সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ছেলেবেলার সরস্বতীপুজোর সেই সকালটা গেল কোথায়! সেই আকাশ৷ ভোরের সেই ফিনফিনে নীল আকাশ৷ আকাশি-নীল রঙের সিল্কের কাপড়৷ মাথার অনেক ওপরে যে-দিকে তাকাই সেই দিকেই৷ একটু পরেই অতি ধীরে মাথা তুলবেন সূর্যদেব৷ হাঁ-করে তাকিয়ে থাকতুম৷ মনে হত, যেন মা সরস্বতীর জ্বলজ্বলে মুখ৷ কিশোরটিকে মন্ত্র শোনাচ্ছেন—‘জয় জয় দেবী, চরাচর সারে! তখন আমি যে পাড়ায় থাকি সেই পাড়ায় সরস্বতী পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়াবার চল ছিল৷ বিশ্বকর্মা পুজোয় নয়৷ ভোরের স্নিগ্ধ আকাশে চার-ছ’খানা ঘুড়ি তখনই উঠে পড়েছে৷ কোনওটা নীল, কোনওটার রং কমলালেবু, কোনওটা ধবধবে সাদা৷
কালীপুজোর সঙ্গে যেমন দুমদাম বাজির যোগ, সরস্বতী পুজোর সঙ্গে সেইরকম ঘুড়ি৷ যাদের পয়সা ছিল তারা তুলত একতে, বাকি সবাই আদ্দে৷ আমাদের মতো ছোটরা একপয়সা দিয়ে কিনতুম সিকিতে৷ সে খুব মজার ঘুড়ি, সেটাকে নিয়ে সারাদিন ফ্যাচ ফ্যাচ করা যেত৷ হাত-দশেকের বেশি উঠত না৷
ঘুড়ি আমাদের আকাশমুখো করত৷ ঘুড়ি দেখতে গিয়ে আকাশ দেখে ফেলতুম৷ কত বড়৷ সবচেয়ে বড়, খেলার মাঠের চেয়েও বড়৷ শিশুমনে প্রথম বিস্ময় এই আকাশ৷ আমাদের স্কুলটা ছিল নদীর ধারে৷ নদীও এক বিস্ময়৷ আমাদের শিক্ষকমশাই কখনও-কখনও বলতেন—‘জানিস তো নদীই হল সরস্বতী৷ জল হল জ্ঞান৷ জ্ঞান ওই নদীর মতোই অনবরত বহে চলে৷’ নীচু ক্লাসে অতটা বুঝতে পারতুম না, যখন কলেজে এলুম তখন বুঝতে পারলুম কথাটা কত সত্য৷ গ্রন্থাগারে প্রবেশ করা মাত্রই কথাটা মনে পড়ত৷ চারপাশে উঁচু উঁচু র্যাক৷ বই আর বই! সবাই তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে—কাছে আয়, কাছে আয়৷ মলাট খুললেই দেখতে পাবি অক্ষরের তরঙ্গমালা৷ লাইনগুলো সব সমুদ্রের ঢেউ৷ তোর মনের বেলাভূমিতে ভেঙে পড়তে চাইছে৷ সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে বালির দিকে তাকিয়ে মনে হত প্রতিটি বালিকণা যেন এক-একটি অক্ষর৷ হাজার হাজার বছর ধরে যত বই লেখা হয়েছে তার সব অক্ষর এখানে ঝরে পড়েছে৷ এই পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা সরস্বতী৷ বেদভূমিতে বসে আছেন৷ জানা-অজানা দুটোই তাঁর এক্তিয়ারে৷ জানতে চাওয়া আর জানতে না-চাওয়া দুটোই তাঁর নিয়ন্ত্রণে৷ বুদ্ধিও তাঁর, নির্বুদ্ধিতাও তাঁর৷ জ্ঞান যেন স্তব্ধ মহাদেব৷ পাতালফুঁড়ে উঠে গেছেন আকাশের দিকে৷ ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু—দুজনে লড়াই করছেন৷ কে বেশি বলশালী৷ তাঁদের মাঝখানে হঠাৎ ঠেলে উঠল স্তম্ভের মতো বিশাল এক আকৃতি৷ দুজনেই অবাক—ইঁনি কে! নীচের দিকে তাকালেন—নেমে গেছে অতলে৷ ওপরে তাকালেন—অনন্তে ঢুকে আছে তার মাথা—কে তুমি? সুগম্ভীর উত্তর—আমি মহেশ্বর৷ দুজনেই উপলব্ধি করলেন নিজেদের ক্ষুদ্রতা৷ শিব হলেন জ্ঞানদাতা, মোক্ষদাতা৷ শিবের সঙ্গী সরস্বতী আবার কালী৷ দুটোই জ্ঞান৷ যা আলোকিত তা জানা যায়, দেখা যায়, ধরা যায়, বই লেখা যায়৷ যা অন্ধকার থকথকে কালো তাকে জানার উপায় নেই৷ তারই নাম রহস্য৷ কালী তাই রহস্যময়ী৷ যেটুকু জানাবেন সেইটুকুই জানা যাবে৷ কালী দেবেন সরস্বতীকে৷ জ্ঞানের আলো মাখিয়ে সরস্বতী দেবেন আমাদের৷
আলো আর অন্ধকার—এপিঠ আর ওপিঠ৷ জ্ঞান আর অজ্ঞান—জানা আর অজানা৷ সেই কারণেই মাস্টারমশাই বলেছিলেন, নদীর নাম সরস্বতী৷ এগিয়ে যাও৷ কূল থেকে কূলে৷ একদিন হারিয়ে যাও অকূলে৷ নীচে নীল সমুদ্র, ওপরে নীল আকাশ৷ দুটোই নীল৷ সরস্বতীর দুটি সীমানা৷ এখানেও আছি, অনন্তেও আছি৷ আমি অন্তহীন৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন