সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
নামটা এখনও মনে আছে আমার৷ বটকৃষ্ট৷
কোনওদিন প্রশ্ন করিনি, বটকৃষ্ট মানে কী? যে কৃষ্ণ বটগাছের তলায় থাকেন, না কি বটই কৃষ্ণ?
ক্লাস সেভেন-এ তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷ নিরেট চেহারা৷ নাকটা থ্যাবড়া৷ শ্যামবর্ণ৷ সেই বয়েসেই বড়দের মতো পাকা-পাকা কথা বলত৷ খুব বিষয়ী ছিল৷ কেবল টাকা৷ বড় হয়ে ব্যবসা করবে৷ ব্যবসা করে বড় হবে৷ গাড়ি কিনবে৷ বাগান-বাড়ি করবে৷ এই সব৷ অঙ্কে খুব পাকা ছিল৷
কালীপুজো আর কয়েকদিন পরেই৷ একদিন ক্লাসে এল৷ পকেট ভরতি ছুঁচো বাজি৷ নিজে তৈরি করেছে৷ আমাকে বলল, ‘কিনবি? টাকায় দশটা৷ মাল দেখে দাম৷’ বাজির খুব শখ ছিল আমার৷ আমাদের বাড়িতে তখন তুবড়ি তৈরি হতো৷ ছুঁচো হতো না৷ কেন হতো না? ছুঁচো খুব পাজি৷ জন্তু ছুঁচোর চেয়ে বাজি ছুঁচো আরও ডেনজারাস৷
টিফিনের সময় বটো স্কুলের দালানে ছুঁচো ছাড়ছে৷ আমরা দর্শক৷ ছুঁচো ছিটকে হেডমাস্টারমশায়ের কোঁচোয়৷ হইহই কাণ্ড৷ দমকল ছাড়া সবই এল৷ বাকি পিরিয়ড বটো ক্লাসের বাইরে নিলডাউন৷ হেডমাস্টারমশাই বলতে লাগলেন, ‘এটা তাঁকে মেরে ফেলার চক্রান্ত৷’
স্কুল ছুটির পর বটো বললে, ‘জিনিসটা দেখলি তো৷ কোঁচায় না ঢুকলে আরও খেলত৷ টাকায় দশটা৷ তোকে বারোটা দোব৷’
আমার টাকা কোথায়! ভরা পেটে খালি পকেটে স্কুলে আসতুম, দিনের শেষে পেট খালি৷ বাড়ি ফেরা মাত্রই ভরা পেট৷ ছোটদের হাতে কাঁচা পয়সা? খবরদার না৷ চরিত্রের সর্বনাশ৷
বটকৃষ্ণকে তাপ্পি-তুপ্পি দিয়ে ভাগটা আদায় করলুম৷ সাড়ে তিন, এক, আধ, মানপাতার রস৷ তার মানে সোরা সাড়ে তিন ভাগ, কাঠ কয়লা এক ভাগ, গন্ধক আধ ভাগ৷ আচ্ছা করে মিশিয়ে মানকচুর ডাঁটার রসে দিয়ে বেশ করে রোদে শুকিয়ে খোলে পুরে ফেল৷ হয়ে গেল চনমনে ছুঁচো৷ এ-পাড়ায় ছাড়, উড়ে চলে যাবে ও-পাড়ায়৷ ফর্মূলার জন্যে বটো সাড়ে তিন টাকা ফি নিয়ে নিলে৷ বললে, ‘‘তুই তো এই ভাগে সারা জীবন করে খাবি, আমার ভাগে কী থাকবে?’’
টাকাটা অনেক কষ্টে জোগাড় হল৷ তিন মাইল হেঁটে পিসিমার বাড়ি৷
সেইখান থেকে কেঁদে-কেটে আদায়৷ সঙ্গে বটোকেও নিয়ে গিয়েছিলাম৷ বারোখানা লুচি-কপির তরকারি দিয়ে সাঁটিয়ে এল৷
বটোর ফর্মূলায় ছুঁতো তৈরি হল৷ মানপাতার রসে হাত কুটকুটিয়ে ফুলে গেল৷ ছুঁচো কিন্তু দৌড়ল না৷ যেখানে ফেললুম, সেইখানেই শুয়ে-শুয়ে ভোঁস-ভোঁস৷ শেষে লাথি মেরে-মেরে এপাশ-ওপাশ৷ লাল মেঝেতে সাদা-সাদা দাগ৷ রাত্তির বেলায় বাবার তিরস্কার৷ মেঝের সর্বনাশ করেছিস৷ পেল্লায় ছুঁচো করছিলুম, ত্রিভুবনে ছুটে বেড়াবে বলে৷ বুঝলুম, বটো ঠকিয়েছে, আসল ভাগ ছাড়েনি৷ ব্যাটা বদমাইশ৷ সাড়ে তিন টাকা, বারোখানা লুচি মেরে কেমন বুড়ো আঙুল দেখাল৷
আমার লাঞ্ছনায় আমার কাকাবাবুর খুব করুণা হল৷ তিনি আমার বাবার লাইব্রেরি থেকে খুঁজে পেতে একটা প্রাচীন বই বের করলেন৷ বইটার নাম ‘পাইরো টেকনিক৷’ নানা রকমের বাজির অজস্র ফর্মূলা৷
কাকাবাবু জিগ্যেস করলেন, ‘‘ছুঁচোবাজির ইংরেজি কী৷ ইংরেজি নামটা পেলেই সূচিতে পাওয়া যাবে, পাতার নম্বর দেখে৷’’ কাকাবাবুর ছুঁচোর ইংরিজি জানি—মোল৷ আর বাজির ইংরিজি—ফায়ার ওয়ার্কস৷ তাহলে ‘মোল ফায়ার ওয়ার্কাস৷’
যথেষ্ট খোঁজাখুঁজি হল৷ দেখা গেল, ইংরেজরা এই বাজির নামই শোনেনি৷ আমাদের গবেষণায় বাবা যোগ দিলেন৷ শেষে সিদ্ধান্ত হল, হাউই তৈরি হবে৷ হাউই-এর ইংরিজি রকেট৷ রকেটের সাত-সাতটা ফর্মূলা রয়েছে৷ ছুঁচোর চেয়ে অনেক ভদ্র, অনেক বড় জাতের বাজি৷ কাছায় কোঁচায় ঢুকে গিয়ে ছ্যাঁচড়ামি করে না৷ সোজা আকাশে, নক্ষত্রলোকে গিয়ে আগুনের ফুল ছড়িয়ে আসে৷
বাবার নির্দেশে মশলা আর খোল তৈরি হল৷ বাঁশ চিরে চেঁচারি তৈরি করে লাগানো হল ডান্ডা৷ বেশ বড়-বড় রকেট৷ তা প্রায় গোটা কুড়ি৷ বাজারি মাল নয়৷ তার মানে, কোথায় সে উঠে যাবে, না ওড়া পর্যন্ত ভাবাই যাচ্ছে না৷ আকার-আকৃতি দেখে আমার ধারণা হল, চাঁদের দেশেও যেতে পারে৷
কালীপুজোর রাত৷ মিশকালো আকাশ৷ তারার খই৷ ঘুরে-ঘুরে উড়ন তুবড়ি উঠছে৷ এপাশ-ওপাশ থেকে রকেট ছুটে যাচ্ছে তীব্র গতিতে৷ একটা দুটো ফুল উগড়ে ডান্ডা সমেত পোড়া খোল ফেরত দিচ্ছে মাটিকে৷ বুম-বাম, ফুট-ফাট শব্দে কেউ কারও কথা শুনতে পাচ্ছি না৷ ফানুস দোল খেতে-খেতে ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণে৷ আলোর মালায় সাজানো বাড়ি-ঘর৷ শ্যামাপুজো খুব জমেছে৷
আমাদের সাবেক কালের তিনতলা বাড়ির ন্যাড়া ছাতে দর্শকরা সব জমায়েত৷ একটু পরেই আমাদের তৈরি বিস্ময় আকাশ-অভিযানে উঠবে৷ ছাতের আলসেতে বোতল৷ বোতলে গোঁজা চার হাত উচ্চতার বারুদ ঠাসা, বিপুল ভারী রকেট৷ বোতলটা মাঝে-মাঝে উলটে যাওয়ার চেষ্টা করছে৷ কোনও রকমে খাড়া রাখা হয়েছে৷ কাকাবাবু দূর থেকে প্যাঁকাটির আগুনে পলতে ধরাবার চেষ্টা করছেন৷ উত্তরের বাতাস অশান্তি করছে৷
অবশেষে পলতে জ্বলছে৷ বিজ-বিজ মন্ত্রের মতো আগুনের ফুলকি ধারা৷ বেশ তেজেই বেরোচ্ছে৷ এইবার হুশ্—আকাশে৷ ভীষণ উত্তেজনা৷ দম প্রায় বন্ধ৷
হঠাৎ, বোতল সমেত রকেট শুয়ে পড়ল৷ ধর, ধর৷
কে ধরবে? ঝ্যাঁটার মতো আগুনের ঝাড়৷ রকেট পাশ ফিরে তিনতলা থেকে একতলায়৷ পাশের লাগোয়া বাড়ির খড়ের চালে৷ চালায় আগুন৷ শুকনো খড় দাউ-দাউ জ্বলছে৷ আমাদের বাড়িটাও গেল-গেল৷ বালতি, বালতি, জল৷
রকেটবাজি হল চালাবাজি৷
তা, একটারই দাম দাঁড়াল গিয়ে তিন হাজার৷ ঘরামির বিলটা বাবাই মেটালেন৷ তিনহাজার তেত্রিশ টাকা৷ তিন বান্ডিল বিড়ির দামও ধরে নিয়েছে৷ এক আঁটি খড় বেঁচেছিল৷ আমাদের উপহার দিয়ে গেল৷
বাবা বললেন, ‘‘এ বাড়িতে গোরু-টরু বলতে তো এই একটাই আছে৷ দ্বিপদ গোরু৷ এটা ওরই ফলার৷ একটু-একটু করে খেতে শিখুক৷ প্রথম-প্রথম বদহজম হবে৷ আমার কাছে নাক্সভূমিকা আছে৷’’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন