শান্তি

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

হেডস্যার ক্লাসে ঢুকেই তাঁর ভরাট গম্ভীর গলায় বললেন, ‘জগা! এই দিকে আয়৷’ এই ‘আয়’ মানেই হয়ে গেল৷ স্যার আমাদের অঙ্কের ক্লাস নেন৷ তখন বলবেন এবং রোজই বলবেন—‘আয় আর ব্যয়, এ ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছু নেই৷ চৌবাচ্চা—জল ঢুকছে, জল বেরোচ্ছে৷ হিসেবটা তা হলে কী? চৌবাচ্চা খালি না হয়ে যায়৷ আয় করে ব্যয় করো৷ এখানে একটা শব্দ—‘কমন’—শব্দটা হল—‘কর’—‘কর’ মানে হাত—হাতই সব৷ জেনে রাখ, পৃথিবীটা হল হাতের প্রয়োগশালা৷ পরপর কত শব্দ —হাতের কেরামতি, হাত সাফাই, হাত আলগা, হাত টান, হাত জমানো, হাত খেলানো, হাতে রাখা, হাতের কাজ, হাতে হাতে, হাতাহাতি, হাতানো৷’

আমরাও কি কম যাই! স্যার ‘আয়’ বললেই, আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করি—অ্যায়! এইবার স্যারের ব্যয় শুরু হবে৷ বেশির ভাগই হাতের ব্যবহার৷ ডাস্টার, বেত টেবিলে থাকে বটে৷ অনেকে যেমন কাঁটা, চামচে, ছুরি নামিয়ে রেখে হাতেই খান৷ শরীর কোনও কারণে খারাপ থাকলে, স্যার অপরাধীর হাত-পা ব্যবহার করেন৷ বলেন, কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক৷ গুরুতর অপরাধে—কান ধরে ক্লাসের বাইরে নিলডাউন৷ ক্লাসের বাইরে খোলা রকে একটা বেদি করা আছে৷ সেই বেদির ওপর নিলডাউন৷ যাতে সবাই দেখতে পান৷ আরও গুরুতর অপরাধে ‘গাধার টুপি’৷ গাধার টুপি পরার যোগ্যতা সকলের থাকে না৷ আমাদের ক্লাসের আশুই একবার সেই যোগ্যতা অর্জন করেছিল৷ ক্লাসের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সরস্বতী পুজোর বিসর্জনের নাচ প্র্যাকটিস করছিল৷ আসছে বছর আবার হবে৷ আমরা খুব তোল্লাই দিচ্ছি৷ আর ঠিক সেই সময় হেডস্যারের সঙ্গে ক্লাসে ঢুকলেন স্কুল পরিদর্শক৷ আশু তখনও নাচছে৷

পরিদর্শক রেগে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে যা বললেন, আমরা সবাই শুনতে পেলুম—‘এই সব স্কুল আমাদের দেশের কলঙ্ক—ছি ছি ছিঃ’৷ আশু তখন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে৷ তখনও নাচছে আর বলছে ‘সরস্বতী মায়ী কী জয়! আসছে বছর আবার হবে৷’

এর পর যা হল—সে আর বলার কথা নয়৷ আশু কিন্তু ভালো ছেলে, ফার্স্ট ডিভিশন পাবেই পাবে৷ পরে জানা গেল, আগের দিন ধোঁকার তরকারি আর কুড়ি-বাইশখানা লুচি খেয়ে পেট গরম হয়ে গিয়েছিল৷ আমাদের স্কুলের হত্তা-কত্তা-বিধাতা—শ্যামলাল বিহারী৷ খাঁকি পোশাক৷ ইয়া বিরাট গোঁফ৷ বেশি লম্বা নয়, তবে বেশ চওড়া৷ হেডস্যারের কাছে খুব মিউমিউ, আমাদের সামনে বহুত হম্বিতম্বি৷ যেন সে-ই হেডমাস্টার৷ তার কাছেই থাকে সব শাস্তির যন্ত্রপাতি৷ নানা সাইজের বেত, গাধার টুপি, গালে মাখাবার চুন-কালি, খাবলা খাবলা করে চুল কপচে দেওয়ার কাঁচি৷ আর অন্য জিনিস তো থাকেই—চক, ডাস্টার, যাবতীয় স্টোর—যেমন কাচের গেলাস, কাপ-ডিশ, সাবান, ঝাড়ন, আয়োডিন, বেনজিন, ব্যান্ডেজ৷ কিছু এমার্জেনসি ওষুধ৷ স্কুল ছুটির পর মানুষটা অন্যরকম৷ নিজে রান্নাবান্না করে৷ বাটনা বাটে৷ কুটনো কোটে৷ বাসন মাজে, নিজের ঘর পরিষ্কার করে৷ আর সব সময় রামনাম করে৷ আমরা ‘লালদা’ বলেই ডাকি কারণ হেডস্যার, অন্য স্যারেরা ‘লাল’ বলে ডাকেন৷

এই লালদার কাঠের সিন্দুকে একটা বিশ্রী অপমানকর জিনিস থাকে—গাধার টুপি৷ চরম শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হলে এই টুপি বেরোবে৷ আর বেরোবে চুন-কালি৷ হেডস্যারের আদেশে আশুর মাথায় গাধার টুপি চড়ানো হল৷ একগালে চুন আর এক গালে কালি৷ আশুকে ক্লাসে ক্লাসে ঘোরানো হল৷ আশু সেদিন আরও একটা কাণ্ড করেছিল৷ সব হয়ে যাওয়ার পর হেডস্যারকে প্রণাম করে বলেছিল, ‘আপনি আমাকে শাস্তি দিয়ে খুব ভালোই করলেন স্যার৷ আমি এই স্কুলেই থাকব আর আপনি দেখবেন, ওই স্কুল ইনস্পেকটরই আমার গলায় পরিয়ে দিচ্ছেন—ভবতারিণী স্মৃতি স্বর্ণপদক৷

ক্লাস টেনের ফার্স্টবয়কে ওই পদক দেওয়া হয়৷ সকলেই শুনল৷ কেউ কেউ মুখ বাঁকাল৷ হেডস্যারের রাগ তখন একটু কমেছে৷ তিনি কিছু বললেন না৷ আশুর বাবার সঙ্গে হেডস্যারের কিছু একটা আত্মীয়তা আছে৷ মন সেই কারণেই খারাপ৷ কিন্তু কী করবেন! অপরাধীকে তো শাস্তি দিতেই হবে৷ এই রকমই তো বলে—‘নো মারসি, নো মারসি৷’ এই কথাটা আমাদের বাড়িতে কতবার যে শুনি!

ক্লাস টেনে আশু ফার্স্ট হবে৷ তা হলে আমাদের নিরঞ্জনের কী হবে! সে তো ফার্স্ট হওয়ার জন্যেই জন্মেছে৷ সেই ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু হয়েছে৷ একঘেয়ে ফার্স্ট হয়েই যাচ্ছে, হয়েই যাচ্ছে৷ ভালোও লাগে! এক নম্বর জায়গাটা চিরকালের জন্যে দখল করে বসে আছে৷ স্বার্থপর! ওদের বাড়ির বেড়ালটা পর্যন্ত স্বার্থপর৷ নিরঞ্জনের ঠাকুরদার বাবা ‘রায়বাহাদুর’ খেতাব পেয়েছিলেন৷ সেইটাই হল কাল৷ নুনের দালালি করতেন ইংরেজ আমলে৷ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা৷ যেখানে পারছেন সেইখানেই একটা করে জমিদারি কিনছেন৷ এখানে বাগান, ওখানে বাগান৷ সাহেবদের পোয়া বারো৷ এসে থাকছে৷ ফ্যাট ফ্যাট করে বন্দুক ছুড়ছে৷ তালের বড়া, মালপো খেয়ে বাথরুমেই বসে থাকছে৷ তারপর যা হয়—মামলা, মকদ্দমা৷ ফাটাফাটি, লাঠালাঠি৷ তবু অহংকার কি সহজে যায়!

নিরঞ্জন ক্লাসে আসে৷ ফার্স্ট বেঞ্চে বসে৷ আমাদের কারও সঙ্গে কথা বলে না৷ আমরা ‘মিডিয়কার’৷ নিরঞ্জন অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো পাবেই পাবে৷ অঙ্কটা দেখার আগেই উত্তরটা দেখতে পায়৷ আমরা কোনওরকমে ষাট পেলে, মা সিদ্ধেশ্বরী কালীতলায় গিয়ে মাকে প্যাঁড়া খাইয়ে আসেন৷

নিরঞ্জন কোনও সময় বাড়ি থেকে বেরোয় না৷ খেলার মাঠে আসে না৷ স্কুল আর বাড়ি, বাড়ি আর স্কুল৷ ওর বোনটার কী অহংকার! বলে, আমরা না-কি সব লোফার! ওদের মা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলেন৷ কবে ওর বাপের বাড়ির বংশ কোথাকার যেন জমিদার ছিলেন৷ ঠাকুমার একশো ভরি সোনার মোটা মোটা গয়না ছিল৷ রঘু ডাকাত ডাকাতি করতে এসেছিল৷ বাড়ির মন্দিরের জাগ্রত মা কালী খাঁড়া ঘুরিয়ে ডাকাত তাড়িয়েছিলেন৷ একটাকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন গাব গাছের ডালে৷ এ সব আমরা মাধুদির কাছে শুনেছি৷ মাধুদির ওই বাড়িতে যাওয়া-আসা আছে৷ মাধুদি সব বাড়িতেই ঘুরে ঘুরে বেড়ান৷ খবরের কাগজের মতো৷

স্কুল ছুটির পর আশু আর আমাদের সঙ্গে গঙ্গার ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখে না৷

আমি আর শংকর তার খুব বন্ধু৷ আমরাই বাড়ি ফেরার পথে একবার উঁকি মেরে যাই৷ আশুর একটা কোণের ঘর আছে৷ একটেরে৷ বাড়ির কোনও শব্দ সেখানে ঢোকে না৷ আশুর ঠাকুরদা বিরাট পণ্ডিত ছিলেন৷ ওই ঘরে বসে দিন-রাত লেখাপড়া করতেন৷ ঘরে একটাও জানলা নেই৷ অনেক উঁচুতে ভেন্টিলেটর৷ আশুর সামনের দেওয়ালে একটা বড় আয়না৷ মাঝে মাঝে সে আয়নাটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ তখন তার ঠোঁট দুটো নড়তে থাকে৷ মনে মনে কিছু বলে কারও কাছে৷ আয়নার মাথার ওপর স্বামী বিবেকানন্দের একটা বড় ছবি৷ আমরা ভাবি, আশু না পাগল হয়ে যায়! আমাদের দুজনের ভীষণ চিন্তা—আশু সেদিনের সেই অপমানের বদলা নিতে পারবে তো!

আমরা রোজ জিগ্যেস করি—‘আশু পারবি তো!’ আর কয়েক মাস পরেই ক্লাস নাইন থেকে ক্লাস টেনে ওঠবার ফাইনাল পরীক্ষা৷ নিরঞ্জন তার কয়েকজন চামচাকে বলেছে—‘আশু ফার্স্ট হবে? পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়?’

পাগল বোধহয় আমি আর শঙ্কর৷ একটা সোমবার ছুটি ছিল৷ আমরা দুজনে কারোকে কিছু না বলে তারকেশ্বরে গিয়ে বাবার মাথায় জল ঢেলে এলুম৷

গর্ভমন্দিরে শংকর আমাকে বলছিল—‘তুই জানিস না, বাবার কাছে যে যা চায়, তাই পায়৷’

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন খুব সুন্দর চেহারার এক সাধু৷ তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘কী চাইছ তোমরা?’

‘আশু যেন ফার্স্ট হয়৷’

‘কে আশু?’

‘আমাদের বন্ধু৷’

‘কোন ক্লাস?’

‘নাইন৷’

‘তোমরা আমাকে অবাক করলে৷ আমি এইটুকু বলতে পারি—এমন যার বন্ধু, তার ভাগ্য ভীষণ ভালো৷ কাছেই আমার আশ্রম৷ চলো৷ তোমাদের তিনজনের জন্যে একটা জিনিস দেব৷ কাছে রাখবে৷ আর প্রসাদ খেয়ে বাড়ি যাবে৷ কতখানি বেলা হল বলো তো?’

একটা গলি, তারপর আর একটা গলি, বিরাট পুকুরের ধারে ছবির মতো সুন্দর একটা আশ্রম৷ আমার বন্ধু শংকর একটা ডাকাবুকো ছেলে৷ জল দেখলে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না৷ বললে, ‘সাধুবাবা! আমি কি জলে যেতে পারি?’

‘সাঁতার জানো?’

‘বাড়ির পাশে গঙ্গা, তিনবার সাঁতরে পার হয়েছি৷’

‘তুমি আমাদের আশ্রমে থাকবে?’

‘এক্ষুনি৷ আজ বললে আজ৷’

‘লেখাপড়ার ভয়ে?’

‘না, সাধুবাবা, আমি খারাপ ছেলে নই৷ আমি ডাক্তারও হতে পারি, সাধুও হতে পারি৷’

‘সাধু-ডাক্তার, বা ডাক্তার-সাধু হলে কেমন হয়? তাহলে আমি একজন সঙ্গী পাই৷’

‘সাধুবাবা! আপনি ডাক্তার?’

‘হ্যাঁ রে! একটা কোনও বিদ্যে জানা না থাকলে মানুষের সেবা করব কী করে? এলুম, খেলুম, হালুম-হুলুম চলে গেলুম৷ কোনও মানে হয়?’

‘সাধুবাবা! আমিও রোজ এই কথাটাই ভাবি৷’

‘তোমার নাম কী?’

‘শংকর৷’

‘আর তোমার বন্ধুর?’

‘শেখর৷ ও কবি হবে৷ কাঁধে ঝোলা নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াবে৷ মানুষের জীবন দেখবে৷ জানেন তো ও কথায় কথায় কেঁদে ফেলে৷’

‘কেন?’

‘ভাবুক৷ সব সময় ভাবে৷ ভাবে আর কাঁদে, কাঁদে আর ভাবে৷’

‘কাঁদে কেন?’

‘ওকেই জিগ্যেস করুন৷’

সাধুবাবা জিগ্যেস করলেন, ‘কী দুঃখে কাঁদো তুমি শেখর?’

‘কত মানুষের কত কষ্ট৷ বৃদ্ধ মানুষ৷ শরীরে শক্তি নেই৷ পিঠে বিরাট চালের বস্তা৷ সামনে ঝুঁকে রেশনের দোকানে ঢুকছে৷ ভিখারি মা, কোলে একটা রোগা বাচ্চা, মোটাবাবু বারান্দায় বসে কলা খাচ্ছে৷ দোকানদার ক্যাশবাক্স থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বের করে গুনছে৷ ছেঁড়া সোয়েটার পরা কর্মচারী দশটা টাকা চেয়েছিল, মেয়ের অসুখ৷ পায়নি৷ পাশের বাড়ির বৃদ্ধাকে তার বাড়ির লোক খেতে দেয় না আবার বলে—মরে না কেন? শোভনদার প্যারালিসিস, বাড়িসুদ্ধ সবাই বেড়াতে চলে গেল রাজস্থানে৷’

‘শোনো শেখর, তুমি মানুষ হয়ে জন্মেছ কিন্তু তোমার ভেতর দেবতা হওয়ার গুণ রয়েছে৷ চোখে জল না থাকলে জীবনে জীবন আসে না শেখর৷’

সাধুবাবা লম্বা লম্বা তিনটে রবারের টুকরো আমাদের হাতে দিলেন৷ দুধের মতো সাদা৷ বললেন, ‘একে বলে ডিস ইনফেকটেড রাবার বাইট৷ তিন জনের তিনটে৷ রোজ সকালে সামনের দাঁত দিয়ে কামড়াবে৷ বেশ কয়েবার৷ বাইট ইট হার্ড৷ ফল কী হবে? আমাদের মাথার যে জায়গাটা খুলে গেলে সব জানা যায়, সেই মেধার জায়গাটা খুলে যাবে৷ এ ছাড়া আর একটা কাজ করবে—বুকের মাঝখানে পরপর তিনবার ঘুসি মারবে, আর মনে মনে নিজের নাম বলবে—শংকর শংকর শংকর৷ এতে তুমি দৃঢ় হবে, নিজের ওপর আস্থা বাড়বে৷ কীসের ভয়, কার ভয়? পৃথিবীতে এমন কোনও কাজ নেই যা আমি পারি না! ভয়ই যত দুর্বলতার কারণ৷ তোমাদের যা দিলুম, যা বললুম, তা আর কারওকে বলবে না৷ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে চুপিচুপি করে যাও৷ বাড়ির লোককেও বলবে না৷’

আমরা প্রসাদ পেলুম৷ চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলুম৷ একটা জায়গায় পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি হচ্ছে৷ যে-সব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে তাদের দেওয়া হয়৷ আমরা বিদায় নিয়ে চলে আসছি, সাধুবাবা বললেন, ‘আবার এসো৷’

আমরা বললুম, ‘আমাদের যেতে ইচ্ছে করছে না৷’

‘লেখাপড়াটা তো করতে হবে৷ নিজেদের মান বাড়াতে হবে জ্ঞান অর্জন করে৷’

‘সে তো অনেক বছরের ব্যাপার৷’

সাধুবাবা বললেন, ‘চলো, স্টেশনের পথে তোমাদের একটা জায়গা দেখাই৷’

পোড়ো একটা জমিদারবাড়ি৷ অনেকটা জায়গা৷ বিশাল একটা পুকুর৷ ঘাট রয়েছে, তবে ভেঙেচুরে গেছে৷ ভাঙা বাড়িটা মাঝেমধ্যে ডাকাতদের দখলে চলে যায়৷ পুকুরটা মানুষ ব্যবহার করে৷ জল খুব মিষ্টি৷ সাধুবাবা বললেন, ‘এই পুরোটাই আমরা নেওয়ার চেষ্টা করছি৷ যদি পেয়ে যাই, এখানে আর্ন্তজাতিক মানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় হবে৷ নতুন নতুন বিষয় পড়ানো হবে৷ বিদেশি অধ্যাপকরা আসবেন৷ যদি করে উঠতে পারি—তোমরা তিনজন এখানে পড়বে৷ এখানেই থাকবে৷ আর এখানেই তোমরা অধ্যাপনা করবে৷’

ট্রেন ছুটছে হাওড়ার দিকে৷ সন্ধের আকাশটা খুব সুন্দর আজ৷ কোথাও এতটুকু মেঘ নেই৷ আমাদের গ্রামের চাঁপাদির উঠোনের মতো৷ তকতকে ঝকঝকে৷ নয়নতারার বর্ডার দেওয়া৷ সন্ধের আগেই নানা রঙের ফুল হইহই করে ফুটে ওঠে৷ দাওয়ায় ঝুলছে ময়নার খাঁচা৷ সেটায় চাপা পড়ে৷ যেখানেই থাকি রোজ এই সময়টায় চাঁপাদির কথা খুব মনে আসে৷ আমি রোজ অন্তত একবার যাবই৷ চাঁপাদি শান্তিনিকেতনের আর্টিস্ট৷ ধর্মীয় ছবি আঁকে৷ মহাপ্রভুর জীবনলীলা৷ সেসব ছবি হাঁ-করে তাকিয়ে দেখার মতো৷ পনেরো দিনের জন্যে এক শিল্পীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল৷ সেই শিল্পী প্যারিসে গিয়ে হারিয়ে গেছেন৷ নানা গুজব৷ চাঁপাদি বলে—‘ছাড় তো ওসব৷ আমি তোকে পেয়েছি, আর কিছু চাই না আমি৷’ চাঁপাদি এই সময় আয়নার সামনে বসে সুন্দর কপালে সুন্দর একটা টিপ পরবে৷ এতখানি একটা খোঁপা করবে৷ পাতলা শাড়ি পরে৷ খুব শৌখিন৷ আর্টিস্ট যে৷ সবকিছু সুন্দর৷ যে-ঘরে বসে ছবি আঁকে, সেই ঘরটাকে বলে স্টুডিয়ো৷ কত রং, তুলি, ক্যানভাস ইজেল৷ আমাকে ছবি আঁকা শেখাবে৷ তারপর বিদেশে পাঠাবে৷ আমার ছবির এগজিবিশন হবে৷ আমাকে বলে, ‘তুই আমার স্বপ্ন৷’

শংকর বললে, ‘কী ভাবছিস? আজকে আমাদের দিনটা খুব ভালো গেল৷ কী বল? রোজ তো আর এমন দিন আসবে না৷ আজ আমরা কত কী পেলুম!’

‘জানিস তো, এই জন্যেই ভালো ভালো মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়৷ ঘরে বসে থাকলে হয় না৷ আবার আমরা আসব৷ মাসে একবার৷’

‘ভাবছি সন্ন্যাসী হব৷’

‘আগে লেখাপড়াটা শেষ কর৷ অশিক্ষিত সন্ন্যাসী এযুগে চলে না৷’

স্টেশনে নেমেই বাড়ির দিকে ছুটল শংকর৷ বাড়িতে শিব মন্দির৷ রাতের পুজো ওকেই করতে হবে৷ ও পুজো করতে খুব ভালোবাসে৷ পুজো করা শিখেছে৷

ভালোই হয়েছে, আমি এখন চাঁপাদির কাছে যাব৷ উঃ! কতক্ষণ দেখিনি৷ কোঁকড়া কোঁকড়া চুল৷ ফরসা কপাল৷ চকচকে মুখ৷ চোখ দুটোয় কতরকমের ভাব-ভাষা৷ দাঁতগুলো যেন সাজানো মুক্ত৷ আমি হাঁ-করে তাকিয়ে থাকি৷ ভয় করে, কবে বলতে কবে কার কাছে চলে যাবে! ক্লাস নাইনে পড়ি৷ সব বুঝি আমি৷ কত ভালো ভালো বড়লোক ছেলে আছে৷ হাতের আঙুলে চাবির রিং ঘোরায়৷ চওড়া কবজিতে সোনার ঘড়ি৷ বাবা! তাদের কথাবার্তাই অন্যরকম৷ ইওরোপ, আমেরিকা৷ তবে চাঁপাদি তার মনের কথা আমাকে খুব বলে—‘আমি ওই সব বিয়েটিয়ের মতো বাজে ব্যাপারে নেই৷ আমি আর্টিস্ট৷ ভালো ভালো ছবি আঁকব৷ তুই সব সময় আমার সঙ্গে থাকবি৷ তুই লিখবি৷ গল্প, উপন্যাস৷ বেশ কিছু টাকা হাতে এলে আমরা কুলু-মানালিতে গিয়ে একটা স্টুডিয়ো করব৷ শুধু হিমালয়ের ছবি আঁকব, মহাদেবের ছবি, প্রকৃতির ছবি৷’ চাঁপাদির কত কল্পনা! কোথা থেকে কোথায় চলে যায়! একদিন বললে, ‘চল, বেড়িয়ে আসি৷’ চলে গেলুম মরুভূমিতে৷ চাঁপাদির বর্ণনায় মনে হতে লাগল, সত্য সত্যই মরুভূমিতে আছি৷ কখনও কালাহারি, কখনও সাহারা, কখনও জয়সলমির৷

চাঁপাদি শুয়ে আছে৷ এই সময় কোনওদিন শুয়ে থাকতে দেখিনি৷ মুখটা কেমন যেন থমথমে৷ ‘তুমি অসময়ে শুয়ে আছ?’

হাতের ইশারায় কাছে ডাকল, ‘সারাদিন কোথায় থাকিস? আমি মরে যাচ্ছি৷’

‘মরে যাচ্ছি মানে?’

‘দেখবি কী হয়েছে? আঁতকে উঠবি৷’

চাঁপাদি তলপেটের কাপড়টা সরিয়ে দিল৷ ফরসা ধবধবে পেটের মাঝখানটা জবা ফুলের মতো টকটকে লাল৷ ফুলেও উঠেছে৷ ‘এ কী গো? কী করে হল?’

‘এত বড় একটা লাল কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিয়েছে৷’

‘যন্ত্রণা হচ্ছে?’

‘হবে না! পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলছে৷ জ্বর এসে গেছে৷ কেবল ভাবছি, তুই কখন আসবি৷’

‘কিছু খেয়েছ, কিছু লাগিয়েছ৷’

‘কী আছে আমার কাছে, কিছুই নেই৷ তুই এখন যা পারিস কর৷’

‘তুমি শুয়ে থাকো, আমি গুপ্তাজির কাছ থেকে আসছি৷’

‘শরীরের এই জায়গাটা আমি কোনও পুরুষকে দেখাতে পারব না৷’

‘দাঁড়াও, গুপ্তাজির কাছে যাওয়ার আগে একটি জিনিস দেখি, হুলটা ফুটে আছি কি না! হুলটা অনেক সময় লেগে থাকে৷’

‘কী করে বুঝবি?’

‘ও আমি পারি৷ আলতো ভাবে আঙুল বোলাতে হবে৷’

‘তুই সবার আগে সদর দরজাটা বন্ধ করে আয়, জানলাগুলো বন্ধ করে দে৷’

সব বন্ধ৷ বাইরের শব্দ শোনাই যাচ্ছে না৷ শিব মন্দিরে ছাড়া ছাড়া ঘণ্টাধ্বনি৷ আমার অনুমানই ঠিক৷ হুলটা রয়ে গেছে৷ নখ দিয়ে ধরে টেনে তুললুম৷ ওইটুকু প্রাণীকে ভগবান কী সাংঘাতিক অস্ত্র দিয়ে রেখেছেন! আমাকে একবার বোলতা কামড়েছিল, এখনও মনে আছে৷ এখনও সেই দাগটা আছে৷

‘তোমার এই কাঠপিঁপড়ের বংশ আমি ধ্বংস করব বিষ দিয়ে৷’

‘না রে, ওটা করিস না৷ ওদের ভারি সুন্দর দেখতে৷ ভয়ংকর সুন্দর৷ সালভাদের দালি পিঁপড়ের ছবি আঁকতেন৷’

গুপ্তাজির দাওয়াখানায় গুপ্তাজি বসে আছেন৷ ভারী চেহারা৷ পাকা চুল, গোঁফ৷ মানুষটাকে আমার খুব ভালো লাগে৷ চোখে সোনার ফ্রেমের গোল গুলগুলি চশমা৷ এক মাথা মোটা মোটা খড়খড়ে চুল৷ খদ্দরের পাজামা, কুর্তা৷ সব সময় যেন স্বপ্ন দেখছেন৷ শান্তির জীবন৷ একটি মেয়ে৷ তার নামও শান্তি৷ বাবার পাশে থেকে কাজে সাহায্য করে৷ সব সময় আনন্দে থাকে৷ মাঝে মাঝে ভেতরের ঘরে গিয়ে এক রাউন্ড নেচে এল৷ সাদা ধবধবে একটা বেড়াল আছে৷ বড় বড় লোম৷ সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে৷

গুপ্তাজি বললেন, ‘শান্তি! তুই একবার গিয়ে আর্টিস্টকে দেখে আয় তো৷’

শান্তি যেতে যেতে বললে, ‘আমাকে কতবার কামড়েছে! যখনই সময় পায় তখনই কামড়ায়৷’ এই কথা বলেই শান্তি দৌড়োতে শুরু করল৷ চটির চটরপটর শব্দ৷ ‘দৌড়োচ্ছ কেন?’ কোনও উত্তর নেই৷ অনেকটা দূরে চলে গেছে৷ শান্তি সকালের স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে৷ মাথায় একটু ছিট আছে৷ সেই জন্যেই ভালো লাগে৷ জন্মাষ্টমীর দিন মাথায় সাতটা কলসি ব্যালেন্স করে রাধাগোবিন্দের মন্দিরের দিকে হেঁটে গিয়েছিল৷ গুপ্তাজির চেম্বারের পিছন দিকের একটা ঘরে পশু হাসপাতাল করেছে৷ সেদিন একটা কুকুর গাড়ি চাপা পড়েছিল৷ ঠ্যাংভাঙা সেই কুকুরটা এখন ওই হাসপাতালে আছে৷

অনেকটা দূরে একটা রকে শান্তি বসে আছে৷

‘কী হল?’

‘এই দেখ!’

চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেছে৷

‘কী হবে এখন?’

‘কী জানি কী হবে? এই রকের ওপর সাজিয়ে রাখি—পাদুকা৷’

‘তারপর?’

‘তারপর?’ ওয়ান, টু, থ্রি’—খালি পায়ে দৌড়৷

আমি আজই গুপ্তাজিকে বলব, মেয়েকে পাগলা গারদে পাঠান৷

কী করব? শান্তিটাকে ভীষণ ভালো লাগে৷ ওই আমাকে সাঁতার শিখিয়েছে, সাইকেল চড়া শিখিয়েছে৷ সরু পাঁচিলের ওপর দিয়ে ব্যালেন্স রেখে হাঁটা শিখিয়েছে৷ একবার ওর প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল৷ আমাকে দিয়ে পা টিপিয়েছে৷ মারামারি করেছে৷ পকেট থেকে চকোলেট বের করে খেয়েছে৷ কি না করেছে শান্তি৷ আরও কত কী করবে!

চাঁপাদির ঘরে ঢুকে হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে৷ হাঁপাতে হাঁপাতে বললে—‘শিল্পীদি কে যেন তোমাকে কামড়েছে৷ বাবা পাঠালে৷ বললে, শিল্পীকে দেখে এসে শিগগির আমাকে বল৷’

চাঁপাদির বালিশের পাশে বসে কপালে হাত রেখে বললে, ‘বাপ্রে! জ্বর এসে গেছে৷’

ক্ষুদে ডাক্তারের রুগি পরীক্ষা৷ ‘নরম জায়গা পেয়েছে আচ্ছাসে কামড়েছে৷ অসভ্য!’

আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘এই ছোকরা! চল আমার সঙ্গে৷’

চাঁপাদি বললে, ‘শান্তি! মরে যাব রে?’

‘মরা অতই সহজ! আমাকে কী কী কামড়েছে শোনো—এক—সাপ, দুই—কুকুর, তিন—কাঁকড়াবিছে, চার—বেড়াল, পাঁচ—বোলতা, ভিমরুল, ছয়—ইঁদুর, সাত—মৌমাছি৷ যত কামড়াচ্ছে, তত শক্তি বাড়ছে৷’

‘আজ রাতে তুই আমার কাছে থাকবি শান্তি?’

‘কেন, ভয় করছে? তোমার এই দিকটা খুব ফাঁকা৷ থাকতে পারি, যদি ওই পাঠানটা থাকে!’

‘ও আবার পাঠান হল কবে?’

‘বাব্বা! জানো না বুঝি? মাথায় পাগড়ি, হাতে লাঠি, অমাবস্যার রাতে শিব মন্দিরের পেছন দিকে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বসে আছে৷ প্রথমে চিনতে পারিনি৷ ভেবেছি কাশী থেকে কোনও বাবা এসেছে৷ পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি৷’

চাঁপাদি বললে, ‘তুই কেন গেলি?’

‘আমি একা না কি? মায়ের সঙ্গে গেছি৷ তারপরে শুনছি, সাধু গান গাইছে৷ গান আর গলা দুটোই চেনা৷ পাগড়ি ধরে মার টান৷ আমায় তাড়া করেছে৷ দৌড়, দৌড়৷ আলোয় এসে আমাকে চিনতে পেরেছে৷ বললে, খুব শিগগিরি আমি সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাব৷ আমি বললুম, ফাইনাল পরীক্ষার আগে ওইরকম ইচ্ছে হয়৷’

রাতে চাঁপাদির কাছে আমরা থাকব৷ শান্তি ভালো রাঁধে৷ বাড়ি থেকে ভালো চাল, ডাল আর ঘি আনবে৷ খিচুড়ি হবে৷ আবার চলো৷ গুপ্তাজির দাওয়াখানা৷ সব শুনলেন৷ খাওয়ার ওষুধ, লাগাবার ওষুধ৷ এর পরে একটা জিনিস দিলেন—অদ্ভুত একটা টুপি৷ সারা রাত মাথায় পরিয়ে রাখতে হবে৷ সব বিষ চুল টেনে নেবে৷ তারপর চান করলে বেরিয়ে যাবে৷

ফিরে আসার সময় শান্তি জুতোর কথা ভুলে গিয়েছিল৷ আমি তুলে নিয়েছিলুম৷ কাল সকালে সারাই করতে হবে৷ চটি-ফটি ওই পায়ে পায়ে পরা কেন! পা তো নয় দুরমুশ৷ ওদের বাড়ির পেছনেই আমাদের ফুটবল খেলার মাঠ৷ হঠাৎ খেয়াল হল—চলে এল৷ খেলবে৷ খেলতে না দিলে এমন উৎপাত করবে, আমাদের খেলা শেষ! কিন্তু সেন্টার ফরোয়ার্ডে ভালোই খেলে৷ তা খেলবে না কেন? ওর পা থেকে বল কেড়ে নিতে গেলে সবাই ভাবে—ওর যে লাগবে! ধাক্কাধাক্কিও করা চলে না৷ সবাই জানে, একটা ছেলে আর একটা মেয়েতে কত তফাত৷ গোলের কাছে বল নিয়ে গেলে বিশু হাঁ-করে ওকেই দেখে৷ হয়ে গেল—গোওওল৷ সাধে বলে, যেখানে মেয়ে সেইখানেই যত গোলমাল৷

ঢাঁই—মাথায় চাঁটি—‘চল, ওঠ, গাধা!’

‘আমাকে গাধা বলবি না শান্তি৷’

‘আর কেউ বললে মেরে দাঁত ফেলে দেব৷ তুই একমাত্র আমার গাধা৷ তুই আর আমি যিশুখ্রিস্টের দেশে যাব৷ সেই ক্রুশটা দেখে আসব৷ তুই আর আমি৷ আমরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করব৷ আমার নাম হবে জুলিয়া, তোর নাম হবে রবার্ট৷ আমরা গির্জায় গিয়ে বিয়ে করব৷ বিয়ের গাউন৷ পাতলা, আলোর মতো, পেছনে অনেকটা ঢেউয়ের মতো আসছে৷ গির্জার ঘণ্টা৷ প্রিস্ট আমাদের গায়ে পবিত্র জল ছিটিয়ে দিচ্ছেন৷ আংটি বদল৷ তারপর রবার্টের ঠোঁট জুলিয়ার ঠোঁটে৷ আমরা একটা সুন্দর কাঠের ঘরে থাকব৷ জানলায় নেটের পরদা, ফুলদানিতে ফুল৷ গির্জার ঘণ্টার শব্দে ঘুম ভাঙবে৷ আমি পিয়ানো বাজাব, তুই গান গাইবি—গ্রেগোরিয়ান চ্যান্ট৷’

‘টাকা!’

‘সমুদ্রের ধারে আমরা একটা ‘পেট শপ’ করব৷ নানারকমের বেড়াল, লোমওয়ালা ছোট কুকুর, কাকাতুয়া বিক্রি হবে৷ একটা ক্লিনিক থাকবে৷ বেশি টাকার দরকার নেই৷ খাদ্য হবে—ব্রেড, বাটার, মিল্ক, হানি, ফ্রুটস৷ সারা রাত ঢেউয়ের শব্দ৷ নীল ঘুম৷ স্বপ্নে স্লেজ গাড়িতে চেপে সান্টাক্লজ আসবে৷ সাদা আলো৷’

‘বিয়ে করলে সান্টাক্লজ বোধহয় আসে না!’

‘কেন, কেন?’

‘বিয়ে করা তো পাপ!’

‘কোন বাঁদর বলেছে?’

‘চুমু খেলে নরকে গমন৷’

এখন আমি তোকে গুণেগুণে বত্রিশটা চুমু খাব৷ দেখি আমার কী পাপ হয়?

এদিকে এখন কেউ নেই৷’

‘শান্তি, আমার প্রচণ্ড জল তেষ্টা পেয়েছে৷ এদিকে দ্যাখ, রাত বাড়ছে৷’

গুপ্তাজির ভাঁড়ার ঘরের একদিকে যত কবিরাজি গাছ-গাছড়া, শেকড়-বাকড়৷ আর একদিকে চাল, ডাল, আটা, সুজি, ঘি, গুড়, আলু, কুমড়ো, লাউ৷ পাশের শিব-মন্দিরে ঢাঁই ঢাঁই করে আরতি শুরু হল৷ ডমরু বাজছে৷ এই শব্দ শুনলেই শান্তি শান্ত৷ সব দুষ্টুমি ঠান্ডা৷ একেবারে অন্যরকম৷ চাল বের করে ব্যাগে ভরছে৷ চওড়া পিঠে চওড়া বিনুনি এপাশ-ওপাশ করছে৷ মেয়েদের কথা ভাবলে রেজাল্ট খারাপ হয়, তাই আমি তারকেশ্বরের সাধুর কথাই ভাবছি৷ সন্ন্যাসী তো হবই কিন্তু শান্তিকে তো ভুলতে পারব না!

‘আমি সন্ন্যাসী, হব৷’

‘তোকে জুতো পেটা করব৷’—বলেই মেঝে থেকে লাফিয়ে উঠল৷

‘আমার চটি? রকের ওপর আমার চটি? ওরে! ওর বয়েস মাত্র দু’মাস!’

‘কুকুর৷’

‘কী কুকুর?’

‘রাস্তার কুকুরে এতক্ষণে শেষ করে দিয়েছে৷’

‘যাঃ’—শান্তি বসে পড়ল৷

‘যার জুতো তার খেয়াল নেই৷ মহারাণি! আপনার জুতো আসার সময় তুলে নিয়ে কেবলরামের দোকানে দিয়ে এসেছি৷ এতক্ষণে হয়ে গেছে৷ যাওয়ার সময় পাওয়া যাবে৷’

এই হল শান্তি৷ চোখে জল৷ ‘তুই আমাকে এত ভালোবাসিস! তবে তুই কেন সন্ন্যাসী হবি? তুই এলি খালি পায়ে, আমি এলুম তোর চটি পায়ে৷ আমি তোকে ছেড়ে থাকতে পারব না৷ জলে ডুবে আত্মহত্যা করব৷’ শিব মন্দিরে শিঙ্গা বাজছে৷ অদ্ভুত আওয়াজ৷ শান্তির কাঁধে হাত রাখলুম—‘শান্তি!’

আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল৷ মনে হচ্ছে, আমি খুব বড় হয়ে গেছি৷ ঠিক কত বছর বয়েসে মানুষ বড় হয়!

‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ সিনেমায় একটা গান আছে৷ সুন্দরী নায়িকা নাচতে নাচতে গাইছে—‘আই অ্যাম সিক্সটিন গোয়িং টু বি সেভেনটিন’৷

দুই

নিরঞ্জন তার চামচাদের বলেছে, ‘আশু ফার্স্ট হলে সূর্য আর পূর্ব দিকে উঠবে না—পশ্চিমে উঠবে৷ আশুর ক’জন মাস্টার! এক মাত্র বাংলায় দু-চার নম্বর বেশি পেতে পারে৷ বাংলা আবার একটা সাবজেক্ট! আমার সঙ্গে অঙ্কে পারবে? একশোয় একশো!’

‘কী রে আশু! খুব আওয়াজ দিচ্ছে৷ পারবি তো!’

‘আর কোনও সন্দেহ নেই৷ কাল তিনি এসেছিলেন৷’

‘কে এসেছিলেন?’

‘তারকেশ্বরের সাধু৷’

একটু গুম মেরে গেলুম৷ সাধুবাবা আশুর কাছে এলেন, আমাদের একবার ডেকে পাঠালেন না৷ যাকে চেনেন না, সে-ই হল এত আপনজন! সাধুতে আর সাধারণ মানুষে কোনও তফাত রইল না৷ আশু বললে, ‘শেষ রাতের স্বপ্ন মিথ্যা হয় না৷ সাধুবাবা আমার মাথার মাঝখানে হাতের তালুটা রেখে বললেন—‘এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও!’ কী স্পষ্ট, কী সুন্দর, কী জ্যোতি! এই দ্যাখ৷’

আশু একটা লম্বা সোনালি চুল দেখাল৷

‘কোথায় পেলি?’

‘আমার মাথায়৷’

‘সে কী রে! এ তো সাধুবাবার৷’

‘আমি কি তাঁকে চোখের দেখা দেখেছি! তোরা দেখেছিস৷’

আশুর কাছে আর একটা মিনিটও বসতে ইচ্ছে করল না৷ কেমন না চাইতেই পেয়ে গেল! ঘড়িতে সময় সকাল আটটা৷ আজ সারাদিন নির্জনে থাকব৷ একেবারে একা৷ সাধু মানুষ-সাধারণ মানুষ-সব সমান৷ ওই শান্তি—ওকেই বা বিশ্বাস কী? দেখছি তো, চারপাশে রোজ যা ঘটছে৷ অমন সুন্দর মানুষ ধীরাজদাকে রেখার জন্য আত্মহত্যা করতে হল৷

এই সব আমি ভাবব না, ভাবব না, ভাবব না৷ আমিই আমার লাঠি, আমিই আমার ঘটি৷ আমি ছাড়া আমার কেউ নেই৷ বেরো, বেরো, সব বেরো, সব জঞ্জাল৷ শিব মন্দিরের পেছনে বেলগাছ৷ আরও অনেক বড় বড় গাছ৷ জমিটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে গঙ্গায়৷ জায়গাটা একটু ‘ড্যাম্প’৷ একটা পঞ্চমুণ্ডীর আসন আছে৷ সাপ-খোপের ভয়ে কেউ তেমন আসে না৷ এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দের৷ এইখানেই যেন সব কিছু আছে৷ আমি ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যারিস্টার হতে চাই না৷ আমি ‘আমি’ হতে চাই, হালকা ‘আমি’, পাতলা ‘আমি’, আতরের মতো সাদা ‘আমি’, আমার প্রিয় ‘আমি’৷

অবাকের চেয়েও অবাক কাণ্ড! শান্তির কাঁধে হাত রেখে তারকেশ্বরের সাধুবাবা মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন৷ আচ্ছা! তাহলে শান্তিও আপনার খুব কাছের! হবেই তো—ওরা কত ভালো! ওদের বাবারা বড়লোক৷ আমাদের নোনা-ধরা পুরোনো বাড়ি৷ আমার বাবার সামান্য চাকরি৷ আমার মাকে বাসন মাজতে হয়, কাপড় কাচতে হয়৷ আমাদের খাবার ডাল-ভাত-একটা তরকারি৷ বড় বড় কথা বলি না৷ স্পেশ্যাল ট্রেনে তীর্থ ভ্রমণে যাই না৷

কানে এল শান্তির গলা ‘মহারাজ, মহারাজ! পালাচ্ছে, পালাচ্ছে৷ ছুঁচোটা পালাচ্ছে৷’

তিন লাফে শান্তি এসে আমার হাতটা শক্ত করে ধরল৷ সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে মহারাজ হাসছেন আর বলছেন, ‘তোর কাছে থেকে কোথায় পালাবে রে! বাঁধা পড়ে গেছে৷ শান্তির কাছ থেকে পালানো যায়! চল তোদের দুটোকে শিবের কাছে দিয়ে আসি৷ শুধু বল শান্তং শিবং সুন্দরম৷’

শান্তি হাত ধরে টানছে আর বলছে, ‘চল ব্যাটা জোচ্চর৷’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%