বন্ধু

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সুদাম আর আমি একই ক্লাসে পড়ি৷ ক্লাস সেভেন৷ আমাদের স্কুলটা গঙ্গার তীরে৷ খুব বড় নয় কিন্তু ভারী সুন্দর৷ বাইরেটায় হালকা গেরুয়া রং৷ দরজায়, জানালায় ঝকঝকে মেহগনি রং-এর পালিশ৷ মেঝে লাল চকচকে৷ ক্লাসরুমের ভেতরের দেয়ালে হালকা নীল রং৷ মাথার ওপর রাজহাঁসের মতো সাদা সাদা পাখা ফনফন করে ঘোরে৷ বেঞ্চ আর হাই বেঞ্চে ঝকঝকে পালিশ৷ চারপাশে সুন্দর বাগান৷ গ্রীষ্মে এক রকমের ফুল৷ শীতে আর এক রকম৷ বাগানটা সারা বছরই যেন ফুলের হাসিতে ঝলমল করে৷ সুদাম রোজই আমাকে বলে, ‘দেখ, পলাশ! আমরা আর বাড়ি যাব না৷ এইখানেই থাকব৷ বাড়িতে গেলেই অশান্তি৷ এই থামে তো, এই শুরু হয়৷ একটা বাড়িতে অত লোক, শান্তিতে থাকা যায়?’

আমাদের বাড়িতে কোনও অশান্তি নেই কিন্তু ভূতের বাড়ি৷ সবাই বলে ‘ভূতের বাড়ি’৷ আমি আর আমার বাবা৷ মা অনেক দিন আগে মারা গেছেন৷ সুদাম মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এসে থাকে৷ বাবা সুদামকে ভীষণ ভালোবাসেন৷ আমিও বাসি৷ যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি সুন্দর স্বভাব৷ লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো৷ আমার যেমন মা নেই, সুদামের সেই রকম বাবা নেই৷

বাবা অফিস থেকে এসে আমাদের দুজনকে পড়াতে বসেন৷

আমি তেমন কাজের নই৷ একটু আদুরে৷ সুদাম খুব কাজের৷ বাবার জন্যে চা তৈরি করবে৷ কেটলিতে জলটা অবশ্য আমিই ভরব৷ বাকিটা সুদাম ঝটপট করে ফেলবে৷

বাবা বলেন, প্রত্যেকেরই উচিত সব কাজ শেখা৷ সেলফ হেল্প ইজ বেস্ট হেলপ৷

ন’টা পর্যন্ত পড়া হবে৷ তারপর রাতের রান্না৷ আমাদের বাড়িতে রোজই যেন পিকনিক৷ প্রথমে একটা মিটিং হবে৷ আমরা তিনজনে আলোচনা করব আজ কী রান্না হবে৷ বেশিরভাগ দিনই সুদাম ঠিক করে৷ আমরা সমর্থন করে কাজে লেগে যাই৷

আমাদের একটা তোলা উনুন আছে৷ আগে আমাদের পরিবারে সবাই যখন বেঁচে ছিলেন, মা, জ্যাঠাইমা, জ্যাঠামশাই, অনেক কাজের লোক, আত্মীয়স্বজন, তখন একটা মস্ত বড় উনুনে রান্না হত৷ সেই উনুনটা আছে, মস্ত একটা চিমনি লাগানো৷ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, আর ভাবি, সেই সব দিন কি আর ফিরে আসবে৷

সুদাম উনুন ধরায়, আমি আনাজ কাটি আর বাবা দলাই মলাই করে ময়দা মাখেন৷ খেতে খেতে সেই রাত বারোটা৷ আমি আর সুদাম এক ঘরে৷ পাশের ঘরে বাবা৷ অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেন৷ আমাদের বলেই রেখেছেন সুদাম যাতে ভয় না পায়—পুরোনো বাড়ি, রাতে অনেক রকম শব্দ শুনতে পাবে৷ ভয় পাবে না৷

আমরা দুজনে পাশাপাশি শুয়ে কত রকম গল্প করি৷ সুদামের খুব ইচ্ছে জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে৷ সমুদ্রে জাহাজ চালাবে, দেশ-দেশান্তরে ঘুরবে৷ আলমারির মাথায় একটা গ্লোব আছে৷ সেইটা নামিয়ে এনে দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত দেখি৷ জাহাজ অস্ট্রেলিয়ায় যাবে, জাপানে যাবে, ম্যানচেস্টারে যাবে, যাবে বোস্টনে৷ সুইডেনেও চলে যেতে পারে৷ ফ্রান্সে অবশ্যই যাবে৷

সুদাম বলেছে, তুই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবি৷ তাহলে আমরা দুজনে একই জাহাজে থাকব৷ তোকে ছাড়া আমি তো থাকতেই পারব না৷ আমিও তো সুদামকে ছাড়া থাকতে পারব না৷

এক সময় আমরা ঘুমিয়ে পড়ি৷ সুদামের একটা হাত আমার বুকের ওপর৷ রাতে সমুদ্রের স্বপ্ন দেখি৷ নীল সমুদ্র৷ সাদা ধবধবে একটা জাহাজ৷ বড় বড় ঢেউ উঠছে৷ ফেনায় ভেঙে পড়ছে৷ সুইস, সুইস শব্দ৷ অনেক গাং চিল উড়ছে৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%