ফেরা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেকদিন পরে আমি আমার ছেলেবেলার জায়গায় ফিরে এলুম৷ আমি এখন দূর বিদেশে থাকি৷ কী করব? ভাগ্য আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে সেইখানেই তো যেতে হবে৷ কয়েকদিনের জন্যে এসেছি, মন ভীষণ টানল, তাই চলে এলুম৷ এখানে আমার আপনজন কেউ থাকে না৷ সবাই মারা গেছেন৷ আমার বাবা-মা, জ্যাঠামশাই, জেঠিমা, আমার দিদি৷ কেউ আর বেঁচে নেই৷ এক-একটা পরিবার এইরকম থাকে, যে পরিবারের সবাই মারা যায়৷ তাদের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাই৷ একসঙ্গে এক জায়গায় বসে সব গল্প হবে, মুড়ি তেলেভাজা খাওয়া হবে, ঠাকুরঘরে পুজোর ঘণ্টা বাজবে, রান্নাঘর থেকে ভালো গন্ধ ভেসে আসবে৷ এইসব সুখ তাদের কপালে লেখা নেই৷ আমি সেইরকম একজন মানুষ৷ মৃত্যু আমার জীবন থেকে সকলকে কেড়ে নিয়ে গেছে৷ এই বিশাল পৃথিবীতে আমি একেবারে একা৷ আমার কিছুই নেই, আছে একগাদা গল্প৷ বাবার গল্প, মায়ের গল্প, আমার দিদির গল্প৷ লিখতে জানলে কত কী লেখা যেত!

ছেলেবেলার এই জায়গাটা গঙ্গার ধারে৷ সেই গঙ্গার ধারেই আমাদের স্কুল৷ খুব পুরোনো স্কুল৷ স্কুলটা এখনও আছে কিন্তু এ কী অবস্থা! বাড়িটার কত দিন রং পড়েনি৷ এখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে৷ গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলুম৷ বাধা দেওয়ার কেউ নেই৷ সামনেই সেই দারোয়ানের ঘর৷ তালা বন্ধ৷ আমি যখন ছাত্র ছিলুম তখন এই ঘরে রামাধর থাকত আর থাকত তার ভাই কেশোরাম৷ দুজনেই ভীষণ ভালো ছিল৷ গরমকালে আমাদের মর্নিংস্কুল হতো৷ গেটের দু-দিকে দুটো চাঁপাগাছ ছিল৷ ভোরে তার কী সুগন্ধ! গাছ দুটো এখন আর নেই৷ রামাধর, কেশোরামেরও থাকার কথা নয়৷ তারাও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে৷ গেটের পাশে রামাধর ছোলাকাবলি বিক্রি করত৷ বাবা রোজ আমাকে এক আনা পয়সা দিতেন৷ সেই এক আনায় ছোলাকাবলি হতো কাঁচা শালপাতায়৷ ঝালঝাল, পেঁয়াজটেঁয়াজ দেওয়া৷ স্বাদটা এখনও মুখে লেগে আছে৷ ছেলেবেলার খাওয়া তো ভোলা যায় না৷ এখন মর্নিংস্কুল নেই, রামাধর নেই, ছোলাকাবলি খাওয়ার ছেলেও নেই৷ যুগ পাল্টে গেছে৷ বড় শান্ত, রামভক্ত মানুষ ছিল রামাধর৷ কেশোরামের বয়েস কম ছিল৷ সে সবসময় হাসত৷ বন্ধ ঘরটার দিকে তাকিয়ে তাদের কথা মনে পড়ে গেল৷ সেই ঘরটায় এখন কেউ থাকে কি!

পাথর-বাঁধানো ছোট্ট পথটুকু পেরিয়ে স্কুলের গাড়িবারান্দার তলায় এসে দাঁড়ালুম৷ পরপর চারটে লম্বা চওড়া ধাপ৷ ভেঙেচুরে গেছে৷ অপরিষ্কার৷ কতদিন ঝাঁট পড়েনি৷ ডানপাশের দেয়ালে মার্বেল পাথরের ফলক৷ এই স্কুলের কৃতী ছাত্রদের নাম, পরবর্তী জীবনে যাঁরা গণ্যমান্য হয়েছেন৷ পঞ্চাশ সালের পর আর কারো নাম নেই৷ সেই ফলকটা পুরো পড়লুম৷ পড়ে ভেতরে ঢুকলুম৷ করিডর৷ দুপাশে বড়-বড় ক্লাসরুম৷ খড়খড়ি পাল্লার দরজা৷ ভেঙেচুরে গেছে৷ ভেতরে সার-সার বেঞ্চ, হাইবেঞ্চ৷ ময়লা, ক্ষতবিক্ষত৷ জানলার ধারে-ধারে কত বছরের আবর্জনার স্তূপ৷

দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে ঘোর লেগে গেল৷ মনে হল ক্লাসরুম ছেলেতে ভরে গেছে৷ সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে আমি বসে আছি৷ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ক্লাস নিচ্ছেন কুমুদবাবু৷ প্রথমে রোলকল করছেন৷ ওয়ান, টু৷ সেই সেভেন বললেন, আমি অমনি দাঁড়িয়ে উঠে ইয়েস স্যার বলছি৷ বোর্ডে চক দিয়ে অঙ্ক লেখার খসখস শব্দ৷ টেবিলের ওপর ডাস্টার ঠোকার খটাস-খটাস৷ একটা সরল করো লিখেছেন৷ এখনি আমার ডাক পড়বে—বোর্ডে আয়৷ অঙ্কটা কর৷ করতে পারলে দু-চোখ ভরা আনন্দ নিয়ে তাকাবেন৷ বলবেন, ভেরি গুড৷ না পারলে দু-চোখে জল—এই সামান্য অঙ্কটা পারলি না! লেখাপড়া একেবারেই করছিস না রে! তোদের ক’জনের ওপর আমার যে বড় আশা ছিল রে!

হঠাৎ, চটকাটা ভেঙে গেল৷ কেউ কোথাও নেই৷ শূন্য অপরিষ্কার ক্লাসরুম৷ ভ্যাপসা একটা গন্ধ৷ ব্লাকবোর্ডটা হেলে আছে৷ ছুটির আগে খড়ি দিয়ে কে লিখে গেছে—পার্থ পাঁঠা৷ আমরাও এইসব লিখতুম৷ আমার সহপাঠী কিশোর ভালো কার্টুন আঁকত, শুনেছি সে এখন প্যারিসে আছে৷ মস্ত বড় চাকরি করে, ফরেন সার্ভিস৷ কে জানত কিশোর এত বড় হবে৷ প্রায় রোজই ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকত দুষ্টুমি করার অপরাধে৷ দুষ্টুমিতে কিশোরের মাথা খুব খেলত৷ মাস্টারমশাইরা মেজাজ ভালো থাকলে বলতেন—কিশোর এই মাথাটা যদি পড়ায় লাগাতে পারিস, তোকে আর আটকায় কে?

একদিনের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল৷ কিশোরের ঠিক সামনে বসত সত্যেন৷ সত্যেনের স্বভাব ছিল শিক্ষকমশাই ক্লাস থেকে বেরোলেই যে কোনও একটা প্রশ্ন নিয়ে, স্যার-স্যার করে তার পেছন-পেছন যাওয়া৷ দেখাতে চাইত, সে কত উৎসাহী ভালো ছাত্র! কী ভীষণ তার জানার আগ্রহ! আমরা বলতুম, সত্যেনের একস্ট্রা কারিক্যুলার অ্যাকটিভিটি৷ সেদিন ইতিহাসের ক্লাস শেষ হল৷ দ্বিজেনবাবু ক্লাস থেকে বেরিয়ে করিডর ধরে দোতলার সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছেন, সত্যেন যথারীতি পেছনে ছুটেছে৷ তার প্যান্টের পেছনের বগলসে লম্বা একটি দড়ি বাঁধা, সেই দড়ির শেষে একটা খালি টিনের কৌটো৷ কৌটোটা ঢ্যাং-ঢ্যাং, ঠ্যাং-ঠ্যাং শব্দে লাট খেতে-খেতে চলেছে৷ যেন দমকল যাচ্ছে৷ ক্লাসসুদ্ধ সবাই হইচই করে হাসছে৷ দ্বিজেনবাবু পেছনে ওই শব্দ শুনে ভয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়চ্ছেন৷ কিশোর চিৎকার করছে, ফায়ার-ফায়ার৷ হেডমাস্টারমশাই হন্তদন্ত হয়ে নেমে এসেছেন৷ সত্যেন তখনও বোঝেনি ব্যাপারটা কী৷ শব্দটা কেন হচ্ছে৷ ফায়ার-ফায়ার শুনেছে, দ্বিজেনবাবু প্রাণভয়ে দৌড়চ্ছেন দেখেছে৷ এইবার সত্যেন নিজেই চিৎকার শুরু করল, আগুন-আগুন৷ সেই সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে-লাফাতে উঠছে, আর খালি টিনের কৌটো আরও শব্দ করছে৷ এইবার হেডমাস্টারমশাই সত্যেনের চুলের মুঠি ধরে বেধড়ক পেটানি শুরু করলেন৷ সত্যেন তারস্বরে চিৎকার করছে, আর বলছে, ‘আমি কী করেছি স্যার, আমাকে কেন মারছেন, আমি তো স্যারের কাছে সিপাই বিদ্রোহের ভেতরের কথাটা জানতে আসছিলুম৷’ ‘লেজে কৌটো বেঁধে সিপাহি বিদ্রোহ! হনুমান৷ ছাগল’ আবার ধোলাই৷ রামধর এসে সত্যেনকে বাঁচাল৷ পেছন থেকে দড়ি-কৌটো খুলে দিল৷ কিশোর তখন ভীষণ মনোযোগী ছাত্র! ব্যাকরণ খুলে শব্দরূপ পড়ছে৷ পরের ক্লাসেই নির্মলবাবুর বাংলা ব্যাকরণ৷

সেই সত্যেন এখন কোথায়! শুনেছি কোনও এক বড় কলেজে লাইব্রেরিয়ান হয়েছে৷ সরকারি চাকরি৷ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলুম৷ সিঁড়ির সেই বাঁক, যে বাঁকে দাঁড়িয়ে হেডমাস্টারমশাই সত্যেনকে পিটেছিলেন৷ মারটা খাওয়া উচিত ছিল কিশোরের৷ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে কিশোর বেকসুর খালাস পেয়ে গেল৷ আমি রাজসাক্ষী হলে কিশোরের সাজা হতো৷ সত্যেনের পাকামি চিরকালের জন্যে বন্ধ হয়ে গেল৷

সিঁড়ির ধাপ, হাতল আর আগের মতো নেই৷ সর্বত্র দৈন্য আর অবহেলার ছাপ৷ পঞ্চাশ বছর বয়েস বেড়েছে৷ জরাজীর্ণ হয়ে গেছে৷ এত ছেলে তৈরি করেছে এই স্কুল, কেউ এই বৃদ্ধের সেবা করে না৷ সবাই সেই অর্থে কুপুত্র৷ দোতলার কোনও একটা ঘর থেকে টাইপরাইটারের শব্দ আসছে৷ দোতলার লবিতে শিক্ষকমশাইদের বসার সেই বিশাল টেবিলটা আছে৷ মেহগনি কাঠের৷ আমাদের সময় ঝকঝক করত৷ এখন একেবারে কালো ভূত৷ একগাদা চা-খাওয়া এঁটো ভাঁড় পড়ে আছে উল্টেপাল্টে৷ মনে হচ্ছিল, টেবিলটাকে পরিষ্কার করি৷ এক সময় দেশের কত নামকরা বিখ্যাত শিক্ষক এখানে বসে গেছেন৷ বড়-বড় পণ্ডিত৷ যশ, খ্যাতি, পুরস্কার, সরকারি অনুগ্রহ, কোনও কিছুর তোয়াক্কা করেননি তাঁরা৷ তাঁরা শুধু জ্ঞান দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে ভালো ছাত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন৷ অতীতের সেই সব মহান শিক্ষকদের আমি দেখতে পাচ্ছি৷ ওই তো বসে আছেন প্রাণধনবাবু, বঙ্কিমবাবু, নির্মলবাবু, অনিলবাবু, ডঃ কাঞ্জিলাল, পণ্ডিত ভুজঙ্গবাবু৷ সবাই যেন একসঙ্গে বসে আছেন৷ সুপণ্ডিত নলিনীবাবু গম্ভীর মুখে আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে কিছু বলছেন৷ সবাই গভীর আগ্রহে শুনছেন৷

শীর্ণকায় এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে৷ ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বললেন, ‘কী চাই? এখানে কী করছেন? স্কুলের এখন ছুটি৷’

‘পঞ্চাশ বছর আগে এই স্কুলে আমি প্রথম ভরতি হয়েছিলুম তখন কাঞ্জিলাল স্যার হেডমাস্টারমশাই ছিলেন৷’

‘ছিলেন-ছিলেন৷ এখন আর তিনি এখানে থাকেন না৷’

‘সে আমি জানি৷ তিনি ভবপারে৷ আমি এখন বিদেশে থাকি৷ তিরিশ বছর পরে এসেছি, ভাবলুম পুরোনো স্কুলটা একবার দেখে যাই৷ আপনি কি শিক্ষক?’

‘না, আমি ক্লার্ক৷’

‘আমাদের সময় পাঁচুবাবু ছিলেন হেডক্লার্ক৷ ভারি সুন্দর মানুষ ছিলেন৷ দেশে তাঁর অনেক নারকেল গাছ ছিল৷ আমাদের পুজোর পর স্কুল খুললে খুব নারকেল নাড়ু খাওয়াতেন৷

‘স্কুল দেখতে এসেছেন তাই তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘হাতে করে কিছু এনেছেন, সন্দেশ-টন্দেশ?’

‘কই, না তো!’

‘কবে আক্কেল হবে? খালি হাতে গুরুজনদের কাছে আসতে আছে? চা-কেক খাওয়ান৷’

‘কোথায় পাবো?’

‘পয়সা ছাড়লেই পাওয়া যাবে৷ দশটা টাকা দিন৷’

‘সে আমি দিচ্ছি৷ দশ কেন পঞ্চাশ দিচ্ছি৷’

‘অত কাপ্তেনি ভালো নয়, রয়েসয়ে খরচ করতে হয়৷ দিনকাল ব্যাড, ভেরি-ভেরি ব্যাড৷’

‘আপনার নামটা জানতে পারি?’

‘আমার নামটা মোহন মিত্তির৷’

মোহন মিত্তির একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘জগা৷’ বুলেটের মতো তিরিশ-বত্রিশ বছরের এক ছোকরা যে-ঘরে টাইপ হচ্ছিল সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল৷ মোহনবাবু বললেন, ‘যাও, চা আর খাস্তা নিমকি বিস্কুট নিয়ে এসো৷ স্বাস্থ্যে অবহেলা কোরো না৷ সুযোগ পেলেই খাবে৷ ইনি আমাদের এক্স-স্টুডেন্ট৷ কী নাম আপনার?’

‘প্রশান্ত চ্যাটার্জি৷’

‘কী করেন?’

‘আমি আমেরিকায় চাকরি করি৷’

‘এই স্কুলের ছেলে আমেরিকায়৷ তাজ্জব কি বাত!’

‘কেন স্কুলটা খারাপ না কি? নিচের ওই মার্বেল ফলকের নামগুলো দেখেননি?’

‘দেখব না কেন? এ-দেশ হল এক পিসের দেশ৷’

‘তার মানে?’

‘মানে সব ওয়ান পিস৷ এক পিস রবীন্দ্রনাথ, এক পিস নজরুল, এক পিস শরৎচন্দ্র, নেতাজী সুভাষ৷ ভাঙিয়ে যদ্দিন চলে৷ এ-বছর আমাদের রেজাল্ট জানেন? সেন্ট পারসেন্ট৷’

‘সেন্ট পারসেন্ট পাশ!’

‘আজ্ঞে না৷ সেন্ট পারসেন্ট ফেল৷ পকেটে বিলিতি সিগারেট নেই?’

‘আছে৷’

‘চেপে রেখেছেন কেন ভাই? মনটাকে কখনও সঙ্কীর্ণ করবেন না৷ ওই জন্যেই বাঙালি তলিয়ে যাচ্ছে৷’

এক প্যাকেট মার্লব্রো ছিল পকেটে, মোহন মিত্তিরকে দিতেই খুব খুশি৷ ঘরে গিয়ে বসেই সেই গানটা মনে পড়ল, ধূলায়-ধূলায় ধূসর হব৷ এত ধুলো কল্পনা করা যায় না৷ পঞ্চাশ বছরের ধুলো৷ ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘মোহনবাবু মাঝেসাঝে ঝাড়াঝাড়ি করলে কেমন হয়?’

‘খুব খারাপ হয়৷ ধুলো মানেই ইনফেকসান, জার্ম৷ যত ঝাড়বেন তত উড়বে৷ সাবধানে রেখে দিলে ক্ষতি নেই৷ পৃথিবীতে মশাই অনেক বড়-বড় জিনিস আছে সামান্য ধুলো নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন! বুঝেছি, বিদেশে থেকে আপনার বাতিক হয়েছে৷ তো থাকতে পারবেন না৷ এখানে ধুলো-ধোঁয়া-কাদা-গর্ত-গু-গোবর এই সব নিয়েই তো থাকতে হবে৷’

চা-বিস্কুট খাওয়া হল৷ মোহন মিত্তিরকে বেশ লাগছে৷ মজার মানুষ৷ জগা ছেলেটিও ভালো৷ তবে রামাধর, কেশোরামের সঙ্গে তুলনা চলে না৷ তারা ছিল সাধু চরিত্রের মানুষ৷ অবশ্য সেই যুগটা ছিল—দেবতাদের যুগ৷ মোহনবাবুকে বললুম, ‘একবার হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরটা দেখাবেন! আমার খুব প্রিয় ঘর ছিল৷’

‘সে আর এমন কথা কী! জগা ঘরটা খুলে দে৷’

ঘরটা খোলামাত্রই বদ্ধ একটা বাতাস বেরিয়ে এল৷ শিক্ষার ডেডবডি থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে৷ আলমারিগুলো আছে, বই একখানাও নেই৷ ডানদিকের আলমারিতে ছিল এনসাইক্লোপেডিয়ার সেট৷ লোপাট৷ মোহন মিত্তিরকে জিগ্যেস করে কোনও লাভ নেই৷ কিন্তু হেডমাস্টারমশাইয়ের সেই বিখ্যাত বড় চেয়ারটা কী হল?

‘মোহনবাবু, চেয়ারটা?’

‘সেই সুন্দর বড় চেয়ারটা? সেটা মাস্টারমশাইরা মারামারি করে ভেঙে ফেলেছেন৷’

‘মাস্টারমশাইরা মারামারি!’

‘ও আপনি তো বিদেশে থাকেন, জানবেন কী করে? স্কুলে যে এখন রাজনীতি ঢুকেছে৷ ডান আর বাঁ, দু-হাতে এখন তালি বাজছে৷ আর ছাত্ররা ধরে সানাইয়ের পোঁ৷’

মোহন মিত্তির আবার টাইপরাইটারে বসে গেলেন আর জগা বসে গেল খাতা সেলাই করতে৷ সামনেই মনে হয় পরীক্ষা আসছে৷ আমি স্কুলের ছোট্ট খোলা মাঠে এসে দাঁড়ালুম৷ কতকালের প্রাচীন সেই বিশাল মেহগনি গাছটা এখনও আছে৷ এই গাছের তলায় আমি আর কিশোর কতদিন বসেছি৷ গল্প হচ্ছে তো হচ্ছেই৷ নলিনীবাবু আমাদের ভূগোলের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন৷ কত দেশ, কত মানুষ, কত নদী, পাহাড়, সমুদ্র৷ আমরা কল্পনায় সেই সব জায়গায় চলে যেতুম৷ ধীরে-ধীরে সন্ধে নেমে আসত৷ বিশাল উঁচু গাছ, মাথায় টিয়ার ঝাঁক৷

গাছটার তলায় বসলুম৷ ভীষণ একা লাগল৷ কিশোর নেই, সত্যেন নেই, সন্তোষ নেই, তরুণ নেই৷ হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল, দেখি তো আছে কি না! মেহগনি গাছের ওখানে যে ধারটা পাঁচিলের দিকে, সেই ধারে একবার দোলের আগের দিন আমি আর কিশোর ছুরি দিয়ে আমাদের নাম খোদাই করেছিলুম৷ সেই বছরটাই ছিল আমাদের শেষ বছর৷ দেখি তো সেই নাম দুটো আছে কি না! আশ্চর্য! নাম দুটো ঠিকই আছে—কিশোর প্রশান্ত৷ নাম দুটো পাশাপাশি, মানুষ দুটো কত দূরে! জীবনেও আর দেখা হবে না৷

যেখান থেকে শুরু হয় সেখানে এসে আর শেষ হয় না৷ জীবন নদীর মতো৷ সেই যে একবার চলতে বেরলো, আর ফেরার নাম নেই৷ সামনে, আরও সামনে৷ সমুদ্রে গিয়ে শেষ৷ হয়তো আর আমার দেশে ফেরা হবে না৷ পকেটে একটা ছুরি ছিল৷ বিদেশি ছুরি৷ বের করলুম সেটাকে৷ জানি পাগলামি, তবু সেই সেদিন যেমন খোদাই করেছিলুম, সেইভাবে ধরে-ধরে লিখলুম—এসেছিলুম৷ কিশোর যদি কোনওদিন আসে, আর যদি মনে করে দেখে, তাহলে দেখবে আমি এসেছিলুম, মাত্র কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আবার ফিরে গিয়েছিলুম আমাদের ছেলেবেলায়৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%