শেষ গোলাপ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

উষার খুব অসুখ৷ আজ একমাস৷ জ্বর নামছে না কিছুতেই৷ সকালের দিকে একটু কমে, তারপর যত বেলা বাড়ে তত জ্বর বাড়ে৷ সকলেই ভীষণ চিন্তিত৷ মেয়েটা দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে৷ কিচ্ছু খেতে চায় না৷ ডক্টর সেন রোজ আসেন সকালের দিকে৷ বেরিয়ে যান গম্ভীর মুখে৷

‘কী বুঝছেন ডাক্তারবাবু?’

‘বেশ ভালো রকমের টাইফয়েড৷ ভোগাবে৷ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে৷ তারপর ভগবানের হাত৷’

আমাদের স্কুলে এখন গরমের ছুটি চলছে, সামার ভেকেসান৷ সকালবেলা স্যারের কাছে পড়তে যাই৷ দশটার সময় সোজা চলে আসি৷ মা আমার হাত দিয়ে ডাব পাঠিয়ে দেন৷ মা রোজ দুপুরে আসেন৷ এসে মাথার কাছে বসেন৷ চলে যাওয়ার আগে চুল আঁচড়ে বেঁধে দিয়ে যান৷ মাথায় কত চুল৷ সব ভুসভুস করে উঠে যাচ্ছে৷ কী সুন্দর উষা! দিন দিন ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে৷ কী সুন্দর গান করত! এখন গলার স্বর কী ক্ষীণ!

মাথার দিকে খোলা জানালা৷ দোতলার ঘর৷ গরমটাও বেশ৷ রোদের আলোয় আকাশ যেন জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে৷ জানালাটা দক্ষিণ দিকে৷ মাঝে মাঝে ফিশফিশ করে বাতাস আসছে৷ উষার ছোট্ট ঝিনুকের মতো কপালে যেন হাত বুলিয়ে যাচ্ছে৷

ঘরের পুব দিকের জানালার কাছে পড়ার টেবিল৷ বই, খাতা সুন্দর করে গোছানো৷ একপাশে কলম, পেনসিল, স্কেল৷ মা সরস্বতীর ছোট্ট মূর্তি৷ উষার তৈরি ডেটকার্ড৷

সুন্দর ছবি এঁকেছে৷ গোলাপি আকাশ, নদী, নৌকো উষার খুব প্রিয়৷ আমি জানি৷ আমাদের নির্জন গঙ্গার তীরে বহু প্রাচীন একটা বটগাছ আছে৷ তলায় একটা বেদি করা আছে৷ কতদিন হু হু শীতের দুপুরে আমরা বসে বসে কত গল্প করেছি৷ সামনে ভরা গঙ্গা৷ জেলেনৌকো মাছ ধরছে বড়সড়ো টানা জাল ফেলে৷ নৌকোগুলো ছবির নৌকোর মতো স্থির৷ মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে বকের ঝাঁক৷ পাশেই শিবমন্দির৷ বিরাট শিবলিঙ্গ ফুল আর বেলপাতায় আচ্ছাদিত৷ বড় একটা ঘণ্টা ঝুলছে৷ হঠাৎ কেউ এসে ঠং করে বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে৷

রোজ এসে উষার পড়ার টেবিল আর বইখাতার ধুলো ঝাড়ি৷ গঙ্গার ধার থেকে সেই কবে টিয়াপাখির হলুদ একটা পালক পেয়েছিল, সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে৷ রোজ আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি৷ উষার কল্পনার জগৎ অনেক বড়৷ সেই জগতে কত কী যে আছে! ছোট্ট একটা নুড়ি-পাথরও তার কাছে ভীষণ মূল্যবান, কারণ এই পাথরটার ভেতর মস্ত একটা পাহাড় লুকিয়ে আছে৷

খুব আস্তে আমাকে ডাকল, ‘বিল্টু শোন৷’

টেবিলের কাছ থেকে সরে তার বিছানার কাছে গেলুম৷

‘আমার পাশে একটু বোস না৷’

একটু সরে গিয়ে আমার বসার জায়গা করে দিলে৷

‘তোর হাতটা আমার কপালে রাখ তো৷’

হাতটা আলতো করে রাখলুম৷ চোখ বুজিয়েই ছিল৷ বললে, ‘আঃ! কী ঠান্ডা! চান করেছিস বুঝি?’

‘না রে৷ এই তো সবে এগারোটা বাজল৷’

‘মামার বাড়ির সেই দিঘিটার কথা তোর মনে আছে?’

‘মনে নেই! তুই আর আমি সাঁতার কাটছিলুম৷ আশুদা ছিপ ফেলেছিল৷ সে কী বকাবকি!’

‘হাঁসগুলো কীরকম ভাসছিল৷ ওদের কী মজা! ভেসে থাকার জন্যে আমাদের মতো অত হাত-পা ছুড়তে হয় না৷ সামনের বছর গরমের ছুটিতে আবার যাব৷ বেশ মজা হবে৷’

‘এবারে আমরা কিন্তু লালগড়ে যাবই যাব৷’

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস৷ মানিকদার জিপে চেপে যাব৷ সঙ্গে খাবারদাবার থাকবে৷’

উষা বড় বড় চোখে তাকাল, যেন দুটো পদ্মপুকুর৷ আমার হাতটা নামিয়ে এনেছে তার বুকের ওপর৷ দু’হাতে চেপে রেখেছে৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আমার হাতটা ধীরে ওঠা নামা করছে৷

চোখ দুটো ধীরে ধীরে আবার বুজে এল৷ আস্তে আস্তে জিগ্যেস করল, ‘বাইরে আজ দিনটা খুব সুন্দর, তাই না রে?’

‘ওই যেমন হয়৷ খুব রোদ৷ ঝাঁ ঝাঁ করছে৷’

‘হ্যাঁ রে, মানিকদাদের আমগাছে মৌচাকটা আরও বড় হয়েছে?’

‘আমি আর দেখিনি রে! তোর অসুখ, আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না৷ তুই অসুস্থ, আমি সুস্থ, ভাবতেও কেমন লাগে৷ কত চেষ্টা করছি, কিছুতেই জ্বর আসছে না৷’

‘শোন বিল্টু, আমি কাল অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছি৷ তুই যদি লাল টুকটুকে একটা গোলাপ এনে আমার বুকে রাখতে পারিস তা হলেই আমি ভালো হয়ে যাব৷ কোনও দোকান থেকে কিনলে হবে না৷ নিজের হাতে গাছ থেকে তুলতে হবে৷ শুঁকবি না৷’

রামবাবুদের অত বড় বাগান কিন্তু একটাও গোলাপ গাছ নেই৷ পরেশবাবুর বাগানে গোলাপ আছে, সাদা, কালো আর পিঙ্ক৷ পরেশবাবু বললেন, তুমি কাজি সাহেবের বাগানে যাও৷ আমি জানি গোলাপ আছে৷ গোলাপের সিজন শেষ হয়ে এল, তবু দেখ, একটা-দুটো যদি থাকে৷

কাজি সাহেব বড় কলেজের নামকরা অধ্যাপক৷ গম্ভীর মানুষ৷ বাগানের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ৷ হঠাৎ ঢুকতে সাহস হচ্ছে না৷ বড় কুকুর আছে৷ মাঝে মাঝে ডাকছে৷ হঠাৎ গেট খুলে কাজি সাহেব বেরিয়ে এলেন৷ বললেন, ‘অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ৷ কী চাই?’

প্রথমেই নমস্কার করলুম, তারপরে বললুম৷ বললুম, আমার বোনের খুব অসুখ৷ কিছুতেই জ্বর ছাড়ছে না৷ আজ প্রায় এক মাস৷ বোন বললে, নিজের হাতে গাছ থেকে একটা লাল গোলাপ তুলে এনে যদি আমার বুকে রাখিস আমি ভালো হয়ে যাব৷’

‘ভেতরে এসো৷ দেখি কোথায় কী আছে!’

বিরাট গোলাপ বাগান৷ একটা গাছে একটি মাত্র লাল গোলাপ সকালের রোদে টকটক করছে৷ কাজি সাহেব বললেন, ‘যাও, তুলে নাও৷ আজই ফুটেছে৷’

ফুলটা এনে উষার বুকের মাঝখানে রাখলুম৷ চোখ মেলে তাকাল৷ বলল, ‘ঠিক সময় এনেছিস৷ এই দেখ, আমি এক্ষুনি কেমন ভালো হয়ে যাব৷’

চোখ দুটো বুজে গেল৷ ঠোঁটের কোণে হাসি৷ দম বন্ধ করে দেখছি৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে লাল গোলাপ উঠছে, নামছে৷ হঠাৎ স্থির৷ উষা উষা হয়ে উঠে গেল চিরকালের আকাশে৷ তাই আজও আমি ভোরে উঠি উষা যখন আসে৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%