শেষ খাওয়া

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বাচ্চা তিনটে আর একটু বড় হোক না বউমা তারপর না হয় মা-টাকে ছেড়ে আসবে৷’ তাকিয়ায় হেলান দিতে-দিতে, ডিশ থেকে একটা পান তুলে মুখে পুরতে-পুরতে দাদু বললেন৷

দাদুর ঘরে জোর মিটিং বসেছে৷ সভাপতি আমার দাদু৷ প্রধান অতিথি আমার বাবা৷ উদ্যোক্তা আমার মা৷ সভ্য হিসেবে উপস্থিত আছেন আমাদের বামুনদি, সুখেনদা, কমলাদি, আর আমার দিদি৷

বাবা একপাশে বসে আছেন৷ হঠাৎ যেন জড়িয়ে পড়েছেন৷ ইচ্ছে নেই তবু বসে থাকতে হয়েছে৷ রবিবার দুপুরে আমার যেমন হয় আর কি! ‘বোস অঙ্ক কষতে৷’ বাবার আদেশ৷ আর বাইরে তখন নীল আকাশ৷ ঝাঁ-ঝাঁ রোদ৷ মনা ঘুড়ি বেড়েছে৷ বসে-বসেই দেখতে পাচ্ছি৷ লাট খাচ্ছে৷ পাক খাচ্ছে৷ বুড়ো সাইকেল শিখছে৷ দেখছি শুনছি আর বসে-বসে অঙ্ক কষছি৷ বাবার ঠিক সেই অবস্থা৷ দাদু জোর করে বসিয়ে রেখেছেন, ‘না, না, যাবে কোথায়৷ এ ব্যাপারে তোমার মতামতের যথেষ্ট দাম আছে৷ থাকবে কি যাবে? আমি ভোটে দোব৷’

‘এর আবার ভোটাভুটি কী? এ সব মেয়েদের ব্যাপার৷ তারাই ঠিক করুক৷’

‘উঁহু, উঁহু, গণতন্ত্রের যুগ৷ সাধারণতন্ত্রী ভারত৷ কারুর একার কথায় সিদ্ধান্ত হবে না৷ হতে পারে না৷’

‘ওই তো পুঁচকে-পুঁচকে তিনটে প্রাণী, আর আমরা এতগুলো ধেড়ে৷ আমাদের কী এমন করতে পারে! আমার বাবা মাথায় আসে না৷’

‘আমারও আসে না৷’

মা বললেন, ‘কী করে আসবে! আপনারা অন্দরের খবর কতটুকু রাখেন৷ দেখতে-না-দেখতে৷ দুধ খোলা রাখার উপায় নেই৷ ঠিক তিন দিক থেকে তিনজন এসে চকাচক৷’

বাবা বললেন, ‘চাপা দিয়ে রাখলেই হয়৷’

‘ঠেলে খুলে ফেলে৷’

‘থালার ওপর থান ইট চাপা দাও৷’

‘গরম দুধ একটু খোলা রাখতে হয়৷ সঙ্গে-সঙ্গে চাপা দেওয়া যায় না৷ ওরা সেই গরমও মানছে না৷’

‘তার মানে, আমরা রোজই বেড়ালের এঁটো খাচ্ছি৷’

‘খাচ্ছি তো৷’

‘ছি-ছি৷ খুব খারাপ কথা৷’

দাদু বললেন, ‘না জেনে খেলে কিচ্ছু হয় না৷ তুমি বলেই ভুল করলে৷’

‘বাঃ, আমি জেনেশুনে না বলে থাকি কী করে! আমার পাপ হবে না!’

‘তাও তো বটে৷ তুমি বউমা ওসব দেখো কেন? অত খুঁটিনাটি ব্যাপারে নজর দাও বলেই অশান্তি বেড়ে যায়৷’

কমলাদি একপাশে ঘুম-ঘুম চোখে বেশ বসেছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আজ তো গেছে৷ ওদের মা-টা, এই এতবড় একটা রুই মাছ টেনে নিয়ে কুয়োতলায় পালিয়েছে৷’

‘তারপর?’ দাদুর খুব উৎসাহ৷

‘তারপর সুখেন, হেই-হেই করে দৌড়ল৷ বেড়াল মাছ মুখে ছুটছে৷ সুখেন ছুটছে৷’

‘তারপর, তারপর!’ দাদুর ভীষণ উৎসাহ৷

‘বেড়াল লাফিয়ে উঠতে গেল পাঁচিলে৷’

‘তারপর?’

‘পারে না কি? মাছটার কত ওজন!’

‘তারপর?’

‘মুখ থেকে মাছটা পড়ে গেল ও-পাশের নর্দমায়৷’

‘যাঃ!’

বাবা বললেন, ‘আজ কি সেই মাছ আমাদের পথ্য!’

মা বললেন, ‘রাম-রাম৷ আজ পেঁপের তরকারি আর রুটি৷’

‘ছোলা দিয়েছ? ছোলা!’

‘দিয়েছি৷ বাদামও দিয়েছি৷’

‘ওঃ, মারভেলাস৷ তবে আর কী?’

দাদু বললেন, ‘সে কি? আজ পেঁপে! আমি যে আবার শাক্ত৷ আজ তাহলে আমার উপবাস!’

সুখেন বললে, ‘মা আপনাদের ভয় দেখাচ্ছেন৷ ভালো ব্যবস্থাই আছে৷ মাছের কচুরি৷ কিমা কারি৷’

‘আহা৷ আহা৷ সোনায় সোহাগা৷’

দাদুর আনন্দ শেষ হয়েছে কি হয়নি, রান্নাঘরে ঝনঝন শব্দ৷

‘যাঃ, সর্বনাশ হয়ে গেল৷’

মা ছুটলেন, পিছন-পিছন কমলাদি৷ তার পিছনে সুখেনদা৷ সভা ভেঙে গেল৷ ওধারে মারমার, ধরধর শব্দ৷ কিছু পরেই আমাদের পুসি ভয়ে ছুটতে-ছুটতে এসে সোজা দাদুর কোলে৷ চোখমুখ লাল করে মা দরজার সামনে৷

‘আজ মেরেই ফেলব৷’

বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘উত্তেজিত হোয়ো না৷ মাথা ঠান্ডা৷ মাথা ঠান্ডা৷ খ্রাইস্ট বলেছেন, হেট দ্য সিন, নট দ্য সিনার৷’

‘এক ডেকচি দুধ উলটে দিয়েছে৷ আগে বেধড়ক পেটাই, তারপর খ্রাইস্ট কী বলেছেন শোনা যাবে৷’

দাদু বললেন, ‘বউমা, অপরাধী নিজে ছুটে এসে আদালতে আত্মসর্ম্পণ করেছে৷ আর তো মারা যাবে না৷ দেশে আইন আছে তো৷ তাছাড়া আমি আবার আইনের ব্যবসা করি৷’

‘দেশে আইন আদালত, গণআদালত দুটোই চলছে৷ গণআদালতের হাতে ওকে ছেড়ে দিন৷’

‘মারলে, তোমার দুধ কি ফিরে আসবে মা? ভেবে দ্যাখো৷ ভেবে দ্যাখো, মানুষ কেন চুরি করে৷ অভাবে৷ চুরি করে, খিদের জ্বালায়৷ খেতে দাও, চুরি ছেনতাই সব বন্ধ হয়ে যাবে৷’

‘স্বভাবেও চুরি করে বাবা৷ চব্বিশ ঘণ্টা খেয়ে-খেয়ে, সব ক’টা ভুঁড়ো পেট৷ তবু ছোঁক-ছোঁক৷ এই মা-টা হল সব চেয়ে বড় চোট্টা৷ ওই মায়ের শিক্ষায় ছেলেমেয়ে তিনটেও এই বয়সে পাকা চোর হয়ে উঠছে৷’

‘তাহলে?’ দাদু চোখে প্রশ্ন নিয়ে সকলের দিকে তাকালেন৷

মা বললেন, ‘আপনার কথামতো বাচ্চা তিনটে আর একটু বড় হোক৷ মা-টাকে আজই রাতে বিদায় করা হোক৷’

আজই রাতে!’

সুখেনদা বললে, ‘লোহা গরম থাকতে-থাকতেই হাতুড়ি মারা উচিত৷ এখন আমরা তেতে আছি, বস্তাফস্তা সব রেডি৷ ডোমবাগানের মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসি৷ রাতেই সুবিধে৷’

‘আজ থাক৷ আহা, আজ থাক৷’ দাদু করুণ মুখে তাকালেন৷ ‘দ্যাখো না, আমার কোলে শুয়েই কেমন ঘড়ঘড় করছে৷ কাল রাতে ছেড়ে এসো৷ তবে ডোমবাগানের মাঠে নয়৷ মাঠে ছাড়লে মরে যাবে৷ কামার পাড়ায় ছেড়ে দিও৷ যে-কোনও একটা বাড়িতে ঢুকে যাবে৷’

বাবা বললেন, ‘আর না, বেড়ালপর্ব এখানেই শেষ৷ কালই ছাড়া হবে৷ আজ সভাভঙ্গ৷’ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি যে একেবারে শুয়েই পড়লে! একেই বলে, কারুর সর্বনাশ কারুর পোষমাস৷ গেট আপ৷ আজ রাত একটার আগে শুতে দিচ্ছি না৷’

যাঃ, উলটো পোষমাস হয়ে গেল৷ এবারে বেড়ালের পোষমাস আর আমার সর্বনাশ৷ দাদু গুম মেরে বসেই রইলেন, বেড়াল কোলে৷ ভাবছেন৷ আইনের প্যাঁচ কষছেন৷ আমি যাওয়ার আগে বললুম, ‘দাদু, কোর্টে আপনি যে মক্কেলের হয়ে দাঁড়ান, সেই তো শুনি ছাড়া পেয়ে যায়৷ একে দিয়ে মায়ের বিরুদ্ধে কোর্টে একটা কেস ঠুকে দিন না৷ হাইকোর্টের ইনজাংশানে কত কী তো বন্ধ হয়ে যায়৷ বেড়াল ছাড়া বন্ধ হবে না?’

দাদু নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘এটা মানুষ হলে একবার চেষ্টা করে দেখতুম৷ এটা যে মানুষ হল না৷’

পরের দিন সকালে সব নর্মাল৷ বাবা ঘরে ডনবৈঠক করছেন৷ দাদু খোলা গায়ে পুজোর আসনে ধ্যানস্থ৷ গলায় গোটা-গোটা লাল রুদ্রাক্ষের মালা৷ সুখেনদা বাজারে৷ কমলাদি ইয়া এক শিল পেড়ে দুলে-দুলে বাটনা বাটছে৷ দিদি ফিসফিস করে ইতিহাস মুখস্থ করছে৷ পরীক্ষা সামনে৷ পড়ার ধুম পড়ে গেছে৷ আর পুসি আছে হাত-পা ছড়িয়ে, নিশ্চিন্ত আরামে দাদুর বিছানায়৷ পুসিটা এমনি খুব ভালো মানুষ৷ কেবল একটু বোকা চোর৷ আমার মতো চালাক চোর হলে, মা কি ধরতে পারতেন! চুরি করতে গিয়ে সব ফেলেমেলে একসা করে৷ আরে, চোরের কি শব্দ করা উচিত, না করা চলে! এই যে আমি, আচার খাই, গুঁড়ো দুধ খাই, শব্দ করে খাই? এমন কী গোঁফে একটু গুঁড়ো লেগে থাকে না৷ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়েরই শাড়ি দিয়ে সব ঝেড়ে ফেলি৷ হি-হি৷ কোনও দিন দিদি ধরে ফেললে ভাগ দি৷ দিদির আবার আচার ফেবারিট৷ ঝ্যাঁটার মতো গোঁফ করেছে পুষি৷ দুধ খেলেই সর ঝোলে৷ মেয়েছেলের আবার গোঁফ কী! যেমন কাণ্ড!

বাবা আর দাদু ন’টার সময় বেরিয়ে গেলেন৷ একটু পরে আমিও স্কুলে চলে গেলুম৷ পুসি তখনও ভোঁস-ভোঁস ঘুমোচ্ছে৷ আর কি, সন্ধের পর থেকে তো আর বিছানা জুটবে না৷ কেউ খেতেও দেবে না৷ আমি দেখেছি, বেড়ালকে কেউ ভালোবাসে না, সবাই দূর-দূর করে৷ আমার দিদিটার কোনও দুঃখ নেই৷ বলতে গেলুম, ‘পুসিটাকে আজ একটু ভালো করে খাওয়াস৷’

বললে, ‘ভ্যাট-ভ্যাট, আমার বলে সামনে পরীক্ষা! এখন বেড়াল-মেড়াল আমার মাথায় আসছে না৷ বিরক্ত করিসনি তো, মাকে বলে দোব৷’

আমি বিনুনিটা ধরে একটু টানব বলে যেই হাত বাড়িয়েছি, অমনি চেঁচাতে লাগল, ‘ও মা, মা মাগো, দ্যাখো না বুড়ো কী করছে!’

মা তেড়ে আসার আগে পুটুর কাছ থেকে নতুন কায়দায় যে মুখ ভেঙানো শিখেছি, সেইটা প্রয়োগ করে সোজা দে ছুট৷ কাপুরুষ৷ নিজে পারে না৷ সব ব্যাপার মার সাহায্য!

রাস্তায় বেরিয়ে শুনলুম, ‘তুই ফিরে আয়, তারপর দ্যাখ না, তোকে আমি কেমন পেটাই৷’

আমাকে পেটাবে! অ্যায়সা হাত মচকে দোব৷

দিদিটা আমার পাগলী৷ আবার দুর্গা-দুর্গা বলছে৷

আজ আসার সময় রাক্ষসটার জন্যে হজমি আনব৷ টকাস-টকাস করে খাবে৷

সন্ধে তো প্রায় হয়ে এল৷ গাড়ি থামল বাড়ির সামনে৷ দাদু নামলেন৷ চকচকে কালো কোট৷ ধবধবে সাদা প্যান্ট৷ হাতে অ্যাটাচি৷ মুখটা টকটকে ফরসা৷ এই সময়ে দাদুকে এমন সুন্দর দেখায়৷ সুখেনদা ছুটে এল৷ দাদু বললেন, ‘গাড়িতে খাবারের বাক্স আছে৷ সাবধানে নামাও৷’

এই সময়টায় আমিও কাছে থাকি৷ দিদি বলে, হ্যাংলা৷

জানে না, বড় হলে আমি কি আর হ্যাংলা থাকব!

সুখেনদা পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় গন্ধ পেলুম৷ অসাধারণ৷ মনে হয় ফিশফ্রাই৷

দাদু যেতে-যেতে বললেন, ‘মাকে বলো ফিশফ্রাই আছে৷’ তারপর আর একটু এগিয়ে বললেন, ‘আছে না গেছে?’

মা এসে গেছেন, ‘কার কথা বলছেন বাবা?’

‘পুসি৷ আছে, না ছেড়ে দিয়েছ!’

মার কত উৎসাহ৷ লাফাতে-লাফাতে বললেন, ‘এই তো, আর একটু অন্ধকার হলেই৷ জানেন আজ কী করেছে! এই অ্যাতো বড় একটা পায়রা মেরেছে৷’

গম্ভীর মুখে একবার ‘হুম’ বললেন দাদু৷ তারপর বললেন, ‘বিদায় করার আগে আমি ওকে প্রাণ ভরে খাওয়াতে চাই৷ গোটা একটা ফিশফ্রাই ওকে খাওয়াব৷ নিজে খাওয়াব৷’

দালানে পুসি বসে আছে পা মুড়ে৷ ধবধবে সাদা তুলোর তালের মতো৷ আধ বোজা চোখে বাচ্চা তিনটের খেলা দেখছে আয়েস করে৷ খুব খেলছে৷ মাঝে-মাঝে মায়ের ঘাড়ে এসে পড়ছে৷ পুসির কোনও ধারণাই নেই একটু পরে কী হবে৷

কোর্টের কাপড়জামা ছেড়ে দাদু এলেন৷ ডাকতেই পুসি এল৷ মাছ ভাজার গন্ধ, আর থাকতে পারে! ন্যাজ তুলে আদুরে গলায় ‘মিঁউ’ করল৷ দাদুর পিঠে গা ঘসল৷ ঘড়ঘড় শব্দ করছে৷ দাদু একটু-একটু করে ভেঙে-ভেঙে দিচ্ছেন ফিশফ্রাই৷

খেয়ে দেয়ে পুসি গা চাটছে৷ বাচ্চা তিনটে মায়ের প্রসাদ খাচ্ছে৷ দাদু উঠে যেতে-যেতে বললেন, ‘না, আর মায়া বাড়াব না৷ তোর বরাতের ওপর ছেড়ে দিলুম, যা৷’

সুখেনদা যখন চটের বস্তার মধ্যে পুসিকে ভরছে তখন আমি আর দিদি ছাতের চিলে কোঠায়৷ দিদি আমাকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কাঁদছে৷ আমি তো ছেলে, তাই প্রথমে ভেবেছিলুম কাঁদব না কিছুতেই৷ অনেকক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে রইলুম৷ তবু জল এসে গেল চোখে৷ দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলুম৷ চোখের সামনে পুসিকে দেখতে পাচ্ছি৷ থুপপি হয়ে বসে আছে বাগানের পাঁচিলে৷ আরামসে শুয়ে আছে দাদুর বিছানায়৷ দুধ খাচ্ছে চকচক করে৷ বাচ্চাদের গা চেটে দিচ্ছে৷ যত মনে পড়ছে, তত কান্না বাড়ছে৷

দিদি একসময় বললে, ‘চল বুড়ো, আমরা দুজনে আত্মহত্যা করি৷’

আমি ছেলে তো, তাই দিদির চেয়ে আমার বুদ্ধি একটু বেশি৷ আমি পড়েছি, বেড়ালকে যত দূরেই ছেড়ে দাও, ঠিক ফিরে আসবে৷ কান্নায় গলা বুজে আছে, তাও বললুম অনেক কষ্টে, ‘দেখিস দিদি, ও ঠিক আবার ফিরে আসবে৷’

দিদি কাঁদতে-কাঁদতে বললে, ‘ঠিক বলছিস৷’

‘হ্যাঁ ঠিক৷ পলাশদের বেড়ালটাকে টোমবাগানে ছেড়ে এসেছিল৷ তিন দিন পরে, কাল আবার ফিরে এসেছে৷’

দিদি আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরল৷

একটু পরেই ছাদের ওপাশে কী একটা শব্দ হল, আর অমনি আমার মনে হল ভূত৷ দিদিরও সেই রকম মনে হল৷ আমরা তখন গুটি-গুটি পায়ে নেমে এলুম নিচে৷ দাদু আসনে বসেছেন৷ ধ্যানে৷ মা রান্না ঘরে মনের আনন্দে রাঁধছেন৷ ছ্যাঁক ছোঁক শব্দ হচ্ছে৷ আমার মা কি খুব নিষ্ঠুর? মনে হয় তা নয়৷ আসলে মা তো আমাদের চেয়ে অনেক বড়৷ অনেক-অনেক বেড়াল দেখেছেন, তাই আর ভালো লাগে না আর কি৷

এক সময় কমলাদি হাই তুলতে-তুলতে বললে, ‘বাবা, সুখেন অনেকক্ষণ গেছে৷ এখনও আসছে না কেন? পুলিশে ধরলে নাকি! অত বড় একটা বস্তা ঝুলিয়ে গেছে৷ অন্ধকারে ছেলেধরা বলে পেটাতেও পারে৷’

দিদি ফিসফিস করে আমাকে বলল, ‘পেটায় তো বেশ হয়!

সবাই খুব ভেবে পড়ল৷ দাদু পড়ার ঘরে আইনের বই নিয়ে বসেছেন৷ চা জলখাবার সব ফিরে এসেছে, গম্ভীর মুখ৷ আবার বলেছেন রাতে, নো মিল৷

এমন সময় বাইরে বাবার গলা পাওয়া গেল৷ আজ বলেই গিয়েছিলেন, ফিরতে রাত হবে৷ বাবা যেন জোরে-জোরে কাকে বলছেন, ‘কী রে তুই এখানে অন্ধকারে একা বসে আছিস কেন?’

সুখেনদার গলা পেলুম, কাঁদো-কাঁদো, ‘এমনি বসে আছি!’

কাঁদছিস কেন? আর কি তোর কাঁদার বয়েস আছে?’

বাবা আগে-আগে, পেছনে সুখেনদা বাড়ি ঢুকলেন৷ ভেতরে এসে সুখেনদার কান্না আরও বেড়ে গেল৷ সামনে মা৷

‘সর্বনাশ হয়ে গেছে মা৷’

‘কী হল?’ মা বেশ ভয় পেয়েছেন৷

‘নন্দকুমার স্ট্রিটের কাছে গেছি, বেড়ালটা হাঁচড়পাঁচড় করে বস্তা ফেঁড়ে বেরিয়ে এল৷’

‘তা আসুক না৷ তাতে কাঁদার কী হয়েছে?’

সুখেনদা এবার হাউহাউ করে কাঁদতে-কাঁদতে বললে ‘ছুটে রাস্তা পেরোচ্ছে এমন সময় একটা টেম্পো...৷’

সুখেনদা আর বলতে পারল না আমরা শুনতে পেলুম না, কী জানি৷ সবাই চুপ৷ দাদু উঠে এসেছেন৷ প্রথমে দিদি কাঁদল৷ মেঝেতে পড়ে গড়াচ্ছে৷ তারপরেই মা৷ তারপর আমি৷ শেষে সবাই৷ এরই মাঝে দাদু চাপা গলায় বললেন, ‘বউমা, তুমি মানুষের এত অত্যাচার সহ্য কর আর সামান্য একটা বেড়ালের গোটাকতক উৎপাত সহ্য করতে পারলে না৷’

এতসব ঘটছে আর কী আশ্চর্য, যাদের মা মারা গেল তাদের তিনটেতে মিলে সারা ঘরে লাফিয়ে-লাফিয়ে খেলা চলেছে৷ দিদি একবার মাথাটা তুলে বললে, ‘ওই যে, ওই যে ওই জায়গাটায় বসে শেষ খাওয়া খাচ্ছিল৷’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%