সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমাদের স্কুলের ঘণ্টাটা একেবারে এক নম্বর৷ জাহাজে চেপে বিলেত থেকে এসেছিল৷ কুইন ভিক্টোরিয়ার উপহার৷ রানির রানিত্বের ‘জুবিলি’তে আমাদের স্কুলের নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘ভিক্টোরিয়া স্কুল’৷ বিরাট ঘটা হয়েছিল৷ বাজি পোড়ানো হয়েছিল৷ সেই সময়কার জাঁদরেল জমিদাররা দাঁড়িয়ে গেয়েছিলেন ঃ ‘রুল ব্রিটানিয়া রুল দি ওয়েভস৷’ ঢাং-ঢাং করে যখন বাজে, গঙ্গার ওপারের স্কুলের ছেলেরা ছুটি হয়ে গেছে ভেবে হে-রে-রে-রে করে বেরিয়ে আসে৷ সঙ্গে-সঙ্গে সপাসপ৷ পিঠে হাত বোলাতে-বোলাতে আবার ক্লাসে৷ টিফিনের ঘণ্টা হল৷ পিল-পিল করে সবাই মাঠে৷ মাঠের ওপরে দোতলার ঘরটা হেডস্যারের৷ পশ্চিমে খাড়া জানলা৷ ওপর দিকে তাকালে আমরা তাঁর গোঁফ দেখতে পাই৷ রাগি গোঁফ৷
আজ ওই ঘরে ভীষণ চেঁচামেচি হচ্ছে৷ হেডস্যার কেবল বলে চলেছেন, ‘গেল কোথায়? কোথায় গেল!’
আমরা সবাই হাঁ-করে ওপরদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ বোঝার চেষ্টা করছি—কে গেল, কোথায় গেল! শাস্তির বহরটা কেমন হবে? নিল ডাউন, গাধার টুপি, বেত!
হেডস্যারের চিৎকার : ‘কল এভরিবডি৷ প্রত্যেককে ডাকুন৷ কোথায় গেল, গেল কোথায়, কোথায় যেতে পারে?’
আমরা কয়েকজন পা টিপে-টিপে দোতলায় উঠে স্যারের ঘরের বাইরে আড়ালে দাঁড়ালুম৷ স্যারেরা সব লাইন দিয়ে—ঘরের বাইরে, ঘরের ভেতরে৷ অর্থাৎ, লাইনটা যতটা পেরেছে ভেতরে ঢুকেছে, বাকিটা বাইরে পড়ে আছে৷ ভেতরে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথেমেটিক্স৷ বাইরে সব হিউম্যানিটিজ৷ সবচেয়ে করুণ অবস্থা হিস্ট্রির৷ একেবারে শেষে৷ অ্যালার্জির ধাত৷ ঘন-ঘন হাঁচি৷ প্রাণখোলা উদাত্ত হাঁচি৷ প্রতিটি হাঁচির পরই বাংলা স্যারের সংযোজন ঃ ‘বাপ্স৷’
ইংরিজিস্যার বললেন, ‘আপনার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে চাকরি নেওয়া উচিত৷ নাক তো নয়, কামান! কাঁটাতারের একদিকে দাঁড় করিয়ে মুখটা ওদের দিকে ঘুরিয়ে দাও৷ সারাদিন মোট কতবার দাগেন? হিসেবে রেখেছেন? ফ্রি ফায়ারিং৷’
হাঁচিস্যার আর-একটা হাঁচি আসার আগে যে-টুকু বলতে পারলেন, ‘প্রাচীন ধুলো আমার একেবারে সহ্য হয় না৷’
‘ধুলোর আবার প্রাচীন আধুনিক আছে নাকি?’
‘ইতিহাসের বইয়ের ঐতিহাসিক ধুলো একবার নাকে ঢুকলে হয়!’
‘বই নাড়ানাড়ির কী দরকার শুনি! নোটসেই যখন কাজ হয়ে যায়৷’
গণিতস্যার ঠেলেঠুলে ঘরের ভেতর থেকে দরজায় এসে দাঁড়ালেন, হেডস্যারের মুখপাত্র৷ তিনি বললেন, ‘আপনাদের কেউ যদি নিয়ে থাকেন, দয়া করে কবুল করুন৷ উনি বলছেন—তা না-হলে পুলিশ ডাকবেন৷’
এ-দিক থেকে ফিজিক্সস্যার জানতে চাইলেন, ‘জিনিসটা কী?’
গণিতস্যার জানেন না৷ ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘জিনিসটা কী?’
ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল ঃ ‘ভল্যুম টেন৷’
গণিতস্যার উত্তরটা ধরে নিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিলেন, ‘ভল্যুম টেন৷’
‘কী ভল্যুম টেন?’
জানেন না৷ প্রশ্নটা ধরে নিয়ে ছুঁড়ে দিলেন ভেতরে৷
হেডস্যার বেরিয়ে এলেন৷ রাগি মানুষ, আরও রেগেছেন৷ ফরসা গোল মুখ টকটকে লাল৷
বাংলাস্যার বললেন, ‘যাক৷ এবার ঘোড়ার মুখ থেকে ঘোড়ার খবর৷’
হেডস্যার বললেন, ‘শুনুন, ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ ভল্যুম টেন—কে নিয়েছেন কবুল করুন৷ কার কাজ?’
স্যারদের মধ্যে থেকে কেউ বললেন, ‘সাইকেল হলে কথা ছিল, এ হল সাইক্লো৷’
ফিজিক্সস্যার বললেন, ‘যার কাছে চাবি, সেই নিয়েছে৷’
হেডস্যার প্রশ্ন করলেন, ‘কার কাছে চাবি?’
প্রশ্নটা বাইরে কিছুক্ষণ পায়চারি করল৷ তারপর শোনা গেল, ‘চাবি পাঁচুবাবুর কাছে থাকাই স্বাভাবিক৷’
হেডস্যার রেগে আছেন, তাই বললেন, ‘সেই ভদ্রমহোদয়কে একবার ডাকা যেতে পারে কি?’
পাঁচুবাবু, আমাদের পাঁচুদা এলেন৷ ভীষণ ভালোমানুষ৷ আমরা বলি, ছাত্রবন্ধু৷ গোলগাল ফানুসের মতো চেহারা৷ সব সময়েই কিছু-না-কিছু একটা খাচ্ছেন৷ পাশ দিয়ে যখন চলে গেলেন, আমরা তালের বড়ার গন্ধ পেলুম৷ কাল জন্মাষ্টমী ছিল৷ বাড়ি থেকে টিফিন কৌটো ভরতি করে এনেছেন৷ হেডস্যারের সঙ্গে কথোপকথন—
‘আলমারির চাবিটা কার কাছে?’ হেডস্যারের প্রশ্ন৷
‘আপনার কাছে৷’
‘তার মানে আমি চোর?’
‘চোর হতে যাবেন কেন? আপনি চাইলেন, আমি পাঞ্জাবির পকেট থেকে চাবিটা বের করে আপনার হাতে দিলুম৷’
‘পকেটটা দেখুন৷’
‘সে দেখছি৷ এই তো!’
‘গোল মতো ওটা কী—বেরিয়েই ঢুকে গেল!’
‘আজ্ঞে, ও একটা জিনিস৷’
‘জিনিসটা কী? জিনিসটার ডেফিনিশান কী?’
‘আজ্ঞে চাবি নয়?’
‘দেন হোয়াট?’
‘তালের বড়া৷ নন্দ নাচিতে লাগিল৷’
‘পাঞ্জাবির পকেটে তালের বড়া? আর ইউ ম্যাড?’
‘দিচ্ছিল না৷ ঝট করে এক মুঠো তুলে পকেটে পুরে হাওয়া৷ কাল জন্মাষ্টমী ছিল স্যার৷ বাড়িতে গোপাল আছেন৷ ইটার্নাল নটি বয়৷ আমি তার নটি ফাদার!’
‘ভল্যুম টেন গেল কোথায়?’
‘কীসের ভল্যুম টেন?’
‘আলমারির দিকে তাকাল—একটা ফাঁক দেখতে পাচ্ছেন? ‘ব্রিটানিকা’-র ভল্যুম টেনটা নেই? নেই কেন!’
‘তা তো বলতে পারব না স্যার৷ বড়-বড় লোকের বাড়িতে ওই বই সাজানো থাকে৷ কেউ পড়ে না৷ তিনদিন আগে আলমারির চাবিটা আপনি কী কারণে নিলেন? সেটা গেল কোথায়! মনে করার চেষ্টা করুন৷ চেয়ারে বসে ধ্যান করুন৷ এত উত্তেজিত হন বলেই আপনার কিছু মনে থাকে না৷’
‘মনে থাকে না?’
‘না, থাকে না৷ আপনি একবার থার্মোমিটার বগলে স্কুলে চলে এসেছিলেন৷ আর বলছিলেন—হাতটা তুলতে পারছি না৷ মনে হচ্ছে কী-যেন একটা রয়েছে, পড়ে যাবে৷’
‘আগে আমার মুখে থার্মোমিটার দিত, পরপর দুটো চিবিয়ে ফেলার পর এখন বগলে দিয়ে বলে—চেপে থাকো৷ আমার সেদিন তাড়া ছিল৷ কুক্ষিগত থার্মোমিটার নিয়ে চলে এসেছি৷ ভুল সকলেরই হয়৷ আপনার হয়, আপনাদেরও হয়৷ আপনাদের কাছে অনুরোধ, সেটটা নষ্ট হয়ে যাবে, দয়া করে উদ্ধার করে দিন৷ আর সহ্য করতে পারছি না এই তালের বড়ার গন্ধ৷ লোকে গন্ধ মাখে, ইনি তাল মেখে চলে এলেন৷’
পাঁচুদা বড়-বড় চোখে হেডস্যারের টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছেন৷
চোখ না-সরিয়ে বললেন, ‘খুঁজে দিতে পারি, কী খাওয়াবেন?’
‘যা খেতে চাইবেন৷’
‘ফুচকা৷’
সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘আ! ফুচকা!’
পাঁচুটা ধীরে-ধীরে—বাঘ যেভাবে শিকারের দিকে এগোয় অথবা বেড়াল যেভাবে এগোয় অন্যমনস্ক পাখিদের দিকে—সেইভাবে এগোচ্ছেন হেডস্যারের টেবিলের দিকে৷ টেবিলল্যাম্পের তলায় একটা মোটাসোটা বই৷
‘হোয়াট ইজ দিস?’
হেডস্যার লাফিয়ে উঠলেন, ‘ওই তো ভল্যুম টেন! ওখানে আলোর তলায় গেল কী করে! ল্যাম্পটা ওর ওপর চেপে বসল কী করে?’
‘আজ্ঞে! চিরকালের সেই প্রবাদটা যে কত সত্য, তা আর একবার প্রমাণ করার জন্যে—আলোর নিচেই থাকে অন্ধকার৷’
বিখ্যাত ঘণ্টার বিপুল শব্দ৷
‘যান, যান৷ সব ক্লাসে যান৷’
‘ভালো করে শুনুন স্যার—এ হল ছুটির ঘণ্টা৷ ফুচকার ঘণ্টা!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন