আমি ও টম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

গলায় নতুন বগলস পরে দরজার সামনে বসে আছে টম৷ টম আমার কুকুর৷ গায়ের রং বাদামি৷ কপালে একটা সাদা তিলক৷ লেজটা বেশ মোটাসোটা৷ মেঝেতে আয়েশ করে ফেলে রেখেছে৷ ন্যাজের ডগাটা আবার সাদা৷ মাঝে-মাঝে যখন জোরে হাওয়া দিচ্ছে চোখ যেন বুজে আসছে৷ কানের পাশের লোম উড়ছে ফুরফুর করে৷ হাওয়ায় ঘাড়ের লোমে ঢেউ খেলে যাচ্ছে৷

আমাদের দুজনেরই খুব মন খারাপ৷ দু-জনেই বকুনি খেয়ে দরজার সামনে বসে আছি৷ আমি শুধু বকুনি খেয়েছি, টম আবার খবরের কাগজ পেটা খেয়েছে৷

‘তোকে তখন আমি বারবার বললুম চাদর ধরে অমন করে টানাটানি করিসনি৷ ছিঁড়ে যাবে৷ খেলার সময় তোর তো কোনও জ্ঞান থাকে না৷ নতুন চাদর ছিঁড়ে দিলে মা রাগ করবে না? সব মা’ই রেগে যাবে৷ একটা চাদরের দাম জানিস?’

টম উদাস চোখে একবার তাকিয়ে চোখ আধবোজা করে আবার হাওয়া খেতে লাগল৷

‘তোকে না আমি বলেছি কোনও কথা বুঝলে প্যাটাপ্যাট ন্যাজ নাড়বি৷ তা না হলে আমি বুঝব কী করে কথাটা তোর কানে গেল কি গেল না! তোর আজকাল খুব ডাঁট হয়েছে৷ বিলিতি কুকুর বলে মাথা কিনে নিয়েছিস৷ কেমন মার খেলি?’

টম ন্যাজ নাড়ল! খুব মন খারাপ৷ তাই ন্যাজ তেমন জোরে নাড়ল না৷ পুটুক-পুটুক করে দুবার নেড়ে বুঝিয়ে দিলে, তোমার কথা বুঝেছি৷ টমের সঙ্গে আমার কথার্বাতা এই ভাবেই হয়৷ দুজনের ভাষা আলাদা হলেও দু-জনেই দু-জনকে বুঝতে পারি৷ ওর অকারণ ঘেউ-ঘেউটা বুঝি না ঠিকই, তবে ওর ন্যাজের আর চোখের ভাষা আমি বুঝি৷

‘এই টম! বাব্বা, তোর দেখছি আমার চেয়েও প্রেসটিজ জ্ঞান বেশি৷ এত করে ডাকছি, একবার তাকা না৷’

উদাস চোখে আমার দিকে একবার তাকিয়েই টম সামনের থাবায় মুখ রেখে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল৷ ‘তোর আর কী! মন খারাপ, লম্বা হয়ে ভর সন্ধেবেলা শুয়ে পড়লি৷ আমার তো আর সে-উপায় নেই৷ এখুনি পড়তে বসতে হবে৷ আলো না থাক, মা নাকের ডগায় শেজ জ্বেলে দিয়ে যাবে৷ কাশতে-কাশতে আমার শিক্ষকমশাই আসবেন৷ এক বস্তা খাতা, এক ধামা বই৷ আমি যদি তোর মতো কুকুর হতুম রে! দুজনেই বসে থাকতুম পাশাপাশি, গলায় বাদামি রঙের নতুন বগলস পরে৷ তবে আমি তোর চেয়ে একটু চালাক হতুম৷ বিছানার চাদর ধরে টানাটানি করে মার খেতুম না৷ আর কী হবে বল? দুঃখু করিসনি৷ তুই চাদর ছিঁড়ে মার খাস, আমি অঙ্ক ভুল করে মার খাই৷ দুজনেরই এক বরাত৷’

আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললুম, টমও দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল৷

আমাদের দুজনকে শোওয়ার ঘর থেকে কান ধরে বের করে দিয়ে মা গা-ধুতে গিয়েছিল৷ বাথরুম থেকে বেরিয়েই আবার বকাবকি শুরু করেছে৷ টমকে বলছে, ‘ওর কাছ থেকে সরে এসো৷ দরজার সামনে আর বসতে হবে না৷ একে রামে রক্ষে নেই, দোসর সুগ্রীব৷ তুমি এত হুড়ে ছিলে না৷ ওর পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছ৷ যাও, ঘরে যাও৷’ টম অমনি সুড়সুড় করে ঘরে চলে গেল৷ বা রে মজা! যত দোষ নন্দ ঘোষ!

আমি কী করেছি! টম শুয়েছিল৷ আমি ঘরে ঢুকতেই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে ন্যাজ নাড়ল, একবার ডন মারল, তারপর লাফ মেরে-মেরে আমার হাতটা ধরার চেষ্টা করতে লাগল৷ তার মানেটা কী? শুয়ে থেকে-থেকে শরীরে জং ধরে গেল, এসো এক পক্কড় খেলা হয়ে যাক৷ তখন বালিশ নিয়ে, বল নিয়ে, ফেদার ডাস্টার নিয়ে, সে কী হুটোপাটি? মেঝে থেকে খাটে, খাট থেকে মেঝেতে৷ কখনও আমি নিচে, টম আমার ঘাড়ে, কখনও টম নিচে, আমি তার ঘাড়ে৷ উঃ, কী লাফান লাফায় টম! জিভ বের করে হ্যা-হ্যা করছে৷ ঝুল কাটছে৷ তেড়ে-তেড়ে এসে পা জড়িয়ে ধরছে৷ আমি একবারও বলেছি, টম তুই চাদরটা ছেঁড়! এসব কথা কেউ বলতে পারে!

রাত আটটার সময় মাস্টারমশাই চলে গেলেন৷ পাটিগণিত, জ্যামিতি, গ্রামার, বিজ্ঞান মাথায় ম্যারাকাস বাজছে৷ রান্নাঘরের কাছে মা খুব লাফাচ্ছে৷ মনে হয় আরশোলা বেরিয়েছে৷ এখন খুব ‘খোকা খোকা৷’ খোকা যাওয়ার আগেই আর এক খোকা, টম গিয়ে হাজির৷ টমটা দেখছি মায়ের এক নম্বর চামচা৷ আরশোলা নয়, ইয়া বড় এক কোলাব্যাঙ৷ বাগান থেকে উঠে এসেছে বোধহয়৷ ব্যাঙটা দেওয়ালের কোণে থপাক-থপাক করে লাফাচ্ছে৷

সব ব্যাপারেই টমের আগ বাড়িয়ে যাওয়া চাই৷ একটা হিরো-হিরো ভাব৷ ঘাড় কাত করে ব্যাংটাকে দেখছে আর গোঁ-গোঁ করছে৷ মা বলছে, ‘ওরে, তুই তো খুব ফুটবল খেলিস, এক কিকে ওটাকে বাইরে পাঠাতে পারছিস না৷’

‘পাঠাব কী করে মা? তোমার টম যে আগেই ওখানে গিয়ে মস্তানি করছে৷’

টম ভেবেছে ওটা একটা বল? লাফাচ্ছে আবার পড়ে যাচ্ছে৷ মাঝে-মাঝে টুকুস-টুকুস করে থাবা বাড়াচ্ছে আবার টেনে নিচ্ছে৷ হঠাৎ সাহস খুব বেড়ে গেল৷ ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক করে ব্যাঙটাকে কামড়ে ধরেই ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এল৷

বাবা! ব্যাঙের বিষ তো জানো না! ঠাসা বিষ, দিয়েছে টমের মুখে ঢেলে৷ টমের মুখে গ্যাঁজলা৷ অসহ্য যন্ত্রণায় মেঝেতে শুয়ে পড়ে কাতরাচ্ছে৷ ব্যাংটা বোধহয় মরেই গেছে৷ চারটে ঠ্যাং ওপরে তুলে কোণে পড়ে আছে৷ মাঝে-মাঝে নড়ছে৷

মা ভীষণ ঘাবড়ে গেছে৷ ঘাবড়ালে কী হবে, আমাকে দাবড়াতে ভোলেনি৷

‘এ কী হল রে? টম, টম! যাঃ, বাঁচবে তো? যদি মরে তো তোর জন্যেই মরবে৷ এত বড় ছেলে হলি, না মারতে পারলি ব্যাঙটাকে একটা লাথি, না পারলি টমটাকে আটকাতে৷ অপদার্থ!’

‘কী করে বুঝব মা, বলা নেই কওয়া নেই তোমার টম ইডিয়েটের মতো ব্যাংটাকে কামড়াতে যাবে৷’ ফরাসিরা ব্যাঙ খায়৷ কই তাদের মুখ দিয়ে তো গ্যাঁজলা বেরোয় না৷ ব্যাঙ কি সাবান দিয়ে তৈরি? তা না হলে টমের মুখ দিয়ে এত ফেনা বেরোচ্ছে কী করে? একটা জিনিস বুঝলুম, কুকুরের পেটে দুটো জিনিস সহ্য হয় না, এক ঘি, দুই ব্যাঙ৷

টমের অবস্থা যত খারাপের দিকে যাচ্ছে, মায়ের উত্তেজনা ততই বাড়ছে৷ আর যা হয়! মায়ের যেমন স্বভাব! কী করবে বুঝতে পারছে না, অসহায় অবস্থা, চোখ বেয়ে জল নামছে৷ আমারও মনটা খুব খারাপ হচ্ছে৷ টম আমার বন্ধু৷ মা বলে আমরা দুটো ভাই৷ একজন দ্বিপদ, আর একজন চতুষ্পদ৷

বাবা এসে পড়লেন৷ না এলে কী যে হতো৷ বাবা সব শুনে বললেন, ‘দুধ আন৷ ডিম আছে, ডিম?’ দুধ এল, ডিম এল৷ ডিমের সাদা অংশটা দুধে মিশিয়ে বেশ করে ফেটানো হল৷ এইবার টমকে খাওয়াতে হবে৷ যেমন করেই হোক মুখে ঢুকিয়ে দিতে হবে৷ উঃ, সে কী দুঃসাধ্য ব্যাপার!

সেই এগ ফ্লিপ খেয়ে টম দুদিন বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল৷ উঃ, ব্যাঙের কী নেশা৷

আমরা যেমন অসুখ থেকে উঠলে ঝোলভাত খাই টমও তেমনি তিনদিনের দিন উঠে দুধ-ভাত খেল৷ শরীরটা খুবই দুর্বল৷ দুজনে বসে আছি দরজার কাছে৷ একটু আগে মা বলে গেছে, ‘দরজার সামনে বেশিক্ষণ বসে থেকো না টম, এখনও শরীরটা তেমন সারেনি৷ তোমার জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ো৷

একগাদা বাদুলে পোকা ফলসা গাছের তলায় বিজ-বিজ করছে৷ টম ঘাড় কাত করে, কান খাড়া করে পোকাগুলোকে দেখল৷ মুখ দেখে মনে হল খুব ইচ্ছে করছে একবার খোঁচাখুচি করে৷ কিন্তু কিছু করল না৷ উদাস হয়ে রইল৷ একটা টিকটিকি চলে গেল সড়সড় করে৷ একবার ঝিঁকি মেরে উঠেছিল৷ আর একটু হলেই দৌড়ে ফেলত৷ খুব সামলে নিল নিজেকে৷ অ্যায়, এইবার একটা ব্যাঙ বেরিয়েছে৷ সেই কোলা৷ থপাক-থপাক করে চলেছে৷ খুব মন দিয়ে জিনিসটাকে দেখছে৷ ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে চলে গেল৷ চোখের বাইরে যেতেই টম একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল৷ আমি বললুম, ‘যাও না, যাও, আর একবার হয়ে যাক৷’ টম আমার দিকে তাকালই না৷

কিছুক্ষণ পরে একটা শামুক বেরোল৷ ধীরে-ধীরে রেলগাড়ির মতো চলেছে, পিঠে খোল, সামনে বাড়া দুটো শুঁড়, শুঁড়ের মাথায় দুটো কালো ফুটকি চোখ৷ টমের চোখে-মুখে ভীষণ একাগ্রতা৷ আমরা যেভাবে পুজোর মিছিল দেখি সেইভাবে দেখছে৷ একেবারে নতুন ধরনের জীব৷ বসে-বসেই দুবার নেচে উঠল৷ পা উসখুস করছে৷ গলা বাড়িয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে দেখছে৷ ‘টম, আর চালাকি করতে যেও না৷ মরবে৷’ ভুক-ভুক করে আমাকে বোধহয় বলতে চাইল, নিজের চরকায় তেল দাও৷ তড়াক করে লাফিয়ে গিয়ে এক থাবা মারতেই শামুকটা ভেতরে ঢুকে গেল৷ আমি বললুম, ‘টম ম্যাজিক৷’ টম তখন দুটো থাবা দিয়ে সেটাকে নিয়ে ফুটবলের মতো খেলতে শুরু করেছে৷ ‘শামুক বলে বেঁচে গেলি৷ তা না হলে আবার এগ ফ্লিপ, দুদিন ঘুম৷’ শামুকটাকে এ-পা থেকে ও-পায়ে ঠেলে দিয়ে টম ভোও করে জানিয়ে দিল জিনিসটা তো মন্দ নয়৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%