সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বেশ বড় একটা আয়না৷ যেমন বড়লোকদের বাড়িতে থাকে—লাহা বাড়ি, মল্লিক বাড়ি৷ আমাদের আয়না ছিল৷ তার মানে এই নয় যে মস্ত জমিদারি ছিল৷ প্রাসাদের মতো বাড়ি, জুড়ি গাড়ি, ঝাড় লণ্ঠন, শুঁড় তোলা জুতোর ফট্ ফট্ অহংকার! ধ্যুৎ, ওসব থাকবে কেন? আমার ঠাকুরদাদা মস্ত বড় শিক্ষক ছিলেন৷ সাধু মানুষ৷ বলতেন, থাকবে গরিব, ভাববে বড়৷ বিদ্যার চেয়ে, জ্ঞানের চেয়ে বড় কিছু নেই৷ লক্ষ্মী একটু একটু, সরস্বতী বেশি বেশি৷
তা হলেও জমিদার কুঞ্জবাবুর ছেলে বিহারী আমার বন্ধু৷ আমরা একই স্কুলে পড়ি৷ বিহারী ভালো-মন্দ খায়৷ খাবেই তো৷ বড়লোক৷ খায় বলেই বেশ মোটাসোটা৷ চকচকে৷ কিন্তু মনটা খুব ভালো৷ মাঝে মাঝে বলে, ‘তোদের বাড়িটা কী ভালো৷ সব কিছু হাতের কাছে৷ এ-ঘর, ও-ঘর৷ জানিস তো বুড়ো, জামিদারের ছেলে হওয়া খুব খারাপ৷ কে যে কোথায় থাকে, খুঁজেই পাবি না৷ এই একটা ঘর তো সেই একটা ঘর৷ তবে ছাতটা বেশ বড়৷ ওই একটাই ভালো৷ বাকি সব যা-তা৷’
আমার ডাক নাম ভূতো৷ বেশ ভালো নাম৷ আমার দাদু রেখেছেন৷ আমার চুল খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়, তাই দিদা বলে, ‘তোর নাম বুড়ি হওয়াই উচিত৷ তুই একটা মেয়ে, ভুল করে ছেলে হয়েছিস৷’ বিহারী বলে, ‘তুই আমাদের বাড়িতেই থাক না, একা একা আমার ভালো লাগে না রে! তোর মায়ের মতো আমার মা যদি হত৷ জানিস তো, কাছে গেলেই বিরক্ত হয়৷ সারাদিন কী করে বল তো, হয় গল্প না হয় খ্যাচ্ খ্যাচ্৷’
আমি আবার উলটোটাই ভাবি৷ বিরাট একটা বাড়ি৷ ঘরের পর ঘর৷ বড় বড় বারান্দা৷ বড় বড় আয়না৷ বড় বড় ঘড়ি৷ ওরা বলে গ্রান্ডফাদার ক্লক৷ রাত বারোটার সময় গম্ভীর শব্দে বাজবে ঢং ঢং৷ সাদা পক্ষীরাজে চেপে হুস হুস শব্দে আসছে রাজপুত্তুর৷ আমার বোন মাধবী বেশ রাজকন্যা৷ পালঙ্কে শুয়ে আছে, মাথার কাছে সোনার কাঠি, পায়ের কাছে রুপোর কাঠি৷
আমার দুটো জিনিসে ভীষণ লোভ—বড় একটা আয়না, আর বড় একটা ঘড়ি৷ আর আমি কিচ্ছু চাই না৷ নিরঞ্জন স্যার খুব ভালো৷ আমাদের বন্ধুর মতো৷ নিরঞ্জন স্যার বললেন, ‘খুব ভালো করে পড়৷ বেশ বিরাট একটা মানুষ হতে হবে৷ ‘স্যার’ উপাধি৷ ‘স্যার ভূতো৷’
‘স্যারের সঙ্গে ভূতোটা যাচ্ছে না স্যার৷’
‘ধ্যাৎ, ভূতো কেন? তোর ভালো নাম তো গগনচন্দ্র! আবার বিহারীর সঙ্গে ভীষণ ভাব৷ দুটো নাম এক করে স্যার গগন বিহারী৷ এমন কিছু একটা করে ফেলেছিস, তেড়ে আসছে ‘‘নোবেল প্রাইজ’’৷ বাঘের মতো৷ ঘ্যাঁক করে ঘাড়ে ধরেছে৷ সোনার পদক৷ নোবেল লরিয়েট ‘‘স্যার’’ বিহারী৷’
‘স্যার! নোবেল হলে ঘড়ি আর আয়না হবে?’
‘দাঁড়া না, ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? ধীরে ধীরে৷ নদীর ধারে বাগান ঘেরা সুন্দর একটা বাড়ি হবে৷ বড় বড় থাম৷ ব্যালকনি৷ কাঠের তৈরি ঘোরানো সিঁড়ি৷ দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে থাকবে ওই ভূতো৷ লম্বা পেন্ডুলাম ধীরে ধীরে দুলছে৷ তারপর দোতলায় উঠেই একেবারে সামনে ওই আয়না—‘‘গুডমর্নিং’’—যেন বলছে—‘‘আয় না’’৷’
‘স্যার! বিহারীর বাবা, ঠাকুরদা, কেউ তো নোবেল পাননি৷’
‘আরে ধ্যুর, ওঁরা তো সব ল্যান্ডলর্ড, ফিউডেল লর্ড৷ প্রজা-পেষা টাকা, যেমন গম পিষলেই আটা৷ তোর বিশ্বজোড়া খ্যাতি হবে৷’
‘হবে না স্যার, আমার তেমন বুদ্ধি নেই৷ আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয় শৈলেন্দ্র৷ সেকেন্ড দীনেন্দ্র৷ আমার কোনো স্থান নেই, একেবারেই অগাবগা৷ বাবা বলেছেন, আমার ভবিষ্যৎ পোস্টাপিসের কেরানি৷ মোটা চালের ভাত, বিউলির ডাল, তক্তাপোশ, মাদুর, মুড়ি৷ বড় কিছু আমার দ্বারা হবে না৷ একমাত্র আমার বোন মাধবী বলে, তোর হাতের লেখা সুন্দর, নাকটা খাড়া, চোখ দুটো আয়নার মতো, তুই শরৎচন্দ্র হলেও হতে পারিস৷’
‘ঠিক বলেছে৷ মেয়েরা যা বলে ঠিকঠিক হয়৷ রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, এঁরা কি ফার্স্ট বয় ছিলেন? রোজ একটা আয়নায় অনেকক্ষণ ধরে মুখ দেখবি৷ তাকিয়ে থাকবি নিজের চোখের দিকে৷ আয়নার ভেতরে আলাদা একটা জগৎ থাকে৷ আয়নার ভেতরে একজন বন্ধু
আছে, সকলের বন্ধু৷ তুই রোজ একপাতা করে লিখে আমাকে দেখাবি৷’
‘কী লিখব স্যার?’
‘আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকবি কিছুক্ষণ, একেবারে একা৷’
‘বোনটা যদি পাশে থাকে?’
‘তাকেও বসিয়ে রাখবি চুপ করে৷’
‘ধ্যান?’
‘এক ধরনের ধ্যান৷ কী ভাবনা আসে লক্ষ রাখা৷ মনের ঘরে কে এল? ধর, এই রকম ভাবলি, সকালটা আজ কী সুন্দর! ব্যস—লেখার বিষয় হল, সকাল৷ সুন্দর হাতের লেখায় দু’পাতা৷’
মাধবী নীচের বারান্দায় হাঁ করে বাগানের দিকে তাকিয়ে বসেছিল৷ আমাদের দুধের মতো সাদা বেড়ালটা মাধবীর কোলে ঘুমোচ্ছে৷ অনেক চাইবার পর শঙ্করকাকু মাধবীকে দিয়েছেন৷ খাঁটি কাবুলি বেড়াল৷ দেখতে কী সুন্দর! মানুষ লজ্জা পাবে৷ হালকা ফং ফং৷ মোটা ল্যাজ৷ বড় বড় লোম৷ নরম তুলতুলে৷ এতটুকু মিষ্টি একটা মুখ৷ হালকা-হলুদ রঙের চোখ, যেন আংটির পাথর৷ মাধুরীর কোলেই থাকে৷ নাম রেখেছে ‘কাজল’৷ কোনও মানে হয়! না, যুক্তি আছে৷ মানুষের নজর লেগে যেতে পারে৷ সব মানুষের দৃষ্টি তো ভালো নয়৷ আমি বেশ একটু মোটা হয়েছিলুম৷ যেই কুন্দমাসি বললে, ‘বাঃ, চেহারাটা বেশ হয়েছে৷’ সাত দিনের জ্বরে চেহারা ধসকে গেল৷
মাধবীর অভিমান হয়েছে, ‘তোর সঙ্গে কথা বলব না৷’
‘কেন, কী করেছি আমি?’
‘যেদিকে দু-চোখ যায় সেদিকে চলে যাব৷’
‘বলবি তো, কী করেছি আমি?’
‘কখন ছুটি হয়েছে?’
‘নিরঞ্জন স্যার আটকে রেখেছিলেন৷’
‘পড়া করে যাস না কেন? রোজ রোজ পানিশমেন্ট৷’
‘ধুস, সেজন্য নয়৷ নোবেল পুরস্কার পেতে হলে কী করতে হবে বলে দিলেন৷ কাল সকাল থেকে তোকে নিয়ে শুরু করব৷’
‘কী শুরু করবি?’
‘যখন করব, তখন দেখবি৷’
‘তা হলে ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া বন্ধ! পাতলা-পাতলা অনেক কাচ জোগাড় করে এনেছিলুম৷’
‘মাঞ্জা হবে না মানে! আর ক’দিন পরেই বিশ্বকর্মা পুজো!’
‘আজ কাচ গুঁড়োবার কথা ছিল৷’
‘এই তো এক্ষুনি হবে৷ জামাটা পালটে আসি৷’
‘একটু পরেই সন্ধে৷ মাস্টারমশাই আসবেন৷ বাবা অপিস থেকে আসবেন৷ কাচের বদলে মাথা গুঁড়ো হবে৷’
‘কী করা যায় বল তো?’
‘কাল একটা ধর্মঘট ডেকে দে৷ বাংলা বন্ধ৷ আমরা বসে বসে কাচ গুঁড়োব৷’
ভাই আর বোন দুজনে বেশ একটা বড় খাটে শোয়৷ সাবেক কালের শক্তপোক্ত খাট৷ বেশ কারুকার্য করা৷ দুটো পাশ-বালিশ৷ মায়ের তৈরি দুটো নকশি কাঁথা৷ ভোর রাতে শীত করলে গায়ে টেনে নিলেই হল৷ মাথার দিকটা দক্ষিণ দিক৷ পরপর দুটো জানলা৷ বড় একটা দীঘি, মাঠ৷ খুব বাতাস৷ দুটো বড় বড় চাঁপা গাছ, কদম গাছ, ছাতিম গাছ৷ ফুলের গন্ধে ঘর ভরে থাকে৷ বড় একটা মশারি৷ সুখের সংসার৷ গল্প করতে করতে ঘুম এসে যাবে৷ এক ঘুমে রাত কাবার৷ স্বপ্ন তো আসবেই৷ বড় একটা আয়না৷ স্বপ্নের আয়নাটা অদ্ভুত৷ যেন দরজা৷ ভেতরে যাওয়া যায়৷ অন্য একটা দেশ৷ অন্য রকমের মানুষ৷ আলাদা ভাষা৷ পাথরের রাস্তা, বাড়ি৷ বড় গির্জা৷ সাদা ঘোড়ায় টানা সাদা গাড়ি৷ সুন্দর সুন্দর ছেলেমেয়ে, বিরাট পাহাড়৷ বড়লোকের দেশ৷ সুন্দর পোশাক৷ একটা বাড়ি৷ কাচের দরজা৷ পালিশ করা কাঠের মেঝে৷ সিঁড়ি উঠে গেছে৷ সামনেই বিরাট ঘড়ি৷ লম্বা পেন্ডুলাম৷ দোতলায় পিয়ানো বাজছে৷ স্বপ্নটা থেকে বেরোতে ইচ্ছা করে না৷ কিন্তু ভোর তো হবেই৷ একটাই দুঃখ, দুজনে একই স্বপ্ন দেখা যায় না৷
প্রথমেই দুজনে চিৎ হয়ে শোয়৷ নীল মশারির নীল চাল৷ চাঁদ থাকলে বিছানায় কত আলো৷ দুজনের মাঝখানে কাজল৷ ঘুমে কাদা৷ এপাশে-ওপাশে পাশ-বালিশ৷
মাধবী বললে, ‘তুই তাহলে বিলেতেই থাকবি?’
‘এখনও ঠিক করিনি কিছু৷ ভেবে বলব৷ নোবেলটা আগে পাই৷ তারপর এসব হবে৷ ওরাই আমাকে আল্পস পাহাড়ের ধাপে একটা কটেজ দেবে৷ ওরা দেয়৷ কেক, চকোলেট, পেস্ট্রি আর দুধ ছাড়া কিছু খাব না ভাবছি৷’
‘মরে যাবি৷ বেশিদিন বাঁচবি না৷’
‘কেন?’
‘ভাত ছাড়া মানুষ বাঁচে না৷’
‘তোর মুণ্ডু৷ সাহেবরা ভাত খায়?’
‘তুই আস্ত একটা বাঙালি৷ তোর নাম ভূতো৷’
‘স্যার আমার নাম পালটে দেবেন কারণ ইংল্যান্ডের রানি আমাকে ‘স্যার’ বা ‘লর্ড’ উপাধি দেবেনই দেবেন, তখন লর্ড ভূতো, স্যার ভূতো শুনতে যাচ্ছেতাই লাগবে৷’
‘ওঁরা তো বলতে পারে না, বলবে ‘বুটো’৷ লর্ড বুটো৷ তুই কি মেম বিয়ে করবি?’
‘ধ্যাৎ৷ মেমরা যাকে ভালোবাসে তাকেই বিয়ে করে৷’
‘জানি না ভাই, তোর বরাতে কী আছে৷ বাবা বলেছিলেন, ভূতোটা অঙ্কে খুব উইক৷ সায়েন্স হবে না মনে হচ্ছে৷ আমার কত আশা ছিল৷ ও একটা মস্ত ইঞ্জিনিয়ার হবে৷ ওই আর্টস নিয়েই পড়ে থাকতে হবে৷ এ সব শুনতে আমার খুব খারাপ লাগে৷ মাথাটা একটু খোলতাই করার চেষ্টা কর না৷ ঘুড়ি, লাটাই, মাঞ্জা, গল্পের বই, লাট্টু, লেত্তি, বর্ষার পুকুরে হাতে ছিপ, বেজি, কাঠবেড়ালি, টুনটুনি, বুবাই, বাউলকাকার একতারা, এইসব কিছুদিনের জন্যে ভুলে যা৷’
‘তার মানে তুই বলতে চাইছিস—মরে যা৷’
‘এর মানে ওই হল!’
‘স্যার বলেছেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দ্যাখ৷ বইয়ের পাতায় বিদ্যা আছে, জ্ঞান আছে বিশ্বে, প্রকৃতিতে, আকাশে, বাতাসে, হাটে-বাটে, মাঠে-ঘাটে৷’
‘এ কী, এ কী, উঠে পড়ছিস কেন? মশারি তুলছিস কেন? মশা ঢুকবে যে৷ দুটো ঢুকেছিল৷ অনেক কষ্টে মেরেছি৷’
‘আমি উত্তেজিত৷ আমার শরীরে ভীষণ একটা শক্তি ঢুকেছে৷ আমি আজ সারা রাত জাগব৷’
‘মার খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে রে ছেলেটার৷ এক্ষুনি মা আসবে৷ বারোটা বাজতে চলল৷ এ পাড়ার সব ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে৷’
‘তোকে বলেছে! দেখগে যা, সরোজ বাড়ির চিলেকোঠায় বসে এখন বাঁশি বাজাচ্ছে৷’
‘বাজাতেই পারে, সে বড় শিল্পী হবে৷’
‘অ, সরোজ শিল্পী হবে আর আমি বড়বাজারের মুটে হব!’
‘এত রেগে যাচ্ছিস কেন? বালিশ-টালিশ ছিটকে! নে, শুয়ে পড়৷ আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি৷ ছেলে ঘুমাল, পাড়া জুড়াল, বর্গি এল দেশে৷’
কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ স্টেশানের আলোটা সারারাত ঘরে খেলা করে৷ পেল্লায় সেই মালগাড়িটা যাচ্ছে৷ লাইনের ওপর চাকার শব্দ৷ ভূতো আস্তে আস্তে জিগ্যেস করল, ‘ঘুমোলি?’
‘না, আসছে না৷’
‘আমি বড় হতে পারব না? খুব বড়৷’
‘নিশ্চয়ই পারবি৷ কত কত বড় হবি৷ দেশ-বিদেশে কত নাম৷ কাগজে-কাগজে ছবি৷ আমি মা কালীকে বলব৷ মা আমার কথা খুব শোনে৷ মায়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব৷’
‘নোবেলের কথাটা মনে করে বলিস৷ আর হলদে রঙের পার্কার কলমের কথা৷ সোনার নিপ৷ বিহারীর আছে৷’
‘বলব৷ তবে বেশি চাস না, লোভ ভালো নয়৷ মা পছন্দ করে না৷’
ভূতো ঠিক বলেছে৷ সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন সরোজ তাদের পুরোনো বাড়ির চিলেকোঠায় বসে বাঁশি বাজায়৷ বাঁশিতে ফুঁ দিলেই বাঁশি বাজানো হয় না৷ রীতিমতো শিখতে হয়৷ সরোজের বাবা অলোকবাবু সত্যিই এক সাধক৷ দেখলেই মনে হয় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি৷ অসাধারণ বাঁশি বাজান৷ দেশ-বিদেশে নাম কিন্তু সাধুর জীবন৷ বাড়ি তো নয়, মন্দির৷ রাধা-গোবিন্দ৷ জ্বলজ্বল করছেন৷ নাটমন্দির৷ প্রায়ই কীর্তন হয়৷ সাধু-সন্তরা আসেন৷ ভগবৎ পাঠ হয়৷ কত ভক্ত৷ স্টেশান বাজারের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আসেন৷ তাঁরা সবাই ভালো লোক৷ সত্যি বলছি—এদিকে একটাও বাজে লোক নেই৷
সরোজদের পরিবারটা ছোট৷ বাবা, মা, একটা বোন৷ ভূতোর বোন মাধবী, সরোজের বোন মাধুরী একই দিনে জন্মেছিল৷ সেদিন ছিল রাসপূর্ণিমা৷ দুটোই খুব সুন্দরী৷ একই রকম দেখতে৷ একই স্বভাব৷ দেহত্বকের তলায় যেন আলো খেলা করছে৷ ওরে বাবা, তোরা বুড়ি হয়ে যাস না৷ যত দিন পারিস আমাদের চোখের সামনে আলোর আকার হয়ে ঘুরে বেড়া৷ দুজনের খুব ভাব৷
আমি ভূতোর জন্যে ভাবি না৷ ওটা একটা পাগল৷ গাজনের দিনে জন্মেছিল—পাগল ভোলা৷ হু-হু বাতাস৷ উঃ, কী ছোটাই না ছুটতে পারে! সরোজ এসেছিল জন্মাষ্টমীর দিন৷ হাতে অবশ্য বাঁশি নিয়ে৷ বাবার কাছে তালিম নিচ্ছে৷ এই বয়েসেই সে ওস্তাদ৷ অদ্ভুত মানুষ এই নিরঞ্জন স্যার৷ উঠতি বয়েসের সব ছেলেমেয়ের দিকে তাঁর নজর৷ আরে ভাই, মাঝে মাঝে দিন কয়েকের জন্যে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় না৷ বস্তিতে, ঝুপড়িতে চলে যান৷ কেন যান? সেখানে ছেলেমেয়ে নেই? মানুষ নেই? স্বামীজি কী বলে গেছেন? স্বামীজির বই পড়োনি? তা পড়বে কেন? সবাই চুপ৷ এই সব কথা যখন বলেন, নিরঞ্জন স্যারের চেহারাটা অন্যরকম হয়ে যায়৷ ভয় করে৷ আমার একটা ‘আমি’ আছে, তার কোনো নাম-ধাম নেই৷ সকলের মধ্যে সুড়ুত-সুড়ুত করে ঢুকে যেতে পারে৷ কী মজা!
সরোজরা বেঢপ বড়লোক নয়৷ আবার অভাবও নেই৷ যেখানে একটা হলে চলে যায় দুটোর কী দরকার৷ প্লিজ, মিথ্যে কথা বোলো না৷ প্রাণ যাওয়ার ভয় থাকলেও না৷ মিথ্যাবাদীকে সবাই ঘৃণা করে৷ এমনকী আর-একটা মিথ্যাবাদীও৷ প্লিজ, আড্ডা মেরে সময় নষ্ট কোরো না৷ হাতে খুব কম সময়৷ সরোজ নিরঞ্জনদার উপদেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে৷ খুব ফরসা৷ মাথা ভরতি চুল৷ টিকলো নাক৷ ভাসা ভাসা চোখ৷ সাদা জামাকাপড়৷ কথা কম বলে৷ অঙ্কে একশোর মধ্যে একশো, সংস্কৃতে একশোর মধ্যে একশো, বাকি সব আশি, নব্বই৷ সরোজ বলে, আমি যাই পড়ি না কেন, মনে হয় সবই আমার আগে পড়া৷ যে-কোনও অঙ্কের দিকে একবার তাকালেই উত্তরটা দেখতে পাই৷ ভূতো এই সব যত শোনে ততই মনমরা হয়ে যায়৷ রাত্তিরবেলা বিছানায় শুয়ে বোনকে বলে, ‘জানিস, আমার কিছু হবে না, আমি একটা বাজে ছেলে৷ দেখবি আমাকে ভিক্ষে করে খেতে হবে৷ ছেঁড়া, ময়লা জামাকাপড়, চুলে তেল নেই, গায়ে খড়ি ফুটছে৷ তুই তখন বড়লোকের বাড়ির বউ৷ আমার পাশ দিয়ে ভোঁস করে মোটরে চেপে চলে যাবি৷ তোর বর বড় ডাক্তার৷ এই বাড়িতে তো আমাকে ঢুকতেই দেবে না৷ বলবে, এটা শিক্ষিতের বাড়ি৷ তুই মুখ্যু, ঢুকবি না৷’
মাধবী মশারি তুলে খাট থেকে নেমে দক্ষিণের জানলায় গিয়ে দাঁড়াল৷ বুকের কাছটায় কেমন করছে, কষ্ট হচ্ছে৷ চোখে জল৷ শরতের ঝকঝকে আকাশ৷ চাঁদ কেমন নিঃশব্দে নৌকো বাইছে৷ আলোয় চারপাশ ভেসে যাচ্ছে৷ সাদা একটা মেঘের টুকরো ভল্লুকের মতো ভেসে যাচ্ছে৷ সরোজ বাঁশি বাজাচ্ছে৷ এক সার নারকেল গাছের আড়ালে ওই তো আড়াইতলা বাড়িটা৷
ভূতো জিগ্যেস করল, ‘কী হল? ওখানে চলে গেলি?’
‘আমি তোর পাশে কোনওদিন আর শোবো না৷ কোনওদিন না৷’
‘কাঁদছিস?’
‘না, হাসছি৷’
‘আর বলব না৷’
‘না বলে তুই থাকতে পারবি না৷ অভ্যাস হয়ে গেছে৷ জানিস তো, যে যা কথা বলে, বলতে বলতে তাই হয়ে যায়৷ স্যার, তোকে নোবেল প্রাইজের কথা বলেছেন, নোবেল মানে একটা পুরস্কার নয়, নোবেল মানে সাফল্য৷ বড় হওয়া৷ বড় অনেকভাবেই হওয়া যায়৷ আমি দেখেছি, তুই বই খুলে থাকিস, পড়িস না৷’
‘সরোজ কতক্ষণ পড়ে?’
‘ধ্যাৎ তেরিকা! সরোজ, সরোজ, সরোজ৷ সরোজ ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই? সরোজ বাঁশি বাজায়, বাজায় তো বাজায়৷ মোহন ভালো ফুটবল খেলে৷ খেলে তো খেলে৷’
‘আমি লেখক হব, মস্ত বড় লেখক৷’
‘হবে৷ চেষ্টা কর৷ তার মানে এই নয়, আমি লেখাপড়া ছেড়ে দোবো৷ সব সাবজেক্টে কম নম্বর পাব৷’
‘তাহলে তুই কী বলতে চাইছিস?’
‘যেটা আমি পারি, সেটা আগে করে দেখাই৷’
সকালবেলা নিরঞ্জনস্যার এলেন৷ তিনি এক অদ্ভুত মানুষ৷ ছাত্রদের বাড়িতে-বাড়িতে নিয়মিত যান৷ কে কী করছে, কেমন সব আছে খবর নেন৷ সকলের সঙ্গে বসে গল্প করার ছলে বুঝে নেন, বাড়ির পরিবেশ কেমন! প্রয়োজনে বড়দের মেরামত করেন৷ গুণাকরের বাবাকে মদ ছাড়িয়ে বাগান করতে শিখিয়েছেন৷ বড় সাহেব- কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি করেন৷ সায়েবি ভাব৷ স্যার এক মাস ধরে বোঝালেন, সায়েবদের পোশাক আর মদটাই নিলেন, তাদের ভালোর দিকের একটা কিছু নিন৷ সাহস, সাহিত্য, স্বাধীনতা, স্বাবলম্বন—কত ভালো ভালো দিক আছে তাদের চরিত্রে৷ পরিবারটা নষ্ট করছেন? গুণাকর একদিন জগদ্বিখ্যাত ডাক্তার হবে, আমি তার হাত দেখেছি৷ আপনি তার বাবা, আপনিই তাকে পৃথিবীতে এনেছেন৷ আশ্চর্যের ব্যাপার গুণাকরের বাবা এখন বিখ্যাত একজন ‘হার্টকালচারিস্ট’৷ অল্পদূরেই বড় একটা বাগান করেছেন৷ বাপরে বাপ্, পৃথিবীতে এত ফুলও আছে৷ রং আর রং৷ পাগল হয়ে যাওয়ার অবস্থা৷ গুণাকরের বাবার চেহারাটা হয়ে গেছে মুনি-ঋষির মতো৷ সাজপোশাক বদলে গেছে৷ বড়বাগান৷ মাঝখানে বাঁশের তৈরি টংঘর, খড়ের ছাউনি৷ খরগোশ, পায়রা৷ পাশ দিয়ে বইছে ছোট্ট একটা নদী৷ সব্বাইকে হেঁকে ডেকে বলেন—স্যার নিরঞ্জন মুখোপাধ্যায় আমার দেবতা৷
গুণাকরের বাবার নাম প্রভাকর৷ সায়েবদের মতো গায়ের রং৷ বড় বড় চুল-দাড়ি৷ তাঁর ওই বাগানে নানারকম ব্যাপার করেন৷ ছেলেরা দেখে আনন্দ পায়, অনেক কিছু শেখে৷ একবার করলেন আফ্রিকা৷ ভালো শিল্পীদের দিয়ে মডেল তৈরি করালেন৷ বন, পাহাড়, ফল্স, নদী, বন্যপ্রাণী৷ লিভিংস্টোন কী করেছিলেন, ভিক্টোরিয়া ফলস্, ক্লিমেঞ্জারো পর্বত, হিপোপটেমাস, গেরিলা৷ সে অনেকটা জায়গা জুড়ে৷ এতটাই আকর্ষণীয়, এক-একদিন এক-এক স্কুল ছাত্রদের নিয়ে আসছেন৷ একবার করলেন দক্ষিণ আমেরিকার ‘আমাজন’৷ আর একবার কালাহারি মরুভূমি, যেখানে এক ফোঁটা জল নেই৷ দেশে-বিদেশে কী নাম ছড়াল! অনেকেই বললেন, পয়সা থাকলে এখানে একটা ‘ডিজনিল্যান্ড’ হত৷ আমাদের দেশ তো গরিব৷ প্রভাকর বলেন, গরিব তো কী হয়েছে! আমাদের বেদ-বেদান্ত-উপনিষদ, আমাদের গঙ্গা, হিমালয়৷
নিরঞ্জন স্যার চেয়ারে বসতে ভালোবাসেন না৷ চৌকির ওপর মোটা শতরঞ্চিতে৷ বসেছেন৷ ভূতো পড়ছিল৷ মাধবী চা নিয়ে ঢুকল৷ চা দিতে দিতে বললে, ‘স্যার! এটা সত্যিই একটা ভূত৷ কাল নিজেও ঘুমোয়নি, আমাকেও ঘুমোতে দেয়নি৷’
স্যার আদর করে ভূতোর মাথার চুল খামচে ধরে বললেন, ‘এবার কি ঢুকল মাথায়?’
মাধবী মেঝেতে বসেছে৷ জানলায়, জানলায় শরতের বৃষ্টি-ধোয়া আকাশ৷ মাধবী কমলা রঙের একটা ফ্রক পরেছে৷ কুচকুচে কালো চুল৷ ফরসা রং৷ টিকলো নাক৷ দিদা বলেন, ‘রূপ নিয়ে এসেছিস বটে৷ এখন জীবন সুখের হলে হয়৷’
মাধবী বললে, ‘স্যার, প্রথম রাতটা নোবেল, নোবেল করে কাটল৷ তারপর সরোজের বাঁশি এল কানে৷ মাথা গেল আরও খারাপ হয়ে৷ শুরু হল সরোজের সঙ্গে তুলনা৷ ওকে পথে পথে ভিক্ষে করে খেতে হবে৷ ছেঁড়া জামাকাপড়, চুলে তেল নেই, ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে আর আমার বড়লোকের সঙ্গে বিয়ে হবে৷ ওর পাশ দিয়ে মোটরে চেপে হুস করে বেরিয়ে যাব৷’
স্যার চায়ে চুমুক দিয়ে, কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘যা ভেবেছি তাই হবে, ও লেখকই হবে৷ এই শেষের ছবিটায় সুন্দর একটা কল্পনা আছে৷’
মাধবী বললে, ‘প্রথমে আমার চোখে জল এল৷ পাগলটাকে আমি খুব ভালোবাসি তো! তারপরে মনে হল খুবসে পেটাই৷ শেষ রাতে পাগল বললে, ‘‘নোবেল-টোবেল অত সহজ নয়, আমাকে ভালোভাবে পাশ করতে হবে৷’’ সেই ভোরবেলা থেকে ও একভাবে পড়ে যাচ্ছে৷ একবার উঠে জানলার গরাদ ধরে কুড়ি বার ওঠ-বোস করেছে৷’
স্যার বললেন, ‘ভেরি গুড৷ দেখ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কত বড় লেখক৷ তাঁর পিতা মতিলালও লেখক ছিলেন, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, সবই লিখেছিলেন কিন্তু কোনোটাই শেষপর্যন্ত ধরে রাখতে পারেননি৷ অস্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন৷ শরৎচন্দ্র নিজেই বলেছেন—বাবার দুটি গুণই আমি পেয়েছিলুম, অস্থিরতা—আজ এখানে, কাল সেখানে, আর লেখা—জীবনের কথা বলব৷
বলেছেন, অভাবের মধ্যে ছেলেবেলা কেটেছে৷ ভাগলপুরে মামার বাড়িতে মানুষ৷ ওইখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করলেন৷ অর্থের অভাবে কলেজে পড়া সম্ভব হল না৷ চলে গেলেন বর্মার রেঙ্গুনে৷ সেখানে সতেরো বছর৷ ভূতো, প্রতিভা হল ছাইচাপা আগুন৷ ও ফুটে বেরোবেই৷ পিতার মৃত্যুর পর তিনি রেঙ্গুনে যেতে বাধ্য হলেন৷ রেঙ্গুনের অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেলের অফিসে চাকরি৷ ভাগলপুরে থাকার সময় প্রথম দিকের সব লেখা৷ ভাগলপুরে তখন অনেক বড় বড় বাঙালি৷ কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার৷ আদমপুরে বাঙালিদের ক্লাব৷ সেই ক্লাবের নাটকে অভিনয় করে তাঁর খুব নাম হল৷ সেই সময়কার বিখ্যাত সব সাহিত্য পত্রিকা ‘যমুনা’, ‘ভারতবর্ষ’ এই সব কাগজেই পরপর প্রকাশিত হল, ‘রামের সুমতি’, ‘পথ নির্দেশ’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘বিরাজ বউ’, ‘পণ্ডিতমশাই’, ‘পল্লীসমাজ’৷ কী সব লেখা! একেবারে নতুন ধরন, ভাব, ভাষা৷ চতুর্দিকে সাড়া পড়ে গেল৷ মানুষকে কাঁদতে হবে, হাসতে হবে, ভাবতে হবে৷ কেমন করে? সে তো শেখানো যায় না বাবা! সে তো ভেতর থেকে আসে৷ কী আশ্চর্য দেখো, শরৎচন্দ্রের লেখা থেকে আমি লাইনের পর লাইন বলে যেতে পারি—‘পথিক যেমন গাছতলায় রাঁধিয়া খাইয়া হাঁড়িটা ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যায় এবং তখন যেমন চাহিয়া দেখে না হাঁড়িটা ভাঙ্গিল কি বাঁচিল, সংসার শতকরা নব্বই ভাগ লোক ঠিক এমনি করিয়াই সরস্বতীর কাছ হইতে কাজ আদায় করিয়া মা লক্ষ্মীর রাজপথের ধারে নির্মমভাবে তাঁহাকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেয়—একবার ফিরিয়াও দেখে না, তিনি ভাঙ্গিলেন কি বাঁচিলেন৷’
‘দেখো, কেমন কায়দায় কী সত্য কথাটি সুন্দর করে বললেন শরৎচন্দ্র৷ এই হল সাহিত্য৷ মানুষ লেখাপড়া শেখে অর্থ রোজগারের জন্যে৷ জ্ঞান অর্জন উদ্দেশ্য নয়, আমি বড়লোক হব৷ কেউকেটা হব৷ শরৎচন্দ্রের জীবনী পড়বে৷ তাঁর সাহিত্য তো পড়বেই৷ সংগ্রামই জীবন৷ আদুরে গোপাল, নন্দদুলালদের কিছু হয় না৷ তারা এক-একটা স্বার্থপর৷ তোমাদের বাবার জীবনটা দেখো৷ কত সৎ, আদর্শবান৷ ইচ্ছে করলে বিরাট বড়লোক হতে পারতেন৷ না, লোভের কাছে নিজেকে বিক্রি করেননি৷ তোমাদের মা বড়লোকের মেয়ে৷ তিনি দেবী৷ রোজ বাবা আর মাকে প্রণাম করে দিন শুরু করবি৷ ভোরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে সুন্দর সুর করে বলবি ঃ
জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহদ্যুতিং৷
ধ্বন্তারিং সর্বাপাপঘ্নং প্রণতোস্মি দিবাকরম্৷’
নিরঞ্জন স্যার খোঁজ নিলেন, বাবা কোথায়, মা কোথায়? বাবা বাজারে, মা রান্নাঘরে৷ ভূতোকে বললেন, ‘অনেকক্ষণ পড়েছিস, চল অর্ণব কী করছে দেখে আসি৷ একটু মা গঙ্গাকেও দর্শন হবে৷’
অর্ণবদের বাড়িটা একেবার গঙ্গার ধারে৷ একতলা বাড়ি৷ বাড়িটার গঠন একটু অন্যরকম৷ বহুকাল আগে বাড়িটা ছিল ব্রাহ্মসমাজের৷ মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এখানে প্রচারে আসতেন৷ গোস্বামীজি পরবর্তীকালে ব্রাহ্মধর্ম থেকে সরে গেলেন৷ অদ্বৈতের বংশধর৷ শুরু করলেন বৈষ্ণব ধর্মসাধন৷
অর্ণবদের বাড়িতে আছেন রাধা-গোবিন্দ৷ অপূর্ব সুন্দর মূর্তি৷ রোজ সেবা পূজা হয়৷ উৎসবও হয়৷ সামনে, পেছনে ঘাসে ঢাকা বেশ কিছুটা জমি৷ পেছন দিকে গঙ্গা৷ সিঁড়ি আছে, নামা যায়৷ চারপাশ বেশ পুরু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ সামনে গেট৷ গেটের মাথায় আছে ঘন মাধবীলতা৷ পরপর সারি দিয়ে কয়েকটি বারোমেসে ফুল-গাছ৷ পেছন দিকে বেদি করা প্রাচীন একটি বকুলগাছ৷ গোস্বামীপ্রভু বকুলগাছ খুব পছন্দ করতেন৷ বাড়ি নয়, শান্ত, থমথমে একটি আশ্রম৷ নিরঞ্জন স্যারের এইরকম পরিবেশ খুব ভালো লাগে৷ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভূতোকে বললেন, ‘কম্পিটিশান, কম্পিটিশান, আর ভালো লাগে না রে! তোদের জীবনগুলো ক্রমশই কীরকম হয়ে যাচ্ছে৷ খালি পড়া, পরীক্ষা৷ দেখ তো, এই একটুখানি জায়গায় কত শান্তি! অর্ণবদের এই বাড়িটা আমাকে খুব টানে৷ আমি মরে গিয়ে অশরীরী হয়ে পেছনের ঝাঁকড়া বকুলগাছে আশ্রয় নেব৷ রাত্তিরবেলায় গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ওই বেদিটায় বসে থাকব৷’
ভূতো বললে, ‘পারবেন না স্যার, ওই গাছে অর্ণবের ঠাকুরদা থাকেন৷’
‘বন্ধুত্ব করে নেব৷ দুজনে বসে বসে গল্প করব৷’
অর্ণবদের বাড়ির পেছন দিকে, অর্থাৎ গঙ্গার দিকে সুন্দর বাঁধানো একটা পাতকো৷ সিমেন্ট বাঁধানো পরিষ্কার মেঝে, কোথাও এতটুকু শ্যাওলা নেই৷ হ্যান্ডপাম্প লাগানো৷ মাথার ওপর শেড৷ চারপাশ খোলা৷ প্রচুর রোদ, গঙ্গার বাতাস৷ দুপাশে বড় দুটো পাম গাছ৷ অর্ণব পাতকোতলায় বাসন মাজছে৷
স্যার জিগ্যেস করলেন, ‘তুই মাজছিস?’
‘ঠাকুরের বাসন স্যার৷ এ আমার রোজের কাজ৷ ভোগও আমি রাঁধি৷
‘কেমন লাগে? বিরক্তিকর?’
‘না স্যার৷ এই কাজের একটা নেশা আছে৷ তেঁতুল দিয়ে মাজি৷ সোনার মতো ঝকঝকে৷ ভীষণ ভালো লাগে৷ বকুলতলার বেদিতে বসুন স্যার৷ বেশ লাগবে৷’
‘মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানিস, তোদের বাড়িতেই থেকে যাই৷ ভারি পবিত্র৷’
‘আপনি সত্যিই যদি থাকেন, আমাদের খুব আনন্দ হবে৷ ঘর আছে৷ খুব ভালো ঘর৷ জানলা খুললেই গঙ্গা৷ তবে স্যার একটা নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে৷ ছিপ নৌকোয় চেপে গভীর রাতে ডাকাত আসছে উত্তর দিক থেকে৷’
‘কী বলছিস রে৷ এখনও ছিপ-ডাকাত?’
‘কাল রাত্তিরে আমি ছাতে চুপ করে বসেছিলুম৷ আপনি বলেছিলেন, অনেক রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবি, দেখবি, তারার গায়ে উল্কা জড়িয়ে আছে, পূজারিনিরা প্রদীপ হাতে সার বেঁধে চলেছে, পরিব্রাজক সাধুরা যাচ্ছেন কৈলাসে৷
তিরবেগে একটা লম্বা ছিপ নৌকো আমাদের ঘাটে ভিড়ল৷ চার-পাঁচজন উঠে এসে বকুলতলায় বসল৷ আমি আলসের আড়ালে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি৷ ভাবছি, নিলে একটা জিনিসই নেবে, প্রাচীন শ্যামসুন্দরের বিগ্রহটি৷ বিদেশে পাচার করে দেবে৷ আমি একা, ওরা পাঁচজন৷ একটা খুব লম্বা৷ এইবার যা হল, অবিশ্বাস্য একটা কাণ্ড৷ হাওয়া নেই, বকুলগাছের মাথাটা খুব দুলে উঠল, ঝস্ ঝস্ শব্দ৷ বিশ্বাস করুন ওদের একজন গোঁ গোঁ করে অজ্ঞান হয়ে গেল৷ জোনাকির মতো অজস্র আলো ওদের ঘিরে ছোটাছুটি করতে লাগল৷ আলোগুলোর বেশ জোর৷ ওদের শরীরে, মুখে, মাথায় আটকে আটকে যাচ্ছে৷ একজনের জামায় আগুন ধরে গেল৷’
‘কী বলছিস তুই?’
‘বিশ্বাস করুন স্যার৷ এই বাড়িতে কী আছে, কে আছেন আমি জানি না৷ ঠিক ওই সময় জল-পুলিশের সেই স্টিমারটা মাঝ-গঙ্গা দিয়ে যাচ্ছিল৷ খুব আলো৷ ওরা ভয়ে ভয়ে পালাল৷ তাই বলছি স্যার, আপনি এখানে এসে থাকুন৷ আমরা দুজনে রাত জাগব৷ কত কী দেখব, শুনব৷ এই বাড়িতে অনেকে কথা বলেন, দেখতে পাই না৷’
‘শোন, এইসব পাঁচকান করবি না, কেউ বিশ্বাস করবে না৷ মনে করবে আজগুবি৷ আমাকে বলবি৷ আচ্ছা, এদিক-ওদিক এত কাজ করিস, পড়ার ক্ষতি হয় না?’
‘স্যার! আপনিই বলেছেন, যারা কাজ করে তাদের সময়ের অভাব হয় না৷ আমার একটা রুটিন আছে৷ একটুও এদিক-ওদিক হয় না৷ শরীর খারাপ হলেও না৷’
স্যার বললেন, ‘ভূতো! শুনছিস? শরৎচন্দ্রের একটা কথা খুব মনে রাখবে—সহজ বুদ্ধিই দুনিয়ায় সবচেয়ে অ-সহজ৷ বুঝলি? সহজ বুদ্ধি ‘‘কমন সেন্স’’৷ অর্ণব একটা বেতের ঝুড়িতে এক-একটা বাসন নরম কাপড় দিয়ে মুছে মুছে রাখল৷ ‘স্যার ভেতরে চলুন না৷ ভালো লাগবে৷’
‘চলো৷’
ভেতরে প্রথমেই চোখে পড়বে, চারচৌকো বেশ বড় একটা ঘর৷ বোঝাই যায়, যখন ব্রাহ্মসমাজ ছিল, তখন প্রার্থনাসভা হত৷ জ্ঞানী-গুণীরা আসতেন৷ এরই একপাশে সুন্দর একটি ঘর৷ বেশ বড়৷ ঝকঝকে পাথরের মেঝে৷ সিংহাসনে শ্যামসুন্দর৷ একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না৷ এমন সুন্দর! পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্বর্গ৷ সবুজ রঙের সিল্কের পরদা৷ ফুল আর ফুল৷ চাঁপা ফুলের গন্ধ৷ তিনজন মহিলা সুন্দর শাড়ি পরে পুজোর জোগাড় করছেন৷ স্যার প্রণাম করে বললেন, ‘কী সুন্দর! কী সুন্দর!’
তিনজন মহিলার একজন অর্ণবের মা৷ তিনি ফল কাটছিলেন৷ এই সময় কথা বলা বারণ৷ একটু হেসে ঘাড় নাড়লেন৷ ইশারায় স্যারকে বসতে বললেন৷ অর্ণবের মা খুব বড় পরিবারের মেয়ে৷ চেহারা দেখলেই বোঝা যায়৷ একেবারে রাজরানি৷ আজ জন্মাষ্টমী৷ রাতে বড় পুজো হবে৷ সেই আয়োজনই চলছে৷ রাতে সরোজ বাঁশি বাজাবে৷ কীর্তন হবে৷ অর্ণব বললে, ‘স্যার! আপনার ঘরটা দেখবেন চলুন৷’
নিরঞ্জন স্যার হাসলেন৷ পশ্চিমে ভীষণ আলো-বাতাসওয়ালা একটা ঘর৷ ফ্ল্যাট চৌকির ওপর মোটা একটা কার্পেট পাতা৷ পশ্চিমের দরজাটা খুললেই সিমেন্ট বাঁধানো একটা জায়গা, তারপরই ঘাসে ঢাকা জমি৷ কয়েক পা এগোলেই বকুলতলা৷ তারপর গঙ্গা৷
অর্ণব বললে, ‘স্যার, আপনি ওই বেদিতে বসবেন৷ আমরা বসব ঘাসে৷ আপনি পড়াবেন৷ আপনি ভালো সাঁতার জানেন৷ গঙ্গায় সাঁতার কাটবেন৷ ঠাকুরের ভোগ আমিই রাঁধি৷ শালগ্রাম আছেন৷ মেয়েদের স্পর্শ করতে নেই৷ আমিই সেবা করি৷ আপনারও সেবা করব৷ গুরু সেবা৷’
স্যার বললেন, ‘অর্ণব, আমার ছাত্রদের মধ্যে তুই একেবারেই অন্যরকম৷ অর্ণব, আমি বলি কি, তুই সংস্কৃত নিয়ে পড়৷ তোর সংস্কার একেবারে আলাদা৷ বেদান্ত নিয়ে মাস্টারস ডিগ্রি, ডক্টরেট করে অক্সফোর্ডে চলে যা৷ আমি তোকে সাহায্য করব৷’
‘স্যার, আপনি কী করে বললেন জানি না৷ আমারও সেইরকম ইচ্ছা৷ সংস্কৃত আমার প্রিয় বিষয়৷ কালিদাস কী সুন্দর! আমি মেঘদূত মুখস্থ করে ফেলেছি৷’
হঠাৎ নাকে এল তালের বড়ার গন্ধ৷ স্যার নাক ফোঁস ফোঁস করে বললেন, ‘তাল’!
অর্ণব বললে, ‘রান্নাঘরে৷ আমার মাসিমা এসেছেন৷ আজ জন্মাষ্টমী৷ তালের কতরকম কী হবে! তালের আঁটি মাটিতে পুঁতে রাখা হবে৷ কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোয় তালের ফোঁপল৷’
স্যার বললেন, ‘অর্ণব, আমাদের কত কী আছে—তাই না!’
‘অঘ্রাণ মাসে ইতু পুজো, আমার খুব ভালো লাগে৷ মাটির সরায় মা যে বীজ ছড়ায়, কী সুন্দর লকলকে গাছ হয়৷ যেন কথা বলে!’
‘ইতু নামটাই তো সুন্দর৷ মা লক্ষ্মী৷ বাঙালিরা কত কী নিয়ে থাকতে পারে—তাই না! ইতু পুজোর মন্ত্রটা কী সহজ সরল—গ্রামবাংলার মায়েদের অংবংচং ভালো লাগবে কেন? সেই মন্ত্র চাই, যা মাটির ওপর দিয়ে বাতাসের মতো বয়ে যায় ঃ
অষ্ট চাল অষ্ট দুধা কলসপাত্রে ধুয়ে
শোনরে ইতুর কথা এক মন-প্রাণ হয়ে
ইতু দেন বর—
ধনে-ধান্যে দৌত্রে-পৌত্রে বাড়ুক তার ঘর৷’
অর্ণব বললে, ‘স্যার! আপনি কবে আসবেন? আপনার জিনিসপত্র আমরা নিয়ে আসব৷ আপনাকে ভাবতে হবে না৷’
‘অর্ণব! আমি এখন যেখানে থাকি, তারা খুব অসহায়৷ দেখ, আমার তো আমি ছাড়া কেউ নেই৷ তাই, যখন যেখানে থাকি তখন তারাই আমার আপনজন৷ আবার একজায়গায় বেশি দিন থাকাও তো হয় না৷ তোদের এই বাড়িটা আশ্রমের চেয়েও সুন্দর৷ অদ্ভুত একটা ভাইব্রেশনে৷ এখানে থাকতে হলে আমাকে সন্ন্যাসী হতে হবে৷ একশো ভাগ পবিত্র৷’
ছোট্ট সাদা একটা তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে অর্ণবের মা সামনে এসে দাঁড়ালেন এতক্ষণে৷ উজ্জ্বল, হাসি হাসি মুখ৷ বললেন, ‘ঠাকুরের ফল কাটছিলুম তাই কথা বলতে পারছিলুম না কিন্তু সব শুনতে পাচ্ছিলুম৷ স্যার! আপনি তো সন্ন্যাসীই, নতুন করে সন্ন্যাসী হওয়ার দরকার কী? আপনার পা দুটো কী সুন্দর! মনে হয় প্রণাম করি৷ আপনার পা দুটোই বলে দেয়, আপনি কেমন মানুষ! আর শিক্ষক হিসেবে আপনি তো পূজারি, ঋষি৷ ছাত্রদের পূজা করেন৷ যার মধ্যে যে-গুণ আছে, খুঁচিয়ে-খুুঁচিয়ে বের করে আনেন৷ সংসার করেননি কেন, বুঝতে পারি৷ দেখুন, আমি আপনার এক বোন৷ সত্যিকারের বোন৷ বড়, না ছোট বলতে পারব না৷ আমরা ভীষণ একা৷ শুনেছেন, কালরাতে ডাকাতরা এসেছিল৷ অর্ণব সাহসী কিন্তু ওর বয়েস তো বেশি নয়! রাতের দিকে গঙ্গাটা হু-হু করে৷ কেউ কোত্থাও নেই৷ মাঝে মাঝে অন্ধকারে এক-একটা নৌকো৷ কে যায়, কী যায়! হঠাৎ একটা আলো ঝলমলে স্টিমার৷ যত রাত বাড়ে কতরকমের শব্দ৷ একদিন একটা মৃতদেহ ওই ঘাটে এসে আটকাল৷ তখন রাত৷ জোয়ার এসেছে, ভরা গঙ্গা৷ অর্ণবের কী সাহস, একটা বাঁশ দিয়ে ঠেলে ঠেলে স্রোতে তুলে দিল৷ একটি মেয়ে৷ আত্মহত্যা৷ আমি কী বলেছিলুম, উত্তরটা কী দিলে জানেন, ‘মা, গঙ্গার জলে সব পবিত্র৷ গঙ্গা-স্থানে ভূত-প্রেতও উদ্ধার পায়৷’
স্যার বললেন, ‘বাঃ বাঃ, বেশ বলেছে৷’
‘আপনি আসুন৷ দোতলাতে সুন্দর একটা ঘর আছে৷ পশ্চিমের জানলা খুলে গঙ্গা দেখবেন, পুবে সূর্যোদয়৷ পুরোহিতের পুজো পছন্দ হয় না৷ সকালের পুজো আপনি করবেন৷ আজ জন্মাষ্টমী৷ আমার ভেতর থেকে তিনি বলছেন৷ বিশ্বাস করুন, বিষয়বুদ্ধি আমাদের নেই৷ আমাদের দিন চলে যায়৷ অভাব নেই৷’
স্যার বললেন, ‘আমি একজন দিদি চেয়েছিলুম৷ দিদি-দিদি করব৷ দিদির বকুনি, দিদির চড়৷ দিদির ভালোবাসা৷ ভগবানকে কে পায়? তবে, তিনি সবাইকে পাইয়ে দেন৷’
নিরঞ্জন স্যার প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন৷ ফরসা ধবধবে পবিত্র এক মানুষ৷ চওড়া বুক, চওড়া কবজি৷ বললেন, ‘সন্ধেবেলা আসব৷ সরোজের বাঁশি শুনব৷’
ভূতো জিগ্যেস করলে, ‘এইবার কোথায় যাবেন স্যার?’
‘মুকুলের বাড়িতে৷ ছেলেটা খুব বিপদে পড়েছে৷ তুই যাবি?’
‘যাব স্যার৷ মুকুল আমার খুব বন্ধু৷ আমার পইতেতে মুকুলের মা আমাকে প্রথম ভিক্ষা দিয়েছিলেন৷ আমার ভিক্ষা মা৷’
‘দেখবি, ছেলেটা একদিন খুব বড়লোক হবে৷’
‘আমি হব না স্যার?’
‘তুই একেবারে অন্যরকম হবি, যা আর কেউ হবে না৷’
ভূতো খুব খুশি৷ ভূতো হতে চায়৷ কী হতে চায় সেটা এখনও জানে না৷ এমন কিছু হতে চায়, যাতে বেশ নাম হয়৷ আমাকে চিনবে৷ খাতির করবে৷ বসার জন্যে চেয়ার এগিয়ে দেবে৷ সবার আগে যাওয়ার পথ করে দেবে৷ সকলের মুখে এক কথা, ‘সরে যা সরে যা, কে যাচ্ছে দেখেছিস! বিরাট এক ব্যক্তি৷’ ভূতো জিগ্যেস করলে, ‘স্যার! বিরাট হতে গেলে কী করতে হবে?’
গঙ্গার ধার৷ পাশেই বহুকালের সেই বিরাট বটগাছ৷ স্যার থেমে পড়লেন৷ বললেন, ‘এই গাছটাকে প্রশ্ন করো, কে তোমাকে এত বড় করলে, কীভাবে তুমি এত বড় হলে? আমরা তো তোমার জন্যে কিছু করিনি৷ গাছ কী বলবে জানো? বলবে, আরে, বড় হওয়াটা আমার ভেতরে ছিল৷ আমি যে বট৷ বড় না হয়ে উপায় কী? আমাকে যে বড় হতেই হবে৷ তোর ভেতরে কোনো একটা গুণ আছেই আছে, সেইটা একদিন বড় হবেই হবে৷ খুুঁজে বের করতে হবে, তোর সেই গুণটা কী?’
‘যদি আমার ভেতর সেইরকম কোনও গুণ না থাকে?’
পথের এক পাশে ক’টা থান ইট পড়েছিল৷ স্যার দেখিয়ে বললেন, ‘কী বলো তো?’
ভূতো অবাক হয়ে বললে, ‘ইট স্যার৷’
‘মাথার বালিশ করা যাবে?’
‘না স্যার৷’
‘মাথার বালিশ দিয়ে বাড়ি করা যাবে?’
‘না স্যার৷’
‘বিছানায় থান ইট রাখবে?’
‘না স্যার৷’
‘তা হলে? ইট বালিশ হবে না, বালিশ ইট হবে না, বট গোলাপ হবে না, গোলাপ বট হবে না৷’
নিরঞ্জন স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘বালিশে লাথি মারা যায়, ইটে যায় না৷ দুটোই প্রয়োজনীয় চরিত্র, আলাদা৷ লোহা আর সোনা৷ মাটি আর বালি৷’
ভূতো কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে বললে, ‘স্যার৷ আপনি বললেন মুকুলের বাড়িতে যাবেন?’
‘দাঁড়া, তার আগে উপেনবাবুকে একবার দেখে যাই৷ খুব জ্বর৷’
উপেন আচার্য, একেবারে একা এক মানুষ৷ শিবমন্দিরের পূজারি৷ মন্দিরের পেছনেই গাছপালা, লতাপাতায় ঘেরা একটি চালা৷ দেয়াল, মেঝে, দালান পাকা৷ পেছনের চাল বেয়ে নামলেই গঙ্গা৷ ঘাট নেই৷ দুটো বিরাট পাথর৷ একটার ওপর আর একটা৷ ক’দিন তিনি পুজো করতে পারছেন না৷ অনাদি চৌবে কাজ চালাচ্ছেন৷ উপেন ঠাকুর এই অনাথ যুবকটিকে তৈরি করেছেন৷ উপেনবাবু অসময়ে শুয়ে থাকতে পারেন না৷ বিছানা তাঁর শত্রু৷ দাওয়ায় বসে আছেন দেয়ালে পিঠ দিয়ে৷ পাশে একটা জলের ঘটি৷ গঙ্গার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন৷ প্রচুর অপরাজিতা ফুল ফুটেছে৷ কাঞ্চন আর টগর ফুলে ফুলে সাদা৷ পারে একটা নৌকো বাঁধা৷
স্যার প্রণাম করলেন, ‘কী ভাবছেন?’
‘আজ তিন দিন হয়ে গেল, বাবার পুজো করতে পারছি না৷’
‘জ্বর কত?’
‘দেখিনি৷ দুই-তিন হবে৷’
‘আজ আমি ডাক্তার আনব৷ এখুনি আনব৷ কোনও কথা শুনব না৷’
‘সে না হয় না শুনলে, দুটো দিন আমার কাছে থাকো না, আমার যে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে৷ চৌবে করছে বটে তবে ছটফটে৷’
‘পথ্য কী হচ্ছে?’
‘এই যে ঘটিতে গঙ্গাজল৷’
‘ওতে হবে না, ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বেন৷’
‘তিনটে করে বেলপাতা খাই৷’
‘ওষুধ চাই, পথ্য চাই৷’
‘দ্যাখো বাবা, আমি আর নিজের কথা ভাবতে পারি না৷ কোনওদিন ভাবিনি৷ এই দুনিয়ায় শিব ছাড়া আমার কেউ নেই৷ তা আমি কী করব? তোমাদের অনেক কিছু আছে, আমার কিছু নেই৷ নেই তো নেই৷ বাবা তো আছেন৷ শিবের চেয়ে বড় ডাক্তার পৃথিবীতে আর কে আছে৷ শিবের চেয়ে বড় সহায় আর কী আছে? একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন আছে কি?’
‘নেই৷ ভাদ্র মাস৷ আপনার জ্বরের কারণ পিত্ত৷ আপনাকে আমি পলতার বড়া খাওয়াব৷ জ্বরের মুখে ভালো লাগবে৷’
‘বাবার পূজা?’
‘আজ, কাল স্কুল ছুটি৷ আমি আসছি৷ সব করে দোবো৷ গঙ্গার স্নান করব৷’
‘ফুল তুলতে হবে৷ দেখছ না, রোদের ঝাঁজে সব ঝিম মেরে যাচ্ছে৷ প্রজাপতি আর তেমন উড়তে পারছে না৷’
‘আপনি এইবার ঘরে বসুন৷’
নিরঞ্জন স্যার মুকুলদের বাড়ির দিকে যেতে যেতে ভূতোকে বললেন, ‘তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে?’
‘কীসের দেরি স্যার? আমি তো আপনার সঙ্গেই রয়েছি৷ একটা কথা বলব স্যার?’
‘একটা কেন? তুই হাজারটা কথা বল৷ যত কথা বলবি তত মনের গুমোট কাটবে৷ মন হালকা হবে৷ মন হল ধোপার গাধা৷ পিঠে তার গাদাই বোঝা৷ চাপিয়েই যাচ্ছি, চাপিয়েই যাচ্ছি৷’
‘তবে যে বলে, কথা কম বলাই ভালো৷’
‘ও যারা বলে বলুক, আমরা বলব না৷’
‘আমি বলছিলুম স্যার, ভূতো নামটা পালটেই দিন৷ সকলেরই কত সুন্দর সুন্দর নাম, আমার নাম ভূতো৷ গৌর নামটা কেমন স্যার?’
‘ভালো, খুব ভালো৷ আমি তোকে গৌর বলেই ডাকব৷’
‘বাড়িতে তো সবাই ভূতো বলবে!’
‘বলুক গে৷ ভূতো নামটাও ভালো৷ বেশ মিষ্টি নাম, কানে লেগে থাকে৷ গৌর নামটাও সুন্দর৷ ভূতনাথ হলেন মহাদেব আর গৌর হলেন গৌরাঙ্গ৷’
মুকুলদের বাড়ির বাইরে ঘরটা একদম রাস্তার ওপরে৷ রাস্তাটা গঙ্গার দিক থেকে এসে বাজারের দিকে চলে গেছে৷ বাজার প্রায় এক মাইল দূরে৷ এই ঘরে মুকুলের বাবা এক সময় দোকান করেছিলেন৷ বেশ ভালোই চলত৷ হঠাৎ কী হল—একদিন সকালে দেখা গেল, তিনি নেই৷ নেই তো নেই৷ একেবারেই নেই৷ তাঁর সব কিছু পড়ে আছে৷ জামা, কাপড়, চশমা, ছাতা, চটি৷ মানুষটা নেই৷ মুকুলের বৃদ্ধ ঠাকুরদা বেঁচে আছেন৷ এই বয়েসেও খুব অ্যাক্টিভ৷ বেশ লম্বা৷ সুন্দর চেহারা৷ সুন্দর দুটো চোখ৷ শিক্ষিত৷ বাড়ির পেছন দিকে বিরাট পুকুর৷ পুকুরে জাল ফেলা হল৷ সবাই বললে, ‘সাঁতার জানা লোক জলে ডোবে না৷’ পুলিশ একটু খোঁজপাত করল৷ কী যে হল? রহস্য৷ মুকুলের ধারণা, বাবা সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন৷ সে বড় তীর্থস্থানে গিয়ে খোঁজ করবে৷ ধন্য বটে মুকুলের ঠাকুরদা৷ ‘আমি আছি রে! আমার আটচল্লিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি দিয়ে তোদের সামলাব৷ মুকুল! এই দুনিয়ায় সব সম্ভব৷ যোদ্ধা হতে হবে৷ বরাত মানতে হবে৷ ভাগ্য৷ চল, দুজনে নেমে পড়ি৷’
মুকুলের মায়ের কোনও তুলনা হয় না৷ বাবা ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট এক যোদ্ধা৷ বহু বছর জেল খেটেছেন৷ তাঁর জীবনে শুধু দান৷ সেই আদর্শে বড় হয়েছেন মুকুলের মা৷ বেশ চলছিল, হঠাৎ মুকুলের ঠাকুরদা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, শয্যাশায়ী৷ আয়ুর্বেদিক ওষুধের ব্যবসা জমে উঠেছিল৷ এক সন্ন্যাসী তাঁকে বাতের তেলের একটা ‘ফর্মুলা’ দিয়েছিলেন৷ অব্যর্থ৷ সেই তেলের জয়জয়কার৷ আরও অনেক ওষুধ রয়েছে৷ মুকুল হল ‘সেলসম্যান’৷ আবার লেখাপড়ায় দারুণ ভালো৷ স্যার বললেন, ‘ও একটা কিছু হবেই৷ ছেলেটার দারুণ মেমারি৷ ইতিহাস ওর প্রিয় সাবজেক্ট৷ ওই দিকেই ওকে ঠেলতে হবে৷’
মুকুল বাইরের ঘরে ছড়িয়ে বসেছে৷ ছোট, বড় অনেক শিশি৷ বড়, মাঝারি, ছোট নানা মাপের ফোঁদল৷ অ্যালুমিনিয়ামে দুটো জগে টলটলে তেল৷ সারাঘরে কবিরাজি গন্ধ৷ এক দেয়ালে সুন্দর এক মানুষের ছবি৷ টাটকা একটা মালা দিয়েছে৷ ওর বাবার ছবি৷ আর এক দেয়ালে একটা একতারা ঝুলছে৷ এরই মধ্যে ও সনাতন বাউলের কাছে গান শিখছে৷ স্যারকে বলেছে, ‘আমি ধুলো পায়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে একতারা হাতে ঘুরব৷ আমি সুখ চাই না, ভগবানের কাছে দুঃখ চাইব, কালো মেঘের মতো দুঃখ, বৃষ্টির মতো চোখের জল৷ যেই মন খারাপ হয়, পেছন দিকে পুকুর ধারে চলে যায়৷ লম্বা লম্বা ঘাস, কচু গাছ, তেলাচুকো লতা৷ একতারাটা আকাশের দিকে তুলে বিভোর হয়ে নাচে, আর সুন্দর গলায় গান করে,
চল গুরু দুজনে যাই পারে৷
আমরা একলা যেতে ভয় করে৷৷
এ দেহ ছিল শ্মশানের সমান৷
গুরু এসে মন্ত্র দিয়ে করল ফুলবাগান৷৷
ওই দিকেই রান্নাঘর৷ গান শুনতে শুনতে তাঁর চোখ জলে ভরে ওঠে৷ ছেলেটা তাঁর অসাধারণ৷ এমন ছেলের মা হতে পারা গৌরবের৷ সারাটা দিন কী না কী করেন! কোনও চাহিদা নেই৷ একটাই তার ব্রত—দাদু আর মাকে সুখে রাখতে হবে৷ নিজে মরে গেলেও ক্ষতি নেই৷ তবু সাবধান করেন ‘ওরে ওখানে সাপ আছে রে!’
মুকুল বলে, ‘তুমি থাকতে সাপ আমার কিছুই করতে পারবে না মা৷’
মাঝে মাঝে একতারাটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে মুকুল ছোট্ট একটা ছেলের মতো মায়ের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ দুজনে রান্নাঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি৷ বাবার হাতে পোঁতা ছাতিম গাছটা খুব বড় হয়েছে৷ এইবার ফুল হবে৷ উঃ কী গন্ধ! মুকুল মাঝে মাঝে গাছটাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে৷ ফুলের গন্ধে সাপ তো আসবেই৷ আসে আসবে৷ পৃথিবীটা শুধু মানুষের! এইসব মুকুলের একেবারে নিজস্ব ব্যাপার৷ কারওকে জানতে দেয় না৷ শুধু তার মা জানেন৷ মুকুল নীচু ক্লাসে পড়ার সময় যে সুটকেসটা নিয়ে ক্লাসে যেত, সেইটা খুব যত্ন করে রেখেছে৷ দাদু আর দিদিমার দেয়া কয়েকটা জিনিস৷ সেই সময় মা শীতকালে যে কাপড়টা মাফলার করে গলায় জড়িয়ে দিতেন, সেই কাপড়ের ফালিটা৷ ছন্দাদির সঙ্গে লুডো খেলত, বিয়ের রাতে মুকুলকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল৷ যে রুমাল দিয়ে চোখ মুছেছিল সেই রুমালটা মুকুলকে দিয়েছিল৷ সেই রুমালটা আছে৷ ছন্দাদি এখন পাঞ্জাবে৷ বাপের বাড়িটাও নেই৷
নিরঞ্জন স্যার জিগ্যেস করলেন, ‘মনে হচ্ছে বড় অর্ডার?’
‘হ্যাঁ স্যার, একশো শিশি৷ আজই একটু পরে চিৎপুরে দিয়ে আসতে হবে৷’
‘ক’টা ভরেছিস?’
‘পঁচিশটা৷’
‘দে দে শিগগির দে৷ গৌর তুইও হাত লাগা৷’
‘গৌর?’
‘ওর নাম পালটে গৌর দিয়েছি৷’
‘ওঃ, খুব ভালো করেছেন স্যার৷ ভূতনাথ নামটা কীরকম যেন বুড়োটে বুড়োটে৷’
এই একশোটা শিশি কার্ডবোর্ডের বাক্সে সাজানো হবে৷ শিশির গায়ে লেবেল৷ গোনাগুনি৷ কীভাবে লাগাতে হবে? কম খাটুনি! স্যার ঝড়ের বেগে কাজ করতে পারেন৷ তেলটায় অদ্ভুত একটা মশলা মশলা গন্ধ৷ স্যার ভূতোকে বললেন, ‘গৌর, তুই অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে বাইরে আছিস, এইবার বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার৷’
ভূতো বললে, ‘স্যার! আমি ঠিক পারছি না, তাই না?’
‘তুই আমাদের চেয়েও ভালো পারছিস৷ ঠিক মাপ মতো ঢালছিস৷ একটুও শিশির গা দিয়ে গড়াচ্ছে না৷ তোর ‘কনসেনট্রেশান’ আছে৷ লেখা-পড়ার কাজে লাগবে৷ আমি যেতে বলছি অন্য কারণে, অনেকক্ষণ আমার সঙ্গে বাইরে আছিস, সবাই বলবেন, ছেলেটার লেখা-পড়া মাথায় উঠল৷’
‘একথা কেউ বলবে না৷ আমার বোনটাকেই ভয়৷ রাগ করে সারা দিন কথা বলবে না৷’
‘তোকে ভীষণ ভালোবাসে৷’
‘ভীষণ মারামারি করে৷ ওর সঙ্গে আমি পারি না৷’
‘হেরে যেতে ভালো লাগে না?’
‘খুব ভালো লাগে৷ তখন ওর চোখ দুটো কাচের মতো চকচক করে, গায়ের রং আরও টকটকে হয়ে যায়৷’
‘লক্ষ করে রাখ, এইসব তোর লেখার কাজে লাগবে একদিন৷ ভালোবাসার রং৷’
‘স্যার! আমার নাম ভূতোই থাক৷ গৌর নামটা কেমন যেন অচেনা৷ অন্য কারো নাম৷ ভূতোকেই আমি ভালোবাসি৷ ভূতো আমার কাছে অনেক দিন আছে৷’
নিরঞ্জন স্যার অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে ভূতোর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘কী বললি রে? তোর সঙ্গে থেকে আমিই না লেখক হয়ে যাই!’
‘স্যার! আমি আর কিছুক্ষণ থাকি৷ আপনি তো ওই দিকেই যাবেন, মন্দিরে?’
‘তার আগে ঝট করে একবার বাজারে যাব৷ উপেন ঠাকুরকে পলতার বড়া খাওয়াব৷’
মুকুল বললে, ‘খুব জ্বর৷ এই যে ওষুধ তৈরি আছে৷ একদম কথা শোনেন না৷ মা কালকে খুব বকেছে৷ বলেছে, দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবে৷’
‘মানুষটা কী পবিত্র! স্বচ্ছ গঙ্গাজল৷ আহা! শিব ওঁর ভেতরে ঢুকে গেছেন৷’
মুকুল বলল, ‘কোনও কাজে কারও সাহায্য নেবেন না৷ অদ্ভুত! প্রায় দুই জ্বর, সেই অবস্থায় মন্দিরের মেঝে মুছছেন৷ মা বললেন, সরুন, আমি করছি৷ বললেন, বউমা, আমি এখনও উঠতে পারছি৷’
সৌদামিনী বললে, মাস্টার! তুমি কোন ভোরে ওঠো, এত বেলায় এলে পলতার খোঁজে? কয়েক আঁটি এনেছিলাম৷ সে কি আর থাকে!’
স্যার বললেন, ‘দিদি! উপেন ঠাকুরের খুব জ্বর৷ আমি বলে এসেছি, পলতার বড়া খাওয়াব৷ গত তিনদিন বেলপাতা আর গঙ্গার জল খেয়ে আছেন৷’
‘ঠাকুর তো নিজেই শিব৷ তুমি একটু দাঁড়াও, আমি বিস্টুর কাছে দেখি৷ ও অনেক আনে৷’
নিরঞ্জন স্যার তিন আঁটি পলতা, ব্যাসন আর দুটো বড় গামছা কিনে মন্দিরে ফিরে এলেন৷ চৌবে এসেছে৷ মন্দির ধোয়া-মোছা সাফ৷ ঠাকুর বসে আছেন৷ ফুল, বেলপাতা স্তূপাকার৷ মাধবী পায়ের কাছে নিঃশব্দে স্থির হয়ে একটি একটি করে নিখুঁত বেলপাতা বেছে পুজোর থালায় একটার ওপর আর একটা রাখছে৷ সেই সময় কথা বলতে নেই৷ থুতুর ছিটে লাগতে পারে৷ ভূতোকে দেখে উঠে এসে বললে, ‘মা বললে, দেখে আয় ভূতটা কার ঘাড়ে চেপেছে, তুই ওঝা হয়ে বেশ করে পিটিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আয়৷’
‘এ তোর কথা৷ মা জানে আমি স্যারের সঙ্গে আছি৷ স্যারের আজ অনেক কাজ৷’
‘তোর সঙ্গে বকবক করে লাভ নেই৷ আমারও অনেক কাজ৷ হোমের জন্যে একশো আটটা বেলপাতা বাছতে হবে৷ আকন্দর মালা গাঁথতে হবে৷ তোর তো কোনো কাজ নেই৷
‘একটু পরেই দেখতে পাবি৷ স্যার, গঙ্গায় নেমেছেন৷’
‘স্যার নেমেছেন, তুই তো নামিসনি৷’
‘আমি গঙ্গায় নামলে মা আমার পিঠের ছাল ছাড়িয়ে দেবে৷’
এদিকে যখন এইসব হচ্ছে, তখন অন্যদিকে অন্য কিছু হচ্ছে৷ হরমোহন, ভুজঙ্গ আর পার্বতীচরণ, এই তিনজন একটা দল৷ এদের কাজই হল মানুষের পেছনে লাগা৷ হরমোহন উকিল, ভুজঙ্গ দালাল, পাবর্তীচরণ সুদখোর৷ তিনজনে জমিদার কৃষ্ণবিহারীবাবুর বৈঠকখানায় অনেকক্ষণ বসে আছে৷ কুঞ্জবাবুর পিতামহ এই স্কুলটা করেছিলেন৷ বিলিতি টাইপের বাড়ি৷ এমন বাড়ি তল্লাটে নেই৷ কৃষ্ণবাবু খাজনাখেকো জমিদার নন৷ পণ্ডিত মানুষ, লেখক, দানধ্যান করেন৷ ছেলে-মেয়ে শিক্ষিত৷ গঙ্গার ধারের সমস্ত জায়গা তাঁদের৷ শিবমন্দির ওঁদের৷ কৃষ্ণবাবু স্কুলের প্রেসিডেন্ট৷ হরমোহন সেক্রেটারি৷ বাকি দুজন কমিটি মেম্বার৷
কৃষ্ণবাবু ঘরে এলেন৷ ফরসা, বলিষ্ঠ এক মানুষ৷ নিয়মিত ব্যায়াম করতেন৷ ঘোড়া ছোটাতেন৷ সাঁতার কাটতেন৷ বয়েস ধরা যায় না৷ তবে ষাট পেরিয়েছে৷ জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি৷ ডক্টরেট করেছেন৷ তিন-চারবার বিদেশ গেছেন৷ হরমোহন-টরমোহন এঁর ‘নখের যুগ্যি’? ছ’ফুটের ওপর লম্বা৷ পরে আছেন দুধ-সাদা পোশাক৷ এঁর সামনে ওই তিনটে লোক যেন ভিজে ছুঁচো৷ কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়েছেন৷ সামনে কুঁজো হয়ে৷
কুঞ্জবাবু বললেন, ‘বসুন, বসুন৷ আপনাদের আসার কারণ জানি৷ ওরে কে আছিস—তিন কাপ চা নিয়ে আয়৷ কাল রাতে দার্জিলিং-এর বাগান থেকে যে চালানটা এসেছে৷ হ্যাঁ, যে জন্যে এসেছেন—তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলা যাক৷ নিরঞ্জন স্যার?’
‘স্কুলের মান-সম্মান আর কিছু রইল না৷ লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন৷ একটা গ্র্যাভিটি নেই৷ এর রান্নাঘরে, ওর ঠাকুরঘরে৷ সময় নেই, অসময় নেই৷ কার জ্বর হয়েছে, তার পথ্য তৈরি করে দিচ্ছেন৷ মাথায় আইসব্যাগ দিচ্ছেন৷ এই তো এখন আপনাদের শিবমন্দিরে পুজোয় বসেছেন৷ উপেন ঠাকুরের জ্বর৷ কয়েকটা ছাত্র জুটিয়েছেন, পায়ে পায়ে ঘুরছে৷ লেখাপড়া শিকেয়৷ এবার স্কুলের রেজাল্ট খুব খারাপ হবে৷ ক্লাসে পড়ালে হবে না—উনি রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতনের কায়দা৷ কুঁজোর চিৎ হয়ে শোওয়ার শখ!’
‘আপনারা কী বলবেন, আমি সব জানি৷ আমার গুপ্তচর অনেক৷ আমি ব্রিটিশ কায়দায় চলি৷ এই আপনারা কী করেন, তাও জানি৷’
তিনজনের মুখের চেহারা পালটে গেল৷ চায়ের কাপের দিকে হাত এগোতে এগোতে থেমে গেল৷
কুঞ্জবাবু বললেন, ‘সবচেয়ে কঠিন কাজ সৎ থাকা৷ লোভ ছাড়া মানুষ হয় না৷ যাক্, আমি বিদ্যাসাগর নই৷ নীতিকথায় দুন.তি যাওয়ার নয়৷ এখন সঞ্জয় স্যার—সহ্য করা যায় না৷ সব প্রথা ভেঙে শেষ করে দিলেন৷’
‘ঠিক, একেবারে ঠিক৷’
‘আমি ভয়ংকর একটা স্টেপ নিতে বাধ্য হচ্ছি৷’
তিনজনের মুখ উজ্জ্বল হল৷ বেশ একটা এনার্জি এল শরীরে৷
হরমোহন মুখটাকে ওলকপির মতো করে বললেন, ‘এই জন্যেই আপনাকে আমরা সবাই বলি—ন্মাবতার৷’
‘বেশ করেন৷ এখন ধর্মস্থানেই চলুন৷ আমি শিবমন্দিরেই যাব৷ সঞ্জয় স্যার সেইখানেই আছেন৷ আপনারাও চলুন৷ ইংরেজিতে প্রবাদ আছে—স্ট্রাইক দ্যা আয়রন হোয়াইল হট৷ গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মারো লোহায়৷ একটা চিঠি তৈরিই আছে৷ ধর্মস্থানেই ধরিয়ে দোবো, আপনাদের সামনে৷ আজ খুব ভালো দিন৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন৷
সবাই কম্পাউন্ডে বেরিয়ে এলেন৷ হরমোহন বললেন, ‘গাড়ি?’
‘মন্দিরে যাব গাড়ি চেপে? অহংকার? না, না খালিপায়ে হেঁটে৷ খালিপায়ে পারব না৷ চটিটা থাক৷
মন্দিরে স্বভাবতই একটা হইচই৷ স্বয়ং জমিদার এসেছেন৷ সামনের চাতালে দাঁড়িয়ে আছেন নিরঞ্জন স্যার নতুন একটা গামছা পরে৷ ফরসা চওড়া বুকের ওপর আড়াআড়ি পড়ে আছে ধবধবে পইতে৷ কপালে ঝুলছে ভিজে চুল৷ কুঞ্জবাবুকে নমস্কার করে বললেন, ‘আপনি এসেছেন, খুব ভালো লাগছে৷’
হরমোহন মনে মনে বললেন, ‘ভালো লাগাচ্ছি৷ শেষকালে এই গামছাই পোশাক হবে৷ তোর যম এসেছে৷’
কুঞ্জবাবু বললেন, ‘পূজারির এ কী সাজ?’
হরমোহন ফুট কাটলেন, ‘গামছা পরে কেউ পুজো করে? ছ্যাঃ! কিস্যু জানে না৷’
নিরঞ্জন স্যার বললেন, ‘আমার পুজোর কাপড় নেই৷ গামছাটা নতুন৷’
হরমোহন বললেন, ‘সব ব্যাপারে আপনাকে নাক গলাতে কে বলেছে?’
কুঞ্জবাবু ডান হাতের পাঞ্জাটা তুলে বলেলেন, ‘আপনি চুপ করুন৷’ তারপর গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘চৌবে!’
চৌবে হাত মুছতে মুছতে এল৷ কুঞ্জবাবু বললেন, ‘একছুটে বাড়িতে যাও৷ মা’র কাছ থেকে নতুন পুজোর জোড় চেয়ে আনো৷ শিগগির৷’
হরমোহন একটু থমকে গেলেন৷ ইতস্তত করে বললেন, ওইটা সার্ভ করে দিন৷’
কুঞ্জবাবু মুচকি হেসে বললেন, ‘আগে রাজবেশে সাজাই৷’
হরমোহন ভাবলেন, ‘বলির পাঁঠাকেও জবার মালা, সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে উৎসর্গ করা হয়! এটাও তো একটা মানুষ পাঁঠা!
উপেন ঠাকুর একটা চাদর জড়িয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন৷
কুঞ্জবাবু বললেন, ‘অনেকদিন পরে অসুস্থ হলেন! বয়েস বাড়ছে৷’
মুকুল এসে হাজির! হাতে একটা কিট ব্যাগ৷ কুঞ্জবাবু বললেন, ‘কেমন আছ মুকুল? বাবা-মা?’
মুকুল পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললে, ‘বাবার তো আর কিছু করা যাবে না৷’
‘তোমার গান?’
মুকুল মাথা নীচু করে লজ্জার হাসি হাসল৷
কুঞ্জবাবু বললেন, তুমি খুব ভালো গাও৷ আমি তোমার গান শুনেছি৷ হ্যাঁ শোনো, তোমার বাতের তেলে আমার স্ত্রীর উপকার হয়েছে৷ আরও দু-শিশি দিও৷’
‘আজ্ঞে, আজই দিয়ে আসব৷ তৈরি করেছি৷’
নিরঞ্জন স্যার জোড় পরে সামনে এসে দাঁড়ালেন৷
কুঞ্জবাবু বললেন, ‘বাঃ, বাঃ, একেবারে রাজপুত্তুরের মতো দেখাচ্ছে৷ আচ্ছা! আপনি পুজোয় বসার আগে আমার একটা ঘোষণা আছে৷ যে যেখানে আছেন এখানে আসুন৷’
হরমোহন ও তাঁর সঙ্গীরা টান টান৷ কে একজন মন্দিরের ঘণ্টাটা ঢং করে বাজাল৷
কুঞ্জবাবু কাগজটা হরমোহনবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘আপনি উকিল৷ এটা আপনিই পড়ে শোনান৷’
হরমোহন পড়ছেন ঃ
শ্রীনিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়,
মান্যবরেষু৷৷
আপনি আমাদের গৌরব, জাতির গৌরব৷ স্বামী বিবেকানন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমাদের দেশে শিক্ষক কোথায়? শিক্ষা কোথায়৷ যে শিক্ষায় মানুষ তৈরি হয়—চরিত্রবান মানুষ, ইস্পাত কঠিন মানুষ৷ বলেছিলেন, মহম্মদ যদি পর্বতের কাছে না যায়, পর্বতই মহম্মদের কাছে যাবে৷ শিক্ষার আলো মানুষের ঘরে ঘরে নিয়ে যেতে হবে৷ আপনি সেই আলোর দূত৷ বেদের কালের গুরু-শিষ্য পরম্পরা আপনি ফিরিয়ে এনেছেন৷ আপনি শুধু আদর্শ শিক্ষক নন, শিক্ষার আদর্শ৷ আপনার ভেতরে আমরা ডিরোজিওকে, বেথুনকে প্রত্যক্ষ করছি৷ আমাদের শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন৷ হরমোহন উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদে বরণ করে নেওয়া হল৷ অবিলম্বে কার্যভার গ্রহণ করে আমাদের বাধিত করুন৷ আপনার দীর্ঘ জীবন প্রার্থনা করি৷
ইতি
কুঞ্জবিহারী মুখোপাধ্যায়
সভাপতি
কিছুক্ষণ সবাই স্তব্ধ, তারপর উল্লাস৷ ঘণ্টাধ্বনি, শঙ্খধ্বনি৷ জয় বাবা ভোলানাথ, জয় বাবা বিশ্বনাথ, জয় বাবা কুঞ্জেশ্বর৷
মুকুল দু-হাত তুলে নাচছে আর গাইছে—‘তাথইয়া, তাথইয়া নাচে ভোলা’—স্বামীজির লেখা গান৷
কালো বেড়াল হরমোহন আর তার দুই ল্যাংবোট—ওই যে পালাচ্ছে৷
নিরঞ্জন স্যার পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন৷ চতুর্দিকে হাসি হাসি মুখ৷
হঠাৎ কুঞ্জবাবু ভূতোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজ সন্ধেবেলা আমি তোমাকে তোমার স্বপ্নের গোল আয়না দোব৷ আজ আমাদের আনন্দের দিন৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন