সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
রান্নাঘরটা বাড়ির একেবারে শেষ মাথায়৷ বেশ বড৷ চারপাশে বাগান৷ পেছন দিকে বেশ বড় একটা পুকুরও আছে৷ আমার দাদু বাড়িটা করিয়েছিলেন৷ খুব নামকরা ডাক্তার ছিলেন৷ সেই সময় লোকজনও ছিল অনেক৷ এখন ফাঁকা ফাঁকা৷ সেই জন্য রাত্তিরের দিকে ভয় ভয় করে. ভূতের ভয়টাই বেশি৷ চোর-ডাকাত—সে যখন আসবে দেখা যাবে৷ আমার একটা গুলতি আছে, দিদির একটা কাটারি, মায়ের একটা ঝাঁটা৷ বাবার আছে সেতার৷ বাজনাটা রাত বারোটা অবধি চলে৷ বাবার সঙ্গে দামুকাকু তবলা বাজান৷ বেশ ভালো চেহারা, বড় বড় চুল, লাল লাল চোখ৷ আমাদের বাড়িতেই থাকেন৷ তাঁর একটা হাতুড়ি আছে৷ চা বাগানে মানুষ৷ হাতির পিঠে চেপে তিস্তা নদীতে চান করতে যেতেন৷ বাঘের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল, পাক্কা পনেরো মিনিট৷ সেই থেকে চোখ দুটো লাল৷ দামুকাকুর একটুও ভয় করেনি৷ কারণ কলেজে পড়েছিলেন, বাঘ ‘ক্যাট ফ্যামিলির’ প্রাণী অর্থাৎ বড় জাতের একটা বেড়াল৷ ভয় পাওয়ার তো কোনো কারণ নেই৷ ভয়ে তাঁর হাতঘড়িটা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গেল৷ কিছুতেই চালু করা গেল না৷ বাঘের ভয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িটা তিনি যত্ন করে রেখেছেন৷ বাবা কোনোদিন বিলেতে বাজাতে গেলে তাঁকেইহ্রস্বরা হবে৷ তখন বিলিতি কোম্পানি ‘ওয়েস্ট অ্যান্ড ওয়াচ’-কে দেখাবেন৷ ঘড়িটা ওই কোম্পানির তৈরি৷
সারাদিন মা কেবল রান্নাই করছে, রান্নাই করছে৷ ওইটাই তার হবি৷ আর হল লোককে খাওয়ানো৷ তাঁরা প্রশংসা করলে মায়ের ভীষণ আনন্দ৷ মা আমাদের দুজনের নাম রেখেছে ‘চোর কোম্পানি’৷ সাধে আমরা কোম্পানি করেছি৷ মা আমাদের বাধ্য করেছে৷ রসবড়া করেছে, ও বাবা! গুনে গুনে রেখেছে৷ পাটিসাপটা গোনাগুনতি৷ সঙ্গে জুটেওছে সেই রকম একজন৷ মানদামাসি৷ সুর তুললেই হল, ‘বউদি-ই’! রসবড়া যেন কম কম লাগছে৷ কাউকে দিয়েছিলে?
‘গোন গোন শিগগির গোন৷’
‘ষোলোটা৷’
‘সে কী রে, কুড়িটা ছিল তো৷’
‘চারটে গেল কোথায়?’
দিদি আর আমি তখন ধারে কাছে নেই৷ তখন যে-ভাবেই হোক আমাদের একটা বড় রকমের সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে৷ মা আর মানদামাসির মনটা সেই দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে৷ এই ব্যাপারে আমার দিদি এক নম্বর৷ হাঁপাতে হাঁপাতে রান্নাঘরে ঢুকল৷ ‘সর্বনাশ হয়ে গেল৷’
মা বলল, ‘কী হল রে?’
‘এ-পাড়ার সর্বনাশ৷ আজ অমাবস্যা৷ সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে সারারাত পুজো হবে৷ বলি, হবে না৷’
‘যা!’
‘যা—মানে?’
‘বলির পাঁঠা দড়ি খুলে পালিয়ে গেল৷ পাঁঠা নেই৷ দড়িটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে পড়ে আছে৷’
মায়ের খুন্তি নাড়া বন্ধ, মানদামাসির কুটনো কোটা৷ দিদির গল্প শেষ হয়নি৷ কালীবাড়িতে পণ্ডিত সভা বসেছে৷ বলি বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ মা মনে হয় নিজেই ছাগলটাকে ছেড়ে দিয়েছেন৷ মা বলি চাইছেন না৷ দিদি বললে, কুঞ্জকাকু ভেউ ভেউ করে কাঁদছে৷
‘কাঁদছে কেন?’
‘কী বলছ তুমি৷ কাঁদবে না? ছাগলটা তো তাঁর মানত করা ছিল৷ সেই ছাগল নিরুদ্দেশ! কত বড় অমঙ্গল৷ মা আমি আর একবার যাই৷ শেষমেশ কী হল জেনে আসি৷’ আমাকে ইশারা করে বেরিয়ে গেল৷
বাইরে এসে দিদিকে বললুম, ‘এইবার কী করে ম্যানেজ করবি?’
‘তুই একটা ছাগল৷ ছাগলটাকে ফিরিয়ে আনতে কতক্ষণ৷ ছাগল ম্যা ম্যা করতে করতে ফিরে এল৷ চোখে জল৷ কাঁদছে৷ মায়ের কাছে ক্ষমা চাইছে৷’
ঠাস্ করে আমার গালে এক চড় মেরে বলল, ‘বাঁদর৷’
‘এই বললি ছাগল৷’
ঠোঁটে এখনও চোরাই মাল লেগে রয়েছে৷ জানিস না, চোরদের খুব সাবধানে থাকতে হয়৷ ফিটফাট, তা না হলেই পুলিশ৷ মানদামাসিটা তো একটা দারোগা৷ রান্নাঘরটা যেন একটা থানা! ওর ক’টা চোখ জানিস! সেদিন দুপুরে এক গাঁট তেঁতুল নিয়েছি, ঠিক ধরেছে৷ শুনতে পাচ্ছি, বলছে, এই দেখলুম দু-গাঁট, আর একটা গেল কোথায়? এনেছিস?
‘কী আনব?’
‘না, তোকে দিয়ে কোম্পানি চলবে না৷ যেখানে দাঁড়িয়েছিলিস, তার পাশেই মা কড়া থেকে গরম গরম ধোঁকা তুলে তুলে থালায় রাখছিল, তুই খালি হাতে গুরুর কাছে এলি? হনুমান একটা৷ গুরুদক্ষিণা দিতে হয় জানিস না৷ জানিস না প্রত্যেকটা সুযোগ একবারই আসে৷ যেমন লেখাপড়ায়, সেই রকম কাজে-কম্মে৷ তুই একটা গোহাবা৷ ঠিক আছে, গুরুকে ফলদান কর৷’
‘কী ফল?’
‘দেখতে পাচ্ছিস না, উঁচু-উঁচু ডালে পাকা পাকা পেয়ারা৷’
‘মা গাছে উঠতে বারণ করেছে৷’
‘বাবারে! মায়ের কথা শুনে উল্টে যাচ্ছে৷ মা আগে, না গুরু আগে৷
‘তুই কীসে আমার গুরু?’
‘বুঝতে পারবি যখন চলে যাব৷’
‘কোথায় যাবি?’
‘আমি কি ইচ্ছে করে যাব! আমাকে যাইয়ে দেবে৷’
দিদি ঠিকই বলেছিল৷ কী বিশাল, বিরাট৷ এত বড় জামাইবাবু আমি আগে কখনো দেখিনি৷ দামুকাকুকেও স্বীকার করেন৷ অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে একটু বেশি বেড়েছে৷ হাইটটা ইঞ্চিখানেক কম হলে মন্দ হত না৷ একদিকে ভালো৷ উঁচু তাক থেকে কিছু নামাতে হলে টুল লাগবে না৷
‘বুকটা বিশ্রী রকমের চওড়া৷ দুপাশে দুটো হাতের মাঝখানের দূরত্ব বেড়ে গেছে৷’
দামুকাকু বললেন, ‘সেটা ঠিক৷ প্রায় ছাপ্পান্ন৷ আটচল্লিশ হলে ঠিক হত৷ পাঞ্জাবির কাপড় বেশি লাগবে৷’
‘বেজায় গম্ভীর৷’
‘গম্ভীর তো হবেই৷ বড় ইঞ্জিনিয়ার, ভোপালে একটা বিলিতি কোম্পানিতে কাজ করে৷’
‘জলখাবার খায় না?’
‘কেন খায় না?’
‘কী করে খাবে? ব্রেকফাস্ট করতে হয় যে৷ মেঝেতে বসে ভাত খায় না৷ টেবিলে বসে লাঞ্চ করে৷ রাত আটটায় ডিনার৷ ডিমের ওমলেট খায় না, পোচ খায়৷’
‘আপনারা কোথা থেকে এই দৈত্যটাকে ধরে আনলেন, আমার দিদিটাকে শেষ করে দেবে৷’
দামুকাকু বললেন, ‘অতই সোজা, তোর দিদিকে তুই চিনিস না৷ ময়ান দিয়ে ঠেসে ফুলকো লুচি করে দেবে৷’
দিদিটা কি স্বার্থপর৷ দৈত্যটার সঙ্গে নাচতে নাচতে ভোপাল চলে গেল৷ চোখে এক ফোঁটা জল নেই৷
আমাকে বললে, ‘কোম্পানিটা উঠে গেল, সাইনবোর্ডটা উল্টে দে৷’
দৈত্যটা বলল, ‘শ্যালক, একবার আমাদের দিকে এসো৷ তোমার সঙ্গে তো আমার গলাগলির সম্পর্ক৷ একমাস থাকবে, চেম্বারটা মজবুত করে দেবো৷’
দৈত্যটা আমার স্বার্থপর দিদিটাকে নিয়ে চলে গেল৷ কান্না আসছিল৷ রাগ দিয়ে চোখের জলটা বাষ্প করে দিলুম৷ ওই দৈত্যটা আমার প্রতিদ্বন্দ্বী৷ আমি তোমাকে ছাড়িয়ে যাব৷ তুমি ইঞ্জিনিয়ার আর আমি হব বিজ্ঞানী৷ দামুকাকু পিঠটা চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘রাইট ডিসিশন৷ আয় তোর পিঠে ঝাঁপতাল বাজাই৷’
সেই রান্নাঘরে আমি একা৷ চায়ের জল ধোঁয়া ছড়ায়৷ সুতোয় বাঁধা টি-ব্যাগ দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দুলছে৷ কত দিন চলে গেল পেছন দিকে৷ বাবার সেতারে সুরের জলতরঙ্গ উঠেনি কতদিন৷ দামুকাকুর হাতুড়ি তোয়ালে মোড়া৷ দেওয়াল মায়ের গলায় বলছে—কেউ আর আমরা রসবড়া চুরি করবে না৷
ফোন বাজছে! ‘ইয়েস৷’
‘ডক্টর বোস! ল্যানসেটে আপনার থিসিস সাডা ফলে দিয়েছে৷’
আবার ফোন—‘ইয়েস৷’
‘দৈত্য বলছি৷ দিদির সঙ্গে কথা বলো’ ‘ইয়েস৷’ ‘ডক্টর বাঁদর! অনেক কানমলা সুদে বাড়ছে রে হনুমান৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন