সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
জালে মাছ ধরে, হেডস্যার কাল রাতে জলজ্যান্ত একটা চোর ধরে রেকর্ড করেছেন৷ বাজারে, চায়ের দোকানে সাত-সকালেই আলোচনা হচ্ছে৷ অনেকেই বলছেন—এটা বিশ্ব রেকর্ড৷ পৃথিবীর কোথাও এখনও পর্যন্ত এমন ঘটনা ঘটেনি৷ অনেক বাঘ জালে পড়েছে৷ সে-জাল আলাদা জাল৷ এ একটা সামান্য জাল, সে-জালে প্রমাণ সাইজের একটা চোর৷ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, যে কিছুই দেখেনি, একালে তাকেই বলা হয় প্রত্যক্ষদর্শী৷ চায়ের দোকানের এই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা সবাই হাঁ করে শুনছে, ‘ছ’ফুট লম্বা৷ বুকের ছাতিটা কপাটের মতো৷ একটা শামুকের এ-বগল থেকে ও-বগল যেতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যাবে৷ গায়ের রং মিশ কালো৷ চোখ দুটো বেড়ালের চোখের মতো৷ অন্ধকারে জ্বলে৷ হাত দুটো শাবলের মতো৷ চওড়া গোঁফ, হাবিলদারের মতো৷ গর্দানটা দেখার মতো, যাকে বলে লোটা গর্দান৷ আমি যখন আর্মিতে ছিলুম, তখন এক কর্নেল আমাকে বলেছিলেন, তিনি তিসি, লোটা গর্দান দোনো হ্যায় শয়তান কি নিশান৷’
‘মানেটা কী হল?’ একজন জানতে চাইলেন৷
‘মানে হল, যার কপাল তিন আঙুলের মতো চওড়া, আর ঘাড়টা ঘটির মতো, জানবে লোকটা শয়তান৷ এই চোরটাও সেই রকম৷’
একজন একটু সন্দেহ প্রকাশ করে বলল, ‘তুমি কবে আর্মিতে ছিলে? এই চেহারায়!’
‘আর্মির কতটুকু জানো তুমি? বাড়ি আর চায়ের দোকান, চায়ের দোকান আর বাড়ি, কুঞ্জদের বারোয়ারি রকে বসে মুড়ি, তেলেভাজা, এই তো তোমার জীবন, ফোর্টউইলিয়াম দেখেছ? ডেস্ট্রয়ার কাকে বলে, ফ্রিগেট কাকে বলে জানো? আর্মিতে একটা রোগা ডিভিসান৷ এই ডিভিসানের সৈন্যরা দুটো পাহাড়ের মাঝখানের খাঁজ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে৷ গাছের ডাল কি শিকড় ধরে ঝুলে থাকতে পারে৷ মেশিনগানের গুলি আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে, গায়ে লাগছে না৷ তোমার মতো মোটা থ্যাসথ্যাসে হলে এক গুলিতেই খতম৷ ইজি টার্গেট৷ আমার পায়ের মাপ পাঁচ৷ পাঁচ সাইজের অ্যামুনিশন বুটের ওজন, দশ সাইজের বুটের ওজনের হাফ হবে৷ আমার ছাতি বত্রিশ, আমার ওজন চল্লিশ কেজি৷ ফুল ইউনিফর্মে আমার টোটাল ওজন মোটাদের থেকে অনেক কম৷ পাহাড় রেজিমেন্টে আমাদের ভীষণ খাতির৷ আমি যখন ছাড়ছি, তখন কিছুতেই আমাকে ছাড়তে চাইছে না৷ যখন বললুম, আমি সতেরো বছর কমপ্লিট করে বসে আছি, তখন কেঁদে ফেলেছে৷’
‘কে কাঁদল?’
‘ব্রিগেডিয়ার টামটা৷ সৈনিকের চোখে জল৷ আমিও কাঁদছি৷ শেষে বললে, কার্গিল যুদ্ধে তুমি মরে গেলে না কেন, তাহলে আমার এত দুঃখ হত না! আমি নিজের প্রচার করতে চাই না, লোকে আমায় বাধ্য করে৷ এমনিই লোকে আমাকে অহংকারী বলে৷ অহংকারের কারণ আছে বলেই করি৷ গয়না আছে, তাই গয়না পরি৷ যার নেই, সে কী করবে? হিংসে করবে৷ সমালোচনা করবে৷ জ্বলে-পুড়ে বদহজমে একটু একটু করে মরবে৷’
‘ঠিক আছে ভাই৷ এখন আসল কথাটা বলো৷’
‘কী কথা?’
‘জালে মস্ত বড়, ইয়া গোঁপওয়ালা একটা চোর পড়েছে৷’
‘ওসব আজে-বাজে, গাঁজাখুরি খবর আমি রাখি না, আমার সময়ের দাম আছে৷ ব্রিগেডিয়ার ওসমান আমাকে ঘুরতে ফিরতে একটা কথাই বলতেন,—time is money৷ যেখানে টাকা নেই, সেখানে সময়ও নেই৷ কিন্তু, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি কেন? যাচ্ছি কোথায়? এই এক হয়েছে, মিনিটে মিনিটে সব ভুলে যাই৷ ওই যে বুলেটটা কানের পাশ দিয়ে চলে গেল, তারপর থেকেই ভোলা রোগটা এল৷ এক চুলের জন্যে বেঁচে গেলুম৷’
‘এটা আবার কোথায় হল?’
‘কে জানে কোথায়? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে৷ ইলিশ মাছ৷ কোথায় বললে—জালে মাছ পড়েছে! কী মাছ? গঙ্গার ইলিশ?’
‘তুমিই তো বললে, জালে চোর পড়েছে৷’
‘কত করে কেজি? গোটা, না কাটা? আমার সাইকেলটা কোথায় গেল?’
‘সাইকেল তো ছিল না৷ হেঁটেই এসেছ৷’
‘কেন? সাইকেল থাকতে হেঁটে এলুম কেন? ও, মনে পড়েছে৷ সাইকেলটা শালা নিয়ে গেছে৷’
‘কোন শালা? থানায় ডায়েরি করেছ?’
‘আরে এ শালা, সে শালা নয়৷’
হেডস্যারের বাড়ির সামনে ভিড়৷ খবর ছড়াতে সময় লাগে না৷ মায়েদের উৎসাহ খুব বেশি৷ একজন আর একজনকে বলছে, ‘দেখতে পাচ্ছিস না? ওই তো রে? পেয়ারা গাছের তলায় জালে জড়ানো৷’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কালো মতো৷ ইয়া মুশকো৷’
‘আরে ধুর, কোন দিকে দেখছিস? ওটা তো জলের ড্রাম৷ পেয়ারা গাছ চিনিস না?’
থানার দারোগা এসেছেন, সঙ্গে দুজন কনস্টেব্ল৷ সব চোরই যে লক্ষ্মীছেলে হবে তেমন কোনো কথা নেই৷ অনেক বদমাইশ চোরও আছে৷ বদমাইশ গরুর মতো৷ এটা বেশ ধুমসো৷ জালে পড়ে কেমন লক্ষ্মী হয়ে বসে আছে দ্যাখ, যেন কিচ্ছু জানে না৷ মুখ পোড়া৷ আমার কাকাবাবু যেটাকে জাপটে ধরেছিল সেটা ছিল রোগা-প্যাংলা৷’
‘চোরটা ঝটাপটি করেনি?’
‘করবে না আবার! খুব করেছিল, কিন্তু কাকাবাবুর তো হিস্টিরিয়া ছিল৷ জাপটে ধরামাত্রই কাকাবাবুর হিস্টিরিয়া শুরু হল৷ চোরটার গায়ে একেবারে আঁকড়ে বসে গেল৷ দাঁতে দাঁত লেগে গেল৷ দাঁতের ফাঁকে চোরটার কানের লতিটা ঢুকে গেছে৷ ও কামড় তো ছাড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই৷ কাকাবাবু থরথর করে কাঁপছেন, চোরও কাঁপছে৷ সে ভেবেছে ভয়ে কাঁপছে৷ সাহস দেবার জন্যে বলছে, ‘আমি ডাকাত নই, ছিঁচকে চোর, আমার কাছে ছুরি, কাঁচি নেই৷’ কাকাবাবুকে টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নামাচ্ছিল৷ মানুষের তো দুটো পা, চারটে সামলাবে কী করে! পায়ে পায়ে জড়াজড়ি করে একতলায়৷ পুলিশ এসে ভেবেছে জোড়া চোর৷ দুজনকেই পেটাতে শুরু করেছে৷ চোরটা তো নীচে, কাকাবাবু ওপরে৷ যেমন বিছানায় থাকে রে—তোশকের ওপর গদি৷
‘কাকিমা সিঁড়ির ওপরের ধাপে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, উলটে নিন, উলটে নিন, চোরটা নীচে, ওপরেরটা আমার স্বামী৷ হিস্টিরিয়া হয়ে গেছে৷’
‘একঘণ্টার চেষ্টায় সেই চোরকে ছাড়ানো গেল৷ কাকাবাবুর দাঁতের ফাঁকে চোরের একটুকরো কান৷ জল ঢালা হয়েছিল, ভিজে সপসপে৷ বড়বাবু চোরটাকে বললেন, ‘তোর যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে, মরে যাসনি ভাগ্য ভালো৷’ কাকিমা বললেন, ‘তুই চলে যা বাবা, কানটায় একটু খুঁত হয়ে গেল, টুকরোটা নিয়ে যা, দর্জিদের সেলাইয়ের হাত ভালো, বললে সেলাই করে দেবে৷ যা পয়সা লাগে আমি দিয়ে দোবো৷’ তারপর সেই চোর হয়ে গেল কাকাবাবুর বাগানের মালি৷ চৌকিদার৷’
‘মাছ জালে পড়লে ধপাং ধপাং করে পালাবার চেষ্টা করে, এ কেন করছে না?’
‘এর চুরিতে তেমন মন নেই৷ চোর যদি ধরা পড়ে যায়, এর চেয়ে বড় অপমান তার জীবনে আর কী হতে পারে৷ আত্মহত্যা করা উচিত৷ একেবারে ল্যাদাড়ুস৷’
‘ওরা তো মুখটা গামছা দিয়ে ঢেকে রাখে! কাগজে যেমন দেখি৷’
‘গামছা থাকলে তো৷ মনে হয় ভিখিরির চেয়েও গরিব৷’
‘যারা দেখতে আসছে, তারা তো দশটা করে টাকা দর্শনী দিতে পারত৷’
‘সে-টাকা ওর বরাতে জুটত না কি? ট্রেনিং না নিয়ে, কোর্স না করে চুরি করতে এলে এই অবস্থাই হয়৷ চল, চল, অনেক কাজ পড়ে আছে৷’
‘তুমিই তো হুজুগটা তুললে৷ সর্বনাশ হয়ে গেল, চারা মাছ আর পাব না৷ পরেশ বলেছিল, বউদি! কাটা আপনি বেলাতেও পাবেন, চারা খেতে হলে সকাল সকাল আসতে হবে৷ হেভি ডিম্যান্ড৷ আজকে ও মোরলা মাছ আনবে বলেছিল৷ তোমার জন্য সব ভেস্তে গেল৷’
‘মোবাইলে ধর না৷ বল, আমরা আসছি৷’
‘মোবাইলে পরেশকে ধরব! তুমি খেপেছ? আমার মোবাইলে আঁশটে গন্ধ হয়ে যাবে৷ ও ওই জল হাতে ধরবে!’
‘সে তো ওরটা ধরবে, তোরটা তো তোর কানে?’
‘কানে কানে যোগ হয়ে যাবে না৷ আমার এই মোবাইল মন্দিরে যায়, ঠাকুর ঘরে যায়৷ পবিত্র৷ পেঁয়াজ, রসুন, মাছ-মাংস, ডিম স্পর্শ করতে দিই না৷ ঠাকুর ঘরে মা লক্ষ্মীর ঘটের পাশে শুয়ে থাকে৷ আমি পুজো করি৷ এই সেদিন একটা টিকটিকি ওর বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল৷ মুখপোড়া৷ আমি গঙ্গাজল ছিটিয়ে, চন্দন মাখানো একটা তুলসী পাতা সেঁটে দিলুম৷’
‘টিকটিকি চলে গেলে কী হয়?’
‘টিকটিকি তো আমিষ৷ এই সব ব্যাপারে আমি ভীষণ কড়া৷’
‘তুইও তো আমিষ?’
‘আমি মরে গেলে আমিষ হব৷ জ্যান্ত মানুষ ভগবান৷ আমাদের বুকে ভগবান বসে আছেন৷ সেদিন আমার শ্বশুরের বুকে পেস-মেকার বসানো হল৷ তার আগে পেস-মেকারকে বৃন্দাবন ঘুরিয়ে আনা হল৷ টানা তিন রাত হরি নাম শুনল৷ এখন শ্বশুরমশাইয়ের বুকে বসে ননস্টপ বলে যাচ্ছে—হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ৷’
‘বাইরে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?’
‘স্টেথিস্কোপ লাগালে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে৷’
‘আমাকে একদিন শোনাবি?’
‘কথা দিতে পারছি না৷ যন্ত্রটা লাগাবার পর থেকেই খুব অহংকার বেড়ে গেছে৷’
‘সে তো বাড়বেই৷ এত দামি একটা জিনিস৷ মজাটা কী বলো তো? পকেটে হয় তো একটা পয়সা নেই বুকে লাখ টাকা৷’
‘ওটা তো আবার উইল করেছেন৷’
‘মানে?’
‘আমাকে বললেন, কাগজ নিয়ে বোসো, আমি যা বলছি লেখো—‘আমার মৃত্যুর পর হারু যদি তখনও বেঁচে থাকে এই পেসমেকার যেন তার বুকে বসানো হয়৷’ হারুবাবু ছেলেবেলার বন্ধু৷
হেডস্যার, যে-চেয়ারটা দারোগাবাবুকে বসতে দিয়েছেন, সেটা সাধারণ মাপের মানুষের জন্যে ঠিক আছে৷ এই দারোগাবাবু ডবল সাইজের৷
নানারকম সাইজের দারোগা আছে৷ এই দারোগাবাবু বেশ বড় সাইজের৷ ছোটখাটো একটা টিলার মতো৷ বীরভূমের মানুষ৷ সেখানকার গ্রামে গ্রামে ভীমের পুজো হয়৷ আবার ভবানী মন্দিরও আছে৷ কলকাতার এক বিখ্যাত কুস্তিগিরের নাম ভীমভবানী৷ আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, প্রাণের বন্ধু কৈলাস আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমার গায়ে গা লাগিয়ে৷ নামেই কৈলাস৷ ও বলে, ওর শরীরটা এখনও ছাড়েনি, যখন ছাড়বে, তখন ও হয়ে যাবে পাক্কা ছ-ফুট, বুকের ছাতি ছাপ্পান্ন ইঞ্চি৷ আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ, এক সঙ্গে দুটো বড় জিনিস সহ্য করতে পারা যাবে না৷ কৈলাস বললে, অঙ্কটা দেখ, ‘হেডস্যার প্লাস থানার অফিসার ইজ ইকোয়াল টু, ডবলস্যার, মানে দুটো শিং৷ গুঁতোটা কীরকম হতে পারে, ভেবে দেখ৷ দুবরাজপুরে মামা-ভাগনে পাহাড় আছে৷ দেখেছিস?’
বললুম, ‘না, দেখিনি৷’
কৈলাস বললে, ‘ঘরে তাকিয়ে দেখ৷ আহা ঘরটা যেন কানায় কানায় ভরে গেছে!’
ভোরে আমরা দুজনে কুঞ্জবাবুর বাগানে ফুল তুলে দুটো ভাগ করি, একটা ভাগ মায়ের মন্দিরে, আর এক ভাগ হেডস্যারকে৷ খুব খুশি হয়ে আমাদের রোজ আশীর্বাদ করেন৷ বেশ জোরে জোরে বলেন, ‘দুষ্টু বুদ্ধির পতন হোক, শুভ বুদ্ধির জয় হোক৷’
কাঁচা কলাপাতায় মোড়া এক গাদা ফুল রাখি কোথায়৷ কৈলাস বললে, ‘ওই গাছের ছায়ায় রেখে আয়৷ পরে কাজে লাগবে৷ আজ কার পুজো হবে কে জানে৷ চোর পুজো, না সাধু পুজো! জালে জড়ানো জিনিসটাকে বেশ দেখাচ্ছে৷ সে তুই যাই বলিস৷’
ওদিকে দারোগাবাবু, ‘হ্যাঁ, কী হয়েছে?’—বলে যেই একটু নড়েচড়ে বসতে গেলেন, চেয়ারের ডান দিকের হাতলটা অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে খুলে মেজেতে পড়ে গেল৷ দারোগাবাবুর কনুইটা শূন্যে হাতলটা খুঁজছে৷ দারোগাবাবু বলছেন, ‘কী হল? কোথায় গেল? এই তো ছিল!’
সহকারী বললেন, ‘খুলে মেজেতে পড়ে গেছে৷’
‘ভেরি গুড! এই নিয়ে সাতটা হল৷ দিজ ইজ সেভেন্থ৷’
হেডস্যার বললেন, ‘সরি! কৃতিত্বটা আমার৷ ওটা জাস্ট লাগানো ছিল৷ আপনি সিক্সথেই রইলেন আপাতত৷ ওটা আমার আঠারোতম সাফল্য৷ ওটা না থাকায় আপনি এখন কতটা ফ্রি, তাই না৷ একেই বলে ফ্রিডম৷ আপনার ডান পাশটা মুক্তির আনন্দে কতটা বেরিয়ে এসেছে! হাতলওয়ালা চেয়ারে আমি আর বসি না৷ প্রতিদিন শরীর বাড়ছে, সেই অনুপাতে চেয়ার তো বাড়বে না!’
‘অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ কথা কিন্তু ডান হাতটা একটা সাপোর্ট খুঁজছে৷ অসহায় বোধ করছে৷’
‘একটা কাজ করা যেতে পারে—জালে জড়ানো চোরটাকে এনে বসিয়ে দি৷ সেম হাইট৷ হাতটা মাথায় রাখতে পারবেন৷’
‘বলেন কী? চোরের মাথায় হাত রেখে দারোগা বসে আছে? ঘোর কলি হলেও অতটা ঘোর এখনও হয়নি৷’
‘আপনি ভুল করছেন, মা দুর্গার পায়ের কাছে কুখ্যাত মহিষাসুর৷ মা তার কাঁধে পা রেখেছেন৷ পা৷ হাত নয়৷ হাত রাখলেই তো আশীর্বাদ৷ আমি চোরকে আশীর্বাদ করব?’
‘এমন তো নয় যে আপনারা চোর-ডাকাতের অঙ্গ স্পর্শ করেন না, বেশ ভালোভাবেই করেন৷ আষ্টেপৃষ্ঠে করেন৷ শুনেছি, কড়িকাঠ থেকে ঝুলিয়ে পায়ের তলায় পালা করে পেটান৷’
‘ওঃ, সে ভীষণ পরিশ্রম৷ ঘাম বেরিয়ে যায়৷ আর এত অসভ্যের মতো চিৎকার করে, অসহ্য, অসহ্য! মাঝে মাঝে ভাবি, এই পুলিশের চাকরি ছেড়ে আপনাদের মতো মাস্টারির লাইনে যাই৷ দেশের সেবার কথা ভেবে যেতে পারি না৷ চোর, ছ্যাঁচোড় না ধরলে মানুষের ঘুমের কী হবে? তাই নিজের ঘুম ত্যাগ করেছি৷ কোমরে রিভলভার, হাতে ডাণ্ডা নিয়ে অলিতে-গলিতে ঘুরছি৷ না ঘুমোবার ফলে যা খাচ্ছি সব ফ্যাট হয়ে যাচ্ছে৷’
‘পুলিশ অফিসারের চেহারা আপনার মতোই হওয়া উচিত, তা না হলে মানায় না৷ ঘর জোড়া চেহারা৷’
‘সে আপনি বলছেন বটে কিন্তু প্যান্টের বোতাম কতবার সারাব! বেল্ট তো এক নম্বর ফুটোয় চলে এসেছে৷’
‘বেল্ট না পরলেই হয়৷’
‘তার উপায় নেই৷ দারোগার তিনটে জিনিস—বেল্ট, বুট, টুপি৷’
‘মাস্টারি করবেন? আপনার কোনো ধারণা নেই৷ কতরকমের বাঁদর আছে জানেন!’
‘এ-বাঁদর সে বাঁদর নয়৷ স্নেহ মাখা বাঁদর৷ গোল্লা, কিন্তু রসগোল্লা৷ সে-রকম একটা বাঁদর আপনিও ছিলেন, আমিও ছিলুম৷ অমন করে আর কেউ আমাদের বাঁদর বলবে না!’
‘সে ঠিক, তবে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করতে করতে দেখেছি, সে-বাঁদরগুলোও আর নেই৷ এখন সব রিয়েল বাঁদর৷ এদের পিঠে, পিঠস্থানে পরিবর্তন এসেছে৷ যে-চামড়া দিয়ে আমাদের পিঠ তৈরি হয়েছিল, এদের পিঠ সেরকম নয়, ঢাকের চামড়া৷ কোনো অনুভূতি নেই৷ মনে আছে, আমাদের কালে যখন স্কুল স্থাপিত হত, তখন, চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ডের সঙ্গে সঙ্গে এক বান্ডিল লিকলিকে বেতও আসত৷ হেডস্যার মাস্টারমশাইদের বলতেন, ‘নিন, নিন, সব পছন্দ করে নিন৷’ আঃ! টাটকা-টাটকা বেত৷ বেত, বেত গন্ধ৷ এপাশে-ওপাশে, বাতাসে মারছি, সপাং, সপাং শব্দ৷ এই শব্দটায় একটা শাসন, একটা শিহরন৷ হেডস্যার আমাকে বললেন, ‘আপনি একজোড়া রাখুন৷’’
‘একজোড়া কেন?’
‘বাংলা বানান৷ ডেঞ্জারাস—ন, ণ, শ, ষ, স, র, ড়৷ এই যেমন দেখুন না, আপনাকে যদি বলি, লিখুন তো, মুড়ি খেয়ে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম, কাল ভোরে উঠে জামা-কাপড় পরে স্টেশানে দৌড়তে হবে৷’
‘উরে বাপ্রে কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷’
‘আপনি কী লিখবেন, বলছি৷ না, বললে হবে না, লিখে দেখাচ্ছি৷ মুরি খেয়ে মুরি দিয়ে শুয়ে পড়লুম৷ কাল ভোড়ে উঠে জামা-কাপড় পড়ে স্টেশানে দৌরতে হবে৷’
দারোগা সাহেব বললেন, ‘আঃ, একেবারে ঠিক৷ ফুল মার্কস৷ একশোতে একশো৷ এই তো দেখুন না, আমি দারোগা না দাড়োগা—সন্দেহ হয়৷’
হেডস্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘এখন রোগা না লেখাই ভালো, কী বলেন? আমি তো পরের জন্মে ঢাকি হয়ে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঢাক বাজাব৷ ছাত্রদের পিঠে এত বেত বাজিয়েছি৷’
‘সে আগে, এখন আর নয়৷’
‘ঠিক বলেছেন, good old days are gone. বেত আর চাবুক ইংরেজদের হাতেই খুলত ভালো৷ দুটোই ওদের জিনিস৷’
‘না, না, বেত অতিশয় পবিত্র৷ খাগের কলম, মাটির দোয়াত, মা সরস্বতীর প্রতিমা, তালপাতার পুঁথি, হাতে খড়ি, জয় জয় দেবী চরাচর সারে, তারপর পণ্ডিতমশাইয়ের টোল৷ বেত ছাড়া পণ্ডিতমশাই কেমন লাগবে? যেন খাঁড়া ছাড়া মাকালী৷ চাবুকের জাত আলাদা, হিন্দু নয়৷ আর আমাদের ব্যাপারটার কোনো জাত নেই—লাঠি, ডাণ্ডা, একেবারে অশিক্ষিত একটা জিনিস৷ ও.সি হয়ে মুক্তেশ্বর থানায় গেছি, এর আগে ভাগ্যেশ্বরে ছিলুম এস.আই৷ প্রোমোশান হয়েছে৷ মুক্তেশ্বরের অফিসঘরের দেয়ালে একটা চাবুক ঝুলছে৷ সেকেন্ড অফিসার বললেন, ওটা ব্রিটিশ আমলের, ওইভাবেই আছে৷ ইংরেজরা স্বদেশি আন্দোলনকারীদের, মানে বিপ্লবীদের ওইটা দিয়ে চাবকাতো৷ দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলুম৷ শহিদদের স্পর্শ রয়েছে৷ চাবুকটা দেয়াল থেকে নামিয়ে মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে একটু কেরামতি দেখাবার চেষ্টা করলুম৷ হিন্দি সিনেমার ভিলেনরা যেমন করে৷ চাবুকের একটা টুকরো ছিটকে মুখে এসে লাগল৷ আর একটু হলে চোখটা যেত৷ খুব শিক্ষা হল৷ যন্ত্রপাতি যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো৷’
একজন কনস্টেবল হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বললে, ‘আর তো রাখা যাচ্ছে না, বলছে পেয়েছে৷’
ও.সি বলল, ‘কী পেয়েছে?’
‘ওই যে স্যার, সকালে যা পায় স্যার৷’
‘ও সব বদমাইশি৷’
‘বলছে ওখানেই...৷’
‘পালাবার তাল৷ বেডপ্যান লাগাও৷’
‘ও তো বেডে নেই স্যার, মাটিতে রয়েছে৷’
‘গ্রাউন্ডপ্যান বোলাও৷’
‘সেটা তো ঠিক কী জিনিস, জানি না স্যার৷’
‘সরা, সরা, মাটির সরা৷’
‘বাইরে কিন্তু প্রচুর লোক৷ কেউ ঢিল ছুঁড়ছে, কেউ ভাঁড়৷ একজন একটা লম্বা গাছের ডাল এনেছে৷ বাইরে থেকে খোঁচাবার চেষ্টা করে চলেছে৷’
‘লাঠি চালাও৷’
‘লাঠালাঠির মধ্যে নেই স্যার৷ ময়ূরেশ্বরে লাঠি চালিয়ে কী বিপদে পড়েছিলেন মনে নেই৷ গোঘাটে বদলি করে দিল৷ আপনার এই কথায় কথায় লাঠি আর ক্যাঁত ক্যাঁত করে লাথি, আপনার বারোটা বাজাবে৷ আমি জুনিয়ার হলেও আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি, যে কারণে আমার প্রোমোশন নেই৷ ওই যে স্পষ্ট কথা বলতে আমার কষ্ট নেই৷ বলব তো বলবই৷ ফাঁসি হলেও বলব৷ কারণটা কী জানেন—রক্ত৷ শরীরে স্বদেশি রক্ত৷ বিপ্লবীদের ব্লাড৷’
জানলা দিয়ে শক্ত মতো কী একটা এসে মেঝেতে পড়ে কোণের দিকে গড়িয়ে গেল৷ ওসি বললেন, ‘কী হল? গুলি-গোলা চলছে না কি?’
‘না স্যার৷ ওরা কয়েন ছুঁড়ছে৷ এই দেখুন, দু-টাকার কয়েন৷ বাইরে বেরিয়ে দেখুন না, এক কুড়ি পাবেন৷’
‘প্রণামী না কি?’
‘না, না৷ ঢিল যা ছিল ফুরিয়ে গেছে৷ সব বাজারে যাচ্ছে তো! পকেটে সব সলিড টাকা৷ মার মার করে ছুড়ছে৷ আপনি এই থানায় এসে আমাকে বলেছিলেন, যতিনবাবু আমার মাথা আর পেট দুটোই গরম৷ আপনি অনেক ও.সি চরিয়েছেন, আমাকেও একটু সামলাবেন, আপনি আমার দাদার মতো৷ সেই জন্যেই বলছি৷ ব্যাপারটার জলদি নিষ্পত্তি করুন৷’
‘কী করে করব! জালে জড়িয়ে আছে তো!’
‘একদিন না একদিন ছাড়াতে তো হবেই৷’
‘আপনি সিনিয়ার, কথাটা বললেন জুনিয়ারদের মতো৷ এটা বনবিভাগের কাজ৷ জালে একটা বাঘ পড়লে কী করতেন?’
‘এ তো বাঘ নয় মানুষ৷’
‘ভুল করছেন, এ, বাঘের স্বভাবযুক্ত মানুষ৷ সুতরাং, বনবিভাগ ও পুলিশবিভাগের যৌথ দায়িত্ব৷’
এতক্ষণ হেডস্যার চুপ করে বসেছিলেন৷ প্রশ্ন করলেন, ‘কত টাকার মতো পড়েছে?’
‘তা হবে৷ হাজার, দু-হাজার না হলেও চার-পাঁচশো হবে৷ বাজার যাওয়ার পথে খুচরো যার যা পকেটে ছিল, সব ছুড়ে ছুড়ে মেরেছে, যেন জুয়া খেলা৷’
‘আপনাদের আইন অনুসারে কে পাবে?’
‘থানাই পাবে৷ ফরেনসিক হবে৷’
‘কার ফরেনসিক হবে? খুন হয়েছে না কি?’
‘হতে কতক্ষণ! ক্লাবের ছেলেদের ঘুম একটু দেরিতে ভাঙে৷ কেন কী ওরা তো রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারে না৷’
‘কেন পারে না?’
‘নানা সমস্যা৷ শরীরে যন্ত্রণা৷ অ্যাকশনের রি-অ্যাকশন৷ খোকা ঘুম থেকে উঠে যেই শুনবে জালে চোর পেরেছে, সঙ্গে সঙ্গে বাইক নিয়ে চলে আসবে৷ পেছনে বুড়ো৷ আমাদের সার্কেলে এই জুটির নাম ‘বুড়ো-খোকা’৷ এরা কী পারে, কী পারে না, আপনার কোনো ধারণা নেই৷ নানা কারণে বেশিক্ষণ অ্যাকটিভ থাকতে পারে না৷ যেটুকু সময় থাকে তাইতেই সবাই অস্থির৷ হিন্দি আর ইংরেজি সিনেমার সব কায়দা শিখে ফেলেছে৷ একটা নয়, দুটো নয়, এক ঝুড়ি মোবাইল৷ ওই ঝুড়িটা ওর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড৷ পয়লা বৈশাখ নিজে মাথায় করে কালীবাড়িতে নিয়ে গিয়ে পুজো করায়৷ মোবাইলগুলোর তখন কী চেঁচামেচি! ওগুলোর কিছু বৈষ্ণব, কিছু শাক্ত৷ তা, ওই একই জায়গায় পুজো হয়৷ বেলপাতা, তুলসী পাতা একসঙ্গে৷ বছরে ওই একবারই বুড়ো-খোকা যুগলে মন্ত্র পড়ে,
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত৷
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্৷৷
পরিত্রাণায় সাধূনাহ বিনাশয়ে চ দুস্কৃতাম্৷
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে৷৷
তারপর চারদিকে চারটে বোমা ফাটবে৷ এর নাম জাগরণ উৎসব৷ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম জাগ্রত হল৷ তারপর নর্মদা৷ নর্মদা মানে বোতল৷ যে যত পারো৷ তারপর নর্দমা৷ ছেলেটা বেশ মজার৷ আমাদের ওখানে মাঝে মাঝে আসতেই হয়৷ এই থানার খবরাখবর-আদানপ্রদান৷ তখন অনেক কথা হয়৷ আপনাকে শ্রদ্ধা করে৷ যেই শুনবে আপনার বাড়িতে চোর পড়েছে—ও আসবেই আসবে৷ তারপর সেই চোর বাঁচে, কী মরে! মরলেই ফরেনসিক, পোস্টমর্টেম৷’
দারোগাবাবু হেডস্যারের পেছনের বাগানে গিয়েছিলেন৷ সে যেতেই পারেন৷ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সব দেখতে হয়৷ এই চাকরিতে কম দায়িত্ব! স্যারের বাড়ির পেছনদিকটা খুব সুন্দর৷ তপোবনের মতো৷ বাড়িটা একতলা৷ তপোবনের মাঝখানে ছোট চারচৌকো একটা সিমেন্ট বাঁধানো জলাশয়৷ স্বচ্ছ পরিষ্কার জল৷ সবুজ ঘাস৷ দারোগাবাবু হাতল-ভাঙা চেয়ারটার সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ বসবেন, কী বসবেন না! হঠাৎ কী মনে হল, একটানে যে হাতলটা ছিল সেটাকে উপড়ে ফেললেন৷ বেশ মোটা কাঠ, ভারী৷
সেকেন্ড অফিসার হাতে নিয়ে বললেন, ‘যাঃ, শেষ করে দিলেন?’
‘আপদ বিদায়৷ ওটাকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এক পাশে রেখে দিন৷ একটা কেসে এতক্ষণ সময় দিলে চলবে?’
‘উপায় নেই স্যার৷ এ তো সাধারণ নয়৷ জালে জড়ান জটিল কেস৷’
‘বসে বসে ন্যাজ নাড়লে তো চলবে না৷ জাল ছাড়াতে হবে৷ তেমন হলে জাল কেটে বের করতে হবে৷’
স্যার হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘কাটবেন না স্যার৷ ওটা সাধারণ জাল নয়৷ আমার ব্যায়াম করার জাল৷’
‘সে কী? ব্যায়ামেও জালিয়াতি?’
দারোগাবাবু হাতল ভাঙা চেয়ারে বসে হাপরের মতো শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘অসাধারণ, অসাধারণ৷ আমার জীবন সার্থক৷’
স্যার বললেন, ‘কারণটা যদি বলতেন৷’
‘বিশ্বাস করুন, বিলিভ মি, আমার লাইফে এইরকম কাঁঠাল গাছ আমি দেখিনি৷ পায়ের কাছে আমার চেয়ে মোটাসোটা একটা কাঁঠাল মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, যেন প্রণাম করছে৷ গাছের গুঁড়ি আর পাতা যেন পালিশ করা৷ কাঁঠালটা ঝকঝক করছে৷ যেন বিউটি পার্লার থেকে বেরিয়ে এল৷ কাঁঠাল পুংলিঙ্গ না স্ত্রীলিঙ্গ?’
‘স্ত্রীলিঙ্গ৷ পেটে সন্তান ধারণ করে আছে৷ একদল সন্তান৷ গাছটার হাইট লক্ষ্য করেছেন? ছেঁটে ছেঁটে কেমন গোল মতো করে রেখেছি৷ গুঁড়ি আর পাতা পরিমাণ মতো সরষের তেল জলে মিশিয়ে রোজ ম্যাসাজ করি৷ ছোট্ট, নরম একটা ব্রাশ দিয়ে কাঁঠালটাকে রোজ ব্রাশ করি৷ রাত্তিরে পাতলা একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখি৷’
‘আমি প্রণাম করেছি৷ ও কাঁঠাল নয়৷ দেবী৷ পনস দেবী৷ আপনি পণ্ডিত মানুষ৷ একটা প্রণাম মন্ত্র রচনা করুন৷ সামনের শনিবার আমরা পনস-বন্দনা করব৷ একটা উৎসব৷’
‘ও আমি পারব না৷ আমার ব্রাহ্মণী থাকলে পারতেন—বিদ্যাভারতী৷’
‘তিনি কোথায়?’
‘নেই তো৷ দু-বছর হয়ে গেল৷ এই গাছ আমি তাঁকে উৎসর্গ করেছি৷’
‘ভালো করেছেন৷ আমি বিয়ে করিনি৷ কেন জানেন! বউ আর কুকুর মারা গেলে ভীষণ শোক হয়৷ সহ্য করা যায় না৷’
হেডস্যার একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘ক্ষমতাশালী মানুষ আপনি৷ হাতে হাতকড়া নিয়ে ঘোরেন৷ কোমরের বেল্টটা আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটার মতো চওড়া৷ ভুরু দুটো পরিপক্ব শোঁয়া পোকার মতো৷ চোখ দুটো যেন সুরা-কুম্ভ...’
দারোগাবাবু বললেন, ‘কী হল আপনার? ভাব হল না কি? কীর্তন তো কোথাও হচ্ছে না!’
স্যার বললেন, ‘আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারেন তবু বলব, অত্যন্ত সাহসভরে বলব, উপমাটা অতিশয় আপত্তিকর, প্রতিবাদযোগ্য৷’
‘কোন উপমা?’
‘ওই যে, বউ আর কুকুর—এক সারিতে, এক আসনে৷ ভালো লাগল না৷ নারী জাতির এমত হেনস্থা! শকিং, ডিসগাস্টিং, হরিবল, অ্যাবমিনেবল...৷’
‘স্টপ, স্টপ৷ বলতে বাধ্য হচ্ছি, কুকুর সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই৷ নারীর মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে আপনি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিশ্বস্ত এক প্রাণীকে যথোচিত মর্যাদা দিতে অপারগ, শেম, শেম! আমি তখন ময়ূরেশ্বরের ও.সি৷ শঙ্করী আমার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল৷ আমি স্যালাইনে চলে গেলুম৷’
‘সে জায়গাটা কোথায়? বর্ধমানে না বাঁকুড়ায়?’
‘হাসপাতালে৷ স্যালাইন চালাতে হল৷ বাঁচার আশা ছিল না৷ অজ্ঞান৷ ওদের ধারণা৷ আমি তখন আকাশের ওপারে একটা হলুদ মাঠে, সবুজ শঙ্করীর সঙ্গে লাল বল নিয়ে খেলা করছি৷’
সেকেন্ড অফিসার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন, ‘যা ভয় পেয়েছিলুম ঠিক তাই হল৷ মিডিয়া৷ ওই যে ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে ঢুকছে৷ সেই ছিপছিপে মেয়েটা৷ ট্যাঁক ট্যাঁক করে কথা বলে৷ ইতিহাস, ভুগোল, বেদ-বেদান্ত সব জানে৷’
ওসি বললেন, ‘আসুক না৷ অত ভয়ের কী আছে? এর মধ্যে রাজনীতি নেই, চিটফান্ডও নেই৷ একটা খতরনক চোর জালে পড়েছে৷ খবরে তো লেখাই হয় পুলিশের জাল৷ সেই অদৃশ্য জাল দৃশ্য হয়েছে৷ লেট দেম কাম৷ স্যার, চুলটা একটু আঁচড়ে নিন৷ পাউডার নেই?’
‘পাউডার তো নেই৷ রোজ হোম করি, সেই ছাই, মানে বিভূতি আছে৷ গঙ্গাজল, বেলপাতা, তুলসীপাতা, শালগ্রাম শিলা, শিবলিঙ্গ, জবা ফুল এই সব আছে৷ টিভি কোন দেবতার আন্ডারে পড়ে?’
টিভি ঢুকে পড়েছে৷ ক্যামেরা, আলো, স্ট্যান্ড৷ তিনজনের একটি দল৷ মেয়েটি ঢুকেই জিগ্যেস করলেন, ‘সেই জেলেটা কোথায়, যার জালে মানুষ ধরা পড়েছে৷ কোথায় ধরা পড়ল—পুকুরে, নদীতে, সমুদ্রে, ভেড়িতে? সেই জায়গাটা কত দূরে? আমরা স্পটে যেতে চাই৷ মানুষটা কত গভীরে ছিল? বেঁচে রইল কী করে? সে কি ডুবুরি? ডুবে ডুবে সে কী খুঁজছিল? সন্ত্রাসবাদী নয় তো? তার কাছে অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে কি?’
ও.সি বললেন, ‘ইনভেস্টিগেশান চলছে৷ এখনও তাকে ভালো করে দেখা হয়নি৷ একপাশে রাখা হয়েছে৷ একটু পরেই দেখা শুরু হবে৷’
‘পুকুরটা কোথায়?’
‘পুকুর! পুকুর কী হবে? পুকুরের কথা আসছে কেন? পুকুর-টুকুর নেই ম্যাডাম৷’
‘কী আশ্চর্য! জালটা কোথায় ফেলা হবে? জাল থেকেই জল, জল থেকেই জাল৷’
‘না, না, অন্য আর একটা দিকও আছে—জাল, জালিয়াতি৷ স্যার জালটা ডাঙাতেই ফেলেছিলেন৷ ফেলা মাত্রই ক্যাচ৷ আস্ত একটা চোর৷ আজকাল চোরদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র, গ্যাস কাটার, ক্লোরোফর্ম এই সব থাকে৷’
‘করেছিল?’
‘কী করেছিল?’
‘এই তো তিনদিন আগে আমার মামার বাড়িতে চুরি হল৷ সদরে এক নাদা৷ ডিসগাস্টিং৷ চোরদের কখনও কনস্টিপেশন হয় না৷ আমার মামার বাড়ির সাইডে সকলেরই কনস্টিপেশন৷’
সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘এখন একটু বেগ এসেছে৷’
‘কেসটা কোনদিক থেকে ধরব, বুঝতে পারছি না৷ জল নেই জাল আছে৷ নামি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ডাঙায় জাল ফেলেছেন৷ এইটাই তো একটা ‘‘ইস্যু’’৷ লেখাপড়া গোল্লায় দিয়ে সম্মানিত এক শিক্ষক জাল কাঁধে জলায় জলায় ঘুরছেন৷ শিক্ষার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য৷’
ওসি বললেন, ‘ভুল করছেন, শাস্ত্র পড়েননি৷ শাস্ত্রে আছে—লেখাপড়া করিবে মরিবে দুঃখে৷ মৎস্য ধরিবে খাইবে সুখে৷ ইলিশ, চিংড়ি, পাবদা, ট্যাংরা, ভেটকি কত টাকা কেজি?’
‘বলতে পারব না৷ ওই সব নোংরা বাজারে আমি ঢুকি না৷ মাঝে মাঝে শপিং মলে যাই রূপচর্চার জিনিসপত্তর কিনতে৷ আমাদের লাইনে রূপটাই সব৷ মাসে একবার রূপ মঞ্জরিতে যাই৷’
‘সে আবার কী?’
‘বিউটি পার্লার৷ সেখানেই এই প্রথম চালু হয়েছে—অ্যান্ট থেরাপি৷’
‘সেটা কী জিনিস?’
‘নাইরোবি থেকে পিঁপড়ে এনেছে৷ ফায়ার অ্যান্ট৷ কামড়ালে শরীরে আগুন জ্বলে যাবে৷ সেই পিঁপড়ে কয়েকটা শরীরে ছেড়ে দেবে৷ তার আগে সারা গায়ে মাখিয়ে দেবে চাক ভাঙা মধু৷ ভাঙা চাক, মরা মৌমাছি—সেই মধুতে ভাসছে—অর্থাৎ সেন্ট পার্সেন্ট খাঁটি৷ এইবার সেই পিঁপড়ে যেখানে সেখানে কামড়াবে৷ সে এক অসাধারণ উত্তেজনা৷ তিন চারটে কামড়েই অজ্ঞান৷ তার আগে চিৎকার—ফায়ার, ফায়ার!’
‘তারপর?’
‘যে এসেছিল দুর্বল, পা টেনে টেনে হাঁটছে, সে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ বাইরে একটা পিৎজা হাট, সেইখানে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে আস্ত একটা পিৎজা খেয়ে ফেললে৷ শরীরে, মুখে আলাদা একটা জ্যোতি৷ মাথার চুল খাড়া, চোখ দুটো রুবির মতো লাল৷ এক ধাক্কায় এক-একজন দশহাত দূরে ছিটকে ছিটকে পড়ছে৷ পুলিশও ভয়ে কাঁপছে৷ অ, আপনি তো পুলিশ৷ কিছু মনে করবেন না, মেয়েদের হাতে আপনারা জব্দ৷’
‘সে তো বটেই৷ আমার কলিগ সন্তানকে সোনারপুরের এক আন্দোলনকারী কামড়ে দিয়েছিলেন৷ সেপ্টিক৷’
‘আপনার সন্তান? তাকেও পুলিশে ঢুকিয়েছেন?’
‘আরে বাবা সন্তান তার নাম৷ সন্তান সমাজপতি৷ চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাঁদরের ব্যবসা করছে৷’
‘সে আবার কী?’
‘সব দেশেই বাঁদর আছে৷ ভারতের বাঁদর অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার বাঁদর ভারতে৷ সোনারপুরে গিয়ে দেখে এলুম৷ রকম রকম বাঁদর৷ একই রকম বাঁদরামি৷’
‘আমি যাব, আমাদের টিম নিয়ে৷ কভার করব৷’
‘কাকে কভার করবেন? কোনো কভার রাখবে না৷ ছিঁড়ে-খুঁড়ে শেষ করে দেবে৷’
‘আরে বাবা, এ-কভার সে-কভার নয়৷ দশ মিনিটের একটা ক্লিপ৷ ঠিকানাটা বলুন৷’
‘এই তো, বানরবাটি, বন্দিপুর৷ তবে মনে রাখবেন, চশমা পরে যাবেন না, আর একটা টেটভ্যাক নিয়ে রাখবেন৷ মোবাইল নট অ্যালাউড৷ ওখানে একটা রেয়ার মাঙ্কি আছে৷ গরিলা মাঙ্কি৷ একটা গরিলা ঠিকঠাক গরিলা হতে গিয়ে ফেল করে বাঁদর হয়ে গেছে, অথবা একটা বাঁদর বেশি উৎসাহে গরিলা টাইপের একটা কিছু হয়ে গেছে৷’
‘আমরা কালই যাব৷ এখন অ্যাকশন রিপ্লে৷ স্যার জালটা ছুঁড়বেন, মানুষটা জালে জড়িয়ে যাবে৷’
‘মানুষটা কে?’
‘কেন? একটা মানুষ৷ যে-কোনো মানুষ৷’
‘আজ্ঞে না৷ মানুষটা একজন কুখ্যাত চোর৷ তার নামে বত্রিশটা মামলা৷ পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল৷ কাল রাতে একটা আড়াই মন ওজনের কাঁঠাল চুরি করতে এসে স্যারের জালে ধরা পড়েছে৷ আমরা বনবিভাগকে খবর দিয়েছি৷ তারা একটু গাঁইগুঁই করছে৷ দায়িত্বটা মৎস্যবিভাগের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে৷’
‘কী আশ্চর্য! আপনি কেন অ্যারেস্ট করছেন না?’
‘আপনি টিভি করেন, আইন-কানুন জানেন না৷ জানা উচিত৷ কত রকমের পুলিশ আছে জানেন? জল-পুলিশ, স্থল-পুলিশ, রেল-পুলিশ, বন-পুলিশ৷ জেনে রাখুন, জালে যদি মানুষ পড়ে, সে আর তখন মানুষ নয়, জন্তু৷ জাল ছাড়িয়ে যেই বের করে দেবে, সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতকড়া৷ ও মনে হয় আইনটা জানে, তাই বড় বাইরে চেপে বসে আছে৷ দাঁত ব্রাশ করেনি, চা খায়নি, ব্রেকফাস্ট করেনি৷’
‘তা হলে কাঁঠালের ইন্টারভিউটা সেরে আসি৷ কাঁঠালের আকর্ষণে আগে শেয়াল আসত৷’
‘বেশিরভাগ শেয়ালই মানুষ হয়ে গেছে৷’
‘কিন্তু আমি যে পড়েছি, বাঁদর থেকে মানুষ হয়েছে৷ শেয়াল তো বলেনি৷’
‘ও বাঁদররা পয়সা খাইয়ে লিখিয়েছে৷ শেয়ালরা কোনো দেবতার সাপোর্ট পায়নি৷ হুক্কা হুয়া, কা হুয়া করেই মরে৷ মানুষের সঙ্গে শেয়ালের খুব মিল৷ শেয়াল পণ্ডিত, এক নম্বরের ধূর্ত, চোর৷ একটা গল্প শুনবেন?’
‘বলুন৷’
‘একটা জঙ্গল, একটা বাঘ আর একটা শেয়াল! বাঘ তো টুরিস্ট নয়, যে বেড়াতে বেরিয়েছে৷ বাঘের ধান্দা শিকার! তিনদিন আগে একটা হরিণের কিছুটা খেয়েছিল৷ শেয়ালটা অন্যমনস্ক বাঘটার সামনে পড়ে গেছে! পালাবার উপায় নেই৷ অবধারিত মৃত্যু৷ বুদ্ধির জোরে যদি বাঁচা যায়৷ ভয় পেলে চলবে না৷ বেশ গম্ভীর চালে বাঘকে বললে, ‘‘তুমি কি আমাকে মারবার মতলব করছ, যদি করে থাক, তাহলে বিপদে পড়বে৷ ভীষণ বিপদ৷’’ বাঘ একটু আশ্চর্য হয়ে বললে, ‘‘আমার বিপদ! কী কারণে বিপদ? এক থাবায় তোমার শেষ৷’’ শেয়াল বললে, ‘‘জঙ্গলের নিয়মে এক সময় এই রকমই ছিল বটে, তবে সেরকম আর থাকবে না কারণ বনের দেবতা ঘোষণা করে দিয়েছেন, এই অরণ্যের রাজা এখন আমি৷ তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে—কথাটা তুমি বিশ্বাস করছ না৷ বেশ! পরীক্ষা হয়ে যাক৷ জঙ্গলের পশুরা আমাকে বেশি ভয় করে, না তোমাকে! আমি আগে আগে যাচ্ছি, তুমি আমার পেছনে পেছনে এসে দেখ৷ নিজের চোখে দেখলেই বুঝতে পারবে, কথাটা সত্য না মিথ্যা!’’ বাঘ বললে, ‘‘বেশ, তাই হোক৷’’ শেয়ালের সে কী ডাঁট৷ আগে আগে চলেছে, সত্যিই যেন জঙ্গলের রাজা, ঠিক পেছনেই বাঘ৷ জঙ্গলের পশুরা ভয়ে এদিক-ওদিক পালাচ্ছে, লুকিয়ে পড়ছে৷ বাঘ তো অবাক৷ অরণ্য ভ্রমণ শেষে, স্বীকার করল, ‘‘হ্যাঁ, ভাই আমার দিন শেষ, সত্যই, তুমি এখন জঙ্গলের রাজা৷’’ বাঘ সরে পড়ল৷ শেয়ালের কূটবুদ্ধি৷ শেয়ালের পেছনে বাঘ৷ জঙ্গলের পশুরা সেই বাঘকে দেখেই পালিয়েছে৷ বোকা বাঘ বুঝতে পারেনি৷’
‘এই গল্পটা বলার কারণ?’
‘কারণটা বলব না৷ এখনও অনেকদিন চাকরি করতে হবে৷ শুধু এইটুকু বলব, সব শেয়ালের পেছনে একটা বাঘ আছে৷’
‘তা হলে কী হল—অঙ্কটা এই দাঁড়াল—কাঁঠালের পেছনে শেয়াল, শেয়ালের পেছনে বাঘ৷’
হঠাৎ বাইরে একটা চিৎকার উঠল৷ বালক-কণ্ঠ—‘স্পাইডারম্যান, স্পাইডারম্যান, ও মা, স্পাইডারম্যান, আমাদের দিকে আসছে মা৷’
সেকেন্ড অফিসার উত্তেজিত হয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, ‘এইবার কী হবে, জাল জড়ান অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে৷’
‘কোন দিকে?’
‘দাঁড়ান, পুব দিকটা ঠিক করতে পারলেই বাকি দিক বের করা যাবে৷ পুব দিক মুখ করে দাঁড়িয়ে, হাত দুটো দু-পাশে লম্বা করে তুলে দেব, তারপর ভেরি ইজি—ডান দিকটা দক্ষিণ, বাঁ-দিকটা উত্তর, পেছন দিকটা পশ্চিম৷ মেন হল—পূর্ব দিক, যেদিকে সূর্য ওঠে৷’
বাইরে চিৎকার, ‘স্পাইডারম্যান গির গিয়া, গির গিয়া৷’
টিভির তিনজন ক্যামেরা নিয়ে দরজা দিয়ে তেড়ে বেরোতে গিয়ে জড়ামড়ি করে তাল পাকিয়ে গেলেন৷ ওপাশের মাঠে রক্তদান শিবিরের মাইক তারস্বরে বেজে উঠেছে—‘হ্যালো, হ্যালো, চেক, চেক৷’ হেডস্যারের করুণ গলা—‘আমার জাল, আমার জাল, মগরার চাঁদ ফকির আমাকে মন্ত্র পড়ে দিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন, এটা মাছ ধরার জাল নয়, ভগবান ধরা জাল৷ রাত বারোটায় মাথার ওপর দিয়ে ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরিয়ে উত্তর দিকে ছুঁড়ে দিবি৷ ঝপাং৷ দেখবি, একদিন না একদিন তোর জালে ভগবান পড়েছেন৷ ও হো, সেই জাল, সেই জাল! স্পাইডারম্যান নিয়ে পালাচ্ছে৷’
ও.সি বেশ একটু ধমকের সুরে বললেন, ‘চুপ, চুপ৷ চেল্লানোটা একটা ন্যাশন্যাল হ্যাবিটে পরিণত হচ্ছে৷ আপনি কী বললেন, মনসা মঙ্গলের চাঁদ ফকির এখনও বেঁচে আছেন?’
হেডস্যার রেগে গেছেন৷ সব সহ্য করতে পারেন, কেউ পড়া না পারলে ভীষণ রেগে যান৷ হেডস্যার বললেন, ‘চাঁদ সদাগর আর চাঁদ ফকির এক লোক হল? কান শুনতে, ধান৷’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে আপনি পাঁচটা নম্বর কেটে নিন, তবে ফেল করাতে পারবেন না৷ নামটা ঠিক বলেছি, টাইটেলে ভুল৷ চাঁদবাবু বললে কী করতেন? থার্ড আম্পায়ার কিন্তু আপনি কি বললেন নিজেই জানেন না৷ জালটা দিয়ে চাঁদ সদাগর কী বললেন আপনাকে?’
‘উঃ, সদাগর নয়, সদাগর নয়, ফকির৷’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ আপনি চাঁদটা ধরে থাকুন৷ চাঁদ বলেছিলেন, একদিন না একদিন জালে ভগবান পড়বেন৷
সেই ভগবান আপনার জালে পড়েছেন৷ কোনো চোর এত ক্যাবলা নয় যে জালে পড়বে৷ গীতার কোনো এক জায়গায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ভক্তের জালে আমি ইচ্ছে করে ধরা দি৷ আমি ভক্তের ভগবান৷ ভক্তের জন্যে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি৷’
হেডস্যার চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘কী বলছেন আপনি, কী বলছেন? আমাকে একটু ধরবেন, আমার শরীর কাঁপছে৷ আমি কিন্তু পড়ে যেতে পারি৷’
‘এখন আপনাকে ধীর, স্থির থাকতে হবে৷ খোলা চোখে দেখতে হবে, ভগবান কোন রূপে ধরা দিয়েছেন৷’
‘আপনি পুলিশ-অফিসার, আপনিও ভগবান বিশ্বাসী?’
‘ওসব কথা পরে হবে, আগে ভগবানকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করি৷ চোর বললে পেটাবে, ভগবান বললে এখুনি দশটা লোক পদপিষ্ট হয়ে মরবে, আর আমাকে পাঠিয়ে দেবে অজগাঁয়ে৷’
হেডস্যার বললেন, ‘ফুল, বেলপাতা, গঙ্গাজল, নৈবেদ্য, কাঁসর, ঘণ্টা, ধূপ, দীপ—এই সব আনব?’
‘একদম ব্যস্ত হবেন না৷ কোন ঘরের ভগবান সেটা আগে চিনতে হবে৷ ভগবানের দুটি জাত—বেলপাতা আর তুলসীপাতা৷ সেটা আগে দেখতে হবে৷ হঠাৎ পুজো করলে হবে? ভগবানকে স্নান করাতে হবে, বস্ত্র পরাতে হবে, সিংহাসনে বসাতে হবে৷ এ তো এতটুকু ভগবান নয়, বেশ বড়সড়৷ তাহলে সিংহাসনটা কত বড় হবে—একবার ভেবে দেখুন৷ এই হাতল ভাঙা চেয়ারটাকে ঢাকাঢুকি দিয়ে কাজ চালানো যেতে পারে৷ সে সব পরে৷’
বাইরে তখন বিরাট উত্তেজনা৷ ভিড় বাড়ছে, ভিড় কমছে৷ টিভি দিদিমণি একজনের বাইট নিচ্ছেন৷ এইরকম কথা হচ্ছে৷
‘আপনার নাম?’
‘জনার্দন দলুই৷’
‘কী করেন?’
‘অনেক কিছু করার ইচ্ছে আছে, দেখি কী করা যায়৷’
‘এখানে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন?’
‘অনেকক্ষণ৷’
‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’
‘শুনলুম এখানে স্পাইডারম্যানের শুটিং হচ্ছে৷ বাড়ির দেয়াল বেয়ে সাততলায় উঠে যাবে৷’
ছয়
উৎকট শব্দ৷ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে একটা মোটরবাইক আসছে৷
সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘এই রে খোকাবাবু আসছে৷’
ওসি বললেন, ‘আসছে আসুক৷ আমরা তো থানায় নেই৷ যদি ভাঙচুর করতে চায় তো এই বাড়িটাই ভাঙবে৷ পাঁচিল, দেয়াল৷ কাঁঠালটা তুলে নিয়ে যাবে৷ ওই সুন্দর কলার কাঁদিটা গাছ থেকে নামাবে৷ কাচের জিনিসপত্তর খুব পছন্দ করে৷ এখানে কাচ তেমন নেই৷ ওদের সবচেয়ে পছন্দের হল গাড়ি৷ গাড়ি এখানে একটাও নেই৷’
হেডস্যার একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ‘কাঁঠালটাকে কম্বল চাপা দিয়ে আসব!’
ওসি বললেন, ‘কষ্ট পাবে৷ গরম হবে৷ শীতকাল হলে কথা ছিল না৷’
‘কলার কাঁদিটা?’
‘কিচ্ছু করার নেই৷ ধরে নিন, ওটা গেছে৷ ও তো একা আসছে না৷ সঙ্গে বুড়ো৷’
পেল্লায় বাইক, উৎকট আওয়াজ৷ খোকা আর বুড়ো৷ খোকা বলছে ‘ব্যাপারটা কী৷ এত আনন্দ কীসের? টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি! স্যার কোথায়৷ বাঃ, কলার কাঁদিটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল৷ একেবারে ফ্রেশ৷ কেমন যেন নিজেকে হনুমান, হনুমান মনে হচ্ছে৷ বুড়ো! তোর হচ্ছে না?’
‘আমার চোখ পেয়ারার দিকে৷ গাছটা একবার দ্যাখ৷ কাশীর পেয়ারা৷ কলমের গাছ৷ হাত বাড়ালেই৷ শুনেছিস তো, আপেলের চেয়ে পেয়ারার গুণ বেশি৷ পাকা টুসটুসে৷ ঝটাপট দশ-বারোটা তুলে আনি৷’
‘ধীরে বস, ধীরে৷ এখনি উতলা হয়ে ভবিষ্যৎটা নষ্ট কোরো না৷ আমাদের সবাই রেসপেক্ট করে৷ আমরা সহায়ের শত্রু, অসহায়ের বন্ধু৷ ইয়াদ রাখ না৷’
টেলিভিশানের মেয়েটি ও.সি-কে জিগ্যেস করলেন, ‘এরা কে?’
‘এরা? এরা হল, রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে-র কেষ্ট৷’
‘একটা বাইট নোবো?’
‘এখন না৷ আগে ওরা কী করে দেখা যাক৷ আপনাদের গাড়িটা কোথায়?’
‘ওপাশের বড় রাস্তায়৷’
‘যাক, খানিকটা সেফ৷ দৌড়তে পারেন?’
‘পারি৷ এই তো কালই, প্রায় এক মাইল দৌড়লুম৷ আমাদের ক্যামেরাম্যান বিভাস একটা খানায় পড়ে গেল৷ কিছু হয়নি৷ কারণ আর একটা চ্যানেলের একজন আগেই ওর মধ্যে পড়েছিল৷’
খোকা আর বুড়ো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ খোকা বেশ মোটা-সোটা৷ বুড়ো রোগা৷ লম্বা৷ সে ওপরদিকটা সামলায়৷ অ্যাকশান সব সময় গ্রাউন্ডে হবে এমন কোনো কথা নেই৷ যে-কোনো হাইটে হতে পারে৷ এই তো পশুপতি কলেজে ক’দিন আগে যা হল৷ একপক্ষ গাছের ডালে-ডালে, আর এক পক্ষ ব্যালকনিতে৷ অমৃতভোগ আমের আঘাতে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের চশমার কাচ ভেঙে, একটা টুকরো চোখে ঢুকে গেল৷ বুদ্ধিমান মানুষ৷ পুরো শরীরটা ইনসিওর করিয়ে তবে দায়িত্ব নিয়েছেন৷ আগের অধ্যক্ষ সেই কাজটি করেননি৷ তিনি লেখাপড়া যা শিখেছিলেন সব ভুলে গেছেন৷ কেউ কিছু জিগ্যেস করলে, কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ফিক্ করে হেসে বলবেন, ‘হাট্টিমা টিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং, হাট্টিমা টিম টিম৷’ প্রচণ্ড গরমে সার্জের সুট পরে ঘুরে বেড়ান৷ নিজেকে বলেন, ‘আমি ডক্টর হ্যামিলটন৷ নেকটাই, সেফ্টিপিন, এই সব আমাদের আবিষ্কার৷’
সেদিন আম্রযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অধ্যাপকরা প্রচুর অমৃতভোগ আম খেয়েছিলেন৷ প্রত্যেকে বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিলেন৷ পলাশীর যুদ্ধ হয়েছিল আমগাছের তলায় তলায়৷ এই যুদ্ধটা হয়েছিল আমগাছের মাথায়৷ আমগাছের ডালে এ-কালের ক্লাইভ বুড়ো৷
খোকা জালে জড়ানো ছেলেটিকে ভালো করে দেখে বললে, ‘এ কী রে, এ তো আমাদের সরোজ৷’
তারপর এদিকে ফিরে বললে, ‘এ আপনারা কী করেছেন? সরোজকে জালে ফেলেছেন?’
‘কে সরোজ? কত বড় বড় লোক, বিজনেস ম্যান, মন্ত্রী, সান্ত্রী জালে পড়ে জেল খাটছে!’
‘এই সরোজকে একদিন চতুর্দোলায় চাপিয়ে, ব্যান্ড বাজিয়ে বিমান বন্দর থেকে আনতে হবে, গলায় দুলবে অলিম্পিক স্বর্ণপদক৷ সরোজ আমাদের জাতির গৌরব৷ কত বড় অ্যাথলিট৷ এক লাফে ছ’ফিট, সাত ফিট পাঁচিল টপকে যেতে পারে৷’
ও.সি বললেন, ‘এর কোনো প্রমাণ আছে? সলিড প্রুফ৷ কোনো পদক? মানপত্র?’
‘থাকলেও থাকতে পারে৷ আজ যদি থাকে, কাল, মানে আগামী দিনে ঝুড়ি ঝুড়ি পদকে ও বিভূষিত হবে৷ খেল রত্ন, অর্জুন পুরস্কার পাবেই পাবে৷ আজ যাকে জালে জড়িয়ে সারাটা রাত বাড়ির বাইরে মশার কামড়ে, অবহেলায় ফেলে রেখেছেন, সে যে আমাদের ভবিষ্যতের ভারত রত্ন, জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে—উঠে দাঁড়ান, উঠে দাঁড়ান, জাতীয় সঙ্গীত৷’
‘কী আশ্চর্য! দাঁড়িয়েই তো আছি৷’
‘তা হলে বসে পড়ুন৷ বুড়ো, বুড়ো৷’
‘ইয়েস বস্৷ পাশেই রয়েছি৷’
‘সরোজকে জাল কেটে মুক্ত করো৷’
হেডস্যার বললেন, ‘বাবা, তোমরা আমার ছেলের মতো৷ পুত্রবৎ৷ দয়া করো৷...’
খোকা কথা শেষ করতে না দিয়েই বললে, ‘দয়া, মায়া, দান, কৃপা মানুষকে দুর্বল করে৷ ন জায়কে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং ভূত্বাছ ভবিতা বা ন ভূয়ঃ...৷’
বুড়ো ধড়ফড় করে বলল, ‘বস, বস! ও কোটেশনটা এখানে যাবে না৷’
‘তা হলে কোনটা যাবে৷’
‘এখানে কিছুই যাবে না৷ স্যার দয়া করতে বলছেন৷ কী দয়া? সেইটা জানতে হবে৷’
খোকা বললে, ‘বলুন স্যার, কী জাতীয় দয়া? জীবে দয়া করে সেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর৷’
বুড়ো বলল, ‘গুড৷ একেবারে ঠিক কোটেশান৷’
হেডস্যার বললেন, ‘জালটা কাটাকুটি কোরো না৷ ওই জালটা আমার ব্যায়ামের জাল৷’
‘সে আবার কী? ব্যায়ামের ডাম্বেল, বারবেল হয়৷ আর ম্যাজিশিয়ানদের কাছে একরকম জাল থাকে, ইন্দ্রজাল৷ সে জাল দেখা যায় না৷ আর বইয়ে পড়েছি মায়াজাল৷ ব্যায়ামের জালটা কী জিনিস স্যার?’
‘ওটা একটু বোঝাতে হবে৷ একদিন আমার ডান কাঁধে খট্ করে একটা শব্দ হল৷ ডান হাতটা ওপর দিকে আর তুলতে পারি না৷ কী সমস্যা! ওপরের তাকে কৌটো ভরতি নারকোল নাড়ু কিন্তুহাত তুলতে পারছি না৷ গাছের ডাল হাতের নাগালে৷ পাকাপাকা পেয়ারা৷ হাত উঠছে না৷’
বুড়ো বললে, ‘ভাববেন না৷ এ দয়া নয়৷ এক সময়ের ছাত্র হিসেবে এ আমাদের কর্তব্য৷ যাওয়ার আগে সব পেয়ারা পেড়ে নিয়ে যাব, নাড়ুর কৌটো নামিয়ে দেব৷ আচার-টাচার থাকলে, সে ব্যবস্থাও হবে৷ পরোপকার আমাদের ব্রত৷’
খোকন গড়গড় করে বলতে লাগল, ‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি...৷’
বুড়ো হাঁ-হাঁ করে উঠল, ‘না-না, ওটা না, ওটা না৷’
হেডস্যার বললেন, ‘না, না, এখন আমার হাত উঠছে৷ একদম মাথার ওপর উঠছে৷ তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ঘুরছে, হল জাল ব্যায়ামের ফলে৷’
খোকা বললে, ‘স্যার, এ দেশটা জালে ভরা৷ জাল টাকা, জাল ওষুধ, জাল ডিগ্রি, জাল পাসপোর্ট, জাল আর জালিয়াতি৷ জাল ব্যায়ামে যা হয়েছে মনে কচ্ছেন, তা হয়নি৷ ওটা আসল হওয়া নয়৷ আবার দেখবেন কাঁধের কাছে খট করে শব্দ হয়ে হাত আটকে গেছে৷’
স্যার বললেন, ‘তোমাকে বোঝাতে পারছি না৷ জাল দিয়ে ব্যায়াম৷’
‘একদম না, ওসব একদম না, দুধ জাল দিন, রস মানে খেজুর রস জাল দিন, ব্যায়ামে জাল দেবেন না৷ কোথায় কী হয়ে যাবে, কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷’
স্যার অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘ভালো করে শোনো জালটাকে আমি মাথার ওপর আকাশে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে...’
খোকা বললে, ‘একটা জাল জিনিসকে মাথার ওপর ঘোরালেই আসল হয়ে যাবে? হাজার টাকার জাল নোট মাথার ওপর ঘোরালেই আসল হয়ে যাবে?’
স্যার বললেন, ‘আরে বাপু, জালটা তুমি ভুলে যাও, হাত ঘোরানোটাই আসল৷ ওইটাই ব্যায়াম৷ একটা কিছু হাতে থাকলে ঘোরানোটা ঠিক ঠিক হবে৷ সে একটা চাবুক থাকলেও হবে৷ জমিদারি চাবুক, ইংরেজ আমলের সায়েবদের চাবুক আমি কোথায় পাব?’
‘আরে বাবা, আপনি আমাকে বলবেন তো! খোকা পারে না, এমন কিছু পৃথিবীতে নেই৷ বুড়োকে জিগ্যেস করুন৷ আমেরিকার টেক্সাসের কাউবয়রা যে ‘ল্যাসো’ ব্যবহার করে, ঘোড়ার পিঠে বসে মাথার ওপরে পাঁই পাঁই করে ঘোরাচ্ছে, সেই ল্যাসো আমি আপনাকে আনিয়ে দেব৷’
ওসি বললেন, ‘কোথা থেকে আনাবে? আমার একটা চাই৷’
‘পাবেন৷ নেট, নেট থেকে৷ ও বলে দিলেই হোম ডেলিভারি৷ আলেকজান্ডারের তরোয়াল, তৈমুরলঙের শিরস্ত্রাণ, জুলিয়াস সিজারের বল্লম, আবার লক্ষ্মীর পাঁচালি, মনসামঙ্গল কাব্য, নামাবলী, খড়ম, হুঁকো-কল্কে, আন্ডারওয়ারে পরাবার দড়ি, কলাপাতা, ময়ূরপুচ্ছ, বাবুই পাখির বাসা, সেট করা পঞ্চমুণ্ডির আসন, গঙ্গা, সিন্ধু, নর্মদা, মানস সরোবরের জল...৷’
ওসি বললেন, ‘বুঝেছি, বুঝেছি৷ এর পরে মরা মানুষকেও ফিরিয়ে আনা যাবে৷’
খোকা বললে, ‘আমি তো মাঝে মাঝেই মালপো আনিয়ে খাই৷’
‘আমাকেও দিতে পারো, তাহলে আমাদের দুজনের সম্পর্কটা মধুর হবে৷’
‘ওটা কোনো ব্যাপার না, আজই পৌঁছে যাবে৷ তাহলে আমরা সরোজকে মুক্ত করি৷’
‘তোমরা ধারে কাছে যাবে না৷ বাইরে পাবলিক৷ তোমাদের দুজনকে সবাই একটু অন্যভাবে চেনে তাই না?’
‘সে তো আপনাদের কেরামতি৷ আমরা নাকি সমাজবিরোধী! আর চোলাই সম্রাট জগু শিব-পুত্র, পরম ধার্মিক৷’
‘জাল থেকে মুক্ত করে দিলে ও কি লাফ মেরে জঙ্গলে পালাবে?’
‘মনে হয় না৷ পালাবে না কারণ ও মানকচু খায়৷’
‘মানকচু খেলে কী হয়?’
‘রক্ত পরিষ্কার হয়৷ রক্ত পরিষ্কার হলে বুদ্ধি পরিষ্কার হয়৷ ভদ্রলোক হয়৷ অসুখ-টসুখ কম হয়৷ চর্মরোগ হয় না৷ খিদে কমে, হজম বাড়ে৷’
‘আমিও তো খেতে পারি!’
‘পারি মানে? আপনার অবশ্যই খাওয়া উচিত৷ শিলে বেটে, নারকোল কোরা দিয়ে দু-থালা ভাত, এক থালায় হবে না৷’
‘তা হলে এইবার জালমুক্ত করা যাক৷’
‘প্রকাশ্য স্থানে করবেন? ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে আসি৷’
‘ভালো প্রস্তাব৷’
ঠং ঠং করে একটা ধাতব শব্দ৷ সবাই ফিরে তাকালেন৷ জটাজূটধারী বিপুল এক সন্ন্যাসী শানের মেঝেতে ত্রিশূল ঠুকতে ঠুকতে আসছেন৷ সকলেই অবাক৷ এদিকের মানুষ বেশিরভাগই রোগাপটকা৷ মোটাও কিছু আছে—থ্যাসথ্যাসে, থ্যাপ্ থ্যাপ্ করে হাঁটে৷ যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে৷ জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিয়ে আবার কয়েক পা হাঁটে৷ সকলের দিকেই সন্দেহের দৃষ্টি৷ একটাই প্রশ্ন, ‘‘চললে কোথায় এমন হন্তদন্ত হয়ে!’’ কেউ উত্তর দেয় না৷
সাধু দৃপ্তভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ প্রশ্ন করলেন, ‘এইটাই কি সেই স্থান?’
ও.সি বললে, ‘একটু বিস্তারিত করুন৷ সেই স্থান, কোন স্থান?’
‘অবশ্যই, অবশ্যই—যে স্থানে শুদ্ধ, সাত্ত্বিক এক শিক্ষক বসবাস করেন৷ এক সময় তাঁর পরিবার, পরিজন অনেকে ছিলেন, এখন তিনি একা৷ তাঁর অনামিকায় একটি সোনার আংটি আছে৷ সেটি তিনি তাঁর বিবাহের রাতে ধারণ করেছিলেন কিন্তু তিন দিনের জ্বরে স্ত্রী বিয়োগ হল৷ একমাত্র পুত্র সপ্তম বর্ষে দুর্ঘটনায় মৃত্যুমুখে পতিত হল৷ একা, এখন একেবারে একা৷ একটা সাদা বেড়াল ছিল, সেটাও চলে গেল৷ জবা গাছে আর ফুল হয় না৷ অভিশাপ, অভিশাপ৷ ব্যোম শঙ্কর৷’
হঠাৎ এত জোরে ‘শঙ্কর’ বললেন, একটা টুসটুসে পাকা পেয়ারা খসে পড়ল৷ বুড়ো দৌড়বার চেষ্টা করেছিল৷ খোকা হাতটা চেপে ধরে বললে, ‘সংযম, সংযম৷’
সাধু বললেন, ‘অবশ্যই, অবশ্যই৷ সংযমই একালের যুবকদের মূল মন্ত্র হওয়া উচিত৷ কত পাকা ফল খসে খসে পড়বে৷ সব ফলের সেরা ফল কর্ম ফল৷’
বুড়ো জিগ্যেস করলে, ‘মহারাজা! গাছের ফল কি তাহলে কিছুই নয়?’
‘এই প্রশ্ন অতি উত্তম প্রশ্ন৷ এই নব্যযুবকের কৌতূহলের আমি প্রশংসা করি তবে এই মুহূর্তে এখানে আলোচনার বিষয় নয়৷ শুধু এইটি শুনে রাখো গাছের ফলের মধ্যে যে-রস, যে-স্বাদ সেইটিই তার কর্মফল৷’
‘মহারাজ! পেয়ারার বিচি কি তাহলে পেয়ারার কর্মফল?’
‘বালক! তুমি বুদ্ধিমান, এবং রসিক৷ এখন, আমি কেন এসেছি, কোথা থেকে এসেছি, অবশ্যই বলা প্রয়োজন৷ আমি স্বপ্ন দেখেছি৷ মহাদেবের বিভিন্ন রূপ৷ একটি রূপ জলেশ্বর, এইবার এই স্থানে তিনি আবির্ভূত হলেন, জালেশ্বর রূপে৷ এইটি তাঁর একেবারে নতুন রূপ৷’
‘তার মানে জালে মহাদেব পড়েছেন?’
ও.সি-র প্রশ্নে মহারাজ মৃদু হেসে বললেন, ‘আরও একটু ভাবতে হবে বাবাজীবন৷ জাল যখন ঈশ্বর তখনই তিনি জালেশ্বর৷ অতএত এই জালটিই ঈশ্বর, তিনি শিব৷ তিনিই কৃপা করে ওই জীবটিকে ধরেছেন৷ এইবার শিব যাকে ধরেন, সে মুক্তিলাভ করে৷’
ওসি বললেন, ‘মুক্তি মানে মৃত্যু?’
মহারাজ একটুকরো হেসে বললেন, ‘অর্বাচীন৷ কারাগার থেকে যারা মুক্তি লাভ করছে, তারা কি মরে যাচ্ছে? মুক্তি মানে সংসারের জাল থেকে মুক্তি, জালিয়াতি থেকে মুক্তি৷’
ও.সি বললেন, ‘সবই তো হল মহারাজ, এখন একটি সমস্যার সমাধান করুন৷’
‘কী সমস্যা?’
‘জাল যে বিস্তার করে, অর্থাৎ জাল ফেলে সেই তো জালিয়াত৷ তাহলে সেই সূত্রে আমাদের হেডস্যার জালিয়াত৷ আর এই জাল, জালের ভেতরে যে, আর জাল ফেলেছেন যিনি অর্থাৎ আমাদের শ্রদ্ধেয় হেডস্যার এই তিনটিই আপাতত পুলিশের সম্পত্তি৷’
‘চতুর্থটির কথা বলুন৷ সবচেয়ে বড় জাল তো পুলিশের কাছে৷ পুলিশ হল জালের জাল মহাজাল৷’
‘তাহলে তিনজনকেই থানায় নিয়ে যেতে হয়৷’
খোকা বললে, ‘স্টেপ বাই স্টেপ এগোতে হবে৷ প্রথমে, আবরণ উন্মোচন, অর্থাৎ জাল তোলা৷ জাল না তুললে অতল জলে তলিয়ে যায়৷’
ও.সি জিগ্যেস করলেন, ‘কে তুলবে?’
মহারাজ বললেন, ‘বাবাজীবন! যে ফেলে সেই তোলে৷ জাল ফেলে জলে বসে আছে জেলে৷’
‘আপনি কি এখন গান শুরু করবেন?’
‘ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই বাবাজীবন৷ আমার পঞ্চা নেই৷ আমি গান লিখি, সুর করি, সে গায়, তার কাছেই আমার একতারা৷ এখানে এখন যদি আমরা গানের আসর বসাই, ভিড় সামলাবার জন্যে আপনাকে পুলিশ ডাকতে হবে৷’
‘কী আশ্চর্য কথা কইলেন আপনি? আমিই তো পুলিশ!’
‘না, না, তুমি পুলিশ নও৷’
‘মানে? আমি জালিয়াত?’
‘বাবাজীবন! আমরা সবাই তাই৷ যে যা নই, তাই হবার চেষ্টা করি৷ এক এক সাজে নিজেকে সাজাই৷ তুমি প্রেমিক৷ তোমার ভেতরে প্রেমের সাগর৷ রাজকার্য তোমার ভালো লাগে না৷ জীবের দুঃখে তোমার হৃদয় কাঁদে৷’
‘আমার জীব মানে—একগাদা চোর, গুন্ডা, মাতাল৷’
‘ভগবান, সব ভগবান, বহুরূপে সম্মুখে তোমার৷’
খোকা লাফিয়ে উঠল, ‘আমি, আমি, আমি বলব,
ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়,
মন প্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে, এ সবার পায়৷
বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর৷
বুড়ো! এইবার ঠিক আছে৷’
‘একদম৷ একবারে চাঁদমারি৷ স্যার রয়েছেন, আমি আর কী বলব? একশোতে একশো?’
ও.সি বললেন, ‘এইবার তাহলে রাজকাজ শুরু করি?’
‘অবশ্য, অবশ্য৷’
‘তাহলে মাছ ধরার দিক থেকেই আসি৷ জালে মাছ পড়লে, জাল তুলে দেখা হয় কী মাছ৷ অনেক সময় হাঙরও পড়তে পারে৷ এখন যে যুবকটি জালবদ্ধ হয়েছে, যে কোন শ্রেণির বক?’
খোকা বললে, ‘আমি তো আপনাকে আগেই বললুম, ও একটি পদক—গোল্ড, সিলভার, অথবা ব্রোঞ্জ৷’
‘তাহলে ছাড়াও৷ ছাল না ছাড়িয়ে আসামীকে জাল থেকে ছাড়াও৷’
বুড়ো বললে, ‘অনেকক্ষণ ধরে সেই চেষ্টা করছি৷ ফাঁস আটকে গেছে৷ টানাটানি করলে আরও আটকে যাচ্ছে৷’
সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘ফাঁসের ধর্মই হল যত টানবে ততই আঁট হয়ে বসে যাবে—মৃত্যু৷’
‘মৃত্যু মানে?’
‘জিভ লম্বা৷ ফাঁস থেকেই তো ফাঁসি৷’
ও.সি এইবার ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে বললেন, ‘এইবার দেখছি আর চাকরি নয়, আমার প্রাণটাই যাবে৷ ছেলেটা মারা গেলে আইন আমাকে ছাড়বে?’
সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘ফাঁসির সময় ফাঁসটা লাগানো হয় গলায়৷ এর ফাঁসটা কি গলায়?’
‘না, মাথার অনেকটা ওপরে৷ যাক বাবা, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি৷ চোর ধরতে এসে কী বিপদ! এখন দেখছি না ধরাই ভালো৷’
মহারাজ বললেন, ‘ফাঁস খোলার কায়দাটা হল আলগা হাতে এ-পাশে, ওপাশে নাড়াতে নাড়াতে একসময় ফুস্৷ ফুস করে খুলে যাবে৷’
‘তা সেইটা করা হচ্ছে না কেন? করুন, সবাই মিলে এক একবার নাড়ান৷’
বুড়ো বললে, ‘একটা বড় টুল চাই৷’
‘টুল চাই কেন? একটা সাধারণ জিনিসকে একটা ছেলে কীরকম ইচ্ছে করে জটিল করছে!’
বুড়ো বললে, ‘টুলেও হবে না, ভারা বাঁধতে হবে৷’
‘ব্যাস, হয়ে গেল৷ আমি এর মধ্যে নেই৷ আমি চললুম৷ আপনারা যা পারেন করুন৷’
হেডস্যার বললেন, ‘রাগ করছেন কেন? আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপার৷ তা ছাড়া টিভি এসে গেছে৷’
ও.সি আরও রেগে গিয়ে বললেন, ‘বেশ করেছে৷ আরও আসুক, লাইন দিয়ে আসুক৷ টিভি যেন আধুনিক ভারতের টি.বি!’
‘তা ঠিক! একবার ধরলে আর রক্ষা নাই, হুল ফুটিয়ে ছেড়ে দেবে৷’
‘ঠিক, ঠিক, হুল মানে স্টিং৷ বাবারে৷ চোখের ভেতরে ক্যামেরা৷ মাথার পিছন দিকে ঘাড়ের কাছে ব্যাটারি৷’
মহারাজ বুড়োকে জিগ্যেস করছেন, ‘নবকুমার! ভারা বাঁধতে হবে কেন?’
বুড়ো অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘আমার নাম জানলেন কী করে? আমাকে তো সবাই বুড়ো বলে৷’
‘ও কিছু না, বাদ দাও৷ ওসব হয়, অনেকরকম হয়৷ ভারা বাঁধবে কেন?’
‘ওর ওপর উঠে, জালটাকে টেনে মাথার ওপর তুলে ফাঁসটাকে খোলার চেষ্টা করব৷ না পারলে কাঁচি দিয়ে চুল কাটার মতো কপচে দোবো৷ সেলুন থেকে জগাদাকে না হয় আনব৷’
মহারাজা বুদ্ধদেবের মতো হাতের ভঙ্গি করে বললেন, ‘আমি কী করতে আছি! যা আ আও! গিয়ে দেখো ফাঁস খুলে গেছে৷’
বুড়োর চিৎকার, ‘খুলছে, খুলছে৷ খুল জা সিম সিম৷’
জালটা মাথার ওপর দিয়ে মশারি তোলার মতো তুলতেই কিছু টাকা, আধুলি ঠ্যাংঠাং শব্দে এদিকে ওদিকে গড়িয়ে গেল৷ সরোজের চুল এলোমেলো হয়ে গেল৷ সরোজ একলাফে পাঁচিল টপকে উত্তর দিকের মাঠে গিয়ে পড়ল৷ রাস্তা পূর্ব দিকে৷ সেখানে অনেক লোক মজা দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে৷ সরোজ তিরবেগে ছুটছে৷ দারোগাবাবুর আর্তনাদ, ‘ওরে বাবারে—পালাচ্ছে রে! সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে৷ মজা দেখছে৷ আসামী ভাগতা হ্যায়, আর সব লোক দাঁড়াকে, দাঁড়াকে দেখতা হ্যায়! এসব খোকার কারসাজি৷’
খোকা হা হা করে হাসতে হাসতে বললে, ‘পালায়নি, পালায়নি৷ বুড়ো লম্বা একটি দড়ি চাই, দড়ি৷’
ও.সি বললেন, ‘এখানে যারা দাঁড়িয়ে মজা দেখছে, তাদের অ্যান্ডারওয়্যারের দড়ি খুলে নাও৷’
বুড়ো বললে, ‘স্যার, আপনার এই কাপড় শুকোতে দেওয়ার দড়িটা খুলে নিচ্ছি৷’
দুজনে দড়িটা নিয়ে মাঠে নেমে গেলে৷ দারোগাবাবু চিৎকার করে বললেন, ‘আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়ে এসো৷’ টিভিকে বললেন, ‘ক্যামেরা রেডি করুন৷ একটা শটও মিস করবেন না৷ এই অপারেশানটার একটা নাম দিন৷ কী নাম দেওয়া যায়—‘অপারেশান ক্যাঙ্গারু’৷ খোকা বললে, ‘বুড়ো, ও এবার এদিকে আসছে, দড়িটা টানটান করে ধর৷ এইটা হল দৌড়ের শেষ ফিতে৷ স্পোর্টসে যেমন থাকে৷ বুকটা ঠেকালেই দৌড় শেষ৷ অনেকটা সরে যা৷ একদিকে আমি, একদিকে তুই৷ ধর টান টান করে৷ আসছে, আসছে৷ চিৎকার কর৷ উৎসাহ দে৷ ‘বহুত আচ্ছা, বহুত আচ্ছা৷ শাবাশ, শাবাশ৷’
ঝড়ের বেগে সরোজ আসছে৷ জনতার হাততালি৷ কোথা থেকে পুঁচকে, পুঁচকে দুটো ছেলে এসেছে৷ তারাও দৌড়চ্ছে৷ দূরের রক্তদান শিবিরে গান বাজছে৷ আকাশে এক ঝাঁক পোষা পায়রা চক্কর মারছে৷ কারোর বাড়ির ছাত ঢালাই হচ্ছে৷ কংক্রিট মিক্সারের শব্দ৷ সরোজ আসছে৷ একটা পুঁচকে প্রায় ধরে ফেলেছে৷ কে হারে কে জেতে৷ সবাই বাচ্চাটাকে উৎসাহ দিচ্ছে৷ বাচ্চাটার নামও রেখে ফেলেছে—‘বুলেট’৷
‘শাবাশ বুলেট, শাবাশ, শাবাশ!’
নাঃ, একটুর জন্যে, সরোজ দড়িতে বুক ঠেকিয়ে দিল৷ বাচ্চাটা দড়ির তলা দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ সরোজ হাঁপাতে হাঁপাতে জিগ্যেস করল, ‘টাইম টাইম? ক’মিনিট, ক’সেকেন্ড? টু হান্ড্রেড মিটারস!’
বুড়ো বললে, ‘এটা ঘড়ি ছাড়া হল৷ তবে আর একটু হলে, বাচ্চাটা মেরে দিচ্ছিল৷’
সরোজ বললে, ‘সে গেল কোথায়? আর একবার হয়ে যাক৷’
‘হবে হবে, আগে পুলিশ আর টিভিকে ছেড়ে আসি৷ অনেকক্ষণ বকর বকর করছে৷’
সরোজ বসামাত্রই ক্যামেরা বার কতক চমকাল৷ ও.সি জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি কী উদ্দেশে স্যারের বাড়িতে মাঝরাতে ঢুকলে?’
‘আমি তো রোজই ঢুকি৷ কখনও কখনও সারারাত থাকি৷’
‘সে কী? কারণটা কী? মতলবটা কী?’
‘স্টিপল চেজ কাকে বলে জানেন?’
‘হেবিয়াস কর্পাস কাকে বলে তুমি জানো?’
‘ডেকাথেলন কাকে বলে জানেন?’
‘সুওমটো কাকে বলে জানো?’
বুড়ো বললে, ‘এই রকম করলে এই কেসটার বারোটা বেজে যাবে৷’
খোকা বলল, ‘ও স্পোর্টসের কথা বলছে৷ স্টিপল চেজ হল এক ধরনের দৌড়৷ দু-মাইল বাধা টপকে টপকে দৌড়তে হবে৷ এক একটা বাধার উচ্চতা তিন ফুট৷ সব শেষে জল—ঝপাং৷’
আমি টিভিতে দেখেছি তো৷ ও আমাকে নতুন কী শেখাবে!’
সরোজ বললে, ‘আমি কারোকে কিছু শেখাতে চাই না৷ বেশি কথাও বলব না৷ আমার গুরুদেব আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন৷’
‘কে গুরুদেব?’
‘মহারাজ৷’
‘কী মন্ত্র? তোমার ইষ্ট কে?’
‘বলব কেন?’
‘আমি তোমাকে জেরা করছি৷ সরকারি ক্ষমতা বলে৷ বলতে তুমি বাধ্য৷’
মহারাজ বললেন, ‘মেজাজ খারাপ করবেন না৷ আমি বলছি৷ আমি ওর স্পোর্টস গুরু৷’
‘তবেই হয়েছে! আপনি স্পোর্টসের কী জানেন?’
‘আমি অর্জুন৷ তিরন্দাজ৷ দয়া করে টুপিটা পরে একবার বাইরে চলুন৷ তির মেরে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পেয়ারা গাছের গুঁড়িতে আটকে দোবো৷’
‘থাক, দিনকাল ভালো নয়, বেশি বীরত্ব দেখাতে হবে না৷ আপনার এই শিষ্যের কথা বলুন৷’
আমি ওকে হরিদ্বারের কংখলে পেয়েছি৷ বসে আছি আমলকী বৃক্ষের তলে৷ দেখছি একটি ছেলেকে কুকুরে তাড়া করেছে৷ সে আমার পাশ দিয়ে ধুলোর মতো উড়ে চলে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, এ ছেলে ভারতকে স্বর্ণপদক এনে দেবে৷ খপ করে হাতটা চেপে ধরলুম৷ সোজা পাতিয়ালায়৷ মহারাজকে আমি টেনিস খেলা শেখাতুম৷ ওখানে আমার একটা কেন্দ্র আছে৷ সেখানে সুস্থ, সুন্দর মানুষ তৈরি হয়৷ সরোজকে আমি ট্রেনিং দিতে শুরু করলুম৷ দৌড়৷ দৌড়লে যেমন দেহ-গঠন হয়, সেইরকম মনও পরিষ্কার হয়৷’
টিভির মেয়েটি বললে, ‘মহারাজ, মহারাজ! এক সেকেন্ড৷ আমরা এই বিষয়ে আপনার একটা বাইট নোবো৷ দেহ আর মন৷’
‘ল্যাপেলটা পাচ্ছি না৷’
‘পাচ্ছি না মানে?’
‘এর আগে যাকে ইন্টারভিউ করেছ, তার জামাতেই মনে হয় আটকানো আছে৷ খোলা হয়নি৷’
ও.সি বললেন, ‘বাঁচা গেছে৷’
খোকা বললে, ‘হেলদি মাইন্ড ইন এ হেলদি বডি৷ খোকা! যে কোটেশানটা ঝাড়লুম, ঠিক আছে?’
‘একদম৷’
ও.সি বললেন, ‘সরোজকে জেরা করতে চাই৷ তুমি রাত-বিরেতে এই বাড়িতে ঢোকো কেন?’
‘এইখানে আমি প্র্যাকটিস করি৷ স্যারের পাঁচিলটা ঠিক তিন ফুট উঁচু৷ স্টিপলচেজের হার্ডলও তিন ফুট উঁচু৷ আমি রোজ রাতে চব্বিশবার এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিকে লাফাই৷’
‘শব্দ হয় না?’
‘স্যার! বেড়াল যখন লাফায়, তখন শব্দ হয়?’
‘অত জানি না৷’
‘ওই সময়টায় স্যার কী করেন?’
‘ধ্যান করেন৷ গভীর ধ্যান৷ বড় একটা মোমবাতি, জ্বলতে জ্বলতে গলে যাচ্ছে৷’
খোকা বললে, ‘আমি বলব, আমি বলব—শমা হর রঙমে জ্বলতি হ্যায়—সহর হোনে তক৷’
বুড়ো বললে, ‘কেয়া বাত, কেয়া বাত, লা জবাব, লা জবাব৷’
ও.সি বললেন, ‘আচ্ছা পাল্লায় পড়া গেল৷ এই চাকরিটা যা জ্বালাচ্ছে!’
সরোজ বললে, ‘বাকিটা শুনতে হলে পেছন দিকে যেতে হবে৷’
হেডস্যারের করুণ গলা, ‘ওদিকটায় আর নাই বা গেলে বাবা!’
সরোজ বললে, ‘কী বলছেন স্যার! কাল সারারাত আমি জলে পড়েছিলাম৷ মায়ের কাছে গিয়ে ভাইয়ের কাছে বসতে পারিনি৷’
ও.সি মহারাজকে জিগ্যেস করলেন, ‘কংখলের পাগলা কুকুরটা কি একে কামড়েছিল?’
সরোজ বললে, ‘ভারতী মা আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন৷ এক বছর দোলের দিন চয়ন ওই পুকুরটায় ডুবে মারা গেল৷’
ও.সি বললেন, ‘কী সব বলছে?’
স্যার বললেন, ‘এ-সব আমার জীবন কথা৷ ভারতী আমার স্ত্রীর নাম—বিদ্যাভারতী৷ চয়ন আমাদের একমাত্র ছেলে৷’
সরোজ বললে, ‘চয়ন আমার বন্ধু, আমার ভাই৷ তাকে বাঁচাতে পারিনি৷ মা বললেন, ‘তুই তো আছিস৷’ কী লাভ হল থেকে? কী লাভ? আমি তো চয়নকে বাঁচাতে পারিনি৷ স্যারের তপোবনে সবাই একবার চলুন৷ স্যারের জালটাও চলুক৷’
জায়গাটা রোদে ভেসে যাচ্ছে৷ সমান করে ছাঁটা সবুজ দূর্বা ঘাস৷ কেয়ারি করা ছোট ছোট ফুলে ভরা গাছ যেন অজস্র হাসিমুখ শিশু৷ কত প্রজাপতি রঙিন কাগজের টুকরোর মতো ভেসে ভেসে চলেছে৷ কাঁঠাল গাছের ঝকঝকে পাতা৷ তলায় শুয়ে আছে একটি কাঁঠাল, কত আদরের! সরোজ বললে, ‘গভীর রাতে আমি আমার ভারতী মা’র কাছে আসি৷ এই গাছে আমার মা থাকে৷ আর ওই ফলটা হল চয়ন৷ আমি ওর তলায় নরম একটা বিছানা করে দিয়েছি৷ রাতে মা একটা প্রদীপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর আমি জায়গাটা পরিষ্কার করি৷ চয়নকে পাহারা দি৷ পোকামাকড় যেন গায়ে না ওঠে৷ ওই যে নীল রঙের জালটা সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ে আছে—ওটা প্রেমের জাল৷ স্যার সারা জীবন ধরে ওই জালে মানুষের চারা ধরে রুই, কাতলা করেছেন৷ জ্ঞানী, গুণী মানুষ ছেঁকে ছেঁকে তুলেছেন৷ এতদিনে সেই জালে আমাকে ধরেছেন৷ মা আমাকে বলেছিলেন, মানুষটার কেউ রইল না রে! তুই একটু দেখিস৷ গভীর রাতে চুপিচুপি এসে পাহারায় বসি৷ কেউ বেঁধে দেয় না, চা করে দেয় না, জামাকাপড় কেচে দেয় না, বিছানা ঝেড়ে দেয় না, জ্বর হলে কপালে হাত রাখে না৷ কেউ বলে না, আমি আছি৷ বয়েস হয়েছে, শরীরের জোর কমছে, ডাকলে কেউ সাড়া দেয় না, রাত বাড়ছে, মোমাবাতির মোম গা বেয়ে গলে গলে পড়ছে৷ স্যার বসে আছেন ধ্যানে৷ রাতের বাতাস ঘুরে গেল ভোরের আলোর দিকে৷ গাছের পাতা চুঁইয়ে কয়েক ফোঁটা জল এসে পড়ল শরীরে৷ মা, তুমি কাঁদছ কেন, আমি তো আছি, আমি এখন থেকে সবসময় থাকব৷ ঠিক সময়ে পৌঁছে দেব তোমার কাছে৷ আর এই যে বাচ্চা দুটো ছুটছিল আমার পেছনে—সমর আর অমর এরা আমার শাগির্দ৷ আমিই ওদের বলব—আমাকে টপকে চলে যা৷ এটা আলোর পৃথিবী, অন্ধকারের নয়, জীবনের পৃথিবী মৃত্যুর নয়৷ The lamps are different, but the light is the same, it come from Beyond. কী? ঠিক বলেছি?
মহারাজ বললেন, ‘আয় এদিকে আশীর্বাদ করি৷’ হেডস্যার এগিয়ে আসছেন৷ দূরত্ব কমছে৷ সরোজকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন৷ ঝপাৎ করে জালটা দুজনের ওপর এসে পড়ল৷ বুড়ো ঘুরিয়ে ছেড়েছে৷ ‘ক্যামেরা ক্যামেরা! টপশট৷ সব্বাইকে চাই, সবটা চাই৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন