অহিদার চোরধরা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার দাদা, অহিদা, ব্যারাকপুরে নতুন বাড়ি করেছেন৷ চারপাশে বাগান৷ একতলা হলদে বাড়ি৷ ছাদে অ্যালুমিনিয়াম রঙের জলের ট্যাঙ্ক৷ টেলিভিশনের অ্যান্টেনা৷ একপাশে খানিকটা অংশ চারদিক তারের জাল দিয়ে ঘেরা৷ তার ভেতরে নানারকম গাছ৷ এক-একটা টবে ছোট-ছোট চৌকো টিকিট, কাঠি দিয়ে নোটিসের মতো মাটিতে পোঁতা৷ অদ্ভুত-অদ্ভুত সব নাম—অ্যাকুইলেগিয়া, অ্যাসপিডিস্ট্রা, ক্যালানা ভালগারিস, গোদেতিয়া, গ্লোকসিনিয়া৷ ওই জালিঘরে ঢোকার গেটে একটা টিনের ফলকে লেখা—যারা ফুল ভালোবাসে, তারা ঈশ্বরকে ভালোবাসে৷ আর একটা ফলকে লেখা—ফুল মানে ফল নয়৷ অন্য আর একটা ফলকে লেখা—ফুলের আকাঙ্ক্ষা করো, ফলের নয়৷

নিজে আর্টিস্ট, যা খুশি তাই লিখতে পারেন৷ আঁকতে পারেন৷ যেমন বাড়িতে ঢোকার গেটের বাইরে লিখে রেখেছেন—কুকুর নেই৷ কুকুর শব্দটা পড়েই লোকে ভাবেন, লেখা আছে—কুকুর হইতে সাবধান৷ ঢোকার আগে গেটের আঙটা বাজিয়ে চিৎকার করে বারবার জিগ্যেস করতে থাকেন, ‘কুকুর বাঁধা আছে তো?’ বসার ঘরের জানলা খুলে অহিদা তখন ভারী গম্ভীর গলায় বলেন, ‘আর একবার পড়ে দ্যাখো৷’

প্রভাতবাবু একদিন সকালে ওইভাবে বেকাদায় পড়ে, পরে ঢুকতে-ঢুকতে, একটু রাগ-রাগ গলায় জিগ্যেস করেছিলেন, ‘এটা তোমার কী কায়দা অহি? কুকুর নেই, সেটা লিখে জানাবার কী আছে হে!’ মোটা চশমার কাচ মুছতে-মুছতে অহিদা বলেছিলেন, ‘একটাই কারণ কাকা, পড়লে পুরোটাই পড়বেন, বুঝলে পুরোটাই বুঝবেন৷ শুধু মলাট দেখেই বিচার করবেন না৷ ক মানেই কৃষ্ণ নয়, কাকও হতে পারে, কঙ্কালও হতে পারে, কালিও হতে পারে!’

বাথরুমের বাইরে লিখে রেখেছেন—বাথরুম৷ শোওয়ার ঘরে—বেডরুম৷ রান্নাঘরে—কিচেন৷ ‘এসব কেন লিখেছেন অহিদা, বোঝাই তো যাচ্ছে বাথরুম, বেডরুম, কিচেন৷’ অহিদা বললেন, ‘ক’টা লোক বোঝে হে, স্নানঘর, শোওয়ার ঘর, রান্নাঘর, খাবারঘরের মর্ম৷ ঘরে-ঘরে গিয়ে দ্যাখো, বাথরুমে পা দিতে পারবে না৷ শোওয়ার ঘরটা খেলাঘর, বসার ঘর! খাটে পাতা বিছানা লন্ডভন্ড৷ ধুলো-বালি কিচকিচ করছে৷ বসার ঘরটাকে মনে হবে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম৷ রান্নাঘরটাকে করে রাখবে গোয়ালঘর৷ চলতে ফিরতে মনে করিয়ে দাও৷ সবসময় চোখের সামনে নোটিস লটকে দাও৷’

আমার এই দাদা, অহিদা, যেমন ছবি আঁকতে ভালোবাসেন, তেমনি খেতে ভালোবাসেন৷ খেতে ভালোবাসেন বলে রাঁধতেও ভালোবাসেন৷ রাঁধতে ভালোবাসেন বলে বাজার করতে ভালোবাসেন৷ সুখে থাকলে, আনন্দে থাকলে মানুষের চেহারা ভালো হয়৷ প্রথমে মুখটা গোল হতে থাকে৷ বেলুন আস্তে-আস্তে ফোলালে যেমন হয়৷ ভাঙা গাল, চোয়ালের হাড়, সব ভরাট হতে থাকে৷ গলার কণ্ঠা ক্রমশ চাপা পড়তে থাকে৷ ঘাড়টা ক্রমশ বেড়ে ওঠা-কলাগাছের মতো গোল থেকে আরও গোল হতে থাকে৷ অহিদার চেহারা বরাবরই ভালো৷ তারপর ভালোতর থেকে ভালোতম হয়ে এখন ভালো-ভালোতর, ভালো-ভালোতম হয়ে ক্রমশই বেড়ে চলেছে৷ কী মজা, রোগা হলে লোকে বলবেন, আহা, তোমার শরীটা কী হয়ে গেছে! আবার মোটা হলেও বলবেন, কী হচ্ছে তোমার শরীরটা! প্রতিবেশী প্রভাতবাবু দেখা হলেই বলবেন, ‘কী হচ্ছে অহি৷ এরপর তো একটা আয়নায় তোমার কুলোবে না হে, জোড়া আয়না লাগিয়ে মুখ দেখতে হবে৷’

অহিদার নজর লাগবে না৷ লাগলেও কিছু হবে না৷ কী আর কমবে! সাগর থেকে ঘটিখানেক জল তুলে নিলে সাগরের কী হবে! সে হবে আমাদের৷ কেউ যদি বলেন, তোর চেহারাটা বেশ চকচক করছে, তাহলেই আমার মা আড়ালে ডেকে কড়ে আঙুলটা কামড়ে গায়ে একটু নুন ছিটিয়ে দেবেন৷

এখন নিজের চেহারাটা যখন এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হয়, তখন বাজার বওয়া, কি কাঁধের পাশে সামান্য একটা ঝোলা ব্যাগ বওয়াও কষ্টকর ব্যাপার৷ নিজেরটা নিয়েই অস্থির, তার ওপর আবার আলু, পটল, ঢ্যাঁড়স ড্রয়িং বোর্ড, তুলি, রং, জামা, কাপড়, চটি, চুল, দাড়ি! সেই জন্যেই নেপাল থেকে আনিয়েছেন বাহাদুরকে৷ বাহাদুর সব পারে৷

ছাদের বাগান আর নিচের বাগানে চারাগাছে জল দিতে পারে৷ এমনভাবে পারে, একটা চারাও উল্টে পড়বে না৷ একটা মাঝখান থেকে চেরা বাঁশ এমন কায়দায়, ফ্যাটফাট করে বাজাতে পারে যে সেই শব্দ শুনলে মানুষের ঘুম এসে যাবে, আর যেসব পাখি বীজ চারা নষ্ট করে, তারা ফররর ফররর করে উড়ে পালাবে! বাহাদুর মোটর গাড়ির টায়ার কাঁধে তুলতে পারে৷ দু-কাঁধে, হাতের ফাঁক দিয়ে দুটো টায়ার ঝুলিয়ে শিস দিতে-দিতে দুমাইল দূরের বাজার থেকে ঘুরে আসতে পারে৷ একটা বড় খাট একাই তুলতে পারে৷ পারে না কেবল অহিদাকে তুলতে৷

কী করে বলছি পারে না? দেখছি বলেই বলতে পারছি৷ অহিদা ব্যারাকপুর স্টেশনে একদিন পা মচকে পড়ে গেলেন! অহিদার দোষ নেই৷ একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনা৷ মহৎ কাজ! অসুবিধে হল, গাড়ির হর্ন থাকে, অহিদার তো হর্ন নেই৷ গাড়ির একেবারে চাকার তলায় কিছু পড়লে ড্রাইভার দেখতে পায় না, অহিদার একেবারে ভুঁড়ির তলায় প্ল্যাটফর্মে কুকুরটা শুয়ে ছিল৷ কী করে দেখবেন! বাহাদুর চেঁচাচ্ছে, ‘কুত্তা বাবু, বাবু কুত্তা!’ কুকুর ঘুমুলেও তার অনুভুতিটা তো আর ঘুমিয়ে পড়ে না৷ সে ভেবেছে মালবোঝাই লরি আসছে৷ অহিদার শেষ পদক্ষেপটা কুকুরটার পেটের ওপরেই হতো, যদি না কুকুরটার বিদ্যুৎ গতিতে অহিদার পায়ের ফাঁক দিয়ে পালাবার চেষ্টা করত৷ পালাবে কোথায়! সামনে কোঁচা, পিছনে ঝুলন্ত কাছা৷ কুকুরটা আকারেও তেমন বড় নয়৷ অহিদার কাছায় কোঁচায় জড়ামড়ি হয়ে, জালে-পড়া শেয়ালের মতো ঝটপট করছে, সঙ্গে কেঁউ-কেঁউ! আর্তনাদ৷ বাহাদুর বলছে ‘উতার দিজিয়ে, উতার দিজিয়ে৷’ পিছন থেকে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলছেন, ‘ঝেড়ে ফ্যালো খোকা, ঝেড়ে ফ্যালো খোকা!’

অহিদা নীচের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, পায়ের ফাঁকে ব্যাপারটা কী হচ্ছে! দেখতে তো পাচ্ছেন না৷ ভুঁড়ির জন্যে দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে৷ পুরো ঘটনাটাই খুব দ্রুত ঘটছে৷ কুকুরটা মুক্তির চেষ্টায় শেষ ঝটকাটা বোধহয় একটু জোরেই দিতে পেরেছিল৷ কাছাটা খুলে গেল৷ অহিদার কাছা এবার কুকুরটার পেছনের পায়ে জড়িয়ে কুকুরের কাছা হয়ে গেছে৷ কুকুর ভাবছে, অহিদা তার কাছা টেনে ধরেছেন৷ যে-দিকে কুকুরের মুখ অহিদার মুখ তার উলটো দিকে৷ কুকুরটা প্রাণপণে দৌড়চ্ছে তিন পায়ে৷ একটা পা কাছায় আটকে উঁচু হয়ে আছে৷ অহিদা কখনও রাগেন না বা উত্তেজিতও হন না৷ ধীর গলায় শুধু বলছেন, ‘এই কী হচ্ছে, কী হচ্ছে!’ কুকুরটা শেষপর্যন্ত হয়তো পালাতে পারত কাছা ছাড়িয়ে৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত পারল না৷ কোথা থেকে একটা মুশমুশে কালো কুকুর টিনের বেড়া গলে সামনে এসে দাঁড়াল৷ মনে হয় জাতভাইয়ের দুর্গতিতে কোনও সাহায্য করা যায় কি না দেখতে এসেছিল৷ অহিদার কাছায় জড়ানো কুকুরটা কিন্তু অন্যরকম ভেবে বসল৷ ভয়ে আবার উলটো দিকে দে দৌড়৷ নিমেষে অহিদার কাছাতে, কোঁচাতে, কুকুরের ন্যাজেতে কী হয়ে গেল৷ হিমগিরির পতন৷ অহিদা পড়ে গেলেন৷ আমাদের পড়া একরকম, অহিদার পড়া আর একরকম৷ আমাদের ওপর দিকটা তো তেমন ভারী নয়৷ অহিদার পড়া মানে, নিজের পায়েই নিজে পড়া৷ ওপরের অতটা গুরুভার সহসা নেমে এল নিজের পায়ে! সেইদিন দেখলুম, বাহাদুর সব তুলতে পারে, পারে না কেবল নিজের বাবুকে৷ অহিদা অবশ্য পরে গর্ব করে বলেছিলেন, ‘যে বাবুকে চাকর তুলে ফেলে, সে-বাবু বাবুই নয়৷’ তখন অবশ্য বাহাদুরকে খুব গালাগালি দিয়েছিলেন, ‘এর আগের বাহাদুর হাতি তুলে ফেলত, তুই ব্যাটা কোথাকার বাহাদুর!’ অহিদার বাড়িতে যেই কাজ করতে আসে, তার নামই বাহাদুর৷

সেই বাহাদুর রাগ করে কলকাতায় চলে গেছে৷ প্রথমদিন বাহাদুর-শূন্য অবস্থায় অহিদার খুব অসুবিধে হয়েছিল৷ অহিদার চেয়ে অসুবিধে হয়েছিল বউদির৷ দুটো প্রেশার কুকার, দুটো ডবল গ্যাস উনুন, একটা কোরোসিন স্টোভকে কাজে নামিয়েও তিনি অহিদাকে সামলাতে পারেন না৷ খেতে ভালোবাসেন৷ অনবরতই খেতে চান৷ খাই-খাই৷ একটু এদিক-ওদিক হলেই রাগ৷ অতবড় একটা মানুষ রেগে গেলে কী রকম শব্দ হয়! বউদি আবার শব্দ সহ্য করতে পারেন না৷ অহিদা রেগে গেলেই হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা নয়, একেবারে ফরাসি ভাষায় চলে যান—‘স্তুপিদ-স্তুপিদ’! ভুজ্যাত অ্যা মেসাঁ, মেসাঁ৷’ নল দিয়ে জল বেরোলে বেশ জম্পেশ করে একটা কিছু গুঁজে দিলে জল বেরোনো বন্ধ হয়৷ গর্ত দিয়ে শেয়াল বেরোলে মাটি চাপা দিতে হয়৷ ফুটো দিয়ে ইঁদুর বেরোলে ইট পুরে দিতে হয়৷ অহিদার মুখ দিয়ে ফরাসি বেরোলেই বেশ নরম, গরম, তুলতুলে, মুচমুচে, ভরাট কিছু খাবার গুঁজে দিতে হয়৷ তা না হলেই, ভুজ্যাত-ভুজ্যাত!

সারাদিন এইভাবে সংসার চালাতে গিয়ে রাতের দিকে বউদির শরীরে আর শক্তি থাকে না৷ রাতের খাওয়া শেষ করেই বউদি ধপাস করে যেই বিছানায় পড়েন, অমনি ঘুম৷ বউদি ঘুমুলেই অহিদার যত খুটখাট শুরু হয়ে যায়৷ চাপা আলো জ্বেলে ইজিচেয়ারে বসে বিদেশি বই পড়ছেন৷ সাবেক আমলের পিয়ানোর ধুলো ঝেড়ে, বেঠোভেনকে স্মরণ করে, টুংটাং করছেন৷ যেমন কায়দার বসা, তেমনি কায়দার বাজানো! মনে-মনে ভাবছেন, সোনাটা বাজাচ্ছি! ভেতর থেকে তিড়িং করে যেই একটা ইঁদুর লাফিয়ে উঠল, তাড়াতাড়ি ঢাকনাটা বন্ধ করে, বাজানোর টুল থেকে উঠে পড়লেন৷ দরকার নেই বাবা, মাউস!

কোনও-কোনও দিন চোরের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে, আলো জ্বেলে কী সব করেন! নোট জাল নয় তো? আধঘণ্টার মধ্যেই প্রেশার কুকার ফিইস্ করে ওঠে৷ চোখ বুজে, নিজের দু-কানে আঙুল দিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন৷ ভাবেন নিজের কান চাপা দিলেই স্ত্রীর কানে এই বিচ্ছিরি শব্দটা ঢুকবে না, ঘুম ভাঙবে না, ইচ্ছেমতো রান্না করে খাওয়ার অপরাধটা ধরা পড়বে না৷ শব্দটা বন্ধ হলে কুকারটা ওভেন থেকে নামিয়ে নিয়ে রান্নাঘরের দরজার খুলে চুপি-চুপি বেরিয়ে এসে পা টিপে-টিপে শোওয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যান৷ ভারী পরদাটা অল্প একটু ফাঁক করে প্রায় অন্ধকার ঘরে দেখে নেন, স্ত্রী জেগে উঠেছে কি না!

নাঃ, গভীর ঘুম৷ ঘুমোও, ঘুমোও! মোটা হয়ে যাচ্ছি বলে ডাক্তার কম খেতে বলেছেন! তাই না! মোটা হচ্ছি আমি হচ্ছি, কার তাতে কী!

পরদাটা ফেলে দিয়ে বাইরের দালানে দাঁড়িয়ে অহিদা, দু-হাতের বুড়ো আঙুল দুটো পুরুষ্ট কলার মতো শূন্যে তুলে গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে একপাক নেচে নেন৷ কলা দেখান ডাক্তারকে আর আমার সাবধানী ঘুমন্ত বউদিকে৷

সেদিন শনিবার৷ সন্ধের দিকে বৃষ্টি হয়ে বেশ একটু শীত-শীত ভাব! খেতে বসে অহিদা আর একটা ফিশ-ফ্রাই চেয়েছিলেন৷ বউদি ধমকে বলেছিলেন, ‘আর আধখানাও না৷ নেহাত শনিবার বলে একটা দিয়েছি তোমাকে৷’ ভালো মানুষের মতো মুখ করে অহিদা খাওয়ার টেবল থেকে উঠে পড়লেন৷ বুঝতেও দিলেন না, কী করবেন পরে, কী প্ল্যান আছে মাথায়৷

তেমন গরম নেই বলে বউদির ক্লান্তিটাও কম! অন্যদিন শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েন৷ আজ মুখের কাছে একটা বই ধরে রেখেছেন৷ অহিদা উসখুস করছেন, একবার চেয়ারে বসছেন, একবার ইজিচেয়ারে আধশোয়া হচ্ছেন৷ কখনও বাগানে বেরিয়ে হাততালি দিয়ে পেয়ারাগাছ থেকে বাদুড় ওড়াচ্ছেন৷ বউদি একবার বললেন, ‘কী ছোট ছেলের মতো ছটফট করে বেড়াচ্ছ, শুয়ে পড়ো না৷’

গম্ভীর গলায় অহিদা বললেন, ‘তোমার মতো আমার তাড়াতাড়ি ঘুম পায় না৷ রাত বাড়লে তবেই আমার মাথায় ভালো-ভালো প্ল্যান আসে, ছবির আইডিয়া আসে৷’

‘তবে তাই আসুক৷ আমরা বাবা শুলুম আর ঘুমোলুম৷’

‘ভালো!’

মুখের সামনে বিলিতি ম্যাগাজিন খুলে অহিদা কালো ঝকঝকে একটা রকিং চেয়ারে বসে ধীরে-ধীরে দোল খাচ্ছেন৷ আর মনে-মনে ভাবছেন, ঘুমোও না বাপু, ঘুমোও৷ না ঘুমোলে কিছু করতে পারছি না!

রাত এগারোটা নাগাদ বউদি ঘুমিয়ে পড়লেন৷ অহিদা ভালো করে দেখে নিলেন৷ সারাদিনের সেই বিরক্ত মুখ নয়৷ ভাঁজটাজ মিলিয়ে মোলায়েম হয়ে গেছে৷ ফোঁস-ফোঁস করে নিশ্বাস পড়ছে৷ ডানদিকে বাঁ-দিকে ঘাড় নেড়ে-নেড়ে অহিদা খুশি-খুশি মুখে বললেন, ‘ঘুমিয়েছে, ঘুমিয়েছে! খুকু ঘুমুলো পাড়া জুড়োল...’

ট্যাং-ট্যাং করে বারোটা বাজল৷ রান্নাঘরে অহিদার প্রেশার কুকারও ফিইস করে উঠল৷ শব্দটা থামতেই দরজা খুলে পা টিপে-টিপে অহিদা বেরিয়ে এলেন৷ খেতে বসার আগে দেখতে হবে তো ঘুমটা বেশ গভীর হল কি না৷ অহিদা গুটিগুটি এগোচ্ছেন, পিছন-পিছন গুটিগুটি এগোচ্ছে ঘি আর গরম মশলার গন্ধ৷

ওদিকে ছাদের সিঁড়ির দিক থেকে আর একটা লোকও গুটিগুটি এগিয়ে আসছে৷ অহিদা প্রথমটা লক্ষ করেননি৷ চোখে চশমা নেই৷ ঝাপসা-ঝাপসা দেখছেন৷ অহিদাকে এগিয়ে আসতে দেখে লোকটি থেমে পড়েছে৷ অহিদা নিজের কায়দায় দম বন্ধ করে এগিয়েই চলেছেন৷ কোনওদিকে নজর নেই, নজর ঘরের দিকে, পরদার দিকে৷

অহিদার বিশাল পালোয়ানের মতো চেহারা৷ তার ওপর ওইভাবে গুটিগুটি চিতাবাঘের মতো হেঁটে আসা, যেন এখুনি লাফিয়ে পড়বেন ঘাড়ের ওপর৷ লোকটি থেমে পড়ল! প্রথমে ভেবেছিল পালাবে৷ তবে চোর হলেও সে শুনেছে, সব লোকেরই চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে৷ সে যেই পালাতে যাবে, অমনি চিৎকার উঠবে ‘চোর-চোর৷’ অবশ্য দু-একটা বাড়িতে সে এমনও দেখেছে, শুয়ে-শুয়ে ড্যাবড্যাবে চোখ বের করে দেখছে, চোর সব নিয়ে পালাচ্ছে, খুব চেষ্টা করছে ‘চোর-চোর’ বলে চেঁচাতে কিন্তু ভয়ে গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না, একেবারে সরু পিঁপড়ের মতো গলায়, ‘চো-চো’ করছে৷

কিন্তু এ লোকটাকে তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না৷ ভয়টয় পেয়েছে বলেও মনে হয় না৷ পালাতে গেলেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করবে! এদিকেও মরেছি, ওদিকেও মরেছি৷ তারচে পায়ে পড়ে দেখি৷ মোটা-সোটা সাহসী বাবুদের দয়ামায়া সময়-সময় থাকে৷ গলাটাকে কান্না-ভাঙা করে, ‘বাভুউউ আহার কোওরবনা’ বলে লোকটা ঝপাং করে অহিদার দু-পায়ের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল৷

এইরকম একটা ঘটনার জন্যে অহিদা একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না৷ সারা বাড়িতে দুটি মাত্র প্রাণী৷ নিজে আর নিজের স্ত্রী৷ হঠাৎ কোথা থেকে একটা লোক এসে হাজির হল! অহিদা থতমত খেয়ে গেলেন৷ মহা উৎপাত দেখছি৷ ভেউ-এ-উ করে চিল্লিয়ে ঘুমটা ভাঙাবে, খাওয়াটা পণ্ড হবে৷ শুধু পণ্ড হবে না, চিরকালের মতো চুরি করে রান্না করে যা খুশি তাই খাওয়াও বন্ধ হয়ে যাবে৷ রান্নাঘরে চাবি পড়ে যাবে৷ অহিদা মাটিতে ‘অহল্যা উদ্ধারের’ মতো পড়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে একটা আঙুল রাখলেন৷ হিসহিসে গলায় বললেন, ‘স্যুপ! আর একটা কথা বললেই গলায় ঠ্যাং তুলে দোব৷’

পায়ের কাছেই লোকটা পড়ে আছে৷ মনে-মনে ভাবলে, হ্যাঁ, একটা পায়ের মতো পা! ওই পা গলায় ওঠা, আর গলার ওপর দিয়ে একটা গাড়ির চাকা চলে যাওয়া একই কথা! তবু মিনমিনে গলায় বললে, ‘আমি চেঁচাব কেন বাবু! আমার কি চেঁচানো শোভা পায়!’

অহিদা জামার কলারের পিছন দিকটা ধরে, বেড়ালছানাকে যেভাবে তোলে, সেইভাবে মেঝে থেকে লোকটাকে তুলে, সোজা রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেলেন৷ রোগাপটকা লোক, তেমন ভারী নয়৷ ঝুলতে-ঝুলতেই লোকটা বলছে, ‘চেঁচাবেন তো আপনি৷ চোরের মার বড় গলা হলেও চোরেদের গলা খাটোই হয়৷ তা বাবু আর যাই করেন, নর্দমায় ফেলবেন না!’

অহিদা লোকটাকে রান্নাঘরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ভেতর থেকে ছিটকিনিটা তুলে দিলেন, ‘নে এবার প্রাণ খুলে বকবক কর৷ আমি ততক্ষণ খেয়ে নিই! এরপর আর কখন খাব! রাত তো প্রায় ভোর হয়ে এল! এই তিনদিনেই তুই এত রোগা হয়ে গেলি কী করে! নে, এখন রাগ করে চলে যাওয়ার ঠ্যালা বোঝ৷ সাতদিন তেড়ে খাওয়াদাওয়া করলে তবেই আবার ‘বাহাদুর’ হবি৷ হি-হি, এখন একেবারে চামচিকি!’

প্রেশার কুকারের ঢাকনাটা খুলছেন অহিদা! গন্ধে জিভে জল এসে যায়! লোকটা বুঝতেই পারছেন না এই মোটামতো লোকটা কী সব বলছে৷ ভীষণ লোভও হচ্ছে! চোর হয়ে সারাজীবন শুধু প্রহারই খেতে হল, ভালো খাওয়ার আর জুটল কোথায়? মাঝেমধ্যে অবশ্য বড়-বড় লোকের বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে হেঁসেলটা আগে হাঁটকেপাঁটকে দেখে৷ ধ্যুর! বড় লোকেরা ভীষণ হিসেবি৷ যা বাঁচল সব ঠান্ডাবাক্সে পুরে দিল৷ দরজা খুললেই আলো জ্বলে ওঠে, হিম ঠান্ডা, ধোঁয়া বেরোচ্ছে! কী আছে ভেতরে? বোতল-বোতল জল, তরকারিতে দেওয়ার বাটা মশলা, এক বোতল হলদে সিরাপ, দু-একটা ফল, ছোট্ট এক বাক্স মিষ্টি, ছোট-ছোট বরফের টুকরো, সাদা ফ্যাকফ্যাকে মুরগির ঠ্যাং একটা, এক চাকা মাছ, তরকারির ঘাঁটাঘাঁটা তলানি, গন্ধেই বমি আসে৷ গরিবদের হেঁসেলে তবু কিছু ভালো খাওয়ার থাকে! মুশকিল, চুরি করতে হলে বড়লোকের বাড়িই ঢুকতে হবে৷ এ লোকটা তাহলে কী! গরিব না বড়লোক! মনে হচ্ছে খেয়েই ফতুর৷ ইস, কার মুখ দেকে যে উঠেছিলুম আজ!

অহিদা ইতিমধ্যে কাচের প্লেটে করে ডিমের খিচুড়ি রেখেছেন লোকটার সামনে৷ ‘নে, বাদলা-বাদলা আছে, ঝপাঝপ মেরে দে৷ মনে আছে তো আমাদের সব আগের কায়দা! সব ধুয়ে-মুছে তকতকে করে রেখে দিতে হবে৷ সকালে তোর মাইজি যদি টের পায়, ব্যস, তাহলেই ইয়ে গেল, চিরকালের মতো খাওয়ার বারোটা৷ কী, কীরকম হয়েছে? ফাস ক্লাস! কী, বল! আর একটু ঝাল হলে ভালো হতো!’

বাইরে খুট করে একটু শব্দ হতেই, অহিদা ঝট করে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে, চাপা গলায় হিসহিস করে উঠলেন৷ সব চুপচাপ৷ নাঃ, কিছু না। আলোটা জ্বেলে দিলেন৷ ‘ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম রে, ভেবেছিলুম তোর বউদি বুঝি বাথরুমে যাচ্ছে৷ না আঃ, ইঁদুর-টিদুর হবে৷ ও ঘুম তো সহজে ভাঙার নয়!’

লোকটা ভয়ে-ভয়ে খাচ্ছে, কৌতূহল আর চাপতে পারছে না, শেষে জিগ্যেস করল, ‘বাবু আপনিও কি চোর?’

আঙুল চুষতে-চুষতে অহিদা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন একনজরে, তারপর ডানহাতের মোটা আঙুলটা চোরটার দিকে ইঙ্গিত করে দমকা হাসি চেপে বললেন, ‘ধরেছিস ঠিক! ধরেছিস ঠিক৷ হার্টের সঙ্গে চুরি’, বলেই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন, দু-কদম এগিয়ে গেলেন লোকটার দিকে, ঝুঁকে পড়ে মুখটা দেখলেন, ‘এ কী রে! তুই তো দেখছি নয়া লোক৷ তুই তো বাহাদুর নোস৷’ তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ঠিক করে বল তুই কে! গুপ্তচর? স্পাই? কে তোকে এ বাড়িতে চাকরি দিয়েছে এবং কবে থেকে? আমার বউ?’

‘আজ্ঞে না! কেউ চাকরি দেয়নি! আমি গুপ্তচর নই, চোর! চুরি করতে এসেছিলুম বাবহু৷’ লোকটা ধড়াস করে অহিদার পায়ে পড়ল, ‘আমি অপরাধী বাবু৷ আমাকে ক্ষমাই করুন৷’ ভেউ-ভেউ করে লোকটা কেঁদে ফেলল৷

লোকটার কান্না শুনে অহিদা ভীষণ বিরক্ত হলেন, ‘পা ছাড়, পা ছাড়৷ পায়ে ধরে সাধু হবে ভেবেছ! জানিস, আমি যদি এখুনি ‘চোর চোর’ করে চেঁচাই তোর কী অবস্থা হবে!’

‘পিটিয়ে শেষ করে দেবে বাবু! তবে জেনে রাখুন, তা হলে আপনিও ধরা পড়ে যাবেন!’

অহিদা খুব চিন্তিত হলেন, ‘তা যা বলেছিস৷ তাহলে তোর যা নেওয়ার নিয়ে চলে যা৷ যাক, চুরি তো তুই করবিই, তার আগে বলে যা রান্নাটা কেমন হয়েছে!’

‘ডিশটিশ আপনাকে ধুতে হবে না৷ আমি সব ধুয়ে দিচ্ছি৷’

‘দিচ্ছি কেন বলছিস, বল নিচ্ছি৷ তবে জেনে রাখ, তুই চুরির ‘চ’ও শিখিসনি৷ এই সময় কেউ কারুর বাড়িতে চুরি করতে যায় গবেট! বিলেতে লোকে এই সময় বেড়াতে বেরোয়৷ বুঝলি কিছু? চুরি করতে গেলে অত হাঁকপাঁক চলে না৷ ধৈর্য চাই৷ দে, ডিশটা দে, ধুয়ে দি৷’

‘না, আমি ধুচ্ছি৷’ লোকটা সিঙ্কের কাছে ধোয়াধুয়ি শুরু করেছে৷ অহিদা কৌটো-টৌটো ঠিকঠাক জায়গায় তুলে রাখতে-রাখতে জিগ্যেস করলেন, ‘তোর নাম কী রে? ও! নাম তো আবার বলবি না৷ ঠিক নাম তো তুই নিজেই জানিস না৷ কাগজে দেখেছি তো, কোর্টে যখন কেস ওঠে তখন তো শুধুই ওরফে মন্টু, ওরফে পল্টু, ওরফে জন, ওরফে নিয়াজ আলি, ওরফে বকু সর্দার, ওরফে পরেশ, ওরফে ছকুলাল৷’

‘না, বাবু না৷ আমার আসল নাম শুনলে হাসবেন, তাই বলব না৷’

‘বল না৷’

‘আমার নাম সাধু৷’

‘ভালোই তো রে! খারাপ নাম কী! চোরে আর সাধুতে তফাত কতটুকু৷ কেউ সাধু চোর, কেউ চোর সাধু৷’

ঠ্যাং-ঠ্যাং করে দুটো বাজল দূরের ঘড়িতে৷ অহিদা বললেন, ‘একটু হাত চালা বাবা৷ এবার আমার নিজেরই ভয়-ভয় করছে৷ আমার বউ যদি উঠে পড়ে, তখন কিন্তু রক্ষে থাকবে না৷ ‘চোর-চোর’ করে চেঁচাবে, লোকে তোকে ধরেই পেটাবে৷’

সাধু নামক চোরটি তোয়ালে দিয়ে ডিশ মুছতে-মুছতে বললে, ‘আপনার বাবু কোনও বুদ্ধি নেই৷ বউদি আমাকে চোর বলে বুঝতেই পারবেন না৷ চোরের সঙ্গে মালিকের এইরকম সম্পর্ক হয় নাকি? মনে করবেন চাকর৷’

‘চাকর’? রাত দশটা সাড়ে দশটা অবধি চাকর ছিল না, হঠাৎ রাত বারোটার সময় চাকর এসে গেল! এ কি কারখানা নাকি? সকালের শিফটে একরকম লোক, রাতের শিফটে আর একরকম৷ অত বোকা ভেবেছিস নাকি আমার বউকে?’

‘বোকা আপনি৷ রাগ করবেন না৷’

‘প্রমাণ কর, তা না হলে রেগে যাব কিন্তু৷’

‘আপনি বলবেন, সকালে তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম৷ অমুকবাবু কি তমুকবাবু, যা হয় একটা চেনা নাম বলে দেবেন৷ একজন লোক দেবে বলেছিল, আসার কথা ছিল অনেক আগেই, ট্রেন লেট করায় তুমি শুয়ে পড়ার পর এল৷’

‘বিশ্বাস করবে?’

‘আলবত করবে, যদি মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস থাকে আর সেইভাবে বলতে পারেন, নিশ্চয়ই করবে৷’

‘তারপর কাল সকালে তুই যখন চলে যাবি সব মালপত্তর নিয়ে তখন আমার অবস্থাটা কী হবে, ভেবে দেখেছিস?’

‘তা বটে! তা হলে এক কাজ করুন বাবু, ‘চোর-চোর’ করে চেঁচান৷ এখন তো ধোয়ামোছা হয়ে গেছে, আপনার তো কোনও ভয় নেই বাবু, লোকে এসে আমাকেই পেটাবে৷ অনেকদিন জেলেও যাইনি৷ এদিকে ব্যাঙ্কে সব লকার হয়ে গেছে, সোনাদানা তেমন পাওয়াও যায় না, বাজার বড় মন্দা৷ যাই, কিছুদিন থেকে আসি৷’

হঠাৎ রান্নাঘরের দরজাটা ধীরে-ধীরে খুলে গেল৷ অহিদা দরজার দিকে পিছন ফিরেছিলেন৷ দেখতে পাননি, চোর সাধু দেখেছিল৷ সে একগাল হেসে ছুট্টে গিয়ে, অহিদার স্ত্রীর পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘ট্রেন লেট ছিল মা, আসতে দেরি হয়ে গেল৷’

বউদি ঘুম-চোখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে৷ ব্যাপার-স্যাপার দেখে অবাক৷ আরব্য রজনী নাকি! ফটফট করে আলো জ্বলা সবকিছু ঝকঝকে তকতকে করে সাজানো৷ লোকটাই বা কে, দাদাই বা কী করছেন! সময়টাই বা কত! চোর সাধু বললে, ‘আপনি আমাকে সাধু বলেই ডাকবেন মা! বাবু আমাকে রান্নাঘর, কাজকর্ম সব দেখিয়ে দিয়েছেন! কাল থেকে আপনাকে আর কিছু করতে হবে না৷ দেরিতে ঘুম থেকে উঠলেও চলবে৷ আমার হাতের রান্না যে একবার খেয়েছে, সে আর ভুলবে না৷’

রান্না নিয়ে বড়াই করলে অহিদার সহ্য হয় না৷ সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিবাদ, ‘দ্যাখ সাধু, বাড়ছিস বাড়, তা বলে সীমা ছাড়িয়ে যাসনি! রান্নায় তুই আমাকে হারাতে পারবি! কেন মিথ্যে বলছিস! হয়ে যাক চ্যালেঞ্জ৷’

‘চ্যালেঞ্জ!’

বউদি থামিয়ে দিলেন, ‘আহাহা, চুপ করো৷ এ লোকটা কে!’

‘আজ্ঞে, আমি সাধু৷ নতুন কাজের লোক৷ বাবু বলেননি৷ আজ আমার জয়েন করার কথা!’

অহিদা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ও হ্যাঁ, তোমাকে বলা হয়নি, এ সাধু৷ থাকবে৷ কাজ করবে৷ কাজের লোক৷ তা দেখিয়ে-টেখিয়ে দিলুম৷ ভোর থেকেই লেগে যেতে পারবে!’

বউদি হাই তুলে বললেন, ‘বাব্বা বাঁচা গেছে, ভগবান মেলে তো লোক মেলে না৷ ক’টা বাজল? তোমরা শোবে না? সারারাত পেঁচার মতো জেগে থাকবে নাকি?’

বউদি চলে গেলেন৷ অহিদা চাপা গলায় বললেন, ‘তুই শুধু চোর না, মিথ্যেবাদী, জানিস, চোরের চেয়ে মিথ্যেবাদী আরও খারাপ৷ কাল সকালে আমার কী অবস্থা হবে?’

‘কী আবার হবে! সকলেই জানে, চাকররাই শেষে সব ফাঁক করে পালায়!’

‘তা বলে, যেদিন এল সেইদিনই পালাল?’

‘বলুন, যে-রাতে এল সেই রাতেই পালাল৷ রাতে-রাতেই কাজ শেষ!’

‘যাঃ, কী যে করলি না৷ একেই বলে যে, আমি কোনও কম্মের নই৷ এরপর কী বলবে তুই ভাবতে পারিস? তুই লুকিয়ে থাকতে পারতিস৷ তুই যখন অভিনয়ই করলি, অন্যভাবে করতে পারতিস৷ ওই ছুরিটা তুলে নিয়ে আমার পেটের কাছে ধরে বলতে পারতিস, ‘একটু নড়েছ কি মরেছ, আমি চোর৷’ তাহলে আমার বউ বুঝতে পারত, আমি তোকে বীরের মতো ধরতে এসে বিপদে পড়েছি৷’

‘বাঃ, আপনাকে চুরির দায় থেকে বাঁচালুম, দোষ হল আমার!’

‘তুই তো আমি যেভাবে বললুম সেভাবেও বাঁচাতে পারতিস৷’

‘তাহলে তো আমি নিজেই চোর হয়ে যেতুম৷’

‘তুই তো চোরই, নামটাই যা সাধু৷ শোন, তুই চুরি কর ক্ষতি নেই, তবে সাত-আটদিন পরে কর৷ দিন সাতেক থেকে যা, তোর কোনও কষ্ট হবে না৷’

সাধু কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বললে, ‘তবে তাই হোক৷ আমার ঘুম পাচ্ছে৷ কোনটা শোওয়ার ঘর?’

অহিদা বাহাদুরের ঘরটা সাধুকে খুলে দিলেন৷ নিজেই আলো জ্বালালেন৷ ওই দ্যাখ চৌকি, বিছানাটা খুলে নে৷ ওই দ্যাখ নাইনলের মশারি, পেড়ে নে৷ জানলাগুলো খুলে দে, বেশ হাওয়া আসবে৷

সাধু সব দেখে-টেখে বললে, ‘জীবনে এরকম ঘরে ঘুমিয়েছি? এ তো লাটসাহেবের ঘর৷ যান, শুয়ে পড়ুন৷’

অহিদা চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘পালাবি না তো? দেখিস বাবা, অনুরোধ রাখিস৷ সাতটা দিন শুধু অপেক্ষা কর৷ তোর চুরির জন্যে এর মধ্যে আমি ভালো-ভালো জিনিস এনে রাখব৷’

‘লোভ দেখাবেননি বাবু৷ দুগগা, দুগগা৷ শুয়ে পড়ুন৷’

সাধু শুয়ে পড়ল৷ অহিদা নিজের ঘরে ঢুকতেই অহিদার স্ত্রী ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, ‘তুলে নিলুম৷’

‘সে আবার কী?’

‘অপদার্থ বলেছিলুম, তুলে নিলুম৷ একটা কাজের মতো কাজ করেছ৷ লোকটা যেমন ভদ্র, তেমনি চটপটে৷ কাল সকালে চায়ের জন্যে খোঁচাখুঁচি করে ঘুম ভাঙাবে না৷’

অহিদা শুয়ে পড়লেন৷ কানটা সজাগ৷ ভয়! ‘খুটখাট শব্দ হলেই লাফিয়ে গিয়ে ধরব৷ এবার তুমি চোর!’ হাই উঠল৷ ঘুমোলে চলবে না৷ পাশের ঘরেই চোর৷ আবার হাই! মনে-মনে বললেন, ‘পালাসনি সাধু!’

রাত অনেক৷ নিস্তব্ধ বাড়ি৷ অহিদার নাক ডাকছে!

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%