সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমার শোয়ার ঘরটা দোতলায়৷ ওটা আমার ঘর নয়, আমার বাবার ঘর৷ সেই ঘরে তিনি সারাজীবন কাটিয়েছেন, লেখাপড়া করেছেন৷ ঘরে একটা খাট আছে, সেই খাট তিনি ব্যবহার করতেন, তিনি শুতেন৷ বাবা চলে যাওয়ার পর আমরা ঠিক করি, ওই ঘরটা আমরা সাধারণভাবে ব্যবহার করব না৷ ওটা ঠাকুরঘর, একটা মিউজিয়াম, একটা স্মৃতিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করব৷
ওই ঘরে বাবার একটা বড়মাপের ছবি আছে৷ তার ডান দিকে শ্রীরামকৃষ্ণ, বাঁদিকে মা সারদা৷ এছাড়াও সারা ঘর ঠাকুর-দেবতা, মনীষীদের ছবিতে ভর্তি৷ মেঝেতে একটা কার্পেট পাতা, খাটটা কার্পেটের ওপরেই রাখা৷ আর এই যে ছবিগুলো—সব খাটের ওপরে খাড়া করে পাশাপাশি রাখা৷ ঘরটায় ঢুকলে মনে হবে খাটের ওপর যেন একটা সভা চলছে৷
আমি ওই কার্পেটের ওপরে একটা ছোট তোশক বিছিয়ে শুয়ে থাকি৷ ঘরটাতে শুয়ে আমার খুব শান্তি অনুভব হয়৷ এইভাবেই চলছিল৷ হঠাৎ একদিন গভীর রাতে একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল৷ ঘরের দরজায় কেউ বাইরে থেকে ঠকঠক শব্দ করছে৷ অদ্ভুত! এত রাতে কে দরজা খটখটাচ্ছে? জিজ্ঞেস করলাম, কে?
কেউ সাড়া দিল না৷ অগত্যা উঠতেই হল৷ দরজা খুলে অবাক হয়ে গেলাম, কেউ কোথাও নেই৷ সারা বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ গায়ে একটা হালকা শিরশিরানি অনুভব করলাম৷ স্বপ্ন নয়, আওয়াজটা আমি স্পষ্ট শুনেছি৷
মনে জোর এনে আলো জ্বালালাম৷ ঘর-লাগোয়া লবি, সিঁড়ি সব শুনশান, কেউ নেই৷ ঘড়ির দিকে তাকালাম, রাত দুটো৷ কী আর করি৷ ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম৷
পরের দিন৷ কাজের ব্যস্ততায় গতকাল রাতের কথা ভুলেই গেছিলাম৷ রাতে শোয়ার সময় ব্যাপারটা মনে পড়ল৷ মনটা খচখচ করছিল৷ যাই হোক, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না৷
ঘুম ভাঙল আবার সে-ই শব্দে৷ ঠকঠক-ঠকঠক৷ আজ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছি৷ আমি বরাবরই একটু ভীতু স্বভাবের৷ ঘড়ি দেখলাম, ঠিক রাত দুটো৷
ঠিক করলাম, যাই ঘটুক আজ উঠছি না, দেখি দরজা না খুলে কী হয়৷ কিন্তু সেদিন আবার এক নতুন ঘটনা ঘটল৷ ওই ঘরের একটা দিকে কিছু মূর্তি আর কিছু ছোট ছবি দাঁড় করানো ছিল৷ এতকাল যেগুলো ঠিকঠাক দাঁড়িয়েছিল, আজ হঠাৎ সেগুলো দুড়দাড় শব্দে পড়ে গেল৷
ওই ঘরের পশ্চিমদিকে একটা বারান্দা আছে৷ তার দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ থাকে৷ স্পষ্ট শুনলাম সেই বারান্দাতে কার যেন পায়ের শব্দ৷ ওপরে আমি একা৷ আর দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই! এই এতগুলো শব্দের ধাক্কায় রাতটা কোনোরকমভাবে জেগে শুধু হরিনাম করে কাটিয়ে দিলাম৷
তৃতীয় দিন৷ সারাটা দিন শুধু নিজের মনে ব্যাপারটা নিয়ে থই খোঁজার চেষ্টা করেছি৷ একটা জিনিস পরিষ্কার, ওই ঘরে দরজা ঠকঠকানোর মানে হচ্ছে কেউ ঘরের মধ্যে ঢুকতে চাইছে৷ কিন্তু সে কে? এই রহস্য ভেদ করতেই হবে৷
সেদিন আমি সাহস করে দরজাটা ভিতর থেকে লক না করেই শুয়ে পড়লাম৷ আমি তো মেঝেতে শুই, আমার মাথা দক্ষিণে, পা উত্তরে, আমার ডান দিকে দরজা৷ সেই দরজা যার তলা দিয়ে সুন্দর পূবের হাওয়া ফুরফুর করে আসছে৷
ঠিক রাত দুটো৷ আমি জেগেই ছিলাম৷ আমি দেখতে চাই ঠিক কী হয়৷ দরজাটা আস্তে আস্তে খুলে গেল৷ প্রথমে ভেবেছিলাম হাওয়া৷ কিন্তু না, হাওয়া এত জোরেও দিচ্ছে না যে দরজাটা খুলে যাবে৷ তাহলে আগেও খুলতে পারত৷ কিন্তু ঠিক রাত দুটোর সময় কেন?
দরজাটা শুধুই খুলে গেল৷ আর কিচ্ছুটি বোঝা গেল না৷ আমি পড়লাম মহা বিপদে৷ আমি কী এবার দরজাটা ভেজিয়ে দেব, না খোলাই থাকবে? ডানহাতটা বাড়িয়ে আমি দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়েই দিলাম৷ উঠে দাঁড়িয়ে ছিটকানি দেওয়ার ক্ষমতা নেই৷ প্রচণ্ড ভয়ে সিঁটিয়ে গেছি! কারণ আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না৷ যা ঘটছে সব আমার জ্ঞানত ঘটছে৷ সব আমার চোখের সামনে৷
এইভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল৷ চুপচাপ মড়ার মতো শুয়ে আছি৷ শুধু ভাবছি, কেউ সত্যি-সত্যি ঘরে ঢুকলে আমি বুঝব কী করে? হঠাৎ চোখ পড়ল আমার ঘড়ির দিকে৷ একটা টাইমপিস৷ দরজাটা যখন খুলে গেছিল তখন বেজেছিল রাত দুটো৷ দেখি, ঘড়িটা কখন দুটো বেজে পাঁচে বন্ধ হয়ে গেছে৷ আশ্চর্য, একদিন আগেই আমি ওটার ব্যাটারি পালটেছি৷ আজ হঠাৎ করে ঘড়িটা এইভাবে বন্ধ হয়ে গেল!
এরপর না-পারছি উঠতে, না-পারছি কাউকে ডাকতে৷ কারণ, আর আমার সাহসে কুলোচ্ছে না৷ কেবল নিজের মনের মধ্যে যুক্তি-তক্কের জাল বুনে চলেছি, আচ্ছা, এই যে একজন অশরীরী ঘরে প্রবেশ করলেন তিনি ভালো না খারাপ? কারণ, এই ঘরে আমার বাবা থাকতেন, তিনি সাধক মানুষ ছিলেন৷ ঘরের মধ্যে ঠাকুর-মা-স্বামীজির ছবি৷ মাঝখানে বাবার ছবি৷ তাছাড়া ওই ঘরে আরও যা ছবি আছে সবই ঠাকুর-দেবতার৷ আমার মনে হয় না এই ঘরে অশরীরী যেই আসুন, তিনি খারাপ কেউ হবেন৷ নিজের মনকে সান্ত্বনা দিলাম, যে আসছেন তিনি ভালোই কেউ৷ কিন্তু তিনি কে? একসময় পাখির ডাক কানে এল৷ বুঝলাম, ভোর হয়ে গেল৷
আশ্চর্য কাণ্ড, বন্ধ ঘড়িটা সকালবেলা টিকটিক করে আবার চলতে শুরু করল৷ টাইমটা কিন্তু রইল দুটো বেজে পাঁচ৷ আমি পড়লাম মহা ফাঁপরে, আমার কি টাইমটা ঠিক করে দেওয়া উচিত? না কি যেমন চলছে চলুক! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হল আরে, টাইমটা যদি ঠিক না করি তাহলে আজ রাত দুটো পাঁচ ঠিক সময়ে বাজবে না৷ তখন তো সব গন্ডগোল হয়ে যাবে৷
আজ চতুর্থ দিন৷ আবার রাত এল৷ বাবার ঘরের দরজাটা পূবদিকে৷ পশ্চিমদিকে খাটটা উত্তর-দক্ষিণে পাতা৷ আরও পশ্চিমে ওই বারান্দার দরজা৷ সেই দরজা দিয়ে বারান্দায় বেরোলে দেখা যাবে, একটা বিশাল বেলগাছ৷ একটা সুন্দর হলুদ ফুল-গাছ, তিকোমা৷ আরও পশ্চিমে তিনশো পা গেলেই গঙ্গা৷
বারান্দায় বেরোবার দরজার দুদিকে বিশাল জানালা, যা সচরাচর খোলা হয় না৷ আজও সেটা বন্ধ৷ কিন্তু আজ হাওয়ার বেগ এত বেশি যে জানলা-দরজা বন্ধ থাকলেও ঘরে বসে বিশাল বেলগাছটার ডালপালা ঝাপটানোর শব্দ পরিষ্কার কানে আসছে৷
আজ গরম কম৷ খুব ঘুম পাচ্ছে৷ ভাবলাম, যে আসছেন আসুন৷ দরজাটা খুলেই রাখলাম৷ রোজ কোনো মানুষ রাত জাগতে পারে—মনে প্রশ্নটা থেকেই গেল—কে আসছেন? বাবা? কিন্তু বাবা তো কবে মারা গেছেন, তাঁর আত্মার তো মুক্তি ঘটে গেছে৷ তিনি কেন প্রেত হবেন? আর কিছু ভেবে পেলাম না৷ মনকে বোঝালাম, বাবা-ই নিশ্চয় আসছেন তাঁর সাজানো বাগান ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে৷ ঘুমোবার চেষ্টা করলাম৷
বিধাতার ইচ্ছে ছিল অন্য৷ অকারণেই আমার ঘুম ভেঙে গেল৷ ঘড়ি দেখলাম রাত দুটো৷ দরজাটা আস্তে-আস্তে খুলে গেল৷ কী সুন্দর সেই খোলার ধরন৷ এ কী, একী দেখছি আমি? কেউ যদি ঘরে ঢোকে তাহলে তো তার পুরো অবয়বটাই দেখতে পাওয়া যাবে৷ আমি দেখছি শুধু দুটো পা, আলতা পরা৷ তার ওপর শাড়ির লাল পাড়৷ ব্যস, তারপর আর কিছু নেই৷
ধীরে-সুস্থে পা’টা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে৷ সারা গায়ে আমার কাঁটা দিয়ে উঠেছে, হাত-পাগুলো কাঁপছে৷ শাড়ির পাড়টা আমার খুব চেনা, আমি খাটের দিকে তাকালাম৷ বাবার ছবির ডানপাশে ঠাকুর, বাঁপাশে মা সারদা, তার বাঁপাশে আমার মা৷ একটা থামে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন৷ মাকে একবার কুমারী-পুজো করা হয়েছিল, মা সাদা শাড়ি লাল-পাড় পরা৷
আমি আবার জোড়া পায়ের দিকে তাকালাম, ওই শাড়িটাই এই শাড়ি৷ সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু মিলিয়ে গিয়ে কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে গেল৷ মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল ‘মা’৷
ভেবে আশ্চর্য হলাম, বাবা মারা যাওয়ার কত আগে মা চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে৷ তখন আমার বয়স চার কি পাঁচ৷ আজ এতদিন পর মা আসছেন! তাহলে কি মায়ের পুনর্জন্ম হয়নি, মায়ের কি মুক্তি ঘটেনি? এ প্রশ্নর আমি কোনো ব্যাখ্যাই খুঁজে পেলাম না৷ মা আসছেন নিশ্চয়ই বাবার কাছে৷ কিন্তু কেন? কেউ উত্তর দেওয়ার নেই, নিজেকে খুব অসহায় বোধ করছি৷ তাই প্রশ্নটা মায়ের উদ্দেশ্যে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলাম৷
‘মা, তুমি কেন আসছ, আমায় বলো৷’
ঘড়ির দিকে তাকালাম—দুটো পঁচিশ! সবকিছু থেমে গেল৷ আমার শরীরটা আস্তে আস্তে ছেড়ে দিচ্ছে৷ রাজ্যের ক্লান্তি গ্রাস করছে৷ ধীরে ধীরে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম৷
সেই রাত্রেই একটা স্বপ্ন দেখলাম, মা আমার মাথার কাছে বসে আছেন৷ আমায় বলছেন, ‘শোনো, তোমার বাবা তো শেষ দিকে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন৷ তোমার মনে আছে, উনি খেতে পারতেন না? রাইন্স-টিউব দিয়ে খাইয়ে দেওয়া হতো৷ তুমি একটা সন্দেশ এনেছিলে, সেটার একটুখানি জলে গুলে রাইন্স-টিউব দিয়ে খাইয়েছিলে? আমি তখনও আসতাম৷ তোমার বাবা খুব সন্দেশ ভালোবাসতেন৷ ওনার সামনে একআধটা ভালো সন্দেশ রেখো৷ আর এই ঘরে প্রতিদিন কিছু নৈবেদ্য রেখো৷ নিয়ম করে পুজো-আর্চা কোরো৷ নইলে সবকিছু কেমন শুকনো-শুকনো লাগে৷’
‘তোমার বাবা রাত দুটো বেজে পাঁচে চলে গিয়েছিলেন, মনে আছে তোমার? আমি আসি ঠিক তার পাঁচমিনিট আগে৷ আর দুটো পাঁচে আমরা হাত ধরাধরি করে ওই বারান্দার দরজা, বারান্দা, বেলগাছ পেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে একটু বসে থাকি৷ ওতে আমরা শান্তি পাই৷ আমাদের তো শরীর নেই, তাই কারোর কিছু বলারও নেই৷ আমি আবার আসব৷ প্রতি রাতেই আসব৷’
পরদিন একটু দেরিতে ঘুম ভেঙেছিল৷ মনে একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করেছিলাম৷ ওই ঘরটার মেঝেটাকে আজ যেন একটু বেশি ঝকঝকে মনে হচ্ছে৷ আমি মেঝেতে নিজের গালটা ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলাম৷ আঃ! কী আরাম!
মা বলে গেছিলেন, তিনি প্রতি রাত্রে আসবেন৷ কিন্তু সে-রাত থেকে অনেক রাতেই নিয়ম করে ওই সময়ে উঠেছি মাকে অনুভব করব বলে৷ মা আসেননি৷
তবে একলহমার জন্য শুনতে পেয়েছি পশ্চিমদিকের বেলগাছটাতে একটা তীব্র ঝটপট শব্দ৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছি, রাত দুটো বেজে পাঁচ৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন