সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
জানলার কাছে ছোট একটা টেবিল৷ ঝক ঝকে পালিশ৷
জ্যাঠামশাইয়ের চশমা, কলম, হাতঘড়ি থাকে৷
জ্যাঠামশাই সকালে অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর সব খালি৷ জানলার বাইরে বাগান, আম গাছ, নিম গাছ, গুলঞ্চ গাছ৷ কত রকমের পাখি৷ কাঠবেড়ালি এসে টেবিলটার ওপর খানিক নাচানাচি করে বাইরে পালায়৷ আবার আসে, আবার যায়৷ সকাল ন’টা পর্যন্ত বাড়ি জমজমাট৷ বাবা, জ্যাঠামশাই বেরিয়ে যাওয়ার পর সব শান্ত৷ তখন মা আর জ্যাঠাইমার গলা পাওয়া যাবে, হাসি শোনা যাবে৷ এক বষ্টুমী এসে খঞ্জুনি বাজিয়ে গান শোনাবেন৷ এক গেলাস চা খাবেন, কাপে দিলে চলবে না৷ থেকে থেকে বলবেন, ‘জয় নেতাই’৷
একটি ছেলে আমাদের বাড়িতে সারাক্ষণ থাকে৷ ফাইফরমাশ খাটে৷ আমার চেয়ে বয়সে দু-তিন বছরের বড়, কিন্তু আমরা দুজনে খুব বন্ধু৷ ছেলেটির নাম বাবুয়া৷ রঙটা ময়লা হলেও খুব সুন্দর দেখতে৷ এক মাথা ঘন কালো চুল৷ বড়-বড় দুটো চোখ, খাড়া নাক৷ স্বাস্থ খুব ভালো৷ তেমনি খাটতে পারে, খেতেও পারে৷ মা আর জ্যাঠাইমার খুব প্রিয়৷ মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, তাঁরা বাবুয়াকেই বেশি ভালোবাসেন কারণ, বাবুয়া গাছে উঠতে পারে পুকুরে জাল ফেলতে পারে, মোট বইতে পারে, ঝালমুড়ি বানাতে পারে৷ রবিবার রবিবার বাবার সঙ্গে বাগানে বেদম খাটতে পারে৷ জ্যাঠামশাই মাছ ধরতে ভালোবাসেন, বাবুয়া চার আর টোপ তৈরি করে দেয়৷ বাবুয়া কি না পারে? ঘুড়ি ওড়ানোয় এক্সপার্ট৷ শুনে শুনে হিন্দি সিনেমার গান একেবারে অবিকল গাইতে পারে৷ মা আর জ্যাঠাইমা খুব গান ভালোবাসেন৷ দুপুরবেলা তিনজনের কোরাস হয়৷ বাবা জানতে পারলে আর রক্ষা থাকবে না৷ বিকেলবেলা আমাকে বেড়াতে নিয়ে যায়৷ হয় গঙ্গার ধারে, না হয় ‘লিলি ক্লাবের’ মাঠে৷ এই মাঠে কখনো-সখনো সায়েবদের দল আমাদের দলের সঙ্গে ফুটবল খেলে থাকেন৷ পাশেই আলমবাজার৷ গঙ্গার ধারে বিরাট জুটমিল ‘জার্ডিন হেন্ডারসন’৷ কিছু সায়েব ওই মিলের কোয়ার্টারে থাকেন, কিছু সায়েব দক্ষিণশ্বরের দেশলাই কলে৷ ‘উইমকো’৷ আলমবাজারের পথে দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দির পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া যায়৷ ওখানে পাশেই গঙ্গার ওপর ঝকঝকে নতুন ব্রিজ৷ কিছুটা যাওয়ার অনুমতি আছে৷ তারপরেই ‘টোল ট্যাক্স’৷ আলমবাজারের মিল এলাকাটা হিজিবিজি, ভিড়ভট্টা৷ মসজিদ আছে, পাঁউরুটি-বিস্কুট তৈরির কারখানা আছে, বিরাট একটা বাজার, অনেক দোকান, ওরই মধ্যে একটা দোকানের ওপর আমাদের খুব টান ছিল৷ বিক্রি হতো পাঁঠার ঘুগনি৷ উল্টোদিকেই দেশীমদের দোকান৷ কিছু মানুষ পড়ে থাকত রাস্তায়, কিছু টাল খেতে ভেতরে৷ ওদের দেখলেই মনে হতো ‘ফুরিয়ে এসেছে’৷ আমরা দুজনে চুপি চুপি দোকানে ঢুকে এক প্লেট ঘুগনি দুজনে ভাগ করে খেতুম৷ খুবই অন্যায় কাজ৷ কোনো ভাবে বাবা যদি জানতে পারেন আর রক্ষা থাকবে না৷ বাবুয়া দেখাত, ওই দ্যাখ, ওই দ্যাখ, মুখে চাদর ঢেকে মদের দোকানে ঢুকছে, যাতে কেউ চিনতে না পারে৷ তখন আমারও মনে হতো ঘুগনি খাওয়াটাও কি অন্যায় কাজ! বাবুয়ার একটা ছোট্ট থলি ছিল, যাকে বলে গেঁজে, তাইতে কিছু খুচরো পয়সা থাকত৷ আমাদের বাড়ি থেকে কত টাকাই বা পেত, কিন্তু আমাকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেত৷ আমার মা ছিলেন একেবারে ছেলেমানুষ৷ কতরকমের বায়না৷ সব বাবুয়ার কাছে৷ ঘুড়ি কেটে মাথার ওপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে, ‘বাবুয়া! ধর ধর৷’
জ্যাঠাইমা বলছেন, ‘তুই কি ঘুড়ি ওড়াবি?’
মা বললে, ‘ওড়াব কেন? ঘুড়ি ধরতে ভালো লাগে৷ তুই পালাবি কোথা?’
কার বাড়ির মড়মড়ে টিনের চালে উঠে বাবুয়া ঘুড়ি পাড়ছে৷ মায়ের হাততালি, ‘সাবাশ বেটা, সাবাশ৷’
বেশ কিছু সাহসী কাজের সঙ্গী হতো বাবুয়া৷ আমার তেমন সাহস দেখাবার উপায় ছিল না৷ সর্বদাই একটা ভয়, বাবা জানতে পারলে ভীষণ কাণ্ড হবে৷
বাবা বাবুয়াকে পছন্দ করতেন, যেমন ভালোবাসতেন, সেই রকম শাসনও করতেন৷ আমার কিন্তু মনে হতো, বাবুয়াকে যতই আপন ভাবা হোক না কেন, আসলে সে পর৷ আলদা বিছানা, ঘর, থালা-বাটি৷ দুটো সোয়টার এল, আমারটা দামী, ওরটা কম দামী৷
ওকে ভীষণ খাটানো হতো৷ কাজের যেন শেষ নেই৷ আমি বসে বসে সকালের আকাশে পায়রা ওড়া দেখব, ওর সে সুযোগ নেই৷ বাবুরা অফিসে বেরোবেন, জুতো পালিশ করছে৷ একটা দাগ টানা থাকছে সব সময়৷ সেই দাগের ভেতরে আসা চলবে না৷ অনেকে, অনেক সময় বাড়িতে এসে বলত, ‘তোমাদের চাকরটাকে পাঠিয়ে দিও বউমা, ডাব পাড়িয়েছি নিয়ে আসবে৷’ বড়রা একবারও বলতেন না, ‘ও চাকর নয়, ওর নাম বাবুয়া, আমাদের আর একটা ছেলে৷’ একই বিছানায় সে আমার পাশে শুতে পারবে না৷ আমি বাবুর ছেলে৷ আমি আপেল, আঙুর, কিসমিস খাব, সন্দেশ খাব, রসগোল্লা খাব, ও তখন ধুলো ঝাড়বে৷
বাবুয়ার একটা মাউথ অরগ্যান ছিল৷ গান শুনে খুশি হয়ে তাকে দিয়েছিলেন৷ দুপুরবেলা যখন তার কাজকার্ম বিশেষ থাকত না, তখন বাগানের নির্জন দিকটায় গিয়ে একটা গাছের তলায় বসে হিন্দি গানের সুর বাজাত৷ ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে ওই সুর ভীষণ ভালো লাগত শুনতে৷ ওর কাছে গেলে বলত, ‘না, আমি আর বাজাব না৷ তোমার এখন হোমটাস্ক করার সময়৷ ছোটবাবু তোমাকে বকলে আমার খুব কষ্ট হয়৷ রোজই তুমি বকুনি খাও, আমার খারাপ লাগে৷ যাও, যাও, সব পড়া আগে শেষ কর৷ বিকেলে বেড়াতে যেতে হবে তো!’ জ্যাঠামশাইয়ের টেবিলের ওপর কিছু খুচরো পয়সা ছড়ানো ছিল৷ গুনে দেখলুম পনের আনা৷ ঘরের বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম৷ নিচে পিচের রাস্তা৷ গঙ্গার দিক থেকে বাজারের দিকে চলে গেছে৷ টেবিলের ওপর পড়ে আছে পনের আনা৷ আলমবাজারের দোকানে ঘুগনি৷ পাশের দোকানে কচুরি৷ আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম৷ আইসক্রিমঅলা কাঠের গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে৷ গায়ে লেখা, হ্যাপি বয়৷ এবার ঘরে শেষ বেলায় রোদ্দুর এসে পড়ছে টেবিলে৷ পয়সাগুলো ঝকঝক করছে৷ ডাকছে আমাকে, ‘নে, নে, তুলে নে৷ পকেটে ভরে ফেল!’
রাতে বাড়ি জমজমাট৷ জ্যাঠামশাই ঘরে৷ সকালের কাগজটা পড়ছেন৷ অ্যাসট্রের ধারে গিয়ে সিগারেটটা রেখেছেন৷ ফিকে ধোঁয়া৷ বাবা ঘরে এসে আর একটা চেয়ারে৷ দুজনে চা খাবেন, গল্প হবে নানা রকম৷ জ্যাঠাইমার ঘরে ঢুকে বললেন, ‘এ কি, পয়সাগুলো গেল কোথায়! এখানে রেখেছিলুম!’
জ্যাঠামশাই বললেন, ‘পয়সা-টয়সা কিছু ছিল না, পরিষ্কার টেবিল৷ দেখো, অন্য কোথায় রেখেছ৷’ পয়সা, পয়সা পয়সা! বেশ একটা হই চই৷ রান্নাঘর থেকে বামুনদি বললে, ‘দেখো, বাবুয়া সরিয়েছে৷ আদর দিয়ে তোমরা ওকে যা মাথায় তুলেছ! যেখানে সেখানে তোমার সব গয়নাগাঁটি খুলে রাখ৷ সাবধান করলেও শুনবে না৷ বলব, ও, কিছু হবে না! ওই তো মিত্তির বাড়ির নতুন বউয়ের সোনার হার চুরি করে কাজের ছেলেটা পালিয়েছে৷ কলিযুগ, ঘোর কলি৷ ডান হাত, বাঁ হাতকে বিশ্বাস করে না, কখন কী করে বসে!’
বাবুয়া রান্নঘরে ময়দা ঠাসছিল৷ মা ছোলারডাল নিয়ে ব্যস্ত৷ ‘ডাকো বাবুয়াকে৷’
বাবা বললেন, ‘আমার সেন্ট পারসেন্ট বিশ্বাস, এ কাজ তার নয়৷ বলিষ্ঠ দেহ আর মনের অধিকারী৷ আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, সে নেয়নি৷ কে দেখেছে সে নিয়েছে!’
‘চোর কি দেখিয়ে চুরি করে!’ জ্যাঠামশাইয়ের যুক্তি৷ চোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকে৷’
বাবুয়া এসে দাঁড়িয়েছে৷ দু’হাতে ময়দা জড়ান৷
বাবা বললেন, ‘স্বীকার করলে কিচ্ছু বলব না৷ আমার পলিসি বা নীতি ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট৷’
বাবুয়া বললে, ‘কী স্বীকার করব ছোটবাবু?’
‘তুই এই টেবিলে পড়ে থাকা পনের আনা পয়সা চুরি করেছিস?’
বাবুয়ার স্পষ্ট উত্তর, ‘আমি চোর নই ছোটবাবু৷ যার খাবো, তার চুরি করব!’
‘তাহলে?’
জেঠামশাই বললেন, ‘আমি আইন পড়েছি, ওকে প্রমাণ করতে হবে, ও নেয়নি৷’
বাবা বললেন, ‘কী করে করবে? ও তো বলছে, ও নেয়নি৷’
‘তাহলে কে নিয়েছে?’
বাবা এইবার রাগছেন৷ বললেন, ‘ভূতে নিয়েছে, ভূতে৷ এদের কোনো সিস্টেম নেই৷ যেখানে, সেখানে জিনিস ফেলে রাখে৷ কলতলায় আংটি, গাছের ডালে চুড়ি৷ এরা আয়, আয় করে চোরকে ডাকে৷’ হঠাৎ আমার মনে কেমন একটা শক্তি জাগল৷ সকালের সামনে বুক ফুলেই বললুম, ‘আমি নিয়েছি, চুরি করিনি৷’
বাবা বললেন, ‘নেওয়া আর চুরি করার মধ্যে তফাৎ কী? সেই কোন ছেলেবেলায় পড়েছি, না বলিয়া পরের দ্রব্য লওয়াকে চুরি বলে৷’
জ্যাঠামশাই বললেন, ‘এখানে পর তো কেউ নেই, সবাই আপন৷’
বাবা বললেন, ‘তা হলে ও চোর নয় লোভী৷’
‘পয়সা তো খাদ্য নয়, যে লোভ হবে? বেড়াল পয়সা খায়?’
বাবা বললেন, ‘পয়সা দিয়ে কেনা মাছ খায়, দুধ খায়, সন্দেশ খায়, আলমবাজারের ঘুগনি খায়৷’
বাবুয়ার দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, ‘কী, ঠিক কিনা না? পাঁঠার ঘুগনি?’
বাবুয়ার মাথা হেঁট৷ একটা গালে খানিক ময়দা৷
জ্যাঠামশাই জিগ্যেস করলেন, ‘তুই জানলি কী করে?’
বাবা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বিকজ, আই অ্যাম এ গুড অভিভাবক৷ গুড অভিভাবক শ্যাল কিপ অল ইনফরমেশান অ্যাবউট হিজ ওয়ার্ড৷ আমি ডালহাউসিতে বসে দেখতে পাই, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দু’জন ঢুকছে৷ গরম এক প্লেট ঘুগনি দুভাগ হচ্ছে৷ আঃ, কী স্বাদ, কী গন্ধ! জিভে জল এসে যাচ্ছে৷ ইয়েস, অফকোর্স, পানিশমেন্ট তো হবেই৷ হিয়ার ইট ইজ এ টেন রুপি নোট৷ আসামী দুজন, এগিয়ে এসো, এই নাও দশ টাকা, কাল একটা মুখ ঢাকা ক্যান নিয়ে যাবে৷ ভর্তি করে ঘুগনি আনতে৷ কাল আমাদের ঘুগনি ডে৷ আসামী বেকসুর খালাস৷ মেজো, জাজমেন্টটা কেমন হল?’
‘হিস্টোরিক, কিন্তু ওই পনের আনা৷’
‘ওটা ওদের উকিল খরচ৷ মা, আমি এখন ব্যায়ামে যাব৷’
‘আর এক কাপ চা৷ তোরটা তো ঠান্ডা হয়ে গেল!’
‘নট ব্যাড—মাই ডিয়ার অ্যাফেকসানেট ব্রাদার!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন