সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মহারাজের সঙ্গে আমরা তিনজন কাশীতে এসেছি৷ আজ তৃতীয় দিন৷ আমরা কেদারঘাটে বসে আছি৷ ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে জলের দিকে৷ এই ঘাটটি ভারি সুন্দর৷ অনেকটা আগেই সন্ধ্যা হয়েছে৷ ঘাটে, ঘাটে মা গঙ্গার সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে৷ বড় বড় প্রদীপ জ্বলন্ত শিখা নিয়ে শূন্যে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নানা ছন্দে বারাণসীর রাতকে স্বাগত জানিয়েছে৷ এই সব প্রদীপ এত ভারী—আমি তুলতে পারব না৷ সব কোলাহল ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে৷ চতুর্দিকে ছায়া ছায়া মানুষ৷ এইবার আশ্রয়ে ফেরার পালা৷ দুদিকে দুটি নদী—বরুণা আর অসি—মাঝখানে এই মহাতীর্থ বারাণসী৷
মহারাজকে ঘিরে বসে আছি আমরা৷ সংসার-টংসার আর ভালো লাগে না৷ সেই একই দিন, একই রাত৷ ঘুরে-ফিরে একই কথা৷ কাগজে কাগজে একই খবর৷ সুন্দর চেহারার এক সাধু জলস্পর্শ করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসছেন৷ আলো অন্ধকারে তাঁকে মনে হচ্ছে সাক্ষাৎ শিব৷ ধবধবে ফর্সা, খাড়া নাক৷ ঘাড়ের কাছে সোনালি চুলের ঢেউ৷ গেরুয়া পোশাক৷ আমাদের কাছাকাছি এসে বললেন, ‘শিব, শিব’৷ আমরাও সমস্বরে ‘শিব শিব’ বলে উঠলুম৷ এমন গভীর ভাবে শিব-নাম আগে কখনো উচ্চারণ করিনি৷ আমরা প্রণাম করার আগ্রহে চঞ্চল হয়েছি দেখে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘আসন ছেড়ো না৷ স্থির হয়ে বোসো৷ পরমানন্দ কী বলে শোনো৷ যা শুনবে তাই কাজে লাগবে৷’
আমাদের মহারাজ আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘আমাকে আপনি চেনেন?’
সাধু বললেন, ‘এই তো, এই তো, এখুনি চেনা হল৷ আমরা দুজন তো একপালকের পাখি৷ তুমি অনেকটা এগিয়েছ পরমানন্দ৷ আর একটু এগোলেই দরজা৷ মনে হবে তালাবন্ধ, কিন্তু আঙুল ঠেকালেই খুলে যাবে৷’
মহারাজ উঠে দাঁড়ালেন, ‘আপনি কে? আমি খুব হতাশায় ভুগছি৷ তীর্থে তীর্থে ঘুরছি৷ পথ দেখতে পাচ্ছি না৷’
‘উল্টোদিকে ঘুরে গেলে তুমি যে ফেলে আসা পথই দেখবে৷ সাধুর পথ সামনের পথ৷ ভুলেও পেছনের দিকে তাকাবে না৷ ছাড়তে ছাড়তে যাবে৷ ভেতরে কিছুই যেন গোটানো না থাকে৷ পরমানন্দ, জীবন যেন একটা ঘুড়ি৷ তোমার হাতে লাটাই৷ বেড়ে যাও, বেড়ে যাও, দূর-দূর আকাশে, সুতো শেষ, এইবার সুতোটা কেটে দাও৷ কোথায় গেল কে জানে৷ ওই দেখ, বাবা কেদারেশ্বরের মন্দির৷ এই ঘাটটির মালিকানা ছিল কুমারস্বামী মঠের৷ উঠেই যখন পড়েছ, আমার সঙ্গে চলো৷ এই বারাণসীতে ইতিহাস থই থই করছে৷ এখানে বসে কী হবে! আমার সঙ্গে চলো৷’
এই আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না৷ আমরা তাঁকে অনুসরণ করছি৷ রাতের বারাণসী৷ সারারাত জেগে থাকে এই তীর্থ৷ মাথার ওপর দিয়ে তারারা ভেসে ভেসে চলে যায় দিনের আকাশে৷ পথে পথে মানুষের মেলা৷ এত মন্দির! আরতি আর শেষ হয় না৷ কত ঘাট, চারশো-পাঁচশো বছরের প্রাচীন ঘাটও রয়েছে৷ দশাশ্বমেধ, অসি ঘাট, তুলসীদাস ঘাট, পরেশনাথ ঘাট, শাহজাদা ঘাট, শিবালা ঘাট, হরিশচন্দ্র ঘাট, মানস সরোবর ঘাট৷ এই সব ভাবতে-ভাবতে, ভিড় ঠেলে চলতে চলতে আমরা বোধহয় শহরের একান্তে নির্জন একটা জায়গায় চলে এসেছি৷ বেশ বড় সুন্দর একটি বাগান, অপূর্ব একটি মন্দির৷
সাধুজি বললেন, ‘এই হল গুরুধাম৷ এইখানেই আমি কিছুদিন থাকব৷ এই মহল্লাটিকে বলা হয় কাশ্মীরিগঞ্জ৷ বারো একর জমির ওপর ১৮১৪ সালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল৷ মন্দিরে রয়েছেন ‘করুণানিধান’ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ আর শ্রীমতী রাধা৷ শিবের রাজত্বে শ্রীকৃষ্ণ! এই সুন্দর মন্দিরের নকশা তৈরি করেছিলেন রাজা স্বয়ং৷ তাঁর রুচিবোধের প্রশংসা করতেই হবে৷ এদিকটায় দর্শনার্থী কম আসেন৷ আমার পক্ষে খুবই ভালো৷ আপনারা মন্দির দর্শন করুন, অপূর্ব বিগ্রহ৷ জীবন্ত অন্ধকারে অন্যদিকে না যাওয়াই ভালো৷ আজ রাতে আপনারা এই ধামেই থাকবেন, রাজ অতিথি হয়ে৷ আমি সেবার ব্যবস্থা করে আসি৷’
মহারাজ বললেন, ‘ভালোই হল, বাবার কৃপা৷ গুরুধাম মানে জয়নারায়ণ মন্দিরটি তাঁর গুরুদেবকে উৎসর্গ করে গেছেন৷ গুরুই তো পথ দেখান৷ গুরু ছাড়া কোনো শিক্ষাই হয় না৷ শহরের একপাশে জায়গাটি ভারি নির্জন৷ সাধন ভজনের উপযুক্ত৷ মন চাইছে, একটা জায়গা দেখে এখুনি বসে পড়ি৷’
মহারাজের ভয়-ডর নেই৷ আমাদের বেশ ভয় ভয় করছে৷ বড় বড় গাছ, ছোট ছোট ঝোপ৷ রাতের ফুল ফুটছে৷ তীব্র গন্ধ৷ রাতের তারারা যেন গাছের পাতায় পাতায় আটকে ঝুলছে৷ বিশাল একটা কূল, সব অন্ধকার গিলে বসে আছে৷ পড়ে গেলে কোন অতলে তলিয়ে যাব কে জানে! অনেক দূরে কারা যেন কথা বলছে৷ আগুনের আভা অন্ধকারের দেয়ালে কাঁপছে৷ সম্ভবত রান্নাঘর৷ অনুমান করার চেষ্টা করছি, এখানে কী কী জন্তুজানোয়ার থাকতে পারে—একটা ময়াল সাপ থাকলে বেশ হয়৷ বিরাট নয় মাঝারি মাপের একটা ভল্লুক, বাঘ না থাকাই ভালো৷ গাছের আড়ালে আড়ালে প্রচুর বাঁদর থাকবেই৷ বারাণসীর বিখ্যাত বাঁদর৷ এদিকে-ওদিকে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া আমগাছ৷ বেনারসের ল্যাংড়া আম বিখ্যাত! অনেকটা দূরে একটা কুটিয়া৷ আলো দেখা যাচ্ছে৷ গান গাইছে কেউ৷ খুব সুরেলা গলা৷ গাছের একটা ডাল অনেকটা ঝুঁকে পড়ে আবার সোজা হয়ে গেল৷ একপাশে এক জোড়া জুতো পড়ে আছে৷ মানুষ কোনো পদ থেকে পদত্যাগ করে, এ যেন জুতো পদত্যাগ করেছে৷ নাকে এল তুলসীর গন্ধ৷ ডান দিকে তুলসীকানন৷
সাধুজি বেশি দূরে যেতে বারণ করেছেন৷ কিন্তু মন চাইছে, ওদিকে ওদিকে, আরও ওদিকে কী সব আছে দেখে আসি৷ কখন যে সকাল হবে! উদ্যানের বাইরে সরু পথ ধরে একটা টাঙ্গা চলে গেল৷ চাকার ছড়ছড় শব্দ৷ পরক্ষণেই সব নিস্তব্ধ৷ আমরা কিন্তু পাকশালার সামনে এসে পড়েছি৷ উঁচু একটা দাওয়া৷ পাশাপাশি তিনটে ঘর৷ একটা ঘরে রান্না হচ্ছে৷
অবাক হয়ে দেখলুম আমাদের সাধুজি রান্না করছেন৷ মুখে একটা কাপড়ের ফেট্টি৷ মহারাজ বললেন, ‘এইটাই নিয়ম৷ ভগবানের ভোগ রান্নার সময় মুখ বেঁধে রাখতে হয়৷ খুব বড়মাপের সাধু৷ সিদ্ধ মহাপুরুষ৷ শরীর ঘিরে জ্যোতি৷ আগুনের তাপে মুখটা যেন ঝকঝকে পেতল৷ আমার কিছু হল না রে! বৃথাই ঘোরাঘুরি৷ সব তীর্থই তো হল, ভগবানের দেখা তো পেলাম না৷ কাশীর গঙ্গায় এই শরীরটা এইবার ফেলে দোবো৷ বাজে, বাজে একেবারে যাচ্ছেতাই৷’
মহারাজের চোখে জল৷ আলো পড়ে চিকচিক করছে৷ ভোগারতি শেষ হল৷ মন্দিরের কাজ শেষ৷ দেবতারা সুখ শয়নে৷ আমাদের ডাক পড়ল৷ খাবার ঘরে পর পর আসন৷ সাধুজি রাতে আহার করেন না৷ আমাদের জন্যে লুচি, তরকারি, বারাণসীর বিখ্যাত মালাই, আরও নানা রকম৷ সাধুজি নিজে তদারকি করছেন৷ বহুদিন এমন সুস্বাদু প্রসাদ বরাতে জোটেনি৷ মহারাজ ফিসফিস করে বললেন, ‘সংযম, বেশি খেয়ো না৷’ সে তো বললেন, কিন্তু লোভ৷ সমস্ত রান্নাই হয়েছে খাঁটি ঘি দিয়ে৷ অপূর্ব সুগন্ধ৷ প্রকৃতই দেবভোগ৷ সাধুজি মৃদু হেসে বললেন, ‘জানি, পরমানন্দ কী বলছেন, আমি বলছি, প্রাণ ভরে খাও৷ আমার প্রভু খুশি হবেন৷’
অনেকদিন ঘড়ির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই৷ অনুমানে বুঝতে পারি ক’টা বাজল৷ এখন মনে হয় মধ্যরাত৷ কোথাও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর বসেছে৷ কানে আসছে সুর৷ কখনো বেশ জোরে, কখনো আস্তে৷ বেশ বড় একটা ঘর৷ মেঝেতে কার্পেট পাতা৷ সারাদিনের পর আমরা একটু বসেছি৷ সাধুজিও বসেছেন, যেন উজ্জ্বল একটি আলো৷ মুখে হাসি৷ আমাদের দেখছেন৷ হঠাৎ বললেন, ‘আজকের এই রাত, আর হয়তো ফিরে আসবে না৷ এই জীবন এক পথচলা৷ কখনো একেবারে একা, কখনো সঙ্গে কয়েকজন৷ এ এমন চলা, যে ফেরা যায় না৷ যাকে বলছি আজ, একটু পরেই কাল হয়ে যাবে৷ কে চলছে? সময়৷ বাবা! আমরা এগোচ্ছি না পেছোচ্ছি! আমরা ক্রমশ, ক্রমশ অতীত হয়ে যাচ্ছি৷ থাকার দিন বাড়ছে, যাওয়ার দিন এগিয়ে আসছে৷’
সাধুজি হা হা করে হেসে বললেন, ‘এ বড় মজা—আমার খরচটাই আমার জমা৷ শোনো, আমি তোমাদের একটা গল্প বলি৷ দেখো না কী পাও!’
এক রাজা৷ ‘হাড় কেপ্পন’৷ ঘরোয়া ভাষায় আমরা এই রকমই বলি৷ জল গলে না হাত দিয়ে৷ তবে রাজা তো৷ স্ত্রী, পুত্র, পরিবার, পাত্র, মিত্র, অমাত্য, সিংহাসন, পাদানি, রাজছত্র, সবই আছে৷ কিন্তু রাজা ভারি কৃপণ৷ ভীষণ হিসেবি৷ একদিন এক নট রাজসভায় এসে রাজাকে বললেন, ‘যদি অনুমতি হয় তো একদিন এই সভায় আমরা নাচ-গান করব৷ আপনাদের খুব ভালো লাগবে—গ্যারান্টি৷ খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আমাদের খুব নামডাক আছে৷’
রাজা বললেন, ‘ঠিক আছে, সে একদিন হলেই হয়৷ আমি জানাব৷’
দশ-বারো দিন হয়ে গেল রাজামশাই হ্যাঁ-না কিছুই বলেন না৷ যেন ভুলেই গেছেন৷ রাজসভার সকলে, রাজ পরিবারের সবাই ধৈর্য হারা৷ অনেকদিন তেমন কোনো আমোদ-প্রমোদ হয়নি৷ রাজার চুপ-চাপ থাকার কারণ—‘হ্যাঁ’ বললেই তো গুচ্ছের পয়সা খরচ৷ এদিকে দেরি দেখে সেই নট আবার এসে হাজির৷ তিনি ইতিমধ্যে জেনে গেছেন, রাজা ওয়ান-পাইস ফাদার-মাদার৷ নট বললেন, ‘মহারাজ! এই অনুষ্ঠানের জন্যে আপনার এক পয়সাও খরচ হবে না৷ শুধু অনুমতি দিন৷ যারা অনুষ্ঠান দেখবেন, তাঁরা খুশি হয়ে নট আর নটীকে যদি কিছু বখশিস দেন—সেইটাই যথেষ্ট৷ আপনার কোষাগার থেকে কিচ্ছু দিতে হবে না৷’
রাজা বললেন, ‘বাঃ, এ তো খুব ভালো কথা, তাহলে আর আমার আপত্তি কীসের!’
পরের দিন সন্ধ্যা বেলায় নট আর নটী তাঁদের বাজনা-টাজনা নিয়ে, সেজেগুজে সভায় এলেন৷ আজ খুব নাচ-গান হবে৷ সভা ভর্তি৷ রং-বেরঙের পোশাক৷ উঁচু আসনে রাজার দুপাশে তাঁর পরিবার পরিজনেরা বসে আছেন৷ ঘোষণা হতেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল৷ জমজমাট ব্যাপার! যেমন গান, সেই রকম নাচ৷ সকলেই মোহিত৷ মাঝে মাঝে এদিক ওদিক থেকে শব্দ উঠছে ‘কেয়া বাত’, ‘কেয়া বাত’৷
রাত বাড়ছে৷ আসর জমছে৷ বারোটা বাজল, একটা বাজল৷ থালা খালি৷ একটা কানা কড়িও সেই থালায় ফেলেনি কেউ৷ বিনা পয়সার নাচ-গান৷ মাঝে মাঝে শুধু তারিফ৷ এদিকে রাত প্রায় শেষ হয়ে এল, আর মাত্র ঘণ্টা দুই বাকি৷ একটানা নাচতে নাচতে নটীর চরণদুটি ক্লান্ত৷ আর যেন পারছে না৷ তখন সে সুরে সুর মিলিয়ে তালে তাল মিলিয়ে সঙ্গী নটকে বলছে ঃ
রাত দো ঘড়ি রহ্ গিয়া, থক্ গিয়া পিঞ্জর আজ,
কহে নটী, এ বামদেব, শুধুই তাল বাজ৷
অর্থাৎ, নট বামদেব, সন্ধে থেকেই নেচেই চলেছি, এখন রাত দুপুর, একটি কানাকড়িও কেউ দেয়নি, আমার শরীরে আর শক্তি নেই, তুমি শুধু বাজিয়েই চলেছ৷
নট এই দোঁহার উত্তর দিচ্ছে:
বহুৎ গেয়ি, থোড়ি রহি, থোড়ি ভি আর যায়,
কহে নট, এ নায়িকা তালমে ভঙ্গ না পায়৷
নটী! রাত তো প্রায় শেষ৷ ভোর হতে আর মাত্র আটচল্লিশ মিনিট বাকি৷ (এক ঘড়ি চব্বিশ মিনিট), তুমি তালভঙ্গ কোরো না৷
সভার এক পাশে বসেছিলেন এক সাধু৷ তিনি দুজনের মধ্যে এই কথা শুনলেন৷ তিনি সাধু৷ তাঁর তো কিছুই নেই৷ সম্বল একটি কম্বল৷ তিনি কম্বলটি নটকে দিয়ে দিলেন৷ রাজপুত্র বসেছিলেন রাজার পাশে, তিনি ঝট্ করে নিজের হাতের জড়োয়ার বালাটি খুলে নটের সামনে রাখলেন৷ রাজকন্যা সঙ্গে সঙ্গে নিজের গলার বহুমূল্য হারটি নটকে দিয়ে দিলেন৷
রাজামশাই অবাক হয়ে দেখছেন৷ ভোর হল৷ আসর শেষ৷
রাজা প্রথমে প্রশ্ন করলেন সাধুকে—‘কী এমন হল, যে আপনার শীতের সম্বল একমাত্র কম্বলটি দিয়ে দিলেন?’
সাধু বললেন, ‘রাজা সাহেব নট নটীকে যে দোঁহাটি বললেন আপনি খেয়াল করে শুনেছেন? আমি আর একবার বলছি ‘বহুৎ গেয়ি, থোড়ি রহি, থোড়ি ভি আব্ যায়, কহে নট এ নায়িকা তালমে ভঙ্গ না পায়৷’ আমার সারাটা জীবন সাধন-ভজন-তপস্যায় কাটল৷ আমি বৃদ্ধ৷ কিন্তু হঠাৎ আমার মাথায় একটা বিপরীত চিন্তা এল৷ ভোগের চিন্তা৷ আপনার মতো আমার যদি একটা রাজত্ব থাকত তাহলে বেশ হত৷ আরাম করে বসে রোজ রাতে এই রকম কত নাচ-গান শুনতাম৷ দাসী-বাঁদি, রাজ সিংহাসন, নরম বিছানা, ভালো ভালো খাবার৷ তখনই এই দোঁহা শুনে চমকে উঠলুম—এ কী ভাবছি আমি! এতকাল কঠোর তপস্যায় কাটল, এবার যাবার সময় হল, ভোগের চিন্তা! এত দিনের তপস্যা জলে যাবে? তখন নিজেকে বললুম—আরে সাধু, ওই শোন নট কী বলছে—‘অ্যায়সা ভাব মন্মে নেহে আবে, আব্ তাল ভঙ্গ নেহি হোনে পায়৷’ রাজা সাহেব বৈরাগ্যের নতুন ঢেউ এল৷ আবেগে কম্বলটা দিয়ে দিলুম৷’
রাজামশাই ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার কী হল? দামি বালাটা খুলে দিয়ে দিলে?’
রাজকুমার বললে, ‘বাবা! আপনি যদি আমার দোষ না ধরেন তাহলে সাহস করে বলতে পারি৷’
রাজা বললেন, ‘ভয় নেই, তুমি নির্ভয়ে বলো৷’
‘পিতা, আমি এখন যুবক৷ আমোদ প্রমোদের বয়েস৷ একটাই সমস্যা, আপনি যা টাকা দেন, তাতে কিছুই হয় না৷ আমি ঠিক করেছিলুম, আজ রাতে আপনাকে হত্যা করে রাজা হয়ে সিংহাসনে বসব৷ পাকা পরিকল্পনা৷ এমন সময় কানে এল নটের ওই দোঁহা৷ থমকে গেলুম—আরে এ আমি কী করতে চাইছি! আমার পিতার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে৷ আর ক’দিন৷ তিনি তো এমনিই মারা যাবেন৷ তাঁকে হত্যা করে পাপের ভাগি হতে চাইছি কেন? বহুৎ রোজ তো বিত গিয়া, আউর ভি কুছ রোজ যানে দেও৷ নটের তো সেই একই পরামর্শ নটীকে৷ ধৈর্য লাগাও৷ আমার ভেতরের লোভী, খুনিটা শান্ত হয়ে গেল৷ মনে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি, ভীষণ একটা বৈরাগ্য এল৷ বালাটা খুলে গুরুদক্ষিণা দিলুম৷ পিতা আমাকে ক্ষমা করবেন৷
রাজা এইবার মেয়ের দিকে তাকালেন, ‘তোমার কী খবর? দামি হার দিয়ে দিলে?’
‘যদি অভয় দেন, তাহলে বলি৷’
‘কোনো ভয় নেই৷ নির্ভয়ে বলো৷’
‘বাবা আমার বিয়ের বয়েস হয়েছে৷ খরচের ভয়ে আপনি বিয়ে দিচ্ছেন না, তাই আমি ভেবেছিলাম, আজ রাতে মন্ত্রীপুত্রের সঙ্গে কুলত্যাগ করব৷ কিন্তু ওই নটের দোঁহা৷ ভাবলুম, এ কী করতে চলেছি আমি! আমার পিতা বৃদ্ধ হয়েছেন, তাঁর একটা মান-সম্মান আছে! আর কিছুদিন কেন আমি ধৈর্য ধরতে পারছি না! ছিঃ! নট যেন আমার গুরু! আমার রক্ষাকর্তা৷ আমার হারের চেয়েও দামি কিছু থাকলে তাও দিয়ে দিতুম৷
রাজা গুম হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তাঁরও পরিবর্তন এল৷ নিজেকে সংশোধন করলেন৷ ছেলেকে সিংহাসনে বসালেন, মেয়ের বিয়ে দিলেন৷ সরে গেলেন নির্জনে৷ এইবার অপেক্ষা৷
কোথাও একটা পেটা ঘড়িতে পরপর দুবার শব্দ হল৷ রাত দুটো৷ সাধুজি হাসছেন৷ যত রাত বাড়ছে তাঁর মুখের জেল্লা যেন বাড়ছে৷ হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাবা, ধৈর্য৷ ধৈর্যই হল সার কথা৷ সবই হবে সময়ে৷ এই সময় কার হাতে? তার হাতে৷ তিনি ভগবান৷ ভাই পরমানন্দ হতাশ হলে চলবে? চলা থামিয়ো না৷ যে-পথ ফেলে এসেছ, সে-পথে আর ফিরো না৷ আর তোমাদের বলি—বয়েস কম, জীবনের এখনো অনেকটা বাকি, এই সৎসঙ্গ ছেড়ে সংসারের ঘূর্ণিতে গিয়ে পোড়ো না৷ নতুন-নতুন সকাল দেখো৷ যতটা পারো আকাশের আরও কাছে চলে যাও৷ এখানে কিছু দিন থাকো না আমার কাছে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন