সন্ধান

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেক-অনেক দিন আগে, আমি যখন খুব ছোট, স্কুলে পড়ি, আমাকে এক ফকির বলেছিলেন, এই শহরের কোথাও একটা ওক গাছ আছে৷ বিশাল বড়৷

ছোট হলেও, এ-কথা জানতুম, ওক বিদেশি গাছ৷ এদেশের মাটিতে জন্মাতে পারে না৷

—এই শহরে ওক গাছ কোথা থেকে আসবে পীর সাহেব? এ তো খুব অসম্ভব কথা৷

আমাদের স্কুলের পাশে একটা দরগা ছিল৷ পীর সাহেব সেইখানেই থাকতেন৷ পরনে কালো জোব্বা৷ ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া চুল৷ অসম্ভব উজ্জ্বল দুটো চোখ৷ আমার সঙ্গে তাঁর খুব ভাব ছিল৷ তিনি গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, আছে-আছে৷ কোথায় কী থাকে কেউ কি বলতে পারে বাবা! আল্লার ইচ্ছায় সব হয়৷

—আচ্ছা, ওক গাছটা না হয় আছে, তাতে আমারই বা কী আপনারই বা কী!

—সেখানে একটা মজা আছে, বহুত মজা৷

—কী মজা! বিশাল একটা গাছ৷ ডাল-পালা-পাতা৷ এর বেশি তো কিছু নয়!

—ওস্তাদ, সে কথাটা আমিও জানি, কিন্তু এ-গাছটায় একটা ব্যাপার আছে৷

—সেইটেই তো জানতে চাইছি৷

পীর সাহেব হাসতে লাগলেন৷ আর তিনি যতই হাসছেন, ততই আমার কৌতূহল বাড়ছে৷

—বলুন না পীরসাহেব! কেন অমন করছেন!

—গাছটা তুমি যদি খুঁজে পাও, তাহলে একটা ঝলমলে দিনে তার তলায় গিয়ে দাঁড়াবে৷ গাছের তলার দিকের গুঁড়িটা খুব ভালো করে দেখবে৷ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখবে৷ দেখতে-দেখতে এক জায়গায় একটা সাদা ফোঁটা দেখবে৷ সেই জায়গায় একটা আঙুল দিয়ে চাপ দেবে৷ প্লাং করে আওয়াজ হবে৷ সঙ্গে-সঙ্গে গোল একটা চাকতি খুলে আসবে৷ একটা ফোকর৷ সাহস করে সেই ফোকরে হাত ঢোকাবে৷ দেখবে একটা সিল্কের দড়ি ঝুলছে৷ দড়িটা ধরে টানবে৷ আর ঝরঝর করে পড়বে মণি, মুক্তো, হীরে৷

পীরসাহেবের যত সব আজগুবি কথা৷ এমন কথা কেউ বিশ্বাস করে! এই শহরে ওকগাছ! সেই গাছের গুঁড়িতে ফোকর! গোল চাকতির মতো স্প্রিং লাগানো ঢাকনা! অসম্ভব! এ হতেই পারে না৷ কিন্তু কথাটা মনে ঢুকে রইল৷ কে বলতে পারে, থাকলেও থাকতে পারে৷ এই পৃথিবীতে কত কী-ই তো থাকে! সমুদ্রের তলায় ডুবে যাওয়া জাহাজের সম্পদ৷ মাটির তলায় পুঁতে রাখা মোহরের ঘড়া৷ হীরের খনিতে হীরে৷ কথাটা একদিন আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু কৃষ্ণেন্দুকে বললুম৷ সে বললে, ‘চল একদিন ইডেনে যাই৷ ওখানে অনেক গাছ৷’

রোদ ঝলসানো দুপুর৷ আমরা দুজনে ইডেনে গেছি৷ অনেক-অনেক গাছ, সবুজ মাঠ৷ দিঘি৷ নৌকা৷ বিশাল একটা গাছ দেখিয়ে কৃষ্ণ বললে, ‘এইটা মনে হচ্ছে ওক গাছ৷’

পাশ দিয়ে এক ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন৷ শুনে ফেলেছেন৷ বললেন, ‘ওক গাছ এদেশে কোথায় পাবে! এটা হল শিশু গাছ৷’

গাছের নাম শিশু, অথচ কী বিশাল৷

কৃষ্ণ বললে, ‘একটা ওক গাছ কোথাও না কোথাও আছে৷’ ভদ্রলোক একটু রেগে গিয়েই বললেন, ‘তাহলে আছে৷ খুঁজে দেখো৷’

আর একটা বেশ বড়সড় গাছের তলায় গিয়ে কৃষ্ণ বললে, ‘এটা ওক না হয়ে যায় না৷ তলাটা ভালো করে দেখো৷

দুজনে গুঁড়ি মেরে দেখতে লাগলুম৷

আঁতিপাতি করে৷ কোথায় কী! একটা গাছ৷ দু-একটা খোঁদল৷ অজস্র কাঠপিঁপড়ে৷ পচা পাতা৷ একটা গিরগিটির বাচ্চা৷ ইডেনে যত বড়-বড় গাছ আছে সব দেখা হয়ে গেল৷ সন্ধের ঝোঁকে হতাশ হয়ে আমরা ফিরে এলুম৷

পীরসাহেবকে বললুম, ‘কোথায় সেই গাছ! বলুন না৷ কেন বলছেন না?’

তিনি রহস্যের হাসি হেসে বললেন, ‘আছে-আছে৷ কোথাও আছে৷ জায়গাটা খুব নির্জন৷ ড্যাম্প৷ স্যাঁতসেতে৷ অনেক দিন সেখানে রোদ আসেনি৷ ইংরেজ আমলের কোনও বাগান৷’

কৃষ্ণেন্দু বললে, ‘জায়গাটা কোথায়? এইটুকু আপনি বলতে পারছেন না? তার মানে আপনি জানেন না৷ সবটাই আপনার কল্পনা৷ গল্প৷’

‘তাই হয়তো হবে৷ তবে আমি জানি আছে৷ আমার গুরু আমাকে বলে গেছেন৷’

আমরা একদিন গঙ্গা পেরিয়ে বোটানিকসে গেলুম৷ ইডেনের চেয়েও বড় বাগান৷ কৃষ্ণেন্দু বিশাল বটগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে বললে, ‘এইটে ওক গাছ হলে কী ক্ষতি ছিল!’

সে আর আমি কী করব! বট--বটই হয়৷ কোন দুঃখে ওক হবে! প্রায় চার ঘণ্টা ধরে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও সেই ওকের সন্ধান কোথাও পাওয়া গেল না৷ আফ্রিকার, দক্ষিণ আমেরিকার কত রকমের গাছ, সেই পাগলা পাতার গাছ, যার কোনও দুটো পাতা একরকম নয়, সবই আছে৷ নেই কেবল ওক৷ গঙ্গার ধারে বসে কৃষ্ণেন্দু বললে, ‘আর যাই হোক অনেক গাছ চেনা হল৷ বেশ ভালোই লাগে গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে৷ কোনওটা বাবার মতো, কোনওটা মাস্টারমশাইয়ের মতো, কোনওটা ওই পাগল ফকিরের মতো৷’

এই শহরে যত পার্ক, যত কবরখানা ছিল সব ঘোরা হয়ে গেল৷ মেহগনি, অর্জুন, আকাশমণি, নাগকেশর, কৃষ্ণচূড়া কত-কত গাছ, নেই কেবল একটা ওক৷ শেষে আমরা হাল ছেড়ে দিলুম৷ সব বাজে৷ ফকির সাহেবের গল্প৷

দেখতে-দেখতে আমরা বড় হয়ে গেলুম৷ ফকির সাহেবও মারা গেলেন৷ দরগাটা শ্রীহীন হয়ে গেল৷ কৃষ্ণেন্দু এখন গাছকে ভালোবেসে বিশাল বোটানিস্ট৷ তানজানিয়ার ন্যাশনাল ফরেস্টে চাকরি করে৷ সেইখান থেকে আমাকে চিঠি লিখেছে, সত্য! তোর ফকির সাহেব, চল্লিশ বছর আগে যে কথাটা বলেছিল, তার অর্থ আমরা বুঝতে পারিনি৷ মানুষই গাছ৷ অন্তত চেষ্টা করলে, সে গাছের মতো হতে পারে৷ সেটাই হল সাধনা৷ আকাশের দিকে ক্রমশ বেড়ে ওঠা৷ উঁচু, আরও উঁচু৷ অচল, অটল, স্থির, ঝড়-ঝাপটা, রোদ৷ কত পাখির বাসা, কত পাখির আশ্রয়, কত পথিকের ছায়ায় বসা, চলে যাওয়া সময়ের সাক্ষী, মানুষের ইতিহাসের দর্শক৷ আর ওই যে বলেছিলেন, চাপ দিলেই ঢাকনা খোলে, হাত ঢোকালেই মুক্তো মানিক! সত্য৷ সেইটাই হল মন৷ জ্ঞানের বোতামে চাপ দিলে অজ্ঞানের ঢাকনা খোলে৷ মনেই হীরে-চুনি-পান্না-জহরত৷ তোর ফকির এক মহামানব৷ ওকগাছ খুঁজে পেয়েছি৷ সেই গাছ আমি, সেই গাছ তুমি৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%