দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মহাসাধক, বালানন্দ ব্রহ্মচারীর উপদেশ৷ এ আবার কেমন কথা! দুঃখে মানুষ তো ভেঙে পড়বে৷ তার কিছুই ভালো লাগবে না৷ শীর্ণ, বিষণ্ণ, হা-হুতাশ, দীর্ঘশ্বাস৷ সংসারের একপাশে চাকা ভাঙা ঘোড়ার গাড়ি৷ আমাদের থাকাটা ‘কন্ডিশানাল’৷ জগৎ হাসার সুযোগ দিলে হাসব৷ আবার কাঁদালে কাঁদব৷ দুঃখ পেলে সুখ লাগাব কেমন করে! দুটো চোখে দুটো জলের ‘পাউচ’ ফিট করা আছে৷ দুঃখে কাঁদব বলেই তো!

না, আমার এই গল্পটা শোনো৷ রাজা মন্ত্রীকে জিগ্যেস করলেন, ‘আচ্ছা মন্ত্রী, দুঃখে পড়লে কী করা উচিত?’ মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ! দুঃখ পেলে দুঃখ ভুলে আনন্দ করুন৷ দুঃখ জব্দ হয়ে পালাবে৷’

‘বেশ! তোমার দাওয়াইটা তাহলে যাচাই করা যাক৷ এই সোনার কৌটোটা তোমাকে দিলাম৷ কাছে রাখো৷ যখনই চাইব, তখনই ফেরত দেবে৷ ফেরত দিতে না পারার শাস্তি প্রাণদণ্ড৷’

মন্ত্রী এই রাজাটিকে খুব ভালোই চেনেন৷ বিপদে ফেলার একখানি! মন্ত্রী মতলবটা জানেন৷ কৌটোটা যেখানেই রাখি, রাজার লোক ঠিক চুরি করবে৷ অনেক ভেবে চিন্তে মন্ত্রী নিজের শোওয়ার ঘরের দরজার খিলানে একটা গর্ত করে কৌটোটা তার মধ্যে রেখে এমন ভাবে প্লাস্টার করে দিলেন, বাইরে থেকে কারও বোঝার উপায় রইল না৷

এদিকে রাজা ঢেঁড়া দিয়ে ঘোষণা করালেন, তাঁর একটা কাজ যে করে দিতে পারবে তাকে তিনি এক হাজার টাকা বকশিস দেবেন৷ ঢেঁড়া ধরলে দুজন গণিকা৷

রাজা জিগ্যেস করলেন, ‘তোমরা কে কি পার আগে বলো৷’

একজন বললে, ‘আমি আকাশে ফাঁদ পাততে পারি৷’

আজ একজন বললে, ‘আমি আকাশে ছিদ্র করতে পারি৷’

রাজা দ্বিতীয়টিকে দায়িত্ব দিলেন, ‘আমার একটা সোনার কৌটো মন্ত্রীর কাছে আছে৷ খুব সাবধানে গুপ্ত জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে৷ যেভাবেই হোক সেটাকে উদ্ধার করে আমার হাতে এনে দিতে হবে৷ পারবে?’

‘পারব৷’

‘যদি পারো, নগদ এক হাজার টাকা বকশিস৷’

গণিকা মন্ত্রীর বাড়ির দরজার সামনে বসে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল৷

একদিন, দু-দিন, তিনদিন৷

একদিন মন্ত্রীর খুব দয়া হল, কে এমন কাঁদে, কেন কাঁদে৷

‘তুমি কি কোনও বিপদে পড়েছ? তোমার কী চাই, আমাকে অকপটে বল৷’

গণিকা খুব মোলায়েম করে বললে, ‘বাবা, আমার কোনও কিছুর অভাব নেই, কিন্তু ভীষণ একটা দুঃখ আছে৷ আমার একটি পরমা সুন্দরী মেয়ে ছিল৷ বহুদিন হল সে কোথায় হারিয়ে গেছে৷ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া গেল না৷ বাবা, তোমার বউটি ঠিক আমার সেই মেয়েটির মতো দেখতে৷ তাই তাকে দেখবার জন্যে আমি এখানে বসে কাঁদছি৷’

মন্ত্রী মহোদয় শোকাভিভূত মহিলাকে অন্তঃপুরে নিয়ে গেলেন স্ত্রীর কাছে৷ সব কথা বললেন৷ স্ত্রীরও ভীষণ দয়া হল৷ বললেন, ‘আপনার জন্যে কি করতে হবে বলুন৷ যা চাইবেন আমি তাই করব৷’

গণিকা বললে, ‘মা, তুমি হলে আমার মেয়ের মতো, তোমার কাছে আমি কিছুই চাই না৷ শুধু তোমার কাছে থেকে তোমার সেবাযত্ন করব, তাহলে আমি সবসময় তোমার মুখখানি দেখতে পাব, আর আমার হারিয়ে যাওয়া মেয়ের শোক ভুলতে পারব৷’

মন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই মুগ্ধ৷ মহিলাকে বললেন, ‘মা, তুমি এই বাড়িতে, এই বাড়িরই একজন হয়ে থাকো৷ সম্পূর্ণ স্বাধীনতা৷’

দেখতে-দেখতে সেই মহিলা হয়ে উঠলেন সংসারের সর্বময় কর্ত্রী৷ মন্ত্রী তার জামাই৷ তার হুকুমে সংসার চলে৷ তালা চাবি সব তার জিম্মায়৷ খোঁজ চলেছে সেই সোনার কৌটোর৷ বাক্স, প্যাটরা, সিন্দুক কোথাও নেই৷ তাহলে গেল কোথায়৷

সজাগ দৃষ্টি৷ একটা ব্যাপার লক্ষ করল—মন্ত্রীমশাই বাড়ির বাইরে বেরোবার সময় দরজার খিলানের দিকে তাকান, ফিরে এসেও তাই করেন৷ মালটা তাহলে ওইখানেই আছে৷

মন্ত্রীমহাশয় একদিন সস্ত্রীক রাজবাড়িতে গেছেন৷ সেই সময় মহিলা খিলান ভেঙে কৌটোটি নিয়ে চম্পট৷ মন্ত্রী ফিরে এসে দেখলেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে৷ কৌটো রাজার হাতে৷ গণিকা তার প্রাপ্য বুঝে নিয়ে অদৃশ্য৷

রাজা জানেন, মন্ত্রী তাঁর চেয়ে সেয়ানা৷ যেখানেই রাখা যাক কৌটোটা সে উদ্ধার করবেই৷ জিনিসটাকে দীঘির জলে ফেলে দিলেন৷ বিরাট একটা মাছ কপ করে গিলে ফেলল—সেফ কাস্টডি৷

রাজা মন্ত্রীকে বললেন, ‘এইবার আমার কৌটো ফেরত দেওয়ার সময় হয়েছে৷’

মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ কৌটো আমার কাছে নেই৷ ফেরত দিতে পারব না৷’

‘তবে প্রাণদণ্ড৷’

‘আদেশ শিরোধার্য৷ তবে আমাকে সাতদিন সময় দিন৷ এই সাতটা দিন আমি ভগবানকে ডাকব৷’

রাজা সময় দিলেন৷

মন্ত্রী গেলেন গুরুর কাছে৷ মৃত্যু আসন্ন৷

গুরু বললেন, ‘দুঃখ করো না৷ আনন্দ করো৷ বেধড়ক আনন্দ৷ পূজা, পাঠ, হোম৷ নাচ, গান, যাত্রা৷ সাতদিন একটা মহা হুল্লোড় লাগিয়ে দাও৷’

মন্ত্রীর বাড়ি উৎসব মুখর৷ লোকে লোকারণ্য৷ সবাই অবাক৷ কীসের উৎসব! ভারে-ভারে শাক-সবজি, দই, মিষ্টি, চাল, ডাল, ঘি, তেল, মাছ৷ যে যা দাম চাইছে তাই পেয়ে যাচ্ছে৷

দীঘিতে জাল ফেলেছিল জেলেরা৷ বিরাট একটা মাছ৷ কোথায় নিয়ে যাবে? মন্ত্রীর বাড়িতে৷ ডবল দাম মিলবে৷ মাছ এল মন্ত্রীর উৎসব-গৃহে৷ বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই৷ একটা মাছ কিন্তু কাটতেই পেট থেকে বেরোল সেই সোনার কৌটো৷

এই সাতদিন মন্ত্রীর মনে আদৌ কোনও দুঃখ, মৃত্যু চিন্তা কিছুই আসেনি৷ আসার পথ পায়নি৷ শুধু উৎসব, শুধু আনন্দ৷ মানুষের মিলনমেলায় বিভোর৷ এসে হাজির রাজ-শমন৷ সাত দিন হয়ে গেছে৷

রাজামশাইর খুব তম্বি—‘ব্যাপারটা কি? পালিয়ে, পালিয়ে বেড়াচ্ছ! চলো, এখুনি তোমাকে ফাঁসিতে লটকান হবে৷’

মন্ত্রীমশাই হাসছেন৷ হাসতে-হাসতে পকেট থেকে বের করলেন সেই কৌটো৷

‘দেখুন তো রাজামশাই, চিনতে পারছেন? এইটাই না আপনার সেই কৌটো’ রাজার হাতে কৌটোটা দিলেন৷

‘কোথা থেকে পেলে তুমি এই কৌটো!’

‘ওই যে বলেছিলুম না, দুখ পাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে৷ মরতেই যখন হবে, তখন বিরাট করে একটা উৎসব লাগিয়ে দিলুম৷ মরার কথা আর মনেই রইল না৷ আর এই উৎসব না করলে কৌটোটাও পেতুম না৷ কৌটোটা আপনি দীঘিতে ফেলে দিয়েছিলেন৷ গিলেছিল একটা মাছ৷ সেই মাছ এল উৎসব বাড়িতে৷ মাছটার আত্মাহুতিতে আমার জীবনটা বেঁচে গেল৷ এইবার আপনি বুঝে নিন৷ বরং আমি বলি—ঘরে আলো জ্বাললে অন্ধকার পালাতে বাধ্য৷’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%