সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমাদের গ্রামে চৈত্র মাসের শেষে বিশাল বড় মেলা বসে৷ মেলা অনেক দিন থাকে৷ প্রায় একমাস৷ কত কী আসে! রাত্তির বেলা কত আলো জ্বলে৷ হ্যাজাক, হ্যারিকেন৷ কারবাইডের ফোঁ ফোঁ আলো৷ জিলিপির মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ৷ বড় বড় লাড্ডু৷ চিনেবাদাম কড়াইয়ের বালিতে সেঁকা হচ্ছে৷ কেমন কেমন একটা গন্ধ৷ আলুর চপ, বড় বড় বেগুনি৷ রাত যত বাড়তে থাকে ভিড় তত জমতে থাকে৷ পাশেই শালি নদী৷ বর্ষায় দু’কূল ছাপিয়ে জল চলে আসে৷ আমাদের স্কুলের মাঠ জলে ডুবে যায়৷ তখন আমাদের খুব আনন্দ! হেড স্যার স্কুলের বারান্দায় বসে ছিপে মাছ ধরেন৷ টপাটপ ছপাছপ৷ সেই মাছ বাড়ি যায় না৷ স্কুলেই ভাজা হয়৷ আমরা সবাই গরম গরম মাছ ভাজা খাই৷ সেই সময় হেড স্যার একটা কথাই বারে বারে বলতে থাকেন, ‘তোমরা সবাই পরিতোষ সহকারে খাও৷’ এত মাছ যে কোথা থেকে আসে!
মেলার মাসে শালি নদীতে জল থাকে না৷ জায়গায় জায়গায় একটু একটু জল৷ ঘাস জন্মে যায়৷ দু’একটা মাছ ধরা জেলে ডিঙি তীরে কাত হয়ে শুয়ে থাকে৷ বর্ষা এলে সোজা হবে৷
এ-পারে কত আলো, ওপারে অন্ধকার৷ হেড স্যারের বড় ছেলে, আমাদের কল্যাণদা মস্ত বড় শিল্পী৷ ছবি আঁকেন, মূর্তি তৈরি করেন৷ সব রকমের হাতের কাজ৷ সে-সব হাঁ করে তাকিয়ে দেখার মতো৷ মেলার সবচেয়ে বড় স্টলটা কল্যাণদার৷ খুব দামি জিনিস এদিকের মানুষ কিনতে পারবে না৷ আমরা তো কলকাতার লোকদের মতো বড়লোক নই৷ তাই কল্যাণদা সারা বছর ধরে কত রকমের পুতুল তৈরি করেন৷ বাঁশপাতা, তালপাতার রকমারি কাজ৷
আমি আর আমার দিদি সারা বছর ধরে লক্ষ্মীর ভাঁড়ে পয়সা জমাই৷ এই মেলায় খরচ করব বলে৷ এ-বছর আমাদের পয়সা একটু বেশি জমেছে৷ দুর্গাপুর থেকে মাসিমা এসেছিলেন৷ আমাকে আর দিদিকে পঞ্চাশটা করে টাকা দিয়ে গেছেন৷ আমরা কিছুতেই নেব না৷ শেষে কেঁদে ফেললেন৷ ‘আমাকে তোরা পর ভাবিস? আমি কোনও দিন আর আসব না৷’
মাসিমারা খুব বড়লোক৷ আমার মায়ের বরাত খারাপ৷ আমরা যখন বড়লোক হতে শুরু করেছি হঠাৎ বাবা মারা গেলেন৷ বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন৷ বিলেত গিয়েছিলেন দু’বার৷ জমিদারের ছেলে৷ এখন আমরা সেই ভাঙা রাজবাড়িতে থাকি৷ মা যে কী কষ্টে সংসার চালান!
দিদি ক্লাস টেনে পড়ে, আমি এইটে৷ দিদি লেখাপড়ায় অসম্ভব ভালো৷ আমি মাথামোটা৷ বুঝতে পারি কিন্তু ভুলে যাই৷ আমার কোনও মাস্টারমশাই নেই৷ দিদিরও নেই৷ দিদি আমাকে পড়ায়৷ দিদি রোজ বলে, ‘তুই আমার ভাই৷ ভালো রেজাল্ট করতেই হবে৷ আমরা দুজনে বিলেত যাব৷ গ্লাসগোতে পড়ব, বাবা যেখানে পড়েছিলেন৷’
নাগরদোলা ঘুরছে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে৷ একটা তাঁবুর মধ্যে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন প্রফেসার রুদ্র৷ তাঁবুর বাইরে একটা উঁচু মাচায় দাঁড়িয়ে একজন চিৎকার করছেন৷ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রফেসার রুদ্রের ভেলকি, ভেলকি, ভেলকি৷ রং বেরং-এর কত লোক, কত দিক থেকে এসেছে৷ কত রকমের শব্দ৷ প্যাঁ পোঁ, ফটাফট৷
সেই গোল-ঘরটা এসেছে৷ যার মধ্যে তীব্র বেগে মোটর সাইকেল চালাবেন ডেয়ারিং দীপক৷ চামড়ার পোশাক, চোখে গগলস৷ গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠবেন, নেমে আসবেন৷ সে এক ভয়ংকর দুঃসাহসী ব্যাপার৷
দিদি প্রথমেই গেল কল্যাণদার স্টলে৷
কল্যাণদা বললেন, ‘কী রে? কী কিনলি?’
দিদি বললে, ‘কিছু কিনিনি, তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে এনেছি৷’
দিদি প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে তুলো আর কাপড় দিয়ে তৈরি রাধা আর কৃষ্ণের এক জোড়া মূর্তি বের করলে৷ কল্যাণদা দেখেই বললে, ‘কী সুন্দর! কে করেছে?’
দিদি বললে, ‘আমি করেছি৷’
‘তুই? এত সুন্দর কাজ তুই কোথায় শিখলি? এ তো পাকা শিল্পীরাও পারবে না৷ কী জিনিস করেছিস তুইও জানিস না৷ পোশাক তোর তৈরি?’
‘যা দেখছো সব আমার তৈরি৷’
‘রাধা আর কৃষ্ণের মুখ?’
কাগজের মণ্ড দিয়ে নিজেই করে পোস্টার কালার লাগিয়েছি৷’
‘মুখ সবাই কিনে আনে, তুই মুখও করেছিস? এ ভাবা যায় না৷ কার কাছে শিখলি?’
‘বই পড়ে চেষ্টা করতে করতে হয়ে গেল৷ এখন বলো এর দাম কত হতে পারে?’
‘কেন তুই বিক্রি করবি?’
‘কল্যাণদা, বলতে খুব লজ্জা করছে, আমার ভীষণ টাকার দরকার৷ মায়ের বুকে একটা লাম্প হয়েছে৷ আমাদের শুভাদি হোমিওপ্যাথি করে৷ ওষুধে কোনও কাজ হল না৷ বললে, একজন স্পেসালিস্ট দেখা৷ মনে হচ্ছে ক্যানসার৷’ কল্যাণদা বললে, ‘আমি এক্ষুনি তোকে তিনশো টাকা দিচ্ছি৷ আমার কালেকশনে থাকবে৷ এগজিবিশনে পাঠাব৷ তুই আরও কর৷ নানা রকমের কর৷’
দিদি বললে, ‘আমার ঠিক তিনশো টাকাই দরকার৷’
‘কী হিসেবে?’
‘আমরা দুজনে তিনশো জমিয়েছি৷ তুমি দিলে তিনশো৷ ছ’শো হল৷ তিনশো টাকা ডাক্তারের ফি আর তিনশো টাকা যাওয়া আসা আর যদি কোনও খরচ থাকে৷’
‘শোন, যে-অসুখের কথা বললি, ভগবান করুন যেন না হয়, যদি হয় অনেক খরচ রে৷ কী হল, আমাকে জানাবি৷ অবশ্যই জানাবি৷’
খুব জমেছে মেলা৷ ওদিকে আর মন যাচ্ছে না৷ আমি আজই শুনলুম৷ আমাকে কেউ কিছু বলেনি৷
দিদি বললে, ‘চল দুটো করে জিলিপি খাই৷’
‘খাবি? টাকা যে কমে যাবে!’
‘আমার কাছে পাঁচটা টাকা একস্ট্রা আছে৷’
জিলিপি আমরা দুজনেই খুব ভালোবাসি৷ দিদি বললে, ‘ফেরার সময় মায়ের জন্যে দুটো নিয়ে যাব৷ কে জানে, সামনের বছরের মেলায় মা যদি না থাকে!’
মেলার আলো দিদির মুখে পড়েছে৷ চোখ দুটো জলে টলটল করছে৷ ওদিকে চিৎকার করছে, ‘ডেয়ারিং দীপক৷ জীবন-মৃত্যুর খেলা৷ ডেয়ারিং, ডেয়ারিং, ডেয়ারিং দীপক৷’
দিদি বললে, ‘চল, এইবার আমরা সেই জায়গাটায় যাই’৷
মেলার আলো, হইচই, মোটর সাইকেলের কান-ফাটানো শব্দ, সব পেছনে পড়ে রইল৷ আমরা শালি নদীর দিকে এগোচ্ছি৷ আকাশে ত্রয়োদশীর চাঁদ৷ কী অপূর্ব লাগছে! শ্মশানটা পড়ে রইল ডানদিকে৷ একটু আগেই মনে হয় শবদাহ হয়েছে৷ একটা আধপোড়া মোটা কাঠ থেকে তখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷
দিদি বললে, ‘কী রে ভয় করছে?’
‘গা-টা একটু ছমছম করছে৷’
দিদি আমার কাঁধে হাত রেখে কাছে টেনে নিল৷
সেই বিশাল পাকুড় গাছ৷ চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে৷ তলার আলোছায়ায় পড়ে আছে সেই প্রকাণ্ড পাথরটা৷ বাবার প্রিয় জায়গা৷ দেশে থাকলে ভোরবেলা এখানে বেড়াতে আসতেন৷ ওই পাথরটায় বসতেন৷ তখন তাঁর চেহারাটা অন্যরকম হয়ে যেত৷ মুখ-চোখ শান্ত৷ কী যেন ভাবতেন! দূর কোনও দেশের কথা৷
দিদি বললে, ‘এই পাথরটায় বাবা আছেন৷ এখানে বসে কপাল ঠেকিয়ে প্রার্থনা করব, মাকে ভালো করে দাও৷’
দুজনে পাশাপাশি বসেছি৷ আমার দিদি খুব সুন্দরী৷ ভীষণ সুন্দরী৷ পাতার ভেতর দিয়ে চাঁদের আলো নেমে এসেছে৷ পাতার ছায়া! এইবার আমি প্রশ্নটা করেই ফেললুম, ‘দিদি! মা যদি না বাঁচে!’
‘আমি তো আছি৷’
‘তোর যখন বিয়ে হয়ে যাবে!’
‘আমি বিয়ে করব না৷ তুইও কথা দে বিয়ে করবি না৷’
‘করব না৷’
‘আমরা দুজনে থাকব৷’
‘দিদি! কল্যাণদা যদি বিয়ে করতে চায়?’
‘করব না৷ নে পাথরে মাথা ঠেকা৷ যদি গাছের একটা পাতা আমাদের ওপর খসে পড়ে তাহলে জানবি আমাদের মা বেঁচে যাবে৷’
ঠান্ডা পাথরে কপাল ঠেকালুম৷ মনে হল বাবার কোলে মাথা রেখেছি৷ দূর থেকে গান ভেসে আসছে৷ মেলায় গান চালিয়েছে৷ গাছের ঝাঁকড়া মাথায় পেঁচার বাচ্চা আছে৷ কতরকম শব্দ করছে৷ শালি নদীর শুকনো বুকের ওপর দিয়ে বাতাস বইছে সাঁ সাঁ করে৷ কপালের তলায় ঠান্ডা পাথর৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন