সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
সুন্দর সাজানো বৈঠকখানা৷ সোফা, সেন্টার টেবিল, কার্পেট, বুককেস, পরদা৷ কিন্তু কোণের দিকে ওটা কী? সঞ্জয়দের বাড়িতে রোজই আসি৷ দুজনে একসঙ্গে ওদের চিলেকোঠায় লেখাপড়া করি৷ সঞ্জয় অঙ্কে এক নম্বর৷ আমাকে অঙ্ক বোঝায়৷ তখন সে অন্যরকম-সিরিয়াস৷ যেন অধ্যাপক৷ আমি লিখে দিতে পারি, ও আমেরিকায় যাবেই যাবে৷ নাসার স্পেস সেন্টারে বিজ্ঞানী হবে৷ মহাকাশে রকেট পাঠাবে৷ বনেদি বড়লোকের বাড়ির ছেলে৷ ভালো, মন্দ কত কী খায়৷ মাথা তো খুলবেই৷ না, মিথ্যে কথা বলব না—বড়লোক হলেও এতটুকু অহংকার নেই৷ সঞ্জয়ের দিদি আমারও দিদি৷ একেবারে স্বপ্নের মতো৷ মুখে সবসময় হাসি৷ কখনও বসে বসে সময় নষ্ট করতে দেখিনি৷ আর্ট কলেজে ফাইন্যাল ইয়ার৷ যা ছবি আঁকে দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে৷ আবার গল্প লেখে৷ লেখা হয়ে গেলে আমাকে ছবি আঁকার ঘরে নিয়ে গিয়ে পড়ে শোনায়৷ গল্পে ভীষণ দুঃখ থাকে৷ আমার চোখে জল এসে যায়৷ এত দুঃখের গল্প কেন লেখে!
বৈঠকখানার কোণের দিকে বিশাল ওই বস্তুটি হল, একটি জয়ঢাক৷ দুর্গাপুজোয় যে-ঢাক বাজানো হয়, তার চেয়ে অনেক অনেক বড়৷ মাটিতে রেখে বাজাতে হয়৷ বীভৎস গুড়ু গুড়ু আওয়াজ৷ কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙাবার জন্যে কানের কাছে এইরকম এক লক্ষ ঢাক একসঙ্গে বাজানো হয়েছিল৷ ভগবান ভীষণ রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ব্যাটা মরবে৷
সুন্দর, বাহারি খোল দিয়ে ঢাকটাকে ঢেকে রাখা হয়েছে৷ ঝালরটালর ঝুলছে৷ তা খারাপ দেখাচ্ছে না৷ নূপুরদি আ.স্ট৷ সারা বাড়িতেই শিল্প৷ পেছনের বারান্দায় ঝুলছে তিনটে বাবুই পাখির বাসা৷ কোন গ্রামে ছবি আঁকতে গিয়েছিল৷ নিয়ে এসেছে৷ নূপুরদির কাছে টুকিটাকি অনেক রকমের জিনিস আছে৷ মাঝে মাঝে আমাকে দেখায়৷ দেখাতে দেখাতে বলে, পৃথিবীর বড় বড়, দামি দামি জিনিস সবাই দেখে, ছোট ছোট তুচ্ছ জিনিসের দিকে কারও নজর নেই৷ Small is so beautiful.
নূপুরদির কাছে ওই ঢাকটার কথা জানতে চেয়েছিলুম৷ সেদিন মন ভালো ছিল৷ শিল্পী, সাহিত্যিকদের মন সবসময় ভালো থাকে না৷ আমার দাদা সাহিত্যিক৷ কিছুটা নাম করেছে৷ ডিম্যান্ড আছে৷ বেশ হাসছিল, কথা বলছিল৷ হঠাৎ গুম মেরে গেল৷ কী হল রে ভাই! মা বললে, সরে যা৷ একা থাকতে দে৷ প্লট আসছে৷ তার মানে, লেখা আসছে৷ কী হবে বাবা কে জানে! শুনছি নূপুরদির সঙ্গে দাদার বিয়ে হবে৷ আর ক’দিন পরে ওই ফাল্গুন মাস থেকে দিদিকে বউদি বলতে হবে৷ আমি ঠিক করেছি, দিদিই বলব, যা থাকে বরাতে৷ দাদাকে না হয় জামাইবাবু৷ আমার দিদি নেই৷ যাও বা একটা পেলুম, কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত৷ ভগবান! এদের ক্ষমা করে দাও৷
তুলি রেখে, নূপুরদি বললে, ‘ঢাকের কথা শুনবি?’
‘খুব জানতে ইচ্ছে করছে৷’
‘ঢাকার নাম শুনেছিস?’
‘বাংলাদেশের রাজধানী৷’
‘বাংলার নবাবের রাজধানী ছিল ঢাকায়৷ এইবার একটা হিসেব করে নিই৷ আমার ঠাকুরদা—মানে, বাবার বাবা, তাঁর বাবা, এইবার সেই বাবার বাবা৷’
‘বাবারে বাবা! কত বাবা!’
‘বাবা আর মা ছাড়া পৃথিবী অচল৷ সব থেমে যাবে৷ এত প্রশ্ন করিস, হিসেব গুলিয়ে গেল৷ কোন বাবা?’
‘তুমি বাবা ধরে এগোচ্ছ কেন?’
‘আরে আমি এগোব কেন, আমি তো পেছচ্ছি৷’
‘তুমি শ্রাদ্ধের সময় যেমন করে, সেইরকম করো৷ পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ৷’
‘ছেড়ে দে৷ সহজ করে নে৷ এইভাবে বলি, আমাদের কোনও এক পূর্বপুরুষ৷’
‘দাদার সঙ্গে তোমার বিয়ে হলে তিনি তো দাদার শ্বশুর গ্রুপে পড়বেন, মানে আমারও শ্বশুর৷’
‘মরণদশা! তুই কি আমাকে বিয়ে করছিস?’
‘তাও তো বটে৷ কিন্তু?’
‘এখানে কোনও কিন্তু নেই৷ যে যাকে বিয়ে করবে, তার বাবা তার শ্বশুর হবে৷’
‘তোমার বাবা দাদার আর আমার দুজনেরই কাকু৷’
‘বিয়ের পর তোর দাদা আর কাকু বলতে পারবে না, বাবা বলতে হবে৷ তুই যেমন কাকু বলিস সেইরকমই বলবি৷’
‘তুমি আমার বাবাকে বাবা বলবে, আমিও বলব, দাদাও বলবে, তা হলে?’
‘তা হলে কী? তুই এখান থেকে বেরো৷ আমার মাথাটা খারাপ করে দিস না৷ কামড়ে দেব৷’
‘ঠিক আছে৷ এই আমি সাইলেন্ট৷ তুমি ঢাকটা বলো৷’
‘নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ আমার দাদুর দাদুকে উপহার দিয়েছিলেন৷’
‘অতটা পেছোলে?’
‘হ্যাঁ, শুনতে হয় শোন, না শুনতে চাস তো বেরো৷’
‘এত জিনিস থাকতে ঢাক কেন?’
‘মুর্শিদ খুব বাজে টাইপের নবাব ছিলেন৷ খাজনা বাকি পড়লে জমিদারদের ধরে আনাতেন৷ রকম রকম শাস্তি৷ এই শাস্তি দেওয়ার ভার ছিল দুটো সাংঘাতিক গুন্ডার ওপর—রেজা খাঁ আর নসরত আলি৷ ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা, সপাসপ চাবুক মারা, প্রচণ্ড শীতকালে গলা জলে ডুবিয়ে রাখা৷ আর একটা সাংঘাতিক শাস্তি ছিল বৈকুণ্ঠে ফেলে দেওয়া৷’
‘সে আবার কী? মেরে ফেলা?’
‘মেরে ফেললে তো হয়েই গেল৷ খাজনাটা তো আদায় করতে হবে৷ বৈকুণ্ঠ হল মল-মূত্রের ডোবা৷ ভ্যাটভ্যাট করছে৷ পচা দুর্গন্ধ৷ ডিফলটার জমিদারবাবুকে সেই ডোবায় ফেলে রাখা হল৷ বারো ঘণ্টা, চব্বিশ ঘণ্টা৷’
‘এইরকম বেয়াড়া নবাবের চাকরি করা তো ভয়ংকর ব্যাপার৷’
‘এই মুর্শিদ আমার সেই অতি বৃদ্ধ পিতামহের কাছে জব্দ থাকতেন৷’
‘কীরকম?’
‘কবিরাজ ছিলেন৷ মরা মানুষকে বাঁচাতে পারতেন৷ ভূত নামাতে, ভূত ছাড়াতে পারতেন৷ নবাবের সুন্দরী মেয়েকে একবার ভূতে ধরল৷ ওরা বলে জিন৷ কেউ জিন চেলে দিয়েছিল৷ আমার সেই দাদুর দাদু, সুপার দাদু, নবাব কুলি খাঁর এক নম্বর দোস্ত, শতরঞ্জ খেলার পার্টনার বললেন, আমাকে একটা জয়ঢাক এনে দাও৷ চুনার ফোর্ট থেকে সবচেয়ে বড় ঢাক হাতির পিঠে চেপে ঢাকায় এল, তারপর সেই ঢাক মেয়ের কানের কাছে লাগাতার তিন দিন বাজল৷ সবাই ভাবলে উড়িষ্যার রাজার সঙ্গে বুঝি যুদ্ধ বেঁধেছে৷ সেনাধ্যক্ষ কারওকে কিছু জিগ্যেস না করে ধাঁই ধাঁই করে তোপ দাগতে শুরু করলেন৷ সৈন্যরা দল বেঁধে ছুটতে শুরু করল যে কোনও একদিকে৷ হাতিগুলো খেপে গিয়ে তিনটে খেতের সব ফসল খেয়ে ফেললে৷ মেয়ের মা কালা হয়ে গেল৷ কুলি খাঁ পা স্লিপ করে নিজের তৈরি বৈকুণ্ঠে পড়ে গেলেন৷ তাঁকে তুলে এনে তিন জালা আতর দিয়ে গোসল করানো হল৷’
‘সেই জিনটার কী হল?’
‘সবাই দেখলে, মেয়েটার শরীর থেকে এক সুন্দরী বেরিয়ে এল৷ সুপার দাদু জিগ্যেস করলেন, তুমি কে? জিন বললে, আমি আনারকলি৷ মুর্শিদ বৈকুণ্ঠে ফেলে হিন্দু জমিদারদের বহুত কষ্ট দেয়৷ তাই আমি তার সুন্দরী মেয়ের শরীরে প্রবেশ করে ওই অত্যাচারীকে তারই তৈরি নরকে ঘপাৎ অ্যান্ড ভড়ভড়৷ ওকে বলো ওখানে একটা গোলাপবাগ তৈরি করতে৷ আর এই ঢাকটা আমি তোমাকে দিয়ে গেলুম—গিফট ফ্রম আনারকলি৷ যখনই বাজাবে ঢাক বলবে, দুনিয়ায় অত্যাচারীর স্থান নেই৷ নিপাত যাক, নিপাত যাক৷ এই হল ঢক্কা কাহিনি৷ এইবার দূর হ! আমি ছবি আঁকব৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন