সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মেজাজ খুব শান্ত রাখবে৷ কথায়-কথায় অত রাগ ভালো নয়৷’ আমি ভীষণ রেগে যাই তো তাই আমার নতুন মাস্টারমশাই পড়াতে বসেই আমাকে এই উপদেশ দিলেন৷ আমার মনে হয়, আমি যে খুব রাগী ছেলে, একথা হয় আমার মা, না হয় আমার বাবা মাস্টারমশাইকে বলে দিয়েছেন?
ইংরেজি বইটা খুলে মাস্টারমশাই জামার হাতা দুটো গুটিয়ে নিলেন৷ টেবিলের ওপর লোমলা দুটো হাত৷ বিশাল হাত৷ তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখার মতো৷ মনে হয় মাস্টারমশাই ব্যায়াম করেন! টেবিলে হাতটা সামনে মেলে ধরে মুঠোটা দুবার খুলে আর বন্ধ করে মাস্টারমশাই বললেন, ‘অনেক রাগী আর বদমেজাজি ছেলে আমি চরিয়েছি৷ আমার মেথড অবশ্য আলাদা৷ ডান কানটা ডান হাতে কষকষে করে ধরে ছ’বার ঝাঁকানি৷ তিন সেকেন্ড বিরতি৷ তারপর খপ করে ঘাড়টা ধরে চারবার ঢেঁকি পাড়ার মতো ওপর নিচ৷ ছেড়ে দাও৷ দু-সেকেন্ড ইনটারভ্যাল৷ তারপর হাতের তালুর এপিঠ-ওপিঠ দিয়ে ঠ্যাসঠ্যাস এগালে-ওগালে চড়৷ রাগ জল৷’
মাস্টারমশাই কথা বলছেন আর দাঁত কিসমিস করছেন৷ চোখের সামনেই যেন দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছেন অথচ কিছু করতে পারছেন না৷ টেবিলে ঢিসুম করে একটা ঘুসি মেরে মাস্টারমশাই বললেন, ‘কিন্তু আমার ও দাওয়াই নাকি চলবে না? তোমাদের বাড়ির নিয়ম আলাদা৷ গায়ে হাত তোলা নিষেধ৷ তোমার বাবা খুব ভুল করছেন৷ শৈশবে মানুষে আর বাঁদরে খুব একটা ফারাক থাকে না৷ বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা না ঝুলিয়ে জুতোর মালা ঝোলাতে হয়৷ ইংরেজিতে বলে, ডোন্ট কাস্ট পার্ল বিফোর এ সোয়াইন৷ শোরের সামনে মুক্তো ছড়িও না৷ বাংলায় আছে বেনা বনে মুক্তো ছড়ানো৷ বাঁদরকে যত আদর দেবে মাথায় চেপে বসবে৷ খুব ভুল করছেন ভদ্রলোক৷ শিব গড়তে বাঁদর গড়ছেন৷’
অনেকক্ষণ ধরেই নাকটা সুড়সুড় করছিল৷ ভ্যাঁচ করে বেরিয়ে এল চাপা হাঁচি৷ যেমন শব্দ তেমনি তেজ৷ সামনে খোলা বইয়ের পাতা ভয়ে কেঁপে উঠল৷ মাস্টারমশাই চমকে উঠলেন৷ মনে-মনে ভাবলেন, যার হাঁচির এত তেজ তার নিজের তেজ কত! আমার কত তেজ যে শুধু আমিই জানি৷ মাস্টারমশাই পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছতে-মুছতে বললেন, ‘তুমি রেগে গেলে কী করো?’
‘আজ্ঞে প্রথমে আমি তিন-চার মিনিট ভীষণ গর্জন করি৷ তারপর হাতের কাছে বই-খাতা-কাগজ যা পাই সব কুচি-কুচি করে ছিঁড়ে ফেলি৷ বিছানা, চাদর, সোফার ঢাকা, জানলার পরদা সব ফালা-ফালা করে ফেলি৷ তারপর আশেপাশে যেসব শক্ত জিনিস থাকে সেইসব এলোপাথাড়ি ধড়ামধড়ুম ছুঁড়তে থাকি৷ পেপারওয়েট, পেপার কাটার, দোয়াত, কলম, কাপ-ডিশ, থালা, ঘটি, বাটি, জুতো ঝ্যাঁটা৷ তারপর দরজায়-দরজায় গমাগম লাথি৷ জানলার পাল্লা ধরে ঘটাঘট শব্দ৷ তারপর মেঝেতে শুয়ে পড়ে হাত-পা ছুঁড়তে থাকি৷’
‘তারপর কী করো?’
‘ঘুমিয়ে পড়ি৷’
তারপর?’
মাস্টারমশাই যেন বেশ মজা পেয়ে গেছেন৷ কেবলই তারপর, তারপর করে চলেছেন৷
তারপর মা এসে ঘুম থেকে তুলে কিছু-না-কিছু খেতে দেন৷’
‘কী খেতে দেন?’
লুচির ওপরের পাতলা খোসা আর রাবড়ি আমি ভীষণ খেতে ভালোবাসি৷’
রোজই খাও৷’
‘হ্যাঁ, রোজ৷ তা না হলে তো আমি রেগে যাব৷ আর রেগে গেলেই তো ওইসব করতে থাকব৷ মা আমার রাগকে ভীষণ ভয় পায়৷ তাই লুচি আর রাবড়ি আমি রোজই খাই৷ যখন-তখন খাই!’
‘অন্য আর কিছু খাও না তুমি?’
‘হ্যাঁ, খাই৷ মাছ খাই, মাংস খাই, ডিম খাই, চকোলেট খাই৷ সরু চালের ঝরঝরে ভাত খাই৷ ভাত গলে গেলে আমি লাথি মেরে থালা সরিয়ে দি৷ ডালের বাটি, জলের গেলাস উলটে দি৷’
‘তুমি এরকম হলে কী করে?’
‘তা জানি না৷ তবে বাবা বলেন আমার ঠাকুরদা ভীষণ রাগী ছিলেন৷ আমি সেই ঠাকুরদা, ছেলে হয়ে জন্মেছি৷’
‘তুমি কখনও মার খাওনি!’
‘একবার৷ একদিন রেগে গিয়ে বাড়ির সব জুতো জানলা দিয়ে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলছিলুম৷ একপাটি জুতো পাশের বাড়ির জ্যাঠামশাইয়ের মাথায় গিয়ে লেগেছিল৷ তিনি সেই সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ খুব রেগে গিয়ে আমার দিকে মুখ তুলে বললেন, বাঁদর ছেলে৷ আমিও তো তখন খুব রেগেছিলুম৷ আমিও বললুম, বাঁদর৷ তারপর মা পিছন দিক থেকে এসে আমার কান ধরে খুব পেটাতে লাগলেন৷ আমি ঘ্যাঁক করে মায়ের হাত কামড়ে দিলুম৷ দুটো দাঁত বসে গেল৷’
‘তারপর?’
‘তারপর ডাক্তারবাবু এলেন৷ বাবা সব শুনে মাকে খুব বকলেন৷ কেন তুমি ওর গায়ে হাত তুলেছ? জানো ও আমার বাবা৷’
‘সে আবার কী?’
‘ওই যে বললুম বাবার বাবা মৃত্যুর পর আমি হয়ে জন্মেছেন৷ তার মানে, আমিই আমার ঠাকুরদা। মানে, আমার বাবার বাবা৷ সেই থেকে মা আর আমার গায়ে হাত তোলেন না৷ তুললেই যে বাবা খুব বকবেন৷ আসলে আমি তো বাবার বাবা৷’
মাস্টারমশাইয়ের চোখ কপালে উঠে গেছে৷ সামনের খোলা বইটা মুড়ে ফেললেন৷ আমাকে বললেন, ‘এক টুকরো কাগজ দাও তো৷ কাগজে খসখস করে কী যেন লিখে চার ভাঁজ করলেন৷
‘শোনো, আমি এখন চলি৷ আমি চলে যাওয়ার পর কাগজটা খুলে তুমি পড়বে৷’
মাস্টারমশাই ধীরে-ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় পড়লেন৷ আমি কাগজটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলুম৷ স্পষ্ট হাতের লেখা—
তোমার পরকাল ঝরঝরে হয়ে গেছে৷ তোমার বাবাকে বোলবে, তোমাকে পড়ানোর ক্ষমতা আমার বাবারও নেই৷ কোনও ডগ টেনার হয়তো পারতে পারেন৷
লেখাটা পড়েই আমার ভীষণ রাগ হয়ে গেল৷ ইংরেজি বইটা ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করলুম৷ কলমটা চিবিয়ে মাংসর হাড়ের মতো খণ্ড-খণ্ড করে ফেললুম৷ টেবিলটাকে উলটে দিলুম৷ নিমেষে সব লন্ডভন্ড৷ আমি ধড়াম করে শুয়ে পড়ে কচ্ছপের মতো হাত-পা ছুঁড়তে লাগলুম৷ বড় টেবিল ল্যাম্পের স্ট্যান্ডটা আমার বুকের ওপর৷ শেডটা গড়াচ্ছে মাথার কাছে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন