ফুল হয়ে ফোটার কালে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলের নাম ছিল ভিক্টোরিয়া স্কুল৷ ভিক্টোরিয়া স্কুল কিন্তু কলকাতার ভিক্টোরিয়া নয়৷ বরানগরে গঙ্গার ধারের ভিক্টোরিয়া স্কুল৷ কুইন ভিক্টোরিয়ার যে বছর জুবিলি হল, সেবছর ওই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ গঙ্গার ধারে বিরাট সুন্দর স্কুল, বিরাট মাঠ৷ আমি যখন ওই স্কুলে পড়তাম তখন স্কুল কম্পাউন্ডে দুটো বিশাল বড়-বড় অর্জুন গাছ ছিল৷ এখনও আছে গাছ দুটো৷ তার কারণ, গাছের পরমায়ু আমাদের চেয়ে অনেক বেশি৷ ওই স্কুলে আমি যখন পড়েছিলাম, তখন তোমাদের মতো বয়েস৷ আজ আমি প্রবীণ৷ আর কিছুকাল পরে হয়তো চলেই যাব, কিন্তু ওই অর্জুন গাছ তখনও বেঁচে থাকবে আর ওই গঙ্গা তখনও প্রবাহিত হবে৷

ওই স্কুলের ভিতরে যখন ঢুকি, দেখি একটা ঘোরানো সিঁড়ি৷ তারপর প্রধান শিক্ষকের ঘর৷ সেই ঘরে, প্রথম যেদিন আমি ভরতি হতে যাই সেদিনের স্মৃতি আজও স্পষ্ট মনে আছে৷ সেটা ছিল শীতকাল৷ তখন স্কুলের ভরতি-টরতিগুলো সব শীতের দিকে হতো৷ এখন তোমাদের নতুন ব্যবস্থা কী হয়েছে আমার মাথায় আসছে না৷ এখন আমাকে একজন বললে যে একালের ছেলেমেয়েরা কী পড়বে সেটা যদি জানতে পারে তাহলেই পাশ করে যাবে৷ আমাদের সময় এত ঝামেলা ছিল না৷ আমার পিতা ছিলেন খুব ব্যস্ত মানুষ আর ভীষণ কড়া৷ কোনও কাজেই ফাঁকি দেওয়ার জো ছিল না৷ কোনওরকম অসভ্যতা বরদাস্ত করতেন না৷ ভীষণ কর্তব্যনিষ্ঠ৷ তিনি আমার দাদুকে বললেন যে, ‘একে এবার স্কুলে ভরতি করে দেওয়া হোক৷’ তার কারণ আমার তখন স্কুলে ভরতি হওয়ার খুব ইচ্ছা জেগেছে৷ সেকালের রেওয়াজ ছিল ছেলেমেয়েদের খুব তাড়াতাড়ি স্কুলে ভরতি না করা৷ প্রথমে বাড়িতে তাদের খুব ভালো করে পড়ানো হবে৷ বাংলা, হাতের লেখা, ইংরেজি, গ্রামার, ব্যাকরণ, অঙ্ক সবকিছুই খুব ভালোভাবে শেখানো হবে৷ এটাকে তাঁরা বলতেন ভিত বা ফাউন্ডেশন্৷ সেটা তৈরি হওয়ার পর স্কুলে শুধুমাত্র ভরতি হয়ে পরপর পরীক্ষায় পাশ করা৷ অর্থাৎ যদি ভিতটা কাঁচা হয় তাহলে ভবিষ্যতে শিক্ষার যে বনিয়াদটা তৈরি হবে বা বাড়িটা তৈরি হবে সেটা নড়বড়ে হতে পারে৷ আমার মন কিন্তু মানে না৷ কত বড় হয়ে গেলুম৷ ইজের ছেড়ে হাফ প্যান্টে প্রোমোশন৷ সব বন্ধু-বান্ধবেরা স্কুলে চলে যাচ্ছে অথচ আমি যেতে পারছি না৷ তখন আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল৷ রোজ আমি তখন করতাম কী, গোটা চার-ছয় বই বগলে নিয়ে ঠিক স্কুল যে সময় শুরু হয় সে সময় আমাদের বাড়ির দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতাম৷ আমাদের বাড়ির দুটো সিঁড়ি ছিল, একটা সামনের একটা পিছনের৷ আমাদের সেই বাড়িটা ছিল গঙ্গার ধারে৷ বরানগর যখন ওলন্দাজদের ছিল তখন ওই বাড়িটা ছিল তাদের কর্মচারীদের আস্তানা৷ ওই বাড়িটার আবার খ্যাতি ছিল ভূতের বাড়ি বলে৷ আমার দাদামশায় বাড়িটা কিনেছিলেন৷ সবাই সে সময় ‘এটা ভূতের বাড়ি, এটা আপনি কিনবেন না, চাটুয্যেমশায়’ বলে নিষেধ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভূত-প্রেতে ভয় পাই না, কারণ আমি ব্রহ্মদৈত্যকে গান শুনিয়েছি—সে আবার অন্য এক গল্প৷’

সেই বাড়িটার সামনে সিঁড়ি দিয়ে নামলে, মানে আমাদের ওই বাড়িটার সামনের দিকটায় ছিল একটা কাছারি বাড়ি৷ আমার মনে হতো ওই জায়গাতে কোনও বিচারস্থল বা আদালত-টাদালত ছিল৷ কারণ, সেখানে ছিল একটা কাঠের ঘেরা বারান্দা৷ আর তার পাশ দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে, সিঁড়ি উঠে গেছে৷ ওই সিঁড়ি দিয়ে নামতাম, নেমেই পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে আসতাম৷ এসেই টেবিলে খাতাপত্র সব ছড়িয়ে দিতাম—যেন স্কুলে গিয়েছি৷ সারা দুপুর লেখাপড়া করতাম৷ কারণ দেখতাম আমার বাড়ির পাশের স্কুল চলছে৷ স্কুলে যখন টিফিন হতো আমারও টিফিন হতো৷ যখন ছেলেরা ছুটির পর বাড়ি ফিরত, আমি তখন বাইরের গেটে গিয়ে মোড় থেকে, যেন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি, এইভাবে ফিরতাম৷ এই দেখে সকলে সিদ্ধান্ত নিলেন যে না একে এবার স্কুলে ভরতি করা হোক৷ তখন আমি দাদুর সঙ্গে ক্লাস সেভেন-এ ভরতি হওয়ার জন্য গেলাম৷

আমি স্কুলে ভরতি হয়েছিলাম ক্লাস সেভেন-এ৷ স্কুলের হেডমাস্টারমশাই-এর ঘরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল৷ সেখানে দেখি ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে বড় অক্ষরে লেখা টাঙানো রয়েছে ‘আপ৷’ প্রধানশিক্ষক মহাশয় বসে আছেন একটা নীল রঙের গরম কোট পরে৷ তিনি আমাকে ডাকলেন৷ আমার দাদুর তখন খুব খ্যাতি ছিল ওই অঞ্চলে, নামী মানুষ৷ কারণ প্রথমত তিনি খুব ভালো গাইতে পারতেন, দ্বিতীয়ত তাঁর দারুণ ভালো চেহারা ছিল, ছয় ফুট লম্বা, সাংঘাতিক টকটকে রং এবং পৃথিবীর কোনও লোককেই কখনও পরোয়া করতেন না৷ একবার এক কাবুলিওয়ালাকে এক চড়ে চিৎপাত করে ফেলে তিনি সেই সময় একটা রেকর্ড করে ফেলেছিলেন৷ তখন সকলের ধারণা ছিল কাবুলিওয়ালাকে কেউ কাবু করতে পারে না৷ সেই কাবুলিওয়ালার কাছে পাড়ার একজন কিছু টাকা ধার করেছিল৷ কাবুলিওয়ালা এসে তাকে বাঙালি বলে খুব গালাগালি দিচ্ছিল৷ আমার ঠাকুরদা তখন বাজার থেকে ফিরছিলেন৷ তিনি কাবুলিওয়ালার কান ধরে একটা চড় মারলেন৷ তিনি পড়ে গেলেন—৷ পড়ে-পড়েই তিনি আমার দাদুর পায়ের ধুলো নিয়ে বললেন ঃ ‘কভি এইসি নহি খায়া’৷ সেদিন বাঙালির আনন্দ দেখে কে৷ দাদুর দিকে তাকিয়ে প্রধানশিক্ষক বললেন, ‘ও তো আপনাদের ফ্যামিলির ছেলে, আচ্ছা আমি গোটা কতক ট্রানস্লেশন জিগ্যেস করছি৷ ঠিক-ঠিক উত্তর দিতে পারলে আমি ভরতি করে নেব৷’ বলে সাতটা ট্রানস্লেশন বললেন পরপর বাংলা থেকে ইংরেজি করতে৷ আমি করে দিলাম৷ ব্যস, তিনি খুব খুশি৷ ক্লাস সেভেন-এ ভরতি হয়ে গেলাম৷

সেই স্কুলের স্মৃতি তোমাদের বলতে বসে আমার দুঃখ হচ্ছে৷ এখন স্কুলের আর সেই বৈশিষ্ট্য নেই, সেই ঐতিহ্যও নষ্ট হয়ে গেছে৷ পরবর্তীকালের অনেক বড়-বড় কবি, মন্ত্রী, অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সে সময় ওই স্কুলে পড়েছেন৷ স্কুলের বাইরে, ঢোকার মুখে একটা মার্বেল ফলকে লেখা আছে কোন-কোন বরেণ্য ব্যক্তি এই স্কুলে পড়ে গেছেন এবং পরবর্তী জীবনে তাঁরা কে কী হয়েছেন এবং তাঁরা কে কী নম্বর পেয়েছেন এফ. এ. বা ম্যাট্রিক পরীক্ষায়৷

আমাদের স্কুলের বাইরে কোয়ার্টারে একজন দারোয়ান থাকতেন৷ তাঁর কাজ ছিল আমাদের নজরে রাখা৷ তাঁর কথা আমি কোনওদিন ভুলব না৷ নাম ছিল রামাধর৷ তোমাদের সময়ের মতো আমাদের সময়ে স্কুলে যাওয়ার জন্যে কোনও নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ছিল না৷ আর তোমরা এখন স্কুলে এসে তোমাদের লটবহর কোথায় রাখো জানি না৷ তাতে নিশ্চয় অনেক কিছু আছে—টিফিন বাক্স, জলের বোতল, নানারকম পেন্সিল রাখার বাক্স৷ আমাদের কিন্তু এসব ছিল না৷ বই, লাল কাগজের ঘরে বাঁধাই করা সাদামাটা খাতা, পেনসিল৷ সাজ-পোশাকেরও কোনওরকম বাছ-বিচার ছিল না৷ যে কেউ যা খুশি পরে আসতে পারত, তবে তা যেন পরিষ্কার হয়৷

আমার পরিবার তো খুব কড়া পরিবার ছিল যে কারণে আমার বাড়ির প্রথম নির্দেশ ছিল এই যে, যতদিন তুমি স্কুলের ছাত্র, যতদিন পর্যন্ত তুমি কোনও চাকরি না করছ ততদিন পর্যন্ত তোমার কোনও কাপতেনি চলবে না৷ কাপতেনি বলতে কী বোঝায়? চুল ওলটানো যাবে না৷ মাসে একবার করে একজন যিনি চুল কাটেন তিনি আসবেন একটা বাক্স নিয়ে৷ আমাদের গেটের সামনে ইটের ওপর আমাকে বসাবেন৷ একটি খবরের কাগজ গোল করে কেটে গলায় গলিয়ে দেবেন৷ তারপর হাঁটুর মধ্যে আমার মাথাটাকে চেপে ধরবেন৷ আমার পিতার নির্দেশ চতুর্দিক থেকে কাটতে-কাটতে তিনি কেবল জিগ্যেস করবেন, ‘ছোটবাবু আপনি ঠিক-ঠিক বলুন৷’ পিতা বলবেন, ‘সামনের দিকে তিন ইঞ্চি, পেছনের দিকে তিন ইঞ্চি সমান করতে হবে৷ তারপর আরও তিন ইঞ্চি, তারপর ওপাশ থেকে আরও দু-ইঞ্চি সোজা কর৷ শেষে তিনি বলবেন, ‘ছোটবাবু এরপর তো চুল আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না৷’ আমার জন্যে তাঁর করুণা হবে৷ পিতা তখন বলবেন, ‘খুঁজে যখন পাচ্ছ না তখন পুরোটাই উড়িয়ে দাও৷’

যিনি আমাদের বাড়িতে চুল কাটতে আসতেন তাঁর নাম ছিল মণিকাকা৷ মণিকাকার বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির পাশেই৷ যেই দেখতাম চুল বড় হয়েছে, এর বেশি বাবা সহ্য করবেন না, আমি তখন মণিকাকা কাছে যেতাম৷ গিয়ে বলতাম, ‘এবারে যখন রবিবারে আমাদের বাড়িতে চুল কাটতে আসবেন, ক্ষমা-ঘেন্না করে একটু দেখবেন চারদিকটা যেন থাকে৷ তিনি সঙ্গে-সঙ্গে বলতেন, ‘উঁহু, ছোটবাবুর অর্ডার নেই৷ তুমি তো যাত্রা করবে না, থিয়েটার করবে না, তোমার এত বড় চুলের দরকার কী?’ শেষ পর্যন্ত ঘুষ৷ আমি তাঁকে একটা পাকা পেয়ারা কি বাগানের গাছের পাকা পেঁপে, জামরুল বা লোভনীয় কিছু একটা ধরিয়ে দিতাম৷ তিনি নির্বিবাদে সেগুলো হজম করে ফেলতেন৷ আর চুল কাটার সময় তাঁর যা কাজ তা দক্ষতার সঙ্গেই করে যেতেন৷ চতুর্দিক দিয়ে কামিয়ে মাথার মাঝখানে একটা ছোট ‘লন’ মতো করে দিতেন৷

আমাদের বাড়িতে আর একটা ব্যাপার ছিল—বাড়ির তোষক যে কাপড়ে তৈরি হতো সেই কাপড়েই তৈরি হতো আমাদের হাফ-প্যান্ট৷ আর যে কাপড়ে তৈরি হতো পরদা সেই কাপড়েই তৈরি হতো আমাদের জামা৷ আর বাইরের জুতো—সেটা যতদিন পর্যন্ত না নিজে থেকে বলত আর আমি পায়ে ধরতে পারছি না, ততদিন পর্যন্ত সেটাকে টেনে বেড়াতে হতো৷ আমার বাবা রবিবার দিন নিজেই জুতো মেরামত করতে বসতেন৷ বলতেন, ‘আয়, তোর জুতো নিয়ে আয়৷’ তালি মারতে-মারতে এমন হতো যে শেষ পর্যন্ত তার কোনটা আসল আর কোনটা নকল বোঝা যেত না৷ আসল চামড়াটা চেনবার প্রায় কোনও উপায়ই থাকত না৷ বলতেন, ‘না, বাবুগিরি চলবে না, বিলাসিতা চলবে না৷ অপচয় করো না৷ জেনে রাখো—ওয়েস্ট নট ওয়ান্ট নট৷ অপচয়ই অভাবের কারণ৷’

আমার এই যে অনাড়ম্বর ছেলেবেলা, মাঝে-মাঝে সেই জীবনে খুব বিরক্ত হতাম৷ কারণ, আমাদের পাশেই ছিল বিরাট-বিরাট বড়লোকদের বাড়ি৷ সে সময়কার বড়লোকেরা চওড়া পাড় কাপড় পরতেন৷ যাকে বলে কাঁচি ধুতি৷ আর যাঁরা খুব বড়লোক তাঁদের পাড়ে নাম লেখা থাকত৷ যেমন ধরো দেবকীভূষণবাবু কাপড় পরেছেন৷ ‘দেবকীভূষণ’ ‘দেবকীভূষণ’ এরকম একগাদা দেবকীভূষণ পাড়ে লেখা থাকত৷ আর তিনি কাপড় কেচে আসার পর ইস্ত্রি করে পাড় কুঁচিয়ে নিতেন, যাকে বলে চুনোট করা৷ কোঁচাটা কুঁড়ি করে নিয়ে হাতে করে চলতেন৷ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য৷ সিল্কের পাঞ্জাবি পরা, গলায় আবার একটা লকেট৷ তা এইরকম লোকেদের দেখলে আমার পিতা বলতেন, ‘বলো, তুমি এরকম হতে চাও কিনা?’ তা সত্যিই আমার কীরকম অদ্ভুত লাগত৷ একটা পুরুষ মানুষ, থলথলে চেহারা, একটা কোঁচা এরকম করে ধরে, গলার লকেট পরে, কীরকম আদুরে খোকা-খোকা হয়ে চলেছেন৷ বলতাম, ‘কখনও নয়’৷ সে জন্যই আমাদের ব্যবস্থা ছিল অন্যরকম৷ এখনকার কালের বোতাম দেওয়া প্যান্ট ছিল না, ছিল ইজের৷ দড়ি বাঁধা, বাঙালি ব্যাপার৷ প্যান্টের সামনে বাড়তি অংশের লটরপটর সবাই বলতেন—কোমরের নেকটাই৷ বগলে দুটো বই, তিনটে ছেঁড়া খাতা, আর একটা পেনসিল—এই নিয়ে আমরা স্কুলে যেতাম৷ তোমাদের স্কুলে যাবার সময় পায়ে মোজা, চামড়ার জুতো, চুলের কেয়ারি, টিফিন বাক্স—সবই থাকে৷ আমাদের কিন্তু এ সবের কোনও ব্যাপারই ছিল না৷ স্কুল শুরু হয়ে যাবে, এই তাড়া থাকায় কোনওরকমে দু-ঘটি জল মাথায় ঢালতাম৷ জল ঢালার পরেই ওই ভিজে চুলটাকেই এপাশ থেকে ওপাশ করে খেতে বসা৷ কানের পাশ পিঠ দিয়ে জল গড়াত৷ এরপর স্কুলে ঢুকেই যে কাণ্ডটা শুরু হতো, তা হচ্ছে, কে কোন বেঞ্চির কোন জায়গায় বসবে তা নিয়ে তাণ্ডব৷ শিক্ষক মশায় এর আসনের পাশেই ব্ল্যাকবোর্ড রয়েছে৷ আর রয়েছে একটা ডাস্টার, দুটো কাজে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য৷ এক বোর্ড মোছার কাজ, দুই আমাদের মাথায় পড়বার কাজ৷ এটাকে বলে একালের ভাষায় ডবল-অ্যাকশন—যা কখনও বোর্ডের মাথায় থাকবে কখনও পড়বে আমাদের মাথায়৷ সেকালের স্কুলে যেকোনও রকম প্রহার বা ধোলাই নীরবে সহ্য করতে হতো৷ হয়তো স্কুলে টিফিনের পরে ঢুকছি, দেখি ক্লাসের বাইরে প্রচণ্ড মার খেয়ে তিনটে ছেলে কান ধরে বসে আছে, নিল ডাউন৷ মুখ-চোখ সব ফুলে গেছে৷ তাদের ওই করুণ অবস্থা দেখে, আমারই কীরকম ভয়-ভয় করতে লাগল৷ কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, কী রে খুব কষ্ট হচ্ছে?’ একজন আবার ওই অবস্থায় আমাকে মুখ ভেঙিয়ে দিল এবং সেই দৃশ্য চোখে পড়ে গেল সংস্কৃতের পণ্ডিত মশাইয়ের৷ তিনি সঙ্গে-সঙ্গে চাপিয়ে দিলেন আর এক ডোজ৷ সুযোগ হাতছাড়া করতে নেই৷

ভাগ্য কার কখন খারাপ হবে কেউ জানে না৷ ভাগ্য হয়তো মলয়কে দেখে, তার করুণ অবস্থা দেখে হাসছে কিছুক্ষণ পরে হয়তো আমিই মলয়ের জায়গায় চলে গেলাম৷ সে জন্য আমরা, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা শিক্ষকদের খুব সমীহ করতাম৷ সভয়ে ঢুকতাম এবং কারও করুণ অবস্থা দেখলে খুব ভয়ে-ভয়ে থাকতাম৷ এখন তোমরা যখন স্কুলে আস সেটা অনেকটা কলেজে আসার মতো তাই না? কারণ আমি জানি এমন স্কুলও আছে যেখানে কোনও শিক্ষক মহাশয় কোনও ছাত্রকে যদি তিরস্কার করেন তবে তাঁকে বিস্তর দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়৷ যেমন আমি কলকাতার একটা নামী স্কুলের কথা জানি, যেখানে আমার খুব পরিচিতা এক মহিলা ইংরেজির শিক্ষিকা ছিলেন৷ তিনি একটি ছেলেকে পড়া পারেনি বলে বকেছিলেন৷ সে তখনি বলেছিল, ‘ডঁটিয়ে মত—শুনিয়ে মেরা পকেট-মানি ডেলি একশো রুপিয়া হ্যায়৷’ যে রোজ একশো টাকা পকেট-মানি পায়, সে একজন সাধারণ শিক্ষিকার বড় গলা শুনবে কেন? হোক সে শিক্ষিকা—তাতে কী হল? তিনি পরদিনই চাকরি ছেড়ে চলে এলেন৷ এই তো সব স্কুল যেখানে বকা যাবে না৷ আমাদের কালে তো ছেলেদের এইভাবে মানুষ করা হতো না৷ তারা কষ্টে মানুষ হতো৷

আমার মনে আছে, আমাদের যিনি অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন তিনি করতেন কি ক্লাসে এসেই প্রথম বেঞ্চ থেকে শেষ বেঞ্চ পর্যন্ত সবাইকে বেধড়ক পিটিয়ে দিতেন৷ কাউকে চড়, কাউকে কানমলা, কাউকে ডাস্টারের আদর, এইভাবে পুরোটা ঘুরে এসে, আমাদের মতো কয়েকজনকে আরও জব্দ করার জন্যে কঠিন একটা অঙ্ক বোর্ডে লিখে দিয়ে বলতেন, ‘কর দেখি৷’ আমাদের বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হতো৷ একে-একে৷ যথারীতি আমরা কেউ পারতাম, কেউ পারতাম না৷ যারা পারত না সবান্ধবে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতেন৷ হাফ-প্যান্ট পরা ছেলেরা সারিবদ্ধভাবে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—কীরকম লাগে! প্রতিজ্ঞা করেছিলাম জীবনে এমন কোনও কাজ করব না যাতে আমার গায়ে কোনও শিক্ষক কোনও কারণে হাত তুলতে পারেন৷ এটা শুধু লেখাপড়া নয়, অন্য সব ক্ষেত্রেও এটা করতে হবে এই ছিল সংকল্প৷ একদিন আমাদের যিনি বাংলা পড়াতেন, মঙ্গল ভট্টাচার্য, তিনি এসেই আমাকে ঠাঁই করে বেত দিয়ে মারলেন৷ আমি সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিবাদ করলাম, ‘আপনি কেন মারলেন?’ বললেন, ‘আমার মনে হল তুই আজ পড়া পারবি না৷’ ভীষণ রেগে গিয়ে বললাম, ‘এটা মুখে বললেই পারতেন স্যার৷ কোনও প্রশ্ন না করেই আপনি আমায় মারলেন কেন?’ তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি৷ উনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে প্রশ্ন হয়ে যাক—’ বলে তিনি আমাকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে লাগলেন...

আমি ছেলেবেলায় মাঝে-মাঝে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করতুম৷ একথাটা বলার একটাই কারণ, প্রত্যেক মানুষের গোটাকতক গর্বের স্থান থাকা দরকার৷ আমার আর একটা গর্ব হল নিজের পরিবার৷ আমি এমন একটা পরিবারে জন্মেছি যেখানে আমার বাবা, আমার মা, আমার ঠাকুরদা, আমার জ্যাঠামশায়, আমার দাদু, এঁরা সবাই ছিলেন গুণী৷ সকলেই সম্মান করতেন৷ তাঁদের জীবনই ছিল আমার উদাহরণ৷ মনে হতো আমাকেও ওইরকম হতে হবে৷ মানী, গুণী৷ সবাই যেন আমার জন্যে গর্ব অনুভব করে৷

আমার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, সেই সময় আমার মা মারা গেলেন৷ মা মারা যাওয়ার পর আমি একেবারে একা৷ আমাকে স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রাখলেন আমার জ্যাঠামশাই ও জ্যাঠাইমা৷ আমার জ্যাঠামশায় অত্যন্ত ভালোমানুষ ছিলেন৷ আমার মা মারা যাওয়ার পরই দাদু এসে পড়লেন৷ আমার মা আমার দাদুকে ভীষণ ভালোবাসতেন৷ আমার দাদু, আমার মামা, এঁরা সবাই লেখাপড়া-সংগীত-স্বাস্থ্যে-রূপে-গুণে এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে ‘মামার বাড়ি যাচ্ছি’ বলতে যেন একটা অন্য জগতে পৌঁছে যেতাম৷ যখনই যেতুম মনে হতো একটু আগেই সেখানে একজন গান গেয়ে গেলেন তার রেশ তখনও মেলায়নি৷ মামার বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকলেই শুনতে পেতাম একটা অসাধারণ সুরেলা সংগীতের আওয়াজ৷ একসঙ্গে তিন-চারটে তানপুরা বাজছে, হারমোনিয়াম বাজছে এবং থেকে-থেকে আমার মামা কোনও একটা রাগ-রাগিণী রেওয়াজ করছেন৷

সেকালে আমার মামা ছিলেন ভারতবর্ষের একজন বিখ্যাত গায়ক৷ তিনি গিরিজাবাবুর ছাত্র ছিলেন৷ এ ছাড়া তিনি দিলীপচাঁদ বেদীর কাছে খেয়াল শিখেছেন৷ তাঁকে দেখে অনেকে আমাকে বলতেন, ‘তোর মামা এত সুন্দর দেখতে—তোকে এরকম মর্কটের মতো দেখতে কেন?’ আমি করুণ মুখে উত্তর দিতুম, ‘আমার মা পাঁচ বছর বয়সে মারা গেলেন কিনা, তাই আমি এরকম দেখতে৷’ তখন সবাই উলটে জিগ্যেস করতেন, ‘মা মারা গেলে এরকম হয় নাকি?’ মা মারা গেলে যে কী হয় সেটা আমি জীবনে হাড়ে-হাড়ে বুঝেছি৷ যে কারণে আমি পরের বার যদি জন্মাই, ঈশ্বরের কাছে একটিই প্রার্থনা করব, হে ঈশ্বর ছেলেবেলায় যেন মাকে হারাতে না হয়৷ ছেলেবেলায় কারও যদি মা মারা যান, তাহলে তার জীবনে আর কোনও কিছুই থাকে না৷ দুঃখটা কীরকম যেন মন থেকে বেড়ে ওঠা একটা গাছের মতো হয়ে যায়৷ মা না থাকলে আর সব কিছুই থাকে, সন্দেশ থাকে, রাবড়ি থাকে, ভালো জামাকাপড় থাকে, ভালো স্কুল থাকে, কিন্তু একটা জিনিস থাকে না সেটা হচ্ছে ছায়া৷ একটা স্নেহ, মানে আমার ছেলে আমার খোকা বাড়ি ফিরে আসছে স্কুল থেকে, আমার খোকা খেতে বসবে, এই কথা বলার মতো কেউ থাকেন না৷ আমার ছেলেবেলায় আমি দেখতাম খাওয়ার সময়ে সামনে একটা থালা পড়ল, চারপাশে তরকারি সাজানো হয়ে গেল, চতুর্দিকে বাটি এসে গেল—আমাদের বাড়ির চারজন কাজের লোক এগুলো সব করেছে৷ তারা সবই করছে কিন্তু তার মধ্যে কোনও স্নেহ নেই, ভালোবাসা নেই৷ আসল কথাটা হল—ধরো যদি তুমি কাউকে একটা হীরের আংটি দাও কিন্তু তার মধ্যে কোনও ভালোবাসার ছোঁওয়া না থাকে তা সে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না৷ আর তুমি যদি রাস্তা থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে ভালোবেসে কারোকে দাও, দেখবে, সেই সামান্য উপহার ভালোবাসার ছোঁয়ার হীরে হয়ে গেছে৷ নুড়িটা হবে স্নেহের, একটা প্রতীক যা পুরো হৃদয়টা দখল করে ফেলবে৷ সেজন্য বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হচ্ছে একটা ছেলে বা মেয়ে যেন ভালোবাসার মধ্যে বড় হয়, শাসন নয়, শৃঙ্খলা নয়, প্রাচুর্য নয়, ঐশ্বর্য নয়৷ তার চারপাশ ঘিরে এমন কিছু মানুষ থাকবে যারা তাকে ভালোবাসবে৷ যাঁদের থাকা-না-থাকার ওপর ছেলেটির জীবন নির্ভর করবে৷ এইটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা৷

আমার মা মারা যাওয়ার পর আমার বাবার একইসঙ্গে মা এবং বাবা হয়ে আমাকে মানুষ করতে লাগলেন৷ তখন শীতকাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে৷ হঠাৎ-হঠাৎ সাইরেন বাজা—বিমান আক্রমণ—আর সাইরেন বাজা মাত্র নিচের ঘরের শেল্টারে চলে যাওয়া—সে এক গল্প৷ এভাবে চলতে-চলতে আমাদের বাড়িতে একটা সময় এল যখন জ্যাঠাইমা এগিয়ে এলেন, বললেন, ‘ওর মা মারা গেছে তো কী হয়েছে, আমি তো আছি৷ আমার এই জ্যাঠাইমা বার্মার রেঙ্গুনে বড় হয়েছিলেন৷ তিনি সেখানে সে-সময়কার সবচেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতা মহিলা ছিলেন৷ তিনি কী না জানতেন৷ কারণ তখন বার্মা বা ব্রহ্মদেশ নারী স্বাধীনতার দেশ ছিল৷ তিনি সেই দেশে মানুষ হয়েছিলেন বলে তাঁর সাজপোশাক, চালচলন সব সে দেশের মতো ছিল৷ আর আমাদের বাড়িতে একটু ব্রাহ্ম-ব্রাহ্ম হাওয়া বইত অর্থাৎ নারী স্বাধীনতা আমাদের বাড়িতে চিরকালই ছিল৷ মেয়েরা শৃঙ্খলিত থাকবে না, তারা ভালো জামাকাপড় পরবে গান গাইবে, লেখাপড়া শিখবে, রাঁধবে, বেড়াতে যাবে, একসঙ্গে বসে গল্প করবে এটাই ছিল এ-বাড়ির রীতি৷ আমাদের বাড়িতে একটা বিরাট ছাদ ছিল, সে ছাদের কোনও আলসে ছিল না৷ কেন না—আলসে থাকলে নাকি আকাশ দেখা যায় না৷ ছাতটা হয়ে যায় জলের ট্যাঙ্কের মতো৷ ছাদ হবে কীরকম, যেন আকাশের সঙ্গে মিশে থাকে৷ আমার বাবা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন৷ তিনি সেই ছাদে অন্তত আড়াইশো-তিনশো চন্দ্রমল্লিকার গাছ করেছিলেন টবে৷ সেও একটা অসাধারণ সাধনা৷ রাত্রিবেলা সাড়ে আটটা-ন’টার সময় এসে আমাকে বলতেন, ‘টর্চ-লাইট ধর৷’ আমি টর্চ লাইট ধরতাম, আর তিনি একটি-একটি করে চন্দ্রমল্লিকার পাতা তুলে তার তলা থেকে পোকা ঝেড়ে ফেলতেন৷ চন্দ্রমল্লিকার পাতার তলায় এক রকমের কালো-কালো পোকা হয়, যা গাছকে নষ্ট করে৷ নরম বুরুশ দিয়ে সেই পাতা ঝাড়া৷ এভাবে আড়াইশো চন্দ্রমল্লিকা গাছের পাতা ঝাড়লেন৷ সে এক মহাযজ্ঞ৷ প্রতি রাতেই এ ঘটনা ঘটত৷ আমি দেখতাম, একটা মানুষ, তিনি ছিলেন সেকালের কলকাতার নামকরা গণিতজ্ঞ এবং কেমিস্ট৷ যিনি সারাদিন নিজের কাজকর্ম করে বাড়িতে এসে আমাদের পড়িয়েছেন৷ পড়িয়ে তিনি প্রায় মাঝরাতে ছাতে উঠছেন কেন? না এখন তিনি আড়াইশো গাছকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় রসদ পরিচর্যা দেবেন৷ এই আড়াইশো গাছ যখন ফুল হয়ে ফুটবে তখন তিনি কী আনন্দটাই না পাবেন৷ পৃথিবীতে সৃষ্টিই আনন্দ৷ পৃথিবীটাকে ফুল দিয়ে, ফল দিয়ে সুন্দর জীবন দিয়ে ভরিয়ে দিলে পৃথিবীর চেহারাটা বদলে যাবে৷ সেকালের মানুষ ছিলেন এমনই নিষ্ঠাবান৷ নিজের বেঁচে থাকাটা তাঁরা তেমন গ্রাহ্যই করতেন না৷ নিজে খেলাম, নিজে পরলাম, নিজে ঘুমোলাম, এটা বড় কথা নয়৷ তাঁদের ধ্যান-ধারণা ছিল—আমার ছেলে একদিন মানুষ হবে এবং তাকে ঘিরে একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে৷ সেই পরিবেশের মধ্যে কী থাকবে? সেই পরিবেশের মধ্যে গাছ থাকবে, ফুল থাকবে, সুন্দর স্বভাবের মানুষ থাকবে, গান থাকবে, প্রতি মুহূর্তে লেখাপড়ার একটা আবহাওয়া থাকবে, আবার কখনও-কখনও বেশ মজার-মজার মুখরোচক খাওয়াদাওয়া থাকবে, সামান্য আড্ডাও থাকবে, আর থাকবে নীল আকাশ, পাখির গান৷ যা আজকের জাপানে দেখা যায়৷ জাপানিদের বেঁচে থাকার ধরনটাও অদ্ভুত৷ জাপানে, কোনও জাপানি যদি এক টুকরো জমি দেখে তো সেখানে তাঁরা রুমালের মাপের একটা লন ও একটি ফুলের বাগান তৈরি করবেনই৷ এই লন তৈরির কায়দাও অসাধারণ৷ সবুজের আঁচল পড়ে আছে যেন, তার চারপাশে সুন্দর সব ফুলের গাছ৷ সেখানে তাঁরা একটা আঁকাবাঁকা নদী তৈরি করতে পারেন৷ ছোট্ট কৃত্রিম নদী, তার ওপর হয়তো একটা সাঁকো৷ যখন চাঁদ ওঠে তখন জাপানিরা বসান মুনলাইট পার্টি৷ সারারাত বাগানে চাঁদের আলোয়—‘মুন গেজিং সেরিমনি’৷ কী দেখবেন—না চাঁদ৷ নীল আকাশের অসীম ছেয়ে ছড়িয়ে আছে চাঁদের আলো৷ এমনি চাঁদের আলো মরি যদি সেও ভালো৷ সে মরণ স্বর্গ সমান। আমাদের গান আছে, অনুভব নেই, উপভোগ নেই৷ রাত আসে লয়ে তারাদলে, চাঁদ হাসে নদীর জলে৷ আর আমরা সারারাত কাটিয়ে দি বেহুঁশ নিদ্রায়৷ এই তামসিকতার জন্যেই কি পৃথিবীতে মানুষকে পাঠিয়েছেন ঈশ্বর? মোটেই নয়৷ উপনিষদের ঋষিরা, বেদের ঋষিরা বলছেন, যে, ‘যখন তুমি শিশু, সেই অবস্থায় তুমি সংসার ছেড়ে চলে এসো ঋষির তপোবনে৷ সেখানে তুমি শিক্ষার্থী, তোমার পরিবেশ হোম, যাগযজ্ঞ, তোমরা নিজেরাই শুদ্ধমনে দিন শুরু করো অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে৷ হোমের আগুনে উৎসর্গ করো ঘৃত৷ অদ্ভুত সুন্দর সুগন্ধি ধুম আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে৷ বাতাসের দগ্ধ বিল্ব-পত্রের পুত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে৷ সেই সুগন্ধ তোমার নাকে আসবে, তোমার মনে হবে, বহুদূরের ওপার থেকে ভেসে আসছে, স্মৃতি-চেতনা, আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা যে জীবনে বেঁচেছিলেন, সে জীবনের ত্যাগনিষ্ঠ, আর সাধনার সুগন্ধে সে জীবন ছিল মন্দিরের মতো৷ একালে একজন মস্তবড় সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজি বলেছিলেন, প্রতিদিন হোম করবে, গায়ে হোমের ধোঁয়া মাখবে৷ তাহলে কী হবে? আমাদের বাইরে যে পশু-পশু গন্ধটা আছে সেটা চলে যাবে৷ এই পশুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত না হলে ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব নয়৷ ঈশ্বর অপ্রাপনীয়৷ ঈশ্বর এমন একটা শক্তি যা তোমাকে ভিতরে অনুভব করতে হবে৷ এই জানাটা তখনি সম্ভব হবে যখন তুমি নিজেকে সবচেয়ে বেশি পবিত্র করতে পারবে৷ এই পবিত্রতা আসবে জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে৷ পবিত্র জীবন কী করে যাপন করা যায় সেটা শেখাবেন আমাদের যাঁরা বড় করেছেন তাঁরা অর্থাৎ আমার পিতামাতা৷ আমার বংশ পরিচয়, আমার আত্মমর্যাদা, আমাকে ঘিরে শৈশব থেকে যে পরিবেশ তাঁরা রচনা করেছেন সেই পরিবেশই গড়ে তুলবে আমার চরিত্র৷ আমার সবচেয়ে বড় গর্বের বস্তু হচ্ছে, আমি এক বিগ্ধ শিক্ষিত পরিবারের ছেলে৷ কেউ যদি ভালো পরিবারের ছেলে হয়, তার বাবা-মা, আত্মীয় পরিজন সম্পর্কে যদি তার একটা বিরাট গর্ব থাকে তাহলে দেখবে, সে যদি দুটো ডিগ্রি-ডিপ্লোমা কমও পায়, তবুও সে প্রকৃত মানুষ হবে৷ হয়তো সে ধনী হবে না, মন্ত্রী হবে না, কিন্তু তার ভিতরে অসাধারণ একটা ব্যাপার ঘটতে থাকবে৷ কী ঘটবে? প্রথমত সে নিজেকে চিনতে শিখবে! অর্থ নয়, ধন নয়, জন নয়, মান নয়, নির্লোভ হয়ে বেঁচে থাকার মহানন্দ৷ তৃপ্তি মানুষের মনে, দেহে নয়৷ যেমন যখন আমাদের কোনও ভালো খাওয়াদাওয়া হয়—এ প্রসঙ্গে একজন বড় লেখক বলেছিলেন, ‘ভালো লেখার জন্য ভালো খাবার প্রয়োজন৷ কেন?’ না—ভালো খাওয়ার পর মনটা বলে আঃ, কী সুন্দর খেলাম! এই মন যতক্ষণ না পর্যন্ত আঃ করে উঠতে পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনও ভালো কাজই হয় না৷ সেইরকম সবকিছুই নির্ভর করছে মনের আঃ করার ওপর৷ মনের ওই আঃ করা নির্ভর করছে, তুমি কী ধরনের জীবন--ছোটবেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত, সেই চিতায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত যাপন করছ তার ওপর৷ সেই জীবন যাপন সম্পর্কে একটা কথা বলার ছিল সেটা খুবই আত্মিক—এটা ভগবানের পথ নয়, জীবনের পথ৷ চতুর্দিক থেকে নানারকম প্রলোভন তোমাকে ডাকবে। তোমার শত্রুরা সবসময় চাইবে, তোমার আত্মপুরুষের মৃত্যু ঘটুক। দেখো মানুষকে বাইরে দেখে চেনা কিন্তু বড় শক্ত৷ বাইরে সব এক, কিন্তু একজন মানুষের ভিতরে কী আছে তা বোঝা যাবে তার চরিত্র দেখে৷ সেখানে একজন মানুষ অন্যের দুঃখে কাঁদে, অন্যের বিপদে ছুটে যায়৷ আমার ছেলেবেলার একটা ঘটনা মনে আছে, আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যুদ্ধের সাজসরঞ্জামের যাওয়া আসা, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, আমেরিকান ট্রাক যাচ্ছে, ট্রেলার যাচ্ছে, গান-ক্যারেজ যাচ্ছে৷ একদিন কী কারণে আমি রাস্তাটা পার হতে যাচ্ছি, এমন সময় একটা বড় ট্রাক তীরবেগে আসছে৷ আমি এক চুলের তফাতে, সেই ট্রাকের তলায় মৃত্যু অবধারিত৷ হঠাৎ এক মহিলা ঝড়ের বেগে ছুটে এসে আমার হাত ধরে এক টান মারলেন৷ দু-জনে মিলে পাশের একটা রকের ওপর ছিটকে পড়ে গেছি৷ আমাদের কালে এই ধরনের মহিলা ছিলেন, যাঁরা নিজের ছেলেকেই শুধু ছেলে বলে মনে করতেন না, অন্যের ছেলেকেও ছেলে মনে করতেন৷ উঠেই আমার মনে হল, মহিলার কপালটা কেটে গেছে৷ আর তিনি করলেন কী, ওই অবস্থায় আমাকে বেধড়ক মারতে শুরু করলেন৷ কোনও হুঁশ নেই৷ তখন অন্য সবাই তাঁকে ধরে ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়ে মাথায় স্টিচ করিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন! এই স্মৃতি তো আমি জীবনে কখনও ভুলতে পারব না৷ সেই স্নেহের প্রহার পাওয়ার আশায় এই পৃথিবীতে বারে-বারে আমি ফিরে আসতে চাই৷ জন্ম-জন্ম সাধ যে আমার মায়ের কোলে আসি আবার৷

আমার মনে আছে, একদিন দুপুরবেলা আমি আমার এক বন্ধুকে ডাকছি—অনিল, অনিল বলে৷ ভীষণ চিৎকার করে ডাকছি৷ স্কুলের সামার ভ্যাকেশন, অনিলদের বাড়ি থেকে একটা বই আনব! সামনের বাড়ির দরজাটা খুলে গেল৷ একজন সাংঘাতিক চেহারার ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন৷ তিনি এসেই কিছু না বলে আমার কানটা ধরলেন, ধরেই ঠাস-ঠাস করে দু-গালে দুটো চড়, মেরে আবার কানমলা নাকমলা৷ কিছুই বুঝতে পারছি না৷ একালের ছেলে হলে বলত যে, আমি চিৎকার করেছি তো আপনার কী৷ রাস্তা সকলের৷ আমাদের কালে সে মানসিকতা ছিল না৷ আমি মনে করতাম যে সত্যিই তিনি আমার জ্যাঠামশায়৷ এরপর তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, ‘গাধা ছেলে, জানিস না চিৎকার করাটা হচ্ছে অসভ্যতা?’ সেই যে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সে-শিক্ষা আজও ভুলিনি৷ একটা শান্ত পাড়ায় খামোকা কারও নাম ধরে চিৎকার করাটা অসভ্যতা৷ এই যে সভ্যতা আর অসভ্যতা বোধটা এই ভাবেই মানুষ শেখে সুসভ্য অভিভাবকের কাছ থেকে৷ যেমন, আমার মনে আছে, একবার আমার বাবা আমার খাবার ধরন দেখে রেগে আগুন৷ কী হল জানি না, তিনি উঠে পঙক্তির তিনজনকে টপকে আমার কাছে এলেন৷ কানটা ধরে তুলে দিয়ে বললেন, যাও বাইরে যাও৷ কী ব্যাপার—না আমি সজনে ডাঁটা চ্যাকোর, চ্যাকোর শব্দ করে চিবোচ্ছিলাম৷ আমি তো বাইরে মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে আছি৷ পরে তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ‘শোনো, খাবে কিন্তু কোনও আওয়াজ করবে না৷’ তখন আমি আবার একটু সাহস করে জিগ্যেস করলাম, মুড়ি চিবোলে যে শব্দ হবেই৷ বললেন, দেখো, মুড়ি চিবোলে একটা শব্দ হবে, সেই শব্দের জন্যে প্রত্যেকের একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে৷ কিন্তু যে খাবারে মানসিক প্রস্তুতিটা শব্দের জন্য নেই সেখানে শব্দ করার মানেই হচ্ছে আর পাঁচজন যাঁরা বসে আছেন তাঁদের একটা অশান্তি সৃষ্টি করা৷ সেইজন্য ঢেউ করে ঢেঁকুর তোলা, যেখানে-সেখানে বিকট শব্দ করে হাঁচা অসভ্যতা৷ সচেতন হলেই সংযত হওয়া যায়৷ চায়ে চুমুক দেবে, শব্দ করবে না, চায়ের কাপ নামাবে শব্দ হবে না, এও শিক্ষা, বড় শিক্ষা৷ তিনি বলতেন—ডোন্ট মেক ইওরসেলফ এ ন্যুইসেন্স টু আদারস৷ এই শিক্ষার সঙ্গে কেমিস্ট্রি, ম্যাথেমেটিকস্-এর কোনও যোগ নেই৷ পরবর্তীকালে লেখাপড়া শিখে তোমরা যখন বিদেশে যাবে তখন এই শিক্ষা ভয়ংকর কাজে লাগবে৷ এর নাম এটিকেট৷ বিদেশে গিয়ে আমরা বদনাম কুড়িয়ে ফিরে আসি৷ কেন না, আমরা অনেক মানবিক জিনিস, সামাজিক জিনিস মানি না৷ আমার এই পঞ্চাশ বছরের জীবনে আমি তিনটে জিনিস শিখেছি৷ (এক) লেখাপড়ার একটা দাম আছে বিশেষত অ্যাকাডেমিক লাইনে৷ ধরো অক্সফোর্ডে গেলে কি কেমব্রিজে গেলে—সেখানে তোমার নিজের জ্ঞানের পরিচয় অবশ্যই দিতে হবে৷ সেখানে তোমার চেয়েও শিক্ষিত, জ্ঞানী মানুষ থাকবেন অবশ্যই৷ কারণ, জ্ঞানীর জ্ঞানী আছেন, তার উপরে বিজ্ঞানী আছেন, তার উপরে প্রজ্ঞানী আছেন৷ জ্ঞানের জগতে শেষ বলে কিছু নেই৷ সীমাহীন৷ (দুই) দামি জিনিস হল, সভ্যতা, বিনয়, নিজের আচার-আচরণ৷ (তিন) সৌরভ, চরিত্রে সুগন্ধ৷ ঘেঁটু ফুল, মাকাল ফল হয়ে লাভ নেই৷

আমাদের প্রধান শিক্ষকমহাশয় ছিলেন অদ্ভুত সুন্দর মানুষ বাইরে থেকে দেখলে ভয় হওয়ারই কথা৷ ভয়ংকর চেহারা৷ ভীষণ গম্ভীর৷ মোটা কাচের আড়ালে বড়-বড় চোখ৷ পাঞ্জাবির ঝুল এত বড়, হাঁটুর নিচে পর্যন্ত ঝুলে পড়ত৷ প্রথম দিন দেখে আমার এত ভয় করেছিল, তিনি যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, আমি ভয়ে সিঁড়ির তলায় লুকিয়ে পড়েছিলুম৷ তিনি লক্ষ্য করেছিলেন৷ আমি সিঁড়ির তলায় গুটিসুটি মেরে বসে আছি৷ সেইদিন টের পেয়েছিলুম কী অপূর্ব মজার মানুষ ছিলেন তিনি৷ গুটি-গুটি পেছন দিকে এলেন, হাতে ছিল ছাতা৷ ছাতার বাঁকানো হাতল জামার কলারে লাগিয়ে ধরে টান মারলেন৷ জামার পেছনে টান পড়ায় ফিরে তাকাতেই বললেন, ‘বেরিয়ে আয়৷ আমি বাঘ না ভালুক৷ ভয়ে লুকোচ্ছিস কেন?’

কাঁধে হাত রাখলেন৷ বন্ধুর মতো গল্প করতে-করতে বেরিয়ে এলেন স্কুল কম্পাউন্ডে—গঙ্গার ধার৷ বিশাল-বিশাল দুটো শিশুগাছ৷ আমার কাঁধে হাত রেখে পায়চারি করতে-করতে বলতে লাগলেন, ভক্তি করবে ভয় করবে না, শ্রদ্ধা করবে কিন্তু প্রশ্ন করতে ভুলবে না৷ তোমার বাবা আর শিক্ষক, জানবে দুজনেই সমান৷ এই স্কুলে তোমার পিতামহ ছিলেন নামকরা শিক্ষক৷ বিদ্যাসাগরের মতোই ছিল তাঁর চরিত্র৷ নিরহঙ্কারী, জ্ঞানী, পরোপকারী৷ কতকাল হয়ে গেছে, এই অঞ্চলের মানুষ এখনও তাঁর নাম করে৷ শ্রদ্ধার প্রণাম জানায়৷ সব সময় মনে রাখবে, তুমি সেই মহাপুরুষ যোগীনবাবুর নাতি৷ সব সময় অনুকরণ করার জন্যে সামনে এক জীবন্ত চরিত্র রাখবে৷ সংকল্প করবে আমাকে ওইরকম হতে হবে৷ সবটা না হলেও কিছুটা যদি হয়, তাহলে ভালো৷

আমার কাঁধে হাত রেখে প্রধান শিক্ষকমহাশয় বেড়াতে-বেড়াতে সেই কতকাল আগে যে কথাগুলি বলেছিলেন, আমার মনে দাগ কেটে বসে গিয়েছিল৷ সেদিন একটি গল্প বলেছিলেন৷ সেই গল্পেই শেষ হবে এই কাহিনি৷

এক বৃদ্ধ মানুষ পথের পাশে উবু হয়ে বসে একমনে কী করছেন৷ সেই রাজ্যের রাজা ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন৷ বৃদ্ধকে দেখে ঘোড়ার পিঠে বসেই প্রশ্ন করলেন, ‘বৃদ্ধ! তুমি কী করছ?’

বৃদ্ধ ঘাড় ঘুরিয়ে রাজাকে বললেন, ‘মহারাজ দেখতেই পাচ্ছেন, আমি একটি আঙুর গাছ রোপণ করছি!’

মহারাজা বললেন, ‘তোমার কি ধারণা, ওই আঙুর গাছের ফল খাওয়ার মতো তোমার বয়স আছে? কত বছর পরে ওই গাছে ফল ধরবে তুমি জানো? তখন কি তুমি বেঁচে থাকবে? বৃদ্ধ বললেন, ‘সবই আমি জানি মহারাজ৷ এই গাছ আমি আমার জন্যে পুঁতছি না৷ এই গাছ সেই ভবিষ্যৎকালের জন্যে৷ আমার পরেও অনন্তকাল এই পথে হাঁটবে৷ তারা এই গাছের মিষ্টি আঙুর খাবে তখন৷ আমি তখন কোথায় মহারাজ! দেহ চলে যাবে, থাকবে কর্ম৷ অজানা এক মানুষের পোঁতা একটি আঙুর গাছ৷ মানুষ্টাকে মনে রাখার প্রয়োজন নেই৷ ফলেই তৃপ্তি৷ পথিকের তৃষ্ণা নিবারণ৷’

মহারাজ নেমে এলেন, অহঙ্কারের ঘোড়া থেকে৷ বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনি আমার গুরু৷ আমরা সবাই নিজের জন্যেই বাঁচি৷ সেই আমির সময়সীমা কতটুকু৷ তার আগেও পৃথিবী ছিল, তার পরেও পৃথিবী থাকবে অনন্তকাল৷ কাল আর কর্ম এই হল প্রবাহ৷ মানুষ নিমিত্তমাত্র৷’

মহারাজ তাঁর গলার বহুমূল্য পদকটি বৃদ্ধের গলায় পরাতে গেলেন৷ বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘না মহারাজ, কর্মের পুরস্কার পদক নয় এই যে আপনি আমাকে গুরু বললেন, তার মানে আপনি আমার ছাত্র৷ শিক্ষিত ছাত্রই গুরুর গলার শ্রেষ্ঠ পদক৷ হীরের চেয়েও দামি৷’

মহারাজ তখন সেই বৃদ্ধকে প্রণাম করলেন৷ প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়াঃ৷ ছাত্রের এই হল কর্ম৷ সেই শিশুগাছ দুটি আজও আছে৷ আজও বয়ে যায় গঙ্গা৷ আমি বৃদ্ধ কিন্তু প্রদীপের মতো ভেতরে জ্বলে আছে, সেই অপূর্ব শিক্ষকের দিয়ে যাওয়া শিক্ষা৷ পারিনি কিছুই কিন্তু জেগে আছে বিবেক৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%