সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বিধানবাবু বাসের পিছন দিকে বেশ টাইট হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন৷ একটা হাত হাতলে, আর এক হাতে পকেট সামলাচ্ছেন৷ চোখের সামনে দুটি সতর্কবাণী৷ ‘নিজের জিনিস নিজের দায়িত্বে রাখুন৷ ‘পকেটমার হইতে সাবধান৷’ এই দ্বিতীয় সতর্কবাণী না মেনে চলায়, গত মাসের পুরো মাইনের টাকাটি চলে গেছে৷ বন্ধু-বান্ধবের কাছে হাত পাততে হয়েছিল৷
বিধানবাবুর আজ ভীষণ সর্দি হয়েছে৷ নতুন ঠান্ডা পড়ছে৷ মাথায় তেমন চুল নেই৷ কাল রাতে পাড়ার পুজো প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ যাত্রা দেখেছেন৷ পালাটি, খুব জমাটি ছিল৷ অতটা খেয়াল করেননি৷ হিম লেগে গেছে৷ সকালে গোটা সত্তরবার হেঁচেছেন৷ নাকের স্টকে এখনও মারাত্মক-মারাত্মক সব হাঁচি জমা আছে৷ তেড়েফুঁড়ে বেরোতে চাইছে৷ অনেক কায়দায় চেপে রেখেছেন৷ এই ঠাসাঠাসি ভিড়ে হাঁচলে বাস থেকে কান ধরে নামিয়ে দেবে৷
হাঁচি আর হেঁচকি, মনটাকে ঘুরিয়ে দিতে পারলেই শরীরে তলিয়ে যায়৷ তিনি মনটাকে নানা কায়দায় ঘোরাতে চাইছেন৷ রাস্তা দেখার চেষ্টা করছেন৷ দেখার কি আর উপায় আছে! দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু কি আর দেখা যায়! রাস্তা সাঁই-সাঁই করে উলটো দিকে ছুটে চলেছে৷ কালো পিচের বেল্ট পিছলে চলেছে৷ কনডাক্টারের চিৎকার শুনে বুঝে নিতে হয় বাস এল কোথায়?
কারা কী বলছে সেদিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করছেন৷ অন্যদিন সামনে, পিছনে, মাঝে কোথাও-না-কোথাও ধুম ঝগড়া বেধে যায়, আজ তাও লাগছে না৷ এমন দিনকাল পড়েছে মানুষ বিপদে পড়লে কেউই আর সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসে না৷ এখন দেখছেন নিজেকেই না ঝগড়া বাধাতে হয়! সেলফ হেল্প ইজ বেস্ট হেল্প৷ সেই কতকাল আগে পড়েছিলেন৷ বর্ণে-বর্ণে সত্য৷ ঝগড়ার সুযোগও রয়েছে৷ ঘাড়ের কাছে তখন থেকে একজন কনুইয়ের রদ্দা মেরে চলেছেন৷ একজন ডান পায়ের আঙুলটা থেকে থেকেই মাড়াচ্ছেন৷ পিছনদিকে পায়ের গুলিতে একজন ব্রিফকেসের খোঁচা মেরে চলেছেন৷ তেরোস্পর্শ চলেছে শরীরে৷ লাগালেই হয়৷ বড় শান্তিপ্রিয় মানুষ৷ ঝগড়াঝাঁটি শুনতে ভালোবাসেন৷ করার শক্তি নেই৷
গলার কাছে একটা হাঁচি ঘোট পাকাচ্ছে৷ যে-কোনও মুহূর্তে উড়ে বেরোতে পারে৷ কেবলই ঢোঁক গিলছেন৷ নাকটাকে ফোলাচ্ছেন, ছোট করছেন৷ সম্প্রসারণ, সংকোচন৷ হাঁচি না হয়ে অন্য কিছু হলে এতক্ষণে গুটিয়ে যেত৷ নাঃ, আর পারা গেল না৷ একেবারে ডগায় এসে গেছে৷ যে হাতে পকেট সামলাচ্ছিলেন, সেই হাতে তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে রুমাল বের করতে গেলেন৷ রুমাল বেরোল, সেইসঙ্গে টক করে একটি পয়সা পড়ে গেল বাসের মেঝেতে৷ ছুটে এসে শেষ মুহূর্তে মানুষ যেভাবে চলন্ত ট্রেন ধরে, তিনিও সেইভাবে রুমালটাকে ঠেলে নাকের কাছে তুললেন৷ একে বলে শেষ মুহূর্তে সেভ করা৷ রুমাল চাপা নাক থেকে বদখত একটা আওয়াজ বেরোল৷ শব্দটা তেমন শ্রুতিসুখকর নয়৷ যাঁরা শুনলেন, তাঁরা বললেন, কী মশাই, ফেটে যাবেন যে!
বিধানবাবু শুনলেন, কিছু বললেন না৷ বলার মতো অবস্থা তাঁর নেই৷ হাঁচি আসে জোড়ায়-জোড়ায়৷ আর একটা পাঁয়তারা ভাঁজছে৷ যে-কোনও মুহূর্তে নাক ছেড়ে বেরোতে পারে৷ রুমাল চেপে কোনওরকমে ধরে রাখলেন৷ শেষে গিলে ফেললেন৷ একপ্রকার অসাধ্য সাধন৷
সঙ্কট এখনকার মতো কাটল, এইবার পকেটে হাত দিলেন৷ ছিল দুটো সিকি আর দুটো পাঁচ পয়সা৷ একটা পাঁচ নেই৷ ফেরার বাস ভাড়া৷ পাঁচটা পয়সা অন্য সময় কিছুই নয়৷ আজকাল কোনও ভিখিরিকে দিলেও ছুঁড়ে ফেলে দেয়৷ আজ কিন্তু পাঁচটা পয়সাই তাঁর কাছে ভীষণ মূল্যবান৷ পকেটে আর একটাও পয়সা নেই৷ বুক-পকেটে নোট নেই৷ টায়-টায় ফেরার ভাড়াটি ছিল৷ কাল মাস পয়লা৷ কাল হলে পাঁচটা পয়সার জন্যে মাথা ঘামাতেন না৷ আজ ঘামাতেই হবে৷ পাঁচ পয়সার জন্যে দশ মাইল পথ হেঁটে আসবেন না কী৷ কারুর কাছে চাইতেও লজ্জা করবে৷ চাইলে পাবেন, তবে উদ্ধার করা যায় কিনা, দেখতে দোষ কী! হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই৷
বিধানবাবু প্রথমে ডান পাশে কাত হয়ে নিচের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলেন৷ অসম্ভব ব্যাপার! কুলফি বরফের মতো খাপে-খাপে মানুষ কাপ হয়ে আছে৷ নড়বার, চড়বার, ঝোঁকবার উপায় নেই৷ জোড়া-জোড়া পা ছাড়া কিছুই দেখা যায় না৷
ডানপাশে কাত হতে গিয়ে পাশের ভদ্রলোকের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়ে গেল৷ তিনি বললেন, ‘কী হল কী?’
‘পয়সা পড়ে গেল৷’
পয়সা পড়ে গেলে সকলেরই সহানুভূতি হয়৷ ভদ্রলোক বাঁ-দিকে কাত হয়ে বিধানবাবুকে সাহায্য করতে চাইলেন৷ সেই একই ব্যাপার৷ দুজনের মাথায়-মাথায় আবার ঠোকাঠুকি৷ পাশাপাশি জলে ভাসমান দুটো পেতলের ঘড়ার মতো দু-জনে ঠুসঠাস ঠোকাঠুকি চলতে লাগল৷
বিধানবাবু এবার একটু পিছিয়ে গিয়ে সামনে ঝুঁকতে চাইলেন৷ সঙ্গে-সঙ্গে পিছনের সারি থেকে একজন বললেন, ‘কী মশাই, গোরুর মতো চতুষ্পদ হতে চাইছেন না কি?’
‘আজ্ঞে, না দাদা। পয়সা পড়ে গেছে৷’
‘কত কত?’
‘বুঝতে পারছি না কত! টপাস করে পড়ে গেল৷’
‘সেরেছে, এই ভিড়ে আবার পয়সা ফেললেন!’
ভদ্রলোকের সহানুভূতি হল৷ তিনিও বিধানবাবুর মতো দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে সামনে নিচু হয়ে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করলেন৷ গেটের কাছে, গেল-গেল যাঃ বলে একদল হইহই করে উঠলেন৷ বাসের মধ্যে মানুষ আজকাল এমনভাবে ঠাসাঠাসি হয়ে থাকে, চাপের সামান্য এদিক-ওদিক হলেই হয়ে গেল৷ ভদ্রলোক দু-কদম পিছিয়ে সামনে ঝোঁকার চেষ্টা করায় গেটের কাছের এক ভদ্রলোক চাপের চোটে বাইরে ছিটকে পড়লেন৷ বাস কিন্তু থামল না৷ গেটের কাছে যাঁরা ছিলেন, রাস্তায় উলটে পড়ে থাকা ভদ্রলোককে বলতে লাগলেন, ‘উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন, ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়ুন৷ কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি৷’
যেন ছোট ছেলে খেলতে-খেলতে পড়ে গেছে৷ সবাই মিলে ভোলাবার চেষ্টা৷ পয়সা খোঁজার অদ্ভুত একটা নেশা আছে৷ পয়সা কেন, হারানো জিনিস খুঁজে বের করার নেশা৷ আর উত্তেজনায় মানুষ কী না করে! প্রত্নতাত্ত্বিকরা বছরের-পর-বছর ধরে ঢিবি খুঁড়ে-খুঁড়ে অতীত ইতিহাসে চলে যান৷ ডুবুরিরা নেমে যান সমুদ্রের গভীরে৷ যে জাহাজ ডুবে গেছে সেই জাহাজের খোঁজে৷
সারা বাসে খবর ছড়িয়ে পড়ল, বিধানবাবুর পকেট থেকে পয়সা পড়ে গেছে৷ শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা৷ কে আগে খুঁজে পায়! যিনি আগে পাবেন, তিনি হাসি-হাসি মুখে, পয়সাটি তুলে এগিয়ে দেবেন, এই নিন মশাই! যেন স্কুলের ফার্স্ট বয় অভিভাবকের দিকে পরীক্ষার ফলের কাগজ এগিয়ে দিচ্ছে৷
বিধানবাবুর এখন আর করার কিছু নেই৷ জনসাধারণ ভার নিয়েছেন৷ যাঁরা বসে আছেন তাঁরা পা ফাঁক করে সামনের দিকে ঝুঁকে নিজেদের পায়ের তলায় খুঁজতে লাগলেন৷ যাঁরা আসনের ধারে বসেছিলেন তাঁরা আবার নিজের এলাকা ছেড়ে, হাত বাড়িয়ে অন্যের পা সরিয়ে খোঁজার এলাকা বাড়াতে লাগলেন৷ অতি উৎসাহের ফলে অল্পস্বল্প অশান্তি দেখা দিতে লাগল৷ কেউ-কেউ ঘুমোচ্ছিলেন, খোঁজার ঠেলায় ঠেলা খেয়ে, কী--কী, কী হল বলে নড়েচড়ে বসে, ঘুম-ঘুম চোখে এদিক-ওদিক হাত বাড়াতে গিয়ে কারুর নাকের ডগা থেকে চশমা খসিয়ে দিলেন, কারুর হাতের নস্যির টিপ ঝরিয়ে দিলেন৷ সামনে ঝুঁকতে গিয়ে আসনের পিছনের লোহায় কপাল ঠুকে গোল আলু করে ফেললেন, সারা বাসে একটা আলোড়ন পড়ে গেল৷ একজন দুজন স্বার্থপর ছিলেন৷ তাঁরা কিছুতেই নিজের পায়ের তলা নিজেও দেখবেন, না, অন্যকেও দেখতে দেবেন না৷ ফলে একদল তাঁদের শিক্ষা দিতে শুরু করলেন৷ সারা বাসে যেন ব্যায়াম চলেছে৷ ফ্রন্ট বেন্ড, ব্যাক বেন্ড, সাইড বেন্ড, হামাগুড়ি৷
কনডাক্টার জায়গা হাঁকছেন৷ বিধানবাবু এবার নামবেন৷ গেটের দিকে এগোতে-এগোতে বললেন, ‘যাক গে, ছেড়ে দিন৷ ও আর মনে হয় পাওয়া যাবে না৷’ তিনি রাস্তার নেমে পড়লেন৷ কনডাক্টার বাসের গায়ে চাঁটা মেরে ছাড়ার নির্দেশ দিলেন৷ তিন-চারজন সমস্বরে প্রশ্ন করলেন, কত ছিল দাদা, কত ছিল? বিধানবাবু ফুটপাথে উঠতে-উঠতে বললেন, ‘পাঁচটা পয়সা৷’
বাসের ভেতরের সমস্ত যাত্রী এক সঙ্গে গর্জন করে উঠলেন সমুদ্রের মতো—‘মার ব্যাটাকে, মার৷’ বিধানবাবু শুনলেন কিন্তু ভয় পেলেন না৷ মার-মার শব্দটা দূর থেকে দূরে চলে গেল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন