারেই বলতে লাগলেন৷ আর হেডস্যার কেবলই বলছেন, ‘পিকটা ফেলে আসুন না৷ এনি মোমেন্ট ওভারফ্লো করবে৷’ বাংলার স্যার একটা নকশা হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন৷ চক দিয়ে লিখছেন, অশ্বত্থগাছ, সীতার পাতাল প্রবেশের স্পট৷ হনুমান ব্যালকনি৷ দশরথের চেয়ার৷

এইসব হচ্ছে দেখে আমি আর শিবাঞ্জন গেলুম সিন আনতে৷ হরেনদা স্নান সেরেছেন৷ বাবরিচুল বেশ পাটে-পাটে আঁচড়ানো৷ খাটে বসে আছেন হাতজোড় করে৷ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির সামনে ধূপ জ্বলছে৷ সুন্দর, মিষ্টি গন্ধ৷ আমরা দুজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি৷ তিনি ধ্যান করছেন৷ নিথর শরীর৷ একসময় চোখ খুললেন৷ চোখ দুটো যেন সমুদ্রে স্নান করে উঠল৷ ঠাকুরের ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমাদের দিকে তাকালেন৷ চিনতে পেরেছেন, ‘অ, তোমরা এসেছ! বেশ করেছ৷ বোসো৷ আমি গুপেকে ডাকি৷’

হাতের কাছে একটা পেতলের ঘণ্টা৷ তিনবার নাড়লেন৷

একটা ঝড় এসে ঢুকল ঘরে৷ পরদা ফেঁড়ে ঘরে একজন এলেন৷ পালোয়ানের মতো চেহারা৷ পরনে গামছা৷ গোটা শরীর তেলে চপচপ করছে৷ হরেনবাবু অবাক, ‘এ কী, তেল মেখে কী হচ্ছে?’

‘তেলটা মাখতে বাধ্য হলুম৷ এখন আমার তেল মাখার কথা নয়৷ আমি তেল মাখব আরও এক ঘণ্টা পরে৷’

‘তা হলে মাখলে কেন?’

‘মাখতে বাধ্য হলুম৷ টিন থেকে তেল ঢালতে গেলুম শিশিতে৷ ধার কাটল না, পড়ে গেল মেঝেতে৷ অতটা তেল নষ্ট হবে, তাই মেখেই নিলুম৷’

‘কতটা ফেললে?’

‘তা পোয়াটাক৷’

‘সরষের তেলের দাম জানো?’

‘জানি বলেই তো কষ্ট করে মাখতে হল৷’

‘সেই ছেলে দুটি এসেছে, যাও গোডাউনে নিয়ে যাও৷’

‘এখন এই অবস্থায় যাব কী করে! চান করব৷ চান করলেই খিদে পারে৷ ভাত খাব৷ ভাত খেলেই ঘুম পাবে৷ ঘণ্টা দুয়েক ঘুমোব৷ উঠতে-উঠতে বিকেল৷ তার মানে আজ আর হল না৷ সেই কাল৷’

শিবাঞ্জন প্রায় কেঁদে ফেলে আর কী, ‘কাল হলে হবে না স্যার৷ সর্বনাশ হয়ে যাবে৷’

হরেনবাবু আশ্বস্ত করলেন, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, উতলা হওয়ার কিছু নেই৷ লোকটার স্বভাবই এইরকম৷ সব কাজেই প্রথমে না করবে, তারপরে তেল-টেল মাখালে হ্যাঁ হবে৷ জাত বাঙালি৷’

হরেনবাবু গলাটা নরম করে বললেন, ‘হ্যাঁ রে সত্যিই হবে না! ছেলে দুটো এত আশা নিয়ে এল৷ ধর তোকে যদি একটা কিছু উপহার দিই, তা হলে!’

‘সেটা আমাকে তা হলে বিচার-বিবেচনা করে দেখতে হবে, কী উপহার, কেমন উপহার৷’

‘ধর এক কেজি ভালো রাবড়ি, মোহনের দোকানের৷’

‘তা হলে ঝাঁ করে আমি দু-বালতি, বালতি তিনেকও হতে পারে, জল ঢেলে আসি৷ টাকাটা অ্যাডভান্স হবে কি?’

‘কথা ইজ কথা৷ হাতি কা দাঁত, মরদ কা বাত৷’

হরেনবাবু বললেন, ‘ও আসতে-আসতে তোমাদের একটা স্কেচ করে ফেলি৷ তোমরা বোসো যেমন বসে আছ৷ বুঝলে, আর্টিস্টের হাত সবসময় চালু রাখতে হয়, ফেলে রাখলেই জং ধরে যায়৷ আর স্কেচ তুমি যত স্পিডে করতে পারবে, ততই লাইন ভালো আসবে, ফ্লোয়িং লাইনস৷ এইট বি পেনসিল, মোটা কাগজ৷’

আমরা বসে আছি, হরেনবাবু ঘচঘচ পেনসিল চালাচ্ছেন৷ দশ মিনিটও লাগল না৷ আমরা কাগজে ধরা পড়ে গেলুম৷ শিবাঞ্জন খাটের ধারে উঠে গেছে৷ এইসব দেখলে তার খুব উত্তেজনা হয়৷ পাগলের মতো হয়ে যায়৷ জিগ্যেস করছে, ‘আগে কোন দিকটা ধরলেন?’

‘আগে-পরে নেই৷ সবটাই একসঙ্গে৷ তুমি যখন সমুদ্র দ্যাখো, তখন কীভাবে দ্যাখো?’

‘ঢেউ দেখি, একের পর এক৷’

‘নো, শুধু ঢেউ দ্যাখো না, তুমি প্রথমে দ্যাখো নীল আসমান, জমিন, সব নীলে নীল, সেইখানে দ্যাখো একের পর এক ঢেউ আর সাদা ফেনা৷ আর দ্যাখো হলুদ বালি৷ এইবার ওইখানে যদি কিছু লোক, ধরো জলে কি সৈকতে বসে আছে, তুমি আর্টিস্ট, তুমি কোনটা দেখবে৷ তোমাকে সবটা একসঙ্গে দেখতে হবে৷ খুব ভালো শিল্পী সমুদ্রের ফনফনে বাতাসটাও দেখবে৷ বাতাস তো দেখা যায় না, অনুভব করা যায়, বাতাসের অ্যাকশান দেখা যায়, চুলে, পোশাকে, ছিটিয়ে পড়া ঢেউয়ের ফেনায়৷ আর ঢেউই তো বাতাস৷ বড় ঢেউ, ছোট ঢেউ, রিপলস৷ একেই বলে সমগ্র দর্শন৷ সাধকেরও ওই এক কথা৷ স্রষ্টা আর সৃষ্টিকে এক করে দ্যাখো৷ যা নুড়ি, তাই পাথর, তা-ই পর্বত৷’

হরেনবাবু শিবাঞ্জনের দিকে তাকিয়ে হাসছেন৷ গুপিবাবু একেবারে ফিটফাট হয়ে ঘরে এলেন৷ হরেনবাবু বললেন, ‘আবার সেই তেলটা মাথায় মেখেছিস গুপি৷ আমাকে এইবার বাড়িছাড়া করবি! তোমরা একটা গন্ধ পাচ্ছ না! হ্যাঁ গা, একটা ছারপোকা-ছারপোকা গন্ধ!’

আমি হ্যাঁ বলতে যাচ্ছিলুম, শিবাঞ্জন আমার হাতে চিমটি কাটল৷ সঙ্গে-সঙ্গে বুঝে গেলুম কী বলতে চাইছে৷ গুপিবাবু গোলমেলে, একবগ্গা লোক৷ হাতে রাখতে হবে৷ তাই চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ৷

গুপিবাবু বললেন, ‘তোমার আর কী! একমাথা চুল৷ আমার যে ক’গাছা আছে, তাও তো সব ভুস-ভুস করে উঠে যাচ্ছে৷’

‘ওরে মূর্খ! ওই দুর্গন্ধী কবিরাজি তেলে যে টাক পড়ে যাবে গবেট! উঃ এই গন্ধটা আমার অসহ্য লাগে৷’

‘এটা কীসের গন্ধ জানো! জেসমিন, জেসমিন৷’

‘তোর মুন্ডু৷ জেসমিন আমার কাছে আছে৷ শুঁকে দেখিস৷’

‘তোমার জেসমিন কী জানি না৷ আমার জেসমিন এইটা৷’

গুপিদা উত্তেজিতভাবে আমাদের বললেন, ‘তোমাদের কী চাই?’

সেরেছে! সিন বুঝি আর কপালে জুটল না৷ শিবাঞ্জন মিষ্টিগলায় বললেন, ‘সবে চান করেছেন, পিত্তি পড়বে৷ চলুন, ঘোষমশাইতে বসে একজোড়া চমচম খাবেন৷’

‘বাঃ, অতিশয় স্নেহপ্রবণ ভদ্রসন্তান! এ-ছেলে দেশের, দশের মুখ উজ্জ্বল করবে৷ মনুমেন্টের মাথায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবে৷ কলকাতার দুঃখমোচন করবে৷ চলো, চলো৷ পিত্তাধিক্যে শরীর বিকল হয়৷’

রাস্তায় বেরিয়ে দু-পা হাঁটতে-না-হাঁটতেই শিবাঞ্জনের সঙ্গে গুপিবাবুর হলায়গলায় ভাব হয়ে গেল৷ ঘোষমশাইতে আমাদের গোটাদশেক টাকা খরচ হল৷ সে আর কী করা যাবে! গোডাউন বটে একখানা৷ কী নেই সেখানে! বাঘ-ভালুক ছাড়া সবই আছে৷ সে এক সিন!

শিবাঞ্জন বলল, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই৷ মানুষ সমুদ্রের অতল থেকে জাহাজের মালপত্র তুলে আনছে, আর আমরা ডাঙা থেকে রামায়ণের সিন বের করে আনতে পারব না!’

গুপিদা তালা খুলে দিয়ে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ আবার গুন্গুন করে গান গাইছিলেন, না চাহিলে যারে পাওয়া যায়৷ শেষে কী মনে হলে, বললেন, ‘সরো দেখি, কী করা যায়! আছে, সে তো আমিও জানি৷ এখন শুয়ে আছে, না খাড়া আছে!’ গোটাকতক প্যাকিং বাক্স টপকে ভেতরে চলে গেলেন৷ সেইখান থেকে শোনা গেল, ‘ওঃ, দুটো চমচমের কী ঠেলা বাবা৷ দয়া করে ভেতরে এসো না! জামাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে৷’

আমি জিগ্যেস করছি, ‘যাব গুপিদা!’

শিবাঞ্জন বলল, ‘কেন, সন্ধেবেলা এক কেজি রাবড়ি! চমচম তো ভূমিকা৷’

ভেতরে হুড়মুড় করে কীসব পড়ে গেল৷ গুপিদার সাড়াশব্দ নেই৷ মরে গেল নাকি৷ বাক্স-টাক্স টপকে দুজনে ভেতরে গেল৷ গুপিদা সিন চাপা পড়ে গেছে৷ মুন্ডুটা বেরিয়ে আছে৷

শিবাঞ্জন বলল, ‘কী গো গুপিদা!’

গুপিদা বলছে, ক্ষীণস্বরে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু৷ রাবড়ি লোভে আজ জীবনটা গেল৷’

‘জীবন যাবে কেন, আমরা তোমাকে তুলছি ভাই!’

‘তোদের ক্ষমতায় কুলোবে না রে চম৷ একসঙ্গে তিনটে ঘাড়ে পড়েছে৷’

সত্যিই সে এক ভজঘট ব্যাপার৷ এক-একটার কম ওজন! তার ওপর ওই ঢাউস সাইজ৷ যাই হোক আধ ঘণ্টার মতো কসরত করে মানুষটাকে বের করা গেল৷ ফিটফাট বাবুটি আর নেই৷ ঝুলকালি-মাখা ভূত৷’

ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘নাও, এইবার সিন দ্যাখো৷ অবস্থাটা একবার দেখেছ৷ এত জায়গায় আগুন লাগে, এই হতচ্ছাড়া গুদোমে লাগে না কেন! নাও, হাত লাগাও৷ এই চারটে হল রামায়ণের সিন৷’

‘আর ওই পাশের ওইগুলো!’

‘শাহজাহান৷ তার ওপাশে চাণক্য৷ এইসব শিশিরবাবুর জন্যে আঁকা হয়েছিল৷ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর নাম শুনেছ?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘ভেরি গুড, তিনি আমার গুরু ছিলেন৷ তাঁর কাছেই আমার সব শিক্ষা৷’

‘আপনি অভিনয় করতেন গুপিদা!’

‘অভিনয় অতি তুচ্ছ জিনিস, আমি তার চেয়ে বড় কাজ করতুম৷ প্রত্যেকটা সিনের শেষে চা খাওয়াতুম৷ চা খাওয়াতুম বলে আমার কত আদর ছিল! তাই তো গুরু আমাকে সন্ধি করে বলতেন, গুরু বলতেন তুই আমাদের চা দিস তাই আমরা এনার্জি পাই, তুই চাদর৷ পুরোনো কথা বলতে বসলে দিন খতম হয়ে যাবে৷ যাও, একটা টেম্পো কী দুজন লোক ভাড়া করে আনো৷ ফিরে গিয়ে আমাকে আবার ওস্তাদের জন্যে রান্না চাপাতে হবে৷ আজ আবার শখ হয়েছে মৌরলা মাছ ভাজা খাবেন৷’

সেই দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হয়েছে, হ্যালো, হ্যালো, মাইক্রোফোন টেস্টিং, ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর৷ আজই আমাদের অনুষ্ঠান৷ তোরণ তৈরি হয়ে গেছে৷ তার মাথায় থার্মোকল কেটে শিবাঞ্জন লিখেছে, স্বাগত, মাননীয় রাজ্যপাল৷ তলার দিকে দু-পাশে খাড়া করে আটকেছে দুটো কাটআউট৷ দুটি মেয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাঁখ বাজাচ্ছে৷ নিজের বন্ধু বলে বলছি না, কাজ দুটো ভীষণ ভালো হয়েছে৷ প্রধানশিক্ষক পিঠ চাপড়ে বলেছেন, সুপার্ব!

মঞ্চ রেডি৷ মাঝখানে বাংলার স্যার দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন৷ পাশে সহপ্রধান৷ রাজ্যপাল আসছেন, সেই কারণেই চুল কেটেছেন৷ সে যা হয়েছে! যেন ঘাস ছাঁট৷ তাঁরা দুজনে সীতার গর্ত তৈরি করাচ্ছেন৷ সহপ্রধান মিস্ত্রিকে বলছেন, ‘আরে রাস্তার ম্যানহোল দেখোনি! এগজ্যাক্টলি সেই কায়দা৷’

মিস্ত্রি বলছেন, ‘গোলটোল হবে না, চারচৌকো হতে পারে৷’

বাংলার স্যার বলছেন, ‘আরে তাই হোক না৷’

‘বেশ, আমি করে দিচ্ছি, তবে পরে আপনারা বিপদে পড়বেন৷ সব ভন্ডুল করবে ওই গর্ত৷ স্টেজের তলাটা কেমন, কোনও ধারণা আছে বাবু! খোঁটা আছে কম-সে-কম সত্তরটা৷ বড়জোর একটা কুকুর ঢুকতে পারে৷ আপনি বলছেন একটা ডালা নিয়ে চারটে ছেলে ঢুকবে, তার ওপর আবার আর-একটা ছেলে৷ জিন্দিগিতে এমন থিয়েটার শুনিনি৷ নাটকটা কি সিঁদেল চোরের কাহিনি!’

‘শুনবে কী করে! তুমি যে বাবু পুরোনো কালেই পড়ে আছ৷ স্টেজক্র্যাফ্ট কোথায় এগিয়েছে জানো? আমেরিকা স্টেজে হেলিকপ্টার নামাচ্ছে৷’

‘এটা আমেরিকা নয়, ইংল্যান্ড নয়, ইন্ডিয়া৷ এ-দেশে এখনও রিকশা চলে৷ মানুষ গামছা পরে ঘুরে বেড়ায়৷’

সহপ্রধান আর বাংলার স্যার দুজনে মিলে মঞ্চের তলাটা দেখতে গেলেন, সঙ্গে আমি আর শিবাঞ্জন৷ সহপ্রধান দেখেই বললেন, ‘অসম্ভব! প্ল্যান বাতিল৷ রামায়ণে সীতার ওপর যথেষ্ট অত্যাচার করা হয়েছে, ফের, এগেন এই অত্যাচার করাটা মানবিক কারণেই অনুচিত৷ কেমন করে একটা ট্রলি এই খোঁটার জঙ্গলে ঢুকবে! চারপাশে গজালের মতো বড়-বড় পেরেক৷ প্ল্যান পালটান, প্ল্যান পালটান৷ সীতা কি শেষে যিশু খ্রিস্ট হয়ে ঝুলবে!’

‘আপনারই প্ল্যান, লাস্ট মোমেন্টে আপনিই চেঞ্জ করছেন৷ আর ওই প্রথম দৃশ্যটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা নাটকটা৷’

‘আরে মশাই, নাটকটা তো দাঁড়িয়ে আছে, আপনার সীতা কোথায় দাঁড়াবে! এক হয়, পাতাল আর স্বর্গ যদি স্থান পরিবর্তন করে৷ পাতালটা মনে করুন ওপরে, স্টেজের মাথায়, আকাশে৷ সেখান থেকে দড়ি বেঁধে সীতাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল৷’

‘অ্যাবসার্ড! আপনি আপনার সুবিধে দেখছেন, ভাষার দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না! আকাশ মানে আকাশ৷ মানে গগন, অন্তরীক্ষ ব্যোম, শূন্য, আ যুক্ত কাশ ধাতুর অ (ধি)৷ আর পাতাল মানে, পুরণোক্ত ত্রিভুবনের সর্বনিম্নস্থ ভুবন, নাগলোক, পৃথিবীর অধোদেশস্থ ভুবন, ভূগর্ভ৷ অভিধানের এই অর্থ বদলে আকাশকে পাতালে, পাতালকে আকাশে পাঠানো যায়! ব্যাকরণ ইজ ব্যাকরণ!’

হঠাৎ পেছনে প্রধানশিক্ষক মহাশয়ের গলায় আমরা চমকে উঠেছি, ‘মাস্টারমশাই, আপনি নাটক লিখেছেন না ব্যাকরণ! ছি, ছি, বড় মানুষের এ কী আচরণ! মশাই, ওপরে কত কাজ এখনও বাকি, আর আপনারা দুজন রেসপনসিবল মানুষ এখানে ধাতুরূপ শব্দরূপ করছেন! অভাবনীয়৷ ওসব ছেলে-ছোকরাদের হাতে ছেড়ে দিন৷’

হেডমাস্টারমশাই গটগট করে চলে গেলেন৷ আমরা সবাই অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলুম৷ এরই মাঝে শিবাঞ্জন, ‘ইউরেকা’ বলে লাফিয়ে উঠেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, ‘উরে বাবা৷’ মাথার ওপর বাঁশ, খেয়াল করেনি৷

‘জল দে, জলদি জল দে,’ বলে সহপ্রধানের চিৎকার৷

শিবাঞ্জন সামলে নিয়ে বলল, ‘স্যার, তেমন লাগেনি৷ মাথার মাঝখানটা সুড়সুড় করছে৷ মনে হয় একটু রক্ত বেরিয়েছে, এখনই জমে যাবে৷ শুভকাজে একটু রক্তপাত ভালো স্যার৷’

‘তা, তুমি বাবা অমন লাফিয়ে উঠলে, কারণটা কী!’

‘স্টেজে ম্যানহোল করতে হবে না স্যার, আমার মাথায় অন্য আইডিয়া এসেছে৷’

‘বলো না, বলো না৷’ স্যার কেমন যেন হয়ে গেলেন৷ যাকে বলে অভিভূত৷

শিবাঞ্জন দুষ্টু-দুষ্টু হেসে বলল, ‘সে দেখবেন যখন হবে চমকে যাবেন৷’

হেডমাস্টারমশাই হাতজোড় করে বললেন, ‘শুধু নিজেদের ফাংশান নিয়ে থাকবেন না স্যার৷ আমার ফাংশানটাও একটু উদ্ধার করতে হবে তো! আই রিকোয়েস্ট৷’

সহপ্রধান আবার মুখে পান ঠুসেছেন, তার ওপর ছেড়েছেন তিন টিপ জর্দা৷ সেই অবস্থায় কিছু একটা বলতে চাইলেন৷ প্রধানশিক্ষক দু-হাত তুলে বাধা দিলেন, ‘থাক, থাক, আর কিছু শুনতে চাই না৷ আমি বুঝে গেছি৷ একেই বলে অন্তর্ঘাত৷ একটা দিন, মাত্র একটা দিনের জন্যে আপনার এই বদভ্যাসটা বন্ধ রাখতে পারছেন না! জাস্ট ফর এ ফিউ আওয়ার্স৷ গভর্নরের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, মুখে পান জর্দা, হাতে পানের বোঁটায় চুন৷ হোয়াট এ সিন৷’

সহপ্রধান একপাশে হেলে প্যাঁক করে খানিক পানের পিক ফেলে বললেন, ‘বাঃ, এরই মধ্যে ফাংশানটাকে ফেঁড়ে ফেললেন দু-ভাগে, আমার-তোমার! এটা কিন্তু আপনিই করলেন, আমরা করিনি৷ আমরা এই যে তলায় এসেছি, এটা একটা টেকনিক্যাল কারণে, অকারণে আসিনি স্যার৷’

হেডমাস্টারমশাই ইশারা করে দেখালেন, সহপ্রধানের পাঞ্জাবির বুকে একফোঁটা পানের পিক লেগেছে৷

সহপ্রধান একবার দেখে নিয়ে বললেন, ‘এই বাজারে একটু লালের স্পট থাকা ভালো৷ ওটা হল রক্ষাকবচ৷ আচ্ছা, এইবার চলুন, ওদিকটা দেখা যাক৷ নির্মলবাবু চলে আসুন৷’

ওঁরা চলে যেতেই শিবাঞ্জনকে বললুম, ‘তোর আবিষ্কারটা কী শুনি?’

‘একবার বাড়িতে যেতে হবে, চল আমার সঙ্গে৷’

শিবাঞ্জনদের বাড়ি স্কুলের খুব কাছেই৷ শিবাঞ্জন আমাকে নিয়ে তরতর করে চিলেকোঠায় চলে এল৷ সেইখান থেকে দুজনে টেনেটুনে বিশাল বড় একটা কাগজের বাক্স বের করলুম৷ বাক্সটা বেশ শক্তপোক্ত৷ একসময় টিভি এসেছিল৷

শিবাঞ্জন বলল, ‘ভেতরে বোস তো৷’

বসলুম৷ মাথার চাঁদিটা জেগে রইল৷

শিবাঞ্জন বলল, ‘মাথাটা নিচু কর৷’

নিচু করলাম৷ শিবাঞ্জন বলল, ‘হবে৷ ফাসক্লাশ হবে৷ সামনের দিকটায় কালো কাগজ মেরে দিই৷’ বাক্স নিয়ে যখন ফিরে এলুম, স্টেজ তখন রেডি৷ লাল কার্পেট, সাদা চাদর ঢাকা লম্বা টেবিল৷ সাদা-সাদা চেয়ার৷ দুটো ফুলদান, সুন্দর তোড়া৷ পেছনে ভেলভেটের পরদা৷ তার ওপর শিবাঞ্জনের আর্ট, সাদা একটা রাজহাঁস, একটা বীণা৷ একটা পদ্ম৷ একেবারে ফেটে গেছে৷ রাজ্যপাল যেদিক দিয়ে উঠবেন সেদিকে রেলিং লাগানো বেশ শক্ত সিঁড়ি৷

মঞ্চে ভারবহন ক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ প্রথমে সিঁড়ি৷ আমাদের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক খুব মোটা৷ তিনি বারবার উঠছেন, নামছেন৷ ধপাস-ধপাস করে৷ দু-চারবার করে বললেন, ‘নাঃ কোনও ভয় নেই৷ আমি ইজিকলটু চারটে সাধারণ লোক৷ রাজ্যপালের চেহারা সাধারণ চেহারা, কোনও ভয় নেই৷’

হেডমাস্টারমশাই মেয়েদের ডাকলেন৷ তিরিশজন৷ সকলকেই মঞ্চে তোলা হল৷

সহপ্রধান বললেন, ‘জাম্প৷’

তারা লাফাচ্ছে৷ হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘টেস্ট করতে গিয়ে খোলনলচে খুলে পড়ে না যায়!’ বলতে-না-বলতেই ফুলদানি দুটো উলটে পড়ে গেল৷

সহপ্রধান বললেন, ‘নুইসেন্স৷ আমি আগেই বলেছিলুম, যে-কোনও সভা পণ্ড করার পক্ষে গোটা দুই ফুলদানিই যথেষ্ট৷ অ্যায়, এই দুটোকে ঘাড় ধরে মঞ্চ থেকে বিদায় কর৷ আমি যা বলেছিলুম টেবিলের মাঝখানে একটা ইকেবানা ফ্লাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্ট রাখতে৷ সেটা কই! শিবাঞ্জন!’

‘ভুলে গেছি স্যার!’

‘ভুললে তো চলবে না স্যার৷ এখনও এক ঘণ্টা সময় আছে, করে ফ্যালো৷ তোমার প্রতিভা আছে৷ রাজ্যপালের সামনে সেই প্রতিভা প্লেস করো৷’

বেচারা শিবাঞ্জন আর পারছে না৷ জিগ্যেস করল, ‘কীসে করব স্যার?’

‘আমার মাথায়, আমার খুলিতে৷’ যত সময় এগিয়ে আসছে, ততই সকলের টেম্পার চড়ছে৷ শিবাঞ্জন আবার লাফিয়ে উঠল, ‘ইউরেকা৷’ মৃদুলা কুঁক-কুঁক করে হেসে উঠল৷ ফার্স্টক্লাসে পড়ে মৃদুলা৷ লেখাপড়ায় যেমন ভালো, তেমনই ভালো নাচে গায়৷ মৃদুলা শিবাঞ্জনকে ভালোবাসে৷ আমরা সবাই জানি৷ শিবাঞ্জন জানে না! সে নিজের খেয়ালেই বনবন ঘোরে৷ শিল্পীরা মনে হয় এইরকমই হয়৷ শিবাঞ্জন গ্রাহ্যই করল না৷ এক লাফে নেমে গেল মঞ্চ থেকে৷ ছুটল বাড়িতে৷ সেখান থেকে নিয়ে এল বিশাল বড় একটা ঝিনুকের খোলা৷ জিনিসটা আন্দামানের৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে সে একটা কাজ নামাল, হাঁ করে তাকিয়ে দেখার মতো৷

তখনও কিন্তু শাঁখের রিহার্সাল চলছে৷ ওয়ান-টু-থ্রি, পোঁ৷

সহপ্রধান পরিচালনা করছেন, ‘হল না, হল না৷ তিনটে পোঁ করেনি, ফোঁ করেছে৷’

রিহার্সাল শেষ হওয়ার পর ফাঁক পেয়ে মৃদুলা শিবাঞ্জনের পাশে এসে দাঁড়াল, ‘কী দারুণ করেছিস রে!’

আমার খুব হিংসে হচ্ছিল৷ বাংলার স্যার দাবড়ানি দিলেন, ‘তাতে তোমার কী৷ ওর মাথাটা খারাপ করে দিয়ো না মা৷ এখনও অনেক কাজ বাকি৷ দয়া করে এসো এখন৷ আমাদের শ্রাদ্ধটা হয়ে যাক৷’

ঠিক পাঁচটায় গভর্নর আসবেন৷ সাড়ে চারটে বাজল৷ প্রধানশিক্ষক সমস্ত দিক একবার ঘুরে দেখে এলেন৷ হেঁ, মনে হচ্ছে নিখুঁত৷ কোথাও কোনও ত্রুটি তো চোখে পড়ছে না৷ তোরণ থেকে গেট সব ঝাড়ু দিয়ে ধুয়েমুছে ঝকঝকে, তকতকে৷ দুটো বড় গর্ত সে গর্ত আজ পনেরো বছর ধরেই আছে৷ সারানো হবে না৷ বলা হল, গভর্নর আসছেন, যদি একটু তাপ্পিতুপ্পি মেরে দেন৷ তাতে রাস্তা মেরামত দফতরের বড়কর্তা বললেন, ‘ওসব নকশা আমাকে দেখাবেন না৷ আজকাল একটা কায়দা হয়েছে, যে-কোনও ছেঁচড়া অনুষ্ঠানে গভর্নরকে ধরে আনা৷ চালাকিটা আমরা বুঝি৷ আসল উদ্দেশ্যটা হল, ওই ছুতোয় রাস্তাটা মেরামত করিয়ে নেওয়া৷ আমরা ধরে ফেলেছি ভাই৷ গভর্নর বড় রাস্তা ছেড়ে গলিঘুঁজিতে ঢুকতে চাইলে আমরা কী করতে পারি!’

ওই গর্ত দুটো আমরাই রাবিশ ঢেলে পিটিয়ে যা হয় একরকম করেছি৷

সিকিউরিটি অফিসার বললেন, ‘সেকেলে বুদ্ধি নিয়ে একেলে টেররিস্ট ধরতে হলে আপনার কবে চাকরি চলে যেত! আর. ডি. এক্স. জানেন কাকে বলে! ট্যাঁকে, ট্যাঁকে থাকে আধুলির মতো৷ একটা ঘষা, এই প্যান্ডেলে-ফ্যান্ডেলে, গ্রাম-ট্রাম উড়ে যাবে৷’

হঠাৎ ড্রামের আওয়াজ, ডুডুডুম, ড্রাম ড্রাম৷ আরে, এসে গেলেন নাকি?

সবাই হুড়মুড় করে দৌড়লেন, দেখা গেল কিছুই নয়, শুভাশিস ড্রামের চার্জে, সে একবার দেখে নিচ্ছে যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক মেজাজে আছে কি না৷ হেডমাস্টারমশাই একটু অসন্তুষ্ট হয়েছেন, মুখ দেখেই বোঝা গেল কিন্তু অসহায়! সবাই রিহার্সাল দিচ্ছে, শুভাশিসও দেবে৷ বাধা দিলে চলবে না৷

এই সময় সহপ্রধান মনে করিয়ে দিলেন, ‘শাঁখের সঙ্গে গান হবে বলেছিলেন, শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে৷’

‘রাজ্যপালকে জননী বলা যায় না৷’

‘তা হলে জননীর জায়গায় জনক বসিয়ে দিন৷’

‘ছন্দ মিলবে না৷’

‘হ্যাঁ, তাও তো বটে! তা হলে একটা কাজ করুন, গায়ে তো ফুল ছুড়ে মারা হবে, সেই সময় যদি গাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথের গান :

পুষ্প দিয়ে মারো যারে চিনল না সে মরণকে৷

বাণ খেয়ে যে পড়ে সে যে ধরে তোমার চরণকে৷৷

হেডমাস্টারমশাই আঁতকে উঠে বললেন, ‘আমাকে জেলে পাঠাতে চান! রাজ্যপালকে বাণ মারব! কোনও গানের প্রয়োজন নেই, কেবল শাঁখ আর ব্যান্ড৷ তাইতেই দেখবেন ব্লাড প্রেশার টু ফর্টি৷ গেট রেডি৷ আর মাত্র টেন মিনিট্স৷ রাজ্যপালকে আপনি রিসিভ করবেন৷’

‘তা হলে এই দশ মিনিটে ঝপ করে আমি একটা পান খেয়ে নিই৷’

‘প্লিজ হেমন্তবাবু, ওই কাজটা আপনি করবেন না৷ আমি বড় হয়েও আপনার পায়ে ধরছি৷’

স্কুলের গেটে ওসি৷ এক ব্যাটেলিয়ান পুলিশের লাইন আপ৷ ওসির কানে ওয়াকিটকি৷ তিনি আওয়াজ দিলেন, ‘আসছেন?’ আর ঠিক সময় বেপাড়ার একটা কুকুর এল কী হচ্ছে দেখতে৷ সঙ্গে-সঙ্গে স্কুলের গেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এল আমাদের বিগ ভোলা৷ বিদ্যুৎবেগে! নিমেষে ঝটাপটি৷ মেয়েরা লাইন ভেঙে চিল-চিৎকার করতে-করতে যে যেদিকে পারল দৌড়ল৷ শিবাঞ্জন চেঁচাচ্ছে, ‘আমার গেট, আমার গেট৷’ গেটের দু-পাশের ঘট রাস্তায় গড়াচ্ছে৷ ধুন্ধুমার মারামারি৷ ওসি চিৎকার করছেন, ‘চার্জ, চার্জ, ফায়ার, টিয়ারগ্যাস৷’ সেই মুহূর্তে দূরে শোনা গেল, সাইরেন, ওঁয়া-ওঁয়া৷ সহপ্রধান বললেন, ‘সর্বনাশ! রাজ্যপাল আ গিয়া!’

পুলিশের বেধড়ক লাঠি চার্জ৷ কুকুর দুটোর একটানা কেঁউ-কেঁউ৷ রাজ্যপাল নামলেন৷ প্রধানশিক্ষক অর্ডার দিলেন, শঙ্খ, স্টার্ট শঙ্খ৷ শঙ্খধারিণীরা যে যেখানে ছিল, সেইখান থেকেই শাঁখ বাজাতে লাগল৷ শুভাশিসের ব্যান্ড, ধ্যা্পড়, ধ্যা্পড়৷ মেয়েরা নেই৷ প্রধানশিক্ষকই পুষ্পবৃষ্টি করছেন৷ কলাগাছ সমেত ঘট রাস্তায় শুয়ে আছে৷ সহপ্রধান এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে, হাতজোড় করে বলছেন, ‘স্বাগতম, স্বাগতম, ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, ফর্চুনেট উই আর দ্যাট ইউ হ্যাভ কাম৷ ওয়েলকাম, ওয়েলকাম৷’

সহপ্রধানের জন্য রাজ্যপাল এগোতে পারছেন না৷ তিনি কেবল বলছেন, ‘থ্যাঙ্কস্, থ্যাঙ্কস্৷’

শেষে সিকিউরিটির একজন, এক ধাক্কা মেরে সহপ্রধানকে পাশে সরিয়ে দিলেন৷ রাজ্যপাল ধীরে-ধীরে মঞ্চে উঠে সিংহাসন চেয়ারে বসলেন৷ বাংলার স্যার মাইক্রোফোনের সামনে৷ স্বাগত ভাষণ, ‘আজ আমাদের...’ মাইক্রোফোনের নিজের ভাষায় নিজের কিছু বলার ছিল, ‘চ্যাঁ চোঁ, সিঁ, কোঁড়র কোঁত৷’

যাঁরা সামনের আসনে ছিলেন চিৎকার করে উঠলেন, ‘মাইক, মাইক৷’

ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, ‘টয়লেটে৷’

বাংলার শিক্ষক অসহায়৷ আবার চেষ্টা, ‘আজ...৷’

এবারে মাইক্রোফোন ক্ষিপ্ত, ‘চোঁও ও চোঁক৷’

স্যার বললেন, ‘ইম্পসিবল৷’

মাইক বললে, ‘ভোঁচ৷’

এমন সময় মাইকম্যান এল৷ সবাই বলে তেএঁটে বিশে৷ মাইক ঠিক হল৷ স্যার শুরু করলেন, ‘আজ আমাদের পরম সৌভাগ্যের দিন৷ এই সুপ্রাচীন বিদ্যালয়ে প্রথম এক রাজ্যপাল এলেন৷ আমরা কৃতজ্ঞ, আমরা ধন্য, আমরা অভিভূত, আমরা উচ্ছ্বসিত, আমরা বাক্যাহত৷’

হেডমাস্টারমশাই ইশারা করছেন, আর না, আর না৷

শেষে সহপ্রধান স্টেজে সাতটা বাচ্চা মেয়ে নামিয়ে দিলেন৷ ফুটফুটে সুন্দর, প্রত্যেকের হাতে মালা৷ তারা নেচে-নেচে আসছে৷ পেছনে বসে গান গাইছেন উমাদির দল—

ফুল বলে, ধন্য আমি মাটির পরে

দেবতা ওগো, তোমার সেবা আমার ঘরে৷৷

জন্ম নিয়েছি ধূলিতে দয়া করে দাও ভুলিতে,

নাই ধূলি মোর অন্তরে৷৷

গানের সুরে আদেশ এল, ‘বড় মালাটা পরিয়ে দাও৷’ কুচো ফুলের বৃষ্টি৷ অমিতা নাচতে-নাচতে গিয়ে মালা পরাল৷ সঙ্গে-সঙ্গে ঝুপুস-ঝুপুস গোলাপের পাপড়ি বর্ষণ৷ আবার গান—

নয়ন তোমার নত করো,

দলগুলি কাঁপে থরোথরো৷

চরণপরশ দিয়ো দিয়ো, ধূলির ধনকে করো স্বর্গীয়

ধরার প্রণাম আমি

গানের আদেশ সুরে ‘ওয়ান বাই ওয়ান, প্লেস ইয়োর মালা অন হিজ হাইনেসেস ফিট৷ নেচে-নেচে, তিক-তিক, তেরো কেটে, তিক, ধরার প্রণাম আমি তোমার তরে৷ ওয়ান, ব্যাক, তোমার তরে, টু ব্যাক৷ স্টার্ট ব্যান্ড, হালকা নোট, ওনলি কেট্ল ড্রাম, কুটুল কুটুল কুটুল৷ স্টপ৷ শাঁখ, পুঁওঁওঁ৷ স্টপ৷’

এরপর একেবারে তেড়ে গান, ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে, জয় হে৷’

বিগ ড্রামের, ড্যাম্ভ-ড্যাম্ভ৷

অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হয়ে গেল৷ শোভনা, আমাদের সুন্দরী শোভনা, রাজ্যপালকে চন্দনের টিপ পরিয়েছে৷ রাজ্যপাল আবার তাকে একটা পালটা টিপ পরিয়ে দিয়েছেন৷ সে কী গর্বের কথা! দেখি-দেখি করে সব মেয়ে তেড়ে-তেড়ে এসে দেখছে৷

প্রধানশিক্ষকমশাই একটা সিল্কের উত্তরীয় রাজ্যপালকে পরিয়ে দিলেন৷ দুজনের করমর্দন হল৷

সহপ্রধান এইবার মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের পর্ব ঘোষণা করলেন৷ স্কুলের সেক্রেটারি বিখ্যাত ব্যবসায়ী চাঁদপাল সরকার স্বল্প কথায় স্কুলের পরিচিতি দিলেন, ‘দিস ইজ অ্যান ওল্ড ইনস্টিটিউশন বাট স্টিল ইয়াং৷ এই স্কুল থেকে যাঁরা পাশ করে বেরিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ আজ বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, মন্ত্রী৷ একমাত্র আমিই এক মূর্খ, কিস্যু, কিস্যু, হতে পা...৷’

হাউহাউ কান্না৷ সহপ্রধান সরিয়ে আনলেন৷ উমাদি রেডিই ছিলেন, সঙ্গে-সঙ্গে ধরে দিলেন গান, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়৷’

চাঁদপালবাবুর সমস্যা তখনও মেটেনি৷ তিনি আমাদের সাজঘরের একটা টুলে বসে দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে সমানে কাঁদছেন আর হাপুস-হাপুস করে শ্বাস ফেলছেন হাপরের মতো৷ ক্রমশই যেন নেতিয়ে পড়ছেন৷ আমরা স্যারকে ডেকে আনলুম, ‘দেখুন, সেই থেকে কেমন করছেন হাপরের মতো৷ মনে হচ্ছে, দম আটকে যাবে যে-কোনও মুহূর্তে৷’

পণ্ডিতমশাই কবিরাজি করেন৷ নাড়ি টিপে বললেন, ‘ভয়ঙ্কর এলোমেলো হনুমানের নাড়ির মতো৷ দুর্বলে সবলা নাড়ি সা নাড়ি প্রাণঘাতিকা৷ এঁকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করাই বিধেয়৷’

শুরু হল দৌড়ঝাঁপ৷ হেডমাস্টারমশাই মঞ্চ ছেড়ে এলেন, সহপ্রধান ছিটকে চলে এসেছেন৷ রাজ্যপালের ভাষণ হচ্ছে, ‘এডুকেশান মেক্‌স এ ম্যান৷ শিক্ষা ছাড়া মানুষ তার জীবনের অর্থ বুঝতে পারে না৷ শিক্ষা মানুষকে সহ্যশক্তি দেয়, উদারতা দেয়৷ শিক্ষিতের সমাজের চেহারা শান্ত, কল্যাণমূলক, আনন্দের, অগ্রগতির, ভ্রাতৃত্বের, ভালোবাসার৷ অশিক্ষিত মানুষের সঙ্গে বনের পশুর তফাত নেই কোনও৷ গোরু শান্ত প্রাণী, হনুমান ছটফটে, বাঘ হিংস্র, হরিণ অহিংস, সব একজায়গায় আছে তাই এত অশান্তি৷ এদের যদি এডুকেশন দেওয়া যেত, হিংসা নয়, শান্তি, বৈরিতা নয়, ভাতৃত্বের, যদি মিনিমাম একটা এডুকেশানে ফেলা যেত, জঙ্গল হতো সিট অব ডিপ কালচার৷’

চাঁদপালবাবু চিত হয়ে শুয়ে ধড়ফড় করছেন৷ হেডমাস্টার বলছেন, ‘এ শিওর হার্ট অ্যাটাকের দিকে যাচ্ছে৷ এই বয়সে রোজ রাতে গাওয়া ঘিয়ের লুচি সহ্য হয়৷ হার্টে ফ্যাট ঢুকেছে৷ হয়ে গেল! সেক্রেটারি মারা গেলে ফাংশান আর হয় কী করে? পতাকা অর্ধনমিত৷ ব্যায়লা বাজিয়ে ড্রপসিন৷ কোনওরকমে আজকের মতো প্রাণটা ধরে রাখতে পারেন না! অন্তত রাত বারোটা পর্যন্ত!’

চাঁদপালবাবু ডুকরে উঠলেন, ‘এ হার্ট নয়, এ হল গভার্নার শক৷ হল না, কিছু হল না আমার জীবনে৷’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনার হতে আর বাকিটা কী আছে! এই শহরে তিনখানা বাড়ি৷ মধ্যমগ্রামে বাগানবাড়ি৷ নির্বাচনে একবার দাঁড়িয়েছিলেন, পনেরো হাজার ভোট পেয়েছিলেন৷ আবার কী! আর কী হতে পারে?’

‘আমি দান করব, এই মুহূর্তে আমি সায়েন্স ল্যাবরেটরির জন্যে স্কুলকে দশ লাখ দান করব৷’

‘আগেও বহুবার বলেছেন, ফল্স৷’

‘এবার সত্য৷ আমার ভেতর থেকে হৃৎপিঞ্জর ভেদ করে সেই দান বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ আপনি গভর্নরকে দিয়ে অ্যানাউন্স করান৷’

‘আগে চেক৷’

‘আগে অ্যানাউন্সমেন্ট৷’

‘আগে চেক৷’

‘বই বাড়িতে৷’

‘নিয়ে আসুন৷ পাশেই বাড়ি৷’

‘পাঁচ লাখ দেব৷’

‘তাই দিন৷’

‘এক লাখ৷’

‘বেশ তাই৷’

‘ভেবে দেখলুম, হঠকারিতা ভালো নয়, পরে ভেবেচিন্তে করা যাবে৷’

‘তা হলে এখন আপনি বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন৷ খুব উত্তেজনা হয়েছে তো!’

‘আমি যদি এখানে একটু শুয়ে থাকি তা হলে আপনাদের কোনও অসুবিধা আছে কি? রাজ্যপালের সঙ্গে আমার প্রাইভেট কথা আছে৷ আমি রাজ্যপালের ফান্ডে দু-লাখ টাকা দান করে পদ্মশ্রী হব৷’

‘তা সে আপনার প্রাইভেট ব্যাপার, প্রাইভেটলি বুঝে নিন৷’

‘বক্তৃণতা শেষ হওয়ামাত্রই অ্যানাউন্স করে দিন, মাননীয় চাঁদপাল সরকার, সেক্রেটারি, প্রখ্যাত সমাজসেবী, দানবীর, মহাবীর রাজ্যপালের ফান্ডে দু-লক্ষ টাকা দান করছেন, শিক্ষার প্রসারে, আর্তের সেবায়৷ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ টাকা তিনি কাল রাজ্যপালের দপ্তরে জমা করে দিয়ে আসবেন৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘আপনার অনেক ঢং আমরা দেখে-দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি মশাই৷ পরের কাঁধে বন্দুক রেখে অনেক দেগেছেন, আর না৷ ওই দেখুন আপনার স্ত্রী এসে গেছেন, এইবার নিজেরা বোঝাপড়া করুন৷ দু-লাখ টাকা দেবেন কি দেবেন না! আপনার স্ত্রীর অনুমতি আছে কি না!’

সেই মহিলা রণরঙ্গিনী৷ মহিলা সমিতির নেত্রী৷ এগিয়ে এসে হাত ধরে হ্যাঁচকা টান, ‘ওঠো৷ আর সাতদিন দেখব তারপর হাতে-পায়ে বেড়ি দিয়ে ফেলে রাখব৷ মাথাটা কতটা বিগড়েছে তখন বুঝবে৷’

ভদ্রলোক কেঁচো হয়ে গেলেন৷ বলা নেই কওয়া নেই বেসুরো গাইতে লাগলেন, ‘জীবন আমার বিফলে গেল, লাগিল না কোনও কাজে৷’

চাঁদপালবাবুর স্ত্রী, পাড়ার সবাই যাঁকে বউদি বলেন, তিনি এইবার আসল কথাটি বলে দিলেন, ‘এইরকম কেন করছেন জানেন? চিটফান্ড৷ আজ হোক কাল হোক শ্রীঘরে এঁকে যেতেই হবে৷ কত লোকের টাকা মেরে বসে আছেন৷ আর তা না হলে গণধোলাই৷ হাড় একদিকে, মাস একদিকে৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘ও, সেই কারণে রাজ্যপালের তহবিলে দান!’

চাঁদপালবাবু ‘ঘরের শত্রু, ঘরের শত্রু’ বলতে-বলতে উঠে পড়লেন৷ চটি গলিয়ে হাওয়া৷

রাজ্যপালের ভাষণ শেষ৷ সহপ্রধান দৌড়ে গেলেন৷ ধন্যবাদ জ্ঞাপন৷ ‘আমাদের বিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাসের স্মরণীয় দিন হয়ে রইল আজকের দিনটি৷’

রাজ্যপালের ভাষণ কিছুই শোনেননি, তবু বললেন, ‘সমাজ, জীবন, শিক্ষা, চরিত্রগঠন ও কর্তব্য সম্পর্কে আপনি যা বললেন, তা আমাদের মনে রাখতে হবে৷ দেশের বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ হতে হবে৷ অখণ্ড ভারত৷ অখণ্ড মানব ঐক্য৷ বর্ণমালার নতুন পাঠ হবে এইরকম, অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, নয়, অ-এ অখণ্ড ভারত৷ আ-এ আম নয়, আত্মত্যাগ৷ ই-তে ইঁদুর নয়, ইনকিলাব৷ ঈ-তে ঈগল নয়, ঈষা, ঈষা মানে লাঙ্গলদণ্ড৷ প্লাউ৷ মানে কর্ষণ, মানে মানবজমিনকে চাষ করতে হবে৷ এমন মানবজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা৷’

ফাটাফাটি হাততালি৷ রাজ্যপাল বোঝেন না, কিন্তু হাততালির অর্থ বোঝেন তো! সহপ্রধান তাঁর চেয়ে বেশি হাততালি পেয়েছেন৷ আমাদের গর্ব৷ জিন্দাবাদ৷ বন্দেমাতরম৷

এইবার আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান৷ শুভব্রতর গলা খুব ভারী৷ মাস্টারমশাইরা বলেন, ব্যস ভয়েস৷ শুভব্রত নিজে বলে, আমার গোল্ডেন ভয়েস৷ তার জীবনের একমাত্র অ্যাম্বিশান হল, টেলিভিশানে খবর পড়বে৷ সেই শুভব্রত ঘোষণা করছে৷ ‘এখন শুরু হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান৷ প্রথমে তিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করছে আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীবৃন্দ৷ তারপরেই আমাদের নাটক, রাবণবধ৷ রচনা, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয়, নির্মলকুমার মুখোপাধ্যায়, অভিনয়াংশে...৷’ হড়হড় করে নাম পড়ে গেল৷ সবশেষে হনুমানের দল৷ সে আবার কত কায়দা, হনুমানশ্রী পঞ্চানন পাল, নির্মল দুবে, সনাতন সরকার, শ্যামল সর্বাধিকারী...৷

সামনের ফালিমঞ্চে গান বসে গেল৷ তারস্বরে৷ পেছনে পরদা, তার পেছন আমরা৷ শিবাঞ্জন নেতা৷ গাছের কাট আউট বাঁ-পাশে৷ তার তলায় বেদি৷ বাল্মীকি বসবেন৷ কাটআউটটা হয়েছে ভালো৷ তবে একটু নড়বড়ে৷ একটু দূরেই টিভির বাক্স৷ সীতা ঘাপটি মেরে থাকবে৷ তুলো দিয়ে ক্রৌঞ্চ তৈরি হয়েছে৷ প্যাকাটির তীর মারাই আছে৷ স্টেজের মাথায় কালো সুতো দিয়ে ঝোলানো৷ ঠিক সময়ে ধপাস করে পড়বে৷ পরদা ওঠামাত্রই দেখা যাবে, বাঁ-দিকে বাল্মীকি৷ পেছনে হরেনবাবুর আঁকা সিন৷ বনের দৃশ্য৷ একটা নদী থাকলে ভালো হতো৷ তমসা নদী৷ যাক, সেটা নেই৷ মাঝখানে ইঁদুরে খাওয়া একটা গর্ত৷ শিবাঞ্জন বলেছে ভালোই হয়েছে৷ ওই ফুটো দিয়ে লাইট মারবে৷ সূর্যের কিরণ৷

ওদিকে একটা ঘরে মেকআপ চলেছে৷ রাম আর সীতাকে নিয়ে তেমন সমস্যা হল না৷ সীতার ঠোঁটের ওপর সামান্য গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছিল৷ সকালে সেলুনে গিয়ে পোঁচ মেরে এসেছে৷ জীবনের প্রথম দাড়ি কামানো৷ স্যার খুব সহজেই বাল্মীকি হলেন বটে৷ সমস্যা একটাই হল, নকল দাড়ি, গোঁফ, চুলের জন্যে মাঝে-মাঝে হাঁচি৷ সহপ্রধান বললেন, ‘মরেচে, এঁর তো উইগ অ্যালার্জি রে ভাই! তমসার তীরে বাল্মীকি যদি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাঁচেন তা হলেই তো হয়ে গেল! শিগগির অ্যান্টি অ্যালার্জিক ট্যাবলেট এনে খাওয়া৷’ ননী দৌড়ল দোকানে৷

বাংলার স্যার বললেন, ‘দাড়িটা তেমন প্রবলেম করছে না৷ ট্যাবলসাম হল গোঁফটা৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘সময় থাকতে-থাকতেই হনুমানদের রেডি করে ফ্যালো৷ লেজ ফিট করে দাও, লেজ ফিট করে দাও৷’

স্যার-স্যার হনুমান লাল কাপড় মালকোঁচা মেরে পরে দাঁড়িয়ে আছে৷ শিবাঞ্জন বাঁকা-বাঁকা, খাড়া-খাড়া, সোঁটা-সোঁটা লেজ ফিট করছে৷ এক-একজনের লেজ লাগানো যেই হয়ে যাচ্ছে সহপ্রধান বলছেন, ‘লাফাও, লাফাও৷ জাম্প, জাম্প৷’ এর আবার একটা গান তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন কে জানে, ‘রথে চড়িকিড়ি যাঁউছি৷’

মহা সমস্যা দেখা দিল রাবণের মাথা নিয়ে৷ একসারিতে দশটা পেপার পাল্পের মুন্ডু৷ ভাবা গিয়েছিল, কানের তলা দিয়ে স্ট্র্যাপ ঘুরিয়ে বেঁধে দিলেই হয়ে যাবে৷ হিসেব মিলছে না৷

শিবাঞ্জন বলছে, ‘স্যার এদিকে পাঁচ ওদিকে পাঁচ হচ্ছে না তো!’

‘কেন হচ্ছে না! বাঁ দিকে পাঁচ, ডান দিকে পাঁচ, সোজা হিসেব৷’

‘হিসেব তো সোজা হবে ভেবেছিলুম৷ হচ্ছে না যে, মাঝখানে ওর ওরিজিন্যাল মুন্ডুটাই তো প্রবলেম করেছে৷’

‘ওটাকে ফেলে দে না৷’

‘আসল মুন্ডুটা ফেলব কী করে! ওটা তো জন্মের সময় থেকেই ওইখানে সেন্টারে ফিক্সড হয়ে আছে৷ ও তো সরানো যাবে না৷’

‘তা হলে এক কাজ কর, ওটা যেমন আছে থাক৷ এপাশে পাঁচটা ওপাশে পাঁচটা ফিট করে দে৷’

‘তা হলে তো রাবণের এগারোটা মুন্ডু হয়ে যাবে স্যার৷’

‘রাবণের মুন্ডু ক’টা ছিল, শাস্ত্র কী বলছে! পণ্ডিতমশাইকে ডাক৷’

‘দশটা মাথা ছিল স্যার, দশানন৷’

‘তা হলে কি রাবণের কোনও মাথাই সেন্টারে ছিল না! একটা ছবি দ্যাখ না৷’

‘রাবণের ছবি কোথায় পাব স্যার!’

‘কেন, ক্যালেন্ডার!’

‘রাবণের ক্যালেন্ডার হয় না স্যার৷ রামচন্দ্রের হয়৷’

‘ডাক, ডেকে নিয়ে আয় অঙ্কের স্যারকে৷ এসব হিসেবের ব্যাপার৷’

অঙ্কের স্যার এলেন, ‘কী সমস্যা৷’

‘খুব জটিল অঙ্ক৷ এই হল রাবণ৷ এই দেখুন সেন্টারে ওর জন্মগত মাথা৷ এইবার দেখুন ওইখানে দশটা নকল মাথা৷ সেন্টার থেকে আসল মাথা সরানো যাবে না৷ কিন্তু ওর দশটা মাথা করতে হবে৷ হিসেবটা কী হবে!’

‘কেন? আসল মাথাটা রেখে ন’টা মাথা ফিট করে দিন৷’

‘তা হলে তো সমান হচ্ছে না৷ ধরুন এপাশে চারটে ওপাশে চারটে করলে, ন’টা হচ্ছে৷ দশটা হচ্ছে না৷ একপাশে পাঁচটা, আর-একপাশে চারটে হয়ে যাচ্ছে৷ একপাশে একটা মাথা বেরিয়ে থাকছে৷’

অঙ্কের স্যার একটু ভেবে বললেন, ‘রাবণ দেখছি সারাটা জীবন জ্বালাবে৷ এপাশে চারটে ওপাশে চারটে ওই ন’টা মাথাই থাক না, কে আর গুনে দেখছে!’

শিবাঞ্জন বলল, ‘স্যার, একটা মাথা আমি রাবণের বুকে আটকে দিই৷’

‘আইডিয়া!’ সহপ্রধান তুড়ি লাফ মারলেন, ‘এই ছেলেটা আইনস্টাইন হবে রে৷ হোয়াট এ মাথা! রাবণের দশটা মাথা এই একটা মাথার কাছে নাথিং৷’

গান শেষ৷ দশ মিনিটের বিরতি৷ দর্শকদের আসনে লোক আর ধরে না৷ বাচ্চাদের ক্যাঁচম্যাঁচ৷ অঙ্কের স্যার একটা বেত হাতে, ‘অ্যায়, অ্যায়,’ করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন৷ মায়েরা এসেছেন ছেলেদের অভিনয় দেখতে৷ স্কুলের বাইরে গেটের দু-ধারে লম্ফ জ্বালানো ঘুগনি, আর কুপি জ্বালানো ফুচকা এসে গেছে৷ ঠ্যাং করে ঘণ্টা বাজল৷

ঘিস-ঘিস করে পরদা সরে গেল দু-পাশে৷ শেষের দিকটায় আটকে গিয়েছিল৷ কে হাত দিয়ে টেনে সরিয়ে দিলে৷ তমালের তলায় বাল্মীকি৷ টেপে পাখির ডাক৷ পেছনের সিনের ফুটো দিয়ে নীল একটা আলো আসছে, যেন ভোর হচ্ছে৷ বাল্মীকি বসে আছেন আলো-আঁধারে৷ টিভির বাক্সে সীতা ঘাপটি মেরে আছে৷

এই পর্যন্ত বেশ ছিল৷ হঠাৎ বাল্মীকি ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে একবার হাঁচলেন৷ সারের হাঁচি কখনও আস্তে হয় না৷ যেন বোমা ফাটল৷ এইবার হল কী, একটাতে খতম হল না৷ পরপর, সিরিজ৷ অন্তত গোটা দশ-বারো৷ সঙ্গে দর্শকদের চিৎকার, ‘বাল্মীকির ফ্লু হয়েছে, বাল্মীকির ফ্লু৷’

অঙ্কের স্যার দাবড়ানি দিলেন, ‘মেরে সব ক’টাকে বাইরে বের করে দেব৷’

সহপ্রধান উইংয়ের পাশেই ছিলেন৷ প্রম্পটার৷ তিনি বললেন, ‘নির্মলটা ডোবালে৷ আমাদের আগেই বলে দেওয়া উচিত ছিল, তমসায় চান করে বাল্মীকির সর্দি হয়েছে৷ সিনটা নষ্ট হওয়ার আগেই পরেশ তুই ক্রৌঞ্চের দড়িটা কেটে দে৷’

পরেশ রেডিই ছিল৷ মারলে কাঁচি৷ এমনই বরাত, ক্রৌঞ্চ স্টেজের সামনে না পড়ে, পড়ল সীতার বাক্সে৷ সীতা এর জন্য প্রস্তুত ছিল না৷ প্যাকাটির আচমকা খোঁচায়, ‘উরে বাববা রে’ চিৎকার করে উঠল৷

সঙ্গে-সঙ্গে ছেলেরা চিৎকার করে উঠল, ‘কে আছিস ভেতরে বেরিয়ে পড়, বেরিয়ে পড়৷’

সীতা সটান উঠে দাঁড়াল৷ দু-হাতে ধরে আছে ন্যাকড়া আর তুলো দিয়ে তৈরি সেই বক৷ বকটাকে ফেলে দিলেই পারত, তা না করে ক্যাবলার মতো জিগ্যেস করল, ‘এটাকে কী করব স্যার!’

বাল্মীকি ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘আমার শ্রাদ্ধ করবি গাধা৷’

সীতা বলল, ‘আমি কি আবার শুয়ে পড়ব স্যার!’

সহপ্রধান চিৎকার করলেন, ‘ড্রপ সিন, ড্রপ সিন৷’

যার ওপর পরদা টানার দায়িত্ব ছিল, সে কেমন করে জানবে সিন এত তাড়াতাড়ি শেষ হবে! এদিকে বাল্মীকির আবার ফ্যাঁচাত-ফ্যাঁচাত শুরু হয়েছে৷ এর ওপর আর-এক কাণ্ড৷ শিবাঞ্জনের প্লাইউড কাটা তমালবৃক্ষ বাল্মীকির ঘাড়ের ওপর দিয়ে সামনে শুয়ে পড়ল৷

সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘সমূলে উৎপাটিত, সমূলে উৎপাটিত৷ স্যারকে বাঁচা, স্যারকে বাঁচা৷’

নির্মল-স্যার মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন, তার ওপর শিবাঞ্জনের কেরামতি৷

হড়হড় করে পরদা নেমে এল৷ প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের যবনিকা৷

সহপ্রধান দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘আর কী হবে! এই নাটক এইখানেই শেষ৷ রামায়ণ আর লিখবে কে, বাল্মীকিই তো হাসপাতালে চলে গেল৷’

প্রধানশিক্ষক বললেন, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই, এই বাল্মীকি কাত হলেও আসল বাল্মীকি অনেক আগেই রামায়ণ লিখে রেখে গেছেন৷ এটা তো শেষ থেকে শুরু হচ্ছিল, এইবার শুরু থেকে শেষ হবে৷’

যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যে আবার শুরু হল নাটক৷ বাংলার স্যার এরই মধ্যে ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে নিজের একটা ছবি তুলিয়ে নিলেন৷ তারপর দাড়ি, গোঁফ, চুল সব খুলে ফেলে গুম মেরে বসে রইলেন একপাশে৷

হেডমাস্টারমশাই বলতে গেলেন, ‘একটু কেটেকুটে গেছে, ওষুধ লাগাবেন?’

গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ত্রেতাযুগে কোনও মেডিসিন ছিল না৷’

‘কিন্তু এটা তো কলি, পিঠে পেরেক ফুটে গেছে, টিটেনাস হলে কে দেখবে!’

‘আমি এখন রামায়ণের যুগে আছি৷ সীতাটাকে আমি পরে পেটাব, কলিতে আগে ফিরে আসি৷’ আবার শুরু হল নাটক৷ বেশ ভালোই এগোচ্ছে৷ প্রম্পট শুনতে না পেয়ে রাম একবার বলে ফেলেছিল, ‘কী বললেন স্যার?’

সহপ্রধান বললেন, ‘বলো, পিতা আপনার আদেশ শিরোধার্য৷’

রাম বলল, ‘বলো, পিতা আপনার আদেশ শিরোধার্য৷’

সহপ্রধান বললেন, ‘গাধা৷’

রাম বলল, ‘গাধা৷’

এক্সপার্ট দশরথ, কায়দা করে জায়গাটা মেরামত করে দিলে, ‘বাবা, তুমি রাজার ছেলে, গাধা কেন, ঘোড়ায় চেপে যাবে, সাদা ঘোড়া৷’

রাম সপরিবারে বনবাসে গেল৷ দেখতে-দেখতে এসে গেল সীতাহরণের দৃশ্য৷ রাবণ এসেছে৷ রাবণের এখন একটা মাথা৷ সন্ন্যাসীর বেশ৷ রাবণ বলছে, ‘ভগবতি! ভিক্ষাং দেহি!’

সীতা ভিক্ষে দেবে৷ গণ্ডির বাইরে আসবে না৷ তানা-নানা করছে সীতা৷ নাটকে সেইরকমই ছিল৷ হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, রাবণ সীতার হাত ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান৷ সীতা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল৷ এইবার রাবণ সীতার চুল ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে উইংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে৷ রাবণ এই সুযোগটাই খুঁজছিল৷ সীতার সঙ্গে অনেকদিনের, অনেক ব্যাপারের ফয়সালা৷ পাছে পরচুল খুলে যায়, সীতা বোকার মতো দু-হাতে চুল চেপে ধরে আছে৷ হিন্দি ছবিতে ভিলেনকে যেমন গাড়ি বা ঘোড়ার পেছনে বেঁধে টানতে-টানতে নিয়ে যায়, রাবণ সীতাকে সেইভাবে নিয়ে যাচ্ছে৷ পাশেই পুষ্পকরথ৷ সেদিকে একবার ফিরেও তাকাল না৷

উইংস দিয়ে স্টেজের পেছনে আসামাত্রই প্রধানশিক্ষক একেবারে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন৷ রাবণের রাবণামি তিনি বরদাস্ত করবেন না৷ রাবণের রাবণত্ব তিনি শেষ করবেন৷ শেষ করবেন৷ মার মার, ‘হতভাগা! এই তোর সীতাহরণ!’ রাবণের পরচুল ছিঁড়েখুঁড়ে চারপাশে ছত্রাকার৷ দাড়ি উপড়ে পড়ে একপাশে৷ রাবণ আর রাবণ রইল না৷ প্রসূন হয়ে গেল৷

হঠাৎ রাম ছুটে এল, ‘এ কী করছেন স্যার! রাবণকে তো আমি বধ করব৷ তার আগে আপনিই যে বধ করে দিলেন!’

হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘নিজের বউকে সামলাতে পারিস না, তুই করবি রাবণবধ!’

লেজখাড়া হনুমানরা বলল, ‘আমরা হাত লাগাব স্যার!’

‘কোনও প্রয়োজন নেই, আমি একাই তুলোধুনে দিচ্ছি৷’

সহপ্রধান মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমাদের নাটক এইখানেই শেষ৷ আপনাদের চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ স্টেজের পেছনে খুব সহজেই প্রধানশিক্ষকমশাই রাবণবধ করে দিয়েছেন৷ সীতাকে আমরা টিংচার আইডিন মাখিয়ে ফেলে রেখেছি৷ বাল্মীকি মনের দুঃখে বাড়ি চলে গেছেন৷ তাঁর প্রেশার এই মুহূর্তে একশো আশি, নব্বই৷ নমস্কার!’

ভটাভট হাততালি৷ হে-হে চিৎকার৷ আমাদের অনুষ্ঠান খতম৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%