টপ সিক্রেট

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

একসময় আমার টেররিফিক ভূতের ভয় ছিল৷ আমার দোষ নেই, ভূতরা যে কোনো কারণে আমাকে লাইক করত৷ ভূতদেরও দোষ নেই৷ একসময় তারা তো মানুষই ছিল৷ সেই স্মৃতি৷ কাঁহাতক ভূতেদের মধ্যে থাকা যায়৷ নাকি সুরে একই রকম কথা৷ আর সব কথাই তো দুষ্টুমির কথা৷ কার ঘরের বন্ধ জানলা ধধ্ধড়্ করে কাঁপিয়েছে৷ জলের গেলাস টেবিলের ওপর উলটে দিয়েছে৷ দলিল দস্তাবেজ ভিজে জাব৷ একজন খাটে ঘুমোচ্ছিল, মাঝরাতে তার ঠ্যাং ধরে টেনে খাট থেকে ফেলে দিয়ে পালিয়েছে৷ মানে যত রকমের বদমাইশি৷ আজ পর্যন্ত কোনো ভূত একটা ভালো কাজ করেছে এমন শোনা গেছে কি! আমার দিদি একটা অদ্ভুত দিদি৷ ভূত-প্রেত কিছুই বিশ্বাস করে না৷ একটা গোঁয়ার গোবিন্দ৷ ভূতদের আর পাড়ার দাদাদের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও যথেষ্ট খাতির করা উচিত৷ আমি কিন্তু বলে দিলুম, আমার দিদি যদি স্বভাব না পাল্টায় ভীষণ বিপদে পড়বে৷ আমি একজন আছি, কান ধরে টানছে, চুলের মুঠি ধরে মাথাটা ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে, পিঠে ঢাক বাজাচ্ছে৷ কিছু বললেই বলবে, বেশ করেছি, তুই না আমার ভাই! এই কথাটা শুনলেই আমার ভেতরটা কেমন করে৷ মনে মনে বলি, ‘আমার দিদি, আমার দিদি!’

আমাকে টানতে টানতে মসজিদে নিয়ে গেল৷ পীরবাবা শুনে বললেন, ‘ভূত আছে, থাকবে৷ আমি ভূত ছাড়াতে পারব না, ভূত অনেক উপকারও করে, আমি এর ভয়টা ঝেড়ে দিচ্ছি৷’

পীরবাবার হাতে একটা মাঝারি মাপের ঝাড়ু ছিল, সেইটা দিয়ে বেশ কয়েকবার আমার আগাপাশতলা ঝেড়ে দিলেন৷ কী একটা ভাষায় নানা রকম মন্ত্র পড়লেন৷ তারপর বিদঘুটে একটা জিনিস আমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চিবো৷ চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে ফেল৷ একটু পরেই খুব জ্বর আসবে৷ ঠিক রাত দুটোর সময় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাবে৷ তখন ঘরের উত্তর দিকের দরজাটায় খুব শব্দ হবে৷ ছাতে ধুপধাপ শব্দ হবে৷ ডারো মাত৷ তোমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা বড় বেল গাছ আছে৷ একটু দূরেই গঙ্গা৷’

‘হ্যাঁ, আছে তো৷ আশ্চর্য! আপনি কী করে জানলেন?’

‘আমি আকাশ পথে মাঝে মাঝে প্যাঁচা হয়ে উঠে বেড়াই যে৷ যারা ওপর দিকে রয়েছে, তাদের দেখা শোনা করতে হবে তো!

তোমাদের বেল গাছে বত্রিশটা বেল ছিল৷ আজ সকালে একটা পড়ে গেছে৷’

‘আপনি এত সব জানেন?’

‘সাধন-ভজন করতে হয়, তবেই না হয়৷ মাসে আমি তিন দিনের জন্যে মরে যাই, তারপর আবার বেঁচে উঠি৷ আমি এই ভাবে এখনো পর্যন্ত তিন হাজার বার মরেছি, তিন হাজার বার জন্মেছি৷ আমার বয়েস সব সময় ২৭ দিন৷ তার মানে, সাত আর দুয়ে নয়, তারপরেই শূন্য৷ অঙ্ক জানো?’

‘খুব কম নম্বার পাই৷ বাবা রেগে গিয়ে বলেন গবেট, ডান্স, ইডিয়েট৷ ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব না৷ ইংল্যান্ড, আমেরিকা যেতে পারব না৷’

‘বলেছেন? এদিকে আয়৷ মাথাটা নিয়ে আয়, ডানদিকটা একটু চড়িয়ে দি৷ বুঝলি, মাথা একটা তবলা৷ ওইতেই যত বোল, একতাল, তিনতাল, চৌতাল, ফাঁকতাল৷’

পীরবাবা ছোট্ট একটা রুপোর হাতুড়ি এনে মাথার ডানদিকে ঠুকঠুক করে কয়েকবার মারলেন, আর বলতে লাগলেন, ‘খুল যা খুল যা সিম সিম৷’ তারপর আমার হাতে ছোট্ট একটা ডিবে দিয়ে বললেন, ‘ওই বাইরেটায় গিয়ে শোঁকো, তারপর কবার হাঁচি হয় গুনে আমাকে বল৷’

‘মোট সাতাত্তরটা হল৷’

বললেন, ‘যাও, অঙ্কে সাতাত্তর৷’

‘আশি হলে ভালো হত৷ লেটার৷’

‘সে আর কি করা যাবে তুমি যে তিনটে হাঁচি কম হাঁচলে!’

দিদি বললে, ‘পীরবাবা৷ এটা ভীষণ একগুঁয়ে, কারো কথা শোনে না৷ যা মনে হবে তাই করবে৷ করবেই করবে৷’

পীরবাবা বললেন, ‘ও তো দেখতেই পাচ্ছি, ভেতরে একটা উল্কা ঢুকে গেছে৷’

‘উল্কা?’

‘হ্যাঁ, আকাশে যে উল্কাপাত হয়৷ খোলা ছাতে হাঁ করে শুয়েছিল, ঢুকে গেছে৷’

‘কী হবে তা হলে?’

‘রোজ সকালে এক গেলাস করে বার্লি খাওয়াও টানা একমাস৷ আর খেয়াল রাখ, এই যে ঝেড়ে দিলুম ওর ভেতর থেকে একটা চামচিকি বেরিয়ে ঘরে তিনটে পাক মেরে জানলা দিয়ে হুস করে বেরিয়ে যাবে৷’

কথা শুনে দিদির চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেছে৷ আমার খুব মজা লাগছে৷ দিদি বললে, ‘আমাকে একবার চামচিকিতে লাথি মেরেছিল, কিছু হবে না তো বাবা?’

‘রোগা হয়ে যাবে৷ সামান্য ওজন কমে যাবে৷ এই আর কি? রোজ ছাতু খাও৷ ভুট্টা খেতে পার৷ টক দই৷’

সুতোর মালা গলায় পরে আমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলুম৷ সেবার জন্যে দিতে হল পাঁচসিকে এক আনা৷ আমাদের মুখে দুটো করে কিসমিস৷ পীরবাবাকে খুব সুন্দর দেখতে৷ যৌবনে ঘোড়ায় চড়তেন৷ দুজনেই বৃদ্ধ হয়েছেন৷ এই অঞ্চলের সবাই বাবাকে খুব শ্রদ্ধা, ভক্তি করেন৷

এক মাসের মধ্যে আমার ভূতের ভয় এতটাই কমে গেল যে শ্মশানেও রাত কাটাতে পারি৷ তারকদা তান্ত্রিক৷ তারাপীঠে ছোট্ট একটা আশ্রম আছে৷ ভয় কাকে বলে জানেন না৷ আমাকে কিছু কিছু ব্যাপার বলেছেন৷ এক নম্বর মোস্ট ইম্পর্টেন্ট, ‘তোর সঙ্গে তোর যে ছায়াটা ঘোরে, সেটা তোর ভূত৷ ওটা বড় হয়, যখন তুই বড় চিন্তা করিস, ওটা ছোট হয় যখন তুই বাজে বাজে জিনিস ভাবিস৷ যখন ভয় পাস তখন ছায়াটা কুঁকড়ে যায়, যখন শরীর খারাপ তখন ছায়াটা পাতলা হয়ে যায়৷ রোজ বেলা বারোটার সময়ে ছায়ার মৃত্যু হয়৷ সূর্য তখন আকাশে আমাদের মাথার ওপর থাকে৷ রাত বারোটার সময় যত ছায়া সব শ্মশানে শ্মশানে ভিড় করে৷’ দ্বিতীয় জরুরি কথা, ‘মাঝরাতে জানলার বাইরে হাত বাড়াবি না৷ তোর ভেতরটা টেনে নিয়ে চলে যাবে৷ রস টেনে নেবে, তুই গাছের পাতার মতো শুকিয়ে যাবি৷ অমাবস্যার মধ্যরাতে শ্মশানে গিয়ে চিতার পাশে দাঁড়াবি, আগুনের উত্তাপ, ধোঁয়া গায়ে মাখবি৷ মানুষের সারবস্তু সব ওই সময় বেরিয়ে আসে৷ আগুনের মধ্যে মা কালীকে দেখতে পাবি৷ মায়ের লকলকে জিভে আগুন খেলা করছে৷ যে মরতে ভয় পায় না, দুনিয়ায় সেই হচ্ছে প্রকৃত সাহসী৷’ তারকদা মড়ার মাথার খুলি নিয়ে খেলা করেন৷ বাতির সামনে খাড়া করে রাখেন৷ দুটো চোখ আর নাকের গর্ত দিয়ে আলো বেরিয়ে আসে৷ প্রথম যেদিন দেখি, সেদিন প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম৷ তিন রাত্তির ঘুমোতে পারিনি৷ দিদিকে কিছু বলিনি৷

পীরবাবা বলেছিলেন, ‘তোমাদের বেল গাছে একজন ব্রহ্মদৈত্য আছেন, আমাকে খুব ভালোবাসেন৷’

প্রথমে আমি বিশ্বাস করিনি৷ দিদি করেছিল৷ একদিন ঝাপসা মতো কারোকে যেন দেখেছিল৷ সাদা ধুতি৷ সাদা পৈতে৷ আমাকে বলে ভিতু৷ নিজে কী? সবে শাড়ি পরতে শিখেছে৷ ছুটে পালাতে গিয়ে শাড়িতে পা জড়িয়ে ধপাস৷ রাতে বিছানায় শুয়ে আমাকে বললে, ‘আছে রে, আছে৷’

‘কে আছে?’

‘বেল গাছে, তিনি আছেন৷ লম্বা, চওড়া সাদা ধুতি, মোটা পইতে৷ ব্রহ্মদৈত্য স্যার৷’

‘কিছু বললেন?’

‘আর বললেন! ভয়ে দৌড়৷ চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে—দাম! হাঁটুতে অ্যায়সা লেগেছে৷’

‘মাকে বলেছিস?’

‘না, বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি৷’

‘তুই রাজরানী হবি৷’

‘থাম তো, যত সব বাজে বাজে মেয়েলি কথা৷ রাজরানী হলে কত কিলো গয়না পরতে হয় জানিস? আর ছবিতে রাজাদের চেহারা দেখেছিস তো! ঘোড়ার মতো মুখ, ওলের মতো মুখ, পেল্লায় পেল্লায় ভুঁড়ি৷ এক একটার ওজন দু’মন, তিন মন৷ হাতির পিঠে যখন বসে, হাতি দেবে যায়৷ ইতিহাসে পড়িসনি, রাজা ইয়াসুদ্দিন খণ্ডঘোষের যুদ্ধে কী ভাবে নিশা খাঁর কাছে পরাস্ত হলেন৷ যুদ্ধটা হচ্ছিল বিরাট একটা খেলার মাঠে৷ ইয়াসুদ্দিন হাতির পিঠে উঠতেই তার চারটে পা মাটিতে এক ফুট করে দেবে গেল৷ ড্যাঙোস মারলে কী হবে? হাতিটা শুঁড় তুলে ডাক ছাড়ছে৷ ওদিকে বাঁশ পাতার মতো লিকলিকে সাতফুট লম্বা নিশা খাঁ চোদ্দো ফুট লম্বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিদ্যুৎবেগে এসে এক কোপ৷ মুন্ডুটা ছিটকে পড়ল পেনাল্টি এরিয়ায়, ওদের সেন্টার ফরোয়ার্ড টুক করে ঠেলে দিল গোলে৷ ওই মাঠে নিশা খাঁর হাজার ফুট উঁচু একটা মূর্তি বসান হয়েছিল৷ ইংরেজ বণিকরা এসে পড়ল৷ দুর্দান্ত, দুঃসাহসী ক্লাইভ ওই মূর্তিটায় রোপ ক্লাইম্বিং প্র্যাকটিস করতেন৷ ওয়াটসনও কম যেতেন না৷ মূর্তিটার কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে জয়নগরের মোয়া খেতেন৷’

‘তোর এই ইতিহাসটা কোথায় আছে?’

‘সম্ভবত তিববতের কোন গুহায়৷ বিশেষ ভাবে লুক্কায়িত৷ চোমং লামাকে আমি দার্জিলিং চা খাওয়াতুম৷ আমাকে বেটি, বেটি বলে ডাকতেন৷ আমার এত বড় বড় চুল হল কী করে? চোমংদাদু আমাকে এক দলা ইয়াকের চর্বি দিয়ে বলেছিলেন, টিকের আগুনে গলিয়ে গরম গরম মাথায় চাঁদিতে মালিশ করবি৷ দেখবি বালিশের ওপর চুল পড়ে আছে, সড়সড় করে বেড়ে যাচ্ছে৷ চুল জীবন্ত, চুলের আলাদা প্রাণ আছে৷ চুল কখনো মরে না৷’

‘রাখ তো, তোর যত আজগুবি কথা৷ কাল অমাবস্যা, একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না?

‘কী চেষ্টা?’

‘ওই ব্রহ্মদৈত্য স্যার৷ আমার কিছু প্রশ্ন আছে রে!’

‘মা জানতে পারলে?’

‘রাত বারোটায় সবাই ঘুমোবে৷’

‘তাহলে একটা মোটা পইতে চাই৷’

‘সে হয়ে যাবে৷ আমি কালীবাড়িতে গিয়ে তারকদাকে দিয়ে করিয়ে আনব৷’

‘ডান৷’

‘থ্যাঙ্ক ইউ দিদি৷’ দিদিকে জড়িয়ে ধরলুম৷ ‘ছাড়, ছাড়, আমার চুল বাড়ছে৷ তুই পেঁয়াজ খেয়েছিস?’

‘সে তো বিকেলে৷ আশু আলুকাবলি খাওয়ালে৷’

‘আমাকে খাওয়ালি না?’

‘একদম বাজে৷ তেঁতুল গোলা জল দেয়নি৷ গুচ্ছের ঝাল৷ কাঠি দেয়নি৷ গিঁতে গিঁতে খাবো তো৷ শুকনো ধনেপাতা৷’

‘ছেড়ে দে৷ ইমলি কি পানি ছাড়া ফুচকা আর কাবলি হয়! নে, নে ঘুমিয়ে পড়৷ সদরের পেটা ঘড়িতে বারোটা বাজছে৷ এখুনি শুরু হবে চৌকিদারদের লাঠি ঠকঠক৷ কালও গঙ্গায় ডাকাতদের ছিপ নৌকো দেখা গেছে৷ পরপর তিনটে পাঁই পাঁই করে বাগবাজারের দিকে চলে গেল৷ কার সর্বনাশ করতে গেল কে জানে! আমরা বড়লোক হইনি, বেশ আছি, কী বল?’

‘শোন দিদি, তুই রাজরানী হোস না৷ তুই আমার দিদিই থাক৷’

অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার৷ কালীবাড়িতে পইতে করাতে গিয়ে তারকদার কাছে জেনে এসেছি, রাত দশটা পনেরো মিনিটে লেগেছে৷ পাওয়ারফুল অমাবস্যা৷ সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়িতে ঝম ঝম করে আরতি হচ্ছে৷ মহাশ্মশান থেকে মা আজ মন্দিরে আসবেন৷ মহাদেব উঠে বসবেন৷ দিনের পর দিন একভাবে শুয়ে থাকতে ভালো লাগে!

বেল গাছের তলাটা খুব সুন্দর করে বাঁধানো৷ মা সন্ধেবেলায় ধূপ-দীপ রেখে যায়৷ দিদি সকালে গঙ্গাজল ঢালে৷ আকন্দের মালা, ধুতুরা ফুল দিয়ে পুজো করে৷ একটু দূরে উত্তর দিকে বাঁধানো একটা রক আছে৷ গ্রীষ্মের দুপুরে এখানে মহিলা মহল বসে৷ চৈত্র, বৈশাখ মাসে দুম দাম বেল পড়ে; কিন্তু কখনো কারো মাথায় পড়ে না৷ মা বলেছে, ‘জানিস মা, বেলের দুটো চোখ আছে৷ একটা বেল হাতে নিয়ে দেখিস৷’

আমাদের সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট একটা কমণ্ডলুতে গঙ্গাজল, পইতে, একজোড়া খড়ম, দুটো ধুতুরা ফুল৷ গায়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে চুপ করে বসে আছি৷ দিদি বলছে চোখ বুজে এক মনে ধ্যান কর, আর বল, ‘বাবা এসো, বাবা এসো৷’

তাই করছি, ‘বাবা এসো, বাবা এসো৷’ প্রার্থনাটাকে আরো শক্তিশালী করার জন্যে মাঝে মাঝে একটু ইংরিজিও ঢুকিয়ে দিচ্ছি, ‘বাবা কাম, প্লিজ কাম৷ কাম বাবা কাম৷’ বেশ মশাও আছে, কামড়ে শেষ করে দিচ্ছে৷ আধখাওয়া ফ্যাকাশে একটা চাঁদ আছে, শেষ রাতে পশ্চিমের আকাশে এসে হাজির হয়৷ দেখলেই শরীরটা কেমন করে ওঠে৷ কবর, কফিন, ক্রশ এই সব মনে পড়ে৷ কিছু দিন আগে স্বপ্ন দেখেছিলুম, চশমা পরা কঙ্কাল, আমাদের পড়ার টেবিলে বসে, আমারই খাতায়, আমার কলম দিয়ে, কী সব লিখছে৷ এই চাঁদটা ভালো নয়৷ আমরা একবার পুরী গিয়েছিলুম৷ হোটেলের সামনেই সমুদ্র নাচছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ আকাশে এই ক্ষেয়ো চাঁদটা৷ দিদি বলেছিল, ‘আমরা ঘুমোবো না৷ হোটেলের বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখবো৷’ সেই চাঁদটাই বেল গাছের আড়ালে এসে হাজির৷ আকাশ বেয়ে পশ্চিমের দিকে নামছে৷

উঃ, কতক্ষণ বসে আছি৷ থানার ঘড়িতে ঘুমন্ত চৌকিদার হাতুড়ি ঠুকে জানিয়ে দিল, রাত দুটো৷ প্রথম শব্দটা বেশ জোরে, পরেরটা দুর্বল৷ অল্প দূরেই গঙ্গার ওপর বালির ব্রিজ৷ সেই মালগাড়িটা ধিকিয়ে ধিকিয়ে যাচ্ছে৷ মাঝরাতে এই আওয়াজটাকে খুব ভয় পাই৷ চারিদিকে ঘন, তরল অন্ধকার, গাছের পাতাগুলো ভোরের অপেক্ষায় থমকে আছে৷ শেষ একটা জোনাকি একেবারে একা, তার সামান্য অবশিষ্ট আলো নিয়ে চলেছে কোথায়, একেবারে দিশেহারা! গঙ্গার ওপারে কোথাও একটা বড় কারখানা আছে, ঝাং করে অনেক লোহা ফেলার শব্দ৷ বেশ বড়, কালো একটা বাদুড় বেলগাছের মাথার ওপর দিয়ে ‘ড্রাকুলার’ মতো উড়ে গেল৷

হঠাৎ বেল গাছের একটা দিক খুব নড়ে উঠল৷ দুম্ করে একটা বেল মাটিতে পড়ে কিছু দূর গড়িয়ে গেল৷ আমি চাপা গলায় বললুম, ‘দিদি!’

‘চুপ্৷ চুপ্ কর৷’

বেশ ভারী একটা কণ্ঠস্বর, ‘আমি এসেছি৷ তোমরা আমাকে দেখতে পাবে না৷ গভীর রাতে আমাকে দেখা যায় না৷ ভর সন্ধেবেলায় চেষ্টা করে দেখতে পার৷ আমি তোমাদের ওপর খুব সন্তুষ্ট হয়েছি৷ তোমাদের দুজনের, তোমাদের পরিবারের খুব ভালো হবে৷ এখন শোনো, ওই পইতে, কাপড়, কমণ্ডলু গঙ্গার ধারের শিব মন্দিরের পূজারিকে দিও৷ একটা বড় গামছাও দেবে৷ বলবে, সদানন্দ দিয়েছে৷ আমি যখন বেঁচে ছিলুম, তখন আমার নাম ছিল সদানন্দ সান্যাল৷ আমিই ওই মন্দিরের পূজারি ছিলুম৷ এখন যে পুজো করে সে আমার ছেলে৷ ভাদ্রমাসের বানে আমি গঙ্গায় ডুবে মারা গিয়েছিলুম৷ ও আমাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিল৷ হাতটা ধরেও ছিল কিন্তু স্রোতের টানে ধরে রাখতে পারেনি৷ ওর হাতে আমার হাতটা আজও ধরা আছে, তাই আমি এই লোক ছেড়ে অন্য লোকে যেতে পারছি না৷ ওকে একটা কথা তোমরা বোঝাবার চেষ্টা কোরো—এই পৃথিবীটা ছাড়াছাড়ির জায়গা৷ কেউ কারোকে ধরে রাখতে পারবে না, আসবে কিছুকাল থাকবে আবার চলে যাবে, আবার আসবে৷ থাকবে শুধু প্রাণের প্রবাহ৷ শোনো, আমি যে এসেছিলুম তার প্রমাণ, আমার অদৃশ্য পায়ে ওই খড়মজোড়া পরে নিলুম৷ এইবার আমি চলে যাচ্ছি, শব্দ শোনো৷’

দিদি আর আমি জড়াজড়ি৷ একটা শব্দ ঠক্, ঠক্, ঠক্ দূর থেকে পশ্চিমে চলে যাচ্ছে৷ সেই জোনাকিটা নেই৷ ধূপ, ধুনোর গন্ধ৷ খড়ম জোড়াটা নেই, সত্যি সত্যি নেই৷ পড়ে আছে টাটকা, সাদা একটা জবা ফুল৷ একটা কথা—‘এটা টপ সিক্রেট! বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি!’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%