সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
সাড়ে তিনঘণ্টা লেটে চলছে ট্রেন৷ স্টেশন যন্ত্রে নিরাসক্ত ঘোষণা৷ আমি যেটির জন্য এসেছি সেটি সাড়ে তিন৷ আরও আছে, কোনটা চার, কোনটা পাঁচ, এরই মধ্যে একটা রেকর্ড, বারো ঘণ্টা৷ এসব নিয়ে আমাদের জনজীবনে আর কোনও ক্ষোভ নেই৷ স্বাভাবিক৷ নবজাতক কাঁদবে, ট্রেন লেট করবে, পুলিশ প্রকাশ্যে লরির কাছ থেকে টাকা নেবে, স্বামী-স্ত্রী মারামারি করবে, নেতারা মিথ্যা কথা বলবে৷ এসব স্বাভাবিক৷
আমার মাসিমা আসছেন৷ কলকাতার কিছুই চেনেন না৷ তাঁকে নিতে এসেছি৷ ট্রেন লেটে না চললে, এতক্ষণে আমি তাঁকে নিয়ে হাওড়া ব্রিজে৷ গাছপাকা পেয়ারার স্বাদ নিতে-নিতে কলকাতামুখো৷ এলাহাবাদে বাগান৷ মেসোমশাই নামকরা আইনজ্ঞ৷ বিশাল রোজগার৷ বাগানে আম, পেয়ারা, গোলাপ৷ মাসিমা নিঃসন্তান৷ আমাকে খুব ভালোবাসেন৷ আমিও বাসি৷ ভালোবাসা উভয়মুখী৷ আর মাসিমা এমনই এক মানুষ ভালো না বেসে পারা যায় না৷
এই ট্রেনেই বড়সড় কেউ একজন আসছেন৷ বড়-বড় মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি দল৷ তিনি দর্শন দেওয়া মাত্রই গলায় চাপিয়ে দেবে৷ কোনও ধর্মগুরু অবশ্যই৷ দলে গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী, সাদা কাপড়ে ব্রহ্মচারী৷ প্রত্যেকেই গম্ভীর৷ নিজেদের মধ্যে একটা-দুটো কথা৷ অন্যজগতের মানুষ৷ সে-জগতে এই জগৎটা নেই৷ চাকরি-বাকরি, মিছিল, ধর্মঘট৷ সে-জগতে কীর্তন, মালপো, মেদ, উপদেশ, ফল, সন্দেশ৷
করার তো কিছু নেই৷ তিনটে ঘণ্টা কাটাতে হবে৷ এইসব সময়ে জপের মালা খুব কাজে আসে৷ নাগাড়ে জপ করে যাও৷ ঈশ্বর আসবেন না, ট্রেন এসে যাবে৷ প্ল্যাটফর্মে অফিস টাইমের ভিড় নেই৷ ছোটাছুটি, গুঁতোগুঁতি না-থাকলেও একটা অপেক্ষা আছে৷ ট্রেন আসামাত্রই অপেক্ষা লাফিয়ে উঠবে৷
ট্রলিতে নানা মাপের প্যাকিং বাক্স৷ উর্দি পরা পোর্টাররা হাঁটু তুলে বসে আছে৷ বিড়ি ফুঁকছে আরামে৷ গুটিকয় ছাত্র আর ছাত্রী নিজেদের মধ্যে রঙ্গরসিকতা করছে৷ রাশভারী এক প্রবীণ মানুষ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বই পড়ছেন৷ ইনভ্যালিড এক ভদ্রমহিলা বহনযোগ্য চেয়ারে বসে আছেন৷ কমলা রঙের শালোয়ার কামিজ পরা সুন্দরী একটি মেয়ে তাঁকে জল খাইয়ে সযত্নে ঠোঁট মুছিয়ে দিচ্ছে৷ এত ভালোভাবে হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আগে কখনও দেখতে বাধ্য হইনি! একবার এদিক যাচ্ছি, একবার ওদিক যাচ্ছি৷ দুপুরটা বেশ রোদ ঝলমলে৷ আঙুরের রসের মতো৷ একজন জিগ্যেস করলেন, ‘দাদা, দেশলাই আছে?’
দুঃখিত বলতে হল৷ ধূমপান করি না৷ আর তখনই মনে হল এক ভাঁড় চা৷ চায়ের দিকে এগোলুম৷ পাশেই ম্যাগাজিনের গাড়ি৷ বাংলা তেমন কিছু নেই৷ সবই ইংরেজি আর হিন্দি৷ কেরিয়ার, কম্পিউটার, ফিল্ম৷ চায়ে চুমুক, ম্যাগাজিন দর্শন৷ কিছুক্ষণ কাটল৷ একটা লোকাল এল৷ ছোটখাট একটা দক্ষযজ্ঞ৷ পায়ে-পায়ে, গায়ে-গায়ে ছুটছে৷ এক ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা চলেছেন তুমুল ঝগড়া করতে-করতে৷ ভদ্রমহিলা মাঝে-মাঝে থেমে পড়ছেন৷ ভদ্রলোক তখন বলছেন, ‘কী হল, দম ফুরিয়ে গেল৷’ ওই কথাটাই মনে হয় দম৷ ভদ্রমহিলা সঙ্গে-সঙ্গে সচল হন৷ আমি ওই জুটির পিছন-পিছন বেশ কিছুদূর গেলুম৷ বুঝতে পারলুম না ব্যাপারটা কী, যা ঘর থেকে ট্রেনে উঠেছে, ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমেছে, এখন চলেছে হয় হাওড়ায় না হয় কলকাতায়৷ বারে-বারে একটা নামই আসছে দুর্গা৷ মনে হল, এদের দুজনের জীবনে দুর্গা নামের একটি মেয়ে ঢুকে পড়েছে৷
আমার কৌতূহল এইবার অন্যদিকে ঘুরে গেল৷ ছিপছিপে, ধারালো, চেহারার একটি মেয়ে বেশ বড়মাপের একটা ট্রাভেল-ব্যাগ টানতে-টানতে আসছে৷ সামলাতে পারছে না৷ কাঁধে একটা সাইড-ব্যাগ, বুকের ওপর পাতলা আঁশের মতো ওড়না৷ সাইড-ব্যাগ হড়কে যাচ্ছে, ওড়না বেসামাল হচ্ছে৷ তিনটেকে নিয়ে মহা বিব্রত৷ কপালের ওপর চুল ঝুলে পড়ছে৷ চোখ দুটো ভারি সুন্দর৷ খুব ইচ্ছে করছে, কাছে গিয়ে বলি, সাহায্য করতে পারি! বলা যায় না৷ সন্দেহের পৃথিবীতে সহযোগিতা মরে গেছে৷ মানুষ এখন একা৷ যে-যার সে-তার৷ প্রথম দর্শনেই আমি প্রেমে পড়েছি৷ এমন প্রেম কতবারই এসেছে৷ পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে শুকিয়ে৷
প্ল্যাটফর্ম আগের চেয়ে অনেকটা লম্বা হয়েছে৷ পরিচ্ছন্নতার অভাব৷ এসব দিকে আমাদের তেমন নজর নেই৷ বিলেত তো নয়৷ যে-দিকটায় এসেছি ভিড় অনেকটা পাতলা৷ থামে-থামে টিভি চলছে৷ হঠাৎ চোখ পড়ে গেল৷ একটি কিশোর আধশোয়া৷ প্ল্যাটফর্মের ধুলোয়৷ দুটো কনুইয়ের ওপর ভর রেখে শরীরের ওপর দিকটা উঁচিয়ে রেখেছে৷ চোখ দুটোয় মায়া মাখানো৷ ছেলেটির ডান পায়ের তলার দিকটা কাটা৷ পুরু একটা ব্যান্ডেজ জড়ানো৷ ময়লা-ময়লা৷ দেখেই মনে হল সদ্য কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে৷ ময়লা একটা হাফপ্যান্ট, নীল টি-শার্ট৷ বুকের খাঁচাটা বেশ চওড়া৷ সরল একটা মুখ, গভীর দুটো চোখ৷ কিউপিডের মতো চুল, অবিন্যস্ত৷
টিভির পরদায় ফুটবল ম্যাচ৷ ছেলেটি গভীর আগ্রহে খেলা দেখছে৷ আমি ছেলেটিকে দেখছি৷ ডান পায়ের গাঁট থেকে পাতাটা নেই৷ একটা খোঁটার মতো৷ ব্যান্ডেজ জড়ানো৷ এখনও শুকোয়নি৷ বয়েস, এগারো কী বারো৷ হাসপাতালের বিছানায় থাকা উচিত৷ পড়ে আছে নোংরা প্ল্যাটফর্মে৷ আমি দেখছি ছেলেটিকে, ছেলেটি দেখছে ফুটবল৷ চোখ বড়-বড় হচ্ছে, ছোট হচ্ছে, দৃঢ় হচ্ছে৷ উত্তেজিত হচ্ছে, হতাশ হচ্ছে৷ পায়ের যন্ত্রণায় ছায়া পড়ছে৷ কখনও উঃ করে উঠছে, পরক্ষণেই হারিয়ে যাচ্ছে খেলার জগতে৷ বড় একটা বস্তা পড়েছিল৷ ছেলেটিকে দেখার জন্যে বসে পড়লুম৷ আমাকে আটকে ফেলেছে আহত কিশোর ওই রাজা৷ ভাবখানা কী! যেন সম্রাট শুয়ে আছে পদ্মফুলের বিছানায়৷
বিদেশি লিগের খেলা৷ দুটো দলই সমান মজবুত৷ তীব্র গতি৷ এক-একজন বল নিয়ে ষাট-সত্তর মাইল বেগে ছুটছে৷ কোনও দলই তার দল নয়, তবে হলুদ জার্সির দলটিকে মনে হল বেছে নিয়েছে৷ হলদের সাপোর্টার৷ হলদে যখন আক্রমণে উঠছে চোখ বড়-বড় হয়ে যাচ্ছে৷ হাত মুঠো করছে, নিজের শরীরটাকে আরও একটু ঠেলে তুলছে৷ আক্রমণ থেকে হলুদ যেই ছিটকে যাচ্ছে, সঙ্গে-সঙ্গে চোখ ছোট, মুঠো আলগা, সেইমুহূর্তে বাদ দেওয়া পায়ের যন্ত্রণাটাও ফিরে আসছে মুখের রেখায়৷
এমন একটা সুন্দর ছেলে! কার ছেলে!
ছেলেটির কাছে এগিয়ে গেলুম৷ এ-তো আমারই শৈশব! আমার বাড়ি ছিল, পিতা, মাতা, দাদু, দিদিমা ছিলেন, সামান্য প্রাচুর্য ছিল, স্কুল ছিল, খেলার মাঠ ছিল, আদর ছিল, শাসন ছিল, চাওয়া ছিল, পাওয়া ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল, উচ্চাশা ছিল, অতীত বা বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যতের কথাই বেশি শুনতুম৷ এই ছেলেটির সেসব কিছুই নেই, আছে কৈশোর, আছে স্বপ্ন, ভবিষ্যৎহীন বর্তমান৷
‘তোমার পায়ে কী হয়েছে?’
একবার তাকিয়েই চোখ টিভির দিকে চলে গেল৷ লক্ষ করিনি হলুদ তখন আক্রমণে৷ হলুদ ছিটকে যেতেই, ছেলেটি কিছুই যেন হয়নি, এমন গলায় বললে ঃ
‘একটা লোক লাইনে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল!’
‘ট্রেন থেকে?’
ছেলেটি আবার খেলায় চলে গেছে৷ হলুদ বল নিয়ে বিপক্ষের গোলের সীমানায়৷ উত্তর পাওয়া যাবে না জানি৷ অপেক্ষা করতে হবে৷
গোল হল না৷ খেলাতে চোখ রেখেই ছেলেটি বললে, ‘প্ল্যাটফর্ম থেকে৷’
‘কেন?’
‘ইচ্ছে হল৷ লাথি মেরে লাইনে ফেলে দিলে৷ ট্রেন ঢুকছিল৷ পা-টা চলে গেল৷’
‘শুধু-শুধু লাথি মারলে?’
‘কুত্তা ভেবেছিল৷’
কথাটা এমন নিরাসক্ত ভাবে বললে! বেঁচে থাকাটাতে কত সহজ করে নিয়েছে!
‘হাসপাতালে ছিলে?’
‘একদিন৷ ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দিলে, বললে, তুই ছোট আছিস, তোর সুগার নেই, এমনিই সেরে যাবে৷ পাটা আর পাবি না৷ পরে একটা কাঠের-পা লাগিয়ে নিস৷’
‘তোমার বাড়ি নেই?’
‘না, আমরা যেখানে-সেখানে থাকি৷’
‘মা-বাবা আছেন?’
‘বাবা পালিয়ে গেছে৷ মা আছে৷’
‘কোথায়?’
‘রেলের বাড়ি হচ্ছে৷ যোগাড় দিতে গেছে৷’
‘ব্যথা করছে?’
‘করলে কী করব!’
‘কী খেয়েছ আজ?’
‘আমরা একবার খাই, রাত্তিরে৷ মা এসে রাঁধবে যখন৷’
ছেলেটি আবার আধবসা হল৷ আবার হলুদ দল আক্রমণে ঢুকছে৷ গোলে মেরেছে৷ গোলকিপার পাঞ্চ করে বল উড়িয়ে দিল৷ গোল হল না৷ কর্নার হবে মনে হচ্ছে৷ ছেলেটি, ধুস করে উঠল৷ নিজের মনেই বললে, ‘ও ভাবে মারলে গোল হয়!’
জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি ফুটবল খেলতে?’
‘না৷’
তা হলে?’
‘আমি সব জানি৷ আর একটু বড় হলে, বড়লোক হলে খেলতুম৷ আমার তো পা চলে গেল!’ বয়েসে আর একটু ছোট একটি মেয়ে এল৷ ঝুমকো-ঝুমকো চুল৷ আধময়লা ছেঁড়া-ছেঁড়া ফ্রক৷ বাঁ-হাতে একগাদা কাচের চুড়ি৷ এর মুখটাও খুব সুন্দর৷ বড়-বড় চোখ৷
সে এসে ছেলেটির বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁ মারতে লাগল৷ ছেলেটা টিভি দেখতে পাচ্ছে না৷ কেবল বলছে, ‘এই সর না, এই সর না৷’
মেয়েটা মাথা তুলে ছেলেটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললে, ‘তোর গাটা খুব গরম! জ্বর হয়েছে৷’
‘ও কাল সকালে কমে যাবে৷’
‘তোর যন্ত্রণা হচ্ছে?’
‘হচ্ছে৷’
‘কিছু খাসনি৷’
‘না৷’
মেয়েটা মোড়ক খুলে একটা লজেন্স বের করে ছেলেটার মুখে পুরে দিল৷ একটু চুষে ছেলেটা বললে, ‘কে দিল?’
‘মাস্টারমশাই৷’
‘তোর কই?’
‘একটাই ছিল৷’
ছেলেটি সঙ্গে-সঙ্গে সেই লজেন্সটা নিজের মুখ থেকে বের করে মেয়েটির মুখে জোর করে ঢুকিয়ে দিলে৷ মেয়েটা চুষতে-চুষতে বলে, ‘তোর জন্যে এনেছিলুম৷ বের করে দিলি কেন?’
‘তুই একটু আমি একটু৷’
মেয়েটার মাথা ছেলেটার বুকে আবার৷
ছেলেটা মৃদু গলায় বলছে, ‘আঃ, সর না, খেলাটা দেখি৷’
‘খেলা দেখছিস তুই?’
‘সর না৷’
মেয়েটা উঠেই ছুটতে-ছুটতে চলে গেল নতুন প্ল্যাটফর্মের দিকে৷
জিগ্যেস করলুম, ‘তোমার বোন?’
‘না, আমার বন্ধু৷’
‘তোমায় খুব ভালোবাসে?’
‘হ্যাঁ, ওর বাবাও আমাকে খুব ভালোবাসে৷ ওর মা নেই৷ আমার মা ওকে মানুষ করছে৷’
‘ওর বাবা কী করে?’
‘রাজমিস্ত্রি৷’
শালপাতার বস্তার ওপর বসে সময়টা বেশ কাটছে৷ মনে-মনে একটা হিসেব করার চেষ্টা করলুম৷ এর ছেলে, ওর মেয়ে৷ এর স্বামী নেই, ওর বউ নেই৷ এ যোগাড়ে, ও রাজমিস্ত্রি৷ এ মেয়েটাকে ভালোবাসে, ও ছেলেটাকে ভালোবাসে৷ মেয়েটা ছেলেটাকে ভালোবাসে, ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবাসে৷ পৃথিবীর সবটাই খারাপ নয়৷ অনেক-অনেকদিন পরে একটা সংসার হবে, আমাদের সংসারের বাইরে৷ লাইনের ধারে, গোলপাতার ছাউনির তলায়৷ ছেলেটা তো সুন্দর, মেয়েটাও সুন্দর৷
আবার আমার কৌতূহল, ‘মাস্টারমশাই কে?’
‘বিজুদা, এমনি-এমনি রোজ এসে যাকে পায় তাকে পড়ায়৷ আমিও পড়ি৷ এখন পড়ছি না৷ পায়ের যন্তন্না৷ আবার পড়ব৷’
‘মাছি, নোংরা, তোমার ঘা-টা বিষিয়ে যাবে না তো!’
‘আমাদের কিছু হয় না৷’
‘বলা তো যায় না৷ যখন জ্বর হচ্ছে!’
‘পচে যাবে তো, তা হলে আরও একটু কেটে দেবে৷ এখনও অনেকটা আছে৷’
ছেলেটার উত্তর শুনে মনে হল, পা আর থোড় এক করে ফেলেছে৷
‘তুমি কিছু খাবে, কেক, বিস্কুট!’
‘না, আমি খাই না৷ খেলে নিজেই খাব৷’
এইটুকু ছেলে৷ খুব আত্মসম্মান বোধ৷ মেরুদণ্ডের জোর আছে৷ দেহের এবং মনের৷ দু-কনুইয়ের ওপর ভর রেখে কতক্ষণ আধশোয়া৷ কাটা পায়ের যন্ত্রণা৷ চোখ দুটো উজ্জ্বল৷ চারপাশে মানুষের বিচিত্রপ্রবাহ৷ কিশোর সম্রাট৷ নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে৷ ভীতু, খর্ব, সঙ্কীর্ণ মনে হচ্ছে৷ শ্যাওলা মনে হচ্ছে৷
মেয়েটা আবার এল ছুটতে-ছুটতে৷ কচি কলাপাতায় মোড়া একটা পেয়ারা৷ চার ফালি, করা৷ খাঁজে-খাঁজে নুন-মশলা৷ ছেলেটার মুখের কাছে ধরে বললে, ‘নে, খা৷ জ্বরের মুখ৷’
‘তুই নে৷’
‘তুই আগে নে৷’
‘কে দিলে!’
‘কিনেছি৷’
‘পয়সা!’
‘ছিল৷’
ছেলেটা কামড় মারল৷ কশ-কশ শব্দ৷ ছেলেটা যে চোখে খেলা দেখছে, মেয়েটা সেই চোখে চিবনো দেখছে, ‘কী, ভালো না!’
‘হ্যাঁ৷’
মেয়েটা অদ্ভুত তৃপ্তি পেল যেন৷ তখন সেও একটা টুকরো তুলে কামড় মারল পেয়ারা শেষ হতেই ছেলেটা বসে-বসে, পিছন টেনে-টেনে সামনে এগোতে লাগল৷
মেয়েটা বললে, ‘যাবি কোথায়!’
‘ওইখানে৷’
সামনে আর একটা থাম৷ সেখানেও টিভি৷ সেখানে একদল সমবয়সি কিশোর৷ খেলা দেখছে৷
মেয়েটা বললে, ‘আমি ধরছি৷ একপায়ে হাঁট না৷’
‘হবে না৷’
মেয়েটার মুখটা খুব করুণ দেখাল৷ কপালে টিপ৷ ঝুপুরঝাপুর চুল৷ হলদে আধময়লা ফ্রক৷ ছেলেটার গতি দেখছে৷ পাশে-পাশে হাঁটছে৷ ভবিষ্যতের দম্পতি চলেছে৷ বর্তমানকে উপহাস করে৷ ছেলেটা মনে হয় আমার জন্যেই সরে গেল বিরক্ত হয়ে৷
ট্রেন লেট করে ভালোই হয়েছে৷ আমি এক সম্রাটকে দেখলুম৷ ভিড় বেড়েছে৷ রকম-রকম মানুষ৷ সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত৷ যত মানুষ, তত টুকুরো এই পৃথিবী৷ তত পাঁচিল, তত দেয়াল!
আবার বস্তা ছেড়ে উঠে পড়লুম৷ যতক্ষণ না ট্রেন আসে ছেলেটাকে দেখব৷ পরে আর দেখা হবে না৷ জীবনের জঙ্গলে হারিয়ে যাবে৷ আর আমার কোনও প্রশ্ন নেই, এইবার দর্শন৷ ছেলেটা দঙ্গল থেকে একটু আলাদা বসেছে৷ সে-যে সম্রাট, ওরা সবাই প্রজা৷
মেয়েটা এইবার তার পিঠটা ছেলেটাকে দিয়েছে ঠেসান দেওয়ার জন্যে৷ ছেলেটার পা-দুটো সামনে প্রসারিত৷ সাদা ব্যান্ডেজের ওপর মাছি বসছে৷ ছেলেটা হেলে আছে৷ খেলা ভয়ংকর জমেছে৷ মাঠ, দু-ধারে দুই গোলপোস্ট, গোটা-গোটা, বেপরোয়া, ক্ষিপ্ত, দ্রুতগামী মানুষ, একটা গোল বল৷ কেউ ছিটকে পড়ছে৷ কেউ ঘোড়ার মতো টপকে চলে যাচ্ছে৷
হলুদের সেন্টার ফরোয়ার্ড এগোচ্ছে৷ বল ঠেলে দিয়েছে লেফট ইনকে৷ সে এগোচ্ছে তীব্রগতিতে৷ ছেলেটাকে দেখছি৷ চোখ দুটো গোল-গোল, স্থির৷ হাতের মুঠো শক্ত৷ পা টান-টান৷ লেফট ইন এগোচ্ছে৷ পাশ কাটাচ্ছে, পেনাল্টি এরিয়ায়, ঠেলে দিয়েছে রাইটে৷ তীব্র শট৷
ছেলেটার মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত টান-টান আকাশে৷ আধশোয়া শরীর৷ বুক খালি করা একটা চিৎকার—গোওওল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন