সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ট্রেন ছাড়তে আর মিনিট দশেক দেরি আছে৷ ওপরের বাঙ্কে অরূপের জায়গা৷ ভালোই হয়েছে, এক ঘুমেই যথাস্থানে পৌঁছে যাবে৷ নামা ওঠার ব্যাপার নেই৷ কেউ বিরক্তও করবে না৷ নিচের আসনে, সারা কম্পার্টমেন্টে যাই হোক না কেন, সবার মাথার ওপর দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে-ঘুমোতে সে দিব্যি চলে যাবে৷
অরূপকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছেন তার বাবা, মা আর ছোট বোন৷ গরমের ছুটি কাটিয়ে অরূপ চলেছে সাঁওতাল পরগনার আবাসিক বিদ্যালয়ে৷ স্বাস্থ্যকর জায়গা, নামকরা স্কুল৷ দুঃখের কিছু নয়৷ আনন্দের ব্যাপার৷ লেখাপড়া শেষ করে যখন বেরিয়ে আসবে, তখন অরূপ হয়ে যাবে অরূপবাবু৷
বাঙ্কে হোলডল খুলে বিছানা পাতা হয়ে গেছে৷ হুকে জলের বোতল ঝুলে গেছে৷ দরকারি যা কথা বলার সব বলা হয়ে গেছে৷ অরূপ ভোম হয়ে নিচের আসনেই বসে আছে৷ অরূপের বাবা, মা আর ছোট বোন সামনেই দাঁড়িয়ে৷ অন্যান্য যাত্রীদের কিছু এপাশে-ওপাশে বসেছেন৷ কিছু প্ল্যাটফর্মে জানালার পাশ ঘেঁসে নিজেদের আসন আর মালপত্রের দিকে কড়া নজর রেখে দাঁড়িয়ে আছেন৷ কেউ-কেউ ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন৷ গার্ডসায়েব বাঁশি বাজালেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠবেন৷
কথা শেষ হচ্ছে না৷ মনে পড়লেই ছুটছাট বেরিয়ে আসছে৷ ছেলে আবার সেই পুজোর ছুটিতে ফিরবে৷ এর মাঝে এদিক থেকেও কেউ যেতে পারবে না৷ ঘনঘন স্কুল গেলে কক্তৃপক্ষ বড় অসন্তুষ্ট হন৷ ছেলের মন চঞ্চল হয়ে যায়৷
কে একজন বললেন, ‘সিগন্যাল দিয়েছে৷ এবার গাড়ি ছাড়বে৷’
যাঁরা বিদায় জানাবার জন্যে এসেছিলেন, তাঁরা সব একে-একে নামতে লাগলেন৷ অরূপের মায়ের চোখ ছল-ছল করছে৷ বোনের মুখ কাঁদো-কাঁদো৷ চেষ্টা করেও গলা দিয়ে আর কথা বেরোচ্ছে না৷ অরূপের বাবা ছেলেকে সাবধান করলেন, ‘তোমার ঘুম কিন্তু সহজে ভাঙে না৷ একটু সজাগ থেকো৷ দেখো, ঠিক জায়গায় যেন ঘুম ভাঙে৷ কেমন?’ অন্যান্য যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঘুমিয়ে পড়লে একটু জাগিয়ে দেবেন অনুগ্রহ করে৷ যশিডিতে নামবে৷’
পান চিবোতে-চিবোতে একজন ভরসা দিলেন, ‘কিছু ভাববেন না৷ মধুপুরেই ঠেলে তুলে দেবো৷’
‘গিয়ে চিঠি দিস৷’—বলে, একে-একে সবাই নেমে গিয়ে জানলার পাশে দাঁড়ালেন৷ যতক্ষণ চোখের দেখা, দেখা যায় ছেলেটাকে৷ ঘ্যাড়াং করে একটা শব্দ হল৷ ট্রেনে ইঞ্জিনের টান ধরেছে৷ শেষ বাঁশি বাজল পুরুর করে৷ প্ল্যাটফর্ম ধীরে-ধীরে উলটো দিকে সরছে৷ কেউ-কেউ দৌড়ে-দৌড়ে শেষ কথা সারছেন৷ যাঁর সঙ্গে কথা তাঁর সঙ্গে বহুদিন হয়তো আর দেখা হবে না৷ কেউ খুব কায়দা করে রুমাল নাড়ছেন৷ ট্রেনের গতি ধীরে-ধীরে বাড়ছে৷ প্ল্যাটফর্ম আর কিছুতেই পাল্লা দিতে পারছে না৷ ক্রমশই পেছিয়ে পড়ছে৷
যাক, আলোটালো সব পিছনে পড়ে রইল৷ বিশাল অন্ধকারে সুড়ঙ্গ কেটে ট্রেন ছুটছে৷ সকলেই গোছগাছ করে বসেছেন৷ অনেকেই ছুটছেন ডোরাকাটা পাজামা আর চীনে কোট নিয়ে বাথরুমের দিকে৷ রাতের পোশাক৷ এই ট্রেনেই কেউ থাকবেন একদিন, কেউ পাক্কা দু-দিন৷ ট্রেন সোজা চলে যাবে একেবারে হিমালয়ের কোলে৷
অরূপের ও সব বায়নাক্কা নেই৷ হাফপ্যান্ট, হাফ-হাতা টি-শার্ট, মোজা, জুতো৷ জুতো জোড়া খুলে মাথার পাশে রেখে আর একটু রাত হলেই শুয়ে পড়বে৷ আর তারপর কী হবে সে জানে না৷ জানেন ওই ভদ্রলোক, যিনি এখনও পান চিবোচ্ছেন, অরূপকে মধুপুরে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন৷
ভদ্রলোক বললেন, ‘কী নাম তোমার?’
‘অরূপ৷’
‘বোর্ডিং-এ চললে?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কোন ক্লাস?’
‘এইট৷’
‘মন খারাপ হচ্ছে?’
‘না, আমি তো সিকস থেকে পড়ছি৷’
অরূপ হাই তুলল৷ সন্ধ্যাবেলা মা পেট ঠেসে ভালো মন্দ খাইয়ে দিয়েছে৷ ট্রেনটাও তেমনি দুলছে৷ বাইরেটাও তেমনি অন্ধকার৷ চোখে কিছুই পড়ছে না৷ মাঝে-মাঝে আলো বিন্দু ছিটকে-ছিটকে পিছনে পালাচ্ছে৷ আশেপাশে সমবয়সিও কেউ নেই৷ কোণের দিকে এক বৃদ্ধ বাতের ব্যথায় মাঝে-মাঝে কাতরাচ্ছেন৷ সঙ্গের মহিলা একটা বালিশ নিয়ে কোমরের পিছনে নানা কায়দা করছেন, আর বলছেন, ‘একটু সহ্য কর বাবা, দেরাদুনে সহস্রধারায় চান করলেই তোমার বাত সেরে যাবে৷’ বৃদ্ধ যন্ত্রণার গলায় বললেন, ‘তার আগেই তো আমি শেষ হয়ে যাব৷’ ওপাশে চশমা চোখে, রাগী-রাগী চেহারা, গোঁফওলা এক ভদ্রলোক বললেন, ‘অত কাতর হলে চলে বাবা৷ শেওড়াফুলিতে দুটো ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে দেবো, চন্দননগরেই ফ্ল্যাট হয়ে যাবেন৷ আপনি না এক সময়ে বারবেল ভাঁজতেন৷’ বৃদ্ধ করুণ সুরে বললেন, ‘সে তো নাইনটিন থার্টি ফোরে, তখন বাঙালি বুকে হাতি তুলত৷’ ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আবার আসবে সেদিন, ভয় নেই৷ ট্রেন একটা মোক্ষম ঝাঁকুনি দিল৷ বৃদ্ধ ‘উরে বাবারে’ বলে ককিয়ে উঠলেন, তারপর বললেন, ‘আর এসেছে সেদিন৷’
তারপর আবার হাই উঠল৷ পান-চিবোনো ভদ্রলোক সুটকেস থেকে একটা চাদর বের করে বললেন, শুধু-শুধু কষ্ট করছ কেন? যাও টঙে উঠে শুয়ে পড়ো৷ বিছানা তো করাই আছে৷ ঠেসে জল খাও৷ শেষ রাতে বাথরুমের টানেই তোমার ঘুম ভেঙে যাবে৷ আমার ওপর বিশেষ ভরসা রেখো না৷ তোমার বাবাকে তখন বললুম বটে, তবে আমিও ভীষণ ঘুমকাতুরে৷ শুলেই মরে যাই৷’
বৃদ্ধ বললেন, ‘কোথায় নামবে খোকা?’
অরূপ বললে, যশিডিতে৷’
‘আমি আবার এ লাইনের কিছু চিনি না৷ তুমি বলে দিও, আমি ডেকে দেব৷’
মহিলা বললেন, ‘বাবা, ও যদি ডাকতেই পারবে, তাহলে আর নামতে কি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেও তো ঠিক কথা৷ তাহলে তোরাই বাপু একটু ডেকে দিস৷’
নামার সময়টা যে বড় বেয়াড়া৷ একেবারে শেষ রাত৷ ওই সময়টাই তো ঘুমের৷’
‘তাহলে তুমি দুর্গা বলে শুয়ে পড়ো৷ মা তোমাকে ঠিক তুলে দেবেন৷ ঈশ্বরে ভক্তি রাখো৷ সর্ববিঘ্ন বিনাশনং৷’
মাথার পাশে জুতো জোড়া রেখে অরূপ দুর্গা বলে শুয়ে পড়ল৷ আর তো কিছু করার নেই৷ সবাই বিদেশে চলেছে সংসার নিয়ে, অসুখ নিয়ে, যন্ত্রণা নিয়ে৷ যে যার নিজেদের কথায় ব্যস্ত৷ তার সঙ্গে কে আর সারারাত বকর-বকর করবে৷ ট্রেন চলেছে দুলে-দুলে৷ যা কিছু বকাঝকা সবই হচ্ছে লাইনে, চাকায়, ইঞ্জিনে৷ ট্রেন চলেছে, ঘুম চলেছে৷ গভীর থেকে গভীরে৷ অরূপ প্রথমে যখন জুতো খুলে শুয়েছিল তখন মনে ছিল চলমান ট্রেনের বাঙ্কে শুয়ে আছে৷ তারপর আর কিছু মনে রইল না৷ এক সময় মনে হল, বালিগঞ্জের বাড়ির দোতলার দক্ষিণের ঘরে নরম বিছানায় শুয়ে আছে৷
এদিকে ট্রেন চলে-চলে ভোরের দিকে যশিডি স্টেশানে এসে থেমেছে৷ দূরে ইঞ্জিন হাঁসফাঁস করছে৷ চা-গরম হাঁকছে ভেন্ডাররা৷ স্টেশনের কোলেই একটা পাহাড় জমাট অন্ধকারের মতো দাঁড়িয়ে৷ চুড়োর দিকে আলোর ছোঁয়া লেগেছে৷ খেজুর গাছের পাতা ঝিরিঝিরি দুলে অন্ধকার ঝেড়ে ফেলতে চাইছে৷ স্টেশন মাস্টারের ঘরে এখনও রাত৷ চড়া-চড়া আলো জ্বলছে৷ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে চাদরমুড়ি দিয়ে মানুষ ঘুমোচ্ছে৷ পান্ডারা হাঁকছে,—বৈদ্যনাথ ধাম, পাণ্ডা চাই বাবু, আপনার পান্ডা কে?
গার্ড সায়েবের বাঁশি বাজল৷ ট্রেন দুলে উঠল৷ মালকোঁচা মেরে ধুতি আর পাঞ্জাবি পরা৷ দুজন মানুষ উদগ্রীব হয়ে প্ল্যাটফর্মে যেমন দাঁড়িয়েছিলেন তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন৷ একের-পর-এক কামরা যাই-যাই বলে পাহাড়ের কোলে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ এঁরা এসেছিলেন অরূপকে নিয়ে যেতে৷ বাইরে টাঙ্গা অপেক্ষা করছে৷ কোথায় অরূপ৷ সে তখন গভীর নিদ্রায়৷ যাঁরা তাকে তুলে দেওয়ার ভার নিয়েছিলেন, তাঁদের একই অবস্থা৷ বাতের ব্যথায় বৃদ্ধ ঘুমের ওষুধে অচৈতন্য৷ সেই পান-খাওয়া দাদা উলটো দিকের দ্বিতীয় বাঙ্কে হাঁ করে ঘুমোচ্ছেন৷ ট্রেন ছুটেছে ঝাঁঝার দিকে৷
রোদ চড়ছে৷ বিহারি গরমের হলকায় কামরার খুরখুরে পাখার বাতাস যেন আগুনের নিশ্বাস৷ চারপাশের গোলমাল ক্রমশই বাড়ছে৷ লোকজনের ওঠা নামা৷ একসময় অরূপের ঘুম ভাঙল৷ ঘোর কাটতেই বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল৷ এখন তো ভোর নয়৷ চারপাশে ক্যাটকেটে রোদ৷ বাঙ্ক থেকে মুখ ঝুলিয়ে জিগ্যেস করল, ‘যশিডি কি এসেছে দাদা?’
‘অ্যাঁ, যশিডি?’ সকলেরই এক প্রশ্ন৷ ‘আরে, সে কী, তুমি এখনও নামোনি? সে তো অনেকক্ষণ চলে গেছে হে৷ পরের স্টেশন পাটনা৷’
অরূপ হুড়মুড় করে নিচে নেমে এল৷ বাথরুম থেকে দাড়িটাড়ি কামিয়ে চান করে ফ্রেশ হয়ে এলেন সেই পান-চিবোনো দাদা৷ এক হাতে ভিজে তোয়ালে, অন্যহাতে সাবানের কেস৷ অরূপকে দেখেই আধ হাত জিভ বের করে বললেন, ‘আরে, ছি-ছি৷ ভীষণ ভুল হয়ে গেছে৷ তোমারও দোষ আছে বাপু৷ আমার মতো করতে পারো না? আমি এমন জায়গায় কখনই যাওয়ার চেষ্টা করি না যেখানে ভোরবেলা নামতে হয়৷ গেলেও, এগিয়ে গিয়ে পেছিয়ে আসি৷ তুমিও তাই করো৷ পাটনায় নেমে ট্রেন ধরে যশিডি চলে যাও৷ এসো তোমাকে সাহায্য করি৷ আমার একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে তো৷’
ভদ্রলোক ডিঙি মেরে-মেরে হোলডল গোটাতে লাগলেন যেন কত বড়ই কাজ করছেন৷ অরূপ হাঁ করে তাকিয়ে আছে৷ ভীষণ ভয় করছে৷ টেলিগ্রাম করা ছিল৷ স্টেশনে যাঁরা নিতে এসেছিলেন, তাঁরা বোর্ডিং-এ ফিরে গিয়ে এক্ষুনি কলকাতায় ফিরতি টেলিগ্রাম করবেন, ছেলে আসেনি, তারপর কী হবে৷ যশিডিতে নেমে সে কীভাবে একা-একা বৈদ্যনাথধাম যাবে৷ যত রকমের ভয় ছিল সব একসঙ্গে এসে তার মনের ওপর চেপে বসল৷ আর ট্রেনও ধীরে-ধীরে পাটনা স্টেশনে ঢুকে পড়ল৷
বৃদ্ধ ভদ্রলোক এতক্ষণে একটিমাত্র কথা বললেন, ‘ছি-ছি, তোমাদের এতটুকু দায়িত্ববোধ নেই৷’
পান-চিবোনো ভদ্রলোক খুব রেগে গিয়ে বললেন, ‘থামুন মশাই৷ বাপ-মায়েরই যেখানে দায়িত্ব নেই, সেখানে দায়িত্ব থাকবে রাস্তার লোকের? কী করে আশা করেন৷ আমার ঘুম ভাঙলে নিশ্চয়ই নামিয়ে দিতুম৷ সূর্য মাথার ওপর এসে গেলেই আমি ফিট৷ এখন আমি এই হোলডল ঘাড়ে করে, এর হাত ধরে পাটনা স্টেশনে কেমন নামিয়ে দি দেখুন৷ এটা দায়িত্ব নয়?’
অরূপের হাত ধরে বললেন, ‘এসো, এসো৷ এখুনি ট্রেন আবার ছেড়ে দেবে৷’
প্ল্যাটফর্মে নেমে হোলডলটা দুম করে পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘ইস, ফরসা গেঞ্জিটা গেল৷ যাকগে৷ পরোপকার করতে গিয়ে কত লোক জীবনদান করে ইতিহাস হয়ে আছে৷ আচ্ছা, ওই হল স্টেশন মাস্টারের ঘর৷ সোজা গিয়ে বলো—ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ছাত্র, আমি এখন যশিডি যাব, ব্যবস্থা করে দিন৷ আরে ম্যান, ঘাবড়ে গেলে চলে৷ জীবনে কত বড়-বড় বিপদ আসতে পারে জান? সব সময় মনে রাখবে, একলা চলো রে৷’
প্ল্যাটফর্মে অরূপকে একলা ফেলে ভদ্রলোক চলে গেলেন! বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন দুলে উঠল৷ অরূপ হোলডলের ওপর বসে পড়ল৷ তার এখন কাঁদতে ইচ্ছে করছে৷ খিদে পেয়েছে৷ জলতেষ্টা৷ জলের বোতলটা ট্রেনেই ঝুলছে৷ ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা, মনটা যেন কেমন করছে৷ অথই জলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা৷ একজনও নেই যার সঙ্গে বাংলায় কথা বলা যায়৷ চারপাশে সব হিন্দি, অরূপের চোখে জল এসে গেছে৷
বসে থাকলে তো চলবে না৷ খোঁজখবর নিতে হবে৷ পাটনা স্টেশনটা তার ঘরবাড়ি হতে পারে না৷ উঠতে হবে, জানতে হবে, যেতে হবে৷ তাদের বিদ্যাভবনেই তো প্রার্থনা হয় উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্যবরাণ নিবোধত৷ বেডিংটা তেমন ভারী নয়, সহজেই মাথায় তোলা যায়৷ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, বাবুগিরি না ছাড়লে বাঙালি মানুষ হবে না৷ অরূপ বেডিংটা কাঁধে তুলে নিয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘর লক্ষ্য করে এগোল৷ এগোতে-এগোতে মনে হল তিনি কি করবেন? টিকিট কেটে ডাউন ট্রেনে উঠতে হবে৷ প্রথমে ট্রেনের সময় জানতে হবে৷ সে তো যে কেউ বলতে পারে৷ লেখাও থাকে কালো বোর্ডে সাদা হরফে৷
এইবার একটু-একটু সাহস আসছে মনে৷ শ্রীঅরবিন্দ সাত বছর বয়েসে বিলেত গিয়েছিলেন৷ সেখানে একা থেকেছিলেন, লেখাপড়া করেছিলেন৷ তবে? তবে সে কেন পাটনা থেকে যশিডি যেতে পারবে না? দু-চারবার ধাক্কা খেয়েই অরূপ জেনে গেল সন্ধের আগে কোনও ট্রেন নেই৷ ভালোই হয়েছে, বিপদ যখন এসেছে ভালোভাবেই আসুক৷ যে ছেলে সময়ে ঘুম থেকে উঠতে পারে না, তার পাটনাতেই পড়ে থাকা উচিত৷
একটা ঘরের বাইরে লেখা আছে, লেফট লাগেজ৷ অরূপের চেনা শব্দ৷ এখানে কিছুক্ষণের জন্যে মালপত্র রাখা যায়৷ বেডিংটাকে লেফট লাগেজে ফেলে, অরূপ বেশ ঝাড়া হাত-পা হল৷ এখন চান করা যায়, খাওয়া যায়৷ ইচ্ছে করলে শহরটাকে দেখে আসা যায়৷ এখনও অনেক সময় আছে৷
বেলা চারটে নাগাদ অরূপের মনে হল যথেষ্ট ঘোরাঘুরি হয়েছে, এবার একটু বসা যেতে পারে৷ অচেনা স্টেশনের সবটাই চেনা হয়ে গেছে৷ কোনটা ডাউন প্ল্যাটফর্ম, কোনটা আপ৷ কোনটা তারঘর৷ বেশ লাগছে কিন্তু৷ এদিক থেকে ওদিক ট্রেন কত দিক চলে যাচ্ছে৷ তার জলের বোতলটা এতক্ষণে কতদূরে চলে গেছে৷
সন্ধের আগেই সে একটা টিকিট কেটে ফেলল৷ আর এক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রেন এসে পড়বে৷ এখন কলকাতার বাড়িতে কী হচ্ছে, কে জানে? বাবা অফিসে৷ অঞ্জর গানের মাস্টারমশাই এসেছেন৷ মা ছাদে৷ সে এখন কত দূরে৷
প্ল্যাটফর্ম চঞ্চল হয়ে উঠল৷ কলকাতার ট্রেন আসছে৷ ঠ্যাং-ঠ্যাং করে লোহার ঘণ্টা বাজছে৷ অরূপ কাঁধে বিছানা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল৷ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তারই মতো একটি সাঁওতাল ছেলে, কাঁধে লাঠি! লাঠির ডগায় পুঁটুলি বাঁধা৷ খুব ভাব করতে ইচ্ছে করছে৷
ট্রেন এসে গেছে৷ কত দূর থেকে আসছে, ইঞ্জিনের হাঁপ ধরেছে৷ অরূপ যে কামরায় উঠল ছেলেটিও সেই কামরায় উঠল৷ তেমন ভিড় নেই৷ বসার জায়গা আছে৷ কম্বলের আসনে একজন সাধু বসে আছেন৷ বড়-বড় চুল, দাড়ি৷ লাল জবাফুলের মতো বড়-বড় চোখ৷ অরূপ একপাশে বসে পড়ল৷ সাঁওতাল ছেলেটি উলটো দিকে বসেছে৷ শিশু কৃষ্ণের মতো দেখতে৷ পুঁটলি থেকে একটা পেয়ারা বের করে খাচ্ছে৷ এক কামড় দিয়েই অরূপের দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর আর একটা পেয়ারা বের করে হাসি-হাসি মুখে তার সামনে এগিয়ে ধরল৷ বেশ ভাব হয়ে গেল দুজনে৷ অরূপ জিগ্যেস করল, ‘তুমি কোথায় যাবে ভাই?’
ছেলেটি বললে, ‘মোগলসরাই৷’
ছেলেটি জিগ্যেস করল, ‘তুমি?’
‘আমি যশিডি যাব৷’
সাধু এতক্ষণ ধ্যানস্থ ছিলেন৷ দুজনের কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ হাসি থামিয়ে বললেন, ‘মায়া, মায়া৷ একই ট্রেনের দুটো আসন দুটো দিকে ছুটছে৷ একটা ওপর দিকে, একটা নিচের দিকে৷ মায়া, মায়া৷’
অরূপ প্রথমটা কিছু বুঝতে পারল না৷ এতে মায়ার কী আছে? দুজন দু-জায়গায় তো যেতেই পারে৷ সকলকেই যে একই জায়গায় যেতে হবে তার কি মানে আছে৷ পরেই খেয়াল হল, সত্যিই তো! মোগলসরাই তো পাটনার মাথার ওপরে৷ যশিডি তো নিচের দিকে৷ তা হলে? অরূপ সেই সন্ন্যাসীকে জিগ্যেস করল, ‘এ ট্রেন কোথায় যাবে, ঠিক, ঠিক?’
‘যদি উলটে না যায় তা হলে মোগলসরাই৷’
‘আমি তা হলে ভুল ট্রেনে চেপে বসেছি৷’
‘লেড়কা, মানুষের জীবনই তো ভুলে ভরা৷ উসমে কেয়া হ্যায়!
‘আমি যে যশিডি যাব?’
যাবে, আজ না যেতে পারো, কাল পারবে, কাল না পারলে পরশু পারবে৷ শুধু লক্ষ্যটা ঠিক রাখ৷ ভুল হোক৷ একশোবার হোক৷ হাজারবার হোক৷ কিন্তু লক্ষ্য যেন হারিয়ে না যায়৷ মা ভৈঃ৷’
ঘ্যাচাঘ্যাম, ঘ্যাচাঘ্যাম ট্রেন ছুটছে৷ সাঁওতাল ছেলেটির মাথা ঘুমে ঢুলছে৷
আর অরূপ৷ এখন আর তার ঘুম আসছে না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন