সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদা বললে, ‘একটু জোরে হাঁট, অমন টুকুস-টুকুস করে হাঁটলে হবে৷ সামনের পথটা সন্ধের আগেই পেরোতে হবে৷’
‘কেন দাদা?’
‘নানা লোকে নানা কথা বলে! জায়গাটা তেমন ভালো নয়৷’
‘কেন ভালো নয়? কী আছে?’
‘বড্ড প্রশ্ন করিস৷ বলছি ভালো নয়৷’
আর প্রশ্ন করার সাহস নেই৷ আমার দাদা ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ার৷ বেশিরভাগ সময় সমুদ্রেই ভাসে৷ এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছে৷ ‘বড় বিল’ বলে একটা জায়গায় আমাদের মাসিমা থাকেন৷ আমাদের ভীষণ ভালোবাসেন৷ মা মারা যাওয়ার পরে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি৷ মাসিমারা বেশ বড়লোক৷ জায়গাটার নাম বড় বিল হয়েছে মাসিমাদেরই বড় বিলের জন্যে৷ মেসোমশাই বিরাট ব্যক্তি ছিলেন৷ বড় শিকারি, ছফুট লম্বা, ইয়া বড় গোঁফ! ছেলেবেলায় মেসোমশাই যখন আমাদের বাড়িতে আসতেন আমরা ভয়ে রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে পড়তাম৷ মেঘের মতো গম্ভীর গলা৷ এমনি খুব মজার মানুষ ছিলেন৷ কথায়-কথায় হা-হা করে হাসতেন৷ তেমনি খেতে পারতেন৷ যে ক’দিন আমাদের বাড়িতে থাকতেন, মনে হতো উৎসব চলছে৷ কী আনন্দ আমাদের৷ ভয় ভেঙে যেতে খুব একটা দেরি হয় না৷ রাত্তিরে আমাদের সকলকে বসিয়ে একের পর এক গল্প বলতেন৷ মজার-মজার গল্প৷ নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার গল্প৷ বারোটা বাজল, একটা বাজল, কেউ আর ওঠেই না৷ কেউ একটা হাইও তুলছে না৷
মেসোমশাই ছিলেন জীববিজ্ঞানী৷ পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গ নিয়েই থাকতেন৷ তিন-চারবার বিলেতে গেছেন৷ তাঁর গবেষণাপত্র বিলেতে ছাপা হয়েছে৷ মেসোমশাই নিজের কাজের সুবিধার জন্যে এই জঙ্গলে একটা বাংলো তৈরি করেছিলেন৷ তখন জঙ্গল আরও গভীর ছিল৷ ক্রমশই ফাঁকা হয়ে আসছে৷ মেসোমশাই আদিবাসীদের ভরসায় এই জঙ্গলে থাকতেন৷ তারাও যেমন করত মেসোমশাইও তাদের জন্য খুব করতেন৷
আমরা সেই কবে একবার এসেছিলুম৷ জি. টি. রোড পেছনে অনেক দূরে পড়ে আছে৷ আলিবর্দীর আমলে বর্গিরা এই জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত৷ অনেক মানুষ মরেছে এই জঙ্গলে৷ এক সময় বাঘও ছিল৷ এখনও থাকতে পারে৷ জঙ্গলের শেষ হলেই ঝাড়খণ্ড৷ দু-দিকে দু-হাত বাড়িয়ে পড়ে আছে আরও জঙ্গল৷ রাঁচি, ডাল্টনগঞ্জ, পালামৌ৷ বাঘ, হাতি বেড়াতে-বেড়াতে চলে আসতে পারে৷ দাদা বোধহয় সেই কারণেই পা চালিয়ে চলতে বলেছে৷
জি. টি. রোড থেকে বাঁক নেওয়ার সময় আমরা হিসেব করেছিলাম, সাধারণ গতিতে হাঁটলে আমরা দু-ঘণ্টার মধ্যে বড় বিলে পৌঁছে যাব৷ ছোট্ট একটা আদিবাসী গ্রাম৷ মেসোমশাইয়ের তৈরি৷ জেনারেটরের আলো৷ পরিশ্রুত পানীয় জলের ট্যাঙ্ক বসিয়েছিলেন৷ শিবের মন্দির, ছোট্ট একটা স্কুল, ডিসপেনসারি, একটা টিলা আছে৷ টিলার মাথায় দু-বেডের একটা হাসপাতাল৷ একটা কমিউনিটি হল৷ প্রোজেক্টর চালিয়ে শিক্ষামূলক সিনেমা দেখাতেন৷ মেসোমশাইয়ের কাজে সাহায্য করত এক আইরিশ সাহেব আর তাঁর স্ত্রী৷ আমরা একবার এসে মুগ্ধ হয়ে ফিরে গিয়েছিলুম৷
হাঁটতে খারাপ লাগছে না৷ জঙ্গলের আলো-ছায়া, শব্দ, পাতার মচমচানি, পাখির ডাক, হনুমান, সাপও আছে৷ সরসর শব্দ৷ দাদা মাঝে-মাঝে বলছে, ‘ফ্যান্টাসটিক!’ গাছের একটা ভাঙা ডাল হাতে নিয়েছে৷ দাদা বলল, ‘মাসিমা বেঁচে আছে তো?’
‘অনেক দিন খবর নেই৷’
‘কী করিস কী? স্বার্থপরের মতো বেঁচে আছিস৷ আমি সমুদ্রে থাকি, তোরা তো ডাঙায় থাকিস৷’
‘মা চলে যাওয়ার পর যোগাযোগ ছিঁড়ে গেছে৷’
‘বিরক্তিকর৷ আমার অসহ্য লাগে৷ মানুষের ভালোবাসার মূল্য দিতে জানলি না?’ হাঁটছি তো হাঁটছিই৷ এইবার রাগ হচ্ছে মেসোমশাইয়ের ওপর৷ কে বলেছিল এই জঙ্গলে বাংলো তৈরি করতে৷ শরৎকাল, শীত-শীত বাতাস৷ তবু ঘেমে গেছি৷
‘দাদা, আর কতদূর! তুমি বললে, ‘দু-ঘণ্টা৷ তিন ঘণ্টা হয়ে গেছে!’
দাদা চিন্তিত মুখে বললে, ‘তাই তো ভাবছি! ঘড়ি আমিও দেখেছি৷ শিব মন্দিরের চূড়াটা দেখতে পাচ্ছি না কেন? সেটাই তো নিশানা৷ থাকগে, হাঁটতে যখন শুরু করেছি হাঁটতেই থাকব৷ দেখি না কতক্ষণে জায়গাটা আসে৷’
দাদা গান ধরলে, ‘আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ৷’ এক সময় খুব ভালো গান গাইত৷ সুন্দর গলা৷ একের-পর-এক গান চলছে, ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি৷ ছড়িয়ে গেল ছড়িয়ে গেল, ছড়িয়ে গেল, ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি’৷
এক সময় জঙ্গল ফুরিয়ে গেল৷ সামনে ঝকঝকে পিচের রাস্তা৷ গাঁক-গাঁক করে লরি ছুটছে৷ দাদা অবাক, আমিও অবাক৷
দাদা বললে, ‘এটা কী হল?’
লোকে যেমন কার্পেট থেকে মেঝেতে পা রাখে, আমরাও সেইরকম দীর্ঘ সবুজ পেরিয়ে নীচের রাস্তায় উঠলুম৷ এই বার কোনদিকে যাব৷ ডানদিকে, না বাঁ-দিকে! এই জায়গাটাই বা কোন জায়গা?
দাদা বললে, ‘ডানদিকে চল৷’
কিছু দূর হাঁটার পর ছোটখাটো একটা গঞ্জ পাওয়া গেল৷ চায়ের দোকান, খাওয়ার দোকান, সবই আছে৷ দাদা একজনকে জিগ্যেস করলেন, ‘ভাই, জায়গাটার নাম কী?’
লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ৷ বোধহয় ভাবছেন এ আবার কী? কোথা থেকে এল এরা? জায়গার নাম না জেনেই জায়গাটায় এসে হাজির!
লোকটি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘রাঁচি!’
দাদা জিগ্যেস করল, ‘বড় বিল জায়গাটা কোথায়?’
তিনি বলতে পারলেন না৷ চলে গেলেন৷ কেউ বলতে পারলেন না৷ আমরা একটা হোটেলে গিয়ে উঠলুম৷ বেশ রইলুম কয়েকদিন৷
কিন্তু বড় বিল জায়গাটা হারিয়েই গেল৷ আর খুঁজে পাওয়া গেল না! সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল সবাই! এ এক রহস্য!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন