টম আর দুলী

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কুকুরটা আমাদের বাড়িতে একদিন এসেছিল৷ হঠাৎ রাস্তা থেকে চলে এসেছিল গেটের ফাঁক দিয়ে৷ তখন সে ছোট ছিল৷ খুবই ছোট৷ তা না হলে ফাঁক দিয়ে গলবে কী করে! সাদা ধবধবে গায়ের রং৷ মুখটা ভোঁতা মতো৷ কান দুটো ঝোলা-ঝোলা৷ ঢুকে কোনও শব্দ করেনি, কেঁউ-কেঁউ করেনি৷ পাঁচিলের পাশে গুটিসুটি মেরে চুপ করে বসেছিল৷ চোখে মুখে ভয়-ভয় ভাব৷ কুকুরটাকে দেখে মা তাড়াতে চেয়েছিলেন৷ তেড়েও গিয়েছিলেন৷ কে যেন বললে, ‘আহা! ওর মা-টা কাল মাঝরাতে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে! এক্ষুনি একটা ইয়া বড় কেলেমতো কুকুর তেড়ে আসতেই ভয়ে তোমাদের বাগানে ঢুকে পড়েছে৷’

মা-মরা কুকুর দেখে আমার মায়ের মন নরম হল৷ ভালো করে দেখলেন জিনিসটাকে৷ ‘বেশ দেখতে রে! তবে বড় হলে ওই হুমদো নেড়িই হবে৷

মনুদি আমাদের বাড়ি কাজ করে৷ বাগানের রাস্তা ঝাঁট দিচ্ছিল৷ সে তো অনেক কিছু জানে৷ সেই বললে, ‘না গো দিদি, ওর, মা-টাকে খুব ভালো দেখতে ছিল গো৷ বেলেতি কুকুরের মতো৷’

মা বললেন, ‘এসেছে, থাকে থাক৷ কিন্তু টম যদি দেখতে পায়? সেটা তো একটা মহা গুন্ডা? সে তো সহ্য করবে না৷ হিংসেতে জ্বলে মরবে৷’

মনুদি সেই বোকা-বোকা কুকুর ছানাটাকে তখন বোঝাতে লাগল, ‘এসেছিস, থাক৷ তবে ভুলেও ভেতরের উঠোনে যাবি না৷ ওখানে টম আছে৷ টমের জমিদারির বাইরে থাকবি৷’

চোখ পিট-পিট করে, পুটুক-পুটুক করে ল্যাজ নেড়ে-নেড়ে সব কথা শুনল৷ মনে হয় বুঝতে পেরেছে, সে গরিবের ছেলে৷ গরিবের ছেলের মতোই বাগানে, বড়জোর সদরের সিঁড়ির ধাপে তাকে থাকতে হবে৷ খেতে পায় ভালো, না পায় নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে৷

কুকুরটা সেই থেকেই রয়ে গেল৷ মায়ের কেমন মায়া পড়ে গেল৷ টম একদিন কেবল বকাঝকা করেছিল৷ পরে বুঝেছিল দিশি কুকুর তার মতো খাস বিলিতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না৷ ওটাকে নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনও দরকারই নেই৷

রোজ মাংস দিয়ে টমের ভাত রান্না হয়৷ বেলা একটার সময় চানটান করে বাবু হয়ে খেতে বসে৷ তখন তার কী মেজাজ! কাছে গেলে গড়ড়-গড়ড় শব্দ করে৷ তখন পৃথিবীর কাউকে সে চেনে না৷ কোনও-কোনও দিন খিদে কম থাকলে দুটি ভাত পড়ে থাকে৷ মাংস থাকে না৷ টম আমাদের চেয়ে চালাক৷ ভাত ফেলে রাখলেও বেছে-বেছে সব মাংস খেয়ে ফেলে৷ সেই মহাপ্রসাদ পায় ওই কুকুরটা৷ তিন চারদিনের মধ্যে তার একটা নামও রাখা হয়েছে৷ নামটা তেমন ভালো নয়৷ দুলী৷ দুলীর খাওয়া-দাওয়ার তেমন ঠিক-ঠিকানা থাকে না৷ যে যখন পারে এই নে দুলী বলে মুখ থেকে বের করে দেয়৷ দুলীর রাতের খাওয়াটা মোটামুটি ঠিক থাকে৷ খানকতক শুকনো রুটি৷ টম তখন চকর-চকর করে এক বাটি দুধ খায়, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে৷

টম ঘুমোয় খাটে৷ নরম-গরম বিছানায়৷ দুলী শুয়ে থাকে বাড়িতে ঢোকার দরজার বাইরে সিঁড়ির ধাপে, পাপোসের ওপরে৷ শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই, বর্ষা নেই দুলী দরজার বাইরে শুয়ে, এঁটোকাঁটা খেয়ে বড় হয়ে উঠল৷

দুলীর ওপর মায়া পড়ে গেল৷ কেমন যেন ভয়ে-ভয়ে থাকে৷ করুণ চোখে তাকায়৷ খিদে পেলে ন্যাজ নাড়ে, বসে-বসে দুলতে থাকে দুপাশে৷ ডাকে না৷ লাফিয়ে উঠে আমাদের আদুরে টমের মতো হাত থেকে খাওয়ার কেড়ে নিতে চায় না৷ সদর সিঁড়ির ধাপে শোয় বটে, কেউ এলে কি গেলে সসম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে একপাশে সরে যায়৷ ‘কী-রে দুলী’ বলে ডাকলে অবাক হয়ে তাকায়৷

মা মাঝে-মাঝে বলেন, ‘আমাদের বাঁদর টমের চেয়ে দুলী শতগুণে ভালো৷ কোনও বায়নাক্কা নেই৷ শুকনো ভাত, ডাল ভাত যাই দাও না কেন, লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নেয়৷ মোটা-মোটা শুকনো রুটি তাই ওর কাছে অমৃত৷ আর আমাদের টম, যেন নবাব৷ একবাটি মাংস না হলে বাবু মুখ ভার করে বসে থাকবেন৷ খাবার ছোঁবেনই না৷ বেষ্পতিবার বেষ্পতিবার ওকে খাওয়াতে আমার জীবন বেরিয়ে যায়৷

টমের সঙ্গে মা আমার নাম, স্বভাব সবই জুড়ে দেবেন৷ আমরা দুজনে নাকি টাকার এপিঠ আর ওপিঠ৷ একজন মানুষের ভাষায় কথা বলে আর একজন কুকুরের ভাষায়—এই যা তফাত৷

টম যখন খেতে চায় না, খাওয়ার ফেলে রেখে দুষ্টুমি করতে ছোটে, কাক তাড়া করে, মা তখন বলেন, ‘দুলী টমের খাওয়ারটা খেয়ে যা তো?’ তখন টম ঘেউ-ঘেউ করে অদৃশ্য দুলীকে বারকতক বকে ধমকে সড়সড় করে খেতে চলে আসে৷ দুলীর যখন খুব খিদে পায় তখন বাইরে থেকে রান্নাঘরের জানলায় সামনের দুটো পা তুলে দিয়ে কুঁই-কুঁই করে৷ মাকে বোধহয় বলতে চায়—তোমরা তো সারা সকাল অনেক কিছুই খেলে, তোমাদের টম বিস্কুটের পর বিস্কুট সাবাড় করল, আমাকে কিছু দাও৷ মা যা দেবেন তা তো জানাই আছে, রুটি, দুধ, ছানা, মাংস সব টমের৷

খুব বৃষ্টি পড়ছে৷ দুলী গুটিসুটি মেরে বাইরে সিঁড়ির ধাপে শুয়ে আছে৷ বৃষ্টির ছাটে গা-ভিজে যাচ্ছে৷ দরজা খুলে কেউ দুলীকে ভেতরে ডাকে না৷ টম আছে যে৷ নেড়ির সঙ্গে মিশলে বিলিতির জাত যাবে৷ পুরো বর্ষাটাই দুলী ভিজে কাটিয়ে দিলে৷ শীতেও গিয়ে শোয় বাগানে, যেখানে গাছের শুকনো পাতা জড়ো করা আছে৷ টম শোয় নরম বিছানায়৷ শীতে তার গায়ে থাকে লেপ৷ সেই লেপটাকেই ও আবার মাঝেমধ্যে খুব খেলা পেয়ে গেলে দাঁত দিয়ে ধরে ঝটাপটি করে৷

দুলীর ওপর মায়ের খুব মায়া পড়ে গেছে৷ রোজ দুপুরে আর রাতে খাবার নিয়ে বাইরে এসে ডাকেন—দুলী আয় দুলী! দুলী যেখানেই থাক দৌড়ে চলে আসবে৷ মা আদরের গলায় বলবেন—‘কখন থেকে ডাকছি! আসবি তো! আয়! এক্ষুনি কাক আর কাঠবেড়ালিতে সব খেয়ে যাবে৷’

সেদিন মা বাইরে এসে কতবার ডাকলেন৷ দুলী কিন্তু এল না৷ মা রাগ করে গাছতলায় ভাত রেখে চলে এলেন৷ ‘যখন তোমার খুশি এসে খেও৷ পাড়া বেড়াতে বেরিয়েছেন৷’ সারা বেলা চলে গেল দুলী এল না৷ কাক আর কাঠবেড়ালিতে মারামারি করে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সব খেয়ে গেল৷ রাতে রুটি নিয়ে মা ডাকাডাকি করলেন৷ দুলী এল না৷ সিঁড়ির ধাপে রুটি কখানা ফেলে রাখলেন৷ কোথায় গেছে কে জানে৷ যদি আসে খেয়ে শুয়ে পড়বে৷ মায়ের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে৷ মাঝরাতে উঠে দরজা খুলে দেখে এসে বললেন, ‘নাঃ আসেনি৷ বোধ হয় মারাই গেছে৷’ সকালে সিঁড়ির ধাপে সেই রুটি পড়ে রইল! দুলী আর এল না৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%