সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
নবেন্দু এতক্ষণ কোমরে হাত রেখে গম্ভীর চালে আমাদের কাজকর্ম সুপারভাইজ করছিল৷ হোলডলের বেল্টটা নিচু হয়ে দুবার টেনে দেখে বললে, ‘আর একটু টান হবে, আরও দু-ঘর যাবে৷’ পরেশ বললে, ‘নে-নে, ওই যা হয়েছে যথেষ্ট৷ এটা তো একটা গন্ধমাদন হয়েছে রে! কী নেই এর ভেতর! পুরো একটা রাজত্ব৷’
নবেন্দু পরেশের কথায় কানই দিল না৷ নিজের মনে গজগজ করতে লাগল, যত সব অপদার্থ, একটা বেডিং পর্যন্ত বাঁধতে পারে না, বাইরে বেড়াতে যাওয়ার শখ! আয় তো অপূর্ব! এতক্ষণের পরিশ্রমে পরেশের কপাল ঘেমে গেছে৷ হাতের তালুর উলটো পিঠে ঘাম মুছতে-মুছতে বলল, তুই যদি আর একটা ঘর কমাতে পারিস, আমি এইখানে একহাত নাক-খত দেব৷
অপূর্ব ঘরের কোণে ফার্স্ট-এইড বক্স সাজাচ্ছিল, নবেন্দুর ডাকে উঠে এল৷ পরেশ একটু ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘দুই পালোয়ানের কেরামতিটা একবার দেখা যাক৷’ নবেন্দু পরেশের দিকে একবার বাঁকা চোখে তাকাল, কোনও কথা বলল না৷ নবেন্দুর স্বভাবে কথা কম, কাজ বেশি৷ সোজা কথা, স্পষ্ট সোজাভাবে বলে৷ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ তার চরিত্রে লেখা নেই৷ রাগে কম৷ যখন রাগে তখন রক্ষে নেই, তখন হাতটাই বেশি চলে৷
পরেশের চ্যালেঞ্জে তার টকটকে ফরসা মুখটা একটু লাল হল, জ্বলজ্বলে বড়বড় দুটো চোখে একটু আগুন জ্বলল৷ নবেন্দু হোলডলটা খুলে ফেলল৷ আমাদের পাঁচ জনের বিছানা, পাঁচটা পাতলা তোশক, যতই পাতলা হোক একসঙ্গে বেশ পুরু হয়েছে, তার সঙ্গে হাওয়া দিয়ে ফোলানো যায় এমন পাঁচটা রবারের চোপসানো বালিশ, দু-ফেটি মোটা দড়ি, দুটো খেঁটে লাঠি, দুটো রেনকোট, পাঁচ জোড়া গ্লাভস, পাঁচটা চাদর, পাঁচখানা মশারি, একটা শিল-নোড়া, সব একসঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে এল৷
পরেশ এতগুলো জিনিস একসঙ্গে ঠিক ম্যানেজ করতে পারেনি, কোনও রকমে জড়িয়ে-মড়িয়ে, যা হোক করে বেঁধেছিল৷ নবেন্দু সেই ছত্রাকার রণাঙ্গনে দু-মিনিট থমকে দাঁড়িয়ে রইল৷ আর ঠিক সেই সময়ে আলুথালু অবস্থায় ঘরে এসে ঢুকল অপর্ণা৷ নবেন্দুর ছোট বোন, হাতের ট্রেতে পাঁচটা বিশাল বাটিতে ফুলকো করে চিঁড়ে ভাজার সঙ্গে চিনেবাদাম আর কুচো পাঁপড়ের মিশেল৷
অপর্ণাও দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে৷ ঘরে অজস্র ছড়ানো জিনিসের মধ্যে পাঁচটি অসহায় প্রাণী হাবুডুবু খাচ্ছে৷ সাবধানে ঘরের মধ্যে পা বাড়িয়ে অপর্ণা বললে, ‘যাচ্ছিস তো মধুপুর, দেখে মনে হচ্ছে এভারেস্ট জয় করতে যাচ্ছিস৷ এখন দয়া করে খেয়ে উদ্ধার কর৷’
দুপুর থেকে কসরত চলছে৷ সন্ধে প্রায় গড়িয়ে এল৷ খিদেও পেয়েছিল৷ পাঁচটি প্রাণী লাফিয়ে উঠে হাত বাড়াল৷ আমাদের মধ্যে প্রাণেশটা চিরকালই একটু উটমুখো৷ একদিকে পা ফেলতে আর একদিকে ফেলে৷ প্রাণেশের পা লেগে হ্যারিকেনটা ফুটবলের মতো ছিটকে অপর্ণার পায়ের কাছে পড়ে চিমনিটা ফুটিফাটা হয়ে গেল৷
প্রাণেশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে করুণ গলায় বললে, ‘দেখতে পাইনি রে৷’ পরেশ বললে, ‘ছোটখাটো জিনিস কোনও কালেই তো তোমার চোখে পড়ে না৷ হাতি ছাড়া তুমি কিছুই দেখতে পাও না৷ বিশেষ করে খাওয়ারের গন্ধ পেলে তোমার একটা ইন্দ্রিয় এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, অন্যগুলোর ফাংশন স্টপ হয়ে যায়৷’
প্রাণেশের অপ্রস্তুত ভাবটা অপর্ণাই কাটিয়ে দিল৷ ‘ওর কী দোষ! সারা ঘরে পা ফেলার এক ইঞ্চিও জায়গা নেই, মানুষ যায় কোথা দিয়ে৷’ প্রাণেশ যেন একটু বল ফিরে পেল, ‘দেখ না, বেলা একটা থেকে এই চলছে৷’ নবেন্দু আবার হোলডলটা নতুন করে খুলে ফেলল৷ বাটিগুলো এতক্ষণে আমাদের হাতে এসে গেছে৷ তোফা মুচমুচে চিঁড়ে ভাজা, অল্প আদা পেঁয়াজের কুচি মেশানো৷
একটু রাত গড়ালেই আর একটা জিনিস আসবে৷ মাঝারি সাইজের পোর্সেলিনের বাটিতে ঠান্ডা জমাট ক্ষীর, মৃদু গোলাপের গন্ধযুক্ত৷ নবেন্দুদের বাড়িতে পাঁচ-পাঁচটা জার্সি গরু, অঢেল দুধ, ঘি, ছানা, ননি, ক্ষীর৷ নবেন্দুর ঠাকুরমা মাঝে-মাঝে আমাদের রসিকতা করে বলেন, আমার গোয়ালে পাঁচটা চারপেয়ে আর ঘরে পাঁচটা দু-পেয়ে৷
নবেন্দুর বোধহয় ঝাল লেগেছিল, খাড়া ধারালো নাকের ডগায় বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছে৷ অপর্ণা বেরিয়ে যেতে-যেতে বললে, ‘সবই তো নিয়েছিস, কিছুই বাকি নেই, কেবল একটা তোলা উনুন হলেই হয়৷ বলিস তো ঠাকুরমার উনুনটা এনে দি, হোলডলে ঢুকিয়ে নে৷’ নবেন্দুর মুখে তখন একমুখ চিঁড়ে৷ ভরা মুখে সে ধর্মকে উঠল, ‘যা-যা, তোকে আর বেশি পাকামো করতে হবে না৷’ অপর্ণা কথাটা শুনেও শুনল না, বরং আর-একটা টিপ্পনি দূর থেকে ছুড়ে দিল, ‘তোরা তো আবার দুধের বাছা, একটা গরুও তাহলে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যা, সন্ধেবেলা সকলে মিলে দুধ খাবি৷’
বেশ তারিয়ে-তারিয়ে আমরা মুচমুচে চিঁড়ে ভাজা খেয়ে, জামার আস্তিনে মুখ মুছে আবার বাঁধা-ছাঁদায় লেগে গেলুম৷ নবেন্দু সত্যিই অসাধারণ৷ হোলডলটাকে অপূর্বর সাহায্যে সে ঠিক কায়দা করে ফেলল৷ স্ট্র্যাপটাকে সে শুধু এক ঘর সরাল না, চার-চারটে ঘর সহজেই কমিয়ে দিয়ে বেশ টাইট করে ফেলে গম্ভীর গলায় পরেশকে বলল, ‘সব কিছুই একটু যত্ন করে করতে হয় বুঝলি পরেশ, বেগার ঠেলায় কিছু হয় না৷’
পরেশকে একটু যেন ম্লান দেখাল৷ আমাদের দলে পরেশটা চিরকালই একটু ফাঁকিবাজ৷ আমাদের ক্লাবের কী একটা ফাংশনে একবার একটা বাঁশের দরকার হয়েছিল৷ কোথায় পাওয়া যায়! গ্রামের শেষ সীমায় দত্তদের একটা বাঁশঝাড় ছিল৷ দলবল চলল বাঁশ কাটতে, পরেশও সেই দলে৷ নবেন্দুই বাঁশ পাতার খোঁচা উপেক্ষা করে কয়েকটা বাঁশ ঝাড় থেকে কেটে নামাল৷ এইবার বয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা৷ বাঁশের লিকলিকে ডগার দিকটায় পরেশ৷ মাঝে আমি৷ গোড়ার দিকে কখনও নবেন্দু, কখনও অপূর্ব৷ মাইল তিনেক হাঁটা-পথে পরেশ বাঁশের পুরো ভারটা আমার কাঁধে ছেড়ে দিয়ে ডগার দিকে কাঁধ ঠেকাল কি ঠেকাল না, গান গাইতে-গাইতে সারাটা পথ এল৷ এই হল পরেশ—তবুও পরেশ আমাদের প্রিয় বন্ধু৷
নবেন্দু বললে, ‘ফ্রেন্ডস, আমাদের কাজ আপাতত শেষ৷ সবই প্রায় গোছানো হয়ে গেছে৷ নাউ ডিসপার্স৷ এখন স্নান, এখন বিশ্রাম৷ কাল সকালে স্টার্ট৷ আমরা ঠিক আটটার সময় বেরোব৷ মনে থাকে যেন৷’
অপূর্ব বললে, ‘চল না নবেন্দু আমরা সবাই মিলে এই সন্ধের অন্ধকারে দল বেঁধে স্নান করে আসি৷’ নবেন্দু ঠোঁটে আঙুল রেখে কিছুক্ষণ ভাবল তারপর বলল, ‘নট এ ব্যাড আইডিয়া৷ চলো তাহলে৷’ দলপতির নির্দেশ পেলে আমরা সবসময় রেডি৷ এ-যেন এক ক্ষুদে সামরিক দল৷
কোমরে গামছা বেঁধে আমরা সারি-সারি বেরোচ্ছি, ঠাকুরমা তখন চওড়া লাল রকে বসে মালা ঘোরাচ্ছিলেন৷ তুলসিতলায় সবে প্রদীপ দেখানো হয়েছে৷ মালা ঘোরানোর ফাঁকেই আমাদের হেঁকে বললেন—এই ছেলের দল, একটু পরেই সব আসবি, তোদের কিলোব৷ ঠাকুরমার কিলোনো আমাদের জানা আছে, পেটে খেলে পিঠে সয়৷ অপর্ণাই বোধহয় তুলসিতলায় প্রদীপ দিচ্ছিল, গোয়ালের দিক থেকে ধোঁয়া ওঠা একটা ধুনচি আনতে-আনতে বলল, ‘সন্ধেবেলা গঙ্গায় চান করতে যাচ্ছ যাও, আমি কিন্তু মাকে বলে দেব, তারপর বুঝবে ঠেলা৷’ নবেন্দু বললে, ‘তোকে আর বেশি পাকামো করতে হবে না, অয়েল ইওর ওন মেশিন৷’—‘ঠিক আছে তোমাদের মেশিনে মা-ই অয়েল দিয়ে দেবেন৷’ অপর্ণা ঘরে-ঘরে ধুনো দিতে চলে গেল৷ আমাদের সকলের নাকেই একটা মিষ্টি চন্দনের গন্ধ এসে লাগল৷ সামনেই পশ্চিমের আকাশে তখন সন্ধ্যার সেই অনেক দিনের বড় তারাটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে৷ উঠোনের একপাশে জুঁই ফুলের গাছটা ফুলে-ফুলে সাদা হয়ে গেছে, যেন অসংখ্য মায়ের মুখের ছোট-ছোট নাকছাবি৷
বাড়ি থেকে দু-কদম হাঁটলেই প্রাচীন কালের গঙ্গার ঘাট, রাধা-গোবিন্দের মন্দির, শিব মন্দির৷ রাধা-গোবিন্দের মন্দিরে সন্ধ্যার আরতি শুরু হয়েছে৷ ঘণ্টা বাজছে৷ মৃদু মিষ্টি একখানা আওয়াজ৷ গঙ্গা একেবারে কুলে-কুলে ভরা৷ ঘাটের কিনারায় জল ছলকে লাগার আওয়াজ উঠছে৷ ওপারে জুটমিলের সারি-সারি আলো জ্বলে উঠেছে৷ ঘাটের খুব কাছ দিয়ে ধীরে-ধীরে একটা নৌকা পাল তুলে ভেসে চলেছে৷ উদাস মাঝি হালে বসে আছে৷ পশ্চিমের আকাশের গায়ে যেন কালো রঙে আঁকা একটা ছবি৷
নবেন্দু আমাদের সতর্ক করে দিল, ‘একদম নিঃশব্দে স্নান সেরে নাও৷ একদম ঝাঁপাই জুড়বে না৷’ নিস্তব্ধ এই সন্ধ্যায় প্রকৃতি যেন ধ্যানে বসতে চলেছে৷ কোনওরকম শব্দ করে তার ধ্যান ভঙ্গ করা চলবে না৷ যেমন নির্দেশ, শীতল কালো জলে ডুব দিয়ে আমাদের শরীর জুড়িয়ে গেল৷ জলে ডুব দিয়েও আমরা যেন কতদূর থেকে ঘণ্টার শব্দ শুনতে পেলুম৷ জল ছলকে-ছলকে যেন রাতের প্রার্থনার মতো কী এক সঙ্গীতে মত্ত!
নবেন্দুদের বাড়িতে অনেক দিন ধরে একটি প্রথা চলে আসছে—সন্ধ্যায় সমবেত প্রার্থনা৷ হলঘরে সাবেক আমলের একটা অর্গান আছে৷ নবেন্দুর মা খুব সুন্দর অর্গান বাজাতে পারেন৷ আমরা যখন গঙ্গা থেকে স্নান সেরে বাগানের পথে ফিরছি তখনই কানে এল অর্গানের মিষ্টি সুর৷ নবেন্দু বললে, ‘পা চালিয়ে চল, প্রেয়ার শুরু হয়ে গেছে৷’
বিশাল হলঘর৷ মেঝেতে পুরু কার্পেট পাতা৷ দেয়ালে বড় বড় অয়েলপেন্টিং, বাঘের মাথা, হরিণের ফ্যাঁকড়া শিং৷ নবেন্দুর ঠাকুরদা হাইকোর্টের জজ ছিলেন৷ তাঁর আমলে বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তি এই হলঘরে আসর জমাতে আসতেন শুনেছি৷ ঘরের একটা কোণে লাইব্রেরি, বড়-বড় বই-ঠাসা আলমারি৷ নবেন্দুর ঠাকুরদা আবার একজন বড় শিকারি ছিলেন৷ দেয়ালে তাঁর একটা বড় অয়েলপেন্টিং ঝুলছে৷ ছবিটা এতই জীবন্ত, মনে হবে ছবি ছেড়ে সুদীর্ঘ পুরুষটি বুঝি এখনই কার্পেটের ওপর নেমে এসে আমাদের মাঝে বসবেন৷
প্রার্থনার সময় ঘরের সমস্ত চড়া আলো নিবিয়ে দিয়ে একধরনের ঘষা কাচের ডোমে ঢাকা আলো জ্বেলে দেওয়া হয়৷ সারা ঘরে একটা পাথুরে আলো ছড়িয়ে পড়ে৷ মনে হয়, মার্বেল পাথরের ঘরে একদল মার্বেল পাথরের মূর্তি স্থির হয়ে বসে আছে, আর উদাত্ত গানের সুর ধূপের ধোঁয়ার মত পাকিয়ে-পাকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷
নবেন্দুর মা অর্গান বাজিয়ে তখন গাইছিলেন ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ আমরাও সকলে গলা মিলিয়ে গাইতে শুরু করলাম৷ নবেন্দুর গলা যেমন মিষ্টি তেমনি চড়া৷ পরেশের গলা একটু ভাঙা-ভাঙা৷ চড়ার দিকে সে আর সাহস করে গাইছিল না৷ অপূর্বর গলাও বেশ ভালো৷ পরের গান ‘তাঁরে আরতি করে চন্দ্র তপন’৷
প্রার্থনা শেষ হবার পর আমরা সকলে একতলার ছাদে এসে মাদুর পেতে বসলাম৷ আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে৷ ভিজে-ভিজে হাওয়া বইছে৷ ছাদেও একটা সুন্দর বাগান৷ লতানে অপরাজিতা একটা মাচার ওপর ডালপালা মেলে হাওয়ায় দুলছে৷ তলায় চাঁদের আলোর ছায়া কাঁপছে৷
কারুর মুখেই কোনও কথা নেই৷ সকলকেই যে প্রকৃতি স্তব্ধ করে দিয়েছে৷ এমনকী অপর্ণা যখন আমাদের জন্যে ঠাকুরমার ‘কিল’ নিয়ে এল, তার কথায়ও কোনও চপলতা নেই৷ চকচকে ট্রে-টা আমাদের মাঝখানে বসিয়ে দিয়ে শান্ত পায়ে চলে গেল৷ আমরা সকলে ঝুঁকে পড়লাম৷ কুলফি মালাই৷ গায়ে পেস্তার ছিটে৷ ভুরভুরে গোলাপের গন্ধ৷ খাঁটি দুধের ক্ষীর দিয়ে তৈরি৷ এক টুকরো জিভের উত্তাপে গলে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ছে৷ পরেশ শুধু বললে, ‘এমন জিনিস আগে কখনও খাইনি’৷ অপূর্বর শুধু একটিই কথা, ‘কী অপূর্ব’!
সকাল বেলা আকাশটা আবার একটু মেঘলা-মেঘলা করেছে৷ বৃষ্টি হবে নাকি! হলেও কিছু করার নেই৷ ঠিক দশটার মধ্যে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতে হবে৷ সাড়ে দশটায় ট্রেন৷ দশ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ছাড়বে৷ অবশ্য ভাবনার কিছু নেই, নবেন্দুদের গাড়িতে যাওয়া হবে৷
মাকে বলাই ছিল৷ ভোর-ভোর উঠে সব কাজ সেরে নিতে হবে৷ খাওয়া নবেন্দুদের বাড়িতে৷ আমরা সকলে একসঙ্গে খেয়েদেয়ে টুক করে গাড়িতে উঠে বসব৷ কী মজা! মেঘলা আকাশ হলেও যাবার আনন্দে মন নেচে উঠল৷ নবেন্দুর নির্দেশ, আমরা সকলেই স্কাউটের পোশাক পরে যাব৷ স্নান করে, বাবার ছবিতে প্রণাম করে, মাকে প্রণাম করে দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়লুম৷ বেরোবার মুখে আমাদের কুকুর ভুলো বসেছিল৷ আমাকে দেখে ল্যাজ নেড়ে একটু রসিকতা করল৷ ভুলোটা ওইরকমই৷ ঠিক যেন মানুষের মতো৷ চোখের দিকে তাকালে মনে হয় হাসছে৷ সব জানে, সব বোঝে, কেবল কথাটাই যা বলতে পারে না৷ ভুলো আবার অঙ্কও জানে৷
একদিন দুপুরে ঘরে বসে অঙ্ক করছি৷ ভুলো থাবার ওপর মুখ রেখে বসে আছে সামনে, যেন কিছুই জানে না৷ সরল করাটা চিরকালই আমার একটু কেমন হয়ে যেত৷ হয় শূন্য কিংবা এক উত্তর হবে, আমি যত সাবধানেই করি না কেন, শেষকালে পূর্ণ-ফুর্ণ দিয়ে একটা বিদঘুটে উত্তর হয়ে যেত৷ নিয়মটা জানাই ছিল—BODMAS অর্থাৎ আগে ব্র্যাকেট, তারপর অফ, তারপর ডিভিশান, মাল্টিপ্লিকেশন, অ্যাডিশন, সাবট্রাকশান৷ সেদিনও সেই ভাবে করছিলাম, তবে অজস্র অঙ্কের ভিড়ের মধ্যে কীভাবে ভাগের আগেই গুণ করতে শুরু করেছিলাম, ভুলো অমনি ঘ্যাঁক করে হাতটা কামড়ে ধরল৷ অঙ্কটা ভুল হতে-হতে বেঁচে গেল৷ উত্তর হল শূন্য৷
ভুলোটা আবার শয়তানও ছিল৷ একদিন পড়ার বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ছিলুম৷ ভুলো চুপি-চুপি মাকে ডেকে এনে ধরিয়ে দিলে৷ বই গেল৷ প্রহারও হল৷ সাতদিন ভুলোর সঙ্গে রেগে কথা বললুম না৷ তারপর ভুলো একদিন নিজে এসেই ভাব করল৷ সামনে এসে চুপ করে বসল, তারপর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল৷ কেউ কাঁদলে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়৷ ভুলোর সঙ্গে ভাব হয়ে গেল৷ নিজে হাতে গোটা দুই বিস্কুট খাইয়ে দিলুম৷
নবেন্দুর বাড়িতে যখন পৌঁছলুম তখন নটা বেজে পাঁচ৷ সকলেই এসে গেছে৷ খাবার টেবিলে প্লেট পড়েছে৷ নবেন্দু বললে, ‘বসে পড়, বসে পড়, আর দেরি নয়৷’ অপর্ণা জল দিচ্ছিল, বললে, ‘যতটা পারিস একসঙ্গে খেয়ে নে! কতদিন যে খাওয়া জুটবে না৷ এক মাসের খাওয়া একসঙ্গে খেয়ে নিতে পারবি দাদা!’ পেটুক পরেশ যেন একটু ঘাবড়ে গেল৷ মুখটা করুণ-করুণ করে জিগ্যেস করল, ‘কি রে নবেন্দু, না খেয়ে মরতে হবে নাকি? মধুপুরে দোকানপাট নেই! সবটাই কি গভীর জঙ্গল!’ নবেন্দু কিছু বলার আগে অপর্ণাই বলল, ‘তোমাদের খাওয়ার জন্যে অনেকে আছে, তোমাদের খাওয়ার কিছু মিলবে বলে মনে হয় না৷ এক ওয়াগন শুকনো চিঁড়ে আর ভেলি গুড় নিলে তবু প্রাণটা বাঁচত৷’ অপর্ণা মার ডাকে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ পরেশের আবার প্রশ্ন, ‘আমাদের কে খাবে রে নবেন্দু?’ পরেশটা জীবনে গ্রামের বাইরে পা দেয়নি৷ তার ধারণা, খুব বড়-বড় শহর ছাড়া ভারতবর্ষের অধিকাংশ জায়গাই গভীর অরণ্যের ছায়ায় ঘুমোচ্ছে৷ সেখানে বাঘ, ভাল্লুক, কুমির, বড়-বড় ময়াল সাপ তার জন্যে ওত পেতে বসে আছে৷ ভাঙা মন্দিরে মাঝ রাতে টিমটিমে আলোর সামনে কাপালিকরা রোজই নরবলি দিচ্ছে৷ অপূর্বই পরেশের প্রশ্নের উত্তর দিলে, ‘কে আর খাবে৷ গোটা কতক বড়-বড় কেঁদো বাঘ আছে তাদেরকেই একটু সামলে চলতে হবে৷ তোর মতোই খাইয়ে সব৷ কোনও কিছু বাছবিচার করে খেতে শেখেনি৷ গরু ছাগলের অভাব হলে টপাটপ মানুষ খেয়ে জলযোগ করে, এই আর কি!’ পরেশ দেখলুম বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে বললে, ‘মার শরীরটা বিশেষ ভালো নেই ভাই৷ আমি না হয় নাই গেলুম৷’ নবেন্দু এতক্ষণ ফুলদানিতে ফুল সাজাচ্ছিল, ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ধমক লাগাল, ‘ইডিয়েট, তোর লজ্জা করে না? তুই না পুরুষ মানুষ! মধুপুর কোথায় জানিস?’ পরেশ ঘাড় নাড়ল, জানে না৷ নবেন্দু নিজের চেয়ারে বসতে-বসতে বলল, ‘তা জানবে কেন? ভূগোলে তো ওই জন্যই চিরকাল গোল্লা পাও’৷ আমি একটু উসকে দিলুম, ‘মধুপুর হল উত্তমাশা অন্তরীপের কাছে একটা গভীর বন৷ সেখানে দিনের বেলা হ্যারিকেন জ্বেলে গাছের ডাল কেটে-কেটে পথ করে এগিয়ে যেতে হয়৷ গাছের ডালে-ডালে অসংখ্য রক্তচোষা বাদুড় মাথা ঝুলিয়ে দোল খায়৷ মানুষ দেখলেই ঝপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, পরেশ যে ভাবে আইসক্রিম খায় সেইভাবে ঘাড় থেকে রক্ত শুষে নেয়৷’ বাকিটা আমায় আর বলতে হল না৷ অপর্ণা মাছভাজা নিয়ে ঢুকছিল—সে-ই বললে, ‘দু-একটা প্রাগৈতিহাসিক জীব যেমন ডায়নোসর, টেরোডাকটিল এখনও সেখানে আছে, তারা পরেশদা যে ভাবে মুরগির ঠ্যাঙ চিবোয় সেইভাবে আস্ত মানুষ মুখে পুরে চোখ বুজিয়ে মৌজ করে চিবিয়ে-চিবিয়ে খায়৷’ অপর্ণার হাতে ইয়া বড়-বড় মাছের দাগা দেখে পরেশের ভয় তখন অনেকটা কেটে গেছে একগাল হেসে বলল, ‘যাঃ তোরা ইয়ারকি করছিস৷ মধুপুরে তোদের বাড়ি আছে৷ কাকাবাবু তো মাঝেমধ্যেই যান, একজন মালি তো সারাবছর সেখানে থাকে৷’ অপর্ণা মাছভাজা পরিবেশন করতে-করতে বলল, ‘যাও-না, গেলেই বুঝবে কত ধানে কত চাল!’
খাওয়াটা খুব জোর হয়ে গেল৷ শুয়ে পড়তে পারলেই ভালো হয়৷ পরেশ তো এইসা খেলো, ভয় হচ্ছিল ওর পেটটা না ফেটে যায়৷ নবেন্দু ঘাবড়ে গিয়ে পরেশকে বাধা দিতে গিয়েছিল৷ পরেশ খুব করুণ গলায় বললে, ‘ভাই, বাধা দিসনি, এত সুন্দর রান্না হয়েছে নিজেকে সামলে রাখতে পারছি না৷’ অপূর্ব বললে, ‘পেট খারাপ হলে কে দেখবে!’ পরেশ ম্লান মুখে বললে, ‘ওইটা যে আমার কিছুতেই হতে চায় না রে৷ আমার পেটে যে কী আছে, খালি খিদে পায়৷ মা বলেন আমি নাকি খেয়ে-খেয়েই সংসারটাকে উচ্ছন্নে পাঠালুম৷’ পরেশ শেষে এক গেলাস জল খেয়ে একটা পেল্লায় ঢেঁকুর তুলে খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেল, কারণ নবেন্দুর বাড়িতে জোরে হাঁচা, শব্দ করে ঢেঁকুর তোলাকে অসভ্যতা বলা হয়৷ পরেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাঁচু মুখে বললে ‘চাপতে পারলুম না রে৷’ অপর্ণা সেই সময় ঘরে ছিল, হেসে বললে ‘আমাদের বাছুরটা ঠিক ওইভাবে ডাকে৷’
বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল৷ মালপত্র সব উঠে গেছে৷ গুরুজনদের প্রণাম করে আমরাও একে-একে উঠলাম৷ ঠাকুরমা দাড়ি ধরে আমাদের প্রত্যেককে চুমু খেয়ে বললেন, ‘সাবধানে থাকিস, বেশি বীরত্ব দেখাতে গিয়ে বিপদে পড়িসনি৷’ অপর্ণা দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল, ভেবেছিলুম অনেক কিছুই বলবে, কিন্তু একটা কথাও বলল না৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল শুধু, চোখ দুটো মনে হল জলে টলটল করছে৷
গাড়িটা সাবেক আমলের বেশ বড়৷ শুনেছি ইঞ্জিনটা নাকি অসাধারণ৷ কোনও শব্দ নেই, বিশ্বাসী কুকুরের মতোই দীর্ঘদিন এই পরিবারের সেবা করে আসছে৷ পিছনের সিটে আমরা চারজন, সামনে ড্রাইভারের সিটের পাশে বসেছেন প্রফুল্লদা৷ এই বাড়িতে অনেকদিন কাজ করছেন৷ বিশাল চেহারা৷ গায়ে অসুরের ক্ষমতা৷ শুনেছি এক সময় নাকি ডাকাত দলের সর্দার ছিলেন৷ এখন ভালো হয়ে গিয়ে আমাদের অভিভাবকের মতো, আমাদের বিশ্বাসী বন্ধুর মতো প্রফুল্লদা সঙ্গে চলেছেন৷ আমাদের হাওড়ায় টেনে তুলে দিয়ে আবার ফিরে আসবেন৷ গাড়িটা ছাড়ার মুখে পরেশ আর একটা বিশাল ঢেঁকুর তুলল৷ এবার আর বাছুরের ডাক নয়, অনেকটা ঝড়ের কালো মেঘের বুকে বিদ্যুতের গুরু-গুরু৷ গাড়ির স্টার্ট পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল৷ প্রফুল্লদা ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘পেটে কী পুরেছ? বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে মনে হচ্ছে!’ অপূর্ব বললে, ‘বিশেষ কিছু নয়৷ ঘাটের কাছে যে বড় রুইমাছটা ঘুরত, মাথা সমেত তার আধখানা, একবিঘে জমির ধান থেকে তৈরি চাল, আর পাঁচপোয়াটাক দই৷’ প্রফুল্লদা বললেন, ‘নিজেকে এত কষ্ট দিলে কেন?’ ‘কষ্ট!’ অপূর্ব হাসল, ‘উপায় ছিল না, ও একেবারে একমাসের রেশান লোড করে নিয়ে চলেছে৷’
গাড়ি আবার স্টার্ট নিল৷ পরেশ কোণের দিকে মুখ টিপে বসে আছে৷ আর কিছুতেই ঢেঁকুর উঠতে দেবে না৷ এবার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেলে নবেন্দু গাড়ি থেকে নামিয়ে দেবে৷ নবেন্দু সকাল থেকেই অসম্ভব গম্ভীর৷ কথা খুব কম বলছে৷ নবেন্দুকে সময়-সময়, বিশেষ করে এই রকম সময়, বয়স্ক লোকদের মতো দেখায়৷ কোথা থেকে একটা অসম্ভব ব্যক্তিত্ব ওর ওপর জাঁকিয়ে বসে৷ নবেন্দু চিরকালই একটু খেয়ালি৷ কখনও বিশাল সবুজ মাঠে সাদা-সাদা কান লোটা-লোটা ছাগলছানার সঙ্গে আপন মনে দিগবিদিক দৌড়োদৌড়ি করে খেলা করে৷ কখনও পাতার-পর-পাতা অঙ্ক কষে বই শেষ করে ফেলে৷ কখনও বসে-বসে আপন মনে ছবি আঁকে৷
দেখতে-দেখতে গাড়ি শ্যামবাজার মোড়ে এসে পড়ল৷ পরেশটা এতক্ষণ ঢুলছিল৷ সকালের শহরের ভিড়, গাড়ি, টাম, সাজানো দোকান দেখে জানলার কাচে নাক ঠেকিয়ে খাড়া হয়ে বসল৷ আমাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, ‘কাঞ্চন, এইটা কলকাতা না কি রে?’ ‘তোর কী মনে হয়?’ পরেশ কিছুক্ষণ গুম, তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘বাপস, কী ব্যাপার রে! এখানে লোকের পথ চলতে ভয় করে না?’
‘ওরা তো গ্রামের লোক নয় যে ভয় করবে, ওরা সব শহরের মানুষ৷ শহরের কায়দা কানুন সব জানে৷’
‘দিন কতক পরে আমরাও এখানে কলেজে পড়তে আসব, কী বলিস৷ বিশ্ববিদ্যালয়টা কোন দিকে রে?’
‘ওদিকে৷ সে দিকে আমরা যাব না৷’ পরেশ হঠাৎ হই-হই করে উঠল, ‘ওই দেখ কাঞ্চন, আকাশের গায়ে একটা বিশাল ক্রেন!’ এইবার মাথায় গাঁট্টা! ‘গবেট, ওটা ক্রেন নয়, ওটা হাওড়ার ব্রিজ৷’ পরেশ সামনের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে হাঁ করে ব্রিজের দিকে তাকিয়ে রইল৷
হাওড়ার পোলের ওপর আমাদের গাড়ি নাকটা ঢুকিয়েই নিশ্চল হয়ে পড়ল৷ কী ব্যাপার কে জানে! সারা পোল জুড়ে এধারে-ওধারে সারি-সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে৷ মাঝের একসার ট্রাম ঠ্যাঙ উঁচু করে স্থির৷ কারুরই কোনও যাবার গরজ নেই৷ প্রফুল্লদা সামনের জানলা দিয়ে মাথাটা বের করে একবার দেখলেন৷ কিছু বুঝতে পারলেন বলে মনে হল না৷ বরং বেশ নিশ্চিন্তে পকেট থেকে একটা গোলমতো টিনের কৌটো বের করে বিড়ি ধরালেন৷ ড্রাইভারসাহেবের পকেট থেকে বেরোল সরু চোঙা মতো একটা কৌটো, সঙ্গে চ্যাপ্টা মতো ছোট একটা বাচ্চা কৌটো৷ বড়টায় আছে দোক্তা পাতা, ছোটটায় চুন৷ হাতের তালুর ওপর দুটোকে ফেলে দলাইমলাই৷ চোখে একটা ভাবালু উদাস দৃষ্টি৷ একজন মৌজ করে বিড়ি ফুঁকছেন, অন্যজন খইনি দলছেন৷ জগৎ যেন চলতে-চলতে হঠাৎ গতি হারিয়ে ফেলেছে৷ এদিকে আমরা মনে-মনে ছটফট করছি৷ টেন ধরতে হবে৷ টেন শেষে ছেড়ে না দেয়! নবেন্দু একটু উসখুস করে জিগ্যেস করল—‘হল কী?’
ড্রাইভার সাহেব দু-আঙুলে চিমটি করে দাঁত আর ঠোঁটের ফাঁকে খইনি গুঁজে নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল—‘হুয়া কুছ’৷ প্রফুল্লদা আর একবার মাথাটা বের করলেন৷ পাশ দিয়ে এক ভদ্রলোক শরীরের চারদিকে মালপত্র ঝুলিয়ে একটি ছেলের হাত ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলেন৷ প্রফুল্লদার মুণ্ডু প্রশ্ন করল—‘কী হয়েছে মশাই?’ ভদ্রলোক গতিবেগ কিছু মাত্র না কমিয়ে অনেকটা দূর থেকে বললেন—‘গুষ্টির পিণ্ডি’৷
‘বাবা, কী মেজাজ!’ প্রফুল্লদা মাথা ঢুকিয়ে নিলেন৷
পরেশ হাঁ করে খানিক গঙ্গার হাওয়া খেয়ে বললে, ‘যাই বলিস, বেশ লাগছে কিন্তু৷’ অপূর্ব বললে, ‘তা তো লাগবেই৷ এদিকে মধুপুরের বারোটা৷ নির্ঘাত ট্রেন ফেল৷’
আমার আবার পোলটোলের ওপর বেশিক্ষণ থাকতে অস্বস্তি লাগে৷ যদি ভেঙে পড়ে যায়! বলা তো যায় না৷ আমার ভয়টা পরেশের কানে-কানে বলতেই পরেশের মুখ শুকিয়ে গেল৷ নবেন্দুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললে, ‘চল আমরা দৌড়ে ওপারে চলে যাই৷’
‘পরেশটা কী বলছে রে?’ অপূর্ব জানতে চাইল৷
‘বলছে, পোলটা যদি ভেঙে পড়ে যায়! চল আমরা দৌড়ে ওপারে চলে যাই’—আমি ভালো মানুষের মতো মুখ করে বললুম৷ পরেশকে একটু অপ্রস্তুত করার জন্যেই বললুম৷
প্রফুল্লদা ঘাড় না ঘুরিয়ে আর একটা ভয় তৈরি করে ফেললেন, ‘পোলের ওপর দৌড়োবে! বলো কি? দৌড়োলেই পুলিশে ধরবে৷ পোলের ওপর দৌড়াদৌড়ি চলে না, বুজেছ? এটা তোমার গ্রামের সাঁকো নয়, এর নাম হাওড়ার পোল৷’
নবেন্দু বাঁ-দিকের দরজা খুলে রাস্তায় নেমে ফুটপাতের ওপর উঠে দাঁড়াল৷ বেশ চিন্তিত৷ সত্যিই চিন্তার কথা৷ আধঘণ্টা হয়ে গেল৷ উলটোদিক থেকে এক ভদ্রলোক আসছিলেন বেশ ধীরে সুস্থে বেড়াতে-বেড়াতে৷ গায়ে ঢোলা পাঞ্জাবি, মুখে বিশাল চুরুট৷ নবেন্দু বেশ বিনীত ভাবে জিগ্যেস করল, ‘ব্যাপারটা কী?’ ভদ্রলোক মুখ দিয়ে চিমনির মতো ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—‘গরু’৷
নবেন্দুর ফরসা মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠল৷ ‘গরু মানে? ভদ্রভাবে একটা প্রশ্ন করলুম আর আপনি আমাকে গরু বললেন! হোয়াট ডু ইউ মিন!’ দলবল আমরা তখন রাস্তায় নেমে পড়েছি৷ মাথায় থাক মধুপুর৷ আমাদের দলনায়কের প্রেসটিজ নিয়ে টানাটানি! থাক-না মুখে চুরুট৷ হোক না ভারিক্কি চেহারা৷ তা বলে যাকে তাকে গরু বলে সরে পড়বেন বিনা কারণে, এ কেমন কথা! হয়ে যাক এক হাত৷ তারপর দেখা যাবে টেন প্ল্যাটফর্মে শেষ পর্যন্ত আমাদের জন্য রইল কি গেল৷
ভদ্রলোক উলটোদিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিলেন, নবেন্দুর চ্যালেঞ্জে ফিরে এলেন৷ মুখের চুরুটে অনর্গল ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ নবেন্দুর দিকে হাসি-হাসি মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘নবেন্দু না! আমাদের পরেশবাবুর ছেলে৷ প্রথমে চিনতে পারিনি, তারপর মনে হল গলাটা চেনা-চেনা লাগছে৷ তুমি কত বড় হয়ে গেছ হে!’ আমরাও যেমন অবাক নবেন্দুও তার চেয়ে কম নয়৷ কে এই ভদ্রলোক! আমরা আস্তিন গুটিয়েছিলুম৷ আবার নামিয়ে নিলুম৷ ভদ্রলোক তখন হো-হো করে হাসছেন, ‘চিনতে পারলে না তো?’ নবেন্দু চিনতে পেরেছে বলে মনে হল না৷ আমরা তো চিনিই না৷ ভদ্রলোক চুরুটটা মুখে পুরতে-পুরতে বললেন, ‘চিনলে না তো! আমি পার্থর বাবা৷’ নবেন্দুর মারমুখী ভাবটা সঙ্গে-সঙ্গে অদৃশ্য হল৷ টপ করে নিচু হয়ে ভদ্রলোককে নমস্কার করে উঠে দাঁড়াতেই তিনি নবেন্দুকে তাঁর ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতিতে জড়িয়ে ধরে গদগদ গলায় বললেন, ‘ব্রেভ বয়’৷ আমরাও নবেন্দুর দেখাদেখি টপাটপ নমস্কার করে ফেললুম৷ ‘তোমার দলবল? আরে ওই দেখো৷’ ভদ্রলোকের কথায় আমরা তাকিয়ে দেখলুম৷ হাওড়ার দিক থেকে পালে-পালে গরু কলকাতার দিকে এগিয়ে আসছে৷ একটা আধটা নয়, প্রায় শ’দুয়েক৷ ‘গরু’ বলার অর্থ এতক্ষণে আমাদের কাছে স্পষ্ট হল! এত গরু ছিল কোথায়! এল কোথা থেকে! নবেন্দু অবাক হয়ে বলল, ‘এত গরু ছিল কোথায়?’
পাঞ্জাবে ছিল৷ এসেছে আজ সকালে৷ চলেছে কলকাতার খাটালে৷ এক-একটা গরু মিনিমাম ২০ লিটার দুধ দেবে দিনে৷
‘ও, এই জন্যেই সব রাস্তা ঘাট বন্ধ!’ নবেন্দু মনে হল এতক্ষণে বুঝেছে৷
‘যাকগে, তোমরা চলেছ কোথায় সদলবলে?’
নবেন্দু হেসে বলল, ‘কয়েকদিনের জন্যে মধুপুরে যাচ্ছি মেসোমশাই৷
‘আই সি! মধুপুর ভালো জায়গা হে৷ ওঃ, সেই কত কাল আগে গিয়েছিলুম!’ মেসোমশাইয়ের চোখ দুটো কীরকম স্বপ্নময় হয়ে এল মধুপুরের নামে৷
‘তোমার বাবা কেমন আছেন নবেন্দু?’
‘ভালো আছেন৷’ নবেন্দু একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল৷ বোধহয় ট্রেনের কথা মনে পড়েছে৷ এ ট্রেনটা যে আমরা ধরতে পারব না, ঘড়ি অন্তত তাই বলছে৷ পরে আর কী ট্রেন আছে জানি না৷
‘তোমাদের ট্রেন কটায়?’ ভদ্রলোক নেভা চুরুটটা দেশলাই দিয়ে ধরাতে-ধরাতে প্রশ্ন করলেন৷ নবেন্দু সময়টা বলতেই পাঞ্জাবির হাতা উলটে ভদ্রলোক সময় দেখলেন৷ ‘আর বেশি সময় নেই৷ তোমরা বরং গাড়ি ছেড়ে কুইক মার্চ করে চলে যাও৷ এছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷ এই জ্যাম ক্লিয়ার হতে সময় নেবে৷’ পরেশটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে গঙ্গা দেখছিল৷ কুইক মার্চ শব্দটা তার কানে যেতেই করুণ মুখে এগিয়ে এল, ‘মালপত্তরের কী হবে মেসোমশাই?’
‘মালপত্তর?’ পরেশের দিকে তাকিয়ে মেসোমশাই সহজ গলায় হেসে-হেসে বললেন, ‘ইয়ং ম্যান, ট্রেন যদি ধরতে চাও, মাল মাথায় করে দৌড় লাগাও স্টেশনের দিকে, নো আদার অলটারনেটিভ৷’ পরেশের মুখ দেখে মনে হল কেঁদে ফেলবে৷ বেশ আয়েশ করে ঘুমোতে-ঘুমোতে আসছিল৷ এ কী মহাবিপদ! শ’খানেক গরু আমাদের সুখ গুঁতিয়ে ফেলে দিয়েছে৷ এখন জগদ্দল মাথায় দৌড়োতে হবে৷ আমাদের কারুরই এই পরিণতি ভালো লাগছিল না৷ একটু-আধটু মাল নয়৷ মালের হিমালয় ঠাসা আছে গাড়ির বুকে, আমাদের পায়ের কাছে৷ এর চেয়ে গাড়ি মাথায় করে দৌড়োনো অনেক সহজ৷
নবেন্দুকেও বেশ চিন্তিত দেখাল৷ সেও বোধহয় একই কথা ভাবছে৷ ভদ্রলোক তাড়া দিলেন, ‘নাও-নাও গেট রেডি, আমি তোমাদের স্টার্ট করিয়ে দিয়ে যাব৷ জানো, আমি একজন ভালো স্টার্টার৷ হাওড়ায় যেখানে যত স্পোর্টস হয় সব জায়গায় আমি৷’ হঠাৎ গলা চড়িয়ে বললেন, ‘রেডি গেট সেট গোও-ও৷’ আমরা কেউই দৌড়োলুম না৷ নন স্টার্টার হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম৷
টর্পেডোর মতো চুরুটটা মুখ থেকে বের করে, ছাইটাই ঝেড়ে পরিষ্কার করে মেসোমশাই একটা খালি দেশলাই বাক্সে ভরে ফেলে বললেন, ‘তোমাদের দৌড় শুরু করে দিয়ে আমি এই গাড়িটা নিয়েই অফিসে চলে যাব৷ বেশি দূরে নয়—এই জি পি ও-তে! তোমাদের সঙ্গে কথায়-কথায় ভীষণ দেরি হয়ে গেছে৷’
আমরা তখন মহা দ্বিধায় পড়েছি৷ কী যে করা উচিত ঠিক করতে পারছি না৷ নবেন্দুর কাছ থেকেও কোনও নির্দেশ নেই৷ এমন সময় কানে এল সেই ঘণ্টার শব্দ৷ দূর থেকে কাছে এগিয়ে আসছে ক্রমশ৷ দমকল একটা নয় পরপর দুটো৷ কলকাতা থেকে হাওড়ার দিকে ছুটছে ঘণ্টা বাজাতে-বাজাতে৷
দূর থেকে দমকলের ঘণ্টা শুনেই প্রফুল্লদা ড্রাইভারের সিটের পাশে বসেই চিৎকার করে উঠলেন—‘কুইক! ঝটপট সব ঢুকে পড়ো এই সুযোগ, দমকলের পিছনে-পিছনে আমরা বেরিয়ে পড়ব, তা না হলে তোমাদের ট্রেন ধরার বারোটা৷’ আমরা পড়ি কি মরি করে গাড়িতে ঢুকে পড়লুম৷ পরেশটা চিরকালের ল্যাদাড়ুস৷ গাড়ির চালটা যে নিচু হয় একথা বোধহয় তেড়ে-ফুঁড়ে ঢোকার সময় ভুলেই গিয়েছিল৷ মনে পড়ল ধাঁই করে মাথাটা ঠুকে যাবার পর৷ কপালটা দেখতে-দেখতে ছোট নতুন আলুর মতো ফুলে উঠল৷ নবেন্দু বললে, ‘ঠিক হয়েছে, লাগতে-লাগতে যদি একটু আক্কেল হয়৷’ পরেশের চোখে তখন জল এসে গেছে৷
আমাদের ড্রাইভার প্রফুল্লদার চেয়েও ওস্তাদ৷ দমকলটা গাড়ি আর গরুর জটিল জট ফুঁড়ে বেরোতেই স্টার্ট নিয়ে পিছু ধাওয়া করল৷ যে লোকটি দমকলের ঘণ্টা বাজাচ্ছিল সে যেতে-যেতে আমাদের একটা দাবড়ানি দিল৷ আমরা তখন মরিয়া৷ দু-পক্ষের তাড়া৷ দমকল চলেছে আগুন নেভাতে, আমরা চলেছি ট্রেন ধরতে৷ ইতিমধ্যে আর একটা দমকল তেড়ে এসেছে৷ প্রচণ্ড ঘণ্টার আওয়াজে গরুগুলো তাদের পরিচালকের হাতছাড়া হয়ে এলোপাথাড়ি ছুটতে শুরু করেছে৷ একজন ট্রাফিক পুলিশ দৌড়ে আসছিল আমাদের গাড়িটাকে দুটো দমকলের মাঝখান থেকে টেনে বের করে দিতে, কিন্তু সুবিধে করতে পারল না৷ বিশাল একটা গরুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, হেই রাম বলে ছিটকে পড়ে গেল৷ দুটো গাড়ির মাঝখানে স্যান্ডউইচ হয়ে আমরা এঁকে-বেঁকে এগিয়ে চললুম৷ প্রফুল্লদার ঠোঁটের বিড়ি উত্তেজনায় টানতে ভুলে গিয়ে নিভে গেছে৷ আমাদের শুনিয়ে-শুনিয়ে বললেন, ‘একে পুরোনো গাড়ি, একবার স্টার্ট বন্ধ হলেই পিছনের গাড়িটা আমাদের ছাতু করে দিয়ে চলে যাবে৷ কোনও কেসই হবে না৷’ সকলের মুখ শুকিয়ে গেল৷ পরেশ দেখি আমার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে৷ ভয়ে তার কপালের যন্ত্রণা ভুলে গেছে৷ ফোলাটাও যেন চুপসে গেছে৷ ভেবেছিলুম, বেশ বড় সাইজের একটা নৈনিতাল আলু হবে৷ তা আর হল না!
হাওড়া স্টেশন
সবার আগে প্রফুল্লদা৷ ডান হাতে ঝুলছে সেই ম্যাগনাম সাইজের হোলডল, যার মধ্যে কি না আছে! খুঁজলে বিশল্যকরণীও পাওয়া যাবে হয়তো৷ শক্তি বটে একখানা! ওই অতবড় একটা ওজনদার জিনিস এমন অক্লেশে বয়ে নিয়ে চলেছেন যেন ছোটদের একটা বই রাখার সুটকেস৷ প্রফুল্লদার পিছনে-পিছনে আমরাও ছুটছি৷ ট্রেন ছাড়তে আর মিনিট তিনেক বাকি আছে৷ প্রথমে আমাদের বলেছিল আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে৷ এখন মাইকে ঝাঁ-ঝাঁ করে বলছে ১২ নম্বর থেকে ছাড়বে৷ আমরা ছুটছিলুম আটের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাস এখন মুখ ঘুরিয়ে আবার বারোর দিকে৷ সারাটা স্টেশনে যেন তোলপাড় কাণ্ড৷ প্রফুল্লদার পিছনে নবেন্দু, তার পিছনে আমরা৷ সবার শেষে পরেশ৷ একে সে বেচারা প্রচুর খেয়েছে৷ তারপর গাড়িতে বসে-বসে বোধহয় একটু ঘুমিয়েছে৷ পরেশ যেন আর নড়তেই পারে না৷ তার ওপর হাতে একটা বালতি৷ বালতির মধ্যে একটা কেরোসিন স্টোভ, তেলের বোতল, সুতুলি দিয়ে ঠেসে টাইট করে বসানো৷ দলবল তখন বারো নম্বরে ঢোকার গেটের কাছে এসে গেছে৷ ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে—আমরা দেখতে পাচ্ছি৷ এমন সময় আমাদের ল্যাজের দিকে একটা হই-চই শুনতে পেলুম৷ সেইসঙ্গে পরেশের গলা৷ পরেশ করুণ সুরে বলছে, ‘আমি কী করব বলুন! আমার কী দোষ বলুন! সঙ্গে একটা হেঁড়ে গলা, ‘তুমি কী করবে? তোমার কী দোষ? ইডিয়েট, তুমি দেখে চলতে পারো না!’ পিছন ফিরে ঘটনা দেখে আমাদের চক্ষুস্থির৷ পরেশের হাতের বালতি প্ল্যাটফর্মে গড়াগড়ি যাচ্ছে৷ কেরোসিনের বোতলটা গড়াচ্ছে৷ ভাগ্য ভালো ভাঙেনি৷ কিছু দূরে মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে একটা খাঁচা৷ দরজাটা খোলা৷ গোটা দশেক গিনিপিগ দৌড়োদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে৷ অসহায়ের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন খাঁচার মালিক৷ লম্বা চওড়া এক মানুষ৷ পরনে কালো সুট, টাই৷ ঘাড় অবধি লম্বা-লম্বা চুল৷ ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি৷ চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা৷ গিনিপিগগুলো এদিক ওদিক দৌড়োতে-দৌড়োতে ক্রমশই দূরে চলে যাচ্ছে৷ একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে মার হাত ছাড়িয়ে একটা গিনিপিগের পিছনে হই-চই করে ছুটে চলেছে৷ মা ছুটছেন মেয়ের পিছনে—‘ডলি-ডলি, চলে আয় বলছি, চলে আয় দুষ্টু মেয়ে৷’ এক ভদ্রলোক হুইলারের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন দেখছিলেন৷ এক হাতে ধরা ছিল চেনে বাঁধা একটা বড় সাইজের কুকুর৷ ভদ্রলোক তন্ময় হয়ে বই দেখছিলেন৷ কুকুরটা দেখছিল ছুটন্ত গিনিপিগ৷ কাছাকাছি আসতেই ভৌ-ও বলে বিশাল এক লাফ মারল৷ আচমকা লাফের জন্যে কুকুরের মালিক প্রস্তুত ছিলেন না৷ তিনি চিৎপাত হয়ে উলটে পড়লেন৷ কুকুর হাতছাড়া হয়ে চেন সমেত সারা প্ল্যাটফর্মে দাপাদাপি শুরু করে দিল৷ এই হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে এক বুড়ি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ভদ্রমহিলা চিলের মতো গলায় চিৎকার শুরু করলেন ‘পুলিশ, পুলিশ’৷ একজন ফাদার আসছিলেন ঝুলো গাউন পরে লম্বা-লম্বা পা ফেলে৷ এক হাতে ধরা সোনালি বাইবেল৷ কুকুরের তাড়া খেয়ে একটা গিনিপিগ তার কোট কামড়ে ধরে ঝুলছে৷ ফাদার দাঁড়িয়ে পড়ে বুকে ক্রশ আঁকছেন আর আমেন-আমেন বলছেন৷
ফ্রেঞ্চকাট ভদ্রলোক রেগে খাঁচাটায় এক লাথি মেরে আশেপাশে ছড়ানো জনসাধারণের দিকে তাকিয়ে অনেকটা বিবাদী পক্ষের উকিলের গলায় বললেন, ‘এই সব উটমুখো জানোয়ারগুলো স্টেশনে ছাড়া পায় কী করে?’ এ প্রশ্নের কে জবাব দেবে! টিকিট কাটলেই স্টেশনে ঢোকা যায়৷ যে কেউ ঢুকতে পারে৷ পরেশ এতক্ষণ মাথা নিচু করে অপমান হজম করছিল৷ জানোয়ার বলায় তার সুপ্ত পৌরুষ এবার জেগে উঠল৷ জনতার আদালতের দিকে তাকিয়ে সেও এইবার তার প্রশ্ন রাখল, এই সব চিড়িয়াখানা নিয়ে স্টেশনে আসার কী দরকার ছিল! এত বড় একটা খাঁচা নিয়ে সকলকে খোঁচাতে-খোঁচাতে উনিই বা কেন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটলেন!’ টেন ধরার আশা তখন আমরা ছেড়েই দিয়েছি৷ গার্ডসাহেবের হুইসিল বেজে লাল পতাকা নড়ে গেছে৷ পরেশের মুক্তির জন্যে আমরা এগিয়ে গেলুম৷ বেচারা মহা ফ্যাসাদে পড়েছে৷ নবেন্দু বললে, ‘যা হওয়ার তা হয়ে গেছে৷ এখন যা হোক একটা কিছু করা দরকার৷ ট্রেনটাও আমরা ফেল করেছি৷’ ‘ট্রেন!’ ভদ্রলোক তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলেন, ‘সর্বনাশ, আমিও যে ওই ট্রেনে যাব৷ কার হুকুমে ট্রেন ছেড়ে গেল?’ ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বলে উঠলেন, ‘গার্ডসাহেবের হুকুমে৷’ ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন ‘স্টপ ইট৷’ যিনি আগের উত্তরটা দিয়েছিলেন তিনি ততোধিক জোরে বললেন, ‘ইয়েস স্যার৷’ জনতা হই-হই করে হেসে উঠল৷
ফাদার এইবার ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন৷ তাঁর সাদা গাউনের বুকে নিশ্চিন্ত আরামে লেপ্টে আছে একটা গিনিপিগ৷ জুলজুলে চোখে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আছে৷ ‘বাবু, ইজ দিস ইওরস?’ ফ্রেঞ্চকাট ভদ্রলোক কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘থ্রো ইট৷ ফেলে দিন৷ দূর করে ফেলে দিন৷’ ফাদারের মুখে সেই মিষ্টি হাসি৷ যিশুর মুখের হাসির মতো৷ ‘বাবু, হোয়াই ইউ আর সো অ্যাংরি! ও তো রাগতে নেই৷ রাগ আমাদের এনিমি আছে৷ আমি একটাকে উদ্ধার করিয়েছি৷ বাট দেয়ার আর সো মেনি অফ দেম৷’ ভদ্রলোক কিছুই করতে চাইছেন না দেখে, আমি খাঁচাটা সোজা করে ফাদারের হাত থেকে গিনিপিগটা নিতে গেলুম৷ সে বেটা কি সহজে আসতে চায়! ফাদারের বুক আঁকড়ে মজাসে পড়ে আছে৷ জোর করে ছাড়িয়ে আনলুম৷ খচমচ করে হাতে একটু আঁচড়ে দিলে৷ কোনওরকমে খাঁচায় ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলুম৷ খাঁচার দরজাটা ডিফেকটিভ৷ সহজে বন্ধ হতে চায় না৷ বন্ধ হলেও ছিটকিনিটা ঠিকমতো আটকানো যায় না৷ নবেন্দু খুব ভদ্রভাবে জিগ্যেস করল, ‘ক’টা ছিল?’ ভদ্রলোক তখনও বেশ রেগে আছেন৷ বললেন, ‘জানি না৷’
‘জানি না বললে তো চলবে না, জিনিসটা কার, মালটা কার ছিল?’ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন রেলওয়ে প্রোটেকশান ফোর্সের একজন অফিসার৷ ‘সারা স্টেশনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে৷ একজন ভদ্রমহিলা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন৷ কে এ-কাজ করেছে? ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারাটা মনে আসছে না, কত নম্বর ধারা—কত নম্বর ধারা, ধ্যুত-তেরি মনে আসছে না৷’ ভদ্রলোক বার কয়েক মাথার টুপিটা তুললেন আবার বসালেন৷ ‘ধারাটা আমার এখন ঠিক মনে আসছে না, মনে না এলেও ধারাটা নেই এমন মনে করার কোনও কারণ নেই৷ রেলওয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আছেন, তিনি বুঝবেন কত নম্বর ধারায় অপরাধীকে সাজা দেবেন৷ আমার কাজ অপরাধীকে অ্যারেস্ট করা৷’ প্রোটেকশান ফোর্সের অফিসার বুক ফুলিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ গিনিপিগের মালিকও কিন্তু কম যান না৷ তিনি এতটুকু ভয় পেলেন না৷ ইংরেজিতে বললেন, ‘হু আর ইউ? আমি যাকে তাকে আমার কাজের কৈফিয়ত দিই না, আমি তার সঙ্গেই কথা বলব হু ইজ নট বিলো দ্য রাঙ্ক অফ এ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট৷’ অফিসার একটু ঘাবড়ে গেলেন৷ ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট এখন বাড়িতে ভাত খেতে গেছেন৷ খাওয়ার পর তিনি একটু ঘুমোবেন, তারপর তিনটে নাগাদ আসবেন৷ আপনি কি বলতে চান ততক্ষণ এই জন্তুগুলো সারা প্লাটফর্মে ঘুরে বেড়াবে! একটা তো সুপারিনটেনডেন্টের ঘরে ঢুকে তাঁর চায়ের কাপ উলটে দিয়েছে৷’ ভদ্রলোকের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, কুকুরের চিৎকারে স্টেশন ফেটে যাওয়ার উপক্রম, সেইসঙ্গে একটা অসহায় মানুষের চিৎকার—‘টম, নো টম, যাঃ খেয়ে ফেলেছে’৷ সকলের নজর বইয়ের স্টলটার দিকে চলে গেল৷ কুকুরের মালিক ধুলো ঝেড়ে উঠছেন কিন্তু কুকুরটাকে সামলাতে পারছেন না৷ কুকুরটা জিভ দিয়ে মুখ চাটছে৷ গোঁফের কাছে সাদা-সাদা লোম৷ একটা গিনিপিগ সাবাড় করে আর একটাকে ধরার জন্য চেন ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে৷ ভদ্রলোক অসহায়ের মতো চিৎকার করছেন, ‘টম, নো নো, হেল্প, হেল্প৷’ কে হেল্প করবে!
আমাদের আশেপাশে যে ভিড় জমেছিল, সেই ভিড়ে কিছু পুরোনো লোক চলে যাচ্ছেন এবং অনবরতই কিছু নতুন লোক এসে জমছেন৷ ফলে জটলার আকৃতি সেই একই থেকে যাচ্ছে৷ বরং যাঁরা নতুন এসে জমছেন তাঁদের একপ্রস্থ ব্যাপারটা গোড়া থেকে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে৷ সে দায়িত্বটা অবশ্য একজনই নিয়েছে৷ সে হল স্টেশনের একজন উর্দিপরা পোর্টার৷ নবেন্দু এতক্ষণ ঘটনার দ্রুত পটপরিবর্তনের সঙ্গে তাল রাখতে না পেরেই বোধহয় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল৷ এইবার সে নাম ভূমিকায় অবতীর্ণ হল৷ গিনিপিগের মালিকের সামনাসামনি এগিয়ে এসে বললে—‘কি ছেলেমানুষি করছেন! একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে৷ সারাদিন নিশ্চয়ই এইভাবে আমরা সঙের মতো দাঁড়িয়ে থাকব না!’ ফ্রেঞ্চকাট ভদ্রলোক মনে হল একটু নরম হয়েছেন, বললেন, ‘কী করবে? এত বড় স্টেশনে কোথায় কোনটা কোন ঘুপচির মধ্যে ঢুকে গেছে, কে বার করবে শুনি?’ ‘কেন, আমরা সকলে মিলে৷ ফাদার একটাকে ধরে এনেছেন৷ সেটা এখন খাঁচায়৷ একটাকে কুকুরে খেয়েছে৷ এখন বলুন, আর ক’টা আছে?’ নবেন্দু হিসেব চাইল৷ ভদ্রলোক লাফিয়ে উঠলেন, ‘যাঃ কুকুরে খেয়ে গেল! কার কুকুর, কোথাকার কুকুর?’
নবেন্দু ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরের মালিককে দেখিয়ে দিল৷ ভদ্রলোকের তখন পরিত্রাহি অবস্থা৷ তিনি কুকুরের মালিক না কুকুর তাঁর মালিক বোঝাই দায়৷ ফ্রেঞ্চকাট ভদ্রলোক লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন৷ কুকুর থেকে একটু সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কী আনট্রেনড, আনসিভিলাইজড কুকুর মশাই আপনার? কুকুরধারী চেনটাকে আঁকড়ে ধরে বললেন, ‘তাতে আপনার কী মশাই? আপনার পাকা ধানে মই দিয়েছে কি?’
‘নিশ্চয়ই দিয়েছে, তা না হলে বলব কেন? আমি যেচে কারুর সঙ্গে কথা বলি না, বুঝেছেন৷’
‘আমার কুকুর কী করেছে আপনার৷’
‘আমার রিসার্চ গিনিপিগ খেয়ে ফেলেছে৷’
‘কোনও প্রমাণ আছে?’
‘নিশ্চয়ই আছে৷ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আছে৷ তা ছাড়া, ওই তো সারা মুখে সাদা-সাদা লোম লেগে আছে৷ বত্রিশ টাকা আটচল্লিশ পয়সা আগে ছাড়ুন, একটা গিনিপিগের দাম, তারপর লম্বা চওড়া বাত ছাড়ুন৷ বুঝেছেন!’
‘একটা গিনিপিগের দাম আটচল্লিশ টাকা বত্রিশ পয়সা, বলেন কি মশাই! কোথাকার গিনিপিগ? অস্ট্রেলিয়ার?’ কুকুরের আচমকা হেঁচকা টানে পড়ে যেতে-যেতে সামলে নিয়ে ব্যঙ্গের সুরে ভদ্রলোক বললেন৷
‘কানে কম শোনেন না কি মগজে গ্রেম্যাটার্সের অভাব হয়েছে? আটচল্লিশ টাকা বত্রিশ পয়সা নয়, বত্রিশ টাকা আটচল্লিশ পয়সা৷’
‘ওই হল মশাই, একটু গুলিয়ে ফেলেছিলুম৷ বড়-বড় লোকেদের ওইরকম একটু-আধটু ভুল হয়েই থাকে, তাদের মাথায় সবসময় বড়-বড় চিন্তা পাক খায়৷ আইনস্টাইনের কথা শোনেননি?’
আইনস্টাইন আর আপনি! হাসালেন মশাই৷ আপনি আমার চেয়েও বড়! আমার নাম জানেন? আমার নাম ডক্টর ল্যাং৷’ নিজের নাম ঘোষণা করে ভদ্রলোক বেশ গর্বের সঙ্গে ভিড়ের দিকে তাকালেন৷ ভিড়টা ইতিমধ্যে আগের জায়গা থেকে এদিকে সরে এসেছে৷ নামটা কুকুরের মালিককে এতটুকু সমীহ করে তুলেছে বলে মনে হল না৷ তিনি আগের মতোই বেপরোয়া ভাবে বললেন, ‘ডক্টর ল্যাং! জীবনে এরকম নাম শুনিনি৷ কীসের ডাক্তার! ঘোড়ার? হর্স ডক্টর!’ ল্যাং সাহেব একটু আহত হলেন৷ হাত দিয়ে টাইটা চেপে ধরে বললেন, ‘কীসের ডাক্তার আর ঘণ্টাখানেক পরেই বুঝতে পারবেন৷’ একটা রহস্যের আভাস দিয়ে ডক্টর ল্যাং নবেন্দুকে বললেন, ‘চলো মাস্টার বাকিগুলোকে উদ্ধার করে আনি বিফোর ইট ইজ টু লেট৷’ ডক্টর ল্যাঙের সঙ্গে আমরা একটু এগিয়ে যেতেই কুকুরের মালিক ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এক ঘণ্টা পরে কী হবে?’ ‘এক ঘণ্টা পরেই বুঝতে পারবেন৷ তখন আপনার ওই ডাঁট চুপসে যাবে৷ তখনই বুঝতে পারবেন ডক্টর ল্যাং কে!’
কুকুরের মালিক একটু এগিয়ে এসে বেশ সমীহ করে বললেন, ‘বলুন না স্যার কী হবে? আমি আবার সাসপেন্সে থাকতে পারি না, পেট ফোলে৷ এটা আমার ছেলেবেলার রোগ৷ তখন কত আর বয়স আমার, এই এদের মতোই হবে, অবাধ্যতা করেছিলুম বলে আমার ফাদার রায়বাহাদুর হরিশঙ্কর রায় আমাকে সারারাত আমাদের নির্জন বাগানবাড়ির চিলেকোঠায় বন্ধ করে রেখেছিলেন৷ লোকে বলত বাড়িটা ভূতের বাড়ি৷ উঃ, ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়, এই দেখুন এত বছর পরেও৷’ ভদ্রলোক বাঁ-হাতটা এগিয়ে দিলেন৷
ডক্টর ল্যাং হাতটার দিকে তাকালেনও না, ভুরু দুটো ধনুকের মতো বাঁকিয়ে বললেন, ‘ও গল্প! স্টোরি! আপনার গল্প শোনার মতো সময় আমার নেই৷ আমার এক সেকেন্ড সময়ের দাম কত অনুমান করতে পারেন?’ ‘অনেক দাম স্যার৷ আমি প্রতিবাদ করছি না স্যার৷ কেবল দয়া করে বলে যান একঘণ্টা পরে কী হবে? ডক্টর ল্যাঙের মুখে চিন্তার ছায়া পড়ল৷ নবেন্দুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নাম কী?’
‘নবেন্দু৷’
‘আই সি৷ নবেন্দু, বলেই দিই একঘণ্টা পরে কী হবে, কী বলো?’ নবেন্দু উত্তর দেওয়ার আগেই আমরা সমস্বরে বললুম, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেই দিন৷ আমাদেরও ভেতরটা কেমন-কেমন করছে৷
ডক্টর ল্যাং প্যান্টের পকেটে হাত দুটো ঢুকিয়ে শরীরটা টান-টান করে ভারিক্কি চালে বললেন, ‘শুনুন, দিস ডগ, আপনার এই বাঁদর কুকুরটা একটা গিনিপিগ খেয়েছে৷ এরা সকলেই দেখেছে৷ আপনি অবশ্য দাম দেবার ভয়ে অস্বীকার করেছেন৷ আপনার স্বীকার-অস্বীকারে আমার ঘণ্টাটি, বুঝেছেন! ফলেন পরিচয়তে৷ ওই গিনিপিগটাকে হাই ডোজে হরমোন ইঞ্জেকশন করা আছে, বুঝেছেন! যেটা আপনার গাধা কুকুরটা খেয়েছে৷ অবশ্য কুকুরের আর দোষ কী বলুন৷ ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে—কুকুরকে দেখে তার প্রভুকে চেনা যায়! রায়বাহাদুরের বংশধরদের কী অবস্থা তা আমার জানা আছে৷’
‘ঠিক বলেছেন স্যার৷’ ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখ করে ডক্টর ল্যাং-এর দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ ডক্টর ল্যাং তাঁর বেদনার মুখটা উসকে দিতেই ভদ্রলোকের এতক্ষণের অহংকারের আলখাল্লাটা যেন নিমেষে পায়ের তলায় খুলে পড়ল৷ অনেকটা আত্মগতভাবেই বললেন ‘কী অবস্থা দেখুন আমার, বাবা মারা যাবার পর সেই ভূতুড়ে বাগান বাড়িটা রেখে গেলেন, তাও আবার তিনবার মর্টগেজ করা৷ আর রেখে গেলেন তেরপলের চালওলা একটা পুরোনো গাড়ি৷ সেটার চালে এখন ছত্রিশটা ফুটো৷ আর এই কুকুরটা৷ বাবার আমলে এটা মাসে তিনশো টাকা খেত, এখন দশ টাকায় ম্যানেজ করতে হয়৷ কতদিন মাংসের মুখ দেখেনি৷ আলোচালের ভাত খেয়ে-খেয়ে ওর স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে৷ কতদিন পরে আজ একটু মাংসের মুখ দেখল!
‘সেই মাংসই ওর কাল হবে৷ কড়া ডোজের হরমোনে ও ঘণ্টাখানেক পর থেকেই ফুলতে থাকবে, আকৃতিতে বাড়তে-বাড়তে এখনকার চেয়ে একশোগুণ হয়ে যাবে, চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলবে৷ শার্লক হোমসের হাউন্ডস অফ বাস্কারভিল পড়েছেন?’ ভদ্রলোক অসহায়ের মতো মুখ করে বললেন, ‘ইংরেজি পড়তে জানি না৷ ছেলেবেলাটা বাড়ির বড় ছাদে ঘুড়ি উড়িয়ে কাটিয়েছি৷ আর একটু বড় হয়ে কেবল সিনেমা আর থিয়েটার দেখে কাটিয়েছি৷ আহা সে কী সব অভিনেতা আর অভিনয়, দুর্গাদাস, শিশির ভাদুড়ি, অর্ধেন্দু শেখর, নরেশচন্দ্র, অপরেশ মুখোপাধ্যায়৷’
‘ছি-ছি’—ডক্টর ল্যাং ছি-ছি করে উঠলেন৷ ‘জীবনটা এইভাবে নষ্ট করেছেন! যাক, আর দুঃখের কিছু রইল না৷ এই কুকুরটাই আপনাকে উদ্ধার করে দেবে৷ হাড় মাংস সমেত প্রথমে আপনাকেই জলযোগ করবে৷ তারপর চেনফেন ছিঁড়ে পাড়ায় বেরিয়ে পড়ে, যাকে পাবে তাকে খাবে৷ তারপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মিলিটারি ডেকে গুলি করে মারার চেষ্টা করবে৷ ভাবনার কিছু নেই৷ চলো নবেন্দু৷’ ডক্টর ল্যাং এগোতে শুরু করলেন৷ আমরা তাঁর পিছনে৷ কুকুরের চেন ধরে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রইলেন৷ ভয়ে মুখটা ছাইয়ের মতো সাদা৷
‘চলো এবার৷’ ডাঃ ল্যাং নবেন্দুর কাঁধে হাত রাখলেন৷ প্রত্যেকটা গিনিপিগ এক-এক ধরনের মারাত্মক রোগজীবাণু নিয়ে ঘুরছে৷ কারুকে কামড়ে দিলে মহা মুশকিল হবে৷ নবেন্দু আর ডাঃ ল্যাং হাতখানেক এগোতেই আর পি এফ-এর অফিসার বাধা দিলেন, ‘যাচ্ছেন কোথায়? আপনাকে তো আমি অ্যারেস্ট করেছি৷’ ‘অ্যারেস্ট!’ ডাঃ ল্যাং থেমে পড়ে ভ্রূ দুটোকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন৷ নবেন্দুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলে কী নবেন্দু এই পেটি অফিসার, অ্যারেস্ট করবে ডাঃ ল্যাংকে! এত বড় শক্তি এই ক্যারিকেচার অফ এ পুলিশ ম্যানের৷ দেখা যাক কার শক্তি বেশি৷’ চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে ডাঃ ল্যাং রুখে দাঁড়ালেন৷
নবেন্দু আর আমরা দলবল চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইলুম৷ কী হবে বোঝা যাচ্ছে না৷ কার শক্তি যে বেশি! ডাঃ ল্যাঙের পুরো পরিচয় তো জানি না৷ পুলিশের শক্তি আমরা জানি৷ পুলিশের কেরামতি আমাদের পাড়ায় কয়েকবার দেখেছি৷ ঘাড়ে রদ্দা মেরে, পেটে রুলের গুঁতো মেরে বাঘা-বাঘা আসামিকে নিমেষে ঘায়েল করা কোনও একটা ব্যাপারই নয়৷ তারপরই তো আসামির বাড়ানো দুটো হাতে ক্ল্যাং করে দুটো লোহার বালা ঢুকে যাবে৷ কোমরে জড়িয়ে যাবে মোটা একটা কাছি৷ তারপর! তারপর ভাবতেও হাসি পায়, ডাঃ ল্যাং আগে-আগে চলবেন, পিছনে হাতে দড়ি ধরে ওই পুলিশের অফিসার৷ প্রফুল্লদা একবার নবেন্দুদের একটা গরুকে এই ভাবে খোঁয়াড় থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন৷
ডাঃ ল্যাঙের হাত তখনও নবেন্দুর কাঁধে৷ ঠোঁটে ঝুলছে মস্ত একটা টোব্যাকো পাইপ৷ ধোঁয়া বেরোচ্ছে না৷ নিভে গেছে বোধ হয়৷ ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘চলো৷ দেখি হতভাগাগুলো কোথায় আছে৷’ পুলিশ অফিসার এতক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ ডাক্তারের বোলচালে বোধহয় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন৷ এইবার ডাক্তার এগোতে চাইছেন দেখে একটু তৎপর হয়ে উঠলেন৷ ইংরেজিতে বললেন, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট৷’ নবেন্দুর কাঁধ থেকে ডাক্তারের হাত নেমে এল৷ পাইপটা মুখ থেকে খুলে নিয়ে ছাই ঝেড়ে কোটের পকেটে ফেলে দিলেন৷ বিড়বিড় করে বললেন, ‘অ্যারেস্ট, অ্য—অ্যারেস্ট, তাই না’ তারপর ধাঁ করে অন্য পকেট থেকে বের করে ফেললেন অনেকটা রিভলভারের মতো দেখতে ছোট একটা অস্ত্র৷ আমরা আবার থমকে দাঁড়ালুম৷ এবার আর ডাঃ ল্যাঙের গা-ঘেঁষে নয়, বেশ দূরে৷ বলা যায় না, গুলি-গোলা ছুটে কে কখন ঘায়েল হয়৷ পুলিশের রাইফেলের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে কি ওই মাঝারি সাইজের রিভলভার! কাঁধে রাইফেল অথচ অফিসার ভদ্রলোক কীরকম ভয়ে-ভয়ে দূরে সরে যাচ্ছেন! নবেন্দুটার কিন্তু আচ্ছা সাহস৷ দু-পক্ষের মাঝখানে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে৷ ব্যাপারটা যেন কিছুই নয়, বিরাট একটা তামাশা৷ যাঁরা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে নিছক মজা দেখছিলেন তাঁরাও সুড়সুড় করে পালাতে শুরু করলেন৷ প্রফুল্লদা এতক্ষণ আরাম করে আমাদের পেল্লায় বেডিংটার ওপর বসেছিলেন৷ উত্তেজনা বেশ বাড়ছে দেখে কৌটো খুলে নতুন করে একটা বিড়ি ধরিয়ে নিলেন৷ পরেশ কানে-কানে বললে, ‘আচ্ছা কাল হল দেখছি৷ এর হাত থেকে সহজে উদ্ধার পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না৷’
পুলিশকে পিঠ দেখাতে নেই বলেই বোধহয় অফিসার ভদ্রলোক যতটা সম্ভব পিছু হটে সরে যেতে-যেতে বললেন, ‘গুলি করবেন নাকি মশাই?’ ডাঃ ল্যাং স্টেশন ফাটানো হাসি হেসে বললেন, ‘গুলি? আমি কি সাধারণ ওয়াগনব্রেকার যে গুলি করব? এ জিনিস গুলির চেয়ে মারাত্মক৷’ অফিসার ভদ্রলোক আরও দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে ভয়ে-ভয়ে বললেন, ‘তবে কি অ্যাটম বম?’ অ্যাটম বম শব্দটা কানে যেতেই প্রফুল্লদা কুঁক-কুঁক করে হেসে উঠলেন৷ হাসির শব্দটা অফিসারের কানে যেতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘হাসে কে? হাসার কী আছে? এটা কী যাত্রা না থিয়েটার!’ জীবনে অনেক পুলিশ চরিয়েছেন প্রফুল্লদা৷ ভয়-ডর কিছুই নেই৷ বসে-বসেই জবাব দিলেন, ‘হাসব না কেন? হাসির কথা হলে হাসি চাপা যায় না৷ অ্যাটম বোমা মশাই তিনটেই ছিল, যুদ্ধের সময় জাপানের ঘাড়ে গিয়ে পড়েছিল৷ ব্যস, স্টক শেষ, আর মাল নেই৷’
‘মাল নেই? আপনি সব জেনে বসে আছেন! আমি রোজ সকালে নিয়ম করে কাগজ পড়ি বুঝেছেন৷ আমার একটা বইও আছে আণবিক বিজ্ঞান, আমি রোজ একটু করে পড়ি৷’ অফিসারের কথায় প্রফুল্লদার হাসি তো কমলই না বরং বেড়ে গেল, ‘পড়ে-পড়ে তো ওই জ্ঞান হয়েছে! আণবিক বোমা হাতে করে ছোঁড়া যায়? আর আণবিক বোমা ডাক্তারসাহেব ছুড়বেন কেন? মশা মারতে কেউ কামান দাগে মশাই!’
‘মশা? আমি হলুম গিয়ে মশা! দেখাব মজা! দেখিয়ে দেব একবার মশা বলার মজাটা৷’ প্রফুল্লদা একটা ঠ্যাং আর একটা ঠ্যাঙয়ের ওপর তুলে দিয়ে বললেন, ‘মশা মারতে লোকে মশামারা তেল ব্যবহার করে, ডাক্তারসাহেবের হাতের ও যন্ত্রে সেই তেল ভরা আছে৷’
পরেশ আমার কানে-কানে বলল, ‘ওটা কী রে, ফ্লেম-থ্রোয়ার নাকি রে!’ পরেশটা আবার জেমস বন্ড গুলে খেয়েছে৷ প্রফুল্লদার কথায় অফিসার আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, সব রাগ গিয়ে পড়ল প্রফুল্লদার ওপর৷ ডাঃ ল্যাঙের কথা ভুলে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ইউ আর আন্ডার মাই অ্যারেস্ট৷’ প্রফুল্লদা নিমদাঁতন করা ঝকঝকে দুসার দাঁত বের করে বলল, ‘আমার অপরাধ স্যার!’ অফিসার একটু ঘাবড়ে গেলেন, আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লজ্জা করে না সব কথায় হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাসতে৷ যখন-তখন যেখানে-সেখানে হাসাটাও অপরাধ! দণ্ডবিধির, দণ্ডবিধির ধারাগুলো ছাই মনেও আসে না৷’
‘আসবে কী করে?’ ডাঃ ল্যাং হাতের অস্ত্রটা নাচাতে-নাচাতে বললেন, ‘মাথায় তো কিছু নেই, পুরোটাই তো কাউ ডাং! তা না হলে আসল কাজ পড়ে রইল আর উনি গোঁফ বাগিয়ে অ্যারেস্ট-অ্যারেস্ট করে তখন থেকে—মোস্ট ডিসটারবিং৷ চলো নবেন্দু৷’ ডাঃ ল্যাং খুব সহজভাবেই এগোতে চাইলেন৷ চাইলে কী হবে৷ সেই অশান্তি৷ এইবার অফিসার ভদ্রলোক একটু লম্ফঝম্ফ করে এগিয়ে এলেন৷ ‘সাহস বেড়ে গেল, তাই না মিস্টার অফিসার? তা হলে মজাটা এইবার দেখুন৷’ ডাক্তার তাঁর অস্ত্র উঁচিয়ে ধরলেন৷ অফিসার হঠাৎ বেগ সংবরণ করতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে উলটে পড়ে যাচ্ছিলেন, নবেন্দু ধরে সামলে দিল৷ নবেন্দুরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে৷ প্রকৃতই বিরক্তিকর ব্যাপার৷ নবেন্দু বললে, ‘একে কোনওরকমে অ্যারেস্ট করা যায় না৷ তখন থেকে পায়ে-পায়ে বেড়ালের মতো ঘুরছে৷’ ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘ঠিক বলেছ নবেন্দু, উৎপাত ক্রমশ বেড়েই চলেছে৷ ভেবেছিলুম, খেটে খাওয়া মানুষ, বিপাকে ফেলব না, তা বেশি তিড়িংবিড়িং করলে আমি কী করব? দিতেই হবে এক ডোজ ভরে৷ তারপর—তারপর, উঃ ভাবা যায় না৷’
‘কী হবে তারপর?’ অফিসার তাঁর গর্তে ঢোকা চোখ দুটো বড়-বড় করে বললেন, ‘মরে যাব?’
‘মরে গেলে তো বেঁচেই গেলেন৷ তবে এ জিনিস মারে না, দগ্ধে-দগ্ধে শেষ করে দেয়! যতদিন বাঁচবেন জ্বলে পুড়ে যাবেন৷’ ডাক্তার মুখটাকে ভয়াবহ করে শেষ পরিণতিটা জানালেন৷ ‘জিনিসটা কী? বেশ দেখতে কিন্তু!’ পুলিশ অফিসার ছেলেমানুষের মতো কৌতূহলী হয়ে উঠলেন৷ ‘এর নাম জেট ইঞ্জেকটার৷ চোখের পাতা পড়ার আগে এক ডোজ ঢুকে যাবে উপরের হাতে৷ একটা মোক্ষম প্রিপারেশান৷ দেখতে-দেখতে চামড়াটা কালো হয়ে যাবে৷ ভেতর থেকে ধীরে-ধীরে পুড়তে থাকবে৷ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সারা শরীর জড়িয়ে পাকিয়ে ফিকে গোলাপি ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ পাটের আগুনের মতো ধিকি-ধিকি জ্বলবে৷’
‘তাই নাকি!’ একটা লোক যে এত দৌড়োতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না৷ অফিসার পলকে প্ল্যাটফর্মের কোণে অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ ডাঃ ল্যাং হো-হো করে হেসে বললেন, ‘বীর পুরুষ? পুরুষসিংহও বলা যেতে পারে৷ যাক, নাও কোস্ট ইজ ক্লিয়ার৷ তটভূমি এখন অবরোধমুক্ত৷ চলো দেখি, আমার সাঙ্গপাঙ্গদের উদ্ধার করার চেষ্টা করি৷’
প্রফুল্লদা কখন বেডিংয়ের সুখাসন ছেড়ে উঠে এসেছেন লক্ষ্য করিনি৷ ল্যাং সাহেবের কাছে এসে বললেন, ‘জিনিসটা কী?’ ‘জিনিসটা?’ প্রশ্নটা ডাক্তার যেন নিজেকেই করলেন৷ ‘জিনিসটা হল’—প্রফুল্লদা কিছু বোঝার আগেই তাঁর বাহুমূলে একটা কাণ্ড ঘটে গেল৷ যন্ত্রটা ছিক করে একটা আওয়াজ করে খানিকটা তরল পদার্থ প্রফুল্লদার শরীরে ভরে দিল৷ পরেশ দাঁড়িয়ে ছিল পাশে, তারও ওই এক হাল হল৷ নবেন্দু এবার গর্জে উঠল, ‘এটা কী হল ডক্টর ল্যাং? যে বিষ আপনি পুলিশের শরীরে ভরে দিতে ভয় পাচ্ছিলেন সেই বিষ ঢুকিয়ে দিলেন এদের শরীরে?’ নবেন্দু ভাবতেও পারেনি যে, ডক্টর ল্যাং নবেন্দুকেও বাদ দেবেন না৷ নিমেষে নবেন্দুর হাতেও ডক্টর ফুঁড়ে দিলেন৷ প্রফুল্লদা বোধহয় ঘটনার আকস্মিকতায় একটু কাবু হয়ে পড়েছিলেন, এইবার হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এলেন, ‘মরার আগে মেরে যাব৷ দেখি কতবড় ডাক্তার তুমি৷’ ডাক্তার মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘তোমাকে মারলুম কে বললে?’ তোমাকে, তোমার এইসব চেলাদের বাঁচালুম বলতে পারো৷’
প্রফুল্লদা একে রাগী মানুষ তায় আবার শরীরে অসীম ক্ষমতা৷ ডাঃ ল্যাঙের মতো কৃশকায় একজন মানুষকে দু-হাতে মাথার ওপর তুলে দশ হাত দূরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া কিছুই নয়৷ আমরাও তাই চাইছিলুম৷ ভদ্রলোকের জন্যে আমরা ট্রেন ফেল করেছি৷ সারা স্টেশনের মানুষ উদ্ব্যস্ত হোক, হয়ে যাক একটা হেস্তনেস্ত৷ তা ছাড়া ভদ্রলোক আমাদের বিনা কারণে আক্রমণ করেছেন৷ শরীরে মারাত্মক একটা কী জানি কী বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন৷ প্রফুল্লদা বাঘের মতো এগিয়ে আসছেন৷ এইবার ডাঃ ল্যাঙের দফা রফা৷ এইবার থানা পুলিশ না হয়ে যায়৷ যাচ্ছিলুম মধুপুরে৷ এইবার ডাঃ ল্যাঙকে মেরে দলবল সমেত যাব হাজতে৷ তবে পুলিশও বহুত রেগে আছে৷ প্রফুল্লদার প্যাঁচ আমাদের জানা আছে৷ ঝাঁ করে লাফিয়ে পড়লেন বিদ্যুৎগতিতে৷ ডাঃ ল্যাং কিন্তু এতটুকু ভীত নন৷ মুখে অদ্ভুত একটা মৃদু হাসি৷ হাসি যেন বলতে চাইছে, আসছ এসো, দেখি তোমার কেরামতি৷
প্রফুল্লদা বাঘের মতো লাফিয়ে উঠলেন৷ ডাং ল্যাং আত্মরক্ষার কোনও চেষ্টাই করলেন না৷ শুধু ডান হাতের তর্জনিটা একটু প্রফুল্লদার গায়ে আলতো ঠেকিয়ে দিলেন৷ ছ্যাঁক করে একটা শব্দ হল৷ গরম লোহা জলে ডোবালে যেমন শব্দ হয়৷ একটু ধোঁয়া মতো বেরোল৷ বাপ বলে একটা শব্দ করে প্রফুল্লদা চিৎপাত হয়ে প্ল্যাটফর্মে শুয়ে পড়লেন৷ কোনও সাড়াও নেই শব্দও নেই কী যে হল, ব্যাপারটা বোঝা গেল না৷ ডাঃ ল্যাং মুখে একটু চুকচুক শব্দ করে বললেন—‘আহা বেচারা৷’
আমরা সকলে প্রফুল্লদার মুখের উপর ঝুঁকে পড়লুম৷ বেঁচে আছেন না মারা গেছেন বোঝা যাচ্ছে না৷ পরেশ ফিসফিস করে বলল, ‘ডেড’৷ নবেন্দু উঠে দাঁড়াল৷ ‘এ আপনি কী করলেন—মার্ডার?’ ডাঃ ল্যাং পাইপ ধরাতে-ধরাতে খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘যাঃ ছুঁচো মেরে কেউ হাত গন্ধ করে! নাড়িটা দেখো না৷’ নবেন্দু আবার নিচু হয়ে প্রফুল্লদার কবজিটা দু-আঙুলে তুলে নিল৷ ডাঃ ল্যাং চিমনির মতো ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে জিগ্যেস করলেন, ‘কী বুঝছ?’ নবেন্দু আবার উঠে দাঁড়াল, ‘বেঁচে আছেন৷ কিন্তু ব্যাপারটা কী হল?’ পাইপ চিবোতে-চিবোতে ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘কিছু না৷ বড্ড লম্ফঝম্ফ করছিল৷ ঠিক পছন্দ হল না৷ বেশি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই আমার ভীষণ খারাপ লাগে! তাই একটু লো ভোলটেজ চালিয়ে দিলুম৷’
‘লো ভোলটেজ মানে৷’
‘ইলেস্ট্রিসিটি৷’ ঘড়ি দেখতে-দেখতে ডাঃ ল্যাং উত্তর দিলেন৷
‘ইলেক্টিসিটি কোথা থেকে পেলেন?’—আমরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম৷
‘কেন, আমার আঙুল৷ ইচ্ছে করলে আমার সবক’টা আঙুল কনডাকটার করে ফেলতে পারি৷ একবার দেখবে নাকি?’
‘না-না’, নবেন্দু প্রফুল্লদার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করেই বলল৷ ‘কিন্তু বিদ্যুতের উৎসটা কী? আপনি কি শরীরের মধ্যে ব্যাটারি লুকিয়ে রেখেছেন নাকি?’
‘ব্যাটারি পাব কোথায়, প্রয়োজনই বা কী?’
‘তবে?’ পরেশ খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করল৷
ডাঃ ল্যাং লোহার একটা সরু শিক দিয়ে পাইপের মুখে খোঁচা মারতে-মারতে বললেন, ‘তোমাদের অজ্ঞতা অপরিসীম৷ একটু লেখাপড়া করো না কেন?’
নবেন্দু একটু প্রতিবাদের গলায় বলল—‘লেখাপড়ায় আমরা খুব একটা খারাপ নয়, বুঝেছেন? শরীরে বিদ্যুৎ প্রবাহ সম্পর্কে কিছু জ্ঞানও রাখি, কিন্তু আঙুলের ডগা থেকে বিদ্যুৎ বের করে মানুষ ঘায়েল করার কৌশল এই প্রথম দেখলুম কিন্তু কায়দাটা বুঝলুম না৷’
‘জল-বিদ্যুতের কথা শুনেছ? Hydro-electricity?’
‘শুনেছি৷’ সমস্বরে আমরা জানালুম৷
‘গতিশীল জল বাধা পেলে, কোনও কিছুতে ধাক্কা খেলে, জলতরঙ্গের গতি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে৷ করে কিনা?’
‘হ্যাঁ, করে৷’
‘বেশ, এইবার শোনো আমার আশ্চর্য আবিষ্কার৷ তোমার আমার সকলের শরীরে রক্ত বয়ে চলেছে৷ যেমন করে নদীতে জল প্রবাহিত হয়৷ রক্তের একটা গতিবেগ আছে৷ এই রক্তপ্রবাহের মধ্যে আমি সূক্ষ্ম কায়দায় একটা ছোট্ট টারবাইন বসিয়ে রেখেছি৷ সেটা ঘুরছে, অনবরত ঘুরছে৷ পাশেই আছে একটা জেনারেটার, এইবার আমার আঙুলটা দেখো৷’ ডাঃ ল্যাং তর্জনিটা তুলে দেখালেন৷ নবেন্দু হাত দিতে ইতস্তত করছিল, শক খাবার ভয়ে৷ ডাঃ ল্যাং আশ্বাস দিলেন, ‘ভয় নেই৷ পাওয়ার হাউস বন্ধ আছে৷’
নবেন্দু আঙুলটা হাত দিয়ে দেখল৷ ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘বুঝলে কিছু?’
‘কী যেন একটা লাগানো রয়েছে৷’
‘দ্যাটস রাইট৷ পাতলা একটা তামার চাদর৷ কনডাকটার৷ এই কনডাকটারের মধ্যে দিয়েই বিদ্যুৎ-তরঙ্গ প্রবাহিত হয়৷’
‘এখন কীভাবে আপনি প্রবাহ বন্ধ করলেন?’
‘তোমাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই হিটার বা ইস্ত্রি আছে৷ মাঝে-মাঝে হয়তো দেখেছ, যেই সুইচ অন করলে ফট করে একটা শব্দ হয়ে একটু আগুন ছিটকে লাইনটা ফিউজ হয়ে গেল৷’
পরেশ খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আজই সকালে আমার সেই ঘটনা ঘটেছে৷ জামাটা আর ইস্ত্রিই করা হল না৷ কলারটা কীরকম কুঁচকে আছে৷’ পরেশ খুঁতখুঁত করতে লাগল৷
ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘তোমাদের বডিগার্ডের গায়ে হাত ঠেকানো মাত্রই সেই ঘটনা ঘটল৷ তোমরা একটা আওয়াজ শুনেছ, একটু ধোঁয়াও হয়তো দেখেছ৷ পজেটিভ, নেগেটিভ এক হয়ে আমার ফিউজ উড়ে গেছে৷’
‘ফিউজ উড়ে গেছে মানে৷’ আমরা সবাই ঝুঁকে পড়লুম৷
ডাঃ ল্যাং বাঁ-হাতের কবজির ঘড়িটা দেখালেন৷ মোটা মানে সাধারণ ঘড়ির ব্যান্ডের চেয়ে চওড়া একটা অদ্ভুত ধরনের কালো ব্যান্ড খাপ হয়ে বসে আছে৷ ঘড়িটাও অদ্ভুত দেখতে৷ কালো ডায়াল৷ বারোটা বেজে পনেরো মিনিট হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে৷ সেন্টার সেকেন্ডের কাঁটাটা একটু বেশি চকচকে৷ কাঁটাটা ঘুরছে না৷ ছত্রিশ সেকেন্ডে স্থির হয়ে আছে৷
‘বুঝলে কিছু?’ ডাঃ ল্যাং মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন৷ আমরা বোকার মতো ঘাড় নেড়ে জানালুম, ‘কিছুই বুঝিনি৷’
‘এই ঘড়িটার সঙ্গে ফিউজ লাগানো আছে৷ ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে৷ সেটা দেখেছ তো?’
আমরা সমস্বরে বললাম, ‘হ্যাঁ, দেখেছি৷’
‘বারোটা বেজে পনেরো মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ডে তোমাদের ওই কমরেড কাত হয়েছে৷ এখন ফিউজটা লাগালেই ঘড়িটা আবার চলতে শুরু করবে৷’
‘ফিউজ লাগাবেন না?’
‘লাগাব একটু পরে৷’
রক্তপ্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ, ব্যাপারটা যেন অবিশ্বাস্য৷ নবেন্দু একটু খুঁত-খুঁত করে বলল, ‘আমি আপনার থিওরিটা আর একটু ভালো করে বুঝতে চাই৷’
‘ভেরি গুড৷’ ডাঃ ল্যাং এতগুলো উৎসাহী ছাত্র পেয়ে বেশ খুশি হলেন৷ ‘বোঝাব, বোঝাব, তার আগে তোমাদের এই ফ্রেন্ডকে একটু চাঙ্গা করে তুলি৷’ ডাং ল্যাং প্রফুল্লদার ওপর ঝুঁকে পড়লেন৷ টাউজারের হিপ পকেট থেকে লম্বা চকচকে একটা লোহার মতো যন্ত্র বের করে প্রফুল্লদার হার্টের ওপর কিছুক্ষণ ধরে রাখতেই, প্রফুল্লদা চোখ খুললেন৷ ডাঃ ল্যাং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ফাইন৷ নাও উঠে বোসো৷ আর কখনও এই রকম হঠকারিতা কোরো না৷ জেনে রাখো, বৈজ্ঞানিকরা অনেক বেশি শক্তিশালী৷’
প্রফুল্লদা উঠে বসে পিটপিট করে বললেন, ‘একটা বিড়ি খাব৷’
‘নো, নো নাও৷ একটু পরে৷ আগে এককাপ গরম কফি খাবে, তারপর ধূমপান৷’
ডাক্তারের একটা হাত আমার কাঁধে আর-একটা হাত নবেন্দুর৷ দলবল এগিয়ে চলল কফি কর্নারের দিকে৷ প্রফুল্লদার পা-দুটো যেন একটু টলছে৷ মুখটা বিমর্ষ৷ বড্ড হেরে গেছেন৷ ‘গিনিপিগ উদ্ধারের কী হবে?’ ডাক্তার ল্যাং নিশ্চিন্ত গলায় বললেন, ‘হবে-হবে ফার্স্ট কফি, তারপর পিগই বলো আর গিনিপিগই বলো, যা হয় একটা কিছু হবে৷’
কফিখানায় ডাঃ ল্যাং
পরেশটা আবার কফি ভালোবাসে না৷ পোড়া-পোড়া গন্ধ লাগে৷ এক চুমুক খেয়েই পেয়ালা নামিয়ে রেখেছে৷ মুখটা করুণ৷ যেন তাকে ভীষণ সাজা দেওয়া হয়েছে৷ প্রফুল্লদা ডবল স্পিডে খেয়ে চলেছেন৷ মাঝে-মাঝে পরেশের না খাওয়া কাপের দিকে তাকাচ্ছেন৷ মনের খুব ইচ্ছে নিজেরটা শেষ করে ওটাও শেষ করে ফেলেন৷ কেউ একবার বললেই নিজের মনের ইচ্ছেটা তিনি কাজে করে ফেলবেন, এই আর কি৷
ডাঃ ল্যাং আবার তাঁর পাইপ নিয়ে পড়েছেন৷ কী ভীষণ জিনিস৷ সারাদিনের বারোটা ঘণ্টাই এই পাইপ নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায়৷ খোঁচাখুঁচি করে৷ তামাক ভরে৷ কিংবা বারে-বারে দেশলাই দিয়ে ধরাবার চেষ্টা করে৷ পাইপে তামাক ভরতে-ভরতে ডাক্তার একবার আড়চোখে আমাদের দেখে নিলেন৷ বেশ দেখতে ডাঃ ল্যাঙকে৷ সরু উঁচু পাতলা নাক৷ অসম্ভব ঘন কালো চুলে কপালের প্রায় আধখানা ঢাকা৷ টকটকে ফরসা রং৷ বলে না দিলে সাহেব বলেই ভুল হতে পারে৷ বিজ্ঞানীদের এত সুন্দর চেহারা খুব কম দেখা যায়৷ আমাদের ক্লাসের বিজ্ঞানের স্যারের মতো নয়৷ মাথা জোড়া বিশাল টাক৷ কুচকুচে কালো রং৷ ইয়া মোটা-মোটা হাত৷ হাত নয়তো, থাবা৷ ডাঃ ল্যাঙের আঙুলগুলো কী সুন্দর! লম্বা-লম্বা সরু-সরু৷
ডাক্তার কফিতে চুমুক দিলেন৷ আমরা সবাই চুপ করে উৎকণ্ঠিত হয়ে বসে আছি৷ কী অদ্ভুত মানুষ! পরেশ কানে-কানে বললে, ‘মানুষ নয়তো, চলমান জেনারেটার, সঙ্গে বিদ্যুৎ নিয়ে ঘোরেন৷’ পরেশ ফিসফিস করে বলেছিল৷ ডাঃ ল্যাং কিন্তু শুনে ফেলেছেন৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন—‘ফ্রেন্ডস আমরা সবাই জেনারেটার৷ কেউ জানে, কেউ জানে না৷ মানুষ যদি নিজের কলকব্জার খবর রাখত, তাহলে প্রতিটি মানুষই অসীম শক্তির অধিকারী হতে পারত৷ আমরা সকলেই এক একটি অদ্ভুত শক্তিশালী যন্ত্র৷ আমরা রেডিও, আমরা টিভি, আমরা জেট প্লেন, আমরা কমপিউটার, আমরা আণবিক বোমা৷ পৃথিবীর জানা অজানা সমস্ত মেশিনের সমন্বয়৷’
প্রফুল্লদা আর থাকতে পারলেন না, বলেই ফেললেন, ‘পরেশের কফিটা আমি...’
‘ও সিওর’—ডাঃ ল্যাং দাঁতে পাইপ চেপে অনুমতি দিলেন৷ প্রফুল্লদা সঙ্গে-সঙ্গে হাত বাড়ালেন৷ হাতটা এখনও অল্প-অল্প কাঁপছে৷ ‘আর একটু পরে তুমি আর এক কাপ কফি খাবে৷’ পাইপটা মুখ থেকে খুলে নিয়ে ডাঃ ল্যাং আর এক কাপ কফি মঞ্জুর করলেন৷
‘ওই বিদ্যুতের ব্যাপারটা’—নবেন্দু আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বলেই ফেলল৷ ডাঃ ল্যাং ধোঁয়া ছাড়লেন৷ মুখটা ধোঁয়ার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ হাত দিয়ে ধোঁয়া ওড়াতে-ওড়াতে বললেন, ‘হার্টের ফাংশান, আই মিন হৃদযন্ত্র সম্পর্কে কিছু জ্ঞান তোমাদের আছে নিশ্চয়৷’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তা আছে৷’
‘অল রাইট, তাহলে বুঝতে পারবে৷ এই আমার হাতের মুঠোর মতো ছোট্ট এতটুকু একটা হৃদয়ের ক্ষমতা কিন্তু বিশাল৷ এই খুলছে এই মুড়ছে৷ এই সঙ্কুচিত হচ্ছে আবার বেড়ে যাচ্ছে বা প্রসারিত হচ্ছে৷ সংকোচন আর প্রসারণ৷ লাবডুব-লাবডুব৷ সারাদিন ধরে তোমাদের শরীরে এই পাম্প চলছে৷ ওয়েটার৷’—ডাঃ ল্যাং ওয়েটারকে ডেকে আবার কফির অর্ডার দিলেন৷
পরেশ বললে—‘আমি না৷’
‘নাবালক’—ডাঃ ল্যাং সস্নেহে হাসলেন৷ হাসার সময় চোখ দুটো একটু ছোট হল—‘এই পাম্প প্রতিদিন ন থেকে দশ টন রক্ত পাম্প করে৷ প্রতিবারে শরীরের সমস্ত রক্তের একশো ভাগের এক ভাগ ঠেলে ‘অ্যাওর্টার’ মধ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছে৷ সেখান থেকে বাঁধভাঙা নদীর গতিতে এই রক্ত আমাদের শরীরের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ শিরা-উপশিরার মধ্যে কুলকুল করে প্রবাহিত হচ্ছে৷ কোনও ধারণা আছে? আমাদের শিরা-উপশিরা একসঙ্গে যোগ করলে দৈর্ঘ্যে কত মাইল হবে?’
পাইপ মুখে দিয়ে ডাক্তার আমাদের দিকে তাকালেন৷ আমরা সকলেই চুপ৷ পরেশ হঠাৎ বলে ফেলল—‘কুড়ি গজ৷’
‘ইজ ইট? তুমি নবেন্দু?’—ডাঃ ল্যাং নবেন্দুকে জিগ্যেস করলেন৷ নবেন্দু একটু ইতস্তত করে বলল...‘এক মাইল৷’
‘ওঃ হো, নো নো৷ ধারে কাছেও গেল না৷ ইট ইজ সিকসটি থাওজেন্ড মাইলস৷ ৬০ হাজার মাইল৷ আমাদের শরীরে শাখা-প্রশাখা মিলিয়ে ৬০ হাজার মাইলের রক্তনদীর ধারা প্রবাহিত হয়ে চলেছে৷ আমাদের ভারতবর্ষের যে-কোনও দুটো রিভার সিসটেমের চেয়ে বড়৷’
আমরা সকলে হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম৷ নবেন্দু নিজের হাতটা চোখের সামনে তুলে বার কয়েক দেখল৷ এ যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার! আমাদের এই ক্ষুদ্র শরীরে প্রবাহিত গঙ্গা, প্রবাহিত সিন্ধু৷ বুকের বাঁ-পাশে হাতের মুঠোর আকারে একটি পাম্প রোজ ন থেকে দশ টন রক্ত পাম্প করে ৬০ হাজার মাইলের সুদীর্ঘ প্রবাহপথে পাঠিয়ে দিচ্ছে! কী বিস্ময়! কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, চুমুক দেবার কথা সকলেই যেন ভুলে গেছি৷
‘হার্টের ভালভটা কেমন জানো? ইট হ্যাজ থ্রি ভালভস্ ট্যাঙ্গুলার ইন শেপ৷ ভালভটার তিনটে কপাট, ত্রিভুজের মতো দেখতে৷ কলম আছে? দাও এঁকে দেখিয়ে দি৷’
নবেন্দু ডট পেন আর পরেশ বুকপকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে এগিয়ে দিল৷ কাগজটার এক পিঠে একটা ঠিকানা লেখা৷ অন্য পিঠ সাদা৷ দাঁতে পাইপ চেপে ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘কার ঠিকানা?’ পরেশ আমতা-আমতা করে বলল, ‘আজ্ঞে আমাদের বাড়ির৷ মা লিখে দিয়েছেন৷’ ‘হাউ ফানি৷ তোমার নিজের বাড়ির ঠিকানা মেমারিতে রাখতে পারো না?’ পরেশ একটু লজ্জা পেলেও তারও ব্যাখ্যাটা শোনার মতো৷—‘ঠিকানাটার ওপর চোখ বোলান৷’ ডাঃ ল্যাং জোরে-জোরে পড়লেন—‘২৩৩/১৪/সি/১০/এইচ/পি ৭, হোয়াট ইজ দিস? এ তো দেখছি কমপিউটারে ফিড করার মতো একটা কোড নম্বর৷ কোথাকার ঠিকানা হে? চিঠিপত্তর আসে তো!’ পরেশ দিগবিজয়ীর মতো মুখ করে বলল, ‘নতুন পিওন এলে প্রথম-প্রথম চিঠিপত্তর আসে না৷ চিঠি না এলেও ক্ষতি নেই৷ মুশকিল ইলেকট্রিক বিল নিয়ে৷ বাবা তখন পোস্ট অফিসে গিয়ে পিওনকে একদিন মধ্যাহ্ণ ভোজনের নিমন্ত্রণ করে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন৷ তারপর থেকে আবার চিঠি আসতে থাকে৷ পুরোনো পিওন বদলির আগে বলে যায়—নতুন কে আসছেন, তাঁর নাম কী!’
হো-হো করে ডাঃ ল্যাং হেসে উঠলেন, ‘মাই গড! পৃথিবী কী ফানি প্লেস! মানুষ যতদিন বাঁচবে ততদিন তার নতুন-নতুন শিক্ষা হবে৷ পৃথিবীর পাঠশালাতে উই আর ইটারন্যাল স্টুডেন্টস৷’ ডাঃ ল্যাং কাগজের সাদা দিকটায় সুনিপুণ হাতে, হার্ট আর ভালভের ছবি এঁকে ফেললেন৷ ‘কাম হিয়ার৷’ সবক’টা মাথা এগিয়ে এল৷ আমার মাথাটা নবেন্দুর সঙ্গে ঢাঁই করে ঠুকে গেল৷ ঠুকে গেলেও আমাদের তখন অন্য কোনও লক্ষ নেই৷ নিজেদের শরীরের রহস্য জানার জন্যে উদগ্রীব৷
‘হিয়ার ইজ ইওর হার্ট’, ছবিটা টেবিলের ওপর ফেলে, বাঁ-হাতে কফির কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিলেন৷ ‘হার্টের মেকানিজমটা আরও একটু বোঝার চেষ্টা করো৷ আমাদের হৃদয়ের চারটি প্রকোষ্ঠ৷ দুটো ঘরের দেওয়াল খুব পাতলা, এদের নাম অরিকল৷ আরও দুটো ঘরের পেশি খুব শক্তিশালী, নাম ভেনট্রিকল৷ তার মানে হৃদয় হল দুটি সহযোগী পাম্প৷ নাও সি’—ডাঃ ল্যাং ডট পেনটা আবার হাতে তুলে নিলেন৷ ‘এই দেখো দক্ষিণ হৃদয়—একটা অরিকল, একটা ভেনট্রিকল৷ আমাদের দেহের মোটা-মোটা শিরা রক্তস্রোত বহন করে আনছে এই দক্ষিণ হৃদয়ে৷ দুটি বিশাল প্রবাহিত রক্তনদী, একটির নাম ইনফিরিয়ার ভেনাকোভা অন্যটির নাম সুপিরিয়ার ভেনাকোভা, অবিশ্রান্ত ধারায় নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে এই হৃদয়ের দক্ষিণের দুটি প্রকোষ্ঠে৷ কান পেতে শোনো, অনবরত কুলকুল শব্দ শুনতে পাবে৷’ ডাঃ ল্যাঙের চোখ দুটো হঠাৎ তীক্ষ্ণ থেকে কেমন যেন ভাবালু হয়ে উঠল, ‘তোমরা জলপ্রপাত দেখেছ নিশ্চয়ই৷ হুড্রু, জুনা৷ হু-হু করে জল ঝরে পড়ছে হাজার-হাজার ফুট নিচে৷ গুমগুম শব্দ, পাথরের দেওয়ালে-দেওয়ালে প্রতিহত হয়ে মহাসংগীতের মতো ঊর্ধ্বে ছড়িয়ে পড়ছে৷ চারিদিকে সূক্ষ্ম জলকণা ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে৷ হৃদয়ের এই দক্ষিণ প্রকোষ্ঠে যদি তোমাদের বেড়াতে যাবার সৌভাগ্য হতো, তোমরাও অবিকল ওই দৃশ্য দেখতে—চারিদিকে লাল রক্তের স্রোত প্লাবনের নদীর মতো ফুলে-ফেঁপে এগিয়ে আসছে৷’ ডাঃ ল্যাং এক চুমুক কফি খেলেন৷ আমাদের কারুর মুখে কোনও কথা নেই৷ ‘এইবার কী হচ্ছে?’ হাতে ডট পেনটা তুলে নিলেন৷ ‘দক্ষিণ হৃদয় পাম্প করে এর রক্তকে পাঠিয়ে দিচ্ছে লাংসে৷ এই দেখো, ফ্রম হিয়ার টু দেয়ার৷’
ডাঃ ল্যাং হঠাৎ ডট পেনটা ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ আমাদের মুখের দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন৷ আমরা একটু ভয় পেলুম৷ কী হল কে জানে৷ আমাদের কারুর পা গায়ে লাগেনি তো! টেবিলের তলায় জোড়া-জোড়া পা৷ ডক্টর হঠাৎ একটু হাসলেন৷ আমরাও হাসলুম৷ ‘একটু খিদে-খিদে পাচ্ছে, তাই না!’ সমর্থনের আশায় আমাদের উদ্বিগ্ন মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিলেন৷ ‘বেশিক্ষণ মাথার কাজ করলে আমার ভীষণ খিদে পায়৷’
‘আমারও’—পরেশ সোৎসাহে সমর্থন করল৷
‘দ্যাটস রাইট৷ হি ইজ মাই টাইপ৷ এই ছেলেটা বড় হলে আমার চেয়ে বড় সাইন্টিস্ট হবে৷ হোয়াট ইজ ইওর অ্যাড্রেস?’ পরেশ তার বাড়ির নম্বরটা মনে করার চেষ্টা করে ‘২৩৩/১৪ বাই, বাই’, পরেশ বাই বাই করল দশ বারো বার৷ ডাঃ ল্যাং হাত তুলে বললেন, ‘বাস-বাস, ফাটা রেকর্ডের মতো বেজো না৷ ইউ নিড প্লেন্টি অফ প্রোটিন টু রিমেম্বার দ্যাট অ’ফুল নাম্বার৷ বয়৷’ তীক্ষ্ণ ডাকে বয় দৌড়ে এল—‘কাটলেট ফর অল অফ আস৷ রাইট৷ হারি আপ৷’ পাইপটা নিভে গেছে৷ তবু ঠোঁটে লাগালেন৷ ‘নাও সি বয়েজ৷ লাংসে গিয়ে রক্ত কী করছে? গেটিং প্লেন্টি অফ অক্সিজেন৷ তোমার প্রতিটি শ্বাসে ফুসফুস তাজা অক্সিজেন বায়ু থেকে নিচ্ছে৷ রক্তপ্রবাহ বুদবুদ করে উঠছে৷ রক্ত অক্সিজেন শুষে নিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দিচ্ছে৷ যেটা ফোঁস করে বেরিয়ে যাচ্ছে তোমার প্রশ্বাসের সঙ্গে৷ বাঁ-দিকের হৃদয় ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের ধারা গ্রহণ করে পাম্প করে পাঠিয়ে দিচ্ছে ধমনীতে৷ তার মানে রক্তনদীর ধারা চলেছে এই ভাবে৷’ ডাঃ ল্যাং ডট পেন দিয়ে কাগজে লিখলেন—
‘ফ্লো অফ ব্লাড ঃ দ্য গ্রেট ভেনস—রাইট আট্রিয়াম—রাইট ভেনটিকল—লাংস (ভায়া পালমোনারি আর্টারি)—লেফট আট্রিয়াম (ভায়া দ্য পালমোনারি ভেন) লেফট ভেনট্রিকল—অ্যাওর্টা (শরীরের সবচেয়ে বড় শিরা, মহানদী)৷ একে বলে রক্তপ্রবাহের ক্লোজড সার্কিট৷ শরীরের মধ্যে অনবরত প্রবাহিত এই স্রোতধারা সরু, মোটা, নানা মাপের রক্তবাহিকা নালির মধ্যে অবিশ্রান্ত ছুটছে৷ প্রবাহের পথে বসে আছে হাতের মুঠোর আকারের এই শক্তিশালী পাম্প, যার নাম হৃদয়৷ অ্যান্ড হিয়ার কামস আওয়ার কাটলেট৷’
বয় টপাটপ ডিশগুলো আমাদের প্রত্যেকের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল৷ অপূর্ব গন্ধে জিভে যেন জল এসে যায়৷ ডাঃ ল্যাং মরিচের পাত্রটা হাতে তুলে নিলেন৷ পরেশ আমার কানে-কানে জিগ্যেস করলে—‘এই হলদে মতো জিনিসটা কী রে?’ আমারও ঠিক জানা ছিল না৷ নবেন্দুকে প্রশ্নটা চালান করে দিলুম৷ উত্তর ঘুরে এল—‘মাস্টার্ড৷ একটু করে কাটো, মাস্টার্ডে ছোঁয়াও, আলতো করে গালে ফেলে দিয়ে একটু স্যালাড চালান করে দাও৷’
‘ডেলিসাস’৷ ডাঃ ল্যাং জ্বলজ্বলে চোখে মন্তব্য করলেন, ‘দেয়ার ইজ নাথিং লাইক কাটলেট৷ কাটলেট না খেলে মানুষ সিভিলাইজড হয় না৷ আমার আবার এক ডজনের কমে মন ভরে না৷ দ্যাটস দ্য প্রবলেম৷ বয় বয়৷’ ডাঃ ল্যাং তারস্বরে চিৎকার শুরু করলেন, ‘কাটলেট কামড়ে আমার ধমনীর রক্তপ্রবাহের গতিবেগ বেড়ে গেল৷ আমার বিল্ট ইন জেনারেটারে এখন হাই ভোল্টেজ বিদ্যুৎ খেলছে৷ ‘প্রফুল্ল আর একবার হবে নাকি?’ ডাঃ ল্যাং হাসতে লাগলেন৷ প্রফুল্লদার তখনও ঘোর কাটেনি৷ করুণ মুখে বললেন, ‘আজকে কার মুখ দেখে উঠেছি জানি না৷ ঘণ্টা দুয়েক হয়ে গেল, হাওড়া স্টেশনেই আটকে আছি, এখন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারব কি না জানি না৷’ ডাঃ ল্যাং বেশ তারিয়ে-তারিয়ে কাটলেট খেতে-খেতে বললেন, ‘কার মুখ দেখেছ নবেন্দু, ঈশ্বরের নয়তো?’
নবেন্দু একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল৷ চমকে উঠে বলল, ‘ও হ্যাঁ, সে এক সাংঘাতিক লোক৷ নাম করলে হাঁড়ি ফেটে যায়৷’
‘ইজ ইট?’ ডাঃ ল্যাং হাড়ের টুকরোটা ডিশে ফেলে দিলেন—হু’ ইজ হি? যার এত পাওয়ার৷ মাস্ট বি এ সায়েনটিস্ট লাইক মি?’
‘সে এক সুদখোর, বন্ধকি কারবার করে৷’ নবেন্দু নামটা আর করল না? আমার ঠোঁটের ডগায় নামটা এসে গিয়েছিল, কোনওক্রমে সামলে নিলাম৷
‘আমি আর এক কাপ কফি খাই, কেমন? ডোন্ট মাইন্ড৷ তোমাদের দুবার হয়েছে৷ নো মোর৷’
‘আমি আর এক কাপ খেতে পারি না ডাক্তারবাবু?’ প্রফুল্লদার করুণ প্রার্থনা৷ ‘ডাক্তারবাবু! দ্যাটস ফাইন৷ আমি তোমার ফিজিসিয়ান! নট ব্যাড৷ আচ্ছা স্যাংকসানড৷ বয়৷’ দু-কাপ কফির অর্ডার গেল৷ ‘নাও বয়েজ, কাম হিয়ার৷ আর একটু বাকি আছে৷’
আমাদের সবক’টা মাথা আবার ঝুঁকে পড়ল কাগজের ওপর৷
‘এইবার ভরা পেটে তোমাদের দুটো সাংঘাতিক ইংরেজি শব্দ শেখাব৷’ ডান হাতের সরু-সরু লম্বা দুটো আঙুল ভি-র মতো করে ডাঃ ল্যাং আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরলেন৷ আমাদের উৎসুক কয়েক জোড়া চোখ৷ ‘শব্দ দুটোর একটা হল ডায়াস্টোল, আর একটা সিস্টোল৷ বলো, তুমি বলো, রিপিট করো শব্দ দুটো’, পরেশের অগ্নিপরীক্ষা৷ বোধহয় একটু অন্যমনস্ক ছিল পরেশ৷ আমতা-আমতা করে বলল, ‘কাশীর টোল আর শেরশাহের টোল৷’
ডাঃ ল্যাং কিছুক্ষণ অবাক হয়ে পরেশের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ওরে আমার সোনার চাঁদ ছেলে রে! কী সেরিব্রাল পাওয়ার নবেন্দু’ তোমার দলে এরকম পাঁঠা আর কজন আছে? একে এখুনি কাটলেট করে খেয়ে ফেলা উচিত৷ গর্দভ৷ টোল শুনলেই বেদের টোল, পণ্ডিতমশায়ের টোল, টুল বলেনি এই আমাদের ভাগ্য৷’ প্রফুল্লদা বললেন, ‘ডায়াস্টোল সিস্টোল৷’ ডাঃ হাসি-হাসি মুখে প্রফুল্লদাকে বললেন—আঃ, হিয়ার ইজ মাই ব্রাইট ফ্রেন্ড৷ আরে, তোমার মগজে দেখছি ওই ইডিয়েটটার চেয়ে বেশি গ্রে-ম্যাটার আছে৷’ পরেশের মুখটা লজ্জায় লাল৷ হালভাঙা নাবিকের মতো বললে, ‘আমার মাথায় সহজে কিছু ঢুকতে চায় না৷’
‘ঢুকবে কী করে বাবা৷ তোমার মধ্যে ঢোকার যে একটি রাস্তা, মুখ দিয়ে উদরে৷ জ্ঞান জিনিসটা তো আর কাটলেট নয় যে, পরেশবাবু ফর্কে গেঁথে বিট বাই বিট মাস্টার্ড মাখিয়ে খেয়ে ফেলবে! তোমার দাওয়াই আমার পকেটে আছে৷’ পরেশ হুমড়ি খেয়ে ডাঃ ল্যাঙের পা জড়িয়ে ধরে আর কি, ‘আমাকে বাঁচান, অংকে তিরিশ, ইংরেজিতে বত্রিশ, লাইফ সায়েন্সে বাইশ৷’
‘স্পেলেনডিড৷ চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও৷ ঘষতে-ঘষতে পাথরও ক্ষয়ে যায়৷ একদিন তোমারও হবে৷ ইহ জন্মে কিংবা পরজন্মে৷’ পরেশ কিন্তু একেবারে ভেঙে পড়ল, ‘পরের বার এইরকম রেজাল্ট হলে বাবা বলেছেন, গম ভাঙার কলে লাগিয়ে দেবেন৷’
‘আ, এ ব্রাইট ফিউচার৷ কিন্তু সেখানেও যে হিসেব আছে বাবা, আচ্ছা নবেন্দু কী বলে? নবেন্দু, তোমার ফ্রেন্ডকে একটু ইনটেলিজেন্ট করে দেব?’ নবেন্দু এতক্ষণ চুপ করে ছিল৷ জিগ্যেস করল, ‘করা যায় নাকি?’ ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘যায় না বলে পৃথিবীতে কোনও শব্দ নেই৷ দেখবে যায় কি না? ডাঃ ল্যাংয়ের কাছে ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল৷ আর দেখাই গেছে, যে-কোনও চ্যালেঞ্জে তাঁর চেহারা৷
পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা রুপোলি কৌটো বের করলেন৷ কৌটোটার একটা দিক চাপ দিতেই খুট করে ডালাটা খুলে গেল, ভেতরটা গাঢ় নীল৷ সারি-সারি সাজানো সোনালি ট্যাবলেট৷ দু-আঙুলে একটা ট্যাবলেট তুলে নিয়ে বললেন, ‘ওয়ান ট্যাবলেট উইল ট্যান্সফর্ম ইউ৷ তোমার পার্সোন্যালিটি ভেঙে চুরমার করে, তোমার ভেতর থেকে আর একটা সেল্ফ বের করে আনবে৷ বাট মাইন্ড ইট, তোমার স্বভাব কিন্তু একেবারে পালটে যাবে৷ তোমার খাই-খাই ভাব কমে যাবে, ঘুম কমে যাবে, কথা বলার ইচ্ছে কমে যাবে৷’ পরেশ সোনালি ট্যাবলেটটা খাওয়ার জন্যে পাখির ছানার মতো বারবার হাঁ করছিল৷ ডাক্তার তাকে নিরাশ করে ট্যাবলেটটা আবার কৌটোয় ভরে রাখতে-রাখতে বললেন, ‘তোমার অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া এটা আমি তোমাকে দিতে পারব না৷ এ খেলে মানুষের ক্যারেকটার চেঞ্জ হয়ে যায়৷’ পরেশ দুঃখ পেলে কী হবে? আমাদের খুব আনন্দ হল৷ একা পরেশ বুদ্ধিমান হয়ে যাবে, আর আমরা সবক’টা যেমন ছিলুম তেমনি থাকব! তা কী করে হয়৷
‘তোমাদের আর প্রশ্ন করব না, কী বলতে কী উত্তর দেবে আমার কাটলেট খাওয়া-মেজাজটাই নষ্ট হয়ে যাবে৷ ডায়াস্টোল আর সিস্টোল হল হৃদস্পন্দনের দুটো পর্যায়৷ ডায়াস্টোল হল হার্টের বিশ্রামের সময়, যে সময় রক্ত অ্যাট্রিয়া থেকে ভেনট্রিকলে যায়৷ সিস্টোলের সময়, ভেনট্রিকল ভীষণভাবে সঙ্কুচিত হয়৷ রক্ত তখন ফুসফুসের দিকে ছুটতে থাকে শিরা উপশিরায়৷ এই পর্যায়ে হৃদয়ের দুটো ভাগে স্পন্দন অদ্ভুতভাবে মিলে মিশে কাজ করে৷ ডায়াস্টোলের সময় হার্টের বাঁ এবং ডান প্রকোষ্ঠ হাত-পা ছড়িয়ে এই আমার মতো বসে থাকে৷ রিল্যাকসড৷ আমার এখন ডায়াস্টোল৷ সিস্টোলের সময় দুটোই সঙ্কুচিত হয়৷ ওই প্রফুল্লর গানের মতো৷’ প্রফুল্লদা ঠিক সেই সময় বিড়ির ধোঁয়া টানছিলেন৷
‘পরেশ কিছু বুঝছে বলে মনে হয় না, তবু আমায় বলতে হবে, বলা যখন শুরু করেছি, কি বলো নবেন্দু? না বন্ধ করব? রহস্যটা রহস্যই থেকে যাক, কি বলো? আমার সিক্রেট৷’ ডাঃ ল্যাং উদাস মুখে তাকিয়ে রইলেন৷ আমরা হই-হই করে উঠলুম, ‘তা কী করে হয়? আমরা যে হাঁ করে আছি শোনার জন্যে৷’ ‘তা হলে শোনো৷’ ডাঃ ল্যাং ডট পেন তুলে নিলেন হাতে, ‘সারা জীবন তোমরা যতদিন বাঁচবে, তোমাদের এই ছোট্ট হৃদয় নিয়মিত আপনি-আপনি স্বয়ংচালিত ঘড়ির মতো ধুকধুক করবে৷ যেদিন ইনি থামবেন সেদিন তোমার গণেশ উলটে যাবে৷ শরীরের প্রয়োজন অনুসারে ঠিক যতটা রক্ত যখন যে সময়ে পাম্প করা উচিত তাই করবে৷ কী করে তা সম্ভব! কে সেই যন্ত্রী যে আমাদের হৃদয়ের কারখানায় সারা জীবন বসে-বসে এর চলা নিয়ন্ত্রণ করছে! গোছা-গোছা বিশেষ একধরনের টিসু বা তন্তু হার্টের মধ্যে এমন কায়দায় জড়ানো আছে যারা এই ঘড়ির কায়দায় হৃদয়ের স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করছে৷ দক্ষিণ অ্যাট্রিয়ামের ওপর বসে আছে হার্টের ‘পেসমেকার’৷ ‘পেসমেকার মানে কী পরেশ?’ পরেশের বুদ্ধি খুলে গেছে, সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর, ‘আজ্ঞে পেসকার৷ কোর্টে পাওয়া যায়৷ আমার মামা পেসকার ছিলেন স্যার৷’
ডাঃ ল্যাং, ‘উরে বাবারে’ বলে দুটো হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরলেন৷ পরেশ যেন গুলি করেছে৷ ‘নাঃ, সোনালি ট্যাবলেট এই গবেটটাকে খাওয়াতেই হবে৷’ ডাঃ ল্যাং পাইপ খুঁচতে-খুঁচতে বললেন, ‘পেসমেকারের নাম সাইনো অরিকিউলার নোড৷ এই পেসমেকার প্রতি মিনিটে হার্টের স্পন্দন ৬০ থেকে ৯০ বারে ধরে রেখেছে৷ পরেশ নামটা একবার রিপিট করবে নাকি? না বাবা দরকার নেই, এখুনি হয়তো বলে বসবে সাইনো সোভিয়েট প্যাক্ট৷ এই যে মিনিটে ৬০ থেকে ৯০ বারের স্পন্দন, এই স্পন্দন বাম এবং ডান অ্যাট্রিয়ার দেওয়াল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে কী হচ্ছে, হার্টের সঙ্কোচন৷ এইবার আর একটা দাঁতভাঙা নাম বলি—ইন্টার আট্রিয়াল সেপটাম৷ বাম এবং ডান অ্যাট্রিয়ার সীমানায় ইনি প্রহরী৷ প্রহরী কেন, আর-এক যন্ত্রবিৎ, যিনি আর-একটি স্পন্দনের ঢেউ তুলে রেখেছেন, যার নাম রাখা হয়েছে এ ভি৷ বড় করে বললে এট্রিয়ো ভেনট্রিকিউলার নোড৷ এই এ ভি আবার স্পন্দনটাকে রিলে করে দিচ্ছে ভেনট্রিকলের গা বেয়ে, যার ফলে ভেনট্রিকল দুটো একইভাবে সঙ্কুচিত হচ্ছে৷ হৃদয় তাই ময়ূরের মতো নাচছে কি না জানি না, তবে গান গাইছে লাবডুব-লাবডুব৷ হার্টকে আমাদের যে সিসটেম নাচাতে পারে, হৃদয়হীন কিংবা হৃদয়বান করে তুলতে পারে, তিনি বসে আছেন এই ব্রেন সেন্টারে৷ পরেশেরও আছে৷ আমরা বলি না—ভয়ে বুক কেঁপে গেল, আনন্দে তিড়িক-তিড়িক করে নেচে উঠল, গর্বে দশহাত হল! এ সব অনুভূতি-রাজ্যের জিনিস৷ ব্রেনের এইসব অনুভূতি দুটি আলাদা রাস্তায় ব্রেন থেকে হৃদয়ে নেমে আসে৷ একটি পথ—ধরো ন্যাশনাল হাইওয়ে-১—যার নাম সিম্প্যাথেটিক প্যাথওয়েস, ব্রেন থেকে হার্টে এসেছে৷ এই রাস্তায় যে অনুভূতি আসে তা আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন বাড়িয়ে দেয়৷ আর এন এইচ দুই, যার নাম প্যারা সিমপেথেটিক প্যাথওয়েস, সেই রাস্তা এসেছে মেরুদণ্ড থেকে হৃদয়ে৷ দুঃখ, ভয়, আনন্দ এইসব অনুভূতি ব্রেন থেকে সোজা এই দু-রাস্তায় হৃদয়ে নেমে এসে তার স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে৷ বুঝলে কিছু? ঘোড়ার ডিম বুঝেছ৷’
ডাঃ ল্যাং আর একবার পাইপ ধরালেন৷ ‘এইবার তোমাদের আর্টারির কথা বলব, কিন্তু তার আগে, ডোন্ট মাইন্ড, এক কাপ কফির অর্ডার দি৷ বক-বক করে গলা শুকিয়ে গেছে৷ বয়-বয়৷’ ডাক্তার কফির অর্ডার দিলেন৷ ‘রক্ত, বুঝলে নবেন্দু, অ্যায়োর্টা দিয়ে হার্ট থেকে বেরিয়ে আসে কলকলিয়ে, আমাদের শরীরের সব চেয়ে বড় ঘমনী৷ কৃষ্ণা, কাবেরী কিংবা গঙ্গা৷ আমার দেহের ওপরের খোলসটা যদি ছাড়িয়ে ফেল, তাহলে তোমাদের কি মনে হবে জানো?—আমি যেন একটা গাছ৷ অসংখ্য শিরা-উপশিরার শাখা-প্রশাখা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ সবচেয়ে বড় ন্মনীর প্রবাহপথে হৃদয় ত্যাগ করে রক্তের নদী হার্ট থেকে যত দূরে যাচ্ছে, ততই ছোট-ছোট শাখা-নদীতে ঢুকে পড়ছে৷ যে সংকোচনকে আমরা সিস্টোলিক বলছি, সেই চাপে রক্ত ছুটছে ঘমনীতে, শিরা-উপশিরায়, সমস্ত দেহকাণ্ডে৷ কবজির কাছে নাড়িতে আঙুল ছোঁয়ালে যে স্পন্দন আমরা অনুভব করি সেইটাই হল হার্টের সিস্টোলিক কনট্রাকশন বা আমরা সাধারণ ভাবে যাকে বলি পাল্স৷ দাঁড়াও এইবার একটু কফি খাই৷ আয়্যাম ড্যাম থার্স্টি৷’
কফি খেতে-খেতে ডাঃ ল্যাঙের পেটটা যেন কফির ট্যাঙ্ক হয়ে গেল৷ বৈজ্ঞানিকদের ব্যাপারই আলাদা৷ ‘এইবার শোনো, এই যে আমাদের সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা আর্টারি, এ তোমার জলের পাইপের মতো শুধু রক্ত বহন করে না, এদের আবার কিছু নিজস্ব ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা৷ এই আর্টারি বা ঘমনী বেশ মোটা, তাদের ভেতরের দেওয়ালে আছে ইল্যাসটিক টিসু৷ হার্টের সিস্টোলিক সংকোচনে যেই রক্তের প্রবাহ বাড়ে অমনি এই ইল্যাসটিক টিসুর আবরণে আবৃত আর্টারি প্রসারিত হয়ে সেই বাড়তি রক্তধারা প্রবাহের পথ করে দেয়৷ আবার ডায়াস্টোলের সময় স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ একবার ফুলছে আবার পরক্ষণেই কুঁচকে যাচ্ছে৷
‘সরু ঘমনীর ভেতরের দেওয়ালের মসৃণ পেশিরও কিছু কাজ আছে৷ তুমি অলস বসে থাকতে পারো হাত-পা ছড়িয়ে কিন্তু তোমার শরীরের ভেতরে সিসটেম বসে নেই৷ সবসময় তারা নিজেদের কাজ করে চলেছে৷ আমাদের স্নায়ুমণ্ডলীর স্বয়ংক্রিয় শাখার অতি সূক্ষ্ম লেজগুলো এই মসৃণ পেশি-দেওয়ালে লেপ্টে আছে৷ এদের বলে আর্টারিয়োল, বেশ শোরগোলের জিনিস৷ এরা আমাদের সতর্ক প্রহরী৷ আমাদের শরীরের ভেতরের কাজকর্মের সঙ্গে আপনা-আপনি সঙ্গতি বজায় রেখে চলেছে৷ আমাদের স্নায়ুর চাহিদা অনুসারে এইসব আর্টারিয়োল বেড়ে গিয়ে কিংবা কমে গিয়ে শরীরের যে অংশে যেমন রক্তের প্রয়োজন তা পাঠাবার ব্যবস্থা করে৷ এরা সব গ্রেট ম্যানেজার৷’
ডাঃ ল্যাং কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা খালি করলেন৷ ডান হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করলেন৷ হাতের ঝকঝকে রিস্ট ব্যান্ড আলোয় ঝলসে উঠল, যেখানে আছে তার বিদ্যুৎশক্তির উৎস৷’
‘ঈল’ বলে একরকম মাছ আছে জানো? সিল নয় কিন্তু, ঈল৷’
আমাদের মধ্যে নবেন্দুর পড়াশোনাই বেশি৷ জানেও অনেক৷ সহজে ঠকে না৷ নবেন্দু বললে, ‘ঈল মাছ হল সামুদ্রিক বান মাছ গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এদের সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের যথেষ্ট কৌতূহল থাকা সত্বেও বিশেষ কিছু জানা সম্ভব হয়নি৷ এদের চাল-চলন জন্ম বৃত্তান্ত সবকিছুই রহস্যাবৃত ছিল৷ এখন অবশ্য এদের সম্পর্কে মানুষ অনেক কিছুই জেনেছে, আরও জানার চেষ্টা চলছে৷’
‘স্পেলেনডিড৷’ ডাঃ ল্যাং হাসি-হাসি মুখে নবেন্দুর পিঠ চাপড়ে দিলেন৷ ‘ঠিক বলেছ৷ ঈল হল জীব-জগতের বিস্ময়৷ ভূমধ্যসাগরের নাবিকরা একসময় যখনই ঈল ধরত দেখত সব মাছই বড়৷ ছোট মাছ কিংবা মাছের ডিম কখনওই তাদের জালে পড়ত না৷ তারা অবাক হয়ে ভাবত, ঈলের তাহলে কি বাচ্চা হয় না? এরা কি ডিম পাড়ে না? কিন্তু আমি তোমাদের হঠাৎ ঈল মাছের কথা বলছি কেন? কেন বলছি পরেশ?’
পরেশ বোকার মতো একটু হাসল৷ ডাঃ ল্যাং বড়-বড় চোখ করে প্রশ্নটা আবার করলেন৷ তিনি উত্তর চান৷ চুপ করে থাকলে চলবে না৷ অথচ পরেশ ঠেকে শিখেছে, যা জানে না তার উত্তর দেবার চেষ্টা করা মানেই, ডাঃ ল্যাঙের উপহাসে চুপসে যাওয়া৷ পরেশ বুদ্ধিমানের মতো বললে, ‘ঠিক জানি না৷’
‘গুড’৷ ডাক্তার বললেন, ‘ভেরি গুড৷ যা-তা বলার চেষ্টা করনি এর জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ৷ এই ঈল মাছেদের মধ্যে এক ধরনের ঈল আছে যাদের বলে ইলেকট্রিক ঈল৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটা গল্প শোনো৷ ডাক্তার পাইপ ধরাবার জন্যে একটু চুপ করলেন৷ পরেশ হাঁউ করে বিশাল একটা হাই তুলল৷ ডাক্তার আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দ্যাট? ঈলের কথা শুনে তুমি দেখছি শীলের মতো হাই তুলছ৷ তোমার বুঝি শুনতে ভালো লাগছে না৷ দেন আই স্টপ হিয়ার৷’
আমরা সকলে হই-হই করে উঠলুম, ‘না-না আপনি বলুন, আপনি বলুন৷’ পরেশটার মাথায় খটাস করে একটা গাট্টা মারতে ইচ্ছে করছিল৷ ডাঃ ল্যাং একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘দেন আই বিগিন৷’ আমরা সবাই সোজা হয়ে বসলুম৷
‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় একদল যুদ্ধ-ঘোড়া ইওরোপের একটা অগভীর নদী সাঁতরে পার হচ্ছিল৷ যুদ্ধ সম্ভার নিয়ে যাচ্ছিল আর কি৷ দেখা গেল এক একটা ঘোড়া জলে নেমেই যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠছে৷ চিঁ হিঁ হি হি করে চিৎকার করে উঠছে৷ মহা বিপদ, ব্যাপারটা কী? মেজর জেনারেল এগিয়ে এলেন ‘লেট মি সি, লেট মি সি৷’ স্বচ্ছ কাচের মতো জল৷ অজস্র ঈল মাছ সাপের মতো কিলবিল করছে৷ কী আর এমন বড় মাছ৷ লম্বায় এক-একটা তিরিশ বত্রিশ ইঞ্চির বড় হবে না৷ যে সমস্ত ঘোড়া যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠছে তাদের পায়ের কাছে এক একটা ঈল এসেই ছিটকে সরে-সরে যাচ্ছে৷ ওইটুকু মাছের কী এমন দাঁতের ধার, কী এমন কামড় যে, শক্তিশালী অত বড়-বড় ঘোড়া কাবু হয়ে পড়ছে! গবেষণার বিষয় অবশ্যই৷ দেখা গেল কামড় নয়, সামান্য স্পর্শেই ঘোড়া কাবু৷ ন্যাজ আর মুড়ো একসঙ্গে ঠেকলেই ঘোড়া যন্ত্রণায় লাফিয়ে উঠছে৷ ভঙ্গিটা অনেকটা সাপের ছোবলের মতো৷ স্বচ্ছ ঈল মাছ চলে এল বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার টেবিলে৷ একদল বিশেষজ্ঞ হুমড়ি খেয়ে পড়লেন৷ দেখা গেল সেই কাচের মতো স্বচ্ছ ঈলের মেরুদণ্ডের দুপাশে সারি-সারি সাজানো রয়েছে অণুর মতো ছোট-ছোট কোষ৷ মাইক্রোস্কোপিক৷ দেখতে গোলাকার৷ মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত সারি-সারি চলে গেছে৷ এই অণুকোষগুলিই হল তড়িৎ কোষ৷ মেরুদণ্ডের এক পাশটি হল পজিটিভ পোল অন্য পাশটি হল নেগেটিভ৷ ধনাত্মক আর ঋণাত্মক৷ এরাই হল ইলেকট্রিক ঈল৷
‘কোনও-কোনও ইলেকটিক ঈল ইচ্ছে করলে ৫০০ ভোল্টের মতো ডিরেক্ট কারেন্ট উৎপাদন করতে পারে নিমেষে, অক্লেশে৷ এখন একটা তুলনামূলক তথ্য দিলেই তোমরা বুঝতে পারবে এই বৈদ্যুতিক মাছের বিদ্যুৎশক্তি কতখানি৷ সাধারণ রাসায়নিক তড়িৎ কোষ ১.১ থেকে ২.১ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ-তরঙ্গ তৈরি করতে পারে৷ ড্যানিয়েল সেল ১.১ ভোল্ট, লিক্লানসে সেল ১.৫ ভোল্ট৷ সঞ্চায়ক কোষ বা স্টোরেজ সেল, যা মোটর গাড়িতে থাকে ২.১ ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে৷ আর ইলেকট্রিক ঈল ৫০০ ভোল্ট! ফ্যানটাসটিক, কী বলো? ফ্যানটাসটিক৷’ ডাঃ ল্যাং আপন মনে হাসতে লাগলেন৷ পাইপটাকে উলটো করে টেবিলে ঠুকতে-ঠুকতে তিনি যেন অন্য জগতে চলে গেলেন৷ আমরা যেন তাঁর সামনে নেই৷ শুধু নির্জন দুপুরে কাঠঠোকরা পাখির ঠোঁটের শব্দের মতো শব্দ হচ্ছে ঠক-ঠক-ঠক৷
এক সময় তাঁর তন্ময়তা কেটে গেল৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যেন এইমাত্র দেখা হল৷ কোনও প্রশ্ন করার সাহস হল না৷ নিজে থেকে যখন শুরু করবেন তখন করবেন৷ ধৈর্যই আমাদের মূলধন৷ ডাক্তার পাইপটা ধরাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ পাইপের মুখে আগুন দপ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল৷ একরাশ ধোঁয়ায় তাঁর মুখ চাপা পড়ে গেল অল্প সময়ের জন্যে৷ ধোঁয়া সরে গিয়ে তাঁর মুখ স্পষ্ট হতেই তিনি আবার শুরু করলেন৷
‘বুঝলে নবেন্দু, আমিও একটি বৈদ্যুতিক মানুষ, ইলেকট্রিক ম্যান, ঈল মাছের কায়দাতেই আমি ডিরেক্ট কারেন্ট তৈরি করছি৷ ঈল মাছের মেরুদণ্ডের দুপাশে সাজানো তড়িৎ কোষ খুলে বৈজ্ঞানিকরা আঠার মতো চটচটে এক ধরনের পদার্থ পেয়েছেন৷ এই জেলিই মাছের প্রাণ-তরঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বলে অনুমান৷ আমার শরীরেও আমি অস্ত্রোপচার করে অণু-তড়িৎ-কোষ প্রধান রক্তবাহী নালীর দুপাশে সাজিয়ে রেখেছি৷ আমার এই দুটো আঙুলের একটা ধনাত্মক, পজিটিভ পোল অন্যটা ঋণাত্মক, নেগেটিভ পোল৷ ধাবমান রক্তের প্রচণ্ড বেগ ও উত্তাপে ওইসব কোষে বিদ্যুৎ তৈরি হয়ে এই দুটো আঙুলের মাথায় এসে জমছে৷ দুটো আঙুল এক করে যাকে আমি স্পর্শ করব তার অবস্থা হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ওই ঘোড়ার মতো৷ যন্ত্রণায় ছিটকে পড়ে যাবে৷ মরবে না, সারা শরীর তার অবশ হয়ে পড়বে৷’
ডাক্তার আবার অন্য জগতে চলে গেলেন৷ চোখ বুজিয়ে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিয়েছেন৷ ঠোঁটের ডগায় পাইপ ঝুলছে৷ সরু ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ আমরা সকলে উন্মুখ শ্রোতা৷ ডাক্তার তাঁর সেই অন্য জগৎ থেকে ভারী গলায় বললেন, ‘এই আমার বুকের বাঁ-দিকে সেই শক্তির উৎস, আমার হৃৎপিণ্ড, আমাদের হার্ট৷ পানের মতো ছোট্ট এতটুকু একটা পেশিময় আকৃতি৷ ধমনীর এক প্রান্ত দিয়ে হু-হু করে লাল রক্তের স্রোত বয়ে আনছে৷ এক প্রকোষ্ঠ থেকে আর-এক প্রকোষ্ঠে, সেখানে রয়েছে বহু অশ্বশক্তিসম্পন্ন একটা পাম্প৷ সেই পাম্প প্রচণ্ড চাপে সমস্ত রক্ত ঠেলে দিচ্ছে শরীরের গোদাবরীতে, কৃষ্ণা, কাবেরীতে৷ শরীরের সমস্ত সেচ-ক্ষেত্রের পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদী ছোট-ছোট শাখায় সেই ধারাকে প্রবাহিত করে দিচ্ছে৷ তাই আমরা সফলা সূফলা, সবুজ, তরুণ, যৌবনের জোয়ার৷ এই তো, কান পেতে শোনো, অনবরত শব্দ করে পাম্প চলেছে৷ সেই রক্তনদীর স্রোতের মাঝখানে বসিয়ে রেখেছি আমার নিজের হাতের তৈরি ছোট্ট একটা টারবাইন৷ ঘুরছে, ঘুরছে সেই টারবাইন৷ তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ৷ সেই বিদ্যুৎ চলে আসছে আমার কৃত্রিম কোষে, আমার একাধিক পাওয়ার হাউসে৷ হাঃ-হাঃ, আমি এক সচল বিদ্যুৎ কেন্দ্র৷’ ডাক্তার হঠাৎ ঝাঁকানি দিয়ে উঠে বসলেন৷
আমরা একটু চমকে উঠলুম৷ সত্যি ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলুম৷ সাংঘাতিক মানুষকে বিশ্বাস নেই৷ গায়ে এতটুকু আঙুল ছুঁইয়ে দিলেই আমরা কাত৷ ডাক্তারের চোখে উদার হাসির ঝিলিক, মনে হচ্ছে যেন মিশনারি ফাদার৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নাও বয়েজ, লেট আস বিগিন আওয়ার একসপিডিশন নাম্বার টু৷ অপারেশন গিনিপিগ৷’ নবেন্দুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আমার সেই গিনিপিগ৷ যারা এতক্ষণ সারা স্টেশনে ছড়িয়ে পড়েছে৷ মাই পুওর অ্যানিম্যালস৷’
কফিখানা ছেড়ে আবার আমরা স্টেশনে৷ লোক ছুটছে৷ মানুষের মাথায় মাল ছুটছে৷ বিশাল ঘড়ির কাঁটা আটকে আছে বারোটার ঘরে৷ মাইকে গলার প্রতিধ্বনি৷ ‘আওয়ার নেকস্ট টেন ফর পাঞ্জাব৷’ এতক্ষণ যেন আমরা অন্য জগতে ছিলাম৷ রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো একটা ঘুম দিয়ে ২২শে মে-র সকাল বারোটায় কলকাতা অথবা হাওড়া স্টেশনের প্লাটফর্মে জেগে উঠেছি৷
পরেশ হঠাৎ নিচু হয়ে একটা ফলের ঝুড়ি উলটে দিল৷ প্রায় হামাগুলি দিয়ে কী যেন খুঁজছে৷ কোমরে দুহাত রেখে ডাক্তার বললেন, ‘কী হল পরেশবাবু৷ মোহর নাকি৷’ হাতের ধুলো ঝাড়তে-ঝাড়তে পরেশ উঠে দাঁড়িয়ে বোকার মতো হেসে বললে, ‘নেই!’
‘কী নেই?’
‘গিনিপিগ৷’
‘মাই গড! তুমি কি ভেবেছিলে ওরা তোমার জন্যে ওর তলায় অপেক্ষা করে বসে আছে! হাও ফানি মাই বয়৷’
পরেশ হন্তদন্ত হয়ে আর একদিকে ছুটছিল৷ ডাক্তার খপ করে তার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘নো নো, মাই বয়৷ ওভাবে নয়৷ সবকিছুরই একটা মেথড আছে৷ অ্যান্ড হোয়াট ইজ দ্যাট?’
আমরা ডাক্তারকে ঘিরে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম৷ সত্যিই তো! কোথায় তারা আছে৷ কীভাবে আছে৷ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম বিশাল এই স্টেশনে তারা ছড়িয়ে গেছে৷ হোয়াট ইজ দি মেথড?
মেথড! আমরা সকলে মেথডের অপেক্ষায় গিনিপিগ ধরা ভুলে ডাঃ ল্যাঙের চার পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি৷ প্রকাণ্ড স্টেশনের কোথায় কে ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে! একমাত্র ভগবান ছাড়া কারুর ক্ষমতা নেই সহজে তাদের উদ্ধার করে৷
নবেন্দু বললে, ‘মেথডটা বলুন৷’ ডাক্তার ল্যাং হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হাসলেন, তারপর বললেন, ‘আর দু-মিনিট অপেক্ষা করো৷ ডোন্ট মুভ৷ যে যেখানে আছ সেইভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো৷ লেট আস প্রে ফর দেম৷’ ডাক্তার নিচু হয়ে খাঁচার দরজাটা খুলে উত্তরমুখো পায়ের কাছে বসিয়ে রাখলেন৷ খুবই রহস্যজনক ব্যাপার৷ ব্যস্ত স্টেশনে মালপত্র, লোকজন চারপাশ দিয়ে স্রোতের মতো হু-হু করে ছুটে চলেছে আর আমরা একটা দল স্থির হয়ে পেঙ্গুইন পাখির মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি৷ দূর থেকে দেখলে মনে হবে আমরা ক’জন কোনও প্রিয়জনের মৃত্যুতে দু-মিনিট নীরবতা পালন করছি যেন৷
হঠাৎ সাদা মতো একটা কী ঝড়ের বেগে খাঁচায় ঢুকে গেল৷ প্রথমে মনে হয়েছিল বন্দুকের নলের মুখ থেকে বুঝি ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছিটকে এল৷ দেখতে-দেখতে আর একটা, তারপর আবার একটা৷ পটা-পট একের-পর-এক খাঁচায় এসে ঢুকছে ঝড়ের বেগে৷ ঢুকেই লুটিয়ে পড়ছে অবশ হয়ে৷ নবেন্দু চুপ করে থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, ‘কী রে বাবা, ভূতুড়ে ব্যাপার নাকি!’ ডাক্তার নবেন্দুর পিঠে আদরের হাত রেখে বললেন, ‘অনেকটা তাই৷ প্রকৃতির শক্তি আর সাধারণ নিয়মকানুনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেই তুমি ভৌতিক শক্তির অধিকারী হবে৷ যেমন ধরো, এই মুহূর্তে আমি যদি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি জয় করে গ্যাস বেলুনের মতো আকাশে ভাসতে থাকি, তুমি ভাববে আমি ভীত হয়ে গেছি৷ আমি যদি হঠাৎ ঝাপসা হতে-হতে অদৃশ্য হয়ে যাই, তোমরা ভয় পেয়ে যাবে৷ ভেবো না এসব একেবারে অসম্ভব ব্যাপার৷ ভূতে যা পারে মানুষও তা পারে৷ তবে হ্যাঁ, সাধনা চাই, শিক্ষা চাই৷’ কথা বলতে-বলতে ডাক্তার নিচু হয়ে খাঁচাটা দেখতে লাগলেন৷ গুনে-গেঁথে বললেন, ‘ওয়ান শর্ট৷ আর-এক ব্যাটা গেল কোথায়?’
প্রফুল্লদা বললেন, ‘একটা যে কুকুরের পেটে গেছে৷’
‘দ্যাটস রাইট, থ্যাঙ্ক ইউ মাই ফ্রেন্ড৷’ ডাক্তার খাঁচার দরজাটা বন্ধ করে সোজা হলেন আর ঠিক সেই মুহূর্তে সারা স্টেশন কাঁপিয়ে একটা কুকুর ঘাঁউ-ঘাঁউ করে ডেকে উঠল৷ বিশাল একটা অ্যালসেশিয়ান আমাদের দিকে তেড়ে আসছে, পিছনে চেন ধরে ঘষটাতে-ঘষটাতে আসছেন কুকুরের মালিক৷ সামাল-সামাল রব উঠেছে চারদিকে! কুলিরা মাল ফেলে পালাচ্ছে৷ যাত্রীরা ভয়ে এ ওর ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন৷ খাঁচার সামনে এসে কুকুর শান্ত হল৷
ডাক্তার বললেন, ‘এসেছিস৷ দে, আমার মাল বের করে দে৷ খাবার সময় মনে ছিল না, কান ধরে টেনে আনব!’ ক্ষতবিক্ষত মনিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী, কতদূর থেকে টেনে নিয়ে এল? খুব তো বোলচাল মেরেছিলেন তখন, এখন সামলান ঠ্যালা!’
ভদ্রলোক হাঁপাতে-হাঁপাতে জামা-কাপড়ের ধুলো ঝাড়তে-ঝাড়তে বললেন, ‘মশাই সবে স্টেশন থেকে বেরিয়ে শিবপুরের দিকে পা বাড়িয়েছি, কুকুরটা বেশ যাচ্ছিল সামনে-সামনে, হঠাৎ কী হল—চনমন-চনমন করে উঠল কয়েকবার, কান দুটো খাড়া হয়ে উঠল, এদিক-ওদিক তাকাল, ফোঁস-ফোঁস করে মাটি শুঁকলো কয়েকবার৷ তারপর উলটোদিকে মারল এক হ্যাঁচকা টান৷ তৈরি ছিলাম না তো, উলটে পড়ে গেলুম৷ ভাগ্যিস ছেড়ে যায়নি হাত থেকে৷ কোনওরকমে উঠলুম৷ সামলানো যায়, এত বড় কুকুর! সেই থেকে হিড়হিড় করে টেনে আনছে৷ রাসকেল কুকুর, অদ্যই তোর শেষ রজনী৷’ ভদ্রলোক রেগে গিয়ে কুকুরকে জুতোপেটা করতে যাচ্ছিলেন৷ ডাক্তার থামিয়ে দিলেন, ‘করছেন কি! কুকুর কিংবা মানুষ কারুকেই মারধোর করা উচিত নয়৷ দ্যাটস ভেরি ব্যাড৷ শিক্ষা দেবার ওটা ঠিক রাস্তা নয়৷ তাছাড়া কুকুরের তো দোষ নেই৷ দোষ ওর আহারের৷ পুওর ক্রিচার! লোভে পড়ে সেই গিনিপিগ খেয়ে মহা বিপদে পড়েছে৷ গিনিপিগ হজম হয়ে যাবে, হজম হবে না হাই ফ্রিকোয়েনসি রিসিভিং সেটটা৷ যতদিন ওটা পেটে থাকবে ততদিন ওকে ছটফট করতে হবে৷’
ভদ্রলোক প্রায় আঁতকে উঠলেন, ‘অ্যাঁ, বলেন কী! রেডিও খেয়ে ফেলেছে! রেডিও কি খাবার জিনিস? শুনেছি ছাগলে কি না খায়! কুকুরেও কি তাই!’
ডাক্তার বললেন, ‘রেডিও খেয়েছে বললে ওই মূক জন্তুটির প্রতি অবিচার করা হবে৷ আসলে আপনার কুকুর গিনিপিগের ক্যাপসুলে একটি ছোট সেট গিলে ফেলেছে৷ চিবিয়ে ফেললে অসুবিধে ছিল না৷ গিলে ফেলায় সেটটির কর্মশক্তি অটুট আছে৷ এবং দীর্ঘকাল তাই থাকবে৷ এবং—‘ডাক্তার এই এবং দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করলেন যার অর্থ—বোঝো বাছা কত ধানে কত চাল!’
ভদ্রলোক করুণ মুখে ডাক্তারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, ‘একটা কিন্তু ভালো হবে৷ সারাদিন ঘেউ-ঘেউ না করে হাঁ করলেই বিবিধ ভারতী বেরোবে৷ কী মজা, কী মজা৷’ কুকুরের মালিকের শিশুর মতো আনন্দ দেখে পরেশ আহ্লাদে আটখানা৷ থাকতে না পেরে বলেই ফেললে, ‘কুকুরটা আপনার বহুব্রীহি সমাস হয়ে গেল, কুকুরও যে রেডিও ও সে—ইজ ইকোয়াল টু রেডিও-কুকুর বা কুকুর-রেডিও৷’ নবেন্দু পরেশের পাণ্ডিত্য থামিয়ে দিল৷
আমার মতো নবেন্দুর মাথাতেও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে৷ কীভাবে গিনিপিগগুলো ফিরে এল আপনা আপনি, কুকুরটাই বা দৌড়ে এল কেন? বুদ্ধি দিয়ে তো এর ব্যাখ্যা করা চলে না৷ পায়েড পাইপার অফ হ্যামলিনে অবশ্য পড়েছি, বাঁশি বাজিয়ে সমস্ত ইঁদুর বের করে আনার কথা৷ সেখানে সুর ছিল, সুরের আকর্ষণ ছিল, কিন্তু এখানে? শব্দ নেই, সুর নেই, চুপচাপ আমরা শোক প্রস্তাব নেবার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলুম আর চোখের সামনে ঘটে গেল অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! নবেন্দু প্রশ্নটা চেপে রাখতে পারল না৷ ‘কী করে কী করলেন আমাদের একটু বুঝিয়ে দিন!’
ডাক্তার ডানহাতের একটা আঙুল উঁচু করে বললেন, ‘বলব, বলব, সময় মতো সব বলব তার আগে এই কুকুরটা বিদায় করি৷ তা না হলে এই কুকুরও আমাদের নিয়ে যেতে হবে নবেন্দু৷’
‘নিয়ে যাবেন,’ কুকুরের মালিক যেন হাতে চাঁদ পেলেন৷ ‘বেশ তো, বেশ তো, যান না নিয়ে, এই চেন আর বগলস সুদ্ধই নিয়ে যান, আমার কোনও আপত্তি নেই৷ এই প্যাকেটটাও আমি ফ্রি দিয়ে দিচ্ছি?’ ভদ্রলোক পকেট থেকে ডগবিস্কুটের একটা প্যাকেট বের করলেন৷ কুকুরকে শান্ত করার জন্যে এইমাত্র হয়তো কিনেছিলেন৷ ডাক্তার ল্যাঙকে ছেলে ভোলাবার মতো করে ভুলিয়ে-ভালিয়ে দামড়া একটা অ্যালসেশিয়ান গছাতে চান আর কি!
ডাক্তার বললেন, ‘কোনও প্রয়োজন নেই, আপনার কুকুর আপনারই থাকবে৷ আমার সংগ্রহে পঁচাত্তর রকমের দুশো একটা কুকুর আছে৷ কয়েক বছরের মধ্যেই চারশো চারটে হবে৷ আমার কুকুর নিবাসে আপনার এই আনট্রেন্ড কুকুর চলবে না৷’
‘মাই গড!’ ভদ্রলোক বড়-বড় চোখ করে বারো নম্বর প্লাটফর্মের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, ‘টু হান্ড্রেড ওয়ান এন্ড ফোর হান্ড্রেড ফোর!’ তারপর হালভাঙা নাবিকের মতো করুণ অসহায় গলায় বললেন, ‘একে নিয়ে যাব কী করে, থেবড়ে বসে আছে খাঁচার সামনে৷ একে সামলাবো কী ভাবে!’
সে ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি৷ ডোন্ট ওয়ারি৷ সুড়সুড় করে মুষিকের মতো এই বিটকেল কুকুর আপনার পিছনে-পিছনে বাড়ি চলে যাবে৷’ ডাক্তার এই কথা বলতে-বলতে কোটের ডান পকেট থেকে ছোট্ট একটা স্প্রেয়ার শিশি বের করলেন৷ শিশিটা দেখে ভদ্রলোক একটু ভয় পেলেন মনে হল৷ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই ডাক্তার সিঁ-সিঁ করে খানিকটা আরেক ভদ্রলোকের গায়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন৷ অদ্ভুত একটা গন্ধ! সেন্টের সুবাস নয়৷ কেমন যেন একটা গন্ধ, একটা কুকুর-কুকুর গন্ধ৷
‘একী করলেন?’ ভদ্রলোকের অভিযোগের গলা৷
‘কিছুই করিনি, কিছুক্ষণের জন্যে আপনাকে কুকুর করে দিলুম৷’ ডাক্তার অমায়িক হেসে পিঠ চাপড়ে দিলেন, ‘নাও ইউ আর এ ডগ, স্বভাবে নয়, গন্ধে! শত চেষ্টা করলেও স্বভাবে কুকুর হতে পারবেন না৷ কুকুরের মতো অত গুণ মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়৷ যান, এবার আস্তে-আস্তে বাড়ি চলে যান৷ বাট বি কেয়ারফুল৷’
‘কেন, কেয়ারফুল হতে বলছেন কেন?’
‘কেয়ারফুল হতে হবে এই কারণে, রাস্তায় নিশ্চয়ই আরও অনেক কুকুর আছে!’
‘তা নেই! শিবপুরের রাস্তায় নেড়ি কুকুরের ছড়াছড়ি৷ অনবরতই লটাপটি ঝগড়া৷’
তবেই বুঝছেন কেন সাবধান হতে বলছি৷ মানুষ যেমন চোখ দিয়ে মানুষ চেনে, কুকুর চেনে ঘ্রাণ দিয়ে৷ নবেন্দু, সেই ছড়াটা কী?’ নবেন্দু সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, ‘রতনে রতন চেনে ভাল্লুকে চেনে শাঁকালু৷’ ডাক্তার বললেন, ‘তোমার আই কিউ তো খুব ভালো, ভেরি গুড৷ তোমার ওই ছড়াটাকে একটু অন্যরকম করে দিই কেমন? কুকুরে কুকুর চেনে, ভৃত্য চেনে মনিব৷ পরেশ, ইংরেজি করো দেখি!’
পরেশ এতক্ষণ ফ্যাল-ফ্যাল করে একঝুড়ি কলার দিকে তাকিয়ে অল্প-অল্প ঢোঁক গিলছিল, চমকে ফিরে তাকাল হঠাৎ যেন ধরা পড়ে গেছে! আসলে মনে-মনে পরেশ কলা খাচ্ছিল৷ প্রশ্নটা পরেশের কানেই ঢোকেনি৷ ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এতক্ষণ ছিলে কোথায়, কোন জগতে শুনি?’
‘ও ছিল কলার জগতে’—না বলে পারলুম না৷
‘কলা? মানে আর্ট?’ ডাক্তার বেশ অবাক হলেন৷
‘মানে প্ল্যানটেন, ওই যে ঝুড়িতে, বড়-বড় সবুজ৷’
‘আই সি, আই সি, ব্যানানা, বেবুন লাইক ইনস্টিংকট৷’ হই-হই করে হেসে উঠলেন৷ ‘যাক, ইংরেজিতে আর দরকার নেই, খুব হয়েছে, নাও লেট আস মুভ৷’ ডাক্তার গিনিপিগের খাঁচাটা হাতে তুলে নিলেন৷ সামনে জিভ বের করে বসে থাকা অতবড় একটা কুকুরকে একটুও ভয় করলেন না৷
ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে জিগ্যেস করলেন, ‘তা হলে আমি!’
‘আপনিও এবার বাড়িমুখো৷ একটু সাবধান, আপনার সামনে-সামনে চলবে আপনার কুকুর, পিছন-পিছন আরও গোটাকতক অনুসরণ করতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে কামড়াকামড়ি করতে পারে৷ ভয়ের কী আছে? হাসপাতাল আছে, তলপেটে ইনজেকশনের ব্যবস্থা আছে৷ নিয়ে নেবেন চোদ্দোটা কি চব্বিশটা৷’ দ্বিতীয় কোনও কথা না বলে ডাক্তার হনহন করে এগিয়ে চললেন ওয়ার্ডের দিকে৷ ডাক্তার যখন বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছেন নবেন্দু চিৎকার করে জিগ্যেস করল, ‘আমরা, আমরা তা হলে যাই৷’
‘তোমরা, তোমরা আমার অতিথি হতে পারো৷’ ডাক্তার পা দুটো অল্প ফাঁক করে আমাদের দিকে ফিরে তাকালেন, ‘চলে এসো, চলে এসো, কাম অন মাই বয়েজ৷ ইয়ার্ডে অপেক্ষা করছে আমার সেলুন কোচ, প্রচুর জায়গা, প্রচুর খাবার, অনেক বিস্ময়, অনেক প্রশ্ন, অনেক উত্তর৷’
প্রফুল্লদা ফিসফিস করে বললেন, ‘অচেনা লোকের সঙ্গে যাবে খোকাবাবু! লোকটা বড় সাংঘাতিক৷ কী বলতে কী করে দেবে৷’ প্রফুল্লদা এত আস্তে বললেন—অতদূর থেকে এই ব্যস্ত কলরবময় প্লাটফর্মে ডাক্তারের শুনতে পাবার কথা নয়৷ ডাক্তার কিন্তু হাত নেড়ে বললেন, ‘আর অচেনা নেই৷ অনেকক্ষণ আমাদের পরিচয় হয়ে গেছে৷ লোক আমি সাংঘাতিক, তবে ছেলেধরা নই আমি একজন বিজ্ঞানী৷ নবেন্দু, আসতে চাও তো চলে এসো তোমার দলবল নিয়ে৷ তোমরা না অ্যাডভেনচারের সন্ধানে বেরিয়েছ!’ ডাক্তার মিলিটারি কায়দায় ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা-সোজা পা ফেলে এগিয়ে চললেন৷
নবেন্দু বললে, ‘আমি যাবই৷ তোমার ভয় থাকলে বাড়ি ফিরে যেতে পারো৷’ অত দূরে ডাক্তার অথচ কানের পাশে গুনগুনে মাছির মতো গলা শুনলুম ঃ ‘এই তো চাই, সাবাস নবেন্দু! উপনিষদে পড়েছ না, ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য৷’ দুর্বল হলে, ভীরু হলে জীবনের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যায় না৷’
খাতার পাতায় যেমন পাশাপাশি অজস্র লাইন থাকে, হাওড়ার রেল ইয়ার্ডে ঠিক সেই ভাবে পাশাপাশি পাতা আছে ইস্পাতের সরল রেখা, বাঁকা রেখা৷ পরেশের খাতার জ্যামিতির হিজিবিজির মতো৷ মাঝে-মাঝে রোদে ঝলসে উঠছে৷ সময়-সময় আপনাআপনিই লাইনে-লাইনে খটখটাস করে জোড়া লেগে যাচ্ছে৷ কী যেসব কাণ্ড হচ্ছে বোঝার উপায় নেই৷ দূর থেকে দেখতে ভালোই লাগে৷ মাঝে-মাঝে এক-একটা লাইন ধরে এক একটা বগি আপন মনে নিরুদ্দেশে চলেছে৷
ডাঃ ল্যাং উঁচু প্ল্যাটফর্ম থেকে তিড়িং করে লাফিয়ে লাইনে নামলেন৷ জোড়া রেল লাইন পেরোতেই বুক কেঁপে যায় আর এত জোড়া-জোড়া লাইন৷ আমাদের দিকে না তাকিয়েই পিছন দিকে হাত নেড়ে বললেন, ‘কাম অন বয়েজ৷’ নবেন্দুর দেখাদেখি আমরাও পটাপট লাফ মারলুম৷ পরেশটা ভয়ে দোনামনা করছে৷
‘কী রে আয়? যাবি না?’
‘যদি কাটা পড়ি!’
‘পড়লে আমরা সবাই একসঙ্গে পড়ব৷ ভাবিসনি, ঝাঁপিয়ে পড়৷ ভাবলেই মরবি৷ টকা-টক লাইন পেরিয়ে চলে আয়, ওই দেখ ওরা কত দূর চলে গেছে৷’
শুকনো মুখে পরেশ একবার তাকিয়ে দেখল৷ লাল একটা বগি দূরে আপন মনে গড়িয়ে চলেছে৷ সাঁতার না জানা ছেলের মতো পরেশ ইয়ার্ডে লাফিয়ে পড়ল৷ এপাশে-ওপাশে ছোট-ছোট কেবিন৷ দোতলাটা কাচের৷ জাহাজের কাপ্তেনের ঘরের মতো৷ বুক পর্যন্ত একটি করে লোক কি কলকাঠি নেড়ে চলেছে! সারাদিন লাইনে-লাইনে জোড়া লাগানোর খেলা৷ দূরে একটা ট্রেন ঢুকছে৷ কেন্নোর মতো গুটিগুটি এঁকে-বেঁকে৷ কোন লাইনে আসবে কে জানে! ডাঃ ল্যাঙই আমাদের ভরসা, আমাদের গাইড৷ জোড়া-জোড়া লাইনের মাঝে-মাঝে ঘাসে ঢাকা জমি৷ মাটির ফুটখানেক ওপর দিয়ে সারি-সারি তার চলে গেছে৷ একটু অন্যমনস্ক হলেই ল্যাং খেয়ে আছড়ে মরতে হবে৷ পরেশ আর একটু হলেই পড়ে মরছিল৷ আমার কাঁধে ভর রেখে সামলে গেল৷
একটু দূরেই একটা সাদা ধবধবে বগি দাঁড়িয়ে৷ চারপাশে নীল সুন্দর বর্ডার৷ সমস্ত জানলার শাটার বন্ধ৷ কাচের গায়ে ঝাপসা হয়ে আছে যেন ভোরের কুয়াশা৷ মনে হল, ডাঃ ল্যাং ওই দিকেই চলেছেন৷ উনি যে কত দ্রুত হাঁটতে পারেন! এক ফুট দেড় ফুট উঁচু তারের রেখা শিশুর মতো লাফিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছেন৷ কিছুই না যেন, খেলা, নীল বর্ডার দেওয়া সাদা ধবধবে বগিটা যেন রহস্যের মতো ইস্পাতের ঝকঝকে জোড়া লাইনে অক্ষরের মতো দাঁড়িয়ে৷ ভেতরে হিম কুয়াশা৷ প্রফুল্লদা আরও একবার ফিসফিস করে বললেন, ‘ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না হে৷ বগিটার রং দেখেছ! এই রকম রঙের বাক্সে বরফের চাঙড়ার ওপর মৃতদেহ শুইয়ে রাখে৷ আমি বহুদিন স্বপ্নে এই রকম গাড়ি দেখেছি৷ ভেতরে বরফের গুহা, বিশাল একটা সাদা ভাল্লুক নখ দিয়ে আঁচড়ে-আঁচড়ে একটা শরীরের খানিকটা পা বের করে ফেলেছে৷ পা-টা মোমের মতো সাদা৷’
প্রফুল্লদার কথা শুনে পরেশ লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছিল৷ ছুটে পালাতে যাচ্ছিল ভয়ে৷ প্রফুল্লদা খপ করে হাত চেপে ধরলেন৷ আর ঠিক সেই সময় পাশের লাইন দিয়ে একটা দূর পাল্লার টেন দিগবিদিক কাঁপিয়ে স্টেশনের দিকে চলে গেল৷ হাওয়ার ঝাপটায় চুল পোশাক এলোমেলো হয়ে গেল৷ ডাঃ ল্যাং তিরষ্কারের গলায় বললেন, ‘মানুষ ভয়েই মরে, বুঝলে পরেশ চন্দ্র৷ ভয়টা কীসের শুনি?’ পরেশ নিজেকে বাঁচাবার জন্য বেমালুম বলে দিল, ‘প্রফুল্লদা বললেন, ওই সাদা বগিটার মধ্যে বরফের চাঙড়ায় ডেড বডি শোয়ানো আছে৷’
ডাঃ ল্যাং হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ হাসতে-হাসতেই পকেট থেকে সিগারেট বাক্সের মতো ছোট্ট একটা বাক্স বের করলেন৷ বাকসটার গায়ে টেলিফোন ডায়ালের মতো ছোট একটা গোল চাকা লাগানো৷ চাকাটা বার কতক ঘোরালেন৷ সঙ্গে-সঙ্গে বগিটায় ঢোকার দরজা চিচিং ফাঁকের মতো দুপাশে শব্দ করে সরে গেল৷ সেই ভীষণ গরমেও একটা হিম ঠান্ডা বেরিয়ে এসে আমাদের কাঁপিয়ে দিল৷
সাইবেরিয়ার ভাল্লুক
কেটে রাখা রেলের কামরার ভেতরটা নীল, ভোরের কুয়াশা ঢাকা আকাশের মতো ঝাপসা৷ দরজা খুলে যেতেই কে একজন দুপাশে হেলে দুলে এগিয়ে এল৷ বিশাল দরজা জোড়া চেহারা৷ কে রে বাবা কোনও পালোয়ান নাকি—ডাঃ ল্যাং বললেন, ‘আলি, মিট মাই ফ্রেন্ডস৷’ আলির মুখে এই মোটা একটা চুরুট৷ গল-গল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ গায়ে যেন একটা সাদা ফারের কোট পা পর্যন্ত নেমে এসেছে৷ আলি হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্যে৷ সামনেই নবেন্দু৷ তাকেই আগে শেকহ্যান্ড করতে হবে৷ ওই হাতের সঙ্গে হাত মেলাতে ভয় হবারই কথা৷ কালো ভাল্লুক রাস্তায় দেখেছি ভাল্লুক-নাচওলা যখন নাচাতো৷ এ একেবারে সাদা৷ নবেন্দু হাতে হাত মেলালো৷ আলি চুরুট মুখেই হুমহুম করে দুবার শব্দ করল৷ চিড়িয়াখানায় শিম্পাঞ্জিকে চুরুট খেতে দেখেছি৷ ভাল্লুকও চুরুট খায়! গ্যালোস দিয়ে প্যান্ট পরে! দু-পায়ে দাঁড়ায়! এমন ঘটনা সার্কাসেও দেখিনি৷ ভাল্লুকের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে ভেবে পরেশ আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেউ-ভেউ করে কেঁদে ফেলল৷ ‘তোরা আমাকে বাড়ি রেখে আসবি চল ওর সঙ্গে এক কামরায় যাওয়ার মানে জানিস তুই! এক-এক খাবলা করে আমাদের সব কটাকে খেয়ে শেষ করে ফেলবে৷ ওরে, আমি বাঁচতে চাই৷ বিশ্বাস কর, এবার থেকে খুব মন দিয়ে লেখাপড়া করব৷’
আমাকে কিছু বলতে হল না৷ ডাক্তার পরেশের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আবার ভয়! জানো, সাইবেরিয়ার এই আলির স্বভাব মানুষের চেয়ে অনেক ভালো! অনেকটা দেবতার মতো৷ মাছ, মাংস, ডিম ছোঁয় না৷ মধু, দুধ, ফল ভেজিটেবিল খায়৷ ইজিচেয়ারে শুয়ে-শুয়ে চুরুট খায়, গান শোনে৷ মাঝে-মাঝে আইসক্রিম খায়৷ সময়-সময় একটু নাচে৷ গেট ইন বয়েজ! আর মাত্র আধ ঘণ্টা সময় আছে৷ তারপর মেন লাইনের ট্রেনের সঙ্গে এই বগি জুড়ে যাবে৷ তারপর? তারপর বলতে পারো কি হবে নবেন্দু?
নবেন্দু বললে, ‘যাত্রা হবে শুরু৷’
আমরা একে-একে সেই শীতল সুন্দর ঘরে ঢুকে পড়লুম৷ ইতিমধ্যে ডাক্তার আমাদের গরম জামা পরিয়ে দিয়েছেন৷ কোথা থেকে একটা সিঁ-সিঁ শব্দ বেরোচ্ছে৷ আলি আরাম-কেদারায় বসে আছে৷ মনে হচ্ছে পরেশের দিদিমা শীতের দুপুরে গায়ে সাদা কম্বল জড়িয়ে দেশের দাওয়ায় বসে ফোকলা মুখে পরেশের মার থেঁতো করে দেওয়া পান চিবোচ্ছে আয়েস করে৷
আলি
আমরা সবাই বেশ গুটিসুটি বসেছি৷ ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে৷ ডোরাকাটা একটা ক্যাম্প-চেয়ারে আলি বসেছে৷ শিম্পাঞ্জি মানুষের মতো অনেক কিছু করে শুনেছি, ভাল্লুক যে তার ওপরে যায়, না দেখলে বিশ্বাস হতো না৷ সারা কামরায় গোল চৌকো হরেক রকমের কাচের পাত্র৷ প্রত্যেকটা পাত্রেই নানা ধরনের প্রাণী৷ কয়েক রকম সাপ, বিষাক্ত বিছে, যেমনি লাল তেমনি চওড়া, গিরগিটি, টিকটিকি৷ এক গাদা খাঁচা, খাঁচায় পাখি আছে, কাঠবেড়ালির মতো অদ্ভুত সুন্দর এক ধরনের প্রাণী, গায়ে সিল্কের জামা৷ সত্যি কথা বলতে কী, বেশ ভয়-ভয় করছে৷ সাপ আর বিছেরা যদি হঠাৎ বেরিয়ে আসে কাচের জার ভেঙে তাহলে আর রক্ষে থাকবে না৷
পরেশ ফিসফিস করে বললে, ‘ভীষণ শীত করছে রে৷’
‘শীত করছে?’ ডাক্তার অপরাধীর মতো মুখ করে বললেন৷
‘তোমাদের কষ্ট হচ্ছে তাই না! আমার কিন্তু শীত করছে না৷’
আলি ভরাট গলায় হেসে উঠল৷ ভাবখানা এই—রে বালক, এই তোদের মুরোদ! এই শীতেই শীত৷ ডাক্তার বললেন—‘আচ্ছা দাঁড়াও, আমি তোমাদের গরম করে দিচ্ছি৷ ওয়ান টু থ্রি৷ তোমাদের ঘাম বের করে ছেড়ে দিচ্ছি৷ সব চোখ বুজোও৷’
আমরা ভয়ে-ভয়ে চোখ বোজালুম৷ ঘাড়ের কাছে মনে হল ছোট্ট একটা লাল পিঁপড়ে কামড়াল যেন৷ সমস্ত শরীরটা মনে হল চাবুকের ঘায়ে জ্বলে উঠল৷ ভয়ে চোখ খুলে ফেললুম—‘একী করলেন? একী করলেন আপনি!’
ডাক্তার অদ্ভুত শব্দ করে হেসে উঠলেন৷ যেন ইস্পাতের ঠোঁটের ঠোকাঠুকিতে হাসিটা বেরিয়ে এল৷ লোকটি কী নিষ্ঠুর! আমাদের কি মানুষ-গিনিপিগের মতো ব্যবহার করতে চান! আমরা কি ধরা দিয়ে ভুল করেছি! প্রফুল্লদার কথাই কি তাহলে ঠিক! পরেশ গরমে উফ-উফ করতে-করতে সোয়েটার খুলে ফেলেছে৷
নবেন্দু সন্দেহের চোখে ডাক্তারের দিকে তাকাচ্ছে৷ মনে হয় আমি যা ভাবছি নবেন্দুও তাই ভাবছে৷
ডাক্তার গৌতম বুদ্ধের ভঙ্গিতে ডান হাতের চেটোটা তুলে বললেন—‘মাভৈঃ৷ আমি কিছু করিনি, শুধু—’ ডাক্তার শুধু বলে রহস্যজনকভাবে চুপ করে গেলেন৷ নবেন্দু অধৈর্য হয়ে জিগ্যেস করল, ‘শুধু কী!’
ডাক্তারের চোখ দুটোয় দুষ্টুমি৷—‘শুধু কী! বলবেন তো!’ নবেন্দুর তাগাদা৷
‘শুধু এইটা তোমাদের ঘাড়ের কাছে একটা শিরায় পুট করে একটু ফুটিয়ে দিয়েছি৷ অল্প একটু৷
ডাক্তারের হাতে বাবলা কাঁটার চেয়ে সরু কালো একটা হুলের মতো জিনিস৷ ‘জিনিসটা কী! জিনিসটা কী বলবেন তো!’ ‘অবশ্যই বলব৷ তার আগে বলো তোমাদের এখনও কি আগের মতো শীত করছে?’
‘শীত!’ আমরা সমস্বরে বললুম, ‘কোথায় শীত! এখন রীতিমতো ঘাম বেরোচ্ছে!’ ডাক্তার শব্দ করে একটু হাসলেন, ‘দেখছ তাহলে শীত আর গ্রীষ্ম জিনিসটা কত আপেক্ষিক! শরীরের বিশেষ একটা অবস্থা মাত্র৷ আমি হিমালয়ের বরফে কত সাধু সন্ন্যাসী দেখেছি যাঁরা সম্পূর্ণ খোলাগায়ে তুষার-ঝঞ্ঝার মধ্যে নির্বিকার ধ্যানে বসে আছেন৷ সূর্য তখনও ভালো করে উঁকি দেয়নি গোমুখীর বরফ গলা জলে মহানন্দে স্নান করছেন৷’ ‘কেমন করে সম্ভব হয় এ সব!’
‘কেমন করে!’ আবার আমাদের সমস্বরে প্রশ্ন৷
‘মন৷ মন৷ বুঝেছ নবেন্দু, বুঝেছ পরেশ৷ মনের খেলা৷ আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশে শীত-গ্রীষ্ম, ব্যথা বেদনার বোধ, সেটার ওপর প্রভুত্ব করতে জানলে মানুষ আর মানুষ নয়, সে রাজা, সে তখন দেবতা, অতিমানব৷ এই প্রভুত্ব দুভাবে করা যায়, এক কৃত্রিম উপায়ে, দুই, যোগের সাহায্যে৷ সেই গল্পটা তোমরা নিশ্চয়ই জানো?’
‘কোনটা! কোনটা!’
‘প্রচণ্ড শীতের রাত৷ মুর্শিদাবাদে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন লর্ড ক্লাইভ৷ গরম কোট প্যান্ট হোস, মাফলার টুপি পরেও গঙ্গার হুহু হাওয়ায় ক্লাইভসাহেব কাঁপছেন৷ নবাব সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন, ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি পরে পান চিবোতে-চিবোতে৷ ঠোঁটের ওপর বিন্দু-বিন্দু ঘাম৷ একজন শীতে কাঁপছেন আর একজন ঘামছেন৷ রহস্যটা কী! রহস্য হল পান!’
‘পান!’ আমরা চেঁচিয়ে উঠলুম৷ আলি খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে উঠল৷
‘ইয়েস মাই বয়েজ, পান৷ এক খিলি পানের দাম এখনকার দিনের একশো টাকার সমান৷ মুক্তোভস্ম দিয়ে সাজা৷ তোমাদের কলকাতার ছাতুবাবু-লাটুবাবুর গল্প জানো?’
‘না৷’
‘অনেকটা একইরকম৷ তখন কলকাতায় হাড়-কাঁপানো শীত পড়ত৷ সেই শীতের রাতে দু-ভাই ছাতু আর লাটু খোলা গায়ে ছাদে পায়চারি করতেন আর বলতেন, উফ বেজায় গরম, বেজায় গরম! না, মুক্তোভস্ম নয়৷ মুরগির মাংস৷ প্রথমে একটা মুরগিকে গোখরো সাপের ছোবল মারানো হতো৷ সেই মুরগির রক্ত ইঞ্জেকশন করা হতো আর একটাকে৷ সেটার রক্ত আর একটাকে৷ এইভাবে শেষ যে মুরগিটা বেঁচে যেত সেটাকে কেটে কাবাব করে দু-ভাই খেতেন৷ আর গরমে তাঁদের রক্ত টগবগ করে ফুটত৷’
‘আমাদের কী হয়েছে৷’
‘তোমাদের কেসটা অন্য৷ তার আগে দেখি পিঁপড়ে সম্পর্কে তোমাদের কার কী জ্ঞান৷ বলো তো পৃথিবীতে ক’জাতের পিঁপড়ে আছে?’
‘সুড়সুড়ি, লাল গোঁদো, ডেঁও, কাঠ৷’
‘উত্তরটা বড় ভাসা-ভাসা হল হে৷ তবে শোনো, সারা পৃথিবীতে ছ’হাজারেরও বেশি জাতের পিঁপড়ে আছে৷ সবই হয়তো মোটামুটি একরকমের দেখতে, কোনও জাতের পিঁপড়ে আকৃতিতে বড়, কোনও জাতের পিঁপড়ে ছোট অথবা মাঝারি৷ সামাজিক জীব৷ এরা হল হাইমেনোপেটেরা জাতীয় কীট৷ পৃথিবীর সর্বত্র এদের পাবে৷ মরুভূমিতে, সুমেরু কিংবা কুমেরুতে বর্ষার বনভূমিতে, শহরে, নগরে৷ এরা নিজেদের কলোনিতে দল বেঁধে থাকে৷ আমাদের সমাজের মতো এদের সমাজেও জাতিভেদ আছে, শাসনব্যবস্থা আছে৷ এক-একটা কলোনিতে পাবে—রানি, পুরুষ আর শ্রমিক পিঁপড়ে৷ রানি হলেন আকৃতিতে সবচেয়ে বড়৷ এনার আবার ডানা আছে৷ পুরুষ পিঁপড়েরা রানির চেয়ে আকৃতিতে ছোট৷ এদেরও ডানা আছে৷ যে-কোনও কলোনিতে শ্রমিক পিঁপড়ের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি আর এদের ডানা নেই৷’
নবেন্দুর মনে হয়, কিছু প্রশ্ন ছিল৷ উসখুস করছিল৷ ফাঁক পেয়েই প্রশ্ন করল, ‘শীত গ্রীষ্মের কথা থেকে পিঁপড়ের কথা আসে কী করে?’
আসে-আসে৷ কেন আসে আর-একটু ধৈর্য ধরলেই বুঝতে পারবে৷ এখন শোনো, আর একরকম পিঁপড়ে আছে এদের বলা হয় অ্যান্টলায়ন বা সিংহ-পিঁপড়ে৷ এরা হল নিউরোপটেরা প্রজাতির কীট৷ সিংহ-পিঁপড়ে থাকে শুকনো বালি-বালি জায়গায়৷ অতি সাংঘাতিক প্রাণী হে৷ তেমনি বুদ্ধিমান৷ এরা কী করে জানো, চমৎকার ফাঁদ পেতে অন্যান্য পোকামাকড় ধরে৷ বালিতে ফানেলের মতো গর্ত করে তলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে৷ গর্তের গা বেয়ে হড়কে এই সব পোকা সোজা তলায় চলে আছে৷ তারপর যেই গা বেয়ে বাইরে পালাবার চেষ্টা করে সিংহমশাই তখন প্রবল বিক্রমে বালির বন্দুক ছুঁড়তে থাকে নিজের মাথা দিয়ে৷ সেই বালির মেশিনগানে ঘায়েল হয়ে বেচারা চিৎপাত হয়ে পড়ে, তখন সিংহমশাই মহানন্দে তার রক্ত-শুঁড় দিয়ে পোকাটির প্রাণ-রস শুষে নিয়ে খোলসটি গর্তের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়৷ সাধারণ পিঁপড়ের যম এই সিংহ-পিঁপড়ে৷
এইবার শোনো আগুনে পিঁপড়ের কথা যার ইংরেজি নাম ফায়ার অ্যান্ট৷ ফায়ার অ্যান্ট বলার সঙ্গে-সঙ্গে আলি পটাপট করে হাততালি দিয়ে উঠল৷ এরা আসলে দক্ষিণ আমেরিকার অধিবাসী৷ এদের দংশনে শুধু জ্বালা নয়, মারাত্মক বিষক্রিয়ায় মৃত্যু পর্যন্ত অস্বাভাবিক নয়৷ তোমরা পিঁপড়ের ঢিবি হয়তো দেখেছ৷ আগুনে পিঁপড়ের ঢিবি দেখনি! তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়৷ শক্ত পাথরের মতো৷ যে জমিতে এই ধরনের ঢিবি দেখা যায় তার ধারে-কাছে ভয়ে কেউ যেতে চায় না৷ চাষ করার চেষ্টা তো দূরের কথা৷ গোটা কতক পিঁপড়ে যদি তোমাদের এখন কামড়ায়, মিনিট পনের লাগবে তোমাদের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে৷ দক্ষিণ আমেরিকায় প্রতি বছর বহু পশু পাখি, এমনকী মানুষের বাচ্চা এই আগুনে পিঁপড়ের কামড়ে মারা পড়ে৷ আমি কিছুই করিনি, কেবল তোমাদের ঘাড়ের কাছে বিশেষ একটি নার্ভে টুক করে একটু ফুটিয়ে দিয়েছি৷ কী ফুটিয়ে দিয়েছেন? আমরা একসঙ্গে সকলে ভয়ে চিৎকার করে উঠলুম৷ পরেশটা একেই ভিতু, আরও যেন কেমন হয়ে গেল৷ মনে হল এক্ষুনি যেন মারা যাবে৷
ডাঃ ল্যাং পকেট থেকে গোল চ্যাপ্টা মতো একটা কৌটো বের করলেন৷ অনেকটা জরদার কৌটোর মতো৷ ঢাকনায় ছোট-ছোট গোল-গোল অজস্র ফুটো৷ ঢাকনাটা খুলে ফেলে কৌটোটা সামনের টেবিলে যেমনি রাখতে গেলেন, ট্রেনটা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল আর কৌটোটা ছিটকে কামরার মেঝেতে পড়ে গেল৷ এক ঝলকে যেন দেখলাম ঠিক লালও নয় কালোও নয় একটা পোকার মতো কী খড়-খড় করে একটা আসনের তলায় গিয়ে ঢুকল৷ ডাক্তার সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার করে বললেন, ‘কেয়ারফুল মাই বয়েজ, ডেঞ্জার-ডেঞ্জার৷ সবাই আসনের ওপর উঠে দাঁড়াও, প্যান্টের ফোল্ড আর শরীরের পেছন দিক সামলাও৷ সুড়-সুড় করলেই জোরে ঝাড়া দাও৷ ও ভেরি ডেঞ্জারাস! ওটাকে পাকড়াও না করা পর্যন্ত এই কামরা বড়ই বিপজ্জনক৷ সঙ্গে-সঙ্গে পরেশ ‘ওরে বাবারে’ বলে একটা লাফ মেরে আলির কোলে গিয়ে ছিটকে পড়ল৷
লখিয়ারা সন্ধের দিকটা বাংলোর হাতায় বড় পিপুল গাছটার নিচের কোয়ার্টারে থাকে৷ এলোমেলো খাটিয়া ছড়ানো৷ একটা ওর বাবার একটা ওর মায়ের৷ লখিয়ার বাবার বাতের অসুখ৷ সারাদিনের খাটুনির পর এই সময়টা তার একটু আরামের৷ লখিয়া তখন মসমস করে গা হাত পা টিপতে থাকে আর বকবক করে বকে৷ মাঝে-মাঝে আবার বাবাকে বকে দেয়৷ লখিয়ার বাবার যেন কত অপরাধ! মেয়ের কাছে বকুনি খেতে-খেতে বুড়োর জীবন যায়! সে কেবল ঘুমজড়ানো চোখে বলতে থাকে—হাঁরে বিটিয়া, হাঁরে বিটিয়া!
মায়ের কাঁপা-কাঁপা গলার ডাক শুনে লখিয়া যেই উত্তর দেয়—আতা হ্যায় মায়ী, বাবা অমনি হুপ করে রান্নাঘরে লাফিয়ে পড়েন৷ মা অমনি আমাকে জাপটে ধরে উ করে উঠতেন৷ বাবা হাসতে-হাসতে বলতেন—ম্যাডাম এই তোমার সাহস! আমাকে বলতেন—তোর ব্যাটা কোনও সাহস নেই, শিকারি হবি কী নিয়ে৷ বাপকো বেটা সিপাহিকো ঘোড়া, কুছ নেহি হ্যায় তো থোড়া-থোড়া৷
কোথায় গেল আমার সেসব দিন! জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রেলের নতুন লাইন পাতা হচ্ছে৷ ওই সময়টা বাবাকে ক্যাম্পে থাকতে হতো৷ একদিন রাতে আদিবাসীরা কী কারণে জানা নেই ক্যাম্পের ওপর চড়াও হয়ে, তীর চালাতে শুরু করল৷ বাবা আহত হলেন৷ স্পেশ্যাল ট্রেনে শহরে আনার আগেই বাবা মারা গেলেন৷ সন্ধে হয়ে এলেই আমার বাবার কথা মনে পড়ে৷ হাফ প্যান্ট, হাঁটু অবধি মোজা, হাফ শার্ট, মাথায় শোলার হ্যাট, মুখে পাইপ, এতখানি চওড়া বুক, মোটা হাতের কবজি৷ হাসলে মনে হতো সমস্ত বাড়িটা যেন সুখে কেঁপে উঠছে৷ মেরে না ফেললে এখনও বাবা বেঁচে থাকতেন৷
ট্রেনটা আবার একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, গুমগুম করে শব্দ হচ্ছে৷ পৃথিবীটা আসলে বড় নির্জন জায়গা৷ বেশিরভাগই যেন জঙ্গল, পাহাড়, নদী৷ এই ব্রিজটাও হয়তো কবে কোনওদিন বাবাই তৈরি করে গিয়েছিলেন রেলের লোকলস্কর এনে৷ আসতে-আসতে কতগুলো যে ব্রিজ পড়ল! ডাক্তার কী একটা বই পড়ছিলেন৷ আলির চেয়ারে পা তুলে দিয়ে৷ বইটা হঠাৎ কোলের ওপর ফেলে দিয়ে আমার দিকে তাকালেন৷ চোখ দেখে মনে হল বহু দূর অতীতে চলে গেছেন৷ ঠোঁটের কোণে অল্প একটু হাসি—‘কীসের দুঃখ৷ পৃথিবীতে কত কী ঘটে জানো৷ তোমার বাবার মতো আমার বাবাও খুন হয়েছিলেন৷’
আমি অবাক হয়ে গেলুম৷ আশ্চর্য ব্যাপার! ডাক্তার কী করে আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন৷ অদ্ভুত ক্ষমতা তো! শুনেছি সাধু-সন্ন্যাসীদের এই রকম ক্ষমতা থাকে৷ জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার বাবা ছিলেন ইংরেজ, আমার মা ছিলেন বাঙালি৷ যুদ্ধের আগে আমার বাবা খড়্গপুরের রেলের কারখানায় জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন, মা ছিলেন রেল হাসপাতালের ডাক্তার৷ আমার জন্ম ওইখানেই৷ যুদ্ধের পর আমার বাবা আর ইংল্যান্ডে ফিরলেন না৷ বললেন, ভারতে থেকে রোদ ভালোবেসে ফেলেছি, চলো সিসিলিতে গিয়ে বাকি জীবনটা কাটাই৷ অলিভগাছ, ভূমধ্যসাগরের সবুজ জল, প্রাচীন ইতিহাস৷ মা-ও রাজি হয়ে গেলেন৷ উঃ সিসিলি কী জায়গা! ভারত আমার মার্তৃভূমি৷ ইংল্যান্ড আমি দেখেছি৷ নিজের জন্মভূমির ওপর সকলেরই মায়া থাকে৷ বাবারও হয়তো ছিল৷ বাবা যেহেতু ইংরেজদের ওপর ভীষণ চটে গিয়েছিলেন, বলতেন বেনের জাত, সেই হেতু সিসিলিকে যেন জোর করে ভালোবেসে ফেলেছিলেন৷ আমার আর কী বলো? আমি তো আর ইংল্যান্ডে জন্মাইনি৷ সিসিলি তো আমার ভালো লাগবেই৷ চোখ বুজলেই আমি আমার কৈশোরের দিন দেখতে পাই৷ ভূমধ্যসাগরের তীরে ইতিহাস দিয়ে সাজানো আমার স্বপ্নের সিসিলি৷’
নবেন্দু বললে, ‘জানেন, পৃথিবীর নানা দেশ আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে৷ আমি যখন বড় হব তখন আমি আপনার মতো ভূপর্যটক হয়ে দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াব!’
‘ভেরি গুড৷ এরচে ভালো হবি আর কিছু নেই নবেন্দু৷ দেশ, মানুষ, প্রকৃতি, পৃথিবী যে কত বড় নবেন্দু, এক জীবনে মানুষ দেখে শেষ করতে পারবে না৷ সিসিলিতে আমার বাবার কেনা বাংলোটা এখনও আছে৷ সিমেতো নদীর ধারে৷ আমার মা সেখানে আছেন৷ বয়স হয়েছে৷ ডাক্তারি করেন তবে জোর করে কেউ ধরে না নিয়ে গেলে রুগি দেখেন না৷ ছোট একটা বাগান আছে৷ সেখানে আঙুর হয়, কমলালেবু পাকে শীতে, পিচ, বাদাম, পেস্তা, পাতিলেবু, ডুমুর, অলিভ গাছ আছে৷ বাংলোর বারান্দায় বসে মা তাকিয়ে থাকেন৷ পোলোরিতান, নেব্রোদিয়ান, মাদোনিয়ান পর্বতশৃঙ্গের দিকে৷ মাউন্ট এটনার নাম শুনেছ তোমরা?’
ডাক্তার প্রশ্নটা করে মোটা একটা চুরুট ধরাবার চেষ্টা করতে লাগলেন৷ ট্রেনটা ভীষণ দুলছে৷ সেই দোলায় আমরাও দুলছি৷ দুলছে সাপের বেতের ঝুড়ি দুটো৷ ছোট্ট একটা খাঁচাও দুলছে, যার মধ্যে লাল একটা পাখি ডানায় মুখ গুঁজে অঘোরে ঘুমোচ্ছে৷ কখনও-কখনও মুখ তুলে ঠোঁট দিয়ে ডানা চুলকে নিচ্ছে৷ চুরুট দেখে আলির মাথা খারাপ হয়ে গেছে৷ নাকের পাটা ফুলিয়ে ফোঁস-ফোঁস করে ধোঁয়া নিচ্ছে নাকে৷ ডাক্তার একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘পাবে-পাবে৷ ডোন্ট বি ইমপেশেন্ট৷ ইউ উইল গেট ইওর শেয়ার৷’
মাউন্ট এটনা, কত বড় আগ্নেয়গিরি! আমাদের বাংলোর বারান্দায় বসলে দেখা যেত আকাশের গায়ে উদ্ধত ‘মাউন্ট এটনা’৷ বিশাল আগ্নেয়গিরি৷ দশ হাজার সাতশ চল্লিশ ফুট উঁচু৷ কী তার শোভা! লোহার মতো কালো৷ জ্বালামুখটা যেন খুবলে নেওয়া পুডিং-এর মতো৷ চাঁদনি রাতে পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে ভাবতুম—হে আগ্নেয়গিরি! আর একবার তুমি জেগে ওঠো৷ অন্ধকার আকাশে মেলে দাও আগুনের লকলকে শিখা৷ ছিটিয়ে দাও স্ফুলিঙ্গ, ছুড়ে দাও আগুনের গোলা৷ সিসিলি যে কী জায়গা, তোমাদের বোঝাতে পারব না৷ সিসিলি মাই লাভ! সিসিলি মাই লাইফ!
ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ সিসিলি৷ কত বড় জানো—ন’হাজার ন’শো পঁয়ত্রিশ বর্গ কিলোমিটার৷ মাঝখানটা সমতল৷ চারপাশে পাহাড়৷ সিমেতো নদী বয়ে চলেছে কুলুকুলু করে৷ এই সমভূমির নাম কাতানিয়া৷ পলি ফেলে-ফেলে সমুদ্রের দিকে চলে গেছে৷ সেখানে আঙুরের বাগানে সিসিলির মেয়েরা বেতের ঝুড়িতে সাবধানে থোকা-থোকা আঙুর সাজিয়ে রাখছে৷ গাছে-গাছে হলদে হয়ে আছে পাকা পিচ ফল৷
বাবার সঙ্গে প্রথম যেদিন পালেরমোতে গেলুম, সেদিনটা আজও আমার মনে আছে৷ সিসিলির রাজধানী৷ ইতালির ষষ্ঠতম শহর এবং বন্দর৷ সমুদ্র যদি দেখতে চাও নবেন্দু, ভূমধ্যসাগরের ধারে দিন কতক থেকে এসো৷ মেসিনার নাম শুনেছ নবেন্দু! আর একটি বড় বন্দর৷ ১৯০৮ সালের বিশাল ভূমিকম্পে মেসিনা একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল৷ পৃথিবীর সামান্য একটু গা-ঝাড়া—৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু৷ সেই শহর, সেই বন্দর আবার গড়ে উঠেছে৷ হাওয়ায় বিশাল অলিভের পাতা কাঁপছে, জীবন চলছে স্বপ্নের মতো, বলা যায় না হঠাৎ কখন এটনা ফুঁসে উঠবে, ভূপৃষ্ঠ একটু কেঁপে উঠবে, স—সব আবার ভূমিসাৎ! সন্ধেবেলার সিসিলি তুমি ভুলতে পারবে না৷ সমুদ্রের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে, ওদিক থেকে আসছে সাহারার শুকনো গরম বাতাস৷ সে বড় মজার অভিজ্ঞতা! তোমার সবসময় মনে হবে গরম আর ঠান্ডা জলের স্রোত ভেঙে তুমি হেঁটে চলেছ৷ গরম হাওয়া হালকা হয়ে ওপর দিকে উঠছে তলার দিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে শীতল বাতাস৷ সাহারার এই গরম বাতাসকে ওদেশে কী বলে জানো—‘সিরোক্কো’৷
ওদেশটা তো আমার মাতৃভূমি নয়, পিতৃভূমিও নয়, তবু এত ভালোবেসে ফেলেছিলুম৷ পালেরমোর বিশ্ববিদ্যালয় কত প্রাচীন জানো? ১৭৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত৷ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়েছি৷ সেই গ্যারিবলডির দেশে আমার যৌবন কেটেছে৷ খ্রিস্টের জন্মেরও আটশ বছর আগে গ্রিকরা এখানে এসেছিল রাজত্ব করতে৷ গ্রিকদের তৈরি মন্দির, প্রাসাদ, থিয়েটারের ধ্বংসাবশেষ৷ তাত্তরমিনায় গ্রিক থিয়েটারের সেই ভগ্নাবশেষে কতদিন চাঁদের আলোয় এক পাগল প্রফেসারকে দেখেছি—সারারাত ঘুরছেন অতীত ইতিহাসের পাতায়৷ একমাথা সাদা চুল, মুখে নিভে যাওয়া একটা চুরুট৷ অত্যাচারী দ্বিতীয় হিয়েরোর তৈরি বেদিতে রাতের বেলার সেই বেহালাবাদককে মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত মনে থাকবে৷ কোনও দিনও ভুলতে পারব কি! সমুদ্রের হুহু হাওয়ার ওঠাপড়ায় বেহালার সুর অলিভ অরণ্যের মধ্যে কেঁদে বেড়াচ্ছে৷
এই সিসিলিতেই আমার বাবা খুন হলেন ‘মাফিয়াদের’ হাতে৷ মাফিয়াদের সম্পর্কে কিছু জানো তোমরা! বিখ্যাত গুপ্তসমিতি৷ যারা ফ্যাসিস্টদের অত্যাচার আটকাবার জন্যে জীবনপণ করে লড়েছে৷ হিটলার ও মুসোলিনি চক্রান্তের কিছু-কিছু তোমরা নিশ্চয় জানো৷ বাবার ভীষণ মাছধরার নেশা ছিল৷ মাঝে মধ্যে রাতের বেলাও খাঁড়িতে ছিপ ফেলে বসে থাকতেন৷
ইতালির মূল ভূখণ্ড থেকে সিসিলিকে আলাদা করে রেখেছে মেসিনা খাঁড়ি৷ সামুদ্রিক জীবের সবচেয়ে প্রিয় বিচরণ ক্ষেত্র৷ ওই মেসিনা স্টেটেই বাবা যেতেন মাছ ধরতে৷ সঙ্গে থাকত তাঁর প্রিয় কুকুর—অ্যাপোলো৷ সেদিনটা ছিল শনিবার৷ ইতালির মানুষ শনিবার সারারাত জেগে থাকে৷ সপ্তাহের শেষ! শুধু স্ফূর্তি আর উল্লাস৷ পরের দিনটা তো রবিবার, ভয় কী! সন্ধের মুখে বাবা বেরোলেন৷ রাতের দিকে সমুদ্রে জোয়ার আসবে৷ সেই সময় খাঁড়িতে কতরকমের মাছ ঢুকবে—সার্ডিন, টুনা, ম্যাকারেল৷
বাবা সাধারণত ভোরের দিকে ফিরে আসতেন৷ দূর থেকেই আমরা অ্যাপোলোর ঘেউ-ঘেউ ডাক শুনতে পেতুম৷ মাঝে-মাঝে বাবার গলা—হেলপ মি অ্যাপোলো, হেলপ মি, ডোন্ট বি এ নটি বয়! মা অমনি আমাদের বসার ঘরের জানলার সাদা পরদাটা সরিয়ে সুপ্রভাত জানাতে চাইতেন৷ পরদাটা সরালেই বর্ষার ফলার মতো রোদ এসে পড়ত ঘরের কার্পেটে৷
সেদিন সাতটা বাজল, আটটা বাজল, তবু বাবা ফিরলেন না৷ মা ঘর-বার করছেন৷ জানলার পরদা সরিয়ে বারে-বারে দেখে আমাকে এসে বলছেন—কী করা যায়, কী করা যায়! হঠাৎ বহুদূরে যেন অ্যাপোলোর ডাক শোনা গেল৷ আমরা দুজনেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম৷ ঢালু বেয়ে অ্যাপোলো উঠে আসছে—মুখে যেন একটা কী৷ আরও কাছে এল৷ মুখে বাবার একপাটি জুতো৷
অ্যাপোলোই আমাদের নিয়ে গেল সেই জায়গাটায়৷ ছিপ, হুইল, খাবারের বাক্স, ফ্লাস্ক চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে৷ নাইলন নেটে বাবার জীবনে ধরা সবচেয়ে বড় মাছ৷ পা-দুটো জলে, শরীরটা বালির ওপর, বাবা মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন৷ পিঠে এতখানি একটা ছোরা ঢুকে আছে৷ ছোরার সঙ্গে একটা কার্ড—দিস ইউ ডিজার্ভড—মাফিয়া ইউনিট নম্বর সেভেন বাই ওয়ান বাই থ্রি৷
সেই দিনটা আমি কোনও দিন ভুলতে পারব না অপূর্ব৷ জীবনের সমস্ত স্বপ্ন সিসিলির সেই ভোরে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল৷ শুধু তাই নয়, বাবা মাফিয়াদের হাতে খুন হয়েছেন এই খবরটা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সবাই আমাদের ছি-ছি করতে লাগল৷ আমাদের জানা নেই বাবার হয়তো এমন কোনও গুপ্ত জীবন ছিল৷ গুপ্ত যোগাযোগ ছিল৷ এই ভুল ধারণাটা তো সহজে পালটানো শক্ত৷ কে বিশ্বাস করবে আমাদের কথা৷ একে আমরা সবে গিয়ে বসবাস শুরু করেছি৷ আমাদের অতীতটা কেউ দেখেনি৷ বর্তমানটাই দেখেছে৷
সব দেশের পুলিশই তো সমান৷ ইতালির পুলিশ বোধহয় অপদার্থতায় সব দেশকে ছাড়িয়ে যাবে৷ কিছুই করল না৷ আসলে করতে পারল না৷ পুলিশের উৎপাতে অপরাধী অতিষ্ঠ না হয়ে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলুম৷ মনে হল আমরাই অপরাধী৷ শেষে সিসিলি থেকে আমাদের পালাতে হল৷ সেন্ট সিবাস্তিয়ান চার্চের ক্রিমেটোরিয়ামে, প্রাচীন এক অলিভগাছের তলায় আমার বাবাকে শুইয়ে রেখে আমরা চলে এলুম৷ সমস্ত জিনিসপত্র যেখানে যা ছিল সব বিলিয়ে দেওয়া হল৷ বাড়িটা খুব কম দামে এক জেলেকে প্রায় দান করেই দেওয়া হল৷’
হঠাৎ ট্রেনের স্পিডটা কমে এল৷ ডাক্তার ল্যাং বললেন, ‘অতীত, বুঝলে নবেন্দু, সকলের অতীতই দুঃখ-সুখের টানা-পোড়েনে বোনা৷ মন দিয়ে সবকিছু জয় করতে শিখবে৷ বুঝলে, মন৷ মনটাই সব৷ মন হবে সৈনিকের মতো৷ ফরওয়ার্ড মার্চ৷ কমান্ডার বলেছেন—এগিয়ে যেতে হবে, নো লুক ব্যাক৷ পিছনে তাকাবে না৷ পরাজিত হয়ে ফিরে আসবে না৷ পালিয়ে আসবে না৷ পলাতকের পুরস্কার—কোর্ট মার্শাল৷’
ডাক্তার হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন৷ ঠিক আটটা বেজেছে৷ আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার ভাবনাটাকেই ডাক্তার বললেন, ‘হ্যাঁ, আটটা বেজেছে৷ নাও ইট ইজ টাইম ফর ডিনার৷ তোমরা কেউ চানটান করবে!’ নবেন্দু বললে, ‘আমি করব৷ আমার একটু উপাসনার কাজও আছে৷’
‘ভেরি নাইস৷ তোমার আছে আমারও আছে৷ দেন লেট আস অ্যাডজাস্ট৷ তুমি আগে যাও, চানটা সেরে এসো৷ ওই নীল কাচের দরজাটার ওপাশে চলে যাও৷ তারপর আমি যাব৷ তোমরা কেউ যাবে না?’
‘হ্যাঁ, আপনারা সেরে নিন৷ তারপর আমরা একে-একে যাব৷’
‘কিন্তু মনে রেখো ন’টার মধ্যে আমাদের শেষ করতে হবে৷ দশটার কিছু পরে আমরা পৌঁছে যাব৷’
নীল কাচের স্নানঘর
বেশ মজা লাগছিল চলন্ত ট্রেনে ‘শাওয়ারের’ তলে দাঁড়িয়ে স্নান করতে৷ আরও ভালো লাগছিল এই কারণে, পুরো স্নানঘরটা গাঢ় নীলরঙের৷ নীলরঙের মেঝে, দেওয়াল, কাচ৷ তার মাঝে সাদা ‘বেসিন’৷ ঝকঝকে নিকেলের কলের মাথা৷ সারাদিনের পর শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল৷ শাওয়ারটার এত জোর, মনে হচ্ছে মাথা ছ্যাঁদা হয়ে যাবে৷ পা বেয়ে জল নেমে যাচ্ছে ফ্যানা-ফ্যানা হয়ে৷ সারা বাথরুমে ছড়িয়ে আছে মিষ্টি একটা ফুলের গন্ধ!
স্নান সেরে অস্বচ্ছ নীল কাচের দরজা খুলে বাইরে আসতেই মনটা যেন ভরে গেল৷ অনেক ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে চার্চে গিয়ে এইরকম সংগীত শুনেছিলুম৷ কখনও মনে হচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, কখনও মনে হচ্ছে বিশাল অরণ্যে ঝড় বইছে৷ ডাঃ ল্যাং সাদা একটা গাউন পরে হাঁটু মুড়ে ‘নিল ডাউন’ হয়ে বসে প্রার্থনা করছেন৷ বুকের কাছে দু-হাতে ধরে আছেন সোনার তৈরি একটা ক্রশ৷ নবেন্দু অবশ্য পদ্মাসনে বসে আছে৷ আমাদের পরেশচন্দ্র যার জীবনে আহার আর নিদ্রা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও সূক্ষ্ম ব্যাপার নেই সেও এই পরিবেশে অন্যরকম হয়ে গেছে৷ অবাক হয়ে একপাশে বসে আছে চুপ করে৷ আলি ইজিচেয়ারে চোখ বুজে চুপ করে বসে আছে৷ আমিও পাশে একটু জায়গা করে নিয়েছি৷ আমার সেই—ভবসাগর তারণ স্তোত্র এখানে সুরে মিলবে না৷ তবে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রার্থনা—খণ্ডন ভব বন্ধন জগ—মিলবে মনে হচ্ছে৷
কতক্ষণ ওই ভাবে চোখ বুজিয়ে বসেছিলুম বলতে পারব না সময়ের কোনও হিসেব ছিল না৷ গাউনের খসখস আওয়াজে চোখ মেলতেই দেখলুম, ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়ে৷ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ও খ্রাইস্ট৷’ সংগীতটা তখনও বন্ধ হয়নি৷ ডাক্তার এগিয়ে গিয়ে টেপ রেকর্ডারটা বন্ধ করে দিলেন৷ সঙ্গে-সঙ্গে কানে এল, ট্রেনের সেই একঘেয়ে শব্দ৷ লাইনে চাকায় ঐকতান৷
ডাক্তার সাদা গাউনটা খুলে ফেলে, গুছিয়ে রাখতে-রাখতে জিগ্যেস করলেন, ‘কেমন লাগছে তোমাদের?’
নবেন্দু বললে, ‘ভীষণ ভালো লাগছে৷ এত সুন্দর সংগীত কখনও শুনিনি৷’
ডাঃ ল্যাঙের মুখে প্রশান্ত হাসি৷ হাসতে-হাসতেই চৌকো একটা বাক্সর সামনের পাল্লাটা খুলে ফেললেন৷ সমস্ত কামরাটা খাদ্যের সুগন্ধে ভরে গেল৷ বাক্সটার ভেতরে মৃদু একটা লাল আলো জ্বলছে৷ সেই ঠান্ডা ঘরেও একটা গরম তাপ অনুভব করতে পারছি৷ ওই চৌকো বাক্সটার ভেতর থেকে খাদ্যের গন্ধের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে৷ ডাক্তার বললেন, ‘নবেন্দু, তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো৷ ওই ফোল্ডিং খাবার টেবিলটা তুমি পেতে ফেলো৷ অপূর্ব, তুমি নবেন্দুকে সাহায্য করো ডিশ, প্লেট, ব্যোলগুলো ঠিকঠাক করে সাজিয়ে৷ ভাঙবে না, অযথা শব্দ করবে না৷ খেয়াল রাখবে আমরা চলন্ত ট্রেনে বসে আছি৷’
মাঝারি আকারের টেবিল৷ পরিষ্কার ঝকঝকে৷ বিশেষ-বিশেষ কয়েকটা জায়গায় ছোট-ছোট গোল খাঁজকাটা৷ প্রথমটা বুঝতে পারিনি কেন এমন করা৷ একটু পরেই বোঝা গেল৷ ডাক্তার প্রথমেই সুপের বড় জায়গাটা একটা খাঁজে বসিয়ে দিলেন৷ তলাটা খাপে-খাপে বসে গেল৷ ট্রেন যতই দুলুক পাত্রটা সরতে-সরতে পড়বে না৷ এইভাবে সবকটা পাত্রই জায়গায়-জায়গায় বসে গেল৷ সব কিছুই মাপে-মাপে তৈরি৷ আলির গলায় বুকের সামনের দিকে ছোট একটা তোয়ালে বেঁধে দিয়েছেন৷ তার কোলে স্টেনলেস স্টিলের বাটিতে দুধ পাঁউরুটি৷ বেশ বড় একটা চামচে৷ পাশেই এক জোড়া বড় সাইজের কলা৷ একটা লাল টকটকে আপেল৷
‘এত সব খাবার আপনি কখন তৈরি করলেন কাকা?’
‘কাকা! আ মাই ডিয়ার সন৷ এতক্ষণে তোমাদের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হল৷ আ মাই ডিয়ার সনস৷ তোমাদের মতো ছেলেরা যে দেশে আছে সে দেশের এত দুঃখ কেন হবে! হবে না৷ যদিও ভারতটা ঠিক আমার দেশ নয়, তবু এই ভারতের চেহারা আমি পালটে দেবো, দেবোই দেবো৷’
এক হাতে ছুরি, আর-এক হাতে কাঁটা—ডাক্তার দু-হাত আকাশে তুলে তাঁর প্রতিজ্ঞাটাকে অনেক উঁচুতে তুলে দিলেন৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নামল৷
‘আঙ্কল, আপনার চোখে জল কেন?’
‘জল, ইজ ইট? আমি কাঁদছি! সত্যি আমি কেঁদে ফেলেছি৷ বাট মাই সনস, এ দুর্বলের কান্না নয়৷ এটা আমার আবেগ, জীবনের অনেক কিছু করতে চাওয়া আর করতে না পারার আবেগ চোখের কোণে জল হয়ে জমেছে৷ আমি যদি বেঠোভেন, বাখ, হ্যান্ডেল হতে পারতুম, আমি যদি গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস হতে পারতুম, আমি যদি ফ্লেমিং, রাসেল, আইনস্টাইন হতে পারতুম! পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত সেরা-সেরা মানুষ এসেছেন, সব মিশিয়ে যদি নিজেকে তৈরি করতে পারতুম!’
‘কিন্তু আঙ্কল আপনি যে কত বড় বৈজ্ঞানিক!’
‘বৈজ্ঞানিক? আমি? আমি সামান্য একটা জোনাকি৷ আমার বিজ্ঞান কার কী কাজে লেগেছে! তবে, ইয়েস, লাগাতে হবে৷ আমি পৃথিবীর মুখের চেহারা পালটে দিতে চাই৷ এমনসব মন তৈরি করতে চাই, যে মনে সব সময় বেঠোভেনের নাইনথ সিমফনি বাজছে৷ যে মন নদী নয়, নালা নয়, নর্দমা নয়৷ বিশাল সমুদ্র, বিশাল উচ্ছ্বাস, বিশাল ঝড়৷ আই উইল বি এ মেকানিক অফ মাইন্ড৷ নাও-নাও, ফুডস আর গেটিং কোল্ড৷’
ডাক্তার চিকেনের একটা ঠ্যাং ধরে টানাটানি করতে লাগলেন, ‘কীরকম রেঁধেছি বলো? হাউ আই কুক? তোমরা একবারও কেউ কিছু বললে না!’
আমরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলুম, ‘চমৎকার! চমৎকার!’
আলি মহানন্দে একটা কলা ওপর দিকে ছুড়ে দিয়েই লুফে নিল৷ ক্রিকেটার হলে একটা ক্যাচও মিস করত না৷
শেষরাত
ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল৷ কেন ভাঙল! ট্রেনের দুলুনিটা থেমে গেছে৷ চলছে না, কোথাও একটা দাঁড়িয়ে পড়েছে স্থির হয়ে৷ চোখের সামনে সেই অদ্ভুত ঘড়িটা৷ স্বপ্নের মায়াবী ঘড়ি যেন৷ ডায়ালটা মস্ত একটা গোল কাচ৷ গাঢ় নীল৷ হালকা মেঘ ভাসছে৷ আলোর অক্ষরে সময় ভেসে উঠছে৷ তিনটে পনেরো, ষোলো, সতেরো৷ তাকাতে না তাকাতেই সময় সরে যাচ্ছে, নদীর জলের মতো৷ পশ্চিমে চাঁদ অস্ত যাচ্ছে, পূর্বে সূর্য উঠছে৷ সূর্য এখন কোথায়, ঘড়ি দেখলেই বোঝা যায়৷ পৃথিবীর কোথায়, কোন দেশে সন্ধ্যা নামছে, কোথায় ভোর হচ্ছে, আজ কোন আকাশে চাঁদ, তারারা কে কোথায় আছে, আকাশের মতো ওই গোল ডায়ালে সব ভেসে উঠছে৷
‘আঙ্কল, আমরা কোথায়?’
‘আমরা বিহারে! এইবার একটা ছোট ইঞ্জিন আমাদের অন্য লাইনে টেনে নিয়ে যাবে৷’ ডাক্তার পাশের বাঙ্ক থেকে শুয়ে-শুয়েই জবাব দিলেন৷
‘কার নাক ডাকছে আঙ্কেল?’
‘আলির৷ ওর ভীষণ নাক ডাকে৷’
‘আমরা কখন পৌঁছব?’
‘ভোরের একটু পরেই৷’
ঘটাংঘট করে ভীষণ একটা শব্দ হল৷ কামরাটা দুলে উঠল৷
‘অপূর্ব, ইঞ্জিন জুড়ল৷ এইবার আবার আমরা চলতে শুরু করব৷’
আমাদের কামরার আর একপাশে আর একটা বড় কাচের পরদা ছিল৷ কেন ছিল, কী তার কাজ বুঝিনি আগে৷ এখন চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলুম৷ ছোট-ছোট আলোর টিপ একটা কোণে ঝাঁক বেঁধেছে৷ আগে ছিল না৷ হলফ করে বলতে পারি ছিল না৷ বিন্দুগুলো হঠাৎ পরস্পর পৃথক হয়ে কাচের গায়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে৷ অবাক হয়ে দেখছি৷ আমার ঘাড়টা বালিশ থেকে উঠে পড়েছে৷ হঠাৎ কোথা থেকে ছোট-ছোট সাদা-সাদা পরীদের মতো কী এক কোণ থেকে আর এক কোণে উড়ে চলেছে৷ ঠিক দেখছি তো? হ্যাঁ পরীই তো!
‘আঙ্কল, ও কী, কাচের পরদায়, কী যেন উড়ে যাচ্ছে! একের পর এক পাখির মতো ভেসে চলেছে৷’
‘যা দেখছ তাই৷ দে আর সোলস৷’
‘সোলস, আত্মা, তার মানে! ফ্যানটাসি! আপনার তৈরি!’
‘না অপূর্ব, আমার তৈরি নয়, যন্ত্রটা আমার তৈরি ঠিকই৷ বাট দে আর সোলস৷ রাতের পরিক্রমা শেষ করে ওরা এক গোলার্ধ থেকে আর এক গোলার্ধে চলেছে৷ দিন ওদের সহ্য হয় না তাই রাতের দিকে ছুটে চলেছে৷’
নবেন্দু উঠে পড়েছে৷ পরেশ গ্যাঁট হয়ে উঠে বসেছে৷ নবেন্দু বললে, ‘কেমন যেন বিশ্বাস হয় না৷’
নবেন্দুর কথা শুনে ডাক্তার উত্তেজিত হয়ে উঠে বসলেন, ‘কেন বিশ্বাস হয় না মাই ডিয়ার নবেন্দু! তুমি টেলিভিশন বিশ্বাস করো নিশ্চয়ই?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, করি৷’
‘আচ্ছা, তুমি রাডারের নাম শুনেছ?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
‘আচ্ছা, এক্স রে চোখে দেখা যায়?’
‘আজ্ঞে না৷’
‘আলট্রা ভায়োলেট রে দেখা যায়?’
‘আজ্ঞে না৷’
‘তুমি নিশ্চয়ই জানো, এমন শব্দ-তরঙ্গ আছে যা কানে শোনা যায় না৷’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
‘অথচ এরা আছে৷ কেমন তো!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
‘এইবার আমি যদি বলি, ওই যন্ত্রটা আমার এমন কায়দায় তৈরি যে কায়দায় আমাদের অদৃশ্য জগতের আলোক-কম্পন সহজেই ধরা পড়ছে৷ যা আমাদের চোখের বাইরে দিয়ে চলে যায় তাই যেন হঠাৎ সত্য হয়ে উঠছে৷ অলৌকিক, ভৌতিক বস্তু সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে৷ পরেশ, তুমি বলো তো ভূত শব্দটার মানে কী?’
পরেশ সবে ঘুম থেকে উঠে চোখ ছানাবড়া করে বসেছিল৷ প্রশ্ন শুনে, প্রথমে ঘ্যাঁস-ঘ্যাঁস করে খানিক মাথা চুলকাল, তারপর ফ্যাল-ফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘ভূত মানে ভয়৷’
‘ব্র্যাভো, ব্র্যাভো মাই ফ্রেন্ড৷’ ডাক্তার দু-আঙুলে টুসকি বাজালেন৷ কাচের পরদাটা ইতিমধ্যে কালো হয়ে গেছে!
‘আঙ্কল, পর্দায় আর কিছু নেই কেন?’
‘যে দৈর্ঘ্যের আলোকতরঙ্গ ওই যন্ত্রের পক্ষে ধরা সম্ভব ওরা হয় তার চেয়ে বড় দৈর্ঘ্যে সরে গেছে কিংবা ছোট হয়ে গেছে৷ শোনো পরেশ, ভূত মানে ভয় নয়, ভূত দেখলে ভয় হতে পারে, তবে ভূত কখনও ভয় দেখাতে চায় না, আমরাই ভয়ে মরি৷ ভূত হল আমরা যা দেখি, শুনি, অনুভব করি তার মূল উপাদান অর্থাৎ ক্ষিতি অপ তেজঃ মরুৎ ব্যোম৷ পঞ্চভূত৷ আকাশ, বাতাস, পৃথিবী, আগুন, জল৷ কোনও জীবই মরে না৷ মৃত্যু হল এক ধরনের রূপান্তর৷ এক অবস্থা থেকে আর এক অবস্থায় চলে যাওয়া৷’
পরেশ বিশাল একটা হাই তুলল৷ ডাক্তার বললেন, ‘নাও, আর একটু শুয়ে নাও তোমরা৷’ সেই অদ্ভুত ঘড়িটার দিকে চোখ চলে গেল৷ মনে হল সূর্য যেন দিগন্তের আরও কাছে চলে এসেছে৷ ডায়ালে সমুদ্রের ঢেউ৷ ডাক্তার বললেন, ‘ওই দেখো, সমুদ্রে জোয়ার আসছে৷’
টিংলিং, টিংলিং করে অদ্ভুত একটা মিষ্টি শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল৷ ‘কীসের শব্দ!’
‘আঙ্কল, কীসের শব্দ?’
‘যদি বলি পৃথিবীর অক্ষপথে ঘোরার শব্দ, বিশ্বাস করবে?’
‘হ্যাঁ করব৷ আপনি যা বলবেন, তাই বিশ্বাস করব৷’
‘তবে মনে রাখবে—প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন, সেবয়া৷’
ট্রেনের ঝাঁকুনিতে আবার যেন ঘুম জড়িয়ে আসছে চোখে৷ খাঁচার পাখিরা বোধহয় টের পেয়েছে ভোর হয়ে আসছে৷ কিচির-কিচির করে ডাকছে৷ ডাক্তার বললেন, পাখিদের ভাষা বোঝো নবেন্দু?’
‘আজ্ঞে না৷’
‘আচ্ছা তোমাকে শিখিয়ে দেব৷ আমি একটি অভিধান তৈরি করেছি৷’
পাহাড়তলি
একসঙ্গে গোটাচারেক সাদা স্টেশান ওয়াগন পরপর ছুটছে৷ রাস্তা কখনও খাড়া ওপর দিকে উঠেছে৷ কখনও গোঁত করে নিচে নামছে৷ চারপাশে শাল সেগুনের বন ঝিমঝিম করছে পাহাড়ি রোদে৷ যাঁরা গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁদের নীল পোশাক৷ যাঁরা নিতে এসেছেন তাঁদের সাদা৷ সাদা আর নীল পাশাপাশি এত সুন্দর দেখাচ্ছে!
আমাদের গাড়িতে ডাক্তার ল্যাং নেই৷ তাঁর বদলে আমরা পেয়েছি ডক্টর শিলারকে৷ জার্মান ভদ্রলোক৷ পরিষ্কার বাংলা বলেন৷ আমাদের সঙ্গে চলেছে সবচেয়ে মারাত্মক জিনিস৷ বিষাক্ত-বিষাক্ত অসংখ্য সাপ গোল ছোট বেতের ঝাঁপিতে৷ ডক্টর শিলার হলেন সাপের বিষ বিশেষজ্ঞ৷ শিলার বললেন, ‘আমার প্রথম কাজই হবে সমস্ত সাপের বিষদাঁতের কোটর থেকে বিষ ঢেলে নেওয়া৷ বড় শক্ত কাজ৷ এই বিষে যেমন মানুষ মরে তেমনি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে বহু মারাত্মক অসুখ সেরে যায়৷’
ডক্টর শিলারের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি গাড়িটা হঠাৎ হুড়মুড় করে বাঁদিকে কাত হয়ে পড়ে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে ওপর থেকে ছিটকে পড়ল একটা বেতের ঝাঁপি৷ ডালাটা খুলে গেছে৷ ধীরে-ধীরে বেরিয়ে আসছে একটা কালো সাপ৷
শিলার বললেন, ‘একদম ভয় পাবে না৷ মনে রাখবে যিনি বেরোচ্ছেন তিনি কেউটে৷ গোলমাল একেবারে পছন্দ করেন না৷’
আমরা ভয়ে আসনের ওপর পা তুলে নিয়েছি৷ সাপটা প্রায় পুরো শরীরটাই বের করে ফেলেছে৷ দেখেই কেমন গা শিরশির করছে৷ শিলার একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, সাপটার গতিবিধি দেখছেন৷ গাড়িটা কাত হয়ে থেমেই আছে৷ চলবে বলে মনে হয় না৷ কী হল কে জানে! গাড়ি ওলটানো থেকে বাঁচলেও সাপের কামড় থেকে বাঁচব কি না ঈশ্বরই জানেন৷
শিলার পকেট থেকে একটা রবারের রড বের করলেন৷ কালো কুচকুচে রং৷ সেই রবারের ডান্ডাটা সাপের মুখের কাছে ধরতেই, সাপটা ছোবল মারার জন্য ফণা তুলল৷ মাথাটা হেলছে, দুলছে৷ লিকলিক করে জিভ বেরোচ্ছে ঢুকছে৷ আতঙ্কে আমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে৷ ডক্টর শিলার হঠাৎ ডানহাত দিয়ে সাপটার গলার কাছটা ঝপ করে চেপে ধরলেন৷ বজ্র মুঠি৷ সাপটাকে মেঝে থেকে সোজা হাতখানেক ওপরে তুলে ধরেছেন৷ শূন্যে লিকলিক করে শরীরটা ঝুলছে৷ প্রথমে আমরা চোখ বুজিয়ে ফেলেছিলুম৷ শিলারের গলা পেলুম, ‘ওপন ইওর আইস বয়েজ, দ্য ক্রাইসিস ইজ ওভার৷’
সাপটাকে ফের ঝাঁপিতে ভরে ফেললেন৷ সেও এক অদ্ভুত কায়দা! মাথাটা ছেড়ে দিলেই তো ছোবল মারবে৷ মাথাটাকে প্রথমে ঢোকালেন, ন্যাজটাকে বাঁহাতে গোল করে গুটিয়ে-গুটিয়ে বেশ সুন্দর করে দড়ি গুছোবার মতো করে রাখলেন৷ মাথাটা ছাড়লেন সব শেষে৷ বিদ্যুৎগতিতে ঢাকনাটা বন্ধ করে দিলেন৷ ভেতর থেকে হিসহিস শব্দ বেরোতে লাগল৷
শিলারের সারা মুখে ঘাম ফুটেছে৷ নিজের হাতের আঙুলগুলো ভালো করে দেখতে-দেখতে বললেন, ‘জানো তো, সাপ নিয়ে যাদের কারবার, তারা সাপের হাতেই মরে৷’
‘ডক্টর, আজ কোনও বিপদ হতে পারত৷’
‘ইয়েস, একে এই ছোট জায়গা, আমার হিসেবে একটু ভুল হলেই আমাকে মেরে দিতে পারত৷ কিন্তু সাপ ধরায় ভীষণ মজা আছে৷’
ড্রাইভার বললেন, ‘এইবার আপনাদের একটু নামতে হবে৷’
গাড়ির বাঁ পাশের সামনের চাকাটা একটা গর্তে পড়েছে৷ নাকটা ঠেকে গেছে একটা পাথরে৷ পাথরটা না থাকলে আমরা চলে যেতুম শখানেক ফুট নিচে৷ একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে যেতুম৷ উদ্ধারের কী উপায় কে জানে! ড্রাইভার বললেন, ‘গাড়িটাকে আর একটা গাড়ির সঙ্গে মোটা তার দিয়ে বেঁধে পেছন দিক থেকে টানতে হবে৷’ আগের গাড়িগুলো আমাদের ফেলে সামনে এগিয়ে গেছে৷
ডক্টর শিলার বললেন, ‘ওয়ারলেসে যোগাযোগ করো৷’
ড্রাইভারের সামনের আসনে একটা চৌকো বাক্স ছিল৷ তার গায়ে ঝুলছে টেলিফোন৷ সামনের গাড়িগুলো বহু দূরে৷ তবু যোগাযোগ হয়ে গেল নিমেষে৷ ‘ইয়েস উই আর কামিং৷ এখুনি আসছি, ভেবো না কিছু৷’
শিলার হাসিহাসি মুখে বললেন, ‘পাহাড়ি পথে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে৷ ভয় পাবার কিছু নেই৷’
আমরা কিন্তু সত্যিই ভয় পেয়েছি৷ পাথরে ঠেকে না গেলে আমাদের খুঁজে পাওয়া যেত কয়েক শ ফুট নিচে তালগোল পাকানো অবস্থায়৷ নবেন্দু খাদটা উঁকি মেরে দেখছে৷ জংলা গাছ, কাঁটা ঝোপ ধাপে-ধাপে নেমে গেছে৷ অনেক নিচে একটা গাড়ি কাত হয়ে পড়ে আছে৷ ভাঙা-চোরা জং ধরা৷ নবেন্দু আর আমি দুজনেই দেখছি৷ এই ভাবেই গাড়িটা একদিন ছিটকে পড়েছিল৷
শিলার বোধহয় আমাদের মনের কথা বুঝেছেন, ‘একবছর আগের একটা দুর্ঘটনার সাক্ষী৷ এই জায়গাটাকে আমরা ডেঞ্জারাস পয়েন্ট বলে থাকি৷ কোনও কারণ নেই, তবে কেন যে এই জায়গাটায় মাঝে-মাঝে দুর্ঘটনা ঘটে যায়! ওটা আমাদের একটা গাড়ি৷ ওই গাড়িটাতেও অনেক সাপ ছিল৷ ডক্টর চন্দ্র মারা গিয়েছিলেন ওই দুর্ঘটনায়৷ বহু মারাত্মক সাপও ছাড়া পেয়েছিল৷ এখন তারা সংখ্যায় আরও বেড়েছে নিশ্চয়!’
দূরে একটা গাড়ি আসছে৷ আমাদেরই গাড়ি৷ আমাদের উদ্ধার করতে আসছে৷ ডক্টর ল্যাং লাফিয়ে নামলেন৷ তাঁর মুখে লেগে আছে মিষ্টি একটা হাসি৷
‘ডক্টর শিলার, দ্য সেম পয়েন্ট!’
‘ইয়েস ডক্টর৷ এই জায়গাটার একটা কিছু ব্যাপার আছে৷’
‘ব্যাপারটা আমাকে ইনভেসটিগেট করতে হবে৷ আমি একদিন সারারাত এখানে বসে থাকব৷ নিশ্চয়ই এখানে কোনও স্পিরিট আছে৷’
‘আমি যে ওসব বিশ্বাস করি না৷’
‘কিন্তু আমি যে করি৷’
শিলার হো-হো করে হাসলেন৷
মোটা তার নয়, বিশাল একটা ম্যাগনেট দিয়ে গাড়িটাকে সরিয়ে আনা হল৷ বাধ্য ছেলের মতো সুড়সুড় করে পিছনে সরে এল৷
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘নেক্সট টাইম এখানে আমি একটা ক্রশ পুঁতে দেবো৷ এখানে একটা ইভল স্পিরিট কাজ করছে৷’
যে যার গাড়িতে উঠে পড়লুম৷ আমাদের যাত্রা আবার শুরু হল৷ দুলতে-দুলতে, লাফাতে-লাফাতে গাড়ি চলেছে৷ রাস্তাটা তেমন ভালো নয়৷ বেতের ঝাঁপিগুলো এদিক ওদিক দুলছে৷ আবার না ছিটকে পড়ে৷
দূর থেকে প্রথমেই চোখে পড়ল একটা চার্চের চূড়া৷ নীল আকাশের গায়ে যেন খোঁচা মারছে! কানে এল ঘণ্টার শব্দ৷ শিলার বললেন, ‘আমরা এসে গেলুম৷ আজ শুক্রবার, তাই চার্চের ঘণ্টা বাজছে৷ আজ প্রেয়ারের দিন৷’
পাহাড়ের গায়ে থাকে-থাকে বাড়ি উঠে গেছে৷ কোথা থেকে যেন একটা আলো ঝলসে উঠছে মাঝে-মাঝে৷ বিশাল একটা আয়না থেকে আলো ঠিকরে পড়লে যেমন হয়৷ বিশাল দুটো বেলুন উড়ছে আকাশের গায়ে৷ একটার রং হলদে আর একটা লাল৷
সামনেই একটা সাইনবোর্ড—হিলসাইড রিসার্চ স্টেশন৷ টেসপাসারস উইল বি ইন ডেঞ্জার৷ ডেঞ্জার মানে তো বিপদ৷ কেউ হঠাৎ বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়লে বিপদে পড়বে কেন? কী বিপদ!
রাস্তাটা হঠাৎ অসাধারণ ভালো হয়ে গেল৷ মসৃণ, চকচকে, কালো পিচ-মোড়া৷ দু-পাশে সাদা-সাদা পাথরের খাড়াই৷ আমরা এখন ঢালু পথে নিচের দিকে নেমে চলেছি৷ মাঝে-মাঝে পথের পাশে ছোট-ছোট গুমটি ঘর৷ পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে৷ হাতে বন্দুক নয়, এক ধরনের কালো নলের মতো জিনিস! মুখের কাছে চকচকে রিং লাগান৷ দু-পাশ দিয়ে দু-সার করে তার চলে গেছে৷ একটা ছোট নালা বয়ে চলেছে পাশ দিয়ে তরতর করে৷ স্বচ্ছ জল৷ মাঝে-মাঝে কালভার্ট৷ কালভার্টের তলায় টিয়ার ঝাঁক জায়গাটাকে সরগরম করে রেখেছে৷ দূরে আকাশের গায়ে পাহাড়ের ঢেউ ঝাপসা হয়ে আছে৷ দেখলেই কেমন যেন মন কেমন করে ওঠে৷ কত দূর! কত অজানা! গভীর বন৷ হরিণ, চিতা, হায়না!
পথের একটা জায়গায় এসে গাড়িটা থেমে গেল৷ ডক্টর শিলার বললেন, ‘বয়েজ, এবার তোমাদের নামতে হবে৷ আমি গাড়িটাকে নিয়ে পাতালে চলে যাব৷ বাসুকিদের রাজত্বে৷ তোমাদের গাইড করে নিয়ে যাবে ‘আমাদের গার্ড৷’
আমরা আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে নেমে পড়লুম৷ সামনেই একজন সুন্দর মানুষ দাঁড়িয়ে৷ অলিভ রঙের পোশাক পরে৷ রাস্তার পাশেই একটা লোহার হাতল৷ লিভারের মতো দেখতে৷ সেটাতে চাপ দিতেই ওপরের রাস্তাটা সরে গেল৷ নিচে বেরিয়ে পড়ল আর একটা রাস্তা৷ সোজা নেমে গেছে ঢালু হয়ে৷ মোটেই অন্ধকার নয়, সেখানেও দিনের আলোর মতো ঝলমল করছে আলো৷ গাড়িটা সেই পথে নেমে যেতেই ওপরের দুভাগ রাস্তাটা আবার জুড়ে গেল৷
আর তো দ্বিতীয় কোনও গাড়ি নেই৷ আমরা কীভাবে যাব৷ সঙ্গে এত মালপত্তর! বাড়িগুলোও অনেক দূরে৷ আমাদের গাইড সাহেব মুখ দেখেই মনের কথা পড়ে ফেলেছেন, হেসে বললেন, ‘হাঁটতে হবে না৷ তোমরা দাঁড়িয়ে থাকবে, রাস্তাটাই চলতে থাকবে৷ কাম হিয়ার৷ কাম টু দিস সাইড অফ দি রোড৷’
আমরা মালপত্তর নিয়ে বাঁ-পাশে সরে গেলুম৷ পায়ের কাছে সুটকেস৷ গাইড সাহেব বললেন, ‘আমি সঙ্গে যাচ্ছি না, ওপাশে তোমাদের যিনি রিসিভ করবেন, তাঁকে আমি ফোনে জানিয়ে দিচ্ছি৷ তোমরা শুধু ডানপাশের এই সাদা রেখাটায় পা লাগাবে না৷ রেডি ওয়ান, টু, থ্রি৷’
সাঁ করে মৃদু একটা শব্দ হল৷ আমরা এগোতে লাগলুম সামনের দিকে৷ পরেশ বললে, ‘অপূর্ব, আমার মাথাটা ঘুরছে রে, তোর কাঁধ দুটো ধরছি৷’
নবেন্দু বললে, ‘আমি পড়েছি, বিদেশে এইরকম চলমান রাস্তা আছে৷ কী মজা লাগছে! তাই না?’ পরেশ কাঁদকাঁদ গলায় বললে, ‘হ্যাঁ কী ভীষণ মজা!’
চোখ-ধাঁধান আলোর রহস্যটাও যেন হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল৷ চোখ পড়ল বিশাল একটা গোল গম্বুজে৷ গম্বুজের বাইরের রঙটা আয়নার পিছনের মতো! মাথাটা খোলা৷ ভেতরটা নিশ্চয়ই খুব গভীর৷ খোলা মুখে সূর্যের আলো পড়ে ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে৷ মনে হয় ভেতর দিকটা আয়নার মতো কোনও বস্তু দিয়ে তৈরি৷ আমরা গম্বুজটার অনেক দূর দিয়েই চলেছি, তবু মনে হল ভেতরে যেন কেমন একটা বগবগ শব্দ উঠছে৷
‘নবেন্দু, ওটা কী বল তো?’
‘মনে হচ্ছে সোলার রি-অ্যাকটার৷ এরা সূর্যের আলোকে সূর্যের তেজকে কাজ লাগচ্ছে! কী কাজে লাগাচ্ছে তা জানি না৷’
আমাদের গতি ধীরে-ধীরে কমে আসছে৷ সামনেই একটা সাদা গুমটি ঘর, গায়ে হলুদের ডোরা৷ সাদা রঙের একটা মানুষ সমান উঁচু লোহার বেড়া আমাদের পথ আগলে আছে৷ ঢং করে একটা ঘণ্টার শব্দ হতেই চলমান রাস্তা স্থির হয়ে গেল৷ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আর একজন গার্ড৷ সেই অলিভ রঙের পোশাক৷ হাত বাড়িয়ে আমাদের সঙ্গে হাত মেলালেন৷ এঁর হাতেও সেই ফাঁপা নলের মতো একটা কী৷ মুখটা চকচকে ধাতুর রিং দিয়ে মোড়া৷
বেড়ার ওপাশে বিশাল একটা প্রাঙ্গণ৷ পাথরের ইট বসানো৷ ঝাউ, ইউক্যালিপটাস, বোগেনভ্যালিয়া, গন্ধরাজ গোল করে ঘিরে রেখেছে৷ সামনেই দূর থেকে দেখা যায় সেই চার্চ৷ কয়েকটা নতুন চকচকে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ চার্চের জানলায় নানা রঙের কাচ বসানো৷ কাচের গায়ে আঁকা যিশুর জীবনের নানা ঘটনা৷
গার্ড বললেন, ‘তোমাদের জিনিস এখানে থাক৷ আমি তোমাদের মালপত্র গেস্ট হাউসে পাঠিয়ে দেব৷ তোমরা সোজা চার্চে চলে যাও৷ ওখানেই সকলকে পাবে৷’
চার্চে অদ্ভুত সব মানুষ
নবেন্দু বললে, ‘ওই যে উঁচু বেদি বা প্ল্যাটফর্মের মতো জায়গাটা, ওটাকে বলে পালপিট৷ আর সাদা পোশাক পরা ওই মানুষটি হলেন বিশপ৷’
অর্গানের সুরে ভেতরটা গমগম করছে৷ সঙ্গে সমবেত কণ্ঠের গানঃ
Holy, holy, holy is the Lord God
Almighty.
Who was, who is, and who is to come.
আমরা সবার পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছি৷ আমাদের প্রত্যেকের সামনে উঁচু একটা ডেস্ক৷ তার ওপর একটা করে বাইবেল৷ মলাটে সোনার জলে লেখা—বাইবেল৷ আমাদের সামনে আর যাঁরা সব দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁদের দেখে আমরা সকলেই খুব ভয় পেয়ে গেলুম৷ কেউই স্বাভাবিক মানুষ নয়৷ ডানপাশের শেষের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন যাঁরা, তাঁরা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া, ঠিক দৈত্যের মতো৷ একেবারে সামনের সারিতে যাঁরা, তাঁরা সব ক্ষুদে মানুষ৷ উচ্চতায় দু-ফুট-আড়াই ফুটের বেশি হবেন না৷ আমাদের সামনে যাঁরা তাঁদের প্রত্যেকের পিঠেই একটা করে বিশাল আকারের কুঁজ৷ তাঁদের পাশেই যাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন তাদের কেমন যেন গেঁটে-গেঁটে চেহারা৷ ঠিক যেন কাঠের তৈরি পুতুল৷
প্রেয়ারের সময় কথা বলতে নেই৷ আমরা পরস্পর-পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছি৷ মনে-মনে কথা হচ্ছে, এঁরা কারা! এমন অদ্ভুত সমাবেশ এখানে হল কী করে! অর্গানের সুর কখনও উঠছে, কখনও পড়ছে৷ রঙিন কাচের বাইরে পাহাড়ি রোদ ক্রমশ প্রখর হচ্ছে৷
সুর থেমে গেল৷ বিশপ প্রার্থনা করলেন,
I will pour out my spirit upon all men.
Your sons and your daughters will prophesy,
Your young men will see visions,
And your old men will dream dreams.
আমরা একে-একে চার্চ থেকে বেরিয়ে এলুম৷ ডাক্তার ল্যাং বোধহয় সামনের দিকে ছিলেন৷ তিনি বেরিয়ে এলেন সবশেষে৷ আমাদের অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাপারটা বুঝেছেন, তাই হাসতে-হাসতে বললেন, ‘অদ্ভুত সব মানুষ, তাই না নবেন্দু!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তাকিয়ে দেখার মতো৷’
‘এই রহস্য তোমাদের কাছে আমি পরিষ্কার করে দেব আজ রাতে৷ এখন তোমরা আমার সঙ্গে চলো৷ বেশ বেলা হয়েছে৷ একটার সময় লাঞ্চ৷ তার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে৷’
গেস্ট হাউস
এত সুন্দর গেস্ট হাউস খুব কম দেখা যায়৷ তবে ক’টা গেস্ট হাউসই বা আমরা দেখেছি৷ চারপাশে গোলাপ ফুলের বাগান৷ নানা রঙের বড়-বড় গোলাপ ফুটে আছে৷ মাঝখানে একটা ফোয়ারা৷ হালকা ধারায় জল উঠে চারপাশে যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন মাঝে-মাঝে রামধনু তৈরি হচ্ছে৷ এত বড়-বড় ভোমরা ফুলের কিছুটা দূরে শূন্যে দাঁড়িয়ে কখনও স্থির, কখনও খোঁচা মারছে ফুলের গর্ভকেশরে৷ কেমন একটা একটানা ভোঁ-ভোঁ শব্দ৷
আমাদের প্রত্যেকের জন্যে একটা করে আলাদা ঘর৷ পরেশের সবেতেই ভয়৷
‘কী করে একলা একটা ঘরে শোব রে অপূর্ব! চার্চে যাদের দেখলুম, তারা যদি রাতে জানলা ধরে উঁকি মারে, ভয়ে মরে যাব রে নবেন্দু৷’
‘তোর মরে যাওয়াই ভালো রে পরেশ৷ তোর সবেতেই ভয়৷ মানুষেও ভয়৷’
‘আচ্ছা বল, ওরা কী মানুষ!’
‘মানুষ না তো কী? এক জায়গায় অতগুলো কদাকার মানুষ দেখা যায় না এই যা!’
নবেন্দু চান করতে চলে গেল৷ আমরাও চানে যাব৷ প্রত্যেকের ঘরের সঙ্গেই একটা করে বাথরুম৷
ওঃ! চানের জন্যেও যে এত আয়োজন থাকতে পারে জানা ছিল না৷ একেবারে সাদা বাথরুম৷ বিশাল বাথটাব৷ শাওয়ার৷ মেঝেতে এটা আবার কী! পায়ের চাপ দিয়ে দেখি৷ আরে, চাপ দিতেই তলা থেকে ফিনকি দিয়ে জল উঠছে ফোয়ারার মতো৷ বেশ মজা তো! ওপরে শাওয়ার থেকে জল পড়ছে, নিচে ফোয়ারা থেকে জল উঠছে৷ আঃ কী আরাম রে! একটা কৌটোর গায়ে লেখা বাথসল্ট৷ বাথ মানে স্নান, সল্ট মানে নুন৷ পুরো মানেটা তাহলে হল চানের নুন৷ সেটা আবার কী জিনিস৷ যেখানকার জিনিস সেখানেই থাক বাবা৷ হাত দিয়ে কাজ নেই৷
গেস্ট হাউসের বারান্দায় খসখসের পরদা নেমেছে৷ একজন লোক পিচকিরি দিয়ে জল দিচ্ছে৷ ছোট্ট এতটুকু মানুষ৷ দেখলেই কেমন মজা লাগে৷ পরেশ দেখলে ভয় পাবে৷ খসখসের মিষ্টি গন্ধে মনটা যেন জুড়িয়ে গেল৷ বিহারি গরম ফুটছে৷ ঘাম নেই, গা-জ্বালা৷ লোকটি আমাকে দেখে বললে, ‘গুড মর্নিং মাস্টার, মাস্টার...’
‘অপূর্ব৷’
‘ইয়েস মাস্টার অপূর্ব৷ আমার নাম টমাস৷’
‘মর্নিং মাস্টার টমাস৷’
মাস্টার বলেই খেয়াল হল, দেখতে ছোট হলেও বয়েসে অনেক বড়৷ ভুল শুধরে নিলুম, ‘মর্নিং মিস্টার টমাস৷’
লোকটি চলে যেতে-যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে হাসল, ‘রাইট ইউ আর, আমার বয়েস এখন ফর্টি সিক্স৷’
নবেন্দু পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ মিষ্টি গন্ধ বেরোচ্ছে৷
‘কী মেখেছিস রে নবেন্দু!’
‘কেন, বাথসল্ট!’
‘বাথটাবে জল ভরবি তারপর বাথসল্ট মিশিয়ে বেশ করে ফেনা করে তার মধ্যে শুয়ে পড়বি৷’
‘তাই নাকি, তাহলে আর একবার চান করে আসি৷’
‘সে কী রে!’
‘হ্যাঁ, তুই করলি আমি করব না! কী সুন্দর জায়গা নবেন্দু৷ আমি আর এখান থেকে যাব না৷’
‘তোকে রাখবে কেন?’
‘আমি আঙ্কলকে রিকোয়েস্ট করব৷’
‘আচ্ছা, পরেশটার কী হল বল তো?’
‘ঠিক বলেছিস৷ অনেকক্ষণ তার কোনও সাড়া শব্দ পাচ্ছি না৷ চল তো ওর ঘরে৷’
পুবদিকের শেষ ঘরটা পরেশের৷ ঘরের দরজা হাট করে খোলা৷ জামাটামা সব খোলা৷ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে৷ বাবু বাথরুমে ঢুকেছেন৷ নবেন্দু ডাকলে, ‘পরেশ, পরেশ৷’
বাথরুম থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ এল৷
‘কী হল রে নবেন্দু, পরেশ কাঁদছে মনে হচ্ছে৷’
‘হ্যাঁ তো রে, কান্নারই তো শব্দ! পরেশ, কী হল, এই পরেশ৷’
বাথরুম থেকে পরেশের কান্না জড়ানো চাপা গলা ভেসে এল, ‘বাথরুমের দরজাটা যে খুলতে পারছি না রে নবেন্দু৷ সেই থেকে আটকে বসে আছি৷’
‘সে আবার কী রে?’
‘হ্যাঁরে, কিছুতেই খুলছে না ভাই৷’
‘উঃ তোকে নিয়ে তো মহা বিপদ হল৷ তুই ছিটকিনিটা বাঁ-দিকে ঘুরিয়ে দরজাটা তোর দিকে জোরে টান৷ দরজার ল্যাচ এইভাবেই খুলতে হয়৷ ট্রেনের ল্যাভেটারির কায়দা তো তুই দেখেছিস, ডানদিকে ঘোরালে বন্ধ হয়, বাঁ-দিকে ঘোরালে খোলে৷’
‘আরে তখন থেকে তাই তো করছি৷ কমসে কম হাজার বার করেছি৷’
‘তাও খুলছে না?’
‘না৷’
‘নবেন্দু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘কী ব্যাপার বল তো অপূর্ব!’
নবেন্দু দরজাটা ভালো করে দেখে হো-হো করে হেসে উঠল৷ পরেশ ভেতর থেকে বললে, ‘আমার এই বিপদে তুই হাসছিস নবেন্দু!’
‘হ্যাঁ, হাসছি ইডিয়েট৷ তুই একটা ইডিয়েট!’
নবেন্দু হাতল ধরে দরজাটা নিজের দিকে টানতেই খুলে গেল৷ পরেশ গামছা পরে দাঁড়িয়ে আছে৷ গা দিয়ে বিনবিন করে ঘাম বেরোচ্ছে৷ মুখে একমুখ হাসি৷
‘কী করে খুললি নবেন্দু! তুই যাদু জানিস৷’
‘হ্যাঁ, জাদু জানি৷ মূর্খ, এ-দরজাটা বাইরের দিকে খোলে, তুই তো দরজাটা ঠেলে দেখবি! তা না, তখন থেকে নিজের দিকেই টেনে চলেছিস!’
পরেশের মুখটা হাঁ হয়ে গেল, জানলি নবেন্দু, বিপদে মানুষের বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়৷ আমি না কেমন বোকার মতো তখন থেকে ছিটকিনিটা কেবল ঘোরাচ্ছি আর দরজাটা টানছি৷ কীরকম ঘেমে গেছি দেখ৷ আর একবার চান করে নিই৷ কি বল অপূর্ব!’
‘হ্যাঁ, তাই নাও ভাই৷ তবে বেরোতে পারবি তো!’
পরেশ একগাল হেসে বললে, ‘আর ভুল হবে না, এবার শিখে গেছি৷’
মরা টিয়া
বারান্দায় সুন্দর করে সাজানো বেতের চেয়ার টেবিল৷ খসখসের পরদার ভেতর দিয়ে গরম হাওয়া পথ করে নেবার সময় কিছুটা উত্তাপ হারিয়ে ঠান্ডা হয়ে গন্ধ মেখে গায়ে এসে লাগছে৷ আমরা পাশাপাশি বসে আছি অলস ভঙ্গিতে৷ কিছু করার নেই৷ কিছু পড়ার নেই৷
সাদা পোশাক পরে একজন লোক এলেন, হাতে একটা কার্ড৷ কার্ডটা লাঞ্চের মেনু৷
‘আপনারা কি সবাই ভেজিটেরিয়ান, না ননভেজ, না মেশানো?’
আমাদের আপনি বলায় একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলুম৷ নবেন্দুই উত্তর দিলে, ‘আমরা সবাই ননভেজ৷’
‘ভেরি গুড৷’
‘চিকেনে আপত্তি আছে?’
‘না-না৷’
‘ভেরি গুড৷ তা হলে একটার সময় ডাইনিং হলে চলে আসবেন৷ সোজা উত্তরে হেঁটে যাবেন, সামনেই ডাইনিং হল৷’
লোকটির হাতের তালু দুটো কুচকুচে কালো, আমরা সবাই হাতের দিকে তাকিয়ে আছি, নবেন্দুই জিগ্যেস করলে, ‘আপনার হাতে কি কোনও রং লেগেছে!’
‘ও নো, নো৷ এইটাই আমাদের ফ্যামিলির বৈশিষ্ট্য৷ হেরিডিটিও বলতে পারেন৷ আমাদের দু-ভায়েরই হাতের তালু এইরকম কালো৷ আমাদের বাবা বা মায়ের কালো ছিল না, তবে শুনেছি আমাদের গ্রেট-গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদারের হাতের তালু দুটো এইরকম ছিল৷ আচ্ছা, গুডবাই, থ্যাঙ্ক ইউ৷’
লোকটি গটমট করে চলে গেল৷
পরেশ বললে, ‘কী অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে এলি নবেন্দু! অবাক-অবাক সব ব্যাপার!’
‘ঘরকুনো হয়ে বসে থাকলে এই সব দেখতে পেতিস?’
‘তা পেতুম না, তবে আমার কীরকম ভয়-ভয় করছে৷’
‘তোর ভয়ে গুলি মার৷ তুই তো আরশোলা দেখলেও ভয়ে আঁতকে উঠিস৷’
দেখতে-দেখতে সাড়ে বারোটা বেজে গেল৷ নবেন্দু বললে, ‘চল এবার বেরিয়ে পড়ি৷ বসে-বসে ঝিম ধরে গেল৷’
বাইরে যেন আগুন ছুটছে৷ গোলাপগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে৷ ভোমরারা সব ছায়ায় সরে গেছে৷ দূরের পাহাড়ের রেখা যেন আরও অস্পষ্ট ধোঁয়াটে৷ বাগানে একটা বাঁশের গায়ে থার্মোমিটার বাঁধা৷ নবেন্দু দেখে বললে, ‘একশো তেরো ডিগ্রি৷ উঃ গরম বটে! খুব পেঁয়াজ খেতে হবে৷’
‘মাথায় একটা করে ভিজে তোয়ালে চাপিয়ে এলে মন্দ হতো না৷’
‘ঠিক বলেছিস৷ চ ফিরে যাই৷’ প্রায় মাঝ রাস্তায় এসে পরেশ আবার ফিরতে চায়৷ এই না হলে পরেশ!
নবেন্দু বললে, ‘হ্যাঁ, তুই ফিরে যা৷ ভিজে তোয়ালে মাথায় দিয়ে আসতে-আসতেই আমাদের খাওয়া শুরু হয়ে যাবে!’
নবেন্দু হঠাৎ রাস্তা ছেড়ে বাঁ-পাশের ঝোপঝাড়ের দিকে সরে গেল৷ কিছু একটা চোখে পড়েছে৷
‘অপূর্ব, এদিকে আয়৷ দেখে যা! ওই দেখ৷ দেখেছিস!’
চার-পাঁচটা টিয়া পাখি একটা পেয়ারাগাছের তলায় মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে৷ গাছে পাকা-পাকা পেয়ারা ঝুলছে৷
‘কী ব্যাপার বল তো? আহা অত সুন্দর-সুন্দর পাখি!’
‘গরমে মরেছে বলে মনে হয় না৷ একশো তেরো ডিগ্রি এখানে এমন কিছু গরম নয়৷ কেউ মেরেছে বলেও মনে হয় না৷’
‘তা হলে কী? কী করে মরল তা হলে?’
‘সন্দেহজনক ব্যাপার রে!’
আবার আমরা চলতে শুরু করলুম৷ মাথায় ঘুরছে মরা টিয়া৷
পরেশ বললে, ‘গরমেই মরেছে রে! লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু৷ এন্তার পেয়ারা খেয়ে কলেরা হয়ে মরেছে৷’
‘ঠিক বলেছিস৷ তুই চুপ কর পরেশ৷ কেবল মনে রাখিস, এখানে সব গুরুপাক খাদ্য৷ একটু ভেবেচিন্তে খাস৷’
ডাইনিং হল
ভারি সুন্দর ঠান্ডা ভেতরটা৷ এয়ারকন্ডিশানড৷ চমৎকার সাজানো৷ ছোট-ছোট টেবিল৷ সাদা টেবিলক্লথ৷ প্রত্যেক টেবিলেই গলা সরু, ঝকঝকে একটা করে ফুলদানি৷ কোনওটায় নীল ফুল, কোনওটায় হলুদ ফুল৷ কোনওটায় লাল ফুল৷ মুখোমুখি গদি আঁটা চেয়ার৷ চারপাশের দেওয়ালে ভালো-ভালো ছবি আঁকা৷ ডক্টর ল্যাং আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন৷
‘বাঃ তোমাদের খুব ফ্রেশ দেখাচ্ছে৷ এখানে কিছুদিন থাকলেই তোমাদের চেহারা ফিরে যাবে৷ পরিষ্কার হাওয়া, তেমনি ভালো জল৷
আমরা হাসি-হাসি মুখে ঘাড় নাড়লুম৷ নবেন্দু বললে, ‘আঙ্কল, আসার সময় বাগানে একটা স্যাড দৃশ্য দেখলুম৷’
‘কি দৃশ্য!’
‘একটা পেয়ারাগাছের তলায় চার-পাঁচটা বড়-বড় টিয়া মরে পড়ে আছে৷’
‘সে কী!’
আমরা সমস্বরে বললুম, ‘ইয়েস আঙ্কল৷ মরে কাঠ হয়ে পড়ে আছে৷’
‘আমি দেখতে চাই৷ আমার এখানে মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে, সেখানে মরা পাখি, সাংঘাতিক কথা? আই মাস্ট সি৷ চলো-চলো৷’
ঘরে আরও অনেকে এসেছেন৷ যে যাঁর টেবিলে বসে পড়েছেন৷ চিনে মেমসায়েবরা প্লেট হাতে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘুরছেন৷ ডাক্তার বললেন, ‘লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, আপনারা শুরু করুন, আমরা এখনই আসছি৷’
ঠান্ডা ঘর থেকে বাইরে আসতেই গরমে সারা শরীর জ্বলে গেল৷ মনে হল, গরম জলের নদীর মধ্যে দিয়ে হাঁটছি৷ সেই পেয়ারা গাছটার তলায় এসে আমরা অবাক হয়ে গেলুম৷ মরা পাখি ক’টা অদৃশ্য হয়ে গেছে৷ আমরা অবাক হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি৷ ডাক্তার বললেন, ‘কই, কোথায় তোমাদের পাখি! ভুল দেখেছ তোমরা৷ ওরা হয়তো বসে ছিল, উড়ে গেছে৷’
‘না আঙ্কল, আমরা মরা পাখি চিনি৷ মরে কাঠ হয়ে পড়েছিল ঠিক ওই জায়গাটায়৷’
অনেক খোঁজা হল৷ পাখিদের ডেডবডি পাওয়া গেল না৷ আমরা সকলেই চিন্তিত মুখে খাবার ঘরে ফিরে এলুম৷
প্রচুর খাওয়া হল৷ সুপ দিয়ে শুরু, পুডিং দিয়ে শেষ৷ অনেকে এই গরমেও কফি খেলেন৷ ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘দুপুরে তোমরা রেস্ট নাও, বই-টই পড়ো৷ ঘুমোতেও পারো৷ চারটের সময় চা৷ তারপর তোমাদের বেড়াতে নিয়ে যাব৷ সন্ধেবেলা আমার রিসার্চ ল্যাবরেটারি দেখাব৷ গুড বাই বয়েজ৷’
পরেশ এত খেয়েছে নড়তেই পারছে না৷ ধরে-ধরে নিয়ে যেতে পারলেই যেন ভালো হয়৷
‘এত খেলি কেন পরেশ?’
‘ওঁরা দিলেন তাই খেলুম৷ জীবনে এরকম রান্না কখনও খাইনি রে নবেন্দু! পাগলা করে দিয়েছে৷’
‘তা দিয়েছে তবে পেট ছেড়ে দিলে কী করবি!’
‘এখান পেট ছাড়বে! এক-এক গেলাস জলই তো হজমি৷ ও তোরা ভাবিসনি কিছু৷ আমার হজম যন্ত্রটা এমনিই ভালো চলে৷’
পরেশ ঘুমিয়ে পড়ল৷ আমি আর নবেন্দু চুপচাপ বসে রইলুম, খসখস ফেলা বারান্দায়৷ বাইরে ধোঁয়া-ধোঁয়া দুপুরের রোদ ঝিম-ঝিম করছে৷ নবেন্দু বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল বল তো! পাখিগুলো সত্যিই কি মরেনি?’
‘মরা পাখি অত সহজে চিনতে ভুল হবে! আচ্ছা নবেন্দু, খাবার ঘরে ডক্টর শিলারকে তো দেখা গেল না!’
‘হ্যাঁ ঠিক বলেছিস৷ অপূর্ব, শিলার মানুষটিকে তোর কীরকম মনে হচ্ছে?’
‘কেমন যেন চাপা মানুষ৷ চোখ মুখ দেখলে মনে হয় বেশ নিষ্ঠুর৷’
‘ধরেছিস ঠিক৷ সাপ নিয়ে থাকেন বলেই বোধহয় অমন মনে হয়৷ পাখির রহস্যটা পরিষ্কার করতেই হবে৷ তা না হলে আঙ্কল ভাববেন, আমরা মিথ্যেবাদী৷’
‘এখন বেরোবি একটু! অনেকক্ষণ তো বিশ্রাম হল৷’
‘মন্দ বলিসনি, বাগানটা একটু ঘুরে দেখলে হয়৷’
রোদের তাপ থেকে বাঁচার জন্যে আমরা একটা করে কপাল চাপা টুপি পরে নিয়েছি৷ রোদ আর সোজা এসে চোখে লাগছে না৷ তা হলেও বাইরেটা ঝাঁ-ঝাঁ করছে৷ হলকা এসে শরীর পুড়িয়ে দিচ্ছে৷ নবেন্দুর কথামতো ভরপেট জল খেয়ে নিয়েছি৷ সহজে লু লাগবে না৷
অনেক দূর পর্যন্ত বাগান চলে গেছে৷ ফুল বাগান নয়৷ বড়-বড় ফলের গাছ৷ লম্বা-লম্বা হাঁটু সমান ঘাস গাছ৷ সাপ থাকতে পারে৷ শিলার বলেছিলেন, সাপ সহজে মানুষকে কামড়ায় না৷ ভয় পেলে তবেই ছোবল মারে৷ উঁচু নিচু জমি৷ মাঝে-মাঝে পাথরের চাঁই পড়ে অছে৷ ঘাসের মধ্যে দিয়ে সরসর করে কী যেন একটা চলে গেল লম্বা মতো৷ মনে হল শরীরটা বেশ বিশাল৷ ঘাসের মাথাগুলো দুলতে লাগল৷ জমিটা ক্রমশই ঢালু হয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে নেমে চলেছে৷ বহু দূরে পাহাড়ের কোলে জল চিকচিক করছে৷ একটা নদী৷ নদীর ওপরে রেল ব্রিজ৷
এক জায়গায় দেখা গেল ঘাস নেই৷ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে৷ আর সেই জায়গাটায় বেশ বড় মাপের একটা চৌকো কাচ বসানো৷ কী একটা পাখির কঙ্কাল পড়ে আছে৷ একটা গিরগিটির হাড়৷ অদ্ভুত দৃশ্য৷ নবেন্দু বললে, ‘শুনেছি ড্রাগনের নিঃশ্বাসে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়৷ ড্রাগন আছে না কি রে অপূর্ব!’
‘কী জানি ভাই৷ এই দুপুর বেলাতেই আমার কীরকম গা-ছমছম করছে৷ গিরগিটির কঙ্কালটা দেখ নবেন্দু৷ দেখলেই ভয় করে৷’
‘এই পুরু প্লেট-গ্লাসটা কীভাবে বসানো দেখেছিস৷ হঠাৎ এইভাবে এখানে কাচ লাগিয়ে রেখেছে কেন?’
‘কী জানি ভাই৷ নিশ্চয়ই কোনও উদ্দেশ্য আছে!’
এখন আর তেমন গরম লাগছে না৷ বড়-বড় সেগুন, কৌটো বাদাম আর শালগাছের তলায়-তলায় বুনো আগাছার ঝোপ৷ একটা গাছের তলায় কাঠবিড়ালিরা গাদা-গাদা বাদাম জড়ো করেছে৷ নবেন্দু বললে, ‘না, এখানে কিছু পাওয়া যাবে না৷ কোথায় খুঁজব পাখির ডেডবডি! কিন্তু ব্যাপারটা বড় রহস্যজনক৷ আচ্ছা, ওই ঘাসপোড়া জায়গাটায় আর একবার চল তো অপূর্ব!’
আবার আমরা সেই জায়গাটায় এলুম৷ নবেন্দু নিচু হয়ে অনেকক্ষণ দেখল৷ পাখির সেই হাড়ের মাথাটা হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখল৷ সরু বাঁকা ঠোঁট৷
‘বুঝলি অপূর্ব, এটা টিয়ার মাথা৷ আমার সন্দেহ হচ্ছে৷’
‘কী বল তো!’
‘এইখানেই একটু আগে পাখি পাঁচটাকে পোড়ানো হয়েছে!’
‘তা হলে আর সব হাড়গোড় গেল কোথায়!’
‘হয় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, না হয় ওই কাচের তলায় লোপাট করে দিয়েছে৷’
‘লোপাট করবে কেন! পাখি কি মানুষ! পাখি মরেছে, কোনও কারণে মরেছে৷ তা নিয়ে কার কী মাথাব্যথা থাকতে পারে!’
‘তোর কথাই হয়তো ঠিক৷ তবু আমার মন বলছে৷ চল চায়ের সময় হয়ে গেল৷’
শ্যারন অসুস্থ
ডাইনিং হলের চায়ের টেবিলে আঙ্কলকে দেখতে পেলুম না৷ একজনকে জিগ্যেস করলুম, ‘আমাদের আঙ্কল ডক্টর ল্যাং কোথায়? তিনি চা খাবেন না?’
‘তিনি হসপিট্যালে৷ শ্যারন ভীষণ অসুস্থ৷’
‘শ্যারন কে?’
‘ওঁর রিসার্চ অ্যাসিসটেন্ট৷’
‘আমরা একবার যেতে পারি?’
‘কেন পারো না! আমিও তো যাব চা খেয়ে৷’ যিনি বললেন তিনি একজন প্রবীণ মানুষ৷ বাঙালি৷ স্বাভাবিক চেহারা৷ লম্বা নন, বামন নন৷ শরীরে কোনও বিকৃতি নেই৷
‘আপনিও কি ডাক্তার?’
‘ডাক্তার বলতে পারো৷ তবে আমি রেডিওলজিস্ট৷ নানা রকম ‘রে’ নিয়ে আমার কারবার, এক্স রে, গামা রে, কোবাল্ট রে৷’
ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে আমরা পাশাপাশি হাঁটছি৷ বাইরের হাওয়ায় রোদের তাপ অনেক কমে এসেছে৷ বিকেল হয়েছে৷ আকাশ নীল৷ দূরের পাহাড় বেশ স্পষ্ট হয়েছে৷ আবার পাখিটাখি দেখা যাচ্ছে৷
‘তোমাদের কিন্তু একটু ক্লাইম্ব করতে হবে৷ হসপিট্যালটা একটু উঁচু জায়গায়৷’
‘সে আমরা পারব৷ গত বছর আমরা স্কাউট থেকে ট্রেনিং-এ গিয়েছিলুম৷’
‘এবারে তোমরা এখানে এলে কী করে!’
‘হঠাৎ স্টেশনে ডক্টরের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল৷ উনি নিয়ে এলেন৷’
‘ভীষণ ভালো মানুষ৷ প্রকৃত খ্রিস্টান৷ দেবতার মতো! একা এতবড় একটা ফাউন্ডেশন চালাচ্ছেন৷ বড় কঠিন বিষয়৷ গবেষণা যদি সফল হয় পৃথিবীতে বিকলাঙ্গ প্রাণীর জন্মের ঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে৷ তোমাদের নাম কী?’
‘আমার নাম নবেন্দু৷’
‘আমার অপূর্ব৷’
‘আমার পরেশ৷’
‘আমি ডক্টর বোস৷’
হসপিট্যালের সামনে বিশাল একটা বাঁধানো চত্বর৷ সাদা একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে৷ আর একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশ চাপা৷ গায়ে লেখা ডিপ-ফ্রিজ৷
একেবারে সর্বাধুনিক হাসপাতাল৷ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন৷ যে ওয়ার্ডে শ্যারন রয়েছেন ডক্টর বোস আমাদের সেখানে নিয়ে এলেন৷ ডক্টর ল্যাং চিন্তিত মুখে একপাশে দাঁড়িয়ে৷ বেডে যিনি শুয়ে আছেন, অসাধারণ সুন্দরী৷ জ্ঞান আছে বলে মনে হল না৷ মুখটা নীল হয়ে আছে৷
‘আঙ্কল, কী হয়েছ!’
‘পয়েজনিং৷’
‘বিষ! বিষ খেয়েছেন?’
‘না, খেয়েছিলেন পাকা পেঁপে৷’
‘পেঁপে খেয়ে...৷’
‘হ্যাঁ নবেন্দু, পেঁপেতে স্নেক ভেনম পাওয়া গেছে৷ যে গাছের পেঁপে সেই গাছের সব ক’টা ফল আমরা টেস্ট করেছি, সবকটাই ডেডলি৷ সাপের বিষ সারা গাছটায় ছড়িয়ে গেছে৷ শুধু তাই নয়, তোমরা যে পেয়ারা গাছটার তলায় মরা পাখি দেখেছিলে, সেই গাছের সমস্ত ফল সাপের বিষে বিষাক্ত হয়ে গেছে৷ অদ্ভুত ব্যাপার!’
‘আঙ্কল, দিদি বাঁচবেন!’
‘খুব চেষ্টা হচ্ছে৷ লেট আস সি৷ শোনো, তোমাদের একটা ওয়ার্নিং দিয়ে রাখি, এখানকার কোনও গাছের ফল খাবে না, ফুল শুঁকবে না, কিচেনে বলে দিয়েছি এখানকার কোনও ভেজিটেবিল ইউজ করবে না৷’
‘আঙ্কল, অনেক সাপ ছড়িয়ে পড়েছে বুঝি?’
‘পরে বলব৷ আমি নিজেই জানি না৷ তবে সাবধানে থেকো৷ অবশ্যই মশারি ফেলে শোবে৷ হাতের কাছে টর্চ রাখবে৷ সন্ধের পর বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে একটুও এদিক-ওদিক যাবে না৷ তোমাদের সঙ্গে এখন আমি বেরোতে পারছি না৷ ডক্টর বোস, আপনি ওদের সামান্য একটু বেড়িয়ে দেবেন?’
‘ওঃ মোস্ট গ্ল্যাডলি৷ পেশেন্টের অবস্থা?’
‘যমে মানুষে টানাটানি চলেছে৷’
ডক্টর বোস আমাদের নিয়ে হাসপাতালের বাইরে এলেন৷ সাপের বিষ খেলে মানুষের কী-কী হতে পারে?
‘ওই ভদ্রমহিলার কী হবে ডাক্তারবাবু?’
‘সাপের বিষে মানুষ দু-ভাবে মারা যেতে পারে ভাই৷ এক ধরনের সাপ আছে যার বিষে মানুষের স্নায়ু অবশ হয়ে যেতে থাকে৷ আর-এক ধরনের বিষে রক্ত জমাট বেঁধে শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়৷ কী যে এখন হবে বলা শক্ত৷ আমি অনেকবার বলেছি, ডক্টর শিলারকে বিশ্বাস করবেন না৷ ও সাপের চেয়েও সাংঘাতিক মানুষ৷ সাপ নিয়ে পাতালে থাকতে-থাকতে নিজেই সাপ হয়ে গেছে৷’
আমরা চারজনে কথা বলতে-বলতে অনেক দূর চলে এসেছি৷ সামনেই কিছু দূরে সেই বিশাল কাচের ডোম৷ এতক্ষণ যেটাকে আমরা দূর থেকেই দেখেছি৷ একটা বিশাল কাচের গামলা যেন উপুড় হয়ে আছে৷
‘এটা কী জিনিস ডাক্তারবাবু?’
‘আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এর নিচে আর একটা রাজত্ব আছে, শিলারের রাজত্ব৷ এই কাচের গোলকের মাথাটা খোলা, ভেতরে বিভিন্ন কোণে আয়না বসানো৷ এর মধ্য দিয়ে সেই পাতালপুরীতে হাওয়া, আলো আর উত্তাপ ঢুকছে৷ মাঝে-মাঝেই দেখবে মাটিতে কাচ বসানো৷ ওই একই কারণ৷ আলো ঢোকার ব্যবস্থা৷
‘আপনি কখনও পাতালপুরীতে গেছেন?’
‘না ভাই, আমার সাহস নেই৷ কয়েক লক্ষ সাপ কিলবিল করছে৷’
দৈত্য
প্রথমে ভেবেছিলুম গাছতলায় একটা দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে৷ দৈত্য নয় মানুষ৷ ডাক্তার বললেন, ‘হ্যালো জেমস?’ দৈত্য উত্তর দিলেন, ‘হ্যালো ডক্টর৷’ আমরা প্রত্যেকেই এর কাছে যেন শিশুর মতো৷ ডাক্তারবাবু বড় জোর কোমরের কাছে কি তার একটু ওপরে পড়বেন৷ আমরা সব পেটের তলায় পড়ে আছি৷ মুখ দেখতে হলে পিছন দিকে ঘাড় হেলাতে হবে৷
ডক্টর বোস পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘জেমস এখন পৃথিবীর সব চেয়ে লম্বা মানুষ৷ জেমস, এই ছেলেরা আমাদের অতিথি৷’
জেমস হাসলেন৷ হেসে বললেন, ‘আমি এখন বড় ব্যস্ত৷ আমার ওপর ভার পড়েছে, সব গাছের ফল সংগ্রহের৷ শুনলুম আমাদের বাগানের সমস্ত ফল বিষাক্ত হয়ে গেছে৷’
জেমসের পিঠে একটা বাসকেট৷ বিভিন্ন ফলে ভরে উঠেছে৷
জেমসের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে চললুম৷ ডক্টর বোস বললেন, ‘রাশিয়ায় একজন দৈত্য ছিলেন, নাম মাখনভ৷ হাইট ছিল ন’ফুট চার ইঞ্চি৷ ওজন ছিল ১৮২ কেজি৷ এক একটা হাতের চেটোর দৈর্ঘ্য ছিল ১৩ ইঞ্চি৷ পায়ের পাতার মাপ ছিল ২০ ইঞ্চি৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রকম একজন মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন, নাম এওয়ার্ট পটগিটার৷ আমাদের জেমস তাঁদের সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন৷ জেমসের হাইট প্রায় একতলা উঁচু৷ প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল৷ তাই না!’
‘সত্যিই তাই৷’
আমরা একটা গুহার মুখে এসে দাঁড়িয়েছি৷ খুব ঘেঁসঘেঁস লোহার শিক দিয়ে মুখটা বন্ধ৷ সামনেই একটা নোটিস ঝুলছে৷
‘সাবধান!’
‘এ গুহার মধ্যে কী আছে ডাক্তারবাবু? বাঘ!’
‘বাঘের চেয়েও মারাত্মক জিনিস, ভ্যাম্পায়ার৷ ভ্যাম্পায়ার কাকে বলে জানো?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, রক্তচোষা বাদুড়৷ এমন জিনিস রাখার কারণ?’
‘কারণ, একটা কিছু আছে নিশ্চয়৷ জানেন ডাক্তার ল্যাং৷ ভ্যাম্পায়াররা কোথায় জন্মায় জানো? মধ্য আর দক্ষিণ আমেরিকায়, এদের প্রধান খাদ্য হল রক্ত৷ ধারালো দাঁত দিয়ে শিকারের চামড়া ছিঁড়ে জিভ দিয়ে রক্ত চেটে-চেটে খায়৷ এদের মুখ দেখলেই ভয় করে৷’
নবেন্দু বললে, ‘একবার দেখা যায় না?’
পরেশ ভয়ে থেমে পড়েছে, ‘ডাক্তারবাবু, কোনওরকমে বেরিয়ে আসবে না তো!’
‘না, বেরিয়ে আসার কোনও উপায় নেই৷ দেখছ না লোহার শিক বসানো৷’
নবেন্দু আবার বললে, ‘একবার দেখা যায় না?’
‘আচ্ছা, ক্লোজড সার্কিট টিভিতে তোমাদের দেখাব৷’
অনেকটা হাঁটা হয়েছে৷ পথের পাশে একটা কালভার্টে আমরা বসলুম৷ শুকনো হাওয়া বইছে৷ সারা শরীরটা যেন চনমন করছে৷ দুপুরের অত খাওয়া কখন হজম হয়ে গেছে৷ ডক্টর বোস পাইপ ধরাতে-ধরাতে বললেন, ‘তাহলে লড়াই এবার সত্যিই শুরু হল৷’
‘কীসের লড়াই?’
‘ডক্টর ল্যাং আর শিলারের লড়াই৷’
‘তার মানে?’
‘ক্ষমতার লড়াই৷ এতবড় একটা ফাউন্ডেশান, প্রচুর টাকা৷ একজন গবেষণা করছেন জীবন নিয়ে, আর একজন মৃত্যু নিয়ে৷’
‘শিলার কেন লাঞ্চে এলেন না?’
‘কেন আসবেন? তিনি থাকেন পাতালে৷ পাতালের রাজা৷ সেখানে তাঁর আলাদা ব্যবস্থা, আলাদা লোকজন৷ বেশ কিছু বেদে আর বেদেনি আছে তাঁর পাতাল পুরীতে৷ বছরে একবার সর্প উৎসব হয়৷ সে এক দেখবার জিনিস৷ এই শিলার চাইছেন ডক্টর ল্যাঙকে হটাতে৷ তোমরা বড় খারাপ সময়ে এসে পড়লে৷’
সাঁ করে ভীষণ একটা শব্দ হল৷ আমরা চমকে উঠেছিলুম৷ একটা ধোঁয়ার রেখা সোজা উঠে গেল মাটি থেকে আকাশে৷ ডক্টর বোস বললেন, ‘ভয় পাবার কিছু নেই৷ রকেট৷ এখান থেকে মাঝে-মাঝে রকেট ছোড়া হয়৷ পেনসিল রকেট৷ ওই দেখো কতদূরে উঠে যাচ্ছে৷ আশেপাশের লোককে একটু ভয় দেখাবার জন্যে মাঝেসাঝে এইসব করা হয়৷ আকাশে আগুন ছোড়া হয়৷’
ধীরে-ধীরে আকাশের আলো কমে আসছে৷ আকাশের গায়ে পাহাড়ের রেখা ক্রমশ কালো হয়ে আসছে৷ নবেন্দু প্রশ্ন করলে, ‘আশেপাশের লোককে ভয় দেখাতে হবে কেন?’
‘তা না হলেই উৎপাত করবে৷ একবার এখানে ডাকাত পড়েছিল৷’
‘ডাকাত!’
‘হ্যাঁ গো ডাকাত৷ ওই যে দূরের পাহাড়৷ ওখানে কি না আছে? বাঘ আছে, ময়াল সাপ আছে, ডাকাতদের আড্ডা আছে৷’
পাহাড়ের মাথার ওপর একটা তারা ফুটেছে৷ সামনের পথটা সোজা টিলার ওপর উঠে গেছে৷ সেখানে একটা গোল গম্বুজ বাড়ি৷
‘ডাক্তারবাবু, ওই গোল বাড়িটায় কী আছে?’
‘ওটা একটা অবজারভেটারি৷ একটা টেলিস্কোপ বসানো আছে৷ আকাশ দেখা হয়৷ ওই যে দেখলে লম্বা জেমস, ও একজন মস্ত বড় জ্যোতির্বিদ৷ সারারাত জেগে-জেগে তারা দেখে৷ ওর ধারণা দিনের পর দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে হঠাৎ নতুন কিছু দেখতে পাওয়া যাবে৷ মাঝরাতের, শেষরাতের আকাশে ও নাকি অনেক অদ্ভুত জিনিস দেখেছে৷ একদিন ওর কাছেই শুনে নিও৷’
আমরা উঠে পড়লুম৷ অনেকটা পথ ফিরে যেতে হবে৷ কলোনিতে একে-একে নানারকমের আলো জ্বলে উঠছে৷ জোর, কম জোর, নীল, লাল, সাদা৷ চার্চের চুড়োয় জ্বলছে নীল আলো৷ একটা টিপ-টিপ আলোর মালা এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেছে৷
ডক্টর বোস বললেন, ‘তোমরা রাতের বেলা, রাত বারোটার পর ভুলেও ঘরের বাইরে বেরোবে না৷ সময়-সময় পাহাড় থেকে বাঘ কী হায়না নেমে আসে৷ এই গুহাটা থেকে ভ্যাম্পায়ারদেরও ছেড়ে দেওয়া হয় শিকার ধরার জন্যে৷ চার্চের ঘড়িতে যেই বারোটা বাজবে, শুনতে পাবে, সঙ্গে-সঙ্গে সাবধান হয়ে যাবে৷ আমি নিজেই একবার ভীষণ বিপদে পড়েছিলুম৷ সে গল্প তোমাদের আর একদিন বলব৷’
সন্ধ্যা
আমাদের গেস্ট হাউসের বারান্দায় তিনজন বসে আছি, চানটান করে ঠান্ডা হয়ে৷ অল্প-অল্প বাতাস আসছে ফুলের গন্ধ মেখে৷ নবেন্দু বললে, ‘দেখ অপূর্ব, ডক্টর বোসকে আমার তেমন সুবিধের মানুষ বলে মনে হচ্ছে না৷ এখানে কী একটা যেন ষড়যন্ত্র চলেছে!’
‘ঠিক বলেছিস৷ আচ্ছা তোর কি বিশ্বাস হয়, রাত বারোটার পর রক্তচোষা বাদুড় ছেড়ে দেওয়া হয়!’
‘কী জানি ভাই৷ ছেড়ে দিলে আবার ধরে কী করে!’
‘তাও তো ঠিক কথা৷ ছাড়লে তো আবার ধরতে হবে?’
‘তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপার হতে পারে, বাদুড়গুলো হয়তো দিনের আলো ফুটলে নিজেরাই গুহায় ফিরে যায়৷’
‘তা হতে পারে৷’
হঠাৎ চার্চের ঘণ্টা বেজে উঠল৷ এই সময় তো ঘণ্টা বাজার কথা নয়৷ ঘণ্টার শব্দ কেঁপে-কেঁপে সারা পাহাড়গুলিতে ছড়িয়ে পড়ছে করুণ আর্তনাদের মতো৷
নবেন্দু বললে, লক্ষণ ভালো নয়৷ কেউ মারা গেলেই এইভাবে ঘণ্টা বাজে৷ শ্যারন বোধহয় মারা গেলেন রে অপূর্ব!’
‘তা হলে তো আমাদের একবার যেতে হয়৷’
‘হ্যাঁ, যেতে তো হবেই৷ চল বেড়িয়ে পড়ি৷’
চার্চের মাথার নীল আলোটা জ্বলছে৷ বহু দূরে হাসপাতাল৷ পিছনে একটা গাড়ির শব্দ পেলুম আমরা৷ ছোট্ট একটা স্কুটারভ্যান আসছে৷ সামনের আসনে ড্রাইভারের পাশে বসে আছেন ডক্টর বোস৷ আমাদের পাশে এসে গাড়িটা থামল৷ ডক্টর বোস প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় চললে তোমরা?’
পরেশ বললে, ‘আঙ্কেলের কাছে৷’
‘আঙ্কল! সে আবার কে?’
‘ডক্টর ল্যাং৷’
‘ও তোমাদের আঙ্কল হন বুঝি! ভালো-ভালো৷’ ডক্টর বোস অদ্ভুত শব্দ করে হাসলেন৷ হেসে বললেন, ‘চলো তোমাদের পৌঁছে দি৷ নাও পিছন দিকে উঠে পড়ো৷’
পিছনের আসনে বসে তাঁর ঘাড়টা আমরা দেখতে পাচ্ছি৷ ঘাড়ে তিন থাক চর্বি, তার ওপর এক থাবা কাঁচা পাকা চুল৷ কেমন যেন গুণ্ডা-গুণ্ডা দেখতে৷
হাসপাতালের সামনে অনেকের জমায়েত৷ সকলেরই পরনে কালো পোশাক৷ বিশপ এসেছেন৷ শ্যারনের বিছানার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর ল্যাং৷ বিষন্ন, করুণ মুখ৷ পাতলা চশমার তলায় ছলছলে দুটো চোখ৷ বুকের ওপর ঝুলছে সোনার ক্রশ৷ আমাদের দেখে বললেন, ‘শি ইজ ডেড! বাঁচানো গেল না৷ এই হত্যার জন্যে কে দায়ী! হেট দ্য সিন, নট দ্য সিনার৷ তা হলেও আমি অপরাধীকে ছাড়ব না৷’
আঙ্কলের কথা শেষ হল, ওয়ার্ডে ঢুকলেন ডক্টর শিলার৷ বিছানার পাশে নতজানু হয়ে বসে বুকে দুবার ক্রশ আঁকলেন৷ উঠে দাঁড়ালেন মাথা হেঁট করে৷ ডক্টর ল্যাঙের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এ কেস অফ সুইসাইড৷’
‘নো, এ কেস অফ মার্ডার৷’
‘মার্ডার, স্বপ্ন দেখছেন ডক্টর ল্যাং৷’ শ্যারন বরাবরই হোমসিক ছিল৷ এই পরিবেশে সে মানিয়ে চলতে পারল না৷ ‘ইউ নো ইট বেটার দ্যান মি৷’
ডক্টর শিলার ধীরে-ধীরে বেরিয়ে গেলেন৷ সারা ঘর নিস্তব্ধ৷ জুতোর শব্দ ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল৷
মাঝরাতে শ্যারনকে সমাধি দেওয়া হল একটা ছোট টিলার নিচে সমাধি ক্ষেত্রে৷ আকাশে মরা চাঁদ৷ ফিকে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে পাতলা কাপড়ের পরদার মতো৷ সমাধির গর্তে মাটি ফেলার শব্দ হচ্ছে ঝুপঝুপ করে৷
আঙ্কলের একটা হাত আমার কাঁধে, আর একটা হাত নবেন্দুর কাঁধে৷
‘চলো, তোমাদের পৌঁছে দি৷ আমার মনটা ভীষণ ভেঙে গেছে৷’
পরেশ হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘আঙ্কল, ভ্যাম্পায়ারদের কি এখন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?’
‘ভ্যাম্পায়ার?’ ডক্টর ল্যাং যেন একটু আশ্চর্য হলেন, ‘ভ্যাম্পায়ার এখানে আসবে কোথা থেকে? কে বলেছে তোমাদের এসব উদ্ভট কথা!’
‘ডক্টর বোস৷’
‘ও৷ হঠাৎ এইভাবে তোমাদের ভয় দেখাবার মানে?’
‘আঙ্কল, ওই গরাদ বসানো গুহাটায় তাহলে কী আছে!’
‘আরে দূর, ওটা হল পাগলা গারদ৷ এখানে কিছু পাগলও আছে৷ আমাদের পরীক্ষার কাজে লাগে৷ ‘কথা বলতে-বলতে আমরা গেস্ট হাউসে এসে পড়েছি৷ বাইরের বারান্দার আলোটা জ্বলছে৷ একটু ছিটকে এসেছে গোলাপ বাগানে৷
ডক্টর ল্যাং ধপাস করে একটা বেতের চেয়ারে বসে পড়লেন৷ বড় ক্লান্ত৷ বসে বললেন, ‘বাতিটা নিভিয়ে দাও, চারদিকে নেমে আসুক নরম অন্ধকার৷ আর কিছু পরেই ভোরের আলো ফুটবে৷’ পরেশ আলোর সুইচটা অফ করে দিল৷
ডক্টর ল্যাং হাঁটুর ওপর হাত রেখে বসে আছেন৷ আমরা বসতেই বললেন, ‘তোমাদের এমন একটা সময়ে এখানে নিয়ে এলুম যে সময়ে এখানকার পরিবেশটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে৷’
‘কেন এমন হল আঙ্কল?’
‘পাওয়ার পলিটিকস৷ ক্ষমতার লোভ৷ আর একটা জিনিস জানবে তোমরা, মানুষের উপকার করলেই মানুষ তার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়৷ এই যে ডক্টর শিলার, হি ইজ মাই এনিমি নাম্বার ওয়ান৷’
‘কেন আঙ্কল?’
‘ডক্টর শিলার এখন রিসার্চ ছেড়ে ষড়যন্ত্রের নায়ক হয়েছেন৷ এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের সর্বময় কর্তা হতে চাইছেন৷ অথচ এই শিলারকে আজ থেকে সাত বছর আগে আমিই এনেছিলুম ইতালি থেকে৷
ডক্টর শিলার
ডক্টর শিলারের বাবা ছিলেন হিটলারের নাজি বাহিনীতে৷ যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে তাঁর প্রাণদণ্ড হয়৷ তিনিও ছিলেন জীববিজ্ঞানী৷ হিটলারের নির্দেশে তিনি এমন একটা জিনিস নিয়ে গবেষণা করছিলেন যার প্রয়োগে মানুষ বিকলাঙ্গ হয়ে যায় কিংবা অমানুষ হয়ে যায়৷ শিলার পালিয়ে এলেন প্রথমে গ্রিসে, তারপর জাত লুকিয়ে ছিলেন ইতালিতে৷ ইতালিতেই আমার সঙ্গে পরিচয়৷ থাকতেন একটা বস্তিতে৷ দু-বেলা ভালো করে খাবার জোটে না৷ কোনও রোজগার নেই৷ এই ধরনের ছোট-ছোট বিষাক্ত সাপ নিয়ে সন্দেহজনক একটা ছোট কাফেতে এসে সন্ধে বেলা বসে থাকতেন৷ যে-কোনও মানুষের জিভে এইসব ছোট্ট সাপের ছোবলে এক ধরনের নেশা হয়৷ শিলার এই ভাবেই পুলিশের নজর এড়িয়ে সাপের নেশার কারবার করে সামান্য টাকা রোজগার করতেন৷ অথচ পণ্ডিত মানুষ৷ সেই শিলারকে সুস্থজীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এলুম৷ ভাবলুম, মানবকল্যাণে তার পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগাব৷ কিন্তু যার বংশের ধারাতেই পাপ, সে পাপ ছাড়া থাকে কী করে৷ জানো নবেন্দু, এই বংশের ধারা নিয়েই আমার গবেষণা৷ মানুষ কেন লম্বা হয়, বেঁটে হয়, ফরসা হয়, কালো হয়, চোখের মণি কেন বেড়ালের মতো হয়, চুল কেন বাদামি হয়, কুঁচকে যায়, কেন শয়তান হয়, পাগল হয়, সাধু হয়৷’
হঠাৎ একটা কাশির শব্দ কানে এল৷ বারান্দার শেষ কোণে একটা বেতের চেয়ার, এতক্ষণ তো ওই চেয়ারে কেউ ছিলেন না৷ কে যেন বসে আছেন, সাদা মতো৷ বুক পর্যন্ত ঝুলে থাকা লম্বা-লম্বা সাদা দাড়ি৷ এক মাথা সাদা চুল৷ আলোটা জ্বালতে উঠলুম৷ ডাক্তার বারণ করলেন, ‘নো লাইট মাই বয়েজ৷’
ডক্টর ল্যাং উঠে দাঁড়ালেন৷ এগিয়ে গেলেন চেয়ারটার দিকে৷ হাঁটু মুড়ে বসলেন বৃদ্ধের পায়ের কাছে৷ বৃদ্ধ তাঁর হাত রাখলেন আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডাক্তারের মাথায়৷ অনেকক্ষণ কথা হল দুজনে৷ শেষরাতের মরা চাঁদ নেমে এসেছে পশ্চিমের পাহাড়ের মাথার ওপর৷ অনেক তারাই আকাশ থেকে অদৃশ্য৷ একটি মাত্র সাহসী তারা এখনও তরল অন্ধকারের গায়ে লেগে আছে৷
কানে এল বৃদ্ধ বলছেন, ‘আই মাস্ট গো নাও৷ দ্য ডে ইজ ব্রেকিং আউট৷’
ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন৷ বৃদ্ধ ধীর পায়ে বারান্দা থেকে নেমে পড়লেন৷ হাঁটছেন৷ ধীরে-ধীরে সমাধি ক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ কেমন ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেলেন৷ ডাক্তার সেই দিকে তাকিয়ে বুকে ক্রশ চিহ্ণ আঁকলেন৷
‘আঙ্কল উনি কে? কেন এসেছিলেন! কী বলে গেলেন!’
নবেন্দুর প্রশ্নে ডাক্তার চেয়ার টেনে আবার বসলেন৷ হাত দুটো হাঁটুর ওপর মোড়া৷
‘নবেন্দু তোমরা বিশ্বাস করবে? উনি কোনও জীবিত মানুষ নন৷ মৃত৷ আজ থেকে সাতবছর আগে উনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন৷ আমি আজকে যা হয়েছি তা হতে পেরেছি ওনার চেষ্টায়, শিক্ষায়, দীক্ষায়৷ আমার গুরু৷ একটু আগে আমি মনে-মনে ওঁকেই স্মরণ করছিলুম৷ ডক্টর ডেভিস, আমার জীবনের সব৷’
পরেশ চেয়ার উলটে আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ছিল৷ শরীর কাঁপছে, ‘ভূ, ভূ, ভূত৷’
ডাক্তার একটু অসন্তুষ্ট হলেন, ‘ভূত শব্দটা বড় নিকৃষ্ট শব্দ৷ ডোন্ট ইউজ ইট! সে স্পিরিট৷ তুমি জেনে রাখো পরেশ, মৃত্যুতেই আমরা শেষ হয়ে যাই না, যেতে পারি না৷ মানুষকে অত সহজ করে নিও না৷ সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে জীবনের রহস্য জানা যায় না৷ আমরা কী, আমরা নিজেরাই তা জানি না৷ পৃথিবীর যে দিকেই তাকাবে সেদিকেই দেখবে বিশাল একটা ইচ্ছার রূপ৷ লেট দেয়ার বি লাইট অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ লাইট৷ সেই বিশাল ইচ্ছাশক্তির সামান্য অংশও যদি আমরা পেয়ে যাই, আমরা সব করতে পারি৷ আমার ইচ্ছেতেই কোন সুদূর থেকে উনি এসেছেন৷ মানুষ ইচ্ছে করেছে তাই আকাশে উড়েছে৷ চাঁদে গেছে, গ্রহান্তরে গেছে, নদীকে বেঁধেছে, পর্বতকে নামিয়ে এনেছে৷’
নবেন্দু জিগ্যেস করলে, ‘ডক্টর ডেভিস কী বলে গেলেন আঙ্কল!’
‘ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের কথা! আজ থেকে ঠিক সাতদিন পরে বৃষ্টি নামবে এই পাহাড়তলিতে! ঠিক তার তিন দিন পরে ডক্টর শিলার সর্পবাহিনী নিয়ে আমাদের আক্রমণ করবেন৷ তছনছ করে দেবেন এই গবেষণাকেন্দ্র৷ আমার বড় বিপদের দিনে তোমরা এসে পড়লে৷ তোমরা বরং আজই চলে যাও নবেন্দু৷ এখানে আর থেকে কাজ নেই৷’
‘তা হয় না আঙ্কল৷ আপনাকে বিপদে ফেলে চলে যাব! আপনার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করব৷ আপনি কিছু ভেবেছেন কি, কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়!’
‘হ্যাঁ, ডক্টর ডেভিস বলে গেলেন৷’
‘কী বলে গেলেন?’
‘তোমরা আমার সোলার ওভেন দেখেছ?’
‘দূর থেকে৷’
‘ওই ওভেনে সাতদিন ধরে শুধু কাচ তৈরি হবে৷ এখানকার পথঘাট সব কাচ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে৷ মসৃণ কাচ৷ জানো তো সাপ মসৃণ জায়গায় চলাফেরা করতে পারে না৷ এক জায়গায় পড়ে-পড়ে নড়বে, কিলবিল করবে কিন্তু একচুল এগোতে পারবে না৷ এই ভাবেই ব্যর্থ করে দিতে হবে শিলারের হানা৷’
‘তার আগেই আমরা যদি হামলা চালাই! পাতালপুরী আক্রমণ করি!’
‘না, শত্রুকেই আগে এগিয়ে আসতে দাও৷ আক্রান্ত হয়ে আত্মরক্ষা করব৷ সেইটাই হবে আমাদের ধর্ম৷’
ডক্টর ল্যাং উঠে দাঁড়ালেন৷ সারারাত জেগে আছেন কিন্তু চেহারা দেখে কিছুই মনে হয় না, যেন তাজা ফুল৷ বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা একবার পায়চারি করে এলেন৷ লাল হয়ে উঠেছে পুবের আকাশ৷ বুকে হাত মুড়ে সেই দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন৷ শেষে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে তোমরা থাকছ?’
নবেন্দু উঠে দাঁড়িয়েছে৷ সে বললে, ‘নিশ্চয় থাকছি৷ শুধু থাকছি না, আপনাকে সাহায্যও করছি৷ অবশ্য আমাদের ক্ষমতা অনুযায়ী৷’
‘ভেরি গুড! আমি তাহলে এখন যাই৷ তোমাদের ঘরে আমার সঙ্গে যোগাযোগের টেলিফোন আছে, সেইটা ব্যবহার করবে৷’
‘আচ্ছা আঙ্কল৷’
‘সাতটায় ব্রেকফাস্ট৷ গেট রেডি৷ চান করে ফেলো, ভালো লাগবে৷’
ডক্টর ল্যাং এগিয়ে চলেছেন সোজা পুব দিকে৷ দীর্ঘ শরীর৷ লম্বা-লম্বা পা ফেলে ক্রমশ দূর থেকে দূরে চলে গেলেন৷
পরেশ
গভীর রাতে আমাদের সভা বসেছে ডক্টর ল্যাং-এর নিজের ঘরে! বেশ কিছু বিশ্বাসযোগ্য কর্মী চাই৷ ডক্টর শিলারের সঙ্গে কারা-কারা হাত মিলিয়ে বসে আছেন বোঝা যাচ্ছে না৷ কর্মী বাছাই করতে হবে৷ কিন্তু কীভাবে? একজন গুপ্তচর চাই৷ আমি আর নবেন্দু গুপ্তচর হতে রাজি আছি৷ বড় শক্ত কাজ৷ সকলের সঙ্গে ভালো মানুষের মতো মিশতে হবে৷ নজর রাখতে হবে৷ তাদের কথাবার্তা লুকিয়ে-লুকিয়ে শুনতে হবে৷ সে সময় কোথায়! ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘ঠিক বলেছ, অত সময় কোথায়!
‘আমাকে একটু নিষ্ঠুর হতে হবে৷ কিছু ফন্দি তৈরি করি৷’
‘কীভাবে করবেন? বন্দুক ধরে!’
‘না৷ ওষুধ খাইয়ে৷’
‘সে আবার কী?’
‘বিজ্ঞান, নবেন্দু, বিজ্ঞান৷ এমন কিছু ওষুধ আছে যা খেলে মানুষের স্মৃতি নষ্ট হবে সাময়িক ভাবে কিন্তু কাজ করার ক্ষমতা ঠিকই থাকবে৷ বাধ্য বালকের মতো যা করতে বলব তাই করবে৷’
‘আঙ্কল, তাহলে তাই করুন৷’
‘কাল সকালের লাঞ্চে চা এবং কফিতে ওই ওষুধ থাকবে৷’
‘আমরাও খাব?’
‘না, তোমরা কেন খাবে! তোমাদের জন্যে আলাদা ব্যবস্থা৷ সোনালি টিপট থেকে তোমরা কিছু খাবে না৷ তোমাদের জন্যে টেবিলে থাকবে ছোট্ট সাদা একটা পট৷ গুড নাইট৷ আজ তাহলে শুয়ে পড়ো৷ তোমরা যেতে পারবে তো! ভয় করবে না!’
‘না আঙ্কল৷’
‘বেশ, তাহলে আমাদের যাত্রা হল শুরু৷’
বাইরের আকাশে চাঁদ৷ ছায়া-ছায়া ধোঁয়া-ধোঁয়া আশেপাশে মাটিতে যেখানে কাচ বসানো সেখান থেকে নীল আলো ঠিকরোচ্ছে৷
এমন সুন্দর স্বপ্নময় জায়গা কী রকম অসুন্দর হতে চলেছে! দূরে পাহাড়ে কী যেন ডাকছে৷ নবেন্দু বললে, ‘ফেউ ডাকছে৷ বোধহয় বাঘ বেরিয়েছে রে!’
নবেন্দুর কথা শুনে পরেশ আমার হাত চেপে ধরল৷ আমাদের সঙ্গে এসে পরেশটা মহা বিপদে পড়েছে৷
কিছু দূরে পথের পাশের সাঁকোয় কে যেন বসে আছে৷ মানুষ না প্রেতাত্মা! এখানে এমন এক বিশ্বাস অবিশ্বাসের জগৎ তৈরি হয়ে আছে আমাদের সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে যেন! থেমে পড়লে চলবে না, সাহস করে এগিয়ে যেতেই হবে৷
একটা টিলায় বসে আছেন ডক্টর বোস৷ এত রাতে কী করছেন! ডক্টর বোস বললেন, ‘আরে এত রাতে তোমরা কোথা থেকে? চাঁদের আলোয় বেড়াতে বেরিয়েছ বুঝি!’
নবেন্দু বললে, ‘ঘুম আসছে না কিছুতেই!’
‘স্বাভাবিক, নতুন জায়গা তো! আমারই ঘুম আসছে না! এসো, একটু বসে যাও৷ এমন সুন্দর রাত! পাহাড়ে আবার ফেউ ডাকছে, তার মানে বড় মিঞা আজ শিকারে বেরিয়েছেন!’
ডক্টর বোসের পাশে একটু বসতেই হল৷ মুখে পাইপ৷ তামাকের গন্ধ, ফুলের গন্ধ, ইউক্যালিপটাস পাতার গন্ধ সব মিলিয়ে অদ্ভুত একটা গন্ধময় পরিবেশ৷
ডক্টর বোস ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে বললেন, ‘কাল পূর্ণিমা৷’
কথা বলতে গিয়ে পাইপটা মুখ থেকে খুলে মাটিতে পড়ে গেল৷ ডক্টর বোস নিচু হলেন পাইপটা কুড়োবার জন্যে৷ ডক্টর বোস যেই সোজা হলেন, পাশেই বসেছিল পরেশ, পিছন দিকে উলটে পড়ে গেল ঝপাত করে৷ পিছন দিকেই ঢালু জমি, আগাছা, জঙ্গল৷ আমরা দুজনেই উঠে দাঁড়িয়েছি, কী হল পরেশের! নবেন্দু ঢালু জমি বেয়ে নামতে গেল৷
ডক্টর বোস গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমরা এক পা-ও নড়বে না৷ বিপদ হবে৷ পরেশকে পাবে না৷ তোমাদের এই কারণেই বসতে বলেছিলুম৷ আচ্ছা গুড নাইট৷’
ডক্টর বোস উঠে দাঁড়ালেন! নবেন্দু বললে, ‘তার মানে৷’
‘তার মানে পরেশ এখন আমাদের হাতে!’
‘আমাদের হাতে মানে?’
‘আমাদের হাতে মানে, তোমাদের আঙ্কেলের হাতের বাইরে৷ ওই হাঁদা, বোকা ছেলেটা এখন আমাদের টোপ৷ ওই টোপকে বঁড়শিতে গেঁথে এখন বড় মাছটাকে ধরতে হবে৷ বুঝলে কিছু!’
ডক্টর বোস পাইপ টানতে-টানতে চলে গেলেন৷ আমরা দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছি৷
‘কী হবে নবেন্দু!’
‘তাই তো ভাবছি রে! মহা বিপদ হল বোকা ছেলেটাকে নিয়ে৷ আমাকে নিয়ে গেল না কেন?’
‘আমাকেও তো নিতে পারত৷’
ফেউয়ের ডাক যেন আরও কাছে এগিয়ে এসেছে৷ নবেন্দু বললে, ‘এখানে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই৷ চল, আঙ্কেলের কাছে ফিরে যাই৷’
একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল৷ দূর থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে৷ বোধহয় পরেশকে ওরা সর্পরাজত্বে ওই গাড়িতে করেই নিয়ে গেল৷ ডক্টর বোসকে ছেড়ে দেওয়াটা কি ঠিক হল!
‘নবেন্দু, ডক্টর বোসকে হঠাৎ পিছন দিক থেকে আক্রমণ করলে কেমন হতো! আমাদের তো অনেক স্কাউটের প্যাঁচ জানা ছিল৷’
‘আমার কাছে কয়েক গজ দড়ি থাকলে একবার দেখে নিতুম রে! এখন আর উপায় নেই৷’
ডক্টর ল্যাঙের ঘরে বাতিদানে বাতি জ্বলছে৷ টেবিলের ওপর নীল মলাটের একটা মোটা বই৷ মলাটে সোনালি অক্ষরে লেখা বাইবেল৷ তার ওপর একটা ছোট্ট ক্রশ৷
‘তোমরা ফিরে এলে৷’
‘পরেশকে ওরা হঠাৎ ধরে নিয়ে গেল!’
‘সে কী? কীভাবে? কারা ধরে নিয়ে গেল?’
‘ডক্টর বোসই আসল লোক৷ দলে আর কে-কে ছিলেন বোঝা গেল না৷’
নবেন্দু পুরো ঘটনাটা বলে গেল৷ ডক্টর ল্যাং সারা ঘরে পায়চারি করতে-করতে সব শুনলেন৷ শেষে স্থির হয়ে বসলেন চেয়ারে৷
‘পরেশকে কিভাবে উদ্ধার করা যাবে আঙ্কল?’
‘যেমন করেই হোক করতে হবে৷ বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে৷’
ঘরের কোণের টেলিফোনটা হঠাৎ ঝনঝন করে বেজে উঠল৷ টেলিফোনটার পাশেই একটা চৌকো বাক্স, সেই বাক্সটার একটা সুইচ টিপে ডক্টর ল্যাং রিসিভারটা কানে তুলে নিলেন, ‘হ্যালো, ডক্টর ল্যাং বলছি৷’ ওদিক থেকে যিনি কথা বলছেন তাঁর গলা আমরাও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি৷
‘শিলার বলছি৷ গুড আফটারনুন ডক্টর৷ ঘুম আসছে না কিছুতেই৷ ছেলেটা ভয়ে এত চিৎকার করছে৷ ভিতু কাঁহাকা৷ ওই যে শুনুন৷’
পরেশের ভীষণ ভয়ের চিৎকার কানে এল৷ আবার শিলারের গলা৷
কিছুই না, ওকে একটা জালের খাঁচায় রেখেছি৷ তার চারপাশে অজস্র সাপ কিলবিল করছে৷ ছেলেটা এমন করছে যেন জীবনে কখনও সাপ দেখেনি৷ ওই ছেলেটার ওপরেই আমার একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবার ইচ্ছে আছে৷ সম্প্রতি বোড়াসাপ থেকে আমি এক ধরনের বিষ আবিষ্কার করেছি৷ ভারি সুন্দর জিনিস৷ মানুষের রক্তে অল্প-অল্প করে মেশালে গায়ের চামড়া সাপের চামড়ার মতো হয়ে যায়৷ হাউ নাইস, হাউ নাইস৷ আজ রাতটা যাক, কাল থেকে শুরু করব৷ ওহে খোকা ঘুমোও-ঘুমোও, তুমি আমার মানুষ-গিনিপিগ৷’
পরেশের চিৎকার আর শিলারের হাসি একসঙ্গে ভেসে এল৷
ডক্টর ল্যাং জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি কী চাইছেন?’
‘আমি চাই কিংডম অফ গড৷ ভগবানের রাজত্বের অধীশ্বর হতে চাই৷’
‘হোয়াট ইজ দ্যাট?’ সেটা আবার কী!’
‘আমি পড়ে আছি পাতালে৷ উঠতে চাই মর্ত্যে৷ সেখান থেকে স্বর্গে৷’
‘উঠুন না, কে বাধা দিচ্ছে!’
‘ইউ ইউ, আপনি বাধা দিচ্ছেন৷’
‘আমি?’
‘ইয়েস৷ একই বনে দুটো বাঘ থাকতে পারে না৷ ইউ মাস্ট গো৷ আপনাকে যেতে হবে৷’
‘কোথায় যাব?’
‘জাহান্নামে৷ শ্যারন গেছে৷ পরেশও যাবে৷ একে-একে সবাই যাবে৷ আমি যে কলকাঠি নেড়েছি তাতে কে কখন যাবে আমি নিজেই জানি না৷’
‘আমি থাকলে অসুবিধেটা কী হচ্ছে? আমি আছি আমার গবেষণা নিয়ে, আপনারা আছেন আপনাদের নিয়ে৷ গোলমালটা কোথায়?’
‘গোলমাল ক্ষমতা নিয়ে৷ আপনি আমাদের মাথার ওপর বসে আছেন সব ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে৷ সেইটাই আমাদের সহ্য হচ্ছে না৷’
‘আমাদের মধ্যে কে-কে আছেন? বহুবচন ব্যবহার করছেন কেন?’
‘তার কারণ আমার দলে আপনি ছাড়া সবাই আছেন৷’
‘তাই নাকি? তাহলে আসুন আমরা সকলে বসে ঠিক করি কীভাবে কাজকর্ম চলবে, কে চালাবে?’
‘বসাবসির কী আছে! ঠিকই হয়ে গেছে আমিই হব সর্বেসর্বা৷’
‘বেশ তাই হবে৷ তার জন্যে শুধু-শুধু একটা নিরীহ ছেলেকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন?’
‘আমার রাজত্বে আপনাকে আসতে হবে৷ একটা চুক্তিপত্রে সই করতে হবে৷ তারপর মাথা নিচু করে এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে হবে৷’
‘বেশ তাই হবে৷ তা হলে পরেশকে ছেড়ে দিন৷’
‘পাগল না কি৷’ আগে দেখাসাক্ষাৎ হোক৷ লেখালেখি হোক৷ তারপর মুক্তি৷ কাল রাত বারোটা৷ কেমন! ততক্ষণ বোকা ছেলেটাকে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করি৷ গুড নাইট৷ কালই হবে লাস্ট সাপার৷’
কট করে একটা শব্দ হল৷ শিলার লাইন কেটে দিলেন৷ ডক্টর ল্যাং রিসিভারটা নামাতে-নামাতে বললেন, ‘ঈশ্বর এই অপরাধীকে ক্ষমা করুন৷’
নবেন্দু বললে, ‘স্কাউনড্রেল৷’
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘উত্তেজিত হবে না৷ বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে৷ একেই বলে দাবা খেলা৷ এক পাশে জীবন অন্য পাশে মৃত্যু৷ খুব সাবধানে খেলতে হবে এ খেলা৷’
আমি আর চুপ করে থাকতে পারলুম না, ‘আঙ্কল, আপনার নিজের এত ক্ষমতা এত শক্তি, আপনি কিছু করতে পারছেন না কেন?’
‘পারছি না গোটাকতক কারণে৷ প্রথম কারণ, পরেশ৷ পরেশ ওদের হাতে বন্দি৷ দ্বিতীয় কারণ, সৃষ্টি বড় শক্ত কাজ৷ ধ্বংস তার চেয়ে অনেক সহজ ব্যাপার৷ একটা জীবন সৃষ্টি করতে পারি না, সহজে মেরে ফেলি কী করে! ডক্টর শিলারের রাজত্ব তছনছ করে দিতে আমার কয়েক মিনিট সময় লাগবে৷’
নবেন্দু খুব চিন্তিত ভাবে বললে, ‘তাহলে কী হবে?’
‘কিচ্ছু ভেবো না তোমরা৷ আজকের রাতটা তোমরা আমার ঘরে কাটাও৷ আমি একবার সমাধি থেকে ঘুরে আসি৷’
‘আমরাও যাব৷’
‘কেন, ভয় করছে?’
‘না ভয় নয়৷ আপনাকে আর একলা ছাড়ব না৷’
‘বেশ চলো৷’
বাইরের ঝাপসা ভাবটা কেটে গিয়ে চাঁদের আলোর জোর বেশ যেন বেড়ে গেছে৷ মা এই রকম জ্যোৎস্না দেখলে বলেন, ফিনিক ফুটছে৷ মন ভালো থাকলে এমন চাঁদের আলোয় গান গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করে৷
‘তোমরা এইখানে একটু দাঁড়াও, আমি আসছি৷’
ডক্টর ল্যাং সারি-সারি ক্রশের মধ্যে দিয়ে পথ করে-করে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেলেন৷ কোথায় গেলেন, কেন গেলেন কিছুই বললেন না৷ সমাধি ক্ষেত্রটা নেহাত ছোট নয়৷ অনেক মৃত্যু হয়েছে এখানে বছরের পর বছর ধরে৷ কেন এত মৃত্যু!
‘নবেন্দু, এখানে মানুষ মরে বেশি, তাই না৷ কত ক্রশ দেখেছিস?’
‘আমার মনে হয় এটা অনেক পুরোনো কালের সমাধি৷ হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল থেকেই এই সমাধিতে মানুষকে কবর দেওয়া হচ্ছে৷ হয়তো সৈন্যবাহিনীর ছাউনি ছিল!’
‘হ্যাঁ, তা হতে পারে৷’
ডক্টর ল্যাংকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না৷ চোখের সামনে আকাশের গায়ে পাহাড়ের রেখা৷ বাতাস বইতে শুরু করেছে জোরে৷ হিসহিস শব্দ হচ্ছে৷ কী হবে, কী হতে চলেছে কে জানে! পাহাড়ের দিকে এক পাল কুকুর ডাকছে৷
দূর থেকে সাদা একটা মূর্তি এগিয়ে আসছে৷
নবেন্দু বললে, ‘ওই যে আঙ্কল আসছেন৷’
ঠিকই বলেছে৷ আঙ্কল আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন৷ মুখে প্রশান্ত হাসি৷ যেন স্বয়ং যিশু দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সামনে৷
‘পেয়ে গেছি নবেন্দু, পেয়ে গেছি দাবার শেষ চাল৷ আর ভাবনা নেই৷ চলো-চলো, রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে দি৷ কাল মধ্য রাতে হবে শেষ খেলা৷’
আমরা আবার ফিরে এলুম আঙ্কেলের ঘরে৷ ইলেকট্রিক কেটলিতে গরম জল চাপল৷
‘এক কাপ করে কফি খাওয়া যাক, কী বলো! এমন রাতে কফি না খেলে হয়!’
দেওয়ালের গা থেকে চাপা আলো ঠিকরোচ্ছে৷ কেমন যেন একটা স্বপ্নের জগৎ৷ কফি খাওয়া হল৷
‘নাও তোমরা এবার একটু শুয়ে পড়ো৷ আমি বসে-বসে তোমাদের বেহালা বাজিয়ে শোনাই৷’
সুরে ঘর ভরে গেল৷ মনে হল কে যেন দূর থেকে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ কখনও মনে হল পাতার মধ্যে দিয়ে বাতাস বইছে৷
কখন ঘুমিয়ে পড়লুম এক সময়ে, আমার মনে নেই, নবেন্দুরও মনে পড়ে না৷
শেষ ভোজ
ঠিক কাঁটায়-কাঁটায় রাত বারোটা৷ পাতালপুরীতে নামার সেই দরজা দিয়ে কিছু আগেই আমাদের গাড়ি নেমে এসেছে৷ নবেন্দু সামনে বসেছিল৷ আমি বসেছিলুম পিছনে৷ আমার পাশে ছোট একটা বাক্স আর আঙ্কলের বেহালা৷ ডক্টর ল্যাং গাঢ় নীল রঙের সুট পরেছেন৷ চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা৷
গোল একটা ঘরে আমরা বসেছি৷ লম্বা টেবিল সাদা কাপড়ে ঢাকা৷ চাপা আলো চারপাশ থেকে একটা আভার মতো বেরিয়ে আসছে৷ শিলার পরেছেন ম্যাজিসিয়ানদের মতো কালো গাউন৷ বুকের ওপর গলা থেকে ঝুলছে চেন দিয়ে বাঁধা দাঁতের মতো সাদা একটা কী জিনিস৷ ডক্টর বোস বসে-বসে পাইপ টানছেন৷ আর যাঁরা রয়েছেন তাঁদের আমরা আগে দেখিনি৷
শিলার টেবিলের মাথার দিকে দাঁড়িয়ে আছেন৷ শয়তানের ছবি দেখিনি৷ মনে হয় এইরকমই দেখতে ছিল৷ শিলার বললেন, ‘ঠিক বারোটা৷ দিন বদলে গেল, তারিখ বদলাল৷ এইবার বদলে যাবে আমাদের দুজনের ভাগ্য৷’
শিলার হাত বাড়িয়ে একটা সুইচ টিপলেন৷ কিছু দূরে একটা কাচের পরদায় ঝিরঝির করে আলো কেঁপে উঠল৷ ভেসে উঠল পরেশ৷ পরেশ একটা চেয়ারে বসে আছে৷ দু-হাত দূরে তারের জালের গায়ে অসংখ্য সাপ কিলবিল করছে৷
আমি চিৎকার করে বললুম, ‘আমাদের পরেশ৷’
শিলার বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের পরেশ৷ এইবার আমার তৈরি কয়েকটা জিনিস দেখাই৷ মানুষের রূপান্তর৷’ দৃশ্য পালটে গেল৷ পরদায় মধ্যবয়সি একটি মানুষের মুখ৷ সারা মুখে লাল অসংখ্য ফুসকুড়ি৷ দেখলেই গাটা কেমন করে ওঠে৷
‘এক নম্বর মানুষ৷ এর নাম রেখেছি মিঃ ওয়ার্ট৷ এক ধরনের সাপের বিষ ধীরে-ধীরে শরীরে প্রবেশ করিয়ে আমি এই মানুষটির চামড়ায় রূপান্তর এনেছি৷’
পরদায় ভেসে উঠল দ্বিতীয় আর একটি মুখ৷ সারা মুখে চাপড়া-চাপড়া লাল দাগ৷ নাকটা থেবড়ে গেছে৷ চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে৷
‘দু-নম্বর মানুষ৷ নাম রেখেছি, মিঃ লেপার৷ এক ধরনের কুষ্ঠ৷ ওই সাপের বিষেরই কেরামতি৷’ ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘এই সব বীভৎস পরীক্ষা আমাদের দেখাবার মানেটা কী! আমি তো প্রস্তুত হয়েই এসেছি৷ পরেশকে এনে দিন, আমরা পাহাড়তলি ছেড়ে চলেই যাই৷’
শিলার হাসতে-হাসতে বললেন, ‘মাত্র দুটো দেখেই ভয় পেয়ে গেলেন, এখনও তো অনেক আছে৷ যেমন ধরুন, আমার পায়ের কাছে একটা বোতাম আছে, সেটাতে চাপ দিলেই আপনারা যে দিকটায় তিনজনে বসে আছেন সেই মেঝেটা চেয়ার সমেত সাঁ করে পিছনের দেওয়ালে ঢুকে যাবে, আর সেখানে আছে, এই দেখুন৷’
পরদায় ভেসে উঠল একফালি ঘর, মেঝেতে থিকথিক করছে ছোট-ছোট মিশকালো সাপ৷
‘এরা তাজা মানুষকে চুমু খেতে বড় ভালোবাসে৷’
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘তাই নাকি?’
‘তাছাড়া যে চেয়ারে বসে আছেন, সেই চেয়ারের তলায় আছে একটা করে চৌকো বাক্স৷ তার মধ্যে আছে একটা করে কেউটে সাপ৷ এমন কায়দা করা আছে বাক্সটা বের করে না নিলে চেয়ার ছেড়ে ওঠা যাবে না, উঠতে গেলেই ফোঁস করে কামড়ে দেবে পিছনে৷ ভীষণ বিষাক্ত৷ মাসখানেকের জমা বিষ রয়েছে দাঁতে৷’
ডক্টর ল্যাং মনে হল ভীষণ ভয় পেয়েছেন৷ আমি তো ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি নবেন্দুর মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারলুম না৷ আসলে ভয়ে আমার মাথাটাই যেন কেমন হয়ে গেছে৷ বেশ বুঝতে পারছি, মৃত্যু সুনিশ্চিত৷ এখান থেকে বেঁচে বেরোতে পারব বলে মনে হয় না৷ মায়ের জন্যে মনটা কেমন যেন ছটফট করে উঠল৷ মন ছটফট করলেও শরীরটাকে স্থির রাখতে হবে, তা না হলেই ফোঁস করে পাছায় কামড়ে দেবে৷
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘তা হলে পরীক্ষা করে দেখতে হয় আপনার বিষ কেমন৷ যে কোনও বিজ্ঞানীর কাজই হল বিশ্বাস করার আগে পরীক্ষা করে দেখা৷ এক্সপেরিমেন্ট, অবজারভেশন, ইনফারেনস৷ ভয় পেলে তো চলবে না৷’
শেষ কথাটা বলেই ডক্টর ল্যাং ঝড়াস করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ আমি ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেলেছি৷ চোখ বুজিয়ে-বুজিয়েই ফোঁসের বদলে হাসির শব্দ শুনছি৷ তীক্ষ্ণ, ধারালো হাসি৷ ডক্টর ল্যাং হাসছেন আর বলছেন, ‘ডক্টর শিলার, হয় আপনার সাপ ঘুমিয়ে পড়েছে, কিংবা আপনার হিসেবের ভুলে চেয়ার বদলে গেছে, অথবা আপনার আদেশ অমান্য করছে৷ মনে হয় শেষটা ঠিক৷’
ডক্টর শিলারের মুখে চোখে বিব্রত ভাব৷
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘তোমরাও উঠে দাঁড়াও৷’
উঠে দাঁড়াতে পারলেই তো আমরা বেঁচে যাই৷ আমরা দুজনেই কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়ালুম৷ কিছুই হল না৷
ডক্টর ল্যাং হেসে উঠলেন, ‘ডক্টর শিলার, এইবার আপনাকে আর একটা সংবাদ দি৷ আপনার আর একটি ব্যর্থতা৷ পরেশ এই মুহূর্তে বাইরে আমার গাড়িতে বসে আছে৷ আপনার খাঁচা এখন শূন্য৷’
‘মিথ্যে কথা৷ হতেই পারে না৷’
‘বেশ তো আপনার টিভি চালু করুন৷’
ডক্টর শিলার সুইচ টিপলেন৷ পরদায় ভেসে উঠল শূন্য খাঁচা৷ খাঁচার গায়ে আর সাপ কিলবিল করছে না৷ ডক্টর শিলার হতভম্ব হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো বললেন, ‘নো নো, দ্যাট কান্ট বি৷ হতেই পারে না৷’
‘হয়-হয়, অনেক কিছুই হতে পারে৷ যেমন এই মুহূর্তে আপনার পেছন দিকের দেয়ালটা খুলে পড়ছে আর...৷
ডক্টর শিলার পেছন দিকে তাকাতেই একটা চোখ ঝলসানো আলো সারা ঘরে খেলে গেল৷ যেন বাজ পড়ল৷ দেওয়ালে একটা বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে৷ প্রথমেই সেই গর্ত দিয়ে গলে এল ভাল্লুক আলি৷ সে এসেই দু-হাতে শিলারকে জাপটে ধরল৷ তার পিছনেই এল বিশাল লম্বা জেমস৷ দেখতে-দেখতে ঘর ভরে গেল ডক্টর ল্যাঙের অনুচর বাহিনীতে৷
শিলার চিৎকার করে বললেন, ‘ডক্টর বোস, আমাদের সমস্ত সাপ ঘরে ছেড়ে দিন৷ ওয়াটসন, ওয়াটসন!’ ডক্টর বোস বসে-বসে যেমন পাইপ টানছিলেন সেই রকমই পাইপ টানতে লাগলেন৷ মৃদু-মৃদু হাসছেন৷ ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘আপনার সব সাপ মরে গেছে ডক্টর শিলার৷ চব্বিশ ঘণ্টা সময় একজন মানুষের আত্মরক্ষার প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময়৷’
মোটা মানুষ বিজয়ার দিন যেভাবে কোলাকুলি করে সেই ভাবে আলি ডক্টর শিলারকে তখনও জাপটে ধরে আছে৷ শিলার রাগে গরগর করতে-করতে বলছেন, ‘ন্যাস্টি বেয়ার, ইউ স্মেল গার্লিক৷ আমি পকেটে হাত ঢোকাতে পারছি না তাই, তা না হলে তোর ফুসফুস এখনই আমি ছেঁদা করে দিতে পারতুম৷’
ডক্টর ল্যাং আদেশের সুরে বললেন, ‘মিস্টার জেমস, গিভ হিম এ শট৷’
জেমসের হাতে সেই ইঞ্জেকশান লাগাবার জেটগান৷ ছ্যাঁক করে একটা শব্দ হল৷ ডক্টর শিলার যেন একটু কেঁপে উঠলেন৷
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘এখন আপনার প্রয়োজন প্রচণ্ড ঘুম, সম্পূর্ণ বিশ্রাম এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো মেলামেশা৷ আর সাপ নয়, সাপের বিষ নয়৷ এবার পাখি আর ফুল৷ ওয়াটসন, ওয়াটসন৷’
‘ইয়েস স্যার৷’
ধবধবে সাদা পোশাকে ঘরে এলেন ওয়াটসন! চোখে গোল্ড ফ্রেমের চশমা৷
‘ডক্টর ওয়াটসন, চলুন তা হলে, এঁকে অ্যাসাইলামে রেখে আসি৷ দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন, তা না হলে ডক্টর শিলার একজন উন্মাদ খুনি হয়ে যাবেন৷’
ডক্টর বোস উঠে দাঁড়ালেন৷ তখনও তাঁর মুখে পাইপ৷ ডক্টর ল্যাং টেবিলের ওপাশ থেকে হঠাৎ তাঁর ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিলেন৷ ডক্টর বোস দু-হাত দিয়ে সেই হাতটা চেপে ধরে জোরে-জোরে ঝাঁকাতে লাগলেন৷
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ৷ এই প্রতিষ্ঠান আপনার কাছে কৃতজ্ঞ৷ চলুন, লেট আস গো আপ৷’
গোল গর্তটার মধ্যে দিয়ে আমরা একে-একে বেরিয়ে এলুম৷ কিছু দূর এগোতেই মনে হল বাইরের ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছে৷ আরে, ওই তো মাথার ওপর তারায় ভরা আকাশ৷ আমরা একে-একে উঠে এলুম সেই সমাধি ভূমিতে৷ সব শেষে বেরিয়ে এলেন ডক্টর বোস আর ডক্টর ল্যাং৷ মাটির ওপর একটা ক্রশ শুয়ে ছিল৷ ডক্টর ল্যাং দু-হাত দিয়ে সেটাকে সোজা করে দিতেই গর্তের মুখটা বন্ধ হয়ে গেল৷ একটা গাড়ি আসছে৷ ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি৷ গাড়িটা থামল৷ একটু পরেই দেখি কে যেন ছুটতে-ছুটতে আসছে৷ আমরা সকলেই চিৎকার করে উঠলুম, পরেশ, পরেশ!’
ডক্টর ল্যাং বললেন, ‘আমাদের হিরো৷’ দু-হাতে পরেশকে বুকে চেপে ধরলেন৷
কি হলো
ডক্টর শিলারের অবসন্ন দেহটাকে ওঁরা ধরাধরি করে সেই গুহাটায় নিয়ে গেলেন, যে গুহায় ডক্টর বোস বলেছিলেন ভ্যাম্পায়ার আছে৷ ব্যাপারটা তাহলে কী হল৷ ডক্টর বোস সম্পর্কে আমাদের ধারণা তাহলে পালটাতে হচ্ছে৷
‘নবেন্দু, সব কেমন যেন গুলিয়ে গেল!’
চার্চের সামনে বেশ বড় একটা জমায়েত৷ চাঁদের আলো৷ চার্চের ছায়া৷ নীল আকাশের দিকে চূড়োটা উঠে গেছে৷
‘ঠিক বলেছিস অপূর্ব, সবই যেন কেমন গুলিয়ে গেল৷ কীভাবে কী হল! ডক্টর বোসকে আমরা সন্দেহ করেছিলুম৷ ডক্টর ল্যাং কি তাহলে আমাদের সঙ্গে অভিনয় করলেন?’
‘সেই রকমই তো মনে হচ্ছে৷’
চার্চে ঢোকার সিঁড়ির উঁচু ধাপের আলোছায়ায় ডক্টর ল্যাং দাঁড়িয়েছেন, যেন সভা হচ্ছে৷ ডক্টর ল্যাং সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ফ্রেন্ডস, আমি আজ আপনাদের ছেড়ে বিদায় নিচ্ছি৷ বিদায় নিচ্ছি চিরকালের জন্যে৷ ফর এভার, ফর এভার৷’
সকলে সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘সে কী? সে কী?’
‘হ্যাঁ, আমার যাবার সময় হয়েছে৷ আপনারা আমাকে নানা ভাবে সাহায্য করেছেন এতকাল৷ আমি কৃতজ্ঞ৷ এক সময়ে আমাকে সকলেই ভালোবাসতেন৷ এখন কারুর-কারুর মনে আমার সম্পর্কে ঘৃণা জন্মেছে, সন্দেহ জেগেছে আমার ক্ষমতা সম্পর্কে৷ আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছে বিজ্ঞান বড়, না মানুষ বড়! প্রশ্ন জেগেছে সমস্যা আর তার সমাধান বড়, না ক্ষমতার লড়াই বড়৷ সাধনা বড়, না ব্যক্তিগত ক্ষমতা বড়৷ উত্তর আমি আজ পেয়েছি৷ মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠান কখনও নির্দোষ হতে পারে না, মানুষ কখনও ভগবান হতে পারবে না৷ একদিন শয়তান এসে মানুষকে স্বর্গোদ্যান থেকে তাড়িয়েছিল, ওইটাই মানুষের নিয়তি৷ ফেট৷ আমাকে শেষ মুহূর্তে ডক্টর বোস একসঙ্গে বহু প্রাণ বাঁচাবার কাজে সাহায্য করেছেন৷ অবশ্য নিঃস্বার্থভাবে নয়৷ তাঁর সঙ্গে আমার চুক্তিই হয়েছিল বিনা রক্তপাতে এই গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে এবং সব ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে৷ ভদ্রলোকের চুক্তি৷ একটা কারণে আমি সুখী, ডক্টর শিলারের কতৃত্বে আপনাদের থাকতে হচ্ছে না! তিনি মানসিক বিকলতায় ভুগছেন৷ কেন ভুগছেন তাও আমি জানি৷ বংশের ধারা৷ এক পুরুষ থেকে আর এক পুরুষে কিছু বিকলতার ধারা এই ভাবেই প্রবাহিত হয়৷ ডক্টর বোসের কাছে আমার শেষ অনুরোধ, কিছু শিক্ষিত, স্বেচ্ছাচারী লোক বিজ্ঞানের নামে জীব-জগতের ওপর ভীষণ অত্যাচার চালাবার ছাড়পত্র নিয়ে বসে আছেন, সেই অত্যাচারের কিছু নির্দোষ শিকার আমার অজান্তেই এখানে বন্দি হয়ে আছেন৷ তাদের তিনি শুধু মুক্তিই দেবেন না, তাদের সুস্থতাও ফিরিয়ে দেবেন৷ আমি জানি মৃত্যু যত সহজে আনা যায় জীবন তত সহজে আনা যায় না৷ সেই জীবনকে প্রয়োজন হলে জীবন দিয়েও বাঁচাতে হবে৷ আপনারা সুন্দরের সাধনা করুন৷ বিদায়৷’
সামনের সহজ পথ
ডক্টর ল্যাং গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে বসে আছেন৷ সামনে সোজা পথ চাঁদের আলোয় খুলছে, ক্রমশ খুলছে৷ সঙ্গে সেই বাকস আর বেহালা৷ সামনে নবেন্দু, পেছনে আমি আর পরেশ৷ নবেন্দু হঠাৎ বললে, ‘আপনি হেরে গেলেন আঙ্কল!’
‘হেরে? কই, না তো৷ আমাদেরই তো জিত হল৷’
‘আমরাই জয়ী৷’
‘কেন? হ্যাঁ জয়ী, তবে অন্যভাবে৷ আমাকে তোমরা বাঁচিয়েছ৷ তা না হলে ওরা ষড়যন্ত্র করে শ্যারনের মতো আমাকেও একদিন হত্যা করত৷’
‘হত্যা!’
‘হ্যাঁ, হত্যা৷ ক্ষমতার লোভে, অর্থের লোভে সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন কত মানুষ জীবন দিচ্ছে জানো কি?’
‘আপনার গবেষণার কী হবে?’
‘আমার রিসার্চ শেষ হয়ে গেছে নবেন্দু৷ আমি সত্য আবিষ্কার করে ফেলেছি, মানুষ মানুষই থাকবে৷ পৃথিবী যেভাবে চলছে ঠিক সেই ভাবেই চলবে৷ পরিপূর্ণ সুন্দর মানুষ আসবে, বিকৃত, বিকলাঙ্গ আসবে, দেবতা আসবে, শয়তানও আসবে৷ এ খেলা চলতেই থাকবে আবহমান কাল ধরে৷’
‘আঙ্কল, আপনি এখন কোথায় যাবেন?’
‘প্রথমে কলকাতায় তোমাদের নামিয়ে দোব৷ কোনও একটা হোটেলে রাত কাটিয়ে প্লেন ধরে চলে যাব সিসিলি৷ সেখানে অনেক-অনেক দিন ধরে একজন মা তাঁর ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছেন৷’
গাড়ির গতি ক্রমশ বাড়ছে৷ পথ কখনও বেঁকেছে, কখনও সোজা৷ দুপাশে বন৷ মাঝে-মাঝে পাহাড়৷ মাঝে-মাঝে গ্রাম৷
আজও মনে পড়ে আমাদের সেই অভিযানের কথা৷ আজও চোখের সামনে ভাসছে, আঙ্কল ল্যাং, ডক্টর ল্যাঙের মুখ৷ সেই মুখ৷ সেই পাহাড়ি পথে, চাঁদের আলোছায়া আর তাঁর সেই শেষ কথা ঃ
‘তোমরা হলে ঈশ্বরের প্রিয়পুত্র৷ তাঁর মতোই হবার চেষ্টা করো৷ অনুশীলন ছাড়া কিছুই হয় না, হবার নয়৷ প্রেম দিয়ে জীবনকে বাঁধবার চেষ্টা করো৷ যিশু আমাদের ভালোবেসে জীবন দিয়েছিলেন৷ আমরা সবাই একদিন ঝরে যাব, তাহলে সুগন্ধী ফুলের মতো পূজার অর্ঘ্য হয়েই ঈশ্বরের পদতলে ঝরে পড়ি না কেন!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন