সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
তারপর কী হল?
‘ভোঁ ভোঁ করে জাহাজ ভোঁ দিল তিনবার৷ বিশাল একটা খাটের মতো, রেলিং ঘেরা, আপার ডেক৷ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি৷ ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছি৷ ডকে দাঁড়িয়ে আছেন, বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন৷ আমার দিদি, ছোট বোন৷ আমার স্কুলের বন্ধুরা৷ হেড মাস্টারমশাইও এসেছেন৷
সবাই রুমাল ওড়াচ্ছেন৷ মায়ের হাতে দুটো রুমাল৷ বাঁ হাতেরটা ছোট৷ সেইটায় চোখ মুছছেন, আর ডান হাতের বড়টা বাতাসে দোলাচ্ছেন৷ বাবার হাতে, তাঁর সেই বিখ্যাত ওয়াকিং স্টিক৷ বিলিতি বেতে তৈরি৷ অ্যালবার্ট সাহেব বিলেতে ফিরে যাওয়ার সময় বাবাকে অনেক কিছু দিয়েছিলেন৷ ওই কেন-ওয়াকিং-স্টিকটা তার মধ্যে ছিল৷
বাতাসে ঘোরালে সাঁই সাঁই শব্দ হয়৷ বাবা সেই স্টিকটা ওপরে তুলছেন, নীচে নামাচ্ছেন৷ ওপরে তুলে ডাইনে-বাঁয়ে দোলাচ্ছেন৷ ক্রমশই সব ছোট ছোট পুতুলের মতো হয়ে গেল৷
ডেকে আরও অনেকে ছিলেন৷ বেশিরভাগই সাহেব মেম৷ আমিই একমাত্র বছর-ষোলো বয়সের এক বাঙালি যুবক৷ কলকাতা তখন ইংরেজের কলকাতা৷ সারা ভারতটাই তাদের৷ সর্বত্র সাদা সাদা মৌমাছির মতো ইংরেজরা ভন ভন করছে৷ চোখে জল এল৷ পেছন দিক থেকে সুন্দর একটা রুমাল গোলাপের গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে চোখে আলতো এসে নামল৷ ধপধপে সাদা একটা হাত৷ সুন্দর একটা মুখ, সোনালি চুলে ঘেরা, পেছন দিক থেকে ঝুঁকে এল কপালের কাছে৷ পশ্চিমে সূর্য ডুবছে৷ জাহাজের ভোঁ৷ ঘসঘস শব্দ করে চিমনি-সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সমুদ্রে চলেছে৷
মিষ্টি একটা গলা-ডোন্ট ক্রাই৷ ডোন্ট ক্রাই৷ আই অ্যাম উইথ ইউ!’
‘তারপর?’
‘একেবারে গায়ের সঙ্গে লেগে আছেন এক মেমসাহেব৷ পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মেয়ে৷ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা৷ মনে পড়ল, বাবা একবার বলেছিলেন, ক্যালোরি কমে গেলে এইরকম হয়৷ সাইড পকেটে নারকোল নাড়ু ছিল৷ আমার দিদি ভরে দিয়েছিল৷ মেম সাহেবকে একটা, মেয়েকে একটা দিয়ে, নিজের মুখে ভরে দিলুম একটা৷
নাড়ু খেয়ে মেমসাহেব আর তার মেয়ে ধেই ধেই করে নাচতে লাগল৷ ডিলিসাস! ডিলিসাস! কী নাম এই বস্তুটার? বললুম, নারকোল নাড়ু৷ কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারে না৷ শেষে ছেঁটে কেটে যা বেরোল, কোলাড৷ নারকোল নাড়ুর ইংরিজি হল কোলাড৷ মেমসাহেবের নাম সাটিন, আর মেয়ের নাম ভেলভেট৷ যে-কটা নাড়ু ছিল, সব তারাই সাবাড় করে দিল৷’
‘তারপর?’
‘তারপর তো নটিংহ্যামশায়েরে গিয়ে আমার বাবার বন্ধু ভারমুখ সাহেবের বাড়িতে উঠলুম৷ বিশাল বাড়ি৷ প্যালেস৷ তিন একর জমির ওপর সাদা একটা পদ্মফুল৷ এরকম বাড়ি পৃথিবীর কোথাও নেই৷ হঠাৎ দেখছি কী, একদিন সকালে একটা সুন্দর দু’ঘোড়ায় টানা গাড়ি বিরাট বড় গেট পেরিয়ে ঢুকছে৷ আমি তখন প্রাসাদের ছাতে ব্যায়াম করছিলুম, যেমন রোজ করি৷ আমার সঙ্গে সব সময় একটা বাইনাকুলার থাকত৷ কেন থাকত? সে-কথাও বলি৷ নটিংহ্যাম, মানে ওই শায়ারে, শায়ার মানে জেলা, ওই জেলায় গাদা গাদা শূকরের চাষ হত৷ বিলিতি শুয়োর আমাদের দিশি শুয়োরের মতো নয়, যথেষ্ট রেসপেকটেবল! কী তাদের আদর! সাদা ধবধবে৷ গায়ে বিলিতি পারফিউম৷ যেখানে রাখা হয় সেই জায়গাটার বিলিতি নাম হল, পিগস্টাই৷ একদিন দেখতে গিয়েছিলুম৷ সেই সময় পিগদের লাঞ্চটাইম৷ দেখি কী! সব লেটুস-পাতা চিবোচ্ছে, আর নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলছে৷ কোট-প্যান্ট-টাই পরিয়ে দিলে, মনে হবে একগাদা সাহেব খেতে বসেছে৷’
‘ওদের মধ্যে থেকে, একটা শিশু শূকর আমাকে দেখিয়ে বলতে লাগল, ‘মাম্মি! মাম্মি! লুক, লুক, অ্যান ইন্ডিয়ান পিগ৷’ এই বলায়, তার মা খুব রেগে গেল, ‘ডোন্ট সে পিগ, হি ইজ এ ব্ল্যাক ম্যান, নিগার নিগার!’ সেই থেকে শূকরের ওপর আমার খুব রাগ, সে দিশিই হোক, কি বিলিতি! হ্যাঁ, যে-কথা বলছিলুম, ওখানকার ছেলেরা ওই শূকরের মাংস, যাকে ওরা বলে হ্যাম, সেই হ্যাম গো-গ্রাসে খায়৷ আর নটি হয়ে নটিং করে!’
‘একটু ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে যে, নটি মানে বদমাইশ, বিশেষণ তো ক্রিয়া হতে পারে না৷ ওয়াক থেকে ওয়াকিং হতে পারে, নটি থেকে নটিং মানে বদমাইশি কী করে হয়?’
‘হয়৷ ইংরেজরা সব পারে৷ সব পারে৷ হ্যাম খেয়ে নটি বয়রা নটিং করে, তাই জায়গাটার নাম, নটিংহ্যাম৷ বাইনোকুলার রাখার কারণ, চোখে লাগিয়ে থেকে থেকেই দেখতুম, নটি বয়রা হামলা করতে আসছে কি-না! হ্যাম থেকেই এসেছে হামলা শব্দটা৷ পরপর-হামলা, গামলা, মামলা৷’
‘যেই দেখতুম, আসছে, সঙ্গে সঙ্গে চালাও গুলতি৷’
‘গুলতি?’
‘ইয়েস গুলতি৷ দি মোস্ট এফেকটিভ বিতাড়ন অস্ত্র৷ সেই বাইনোকুলারে দেখছি—সাদা ঘোড়ার গাড়ি৷ দুই আরোহী নামছেন৷ দুই মহিলা৷ এ কী? এ যে সেই জাহাজের দুই সহযাত্রী, সাটিন আর ভেলভেট৷
কী কাণ্ড!’
‘তারপর?’
‘আজ আর আমার সময় নেই৷ কপ্টার এসে গেছে৷ পি এম-কে স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীত শোনাতে চল্লুম৷ টা-টা৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন