সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
প্রতি রবিবার দাদা একজোড়া জুতো খুব পালিশ করে৷ চামড়ার জুতো৷ জুতো-জোড়াটা ছিল আমার বাবার৷ বাবা চলে গেছেন৷ আজ প্রায় তিন বছর হয়ে গেল৷ নরম কাপড় দিয়ে পালিশ করতে-করতে এমন করে ফেলে, আয়নার মতো মুখ দেখা যায়৷ বাবা যে খাটটায় শুতেন তার তলায় সুন্দর একটা পিঁড়ের ওপর সাজিয়ে রাখে৷
বাবা মারা যাওয়ার পর দাদাকে চাকরিতে ঢুকতে হয়েছে৷ এ ছাড়া, আর কোনও উপায় ছিল না৷ দাদার খুব ইচ্ছে ছিল, অনেক লেখাপড়া করবে৷ বিলেত যাবে৷ সে আর হল না৷ এক মারোয়াড়ি ফার্মে চাকরি করে৷ দাদার স্বপ্ন হলুম আমি৷ দাদা বলে, ‘আমার ইচ্ছে ছিল, হল না৷ তোকে হতে হবে৷ রোজ যখনই সময় পাবি, ওই জুতোর দিকে তাকিয়ে থাকবি৷ দেখবি একটা শক্তি পাবি৷’
মাধ্যমিক পরীক্ষা এসে গেল৷ আর ক’দিন মাত্র বাকি৷ এমন একটা ভয় এল মনে৷ প্রথমে মনে হল, আমি পাশ করতে পারব না৷ তারপর মনে হল, যদিও পাশ করি কোনওরকমে করব৷ ভালো নম্বর পাব না৷ আর ভালো নম্বর না পেলে পড়াশোনা শেষ৷ দাদাকে আর সাহায্য করতে পারব না৷ সারা জীবন বেকার বসে থাকতে হবে দাদার ঘাড়ে৷ আমার চোখে জল এসে গেল৷ যতই পড়ছি, ততই সব ভুলে যাচ্ছি৷ আমার এই অবস্থার কথা কাউকে বলতে পারছি না৷ লেখাপড়ায় আমি খুব একটা খারাপ নই৷ আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না৷
আমাদের অবস্থা এক সময়ে খুব ভালো ছিল। মানুষের সবদিন তো ভালো যায় না৷ কর্মচারীরা প্রবল আন্দোলন করে বাবার কারখানাটা উঠিয়ে দিল৷ বাবা আর নতুন করে কিছু করতে চাইলেন না৷ বললেন, ‘অনেককে নিয়ে বড় কিছু করার দেশ এটা নয়৷ হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ-কারখানা, এ-সবই বন্ধ হয়ে যাবে৷’ বাবার অনেক বড়-বড় স্বপ্ন ছিল৷ মানুষ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে৷ বাবা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়লেন৷ যে-ঘুম কোনওদিন ভাঙে না৷ চলে যাওয়ার সাতদিন আগে কথায়-কথায় বলেছিলেন, ‘এবার জন্মালে বিলেতে জন্মাব৷’ সাতদিন পরেই স্ট্রোক৷ দাদা বাবার ইউনিফর্ম পরে নেমে এল খেলার মাঠে৷ বললে, ‘চলছে, চলবে৷ যা চলছিল সবই ঠিক সেইরকম চলবে৷’
ছেলেবেলায়, দাদা যখন ছোট ছিল, ছাতে ঘুড়ি ওড়াত৷ আমার হাতে লাটাই৷ আকাশে ঘুড়ি, দাদার হাতে সুতো, সে কী চিৎকার—‘দুয়ো৷ আমার বাজারে কেউ নেই, আমি আছি ভয় নেই৷’ ছেলেবেলার এই স্লোগানটাকেই একটু অন্যরকম করে নিয়ে, দাদা এখন থেকে-থেকে হুঙ্কার ছাড়ে—‘আমার পাশে কেউ নেই, আমি আছি ভয় নেই৷’
সকালে দমাদ্দম ডন-বৈঠক মারার পরই এই স্লোগানটা বারে বারে বেরোতে থাকে৷ আমাকে বোঝায়, ‘জীবন কেমন জানিস? তোকে বাঘে তাড়া করেছে৷ তুই ছুটছিস৷ উঠে গেছিস পাহাড়ে৷ বাঘ তখনও তোর পেছনে৷ পাহাড়চুড়া থেকে তুই পড়ে যাচ্ছিস খাদে৷ পড়ে যেতে-যেতে কোনওরকমে একটা লতা ধরে ঝুলছিস৷ বাঘটা উঁকি মারছে৷ এই সময় হঠাৎ বেরিয়ে এল এক পাহাড়ি ইঁদুর, ইয়া এত বড়৷ ইঁদুরটা ধারালো দাঁত দিয়ে, তুই যে লতাটা ধরে ঝুলছিস, সেইটা কাটতে লাগল৷ তুই ঝুলছিস৷ নিচে গভীর খাদ৷ পড়ে গেলেই মৃত্যু৷ এমন সময় তুই দেখলি, পাশেই তোর হাতের নাগালের মধ্যে ঝুলছে এক থোলা পাকা আঙুর৷ বাঁ-হাতে লতাটা ধরে ঝুলছিস, ইঁদুর কাটছে, মাথার ওপর বাঘ ঝুঁকে আছে, তুই ডান হাতে একটা করে আঙুর ছিঁড়ছিস আর মুখে দিচ্ছিস, নিচে গভীর খাদ হাঁ করে আছে৷ তোকে যেভাবেই হোক, ঝুলে থাকতে হবে৷ মৃত্যুর পরোয়া করি না, জীবনকে উপভোগ করি৷’
আমার দাদা, সাঙ্ঘাতিক দাদা৷ বাবাকে ভীষণ ভালোবাসত৷ বাবাই তার গুরু৷ বাবার সমস্ত জিনিস, বাবার ঘরে এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে, যেন বাবা বাথরুম গেছেন৷ এখনই এসে জামাকাপড় পরবেন, চশমাটা চোখে দেবেন, জুতো পরে হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে যাবেন৷ দাদা বাবার ঘরে কাউকে শুতে দেয় না৷ বলে, ‘বাবার মন্দির৷’ ঘরের সংখ্যা কম৷ আমরা দু-ভাই বারান্দায় শুই৷ দাদা বাবার বিছানায় মশারি ফেলে ভালো করে গুঁজে, মাথার কাছে ছোট টেবিলে এক গেলাস জল চাপা দিয়ে রাখে৷
দাদাকে মনে হয়, আমার বাবা৷ ছোট বাবা৷ বাবা যেমন রোজ রাতে দাদাকে পড়াতে বসতেন, দাদাও আমাকে নিয়ে সেইরকম বসে৷ বাবার মতো মুখ, চোখ, কপাল, খাড়া নাক এমনকী, গলার আওয়াজও৷ পরীক্ষা যেদিন শুরু হবে, তার আগের রাতে, দাদা আমাকে নিয়ে বসেছে৷ বলছে, ‘সব একবার রিভাইস করে নে৷’
আমি কেঁদে ফেললুম, ‘দাদা, আমার কিছু মনে নেই৷ সব ভুলে গেছি৷ আমি বসে-বসে ফেল করব৷’
দাদা কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে রইল৷ তারপর হঠাৎ যেন আগুনের মতো জ্বলে উঠল৷ কোনও বাধা পেলেই দাদা যেমন হয়ে যায়৷ বাবার নাম ছিল সুরেন্দ্রনাথ৷ বাবার সামনেও কোনও বাধা এলে, বুক চিতিয়ে বলতেন, ‘আমার নাম সুরেন্দ্রনাথ, সারেন্ডার নট৷ আত্মসর্ম্পণ করব না৷’
দাদা আমার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি মেরে বললে, ‘তুই সারেন্ডার নট-এর ছেলে হয়ে এই কথা বলছিস! আয় আমার সঙ্গে৷’
দাদাকে অনেকটা মহাদেবের মতো দেখতে৷ আমাকে টানতে-টানতে বাবার ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল৷ বললে, ‘বোস মেঝেতে, বাবু হয়ে৷’
বসলুম৷ একসঙ্গে চার-পাঁচটা ধূপ জ্বেলে বাবার ছবির সামনে রাখলে৷ ছবিটা খাটে৷ ধূপদানিটা সামনের টুলে৷ মৃদু একটা আলো জ্বেলে দিলে৷ খাটের তলায় চোখের সামনে বাবার জুতো-জোড়া৷ ঝকঝক করছে৷ ছোট্ট একটা আসনের ওপর৷
দাদা আমার পাশে বসল৷ প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে৷ বললে, ‘বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাক বেশ কিছুক্ষণ৷ চোখের পাতা ফেলবি না৷’
একভাবে তাকিয়ে আছি৷ জল আসছে চোখে৷ বাবার হাসি-হাসি মুখ বসে আছেন চেয়ারে৷ গায়ে একটা কাশ্মীরি শাল৷ মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তোলা৷ সেই ছবিটাই বড় করা হয়েছে৷ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মনে হল, ছবিটা জীবন্ত৷ চোখের পাতা পড়ছে৷ ঠোঁট নড়ছে৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি৷ কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে৷ সব ঝাপসা হয়ে আসছে৷ হঠাৎ খটখট জুতোর শব্দ কানে এল৷ যে-ঘরে বসেছিলুম, সেটা যেন নিমেষে মিলিয়ে গেল৷ লম্বা, সোজা একটা রাস্তা৷ দু-পাশে সার-সার বিশাল-বিশাল গাছ৷ বহু দূরে আকাশের গায়ে নীল একটা পাহাড়৷ জল চিকচিক একটা নদীর রেখা৷
আমার সামনে সোজা হয়ে হেঁটে চলেছেন বাবা৷ আমি তাঁর শক্ত পায়ের গোছ দেখতে পাচ্ছি৷ গোড়ালিটা ঢুকে গেছে চামড়ার তৈরি ঝকঝকে জুতোর মধ্যে৷ বাবার হাঁটার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল৷ কখনও পা ভাঙত না হাঁটুর কাছ থেকে৷ সৈনিকের মতো চর্চা করতেন৷ চিবুকটা থাকত খাড়া৷ যেন খাপখোলা একটা তলোয়ার হেঁটে চলেছে৷ আর হাঁটতেন খুব দ্রুত গতিতে৷
আমি, আমার দাদা, দুজনে প্রায় ছুটছি৷ তাল রাখতে পারছি না৷ জুতোর ভয়ংকর শব্দ আমাদের আগে-আগে চলেছে৷ কাঁকুরে পথ৷ শেষবেলার রোদ লুটিয়ে আছে, গাছের ফাঁক দিয়ে যেখানে-যেখানে আসতে পেরেছে৷ ‘বাবু’ বলতুম আমি বাবাকে৷ দাদা ‘বাবাই বলত৷ বাবার জুতোর গোড়ালির চাপে ছোট-ছোট কাঁকর গুঁড়িয়ে পাউডার হয়ে যাচ্ছে৷ মশর-মশর শব্দের সঙ্গে জুতোর গোড়ালির শব্দ৷
বাবার চওড়া পিঠ৷ সুন্দর মাথা৷ শক্ত ঘাড়৷ ব্যায়াম করা শরীর৷ আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন না৷ কেবল এক-একবার বলছেন, ‘ঠিক আসছ তো, ঠিক আসছ তো৷’
আমরা প্রায় ছুটছি৷ আমাদের নজর বাবার পায়ের দিকে৷ সুন্দর দুটো পা৷ কালো কুচকুচে জুতো৷ সমান-সমান দুরত্ব রেখে একটার-পর-একটা পড়ছে৷ আর বিশাল লম্বা একফালি কাপড়ের মতো পথটা গুটিয়ে যাচ্ছে৷ আমার পায়ে ভোঁতা-মুখ ছোট্ট একজোড়া বুট৷ আমাদের জুতোর ঠোক্করে, ছোট-ছোট সাদা মসৃণ পাথর ঠিকরে চলে যাচ্ছে৷
উলটো দিক থেকে বাতাস বইছে জোরে৷ বাবার মাথার পেছন দিকের বড়-বড় চুল উড়ছে৷ আমাদের কপালে চুল খেলা করছে৷ হঠাৎ পেছন দিক থেকে একটা টাঙা আমাদের অতিক্রম করে সামনে চলে গেল৷ সাদা ঘোড়ার পায়ের টগবগ শব্দ৷ নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে চাকার কেটে-কেটে চলে যাওয়ার অদ্ভুত আওয়াজ৷ পেছন দিকে তিন-চারজন যাত্রী৷ তাদের মধ্যে একজন সিল্কের রুমাল নাড়ছে৷ টাঙাটা ক্রমশ দূর থেকে দূরে একটা দেশলাইয়ের খোলের মতো হয়ে গেল৷ পথটা যেন নাড়া খেল৷ নির্জন, আরও নির্জন হল৷ সাদা স্বাস্থ্যবান ঘোড়াটা বাবার হাঁটার শক্তি যেন আরও বাড়িয়ে দিল৷
আমি মাথা নিচু করে, হাত মুঠো করে সারা শরীর দুলিয়ে হাঁটছি৷ আমার চোখ আমার ছোট পায়ের ছোট জুতোর দিকে৷ পথের সাদা কাঁকরের দিকে৷ মাঝে-মাঝে চোখ যাচ্ছে বাবার পায়ের দিকে৷ কী গতি, কী শক্তি৷ টাঙার বড়-বড় লোহার চাকাও হেরে যায়৷ আমাদের দুই ভাইয়ের সঙ্গে বাবার একটা যেন রেস চলেছে৷ আকাশের গায়ে নীল পাহাড়টাকে অনেক বড় দেখাচ্ছে৷ নদীর সুতো এখন চওড়া ফিতে৷ বাবা পাহাড় ভীষণ ভালোবাসতেন৷ পাহাড়টাকে ধরার জন্য যেন ছুটছেন৷ আমি ঘেমে গেছি৷ আমার ছোট-ছোট পা দুটো যেন আর চলছে না৷ হঠাৎ আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলুম মুখ থুবড়ে৷ দাদা বলছে, ‘রাজা পড়ে গেছে৷ রাজা পড়ে গেছে৷’ বাবা অনেকটা দূরে ছিলেন৷ আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন গটগট করে৷ আমি দেখতে পাচ্ছি কালো জুতো৷ পাউডারের মতো ধুলো জমেছে৷ বাবা সামনে এসে আমাকে তুলতে-তুলতে বলছেন, ‘পড়ে গেছে তো কী হয়েছে? এই তো আবার উঠে পড়েছে৷’
আমার হাঁটু দুটো ছড়ে গেছে৷ দাদা বলছে, ‘কেটে গেছে৷’
বাবা বলছেন, ‘ও অমন অনেক কাটবে ছিঁড়বে৷ সামনেই নদী৷ পাহাড়ি নদীর জল ওষুধের মতো৷ ওখানে গিয়ে ধুয়েমুছে দেব৷’
আবার আমাদের হাঁটা শুরু হল৷ বাবার সেই এক গতি৷ আমার হাঁটুর কাটা থেকে অল্প-অল্প রক্ত ঝরছে৷ এক সময় বললুম ‘বাবা, আমি যে আর পারছি না৷’
বাবা থেমে পড়লেন৷ আমার দিকে বড়-বড় চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘পারছ না মানে! তুমি ওই নীল পাহাড়ে যাবে না?’
‘আমার শরীর আর পারছে না৷’
‘শরীর নয়, তোমার মন৷ তোমার মন হেলে গেছে৷ তুমি হেরে যাবে? যারা টাঙা করে গেল তারা এতক্ষণে নদী পেরিয়ে পাহাড়ের মাথায় উঠে গেছে৷ ওই পাহাড়ের চূড়ায় নানা রঙের পাথর পাওয়া যায়৷ এক-একটার রং প্রজাপতির পাখার মতো৷ আর পাথরের ফাটলে-ফাটলে আছে তুলো ঘাস৷ এত কাছে এসে তুমি বলছ, পারবে না৷ ওদের কাছে তুমি হেরে যাবে৷’
দাদা বলছে, ‘বাবা, আমরাও তো টাঙায় যেতে পারতুম৷’
বাবা বলছেন, ‘ও তো দুর্বলের যাওয়া, সবল যায় পায়ে হেঁটে৷ হাঁটার একটা আলাদা আনন্দ আছে৷ সব জিনিসই জয় করে নিতে হয়৷ কষ্টের পর বিশ্রাম, তার আনন্দ অনেক বেশি৷ হারি আপ, হারি আপ মাই বয়েজ৷ সূর্য ডোবার আগে আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে৷ কেন পারবে না! বীর কখনও হারে না৷’
আবার আমাদের হাঁটা শুরু হল৷ পথ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে৷ গাছ সরে যাচ্ছে৷ নদী এগিয়ে আসছে৷ পাথর আরও বাড়ছে৷ এইবার বড়-বড় পাথর৷ সাদা দুধের মতো, হালকা সবুজ-লালের ছিট৷ ক্রমশই ঢালু হচ্ছে পথ৷ এক সময় শুধুই পাথর৷ টাঙাটা একপাশে দাঁড়িয়ে৷ আর এগোতে পারেনি৷ চালক ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিয়ে, একপাশে বসে আছে উদাস হয়ে৷
বাবা বলছেন, ‘দেখছ, অন্যের কাঁধে চড়ে, কিছুদূর যাওয়া যায়, শেষ পর্যন্ত যেতে হলে নিজের শক্তিই ভরসা৷’
বাবা এইবার পাথর থেকে পাথরে লাফ মেরে চলেছেন৷ কী ব্যালান্স৷ জুতোর শব্দ হচ্ছে খটাস-খটাস৷ গোড়ালির পেরেকের সঙ্গে পাথরের কোণা লেগে সিগারেট লাইটারের মতো আগুনের ফিনকি ছুটছে৷
নানা মাপের অত পাথর, দিগন্তবিস্তৃত অত পাথর দেখে চোখে ঘোর লেগে যাচ্ছে৷
বাবা বলছেন, ‘শরীরটাকে পাখির মতো হালকা করে দাও৷ মনে করো তোমার ডানা আছে৷ ভাবলেই হবে৷ মানুষ সব পারে, মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই৷’
আমরা আরও ঢালু বেয়ে একেবারে নদীর বুকে নেমে এলুম৷ জল বেশি নয়, কিন্তু ভীষণ স্রোত৷ কাচের মতো জল৷ একবার তলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে৷ ছোট-বড় পাথর, বালির দানা কিচকিচ করছে৷ বাবা পকেট থেকে রুমাল বের করে জলে ভিজিয়ে, আমার হাঁটুর থেঁতলে যাওয়া জায়গা দুটোয় থুবে-থুবে, আলতো করে লাগলেন৷ সব ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল৷ হাতে লেগেছিল৷ সেই জায়গাগুলোও মেরামত করলেন৷
জিগ্যেস করছেন, ‘কী, খুব জ্বালা করছে?’
করছে৷ তবু আমি বললুম, ‘না-না, ঠিক আছে৷’
বাবা, খুশি হয়ে বলছেন, ‘বাঃ, ভেরি গুড! এই তো ট্রেনিং৷ কষ্ট, জ্বালা, যন্ত্রণা, আমাদের জীবনের সঙ্গী৷ একদম পাত্তা দেবে না৷ তা হলেই সব কাবু হয়ে যাবে৷ এখানে হাঁটতে এসেছ, হেঁটে যাও৷ থামবে না, থেমে পড়বে না, ভেঙে পড়বে না৷ এই হল পথ, তুমি হলে পথিক৷ আর এই জুতো হল গতি৷ দ্যাখো না, আমি কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি৷ আর হ্যাঁ, জুতো হল আত্মবিশ্বাস৷ এই দ্যাখো, পেছনে তাকাও৷’
আমি ফিরে তাকালুম৷ অবাক কাণ্ড৷ দেখি একটা ঘর, দালান৷ চারপাশে আমগাছ, জামগাছ, লিচুগাছ৷ সকালের রোদ৷ পাখি ডাকছে৷ দালানে একটা দোলা৷ একেবারে এতটুকু একটা শিশু দোলায় শুয়ে হাত-পা নাড়ছে৷ ছোট্ট লাল-লাল কচি-কচি দুটো পা৷ বাবার গলা৷ তিনি বলছেন, ‘চিনতে পারছ? তোমার বাবা৷’
আমি বাবার দিকে ফিরে তাকালুম৷ আশ্চর্য! ওই দিকটায় সেই খরস্রোতা নদী৷ নীল পাহাড় খাড়া হয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে৷
বাবা বলছেন, ‘আবার দ্যাখো৷’
একজন কিশোর গ্রামের পথ ধরে স্কুলে যাচ্ছে৷ বগলে বই৷
বাবা বলছেন, ‘বাড়ি থেকে দেড় মাইল দূরে ছিল তোমার বাবার স্কুল৷ রোজ হেঁটে যেত, হেঁটে ফিরত৷ তাই তো আমি এখনও এত হাঁটতে পারি৷ একদিনও কামাই হতো না৷ টিফিন ছিল ছোলা ভিজে আর আদা৷ একটু নুন৷’
ফ্রুর-ফ্রুর করে বাঁশি বাজল৷ নিমেষে দৃশ্য বদলে গেল৷ খেলার মাঠ৷ লাল জার্সি পরা একটি ছেলে দুর্দান্ত খেলছে৷ গোল৷ হাততালি৷ খেলা-শেষের বাঁশি৷ ভারিক্কি চেহারার এক ভদ্রলোক ছেলেটির হাতে একটা বড় কাপ তুলে দিচ্ছেন৷ লাল জার্সি-পরা ছেলেটি মাথায় কাপ নিয়ে বেরিয়ে আসছে মাঠ থেকে৷ হই-হই উল্লাস৷
বাবা বলছেন, ‘আমাদের স্কুল ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হল৷ আমাদের সময় পড়া আর খেলা৷ দুটোই ছিল৷’
একটা ঘর৷ জানলার ধারে একটা টেবিল৷ টেবিল-ল্যাম্প জ্বলছে৷ এক যুবক বই খুলে গভীর মনোযোগে পড়ছে৷ টেবিল-ক্লকে রাত দুটো৷ যুবকের গায়ে গেঞ্জি৷ ভীষণ ভালো স্বাস্থ্য৷ টেবিলের ওপর ডান হাত৷ হাতের গুলি ঠেলে উঠেছে৷
বাবা বলছেন, ‘কলেজ হোস্টেল৷ কাল থেকে শুরু হচ্ছে বি.এস-সি পরীক্ষা৷ ওই ছেলেটি জীবনের কোনও পরীক্ষাকেই ভয় পায়নি কোনওদিন৷ সারারাত পড়বে৷ ভোরবেলা...’
ঠিংঠাং শব্দ৷ জিমনাশিয়াম৷ যুবক একা বারবেল ভাঁজছে৷ ভোরের আকাশ৷ দূরে একটা পার্ক৷ জল টলটলে দিঘি৷
বাবা বলছেন, ‘দেহচর্চায় শুধু দেহ বড় হয় না, মনও বড় হয়৷ মনের সব ভয় কেটে যায়৷’
দৃশ্য বদল হল৷ বিশাল একটা বাড়ি৷ বড়-বড় থাম৷ অনেক সিঁড়ি৷ সুন্দর সেই যুবক কালো গাউন পরে ধাপে-ধাপে নেমে আসছে৷ হাতে গোল করে গোটানো একটা কাগজ৷
বাবা বলছেন, ‘ওই দ্যাখো, সিনেট হল৷ তোমার বাবা কনভোকেশান থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছে৷ ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল৷ তোমার বাবার কাঁধে যিনি হাত রাখছেন, তিনি তোমার ঠাকুরদা৷ ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বড় উকিল ছিলেন৷ তোমার ঠাকুরদার মুখের ভাবটা দ্যাখো, যেন কোহিনূর পেয়েছেন৷ পিতার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ পুত্রের সাফল্য৷ ছেলের মধ্যেই বাবা বেঁচে থাকেন৷ অনন্তকাল ধরে এই হয়ে আসছে৷ তোমার সাফল্যেই আমার সাফল্য৷ তুমি আমাকে আনন্দ দিলে তবেই আমি আনন্দ পাব৷ জানবে মানুষের পা হাঁটে না, হাঁটে মন, পায়ের সাহায্যে৷ কোনও জিনিস হাত ধরে না, ধরে মন৷ দেহ বড় হয় না, বড় হয় মন৷ ইচ্ছে করলে মানুষ আকাশের চেয়েও বড় মন করতে পারে৷ পৃথিবীর সবকিছু দুর্বল৷ ইচ্ছাই প্রবল৷ সবচেয়ে শক্তিশালী হল মানুষের ইচ্ছে৷’
হঠাৎ সব অদৃশ্য৷ কেউ কোথাও নেই৷ শুধু বড়, ছোট পাথর৷ পাহাড়ি নদীর বয়ে চলার কুলকুলু শব্দ৷ একটা পাথরের ওপর বাবার জুতো-জোড়া৷ চকচকে কালো জুতো৷ মিহি পাউডারের মতো ধুলো৷ নদীর ওপারে সেই নীল পাহাড়৷ খাড়া উঠে গেছে আকাশের দিকে৷ কান ছুঁয়ে শাঁ-শাঁ শব্দে বাতাস বয়ে যাচ্ছে৷ নদীর তরতরে জল পাথরে-পাথরে গান শুনিয়ে যাচ্ছে, আমরা চলেছি, চলেছি, আমরা থেমে নেই৷
ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম৷ আলো কমে আসছে৷ নীল পাহাড় ধূসর হয়ে গেছে৷ পৃথক-পৃথকভাবে আর কোনও কিছুই চেনা যাচ্ছে না, সব একাকার৷
চিৎকার করলুম, ‘বাবা৷’
প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতেই পাহাড়চূড়া থেকে উত্তর এল, ‘রাজা৷’
প্লেট-পাথরের মতো আকাশ, দৈত্যের মতো পাহাড়, দুধের মতো নদী, একেবারে চূড়ায় সাদা হাঁসের মতো এতটুকু একজন মানুষ, ‘রাজা, আমি এইখানে৷ তুমি নদীর বাধা পেরিয়ে চলে এসো৷ এখানে এলে তুমি দূর-দূর কত দূর দেখতে পাবে৷ মিছরির মতো মিষ্টি বাতাস৷ কতরকমের পাথর ছড়িয়ে আছে এখানে৷ কোনও-কোনও পাথরে, সোনার আঁচড়৷’
‘ভীষণ অন্ধকার৷’
‘মনের মশাল জ্বেলে নাও৷’
‘নদীতে ভীষণ স্রোত৷’
‘মনের ভেলা ভাসাও৷’
‘পাহাড় ভীষণ উঁচু৷’
‘মনের মই তার চেয়ে উঁচু৷’
‘আমার পা চলছে না৷’
‘আমার পৃথিবী-ঘেরা জুতোটা পরে নাও৷’
‘আমার দাদা কোথায়?’
ঠিক আমার পাশ থেকে উত্তর এল, ‘তোর পাশে৷’
ঘোর কেটে গেল৷ বিছানায় বাবার ছবি৷ সামনেই কালো চকচকে জুতো৷ দাদা রোজ অফিসে বেরোবার আগে প্রণাম করে৷ আমি কোনওদিন করি না৷ জুতোয় মাথা ঠেকালুম৷ সঙ্গে-সঙ্গে মনে হল, শুধু জুতো নয়, জীবন্ত দুটো পা এসে গেছে৷ জুতোটা গরম৷
দাদা বলছে, ‘আর কোনও ভয় আছে রাজা?’
‘না, দাদা, আমি পেয়ে গেছি৷’ অনেকদিন পরে কাঁদছি আমি৷
দাদা বলছে, ‘রাজা, জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হল কৃপা৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন