বালির ওপর পোল

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মান্দারহিলে আমরা বেড়াতে গেছি৷ শীতের সময়৷ সঙ্গে আছেন আমার কাকা৷ ভীষণ ডাকাবুকো মানুষ৷ সাহস খুব বেশি হলে বলা হয়, দুঃসাহস৷ বাইরে চেঞ্জে গেলে সকাল-বিকেল বেড়াতেই হবে৷ না বেড়ালে, চেঞ্জে এসেছ কেন? কেউ না প্রশ্ন করুক, নিজেদের বিবেকই প্রশ্ন করবে৷

বেলা তিনটের সময় কাকাবাবু বললেন, গেট রেডি৷ কোট পরো৷ মোজা চাপাও৷ মাফলারে মাথা মোড়ো৷ আজ আমরা বহুদূরে যাব৷ হাঁটার রেকর্ড করব৷ দুধ খেয়েছ?

তখন সস্তাগণ্ডার বাজার৷ দুধের বন্যা বইছে৷ রোজ সকালে বিশাল এক বালতিতে দুধ আসে৷ এত দুধ যে, তাইতে রূপকথার রাজপুত্রের মতো স্নান করা যায়৷ বাড়ির আশেপাশে অসংখ্য বাঁশ আর বেতের ঝাড়৷ সেই বাঁশঝাড় থেকে কচি বাঁশ কেটে এনে, দুধ মন্থনের যন্ত্র তৈরি হয়েছে৷ মুখের দিকটা ডাল-ঘোঁটার কাঁটার মতো ছেতরে দেওয়া হয়েছে৷ নীলচে সবুজ কচি বাঁশ যে কী সুন্দর দেখতে! একটা থামের পাশে দুধভরতি বালতি৷ থামের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা সেই বাঁশের টুকরো দুধে ডুবে আছে৷ বাঁশে প্যাঁচানো আর একটা দড়ির দু-প্রান্ত ধরে টানো৷ কাঁটা অমনি বনবন করে দুধের মধ্যে ঘুরতে লাগল তরঙ্গ তুলে৷ সে এক আশ্চর্য খেলা! যত ঘোরে ততই মাখন ভেসে ওঠে, ছোট-ছোট টুকরো-টুকরো৷ সারা সকাল দুধ মন্থন করেই কেটে যায়৷

সেই দুধ এক গেলাস চোঁ-চোঁ করে খেয়ে আমরা তিনটে সাড়ে-তিনটের সময় বেরিয়ে পড়লুম৷ কাকাবাবুর হাতে একটা পাঁচ শেলের বিরাট টর্চ৷ সূর্য পাটে বসার আয়োজন করছে৷ সারাদিনের পর ছুটির সময় আসছে৷ আবার দেখা হবে কাল সকালে৷ দূরে আকাশের গায়ে মান্দারহিল লেগে আছে৷ সমুদ্র মন্থনের সময় ওই পাহাড়কেই দেবতা আর অসুরেরা মন্থন দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন৷ পাহাড়ের গায়ে নিচের দিকে দড়ি বাঁধার দাগ গোল হয়ে আছে, আমরা দেখে এসেছি, একদিন৷ দড়ি নয় বাঁধা হয়েছিল বিশাল ময়াল সাপ৷ দেবতারা ধরে ছিলেন ল্যাজের দিক, অসুরেরা ধরেছিলেন মুখের দিক৷ টানাটানির চোটে সাপের মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল কলসি-কলসি গরল৷ সেই গরল ধারণ করেছিলেন মহাদেব৷ গলার কাছটা নীল হয়ে গেল৷ মহাদেব হলেন নীলকণ্ঠ৷

আমরা দুজনে হাঁটছি আর হাঁটছি৷ কাকাবাবু হাঁটছেন নেচে-নেচে৷ হাঁটার বেগও তেমনি৷ আমাকে মাঝে-মাঝে দৌড়তে হচ্ছে৷ এই পাণ্ডববর্জিত দেশেও একটা পিচের রাস্তা সোজা চলে গেছে৷ কখনও উঠছে ওপরে, কখনও নামছে নিচে৷ চারপাশে ফাঁকা মাঠ৷ ছড়ানো পাথর৷ ছোট, বড়, মাঝারি৷ যেন দৈত্যদের লড়াই হয়ে গেছে৷

বেশ কিছুটা হাঁটার পর আমার পা ধরে গেল৷ আর পারছি না হাঁটতে৷ কাকাবাবু বললেন, তুই এখানে বসে থাক৷ আমি মাইল দশেকের আগে থামব না৷

চারপাশে ফাঁকা মাঠ৷ বাবলাগাছের ঝোপ৷ রাশি-রাশি পাথর৷ ছোট-বড় টিলা৷ সূর্য নেমে যাচ্ছে হু-হু করে পাহাড়ের আড়ালে৷ শীত আসছে হিল-হিল করে সাপের মতো৷ কাকাবাবু কথা ক’টা বলেই যে গতিতে হাঁটছিলেন, সেই গতিতেই এগিয়ে চললেন সামনের দিকে৷ দূরত্ব বেড়েই চলেছে৷ ভয়ে বুক কাঁপছে৷

চিৎকার করে ডাকলুম, কাকাবাবু!

প্রতিধ্বনি ঘুরে এল৷ যতবার ডাকি ততবারই আমার গলা, আমার ডাক বড়-ছোট ঢেউয়ের আকারে ফিরে-ফিরে আসে৷ ভীষণ ভয়ে ছুটতে শুরু করলুম৷ যে পা হাঁটছে পারছিল না, সেই পা দৌড়োচ্ছে দেখে অবাক!

বেশ খানিকটা ছুটে কাকাবাবুকে ধরে ফেলে হাঁপাতে লাগলুম৷ রাগে, অভিমানে চোখে জল এসে গেছে৷ কাকাবাবু পিঠে হাত রেখে বললেন, কী বুঝলি? দেহের জোরে নয়, মনের জোরে মানুষ সব পারে৷ পঙ্গু গিরি লঙ্ঘন করে৷

আমি না এলে আপনি আমাকে ফেলে চলে যেতেন?

না রে পাগল? আমি তোকে সাহসী করতে চাই, কষ্টসহিষ্ণু করতে চাই৷

এইবার আমরা দুজনে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে লাগলুম৷ কাকাবাবু গান ধরলেন, দুর্গম গিরি৷ গানের ফাঁকে-ফাঁকে আমি কেবল বলতে লাগলুম, সন্ধে হয়ে গেলে কী হবে!

ঘোড়ার ডিম হবে৷ দুর্গম গিরি...

আমরা ফিরব কী করে?

ফিরব না, কান্তার মরু...

আমার কোনও কথাই শুনতে চাইছেন না৷ হঠাৎ দূর আকাশের গায়ে একটা ব্রিজ দেখা গেল৷ দিন-শেষের সোনালি রোদ পড়ে রুপোর মতো ঝকঝক করছে৷

আরেব্বাস ব্রিজ রে৷ বলে কাকাবাবু ছুটতে লাগলেন৷

আশ্চর্য, ব্রিজ কোথা থেকে এল! নদী কই? আমি আনন্দে ছুটলুম৷

তখন কি জানতুম, ব্রিজের ওপারে কী আছে? ব্রিজের তলায় কী আছে? ভাগ্যে কী আছে?

চকচকে অ্যালুমিনিয়াম রঙের ব্রিজ পড়ে আছে বিশাল এক মজা নদীর ওপর৷ একফোঁটা জল নেই৷ শুধু সাদা বালি৷ শেষ দিনের আলোয় রুপোর দানার মতো চকচক করছে৷ কাকাবাবু ব্রিজের মাঝখানে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেন৷

কম উঁচু নয়৷ অনেক নিচে বালির নদী৷ তাকালেই ভয় করে৷ নদীর সব জল কে যেন শুষে নিয়েছে৷ সামনে পিছনে যতদূর তাকানো যায় ধু-ধু করছে শুধু বালি৷

এ আবার কেমন নদী? জল নেই একফোঁটা?

জল নেই কি রে, সব জল ভেতরে চলে গেছে৷ এ নদীর নাম ফল্গু নদী৷ নাম শুনেছিস? তাকিয়ে দেখ৷ যেখানটা খুঁড়বি সেখান থেকেই পরিষ্কার জল বেরোবে৷ কাচের মতো টলটলে৷

কাকাবাবুর হাতে পাঁচ শেলের এক বিরাট টর্চ৷ সেই টর্চ বাড়িয়ে দেখাতে লাগলেন, ওই দেখ জায়গায়-জায়গায় গর্ত খোঁড়ার চিহ্ন রয়েছে৷ দেহাতিরা এসে জল নিয়ে গেছে৷ দেখেছিস?

দেখেছিস বলার সঙ্গে-সঙ্গে, অসাবধানে তাঁর হাত ফসকে টর্চটা নিচে পড়ে গেল৷ এত উঁচুতে আছি, টর্চটা পড়তে কত সময় লাগল ঘড়ি ধরে দেখা থাকলে অঙ্ক কষে উচ্চতা বলা যেত৷ জিনিসটা নরম বালিতে পড়ে দেবে গেল৷

যাঃ পড়ে গেল, বলে কাকাবাবু আমার দিকে তাকালেন, কী হবে? ফেরার সময় যে অন্ধকার হয়ে যাবে৷

কী করে ফেললেন?

ইচ্ছে করে৷ বিজ্ঞানীরা মাধ্যাকর্ষণ পরীক্ষা করে একটা সূত্র বের করার জন্যে পিসার টাওয়ার থেকে নানা ওজনের জিনিস নিচে ফেলতেন৷ ঘড়ি ধরে দেখতেন কত সময় লাগল৷ বড় হলে পড়বি, ল অফ গ্র্যাভিটি৷ নিউটন সায়েবের নাম শুনেছিস, যিনি সেই গাছ থেকে আপেল পড়া দেখেছিলেন৷

হ্যাঁ, শুনেছি৷

আজ আমি সেই নিউটন৷ সেদিন ছিল আপেল৷ আজ হল টর্চ৷ এইবার ফেলব তোমাকে৷ টাক-ডুমাডুম-ডুম৷

কাকাবাবু ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিউটন হয়ে নাচতে লাগলেন৷ কাকাবাবু সব পারেন৷ হঠাৎ-হঠাৎ দুম করে এমন সব কাজ করেন, ভাবলে ভয় হয়৷ তারপর সামাল দিতে জীবন বেরিয়ে যায়৷ এইতো এখানে বেড়াতে আসার সপ্তাহখানেক আগে আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এক কাণ্ড করে এলেন৷ ঝাঁকড়া একটা রঙ্গনগাছে থলের মতো বিরাট একটা কী ঝুলছে৷ তার ওপর একগাদা মাছির মতো পোকা বিজবিজ করছে৷ কাকাবাবু বললেন, এটা কী জানিস?

দেখে মনে হয়েছিল, মৌচাক৷ বললুম, মৌচাক৷ বলেছিস ঠিক৷ মৌচাকে খোঁচা মারলে কী হয় জানিস?

আজ্ঞে হ্যাঁ, উড়ে এসে কামড়ে দেয়৷

মৌমাছির কামড় কোনওদিন খেয়েছিস?

আজ্ঞে না৷

আম খেয়েছ, জাম খেয়েছ, মৌমাছির কামড় খাওনি খোকা৷ একটু খেয়ে দেখো৷

খেয়ে দেখো, বলেই মৌচাকে মারলেন এক খোঁচা৷ তারপর কী হল, আমি বলতে পারব না৷ অন্যের মুখে যেমন শুনেছি৷ যেভাবে শুনেছি সেই ভাবেই বলি৷ ঘণ্টাখানেক পরে, আমরা দুজনে আমাদের বাড়ির উঠানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে৷ ভিজে বেড়ালের মতো চেহারা৷ মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা গায়ে ঝুলছে ঝাঁঝি আর পানা৷ মা জিগ্যেস করছেন, একী চেহারা? কী করে এমন হল? এই তো দুজনে বেশ সেজেগুজে বাগান দেখতে বেরোলে৷

মায়ের প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিতে হল না৷ উত্তর দিলেন উদ্ধারকারী গ্রামের মানুষেরা৷ তাঁরা বললেন—দেখলুম মা, এই ছেনকাটা, এই বড়বাবুটা মাঠ ভেঙে পাঁইপাঁই করে ছুটছে৷ পিছনে আকাশ কালো করে ছুটে আসছে ঝাঁকে-ঝাঁকে মৌমাছি৷ আমরা মা বলতে লাগলুম, পানা পুকুরে ডুবে পড়ো, ডুবে পড়ো, নইলে মরবে, কেউ বাঁচাতে পারবে না৷

কাকাবাবুকে কেউ না চেনে তো আমি চিনি হাড়ে-হাড়ে৷ কখন কী করে বসবেন কেউ জানে না৷ আমি পায়ে-পায়ে ধার ঘেঁষে-ঘেঁষে যেদিক থেকে এসেছিলুম, সেইদিকেই সরতে লাগলুম৷ আজ নিউটন হয়েছেন৷ সেদিন প্যাসকেল হয়ে আমাকে জলে ডোবাতে চেয়েছিলেন৷ জলের ঊর্ধ্বচাপের পরীক্ষা হচ্ছিল! আমার পায়ে-পায়ে পাশে সরে যাওয়ার চেষ্টা কাকাবাবুর নজর এড়ায়নি৷ পালাচ্ছিস কোথায়, বলে খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন৷

পালাতে চাইলেও কী পালাবার উপায় আছে! আর পালিয়ে যাবই বা কোথায়! নিচে ধু-ধু বালির নদী৷ চারপাশে গভীর জঙ্গল৷ কালো পিচের রাস্তা ক্রমশই উঁচু হয়ে-হয়ে আকাশের দিকে চলে গেছে৷ এতক্ষণ আমরা দাঁড়িয়ে আছি, একটিও মানুষ চোখে পড়ল না৷ এমন নির্জন জায়গা পৃথিবীতে আর দুটি নেই৷

পালাবার তালে আছিস? কোথায় পালাবি? একা-একা যেতে পারবি?

কাঁদো-কাঁদো গলায় বললুম, আমাকে ফেলে দেবেন না কাকাবাবু৷ মারা যাব৷

হ্যাঁ, মারা যাওয়া অত সোজা! ধপাস করে নরম বালির ওপর গিয়ে পড়বি, দেখবি কেমন আরাম লাগবে!

না, প্লিজ না৷

প্লিজ-ফ্লিজ জানি না৷ এক্সপেরিমেন্ট ইজ এক্সপেরিমেন্ট৷ টর্চটাকে তো তুলতে হবে, পয়সার জিনিস৷

ফেললেন কেন?

তুলব বলে৷

তুলে আনুন৷

আমি কেন তুলব? তোলাতুলির কাজ ছোটদের৷

আমি আবার উঠে আসব কী করে?

সে আমি জানি না৷ আমার কাজ ফেলা৷ তোমার কাজ ওঠা৷ বাঃ, তার মানে টর্চ আর আমি দুজনেই একসঙ্গে যাই৷ টর্চও গেল, আমিও গেলুম৷

আমি দড়ি ঝুলিয়ে দোব, তুই ধরে-ধরে উঠে আসবি৷

দড়ি পাবেন কোথায়?

সে আমি কাছাকাছি কোনও গ্রাম থেকে নিয়ে আসব৷

অত বড় দড়ি পাবেন?

সে দুশ্চিন্তা আমার৷ তোমাকে সেজন্যে ভাবতে হবে না৷ দড়ি আর কথা, যত খুশি ততই লম্বা করা যায়৷ লম্বা দড়ি, লম্বা বাত৷

কাকাবাবু নিচের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন, আরে! তাজ্জব কী বাত৷ টর্চটা তো আর নেই৷ তাহলে, তাহলে কী...?

তাহলে কী কাকাবাবু?

যা সন্দেহ করেছিলুম৷

চোর?

আজ্ঞে, চোর নয়, চোরা বালি৷ ইস! আমার তো আবার সব বদবিটকেলে খেয়াল, তোকে যদি দুম করে সত্যি-সত্যিই ফেলে দিতুম, তাহলে কী সর্বনাশ হতো বল তো? তুই ধীরে-ধীরে তলিয়ে যেতিস৷

চোরা বালি আবার কী জিনিস? আমি তো শুনেছি, চোরা না শোনে ধর্মের বাণী৷

চোরা বালি বড় সাংঘাতিক জিনিস৷ পরীক্ষা করে দেখতে চাস?

না বাবা৷ দেখতে গিয়ে মরি আর কি?

তুই মরবি কেন? আমি মরে তোকে দেখিয়ে যাব৷ পড়িসনি বিজ্ঞানী নিজের ওপর পরীক্ষা চালাতে গিয়ে জীবন দান করেছেন৷ এভারেস্টে উঠতে গিয়ে কত দুঃসাহসী আর ফিরে আসেননি৷ জীবন বড়, না আবিষ্কার বড়! সত্য বড়, না ভয় বড়! দেখ তাহলে!

কথা শেষ করেই কাকাবাবু ব্রিজের রেলিঙের ওপর ঝাঁ-করে উঠে পড়লেন৷ সরু রেলিঙে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না৷ লগবগ, লগবগ করছেন৷ যে-কোনও মুহূর্তে নিচে পড়ে যাবেন? পড়া মানেই চোরা বালিতে তলিয়ে যাওয়া৷

আমি আতঙ্কে চিৎকার শুরু করলুম, ও কাকাবাবু লাফাবেন না, ও কাকাবাবু লাফাবেন না৷

কে কার কথা শোনে! হাত দুটো পিছন দিকে ঝুলিয়ে বিশাল এক লাফ মারার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, আর কোনও উপায় না দেখে আমি তারস্বরে ‘কাকা, কাকা’ বলে কাঁদতে শুরু করলুম৷

কান্নায় কাজ হল৷ কাকাবাবু সামনে লাফ না মেরে পিছনে লাফ মারলেন৷ শরীরটাকে সোজা করে আমার দিকে ঘুরে বললেন, ভীরু, কাপুরুষ৷ তোর দ্বারা কিসসু হবে না৷

বাঃ, আপনি লাফ মেরে-মরে যাবেন, আর আমি একটু কাঁদব না?

আগে দেখবি তো, আমি সত্যিই মরছি কি না৷ সেই ইংরেজি কথাটা বুঝি ভুলে গেছিস, ভীরুরা প্রকৃত মরার আগে হাজার বার মরে?

পোলের ওদিক থেকে বিরাট আকারের একটা কুকুর গদাইলস্কর চালে আসছে৷ চোখ সেদিকে চলে গেল৷ ইয়া হাঁড়ির মতো গোবদা মুখ৷ বেড়ালের মতো লম্বা-লম্বা গোঁফ৷ কুকুরের গোঁফ হয়! ঠিক মনে পড়ছে না৷ এসব প্রশ্নের উত্তর কাকাবাবুই দিতে পারেন৷ তাঁর অনেক জ্ঞান৷ আমি তো বোকা৷

কাকাবাবু, কুকুরের গোঁফ হয়?

সেই স্বাস্থ্যবান কুকুরটা তখন হেলতে-দুলতে আমাদের সামনে এসে গেছে৷ হাঁটছে দ্যাখো, যেন চেঞ্জারবাবু বেড়াতে বেরিয়েছে৷ গায়ের রংটাও কী সুন্দর৷ এমন কুকুর আমাদের দেশে দেখিনি৷ ভালো খাওয়া আর জলবায়ু পেলে কি না হয়!

কাকাবাবু বললেন, এটা ব্যাটাছেলে কুকুর, তাই গোঁফ বেরিয়েছে৷ জায়গাটা কীরকম দেখেছিস, একটা সাধারণ কুকুর, তারও স্বাস্থ্য দেখ৷

কুকুরটা একবার থমকে দাঁড়াল৷ ভ্যাঁচ করে একবার হাঁচল৷ তারপর যে পথে যাচ্ছিল, সেই পথেই এগিয়ে চলল হেলে-দুলে৷ আমরা চলেছি এদিকে, ও চলেছে ওদিকে৷

কাকাবাবু বললেন, ব্যাটা, খুব খেয়েছে৷ নড়তে পারছে না৷ নাও, আর হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না৷ আমাদের কম করে আরও অন্তত মাইল-পাঁচেক হাঁটতে হবে৷ তা না হলে দূর করে দেবে৷

কে দূর করে দেবে?

ওরে বাবা, জানিস না বুঝি? চেঞ্জারদের ওপর স্থানীয় লোকের খুব নজর৷ না হাঁটলে ভালো হজম হবে না, হজম না হলে খাওয়া কমে যাবে, খাওয়া কম হলে বিক্রি কমে যাবে, ব্যবসা মরে যাবে, মোটা না হলে জায়গার নাম কমে যাবে৷ সব এক সুতোয় বাঁধা৷ নে, নে, আর দেরি নয়, জোরে-জোরে হাঁট৷

পোলটা বেশ বড়৷ আমরা প্রায় শেষে এসে গেছি৷ রাস্তা সোজা চলে গেছে, দূরে একটা পাহাড়ের দিকে৷ দু-পাশে বাবলা গাছ৷ পিছনে কারা যেন ছুটে আসছে! একপাল গোরু, ল্যাজ তুলে ছুটে আসছে৷ এখুনি আমাদের গুঁতিয়ে ফেলে দেবে৷ একপাশে সরে দাঁড়ালুম৷

এত গোরু একসঙ্গে ছুটে আসছে কেন?

দ্যাখো, দ্যাখো, দেখে শেখো৷ এদেশে গোরুরাও চুপ করে বসে থাকে না, বিকেলে দল বেঁধে ছুটতে বেরিয়েছে৷ মানুষের দুটো কাজ, বুঝলে, এক দেখে শেখা, আর এক ঠেকে শেখা চল আমরাও দৌড়ই৷

গোরুর পালের পিছনে, লাঠি উঁচিয়ে এক রাখাল আসছে পাগলের মতো ছুটতে-ছুটতে৷ গরুতে, মানুষে রেস হচ্ছে যেন৷

কাকাবাবু হেঁকে উৎসাহ দিলেন, বহুত আচ্ছা জি, বহুত আচ্ছা৷

রাখাল হাঁপাতে-হাঁপাতে বললে, আচ্ছা নেহি জি, শের নিকালা, ইধারসেই উধার গিয়া৷ দেখা নেহি? কথা ক’টা বলতে-বলতেই রাখাল বহুদূরে চলে গেল৷

শের কী জিনিস কাকাবাবু? ওজন? এক সের, দু-সের!

তোমার মুন্ডু! শের মানে, বাঘ৷ ওরে...

কাকাবাবু কথা শেষ না করেই ছুটতে শুরু করলেন৷ আমিও ছুটছি৷ ছুটতে আমি ভালোই পারি৷

ছুটতে-ছুটতে কাকাবাবু বললেন, মনে পড়েছে, মনে পড়েছে৷ কুকুরের গোঁফ হয় না৷ ওটা কুকুর নয়, কেঁদো একটা বাঘ৷ উরে বাবারে৷ খুব বাঁচা বেঁচে গেছি? ছোট-ছোট৷ চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা! কাকাবাবু ছুটছেন লম্বা-লম্বা পা ফেলে! তাঁর সঙ্গে আমি পারব কেন? তবে আমারও খুব স্পিড এসে গেছে৷ ছুটতে-ছুটতে আমার একবার মনে হল৷ অলিম্পিকে দৌড়োবার সময় পিছনে যদি একটা বাঘ লেলিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আমি ভারতের জন্যে একটা স্বর্ণপদক আনতে পারি৷

মানুষ বিপদে পড়লে কেউ কারুর নয়৷ কাকাবাবু একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন না৷ শুধু ছুটেই যাচ্ছেন৷ এমন সময় দূরে সেই বাঘটা বারকয়েক ডেকে উঠল৷ কী বিশ্রী হেঁড়ে ডাক৷ আকাশ-বাতাস যেন ফেঁড়ে ফেলছে৷ দুটো কান চুলবুল করে উঠল৷ সেই ডাকে গাছে-গাছে পাখির ঝাঁক ভয়ে কিচিরমিচির করে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল৷ কী বোকা রে বাবা! তোরা তো আছিস গাছে! বাঘ কী গাছে উঠবে? বাঘ কী বেড়াল, যে পাখি ধরে খাবে!

পোল শেষ হয়ে গেল৷ কাকাবাবু আমার থেকে প্রায় বিশ-বাইশ গজ এগিয়ে গেছেন৷ ভয়ে-ভয়ে, কাঁপা-কাঁপা গলায় বললুম ‘আমাকে ফেলে পালাবেন না কাকাবাবু৷’

কাকাবাবু যে বেগে দৌড়চ্ছিলেন সামনের দিকে ঠিক সেই বেগে পিছন দিকে দৌড়ে এসে ছোঁ-মেরে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে আবার সামনের দিকে ছুটতে শুরু করলেন৷ এখন আমার বেশ মজা লাগছে৷ মনে হচ্ছে ঘোড়ায় চেপেছি৷ সেই ছড়াটা মনে পড়ছে, টাট্টু ঘোড়া খুব ছুটেছে৷ ঠাকুরদাদার চুল পেকেছে৷ ডামাডোলের দিন পড়েছে৷ ঢাকের পিঠে পালক নাচে৷ সাহসও খুব বেড়ে গেছে৷ এত উঁচুতে যখন আছি, বাঘে আমার আর কী করবে! ধরলে কাকাবাবুকেই ধরবে!

এতটা দৌড়ে আমার জিভ বেরিয়ে গেছে৷ কাকাবাবুও বেশ হাঁপাচ্ছেন৷

টং থেকে বললুম, আর দৌড়ে কী হবে! এবার তো থামলে হয়৷

কথা শেষ হতে-না-হতেই সামনের দিক থেকে চার-পাঁচজন আমাদের দিকে তীরবেগে দৌড়ে এল৷ একজনের হাতে আবার লণ্ঠন৷ ছোটার তালে-তালে দুলছে৷

কাকাবাবু থেমে পড়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করলেন, ক্যা হুয়া ভাই?

তারা দূর থেকে বললে, শুনা নেহি, শের নিকালা?

যা বাববা, শের তো পিছে নিকালা৷

নেহি জি চক্কর মারকে সামনা আগিয়া৷

তব তো মাটি কর দিয়া রে বাবা!

আমরা যেদিক থেকে এসেছিলুম কাকাবাবু আবার সেদিকেই ছুটতে লাগলেন৷ পোলের ঢাল বেয়ে উঠতে এবার জীবন বেরোচ্ছে৷

কিছুটা ছুটেই দেখা গেল একটি দেহাতি লোক বেশ আপনমনে লাঠি ঠুকঠুক করে আরামসে চলেছে৷ বাঘ-টাঘ তার কাছে যেন কিছুই নয়৷ পিঠে একটা পুঁটলি দুলছে চলার তালে-তালে৷

কাকাবাবু তার কাছে এসে বললেন, শুনা, শের নিকালা৷

লোকটি গম্ভীর গলায় বললে, নিকালা তো কেয়া হুয়া!

তোমকো খা লেগা৷

লোকটি ভীষণ রেগে বললে, তোম নেহি আপ বোলো জি৷

আপকো খা লেগা৷

খানে দেও৷

লোকটি উদাস গলায় খানে দো, বলে যে চালে হাঁটছিল সেই চালেই হাঁটতে লাগল৷ আবার গান ধরেছে, রাম নাম সুখদায়ী৷

কথা বলার জন্যে কাকাবাবু একটু থেমেছিলেন৷ লোকটি গান ধরতেই আবার ছুটতে শুরু করলেন৷ ছুটতে-ছুটতে বললেন, যাও বা বাঁচার আশা ছিল, গান ধরে সব মাটি করে দিলে৷ বাঘ এবার নিশানা ঠিক করে এই দিকেই তেড়ে আসবে৷

পোল আবার ফুরিয়ে গেল৷ পোলের বেশ মজা৷ একেবারে সমান মাপ৷ এপাশেও যতটা ওপাশেও ততটা৷ ধনুকের মতো পড়ে আছে, বালিতে দু-পাশ ঢুকিয়ে৷ আমরা এখন বাড়িমুখো৷ অন্ধকার হয়ে এলেও, আকাশের নিচের দিকটা লালচে হয়ে আছে৷ গাছের মাথা-টাথাগুলো বেশ কালো দেখালেও নরম একটা আলো বেরিয়ে এসেছে৷ বেশ গা-ছমছমে সন্ধে৷ চারপাশ নির্জন৷ ধু-ধু মাঠ৷ ঝোপ-ঝাপ, পাথরের চাঁই৷ আকাশের গায়ে নীলচে রঙের যেসব পাহাড় লেগেছিল, সেগুলো একেবারে জমাট অন্ধকারের স্তূপের মতো দেখাচ্ছে৷ বাবলাগাছের কাঁটা ছুঁয়ে বিদ্যুৎ-তরঙ্গের মতো বাতাস আসছে সিনসিন শব্দে৷

পোল থেকে নেমে কাকাবাবু সবে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলেছেন, নে এবার কাঁধ থেকে নাম! অমনি সামনের দিকে যারা গিয়েছিল, দেখা গেল তারা আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরে আসছে৷

কাকাবাবু জিগ্যেস করলেন, কেয়া হুয়া জি? ফির কেয়া হুয়া?

শের নিকালরে বাপ, শের নিকালা৷

কাকাবাবু রেগে গিয়ে বললেন, মারে গা এক ঝাপ্পড়৷ রসিকতা পা গিয়া৷ একবার বোলতা হায় উধার, আর একবার বোলতা হায় ইধার৷ মামার বাড়ি পা গিয়া?

কাকাবাবুর কথা কে শুনবে! তারা তখন কোথায় চলে গেছে৷ পেছনে শোনা গেল লাঠির ঠুকঠুক শব্দ৷ আর সেই গান৷ রাম নাম সুখদায়ী৷

কাকাবাবু জিগ্যেস করলেন, কী করি বল তো?

সারা রাতই কী এই পোলের এধার থেকে ওধার, আর ওধার থেকে এধার ছোটাছুটি করে বেড়াতে হবে? তাহলে আর বাঁচব না রে! তার ওপর তুই চেপে আছিস কাঁধে৷ ওজন তো কম নয় তোর!

আমাকে এবার নামিয়ে দিন কাকাবাবু৷ এবার আমার লজ্জা করছে৷

যাক, তোরও তাহলে লজ্জা আছে?

কাকাবাবু ধীরে-ধীরে আমাকে কাঁধ থেকে মাটিতে নামিয়ে দিলেন৷ পায়ে যেন কোনও জোর নেই৷ এখন বাঘ এলে আর দৌড়তে পারব না৷ কী আর করব, বাঘের পায়ে ধরব৷ সেই পথিক লাঠি ঠুকঠুক করে আপনমনে আমাদের পাশ দিয়ে চলেছে৷

কাকাবাবু কিছু ভেবে না পেয়ে তাকে জিগ্যেস করলেন, কেয়া করে গা জি?

লোকটি উদাস গলায় বললে, আরাম করো, আরাম করো, রামজিকা নাম করো!

কাকাবাবু আমাকে বললেন, লোকটার সাহস দেখেছিস? ভগবানের নামের জোর দেখো!

চলুন, আমরাও রাম-নাম নিতে-নিতে পিছন-পিছন যাই৷

আমরা যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই লোকটি গম্ভীর গলায় বললে, ঠারিয়ে!

কাকাবাবু বললেন, কেন?

কলকেতে কী একটা ভরতে-ভরতে লোকটি যা বলল, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, তোমরা যদি দুজন ওদিকে যাও, তাহলে বিপদ হতে পারে! একটু অপেক্ষা করো! আমি ধূমপান করেনি! বাঘটার খিদে পেয়েছে, তাই অমন ঘোরাঘুরি করছে! বাঘটাকে আমি চিনি! খুব ভালো ছেলে! মানুষ ও খায় না৷ একটা গরু বা মোষ পেলেই ও পাহাড়ের দিকে চলে যাবে!

কথা শেষ করে লোকটি কলকেতে টান লাগাল! আগুন ঝিলিমিলি করছে! আর একটু জোরে টান মারার সঙ্গে-সঙ্গে ব্লপ করে আগুন জ্বলে উঠল! আগুনের গোল একটা বল ঠিকরে আকাশের দিকে উঠে গেল! এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখিনি!

কাকাবাবু ভয়ে চমকে উঠে বললেন, বাপ! এ যে ভৌতিক কাণ্ড!

পথিক পাঁচবার গাঁজায় দম দিলেন৷ পাঁচটা আগুনের গোলা আকাশের দিকে উঠে গেল৷ সন্ধ্যা শেষে রাত নেমে গেছে চারপাশে৷ সব কিছুই কেমন যেন ভৌতিক হয়েছে৷ ঝোপঝাড়, বড় গাছ, ছোট গাছ, টিলা, পাহাড়৷ সব কিছুই যেন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ওত পেতে বসে আছে৷ পথের পাশ থেকে মাঝে-মাঝে একটা-দুটো আলগা পাথর ছড়ছড় শব্দ করে ঢালু বেয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে৷ শব্দে আমরা চমকে উঠছি৷ ভাবছি বাঘ বুঝি এসে গেল৷

পথিক কলকে ঠুকে গাঁজার আগুন পথের পাশে ফেলে দিলেন৷ বাতাসে আগুনের ফুলঝুরি খেলে গেল৷ পথিক তার ঝোলাটি আমাদের সামনে ফাঁক করে ধরে বললে, ‘সব এর মধ্যে ফেলে দাও৷’

কাকাবাবু বললেন, ‘কী ফেলব?’

তোমাদের অহংকার, হিংসা, পাপচিন্তা, মনের মধ্যে যা-যা ময়লা আছে, সব, সব ফেলে দাও এর মধ্যে৷

আমার মনে কিছু হিংসে ছিল, রাগ ছিল, লোভ ছিল, মনে-মনে সব বিসর্জন দিলুম পথিকের তালিমারা ঝুলিতে৷ কাকাবাবু কী ফেললেন জানি না৷ তবে কিছু একটা ফেললেন৷

পথিক ঝোলা মুড়ে বললে, আর শের তোমাদের কিছু করতে পারবে না৷ শুধু শের কেন কেউ কিছু করতে পারবে না৷ নাও, এবার আমার সঙ্গে চলো৷

আমরা তিনজনে উঠে দাঁড়ালুম৷ দূর আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে৷ ঝড় জল হবে না কি? আজ কার মুখ দেখে আমরা বেড়াতে বেরিয়েছিলুম কে জানে? আমি আয়নায় আমার মুখই দেখেছিলুম৷ চলতে-চলতে পথিক জিগ্যেস করল, কী, এখন শরীরটা বেশ হালকা লাগছে না?

হ্যাঁ, বেশ হালকা লাগছে৷ কাকাবাবু বললেন৷

আমি অবশ্য তেমন কিছু বুঝছি না৷ কাকাবাবু সাধু-সন্তে, তুকতাকে ভীষণ বিশ্বাস রাখেন৷ জ্যোতিষচর্চা করেন৷ মাঝে-মাঝে প্রেতচক্র বসান৷ গভীর রাতে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা৷ বলেন, অনেক রকম অলৌকিক জিনিস দেখা যায়৷ গাছেরা নাকি ফিসফিস করে কথা বলে৷ জড়পদার্থেরা হেঁটে চলে বেড়ায়৷

পথিক পিঠে ঝোলা নিয়ে সামনে নুয়ে পড়ে টুকটুক করে হেঁটে চলেছে৷ আমরা চলেছি পাশে-পাশে৷ কিছুই তেমন দেখা যাচ্ছে না৷ চারপাশে পাতলা অন্ধকার৷ বাতাসের শনশন শব্দ৷ বাঘের গর্জন থেমে গেছে৷ হয়তো শিকার পেয়েছে৷ সামনে ঝাঁকড়া মতো বিশাল একটা গাছ৷ তলায় তলায় আলকাতরার মতো আঁধার৷ ধকধক করে দুটো আলো জ্বলছে৷ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, কী রে বাবা?

পথিক বললে, ডরো মাৎ? এই সেই শের৷

মট করে একটা শব্দ হল? কাকাবাবু বললেন, হাড় ভাঙার শব্দ৷ কী করব আমরা এগোব? কাকাবাবুরও গলাটা যেন একটু কেঁপে গেল৷ আমার পা-দুটো অবশ হয়ে আসছে৷

পথিক জ্বলজ্বলে চোখ দুটো লক্ষ করে এগিয়ে যেতে-যেতে বললে, তোমরা আমার পিছন দিয়ে আস্তে-আস্তে গাছতলাটা পেরিয়ে চলে যাও, আমি আসছি৷

পথিক বাঘের খুব কাছে গিয়ে বললে, ক্যা মস্তান, শিকার মিল গিয়া?

বাঘ উত্তরে একটা চাপা গর্জন ছাড়ল৷ দুবার ল্যাজ আছড়াল পটাপট শব্দে৷ আমরা যতটা সম্ভব দ্রুত গাছতলাটা পেরিয়ে গেলুম৷ আর একবার হাড় ভাঙার শব্দ হল৷ পথিক লাঠি ঠুকঠুক করে এগিয়ে এল৷ কিছুই যেন হয়নি৷ যেন বড় একটা বেড়াল আদর করে এল৷ গুনগুন করে সেই একই গান ঠোঁটে লেগে আছে৷

প্রায় মাইলখানেক হাঁটার পর আমরা লোকালয়ে এসে পড়লুম৷ কিছু-কিছু দোকানপাট রয়েছে৷ মিঠাইওয়ালা লাড্ডু পাকাচ্ছে৷ গরম কচুরি ভাজার গন্ধ আসছে নাকে৷ থাক-থাক প্যাঁড়া সাজানো রয়েছে৷ বড় কড়ায় দুধ ফুটছে৷ পথিককে দেখে সেই বাজার মতো জায়গাটার সমস্ত মানুষ একবাক্যে হইহই করে উঠল, আইয়ে মহারাজ আইয়ে৷

পথিক শুধু উদাত্ত গলায় বললে, জয় রামজি কি জয়, জয় রাম৷

আমরা এত হেঁটেছি যে পা যেন আর চলছে না৷ মিঠাইওয়ালার দোকানের বাঁশের বেঞ্চিতে কাকাবাবু আর আমি থেসকে বসে পড়লুম৷ মনে হচ্ছে শুয়ে পড়ি৷ স্থানীয় লোকেরা পথিককে ছেঁকে ধরল৷ মহারাজের কী খাতির৷ কাঁচা শালপাতায় লাড্ডু আর প্যাঁড়া এসে গেল৷ খাঁটি ঘিয়ে কচুরি ভাজা হচ্ছে৷ কী তার গন্ধ! বাঘের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে এখন পেটে চন-চনে খিদে৷ ভেবেছিলুম, আমরা হয়তো বাদ পড়ে যাব৷ না, এরা ভদ্রতা জানে৷ আমাদের জন্যেও খাওয়ার এসে গেল৷

মহারাজের কাছে নানা লোকের নানা বায়না৷ কারুর বোখার হয়েছে, কারুর পেটে দরদ৷ কারুর বাত৷ মহারাজ সকলকেই ওষুধ দিচ্ছেন৷ ওষুধ আর কিছুই নয়—প্রসাদ৷ মুখ থেকে বের করে দিচ্ছেন কাউকে এক টুকরো প্যাঁড়া, কাউকে লাড্ডু৷ মুখে ফেলামাত্রই অসুখ সেরে যাচ্ছে৷ মহারাজের জয়ধবনিতে দিগবিদিক কেঁপে উঠছে৷ মিঠাইওয়ালা বেশ বড় তিন ভাঁড় দুধ পাঠিয়ে দিলেন৷ মোটা সর ভাসছে৷ কাকাবাবু ভীষণ খেতে ভালোবাসেন৷ মুখ দেখে মনে হল ভীষণ খুশি হয়েছেন৷ চুমুকে-চুমুকে দুধটা মেরে দিয়ে, তিনিও জয়ধবনি দিলেন, জয় মহারাজের জয়৷

কাকাবাবু বললেন, তুই সোজা বাড়ি চলে যা৷ আমি একটু সাধুসঙ্গ করে যাই৷ মহারাজের কাছে অনেক জিনিস৷ একটু সেবা করে দেখি৷ যদি কিছু পাওয়া যায়৷

এই অন্ধকারে আমি একলা যাব কী করে?

কি যে বলিস! এই তো একটু মাত্র পথ৷ সোজা গান গাইতে-গাইতে চলে যা৷ ভয় কী? পুরুষ মানুষের আবার ভয় কী?’

শোনা গেল, মহারাজ আজ এখানেই রাত কাটাবেন৷ আর একটু পরেই দূর ওই গ্রামে রামলীলা হবে৷ মহারাজ সেই লীলা দেখবেন৷ ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে-দলে দলে হ্যাজাক লাইট চলেছে৷ কালো-কালো ছায়া চলেছে সার বেঁধে, মেয়ে-পুরুষের দল৷ আকাশ ফুঁড়ে একটা বাজি উঠল৷ ফট করে ফেটে তারার ফুল ঝরতে লাগল৷ চারপাশ আলোয় আলো৷

মিঠাইওয়ালার দোকানের পাশ থেকে অন্ধকারে কে যেন ফোঁস-ফোঁস করে কেঁদে উঠল৷ প্রথমে ভেবেছিলাম সাপ৷ বাঘের হাত থেকে বেঁচে এইবার নাগের হাতে মৃত্যু৷ মিঠাইওয়ালা বললে, মহারাজ, আমার বহু কাঁদছে৷

মহারাজ বললেন, আও বেটি, ইধার আও৷

মহিলা মহারাজের পায়ের কাছে এসে বসলেন৷ মাসখানেক হল একমাত্র শিশুটি মারা গেছে৷ তাই ভীষণ দুঃখু৷ মহারাজ তার মাথায় হাত রাখতেই ফুলে-ফুলে কান্না থেমে গেল৷ মহারাজ মৃদুস্বরে বললেন, জয় রামজিকি জয়!

মহারাজ ঝোলার মধ্যে হাত চালিয়ে একটা পাকা পেয়ারা বের করে মহিলার হাতে দিয়ে বললেন, যাও বেটি ঘরে যাও৷ এই ফল খেলে তোমার সব দুঃখ চলে যাবে৷ তুমি আনন্দ পাবে৷

মহিলা ধীরে-ধীরে চলে গেলেন৷ কাকাবাবু সাধুজিকে বললেন, মহারাজ, আমি আপনার চেলা হতে চাই৷

মহারাজ অন্ধকারে চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ৷ হ্যাজাকের আলো এসে পড়েছে মুখের একপাশে৷ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে আগুনের টুকরোর মতো৷ এতক্ষণ মানুষটিকে আমরা সাধারণ পথিক ভেবেছিলুম, এখন মনে হচ্ছে ভীষণ শক্তি আছে ভেতরে৷ খুব ইচ্ছে হচ্ছে, আমিও একবার চেপে ধরি৷ সামনে পরীক্ষা৷ একটু শক্তি পেলে হয় তো ফার্স্ট হয়ে যাব৷ সকলের তাক লেগে যাবে৷ অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো৷ ইংরেজিতে মিনিমাম সত্তর৷ বাংলায় আশি৷

পাহাড়ের দিকে বিদ্যুৎ ঝিলিকের সঙ্গে-সঙ্গে বাজ-পড়ার বিশাল শব্দে বনস্থলী কেঁপে উঠল৷ হঠাৎ পাগলা হাতির মতো আকাশ-পাতাল তোলপাড় করে গাছপালা মড়মড়িয়ে বাতাস ছুটে এল৷ বড়-বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে৷ ধুলো উড়ছে৷ বন্দুকের ছররার মতো কাঁকর, বালি গা ঘষে চলেছে৷ মিঠাইওয়ালার দোকানের ত্রিপল ভটাস করে উড়ে চলে গেল জাদু-কার্পেটের মতো৷ সবাই ছুটছে আশ্রয়ের জন্যে এদিকে-ওদিকে৷

সেই পথিক মহারাজ নিশ্চল৷ কোনও চঞ্চলতা নেই৷ আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে মহারাজ বললেন, ডরো মাত৷ সব ঠিক হো জায়গা৷

মহারাজের একটা হাত কাকাবাবুর কাঁধে৷ তিনি বসে রইলেন৷ অলৌকিক কি না জানি না, আমাদের চারপাশে বৃষ্টি হয়ে চলেছে অঝোরে, আমরা তিনজনে গোলাকার একটা শুকনো জায়গায় বেমালুম বসে আছি, যেন অদৃশ্য একটি ছাদ আমাদের মাথার ওপর রয়েছে৷ মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে, বাজ অট্টহাসি হাসছে পাহাড়ের মাথায়৷

কাকাবাবু পরের দিন সকালে ইঁদারার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁতন করছেন৷ এই শীতে পরনে শুধু একটা গামছা৷ খালি গা৷ ফরসা শরীরে বিজকুড়ি-বিজকুড়ি শীতকাঁটা৷ আমার পরনে প্যান্ট, সোয়েটার, মোজা, জুতো৷ গলায় সাতপাট মাফলার৷ মাথায় হনুমান টুপি৷ এত কিছুর দরকার ছিল না৷ ঠান্ডা লাগবে, ঠান্ডা লাগবে বলে মা পরিয়ে দিয়েছেন৷ কাকাবাবুর আজ এ অবস্থা কেন?

আপনার শীত করছে না?

দাঁত থেকে দাঁতন সরিয়ে বললেন, না৷

কেন, শীত করছে না?

সে অনেক ব্যাপার৷

তার মানে?

তোর মনে আছে, কালকের সেই সাধুর ঝুলি?

খুব মনে আছে৷

কাল সেই ঝুলির মধ্যে কী-কী ফেলেছি জানিস?

না৷

শীত ফেলেছি, গ্রীষ্ম ফেলেছি, দুধ খাওয়ার লোভ ফেলেছি৷ ভালো-ভালো জামাকাপড় পরার ইচ্ছে, সব ফেলে দিয়েছি৷

হঠাৎ-হঠাৎ যা খুশি তাই করার ইচ্ছে, সেই ইচ্ছেটা ফেলেছেন?

যাকে তোর মা বলে পাগলামি?

ওই আর কি৷

না রে, সেটা ফেলতে ভুলে গেছি৷ ওটা ফেলে দিলে বাঁচব কী নিয়ে?

ফেললে ভালো হতো৷ আমি তাহলে বেঁচে যেতুম৷

তোকে মারবে কে রে গাধা? তুই দেড়শো বছর বাঁচবি৷

মানুষ দেড়শো বছর বাঁচে নাকি? একমাত্র কচ্ছপ বাঁচে তিনশো বছর৷

তুই কিস্যু জানিস না৷ গজকচ্ছপ বাঁচে দেড়শো বছর৷

গজকচ্ছপ কি জিনিস?

ঠিক তোর মতো দেখতে, তোর মতো স্বভাব, ভিতু শীতকাতুরে, একেবারে অবিকল তোর মতো৷

ভীষণ রাগ হয়ে গেল৷ কথা না বাড়িয়ে ইঁদারার কাছ থেকে সরে এলুম৷ সাধুর ঝুলিতে আরও অনেক কিছু ফেলার ছিল৷ বেলা দশটার সময় কিছু না খেয়ে, ধুতি আর শার্ট পরে কাকাবাবু হনহন করে কোথায় বেরিয়ে গেলেন৷

মা জিগ্যেস করেছিলেন, কিছু খাবে-টাবে না? দুধ, মোহনভোগ?

মৃদু হেসে কাকাবাবু বলেছিলেন, আমার আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই বউদি৷ চিরকালের মতো আমার পেট ভরে গেছে৷

মা হেসেছিলেন, দেখা যাবে বেলা একটা দেড়টার সময়৷ যখন বেড়িয়ে ফিরে আসবে৷

একটা বাজল, দুটো বাজল, তিনটে বাজল, কাকাবাবুর আর দেখা নেই৷ আমার ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে৷ ঘর-বার করছি৷ মা একবার বাইরে আসছেন, একবার ভেতরে যাচ্ছেন৷ অত সব রান্না, কারুরই খাওয়া হয়নি৷ বিদেশ বিভুঁই জায়গা৷ কারই বা সাহায্য পাওয়া যাবে? মা গালে হাত দিয়ে গেটের পাশে রকে বসলেন৷ বেলা ক্রমশই পড়ে আসছে৷ শীত আসছে চেপে৷

মা জিগ্যেস করলেন, কোথায় যেতে পারে বল তো?

মনে হয় সেই সাধুর আস্তানায়?

কোথায় সেই আস্তানা?

তা তো জানি না মা৷

কাল সেই সাধুকে তোরা কোথায় পেয়েছিলিস?

ওই দূর গ্রামে৷ একটা মিঠাইয়ের দোকানে৷

চল তাহলে একবার যাই৷

সে তো মা অনেক দূরে৷

তা হোক৷ তুই টর্চটা নে৷ ঘরে বসে ভেবে-ভেবে মরার চেয়ে বাইরে খুঁজে আসাই ভালো৷

দরজায় তালা মেরে মা আর আমি বেরলুম৷ আমাদের বাড়িতে যে কাজ করে সেই সুখিয়াও সঙ্গে চলল৷ কাকাবাবু ফিরছেন না দেখে তার ভীষণ মন খারাপ হয়েছে৷ মাঝে-মাঝেই আঁচলে চোখ মুছছে৷

মা হাঁটতে-হাঁটতে এক সময় রাগ করে বললেন, এইসব মানুষের সঙ্গে কেউ বিদেশে আসে, তোর বাবার যে কী কাণ্ড! রোজই চিঠি দিচ্ছে, আজ আসছি আর কাল আসছি৷ আমাকে এরা সব পাগল করে ছাড়বে৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আমরা সেই মিঠাইওয়ালার দোকানে এসে পৌঁছলুম৷ আজও পুরি ভাজা হচ্ছে৷ বড়-বড় লাডডু সাজানো দোকানে৷ অমৃতি তাকিয়ে আছে স্নেহের চোখে৷ ভীষণ খিদে৷ আজ আর কে খাওয়াবে৷ কাকাবাবুও নেই৷ সাধুবাবাও নেই৷

মাকে দেখেই মিঠাইওয়ালা দোকান থেকে নেমে এল৷ কেয়া হুয়া মাইজি৷

মা সব বললেন৷ মিঠাওইয়ালার দোকানে কাকাবাবু সকালে একবার এসেছিলেন৷ সাধুবাবার খবর নিয়ে সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেছেন৷

পাহাড়? সে কত দূর?

ওই যে মা, আকাশের গায়ে আঁকা৷ এখান থেকে চার-পাঁচ ক্রোশ তো হবেই৷

আমরা অন্ধকারে আকাশের গায়ে লেগে থাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ আজ আর যাওয়া যাবে না৷

ভোরের ট্রেনে বাবা এলেন৷ সব শুনে বললেন, বিকাশ তাহলে সত্যিই সাধু হয়ে গেল৷ এর আগেও একবার সাধু হয়ে গিয়েছিল৷

সাধু হয়ে গেল, কি বাঘের পেটে গেল, জানলে কী করে?

মান্দারহিলে বাঘ৷ হাসালে তোমরা৷

পরশু বাঘ বেরিয়েছিল৷ আর সেই বাঘই হল কাল৷

চা, জলখাবার খেয়ে বাবা আমাকে নিয়ে পুলিশ চৌকিতে চললেন৷ দারোগাবাবু সব শুনে বললেন—মিস্টার যে সাধু হয়ে গেছে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করি কী করে! আমরা যে চোরই ধরি৷ সাধুকে কি ধরা যায়৷ তবু একটা ছবি দিয়ে যাবেন৷ তালাশ করে দেখব৷

মহাসমস্যা৷ কাকাবাবুর কোনও ছবি নেই৷

মা বললেন, আর্টিস্টকে বলে আঁকিয়ে দাও৷ বলো এইরকম নাক, এইরকম চোখ৷ মানুষের চোখ আর নাকই তো আসল৷

বাবা বললেন, চেহারা তো আমার চোখে আসছে৷ আমিই তো এঁকে দিতে পারি৷

সাতদিন মান্দারহিলে কাটিয়ে আমরা কলকাতায় ফিরে এলুম৷ কাকাবাবুর কোনও খোঁজ নেই৷ কোথায়ই বা সেই সাধুবাবা৷ সব তোলপাড় হয়ে গেল তবু কাকাবাবুর কোনও সন্ধান নেই৷ এক মাস গেল, দু-মাস গেল৷ এক বছর গেল দু-বছর গেল৷ কাকাবাবুর হাতঘড়ি দেরাজের ওপর টিকটিক করে৷ মা এখনও দুপুরে পা ছড়িয়ে বসে চোখের জল ফেলেন৷ অনেকে তীর্থ থেকে ফিরে এসে বলেন, একজন সাধুর সঙ্গে দেখা হল, ঠিক বিকাশের মতো দেখতে৷ অমনি আমরা ছুটি সেই তীর্থে৷ বেড়ানো হয়, কিন্তু কাকাবাবুকে ধরা যায় না৷

কত বড় হয়ে গেলুম৷ কাকাবাবুর পাঞ্জাবি এখন আমার গায়ে ঠিক হতে পারে৷ কাকাবাবু বলেছিলেন, সাহসী হবি, পরোপকারী হবি৷ মনটাকে জলের মতো পরিষ্কার রাখবি৷ আমার সাহস অনেক বেড়েছে৷ অন্যের উপকার করার চেষ্টা করি৷ আর মন! সেই সাধুর ঝোলার মধ্যে মনের সব নোংরা জিনিস তো ফেলেই দিয়েছি৷

রোজ রাতে এখনও আমি স্বপ্ন দেখি৷ প্রতিদিন দেখি৷ বালির নদী পড়ে আছে নিচে৷ সেই বালিতে পড়ে আছে ঝকঝকে একটা রুপোর টর্চ৷ আর সোনার তৈরি একটা পোল কোথায় যেন চলে গেছে নীল একটা পাহাড়ের কোলে৷ পোলের মাঝখানে পা ছড়িয়ে বসে আছে বিশাল একটা বাঘ৷ আর বাঘটার কিছু দূরে স্থির হয়ে বসে আছেন সেই সাধুবাবা আর আমার কাকাবাবু৷

ছাঁৎ করে ঘুম ভেঙে যায়৷ দেখি মাঝরাত? আর ঘুমোতে পারি না৷ জেগে শুয়ে থাকি৷ আর তখনই জানতে পারি আমি একা নই, মা আর বাবা দুজনেই জেগে৷ আর জেগে আছে সেই পোল৷ বালির ওপর শুয়ে আছে পোল৷ মাথার কাছে বসে আছে পাহাড়! সেই পাহাড়ের মাথায় জ্বলছে হোমের আগুন৷ আকাশ টকটকে লাল৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%