সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আজ শনিবার৷
হেডস্যার আজ ছুটির পর মিটিং ডেকেছেন৷ মিটিং-এর পর ইটিং-এর ব্যবস্থা আছে৷ ক্লাস নাইন আর টেনের ছেলেরাই শুধু থাকবে৷ আমাদের স্কুলের বিশিষ্ট দারোয়ান রামাধরদা তাঁর ছোট্ট ঘরে ডাববা-ডাববা ঝালমুড়ি তৈরি করছেন৷ গুঁড়ো মশলার গন্ধে জিভে জল আসছে৷
হেডস্যার এলেন৷ আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালুম৷ মধ্যবয়সি মানুষ৷ বেশ মোটাসোটা৷ ফরসা চেহারা৷ সাদা পাঞ্জাবি৷ বোধহয় খদ্দর৷ মোটা ধুতি৷ পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি৷ চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা৷ কদমছাঁট চুল৷ আমাদের প্রায়ই বলেন—এদেশে একজন মানুষই জন্মেছিলেন, তাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর৷ আমরা তাঁর পায়ের নখের যোগ্য নই৷ আমরা সব স্বার্থপর শয়তানের দল৷ আমাদের ধরে-ধরে পেটানো উচিত৷ আমরা দেশের কলঙ্ক৷ রবীন্দ্রনাথ লাখ কথার এক কথা বলে গেছেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি৷
চেয়ারে বসতে-বসতে, স্যার বললেন,—বোসো, বোসো, আর সুব্রতটাকে কান ধরে টানতে-টানতে নিয়ে এসো৷
—সে কোথায় আছে স্যার?
—পেটুকরা যেখানে থাকে৷ রামাধরের ঘরের সামনে ছোঁক-ছোঁক করছে৷ আমাদের যেতে হল না৷ সুব্রতই এল হুসহাস করতে-করতে৷
হেডস্যার জিগ্যেস করলেন,—আপনি কোথায় ছিলেন জানতে পারি! সুব্রতর চোখ দুটো ছানাবড়ার মতো হয়ে আছে৷ মুখে হুসহাস শব্দ৷ সুব্রত খুব সহজ, সরল৷ একটু বোকা-বোকা৷ বাঁকা কথা বোঝে না৷ কেরিয়ার-ফেরিয়ারের ধার ধারে না৷ নিজের জীবনের মজার-মজার ঘটনা বলে সারাক্ষণ আমাদের মাতিয়ে রাখে৷ স্যাররাও তাকে খুব ভালোবাসেন৷
সুব্রত বললে,—অ্যায়সা ঝাল ছেড়েছে কেউ খেতে পারবে না৷ জিভের তলায় বাটি ধরতে হবে৷ আপনার স্যার আলসার আছে, তাই একটু টেস্ট করতে গিয়েছিলুম৷ ঝাল কমাও, ঝাল কমাও, মুড়ি ঢালো৷ আমার হেডস্যার মুখে দিতে পারবেন না৷ এ সেই সরস্বতী পুজোর আলুর দম-কেস৷ আমাদের কথা শুনলেন না৷ খেয়ে অসুস্থ হলেন৷
স্যার সুব্রতর মন জানেন৷ অবিশ্বাস করলেন না৷ বললেন,—সামনে বোস, আমার চোখের সামনে৷ একটা কথা জেনে রাখ, এখন সব বাঙালির পেটেই আলসার৷
আমরা সবাই কোরাসে বললুম৷—ইয়েস স্যার৷
হেডস্যার সভার কাজ শুরু করলেন৷ ছোট্ট একটি বক্তৃতা—বয়েজ! যে-ভাবেই হোক আমাদের পরোপকার করতে হবে৷ নিঃস্বার্থ সেবা৷ ঘোর দুর্দিন আমাদের সামনে৷ ছেলেরা বাপ-মাকে দেখে না৷ ভাই ভাইকে দেখে না৷ নেতারা দেশ দেখে না৷ ফি না দিলে ডাক্তার রোগী দেখে না৷ মাতালে দেশ ভরে গেছে৷ চতুর্দিকে সন্ত্রাসবাদী৷ এই অবস্থায় আমাদের জীবনের একমাত্র ব্রত হবে পরোপকার৷ পরের উপকার৷ তোমরা সব গ্রুপ করে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ো৷ সমাজের সর্বস্তরে ঢুকে যাও৷ আমাদের আদর্শ হবে উইপোকা৷ উইপোকা যেমন বইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে, খাঁজে-খাঁজে ঢুকে যায়, আমাদেরও সেই ভাবে ভাঁজে-ভাঁজে সমাজের খাঁজে খাঁজে ঢুকে যেতে হবে৷ উইপোকা ধ্বংস করে আমরা দেশ গঠন করব৷ আমরা চটাপট, চটাপট হাততালি দিয়ে উঠলুম৷ খুব ভালো লেগেছে আমাদের৷
হেডস্যার খুব অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন,—এটা কি নাট্যশালা৷ পায়রা ওড়াচ্ছিস! ঠিক এই সময় ঘরে প্রবেশ করলেন আমাদের বাংলার স্যার নিমাইবাবু৷ প্রায় ছ’ফুট লম্বা৷ স্বাস্থ্যবান৷ এমন চেহারা—কেন যে বাংলায় পড়ে আছেন আমরা বুঝতে পারি না৷ আবার কবিতা লেখেন৷ সেইসব কবিতা আমাদের ক্লাসে শোনান৷ মানে বুঝি না, তবে শব্দের খেলা, বেশ ভালো লাগে৷ মেঘলা দিনে সাংঘাতিক কবিতা আসে৷ কাল সেইরকম একটা দিন ছিল৷ ক্লাসে বসে-বসেই স্যার লিখে ফেললেন,
মেঘের ফানুষ উড়ছে
মানুষ কি আর দেখছে৷
কাজের কথাই বলছে
ময়ূর কেবল নাচছে৷
আমরা টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে উঠলুম,—ফাটাফাটি, ফাটাফাটি৷ স্যার বললেন,—আলুকাবলি, আলুকাবলি৷ তার মানে আমাদের আলুকাবলি খাওয়াবেন৷ তৈরি করবে রামাধর৷ আমাদের রামাধরের কোনও তুলনা নেই৷ রোজ ভোরবেলা গঙ্গায় চান করে৷ মহাবীরের পুজো করে৷ আগে কুস্তি করত, এখন আর করে না৷ যোগাসন করে৷ স্যার বললেন,—আলুকাবলি নিয়ে কবিতা হবে, এক-একজন এক-একটা লাইন লিখবে৷ চলে এসো বোর্ডে৷
আমাদের মধ্যে স্বরাজ কবিতা লেখে৷ বোর্ডে গিয়ে লিখে এলো, ফাটাফাটি আলুকাবলি৷
মধুকর পরের লাইন লিখলে, সুদ চায়না এই কাবলি৷
সব লেখালিখির পর কবিতাটা যা দাঁড়াল,
ফাটাফাটি আলুকাবলি,
সুদ চায় না এই কাবলি,
জিভে জল, টক, ঝাল আর মিষ্টি,
কাবুল ফেলে বাংলায় এল এই কাবলি৷
নিমাইস্যার হেডস্যারের পাশের চেয়ারে বসে বললেন,—পরোপকার খুব কঠিন কাজ৷ আমাদের এই জায়গাটা এত হতচ্ছাড়া না, হয় বিধ্বংসী বন্যা, না হয় দুর্ভিক্ষ৷ এই দুটো হলে পরোপকারের কাজটা সহজ হয়৷ হাণ্ডা-হাণ্ডা খিঁচুড়ি বানাও, ঝপাঝপ দিয়ে যাও, কপাকপ খেয়ে যাও৷ হেডস্যার বললেন,—সকলের ভাগ্য কি আর ভালো হয় নিমাইবাবু৷ আমাদের গভীরে ঢুকে কাজ করতে হবে৷ বেগুন গাছে ঝোলে৷ মারো টান৷ হাতে এসে গেল, আর আলু! মাটি খুঁড়ে তুলতে হয়৷ কারও বেগুনে বরাত কারও আলুর বরাত৷ আমাদের খুঁড়তে হবে৷ প্রথমে সারভে৷
সুব্রত বললে,—স্যার! আমার একটা প্রশ্ন আছে৷
—একটা কেন, তুমি হাজারটা প্রশ্ন করো৷
—স্যার! পরোপকার জিনিসটা ঠিক কী?
—জিনিস বলছিস কী রে গাধা৷ বল কর্ম৷ পরের উপকার?
—উপকার কাকে বলে স্যার?
অপকারের উলটটাই হল উপকার৷ যেমন মানুষের উলট হল অমানুষ৷ উদাহরণ শোন—একটা মানুষকে ঠেলে ফেলে দিলি৷ এটা হল অপকার৷ হাত ধরে টেনে তুললি এটা উপকার৷ একজন মানুষ খেতে পায় না, তাকে খাওয়ালি এটা উপকার৷
নিমাইস্যার বললেন,—এটা উপকার নয় সেবা৷
—আপনি আবার নতুন কথা এনে ব্যাপারটা গুলিয়ে দেবেন না৷
—ব্যাপার নয়, বলুন বিষয়৷
—ব্যাপার আর বিষয় এক৷ এটা ভাষা শিক্ষার ক্লাস নয়৷ উপকার হল এমন কাজ করা যাতে সমস্যার সমাধান হয়৷ তোমরা ঘুরবে৷ ঘুরে-ঘুরে দেখবে৷ নোট নেবে৷ প্রথমেই কিছু করবে না৷ আমাদের জায়গায় অর্থাৎ কমিটিতে এসে জানাবে, তারপর অ্যাকসান৷
ঝালমুড়ি এসে গেল৷ রামাধর বানায় বটে! দরজা দিয়ে ঢুকছে ঘরটা গন্ধে ভরে গেল৷ মার-মার কাট-কাট৷ ঠোঙায় ঠোঙায় ভাগ-ভাগ করে এনেছে৷ সুব্রত টপাটপ সব দিয়ে দিল৷ একটা ভাগ বেশি হয়েছে৷
হেডস্যার বললেন,—ওটা রামাধরের৷
সুব্রত বললে,—আমি স্যার বাইরে গিয়ে খাব?
—কেন?
—গাছতলায় বসে খেতে ভালো লাগে৷
নিমাইস্যার বললেন,—ঠিক বলেছিস৷ চল আমিও যাই৷
একটু দূরে বারুইপাড়া৷ ওই পাড়ায় বড়-বড় কারিগরদের বাস৷ তাঁরা সেতার, সরোদ, তানপুরা, হারমোনিয়াম, তবলা, এইসব তৈরি করেন৷ বড় ছোট অনেক দোকান আছে৷ আমরা ওই দিকটায় যাই লোভে লোভে৷ একটা বড় কুল-বাগান আছে৷
আমি আর সঞ্জয় গেছি৷ বিকেল বেলা৷ সরস্বতী পুজো আসছে৷ গাছে-গাছে কেমন কুল ধরেছে দেখতে হবে তো৷ হঠাৎ দেখি একটা দোকানের সামনে এক বৃদ্ধ মইয়ের ওপর কোনওরকমে দাঁড়িয়ে বেশ বড় একটা সাইনবোর্ড লাগাবার চেষ্টা করছেন, পারছেন না৷ বয়েস হয়েছে৷ দুর্বল শরীর৷
সঞ্জয় বললে,—এই দেখেছিস?
—কী দেখব?
—পরোপকার৷
—কে করছে?
—কেউ করেনি৷ আমরা করতে পারি৷ ওই দেখ, দাদু সাইনবোর্ড ঝোলাচ্ছে৷ একা৷ পারছেন না৷ যে-কোনও মুহূর্তে মই নিয়ে পড়ে যেতে পারে৷ চল সাহায্য করি৷
সঞ্জয় বললে,—অতবড় জিনিসটা একা পারবেন?
—আর একজন পাচ্ছি কোথায়?
—আপনার ছেলে নেই?
—ছিল৷ বিয়ে করে বউ নিয়ে পালিয়েছে৷ ছেলেরা যা করে থাকে?
—কই, আমার দাদা তো তা করেনি!
—তোমার দাদা একটি গাধা৷
সঞ্জয় আমাকে বললে,—দেখছিস, দাদাকে গাধা বলছে৷
—এ গাধা ভালো গাধা৷ তোর দাদার প্রশংসা৷
সঞ্জয় বৃদ্ধকে বললেন,—আমরা আপনাকে সাহায্য করব৷
বৃদ্ধ বললেন,—মতলব?
সঞ্জয় বললে,—আমরা পরোপকার করে থাকি৷
আমি মরলে এসো৷ কাঁধ দিও৷ বাঙালি তো একটা পরোপকারই জানে বলো হরি হরিবোল৷
কথা শেষ করেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক মই, সাইনবোর্ড, সবসুদ্ধ নিয়ে দাম করে পড়ে গেলেন৷ সাইনবোর্ডের তলায় বৃদ্ধ৷ চিৎকার করছেন হিন্দিতে—জানে মারা, জানে মারা৷ চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসছে৷
আমি আর সঞ্জয় ছুটছি৷ পিছনে চিৎকার—পালাচ্ছে, পালাচ্ছে৷ পাকাড়ো, পাকাড়ো৷
আমরা কুলবাগানের মধ্যে দিয়ে, পুকুর পাড় ধরে কোনওরকমে পালিয়ে এলুম৷ কুলকাঁটায় শরীর ক্ষত-বিক্ষত৷ হাপরের মতো হাঁপাচ্ছি৷ হেডস্যার অনেক রাত পর্যন্ত স্কুলের অফিসে কাজ করেন৷
আমাদের দেখে বললেন,—কী ব্যাপার? একি চেহারা?
সব শুনে বললেন,—আমি তোদের কি বলেছিলুম, আগে এসে রিপোর্ট করবি৷ কমিটি মিটিং-এ পাস হবে, তারপর অ্যাকসান৷ তোরা যেটা করতে গিয়েছিলিস, সেটা পরোপকার নয় সাহায্য৷ কালই আমি মিটিং ডাকছি!
সঞ্জয় বললে,—ঝালমুড়ি হবে স্যার?
—না, আলুকাবলি হবে৷
সঞ্জয় উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, ইয়া হু!
হেডস্যার ভুরু কুঁচকে বললেন,—এটা কী হল?
—এটা স্যার আনন্দের চিৎকার৷
সেই নিউহলে মিটিং৷ বাংলার স্যার আর আমাদের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাকটারও এসেছেন৷ আমাদের ব্যায়াম, আসন করান বটে, নিজের অম্বলের অসুখ৷ দশ মিনিটের মধ্যে তিনবার ঢেঁকুর তুললেন ভেউ, ভেউ করে৷ হেডস্যার বিরক্ত হয়ে বললেন,—জোয়ানের আরক খেয়েছিলেন?
করুণ মুখে বললেন,—ইলিশ মাছ!
এদিক নেই ওদিক আছে৷ যার জল সহ্য হয় না ইলিশ মাছ! কটা খেয়েছেন?
—খাবো না, খাবো না করে তিন পিস মেরে দিয়েছি৷
—আপনি ইলিশ মেরেছেন, এইবার ইলিশ আপনাকে মারবে৷ গঙ্গার ধারে গিয়ে এক ডেলা মাটি খেয়ে আসুন৷ মিনিটে-মিনিটে এইরকম ঢেঁকুর তুললে সভা তো সাসপেন্ড করে দিতে হবে৷
বাংলারস্যার বললেন,—সভা সাসপেন্ড না করে এই ব্যায়ামবীরকে সাসপেন্ড করে দিন৷ বাড়ি গিয়ে বারান্দায় বসে ঢেঁকুর তুলে বাড়ির লোককে মোহিত করুন৷
ব্যায়ামস্যার বললেন,—আমাকে আলুকাবলিটা দিয়ে দিলে এখুনি চলে যেতে পারি৷
হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন,—এর ওপর আলুকাবলি চাপাবেন?
ব্যায়ামস্যার বললেন,—হাওড়া স্টেশানে ট্রেন ধরতে গিয়ে দেখেননি৷ পোর্টারকে ডেকেছেন, ভারী-ভারী মাল মাথায় তুলেছে৷ দু-কাঁধে দুলছে দুটো ব্যাগ৷ আপনার হাতের হাতব্যাগটা দেখিয়ে বলছে, ওটাও আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিন৷ এ আপনার সেই কেস৷ যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন৷
আমাদের মধ্যে নিমাই খুব উসখুস করছিল৷ উঠে দাঁড়িয়ে বললে,—স্যার! আমাদের পাড়ায় একটা পরোপকার পাকছে৷
হেডস্যার বললেন,—ভাষাটা একবার শুনুন৷ পরোপকার কি ফল, যে পাকবে?
—না স্যার, পরোপকারের একটা সুযোগ তৈরি হচ্ছে৷
শুনি কীরকম সুযোগ!
আমাদের বাড়ির পাশেই থাকেন পরেশজেঠু৷ সকাল থেকেই খাবি খাচ্ছেন৷ একটু পরেই মারা যাবেন৷ খিটকেল টাইপের লোক৷ জ্যাঠাইমা কাঁদছেন আর বলছেন,—কে কাঁধ দেবে৷
হেডস্যার বললেন,—আমাদের ছেলেরা একেবারে উচ্ছন্নে গেছে৷ কী সব ভাষা, খিটকেল, খিচাইন, ক্যাচাল৷
ব্যায়ামস্যার বিশাল একটা ঢেঁকুর তুলে বললেন,—সব ওই টিভি৷
হেডস্যার করুণ গলায় বললেন,—কথা বলছেন কেন! কথা বললেই যখন ঢেঁকুর লিক্ করছে৷
বাংলারস্যার বললেন,—বড্ড বাজে দিকে আমাদের মন চলে যাচ্ছে৷ পরেশবাবুকে আমি চিনি৷ একটা মানুষ মারা গেলে তার যেমন প্রাণ থাকে না, সেইরকম গুণাগুণও থাকে না৷ আমাদের প্রত্যেকের একটা সামাজিক কর্তব্য আছে, সেই কর্তব্যবোধে ছেলেরা কাঁধ দেবে৷ একজন চলে যাও ওখানে৷ শেষ খাবিটা খাওয়া হয়ে গেলে খবর পাঠাও, আমাদের বিদ্যামন্দিরের টিম গিয়ে সৎকার করে আসবে৷
হেডস্যার জনমত চাইলেন৷ কর্তব্য আর পরোপকার কি এক হল?
অবশ্যই হল৷ অত বড় একটা সমিতি তৈরি হয়ে গেল, হিন্দু সৎকার সমিতি৷ অসহায় মানুষ রাতবিরেতে মারা গেলে কী হবে? এ তো খালি প্যাকেট নয়, যে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে৷ সেকালে কত হিতকারী সভা, সমিতি ছিল৷ জলে ডুবে গেলে, পাতকুয়ায় পড়ে গেলে, ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাত থেকে গিরে গেলে, সঙ্গে-সঙ্গে...৷
হেডস্যার বললেন,—হঠাৎ হিন্দি শব্দ ব্যবহার করলেন কেন? গিরে!
—আমি যে বাতলা৷ সাহিত্য আমার বিষয়৷ তিনখানা উপন্যাস শেষ৷ চতুর্থ প্রায় শেষ৷ একবার পড়ে গেল বলেছি৷ একই ক্রিয়া আমি পরপর দুবার ব্যবহার করি না৷ আমার ছাত্ররা ব্যবহার করুক তাও আমি চাই না৷
হেডস্যার বললেন,—উপন্যাসগুলো যন্ত্রস্থ হবে কবে?
—সে কি এক কথায় হয় স্যার! মেয়ের বিয়ের মতো! প্রকাশকরা সব পাত্রপক্ষ৷ নতুন লেখকের লেখা ছাপবে কে?
—এ আবার কি? সব লেখকই তো একসময় নতুন ছিলেন৷ ছাপতে-ছাপতে তবেই না পুরোনো হলেন৷
—সে কথা কে শুনছে স্যার!
—যাক, আমাদের কথায় আসি৷ কতকগুলো জিনিস বোঝার আছে, যেমন পরোপকার, সেবা, সাহায্য, কর্তব্য, পরহিত, কোনটা কী? আমাদের মধ্যে থেকে শ্যামল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,—স্যার! আমার ঠাকুমা একেবারে বুড়ি, কোমর ভাঙা৷ আমাকে ধরেছেন রোজ সকালে গঙ্গার স্নান করিয়ে আনতে হবে৷ এটা কি পরোপকারের মধ্যে পড়ে? যদি পড়ে, তা হলে আমাকে করতে হবে৷ আর তাহলে সকালে আমার পড়া হবে না৷ আর পড়া না হলে আমি ফেল করব৷ আর ফেল করলে আমাকে বাড়ি থেকে দূর করে দেবে৷ আর দূর করে দিলে আমি কোথায় যাব, কী খাব! শ্যামল বসে পড়ল৷
হেডস্যার বললেন,—ঠাকুমা পর নন, আপনজন৷ এ-তোমার পরোপকারের মধ্যে পড়ছে না৷ আপনি কি বলেন?
বাংলাস্যার বললেন,—আমার আমি ছাড়া বাকি সবাই তো পর৷ শ্যামলের পেট খারাপ হলে শ্যামলকেই বাথরুমে যেতে হবে৷ শ্যামলের ঠাকুমা গেলে হবে না৷ অতএব?
হেডস্যার বললেন,—অতএব?
বাঙলাস্যার বললেন,—শ্যামলের কেসটা সেবার মধ্যে পড়ছে৷ আর স্বামীজি পরোপকার, দয়া এইসব কথা সহ্য করতে পারতেন না৷ তিনি বলতেন৷ শিবজ্ঞানে জীব সেবা৷ তা হলে?
হেডস্যার বললেন,—তা হলে!
তা হলে ব্যাপারটা একটা কথায় এসে দাঁড়াল—সেবা৷ সেবার মধ্যেই সব আছে৷
ব্রজ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,—স্যার! আমার বোনের যখনই জ্বর হয় তখনই পা দুটো এগিয়ে দিয়ে বলে, পদসেবা কর৷
ব্যায়ামস্যার বললেন,—করবি! সঙ্গে-সঙ্গে ভেউ করে ঢেঁকুর৷
নীলাঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে বললে,—স্যার! আমার মনে হয় কামারপাড়ায় একটা প্রাইমারি স্কুল করা যেতে পারে৷ বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা সারা দিন মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়৷ খুব গরিব ওরা৷
হেডস্যার বললেন,—গুড আইডিয়া!
বাংলাস্যার বললেন,—আইডিয়া গুড কিন্তু করা যাবে না৷ রাজনীতি৷
হেডস্যার ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন,—আমরা তা হলে কী করব?
—কিচ্ছু করব না, মিটিং করব৷
বিষ্ণু হাঁপাতে-হাঁপাতে ঘরে এসে ঢুকল৷
—কী রে! বাঘে তাড়া করেছে?
বিষ্ণু বললে,—শিগগির, শিগগির৷ পরোপকারের মেশিন বের করুন৷
—সে আবার কী?
—বাড়িওয়ালা গুন্ডা এনে আমাদের সব জিনিসপত্তর বাইরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে৷ বাবাও হাসপাতালে৷ মাকে মেরেছে৷ দিদির চশমা ভেঙে দিয়েছে৷
হেডস্যার বললেন,—পুলিশ৷
ব্যায়ামস্যার বললেন,—পুলিশ কী করবে? এসব পেটি কেস৷
—তা হলে কে করবে?
কেউ করবে না৷ দেশ এখন আইনের হাতের বাইরে৷
অপরেশ উঠে দাঁড়াল,—চলুন না স্যার, আমরা দল বেঁধে সবাই যাই৷
হেডস্যার উঠে দাঁড়ালেন,—নিশ্চয় যাব৷
বাংলাস্যার সাবধান করলেন,—আপনার বুকে পেসমেকার৷ আর আমি তো যেতে পারবোই না গল ব্লাডার৷
ব্যায়ামস্যার বললেন,—আর আমারও অম্বল! আজ এক বছর হয়ে গেল একটাও সিঙ্গাড়া খাইনি, কড়াইসুঁটির কচুরি খাইনি৷
আমাদের মধ্যে অপরেশ অন্য ধাতুতে তৈরি৷ যেমন চেহারা সেইরকম সাহস৷ ত্রিভুবনে অপরেশের কেউ নেই৷ অনেক সময় মুটেগিরি করে পয়সা রোজগার করে৷ খুব ভোরে বাড়ি-বাড়ি দুধ বিক্রি করে৷ লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো৷ প্রাইভেট টিউটার রাখার ক্ষমতা নেই৷ রামকৃষ্ণ মিশনের এক সাধু অপরেশকে পড়ান৷ আমরা স্বামীজি স্বামীজি করি, অপরেশ স্বামীজিকে তার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে৷ অপরেশ বলে, ঠাকুর আমার সব কেড়ে নিয়ে খুব ভালো করেছেন৷ ঠাকুর, মা, স্বামীজি ছাড়া আমার আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে৷ আমরা এ-সব বুঝি না, তবে এটা বুঝি অপরেশ একেবারে অন্য রকমের৷ যেমন দেখতে সুন্দর, সেইরকম সুন্দর মন৷
অপরেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললে,—কেউ আসবে? সাহস আছে? আমরা চারজন এগিয়ে গেলুম৷ হেডস্যার আসছিলেন, অপরেশ বললে,—আপনাকে চিনেছি স্যার৷ কথা আর কাজ এক করতে পেরেছেন৷ আপনি পরে আসবেন৷
অপরেশ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে বিষ্ণুদের বাড়ি নয়৷
ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করলুম,—যাচ্ছিস কোথায়?
ফোর্স আনতে৷ আর-একটা কথাও বলবি না৷ শুধু দেখে যা৷ আমরা একটা অন্ধকার পাড়ায় এলুম৷ খুব খারাপ জায়গা৷ মেয়েরা ঘুরছে৷ অপরেশ হনহন করে হেঁটে একটা সাবেক কালের বাড়িতে ঢুকল৷ গোটা বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ পেছন দিকের একটা ঘরে আলো জ্বলছে৷
ঘরে একটা ডিভান৷ ডিভানে বলিষ্ঠ চেহারার এক যুবক আড় হয়ে শুয়ে আছে৷ আর চারজন মেঝেতে বসে আছে বেশ আয়েস করে৷ পেছন দিকের দরজাটা খোলা৷ সেখানে একটা মাঠ৷ দরজার ধারেই পাঁচটা মোটর সাইকেল অন্ধকারে চকচক করছে৷ মাঠের ওপারে বড় রাস্তা৷ আলো জ্বলছে৷ রাস্তার ওপারে জমজমাট বাজার দোকান-পাট নতুন-নতুন বাড়ি৷ সেটা পেরলেই রেললাইন৷ আবার অন্ধকারের এলাকা৷ মেঝেতে যারা বসেছিল তাদের মধ্যে একজন খুব সুন্দর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান গাইছে—তোমার অসীমে৷
অপরেশ ঘরে ঢুকেই বললে,—নিবারণদা, উঠে পড়ো, অ্যাকসান৷
—আবার কী হল? আজ যে আমার অফ ডে৷ ঠাকুরের জন্মদিন বুধবারে আমি কোনও কাজ করি না৷
—ঠাকুরেরই কাজ৷ তপার দল আমাদের এক হেডমাস্টারের বাড়িতে ঢুকে অত্যাচার করছে৷ স্যার হাসপাতালে আই সি ইউতে পড়ে আছেন৷
—কেসটা কী?
—মডার্ন ইলেকট্রনিকসের জগদা মণ্ডল বাড়িওয়ালা৷ ভাড়াটে উচ্ছেদ করে বাড়িটা প্রোমোটারকে দেবে৷ উৎপাত চলছে অনেক দিন ধরে৷ স্যার হাসপাতালে৷ এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে৷
তোর প্ল্যানটা বল? তোর মাথা আমার চেয়ে অনেক ভালো৷
আমরা পাঁচটা বাইকে চড়ে সোজা জগদার ঠেকে যাব৷ কোথায় এই সময়ে থাকে তুমি জানো৷ আমিও জানি৷ এখন সে খুব দুর্বল৷ সঙ্গে মেশিন রাখে৷ চালাতে জানে না৷ যদি ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করে সোজা তুলে নিয়ে যাব ওর গুরুর বাড়িতে৷ সেখান থেকে মোবাইলে তপাকে বলবে৷ যদি না বলতে চায় বারুইপুরে তোমার ডেরায় ডাম্প৷
—মন্দ বলিসনি, তপা তো ওইটার কুত্তা৷ চল তা হলে৷
যে গান গাইছিল, সে এবার গাইতে লাগল,—কোন খেলা যে খেলবে কখন৷
পাঁচখানা মোটর সাইকেল এক সঙ্গে পাড়ায় ঢুকল৷ বিকট শব্দে৷ আমরা অবাক৷ জগদার ফূর্তির ডেরার সামনে আমাদের বিদ্যায়তনের অন্তত দুশো ছেলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷
ভেতরে ঢুকে আরও অবাক৷ জগদা কাঁদছে, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের হেডস্যার, বাংলার স্যার, আর ব্যায়ামস্যার৷ বেশ একটা নাটক৷ ব্যায়ামস্যার ঘন-ঘন ঢেঁকুর তুলছেন৷
আমরা যখন ঢুকলুম তখন হেডস্যার বললেন,—জগদা! তুমি আমাদের এক্স স্টুডেন্ট৷ তোমার বাবা ছিলেন অতি সম্মানিত, সাধক মানুষ৷ ভগবান তোমাকে কিছু কম দেননি, তোমার এই অধঃপতন৷ গুন্ডারাজ একদিন শেষ হবে৷ তখন তুমি কী করবে? বাইরে তাকিয়ে দেখো আমার দুশো ছাত্র হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে আছে আদেশের অপেক্ষায়৷ আর এই তো আমাদের নিবারণ এসে গেছে৷ নিবারণকে তুমি চেনো নিশ্চয়৷
জগদা হাঁ করে চেয়ে আছে৷ ফোলা-ফোলা মুখ৷ কাতলা মাছের মতো চোখ৷ বাবু আবার মদ খাচ্ছিলেন! সামনের বার ইলেকশানে দাঁড়াবে৷ এইসব লোক সমাজের মাথা হবে!
হেডস্যার বললেন,—যে বাপের পরিচয় দিতে গিয়ে ছেলে-মেয়েরা মাথা হেঁট হয়, তারা তো অরফ্যান৷ তুমি যখন তোমার পিতার পরিচয় দেবে লোকে বলবে আম গাছে আমড়া হয়েছে৷ শোনো জগদা আমার শরীরে বিপ্লবীর রক্ত বইছে৷ এখুনি তোমার সাজানো-গোজানো দোকানটা আমার ছেলেরা চুরমার করে দিতে পারে৷
জগদা উঠে দাঁড়াল৷ টলছে৷ বললে,—আর আমাকে কিছু বলবেন না স্যার৷ আমি নিজে যাচ্ছি ক্ষমা চাইতে৷
একটা মিছিল৷ পাঁচখানা মোটর সাইকেল আগে৷ তারপর আমাদের তিনজন স্যার৷ তারপর আমরা৷ বিষ্ণুদের বাড়ির সামনের রাস্তায় মালপত্তর ডাঁই৷ বিষ্ণুর মা আর দিদি সামনের বাড়ির রকে চুপ করে বসে আছেন৷ আর বাঙালি ভদ্দরলোকের যা রীতি, সবাই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল৷ আমাদের মিছিল দেখে সব পালাচ্ছে৷
নিবারণ একটার হাত চেপে ধরে বললে,—পালাচ্ছিস কোথায়! বাকি মজাটা দেখে যা৷ এই এর ফুলপ্যান্টটা হাফপ্যান্ট করে দে৷ প্রতিবাদ না করে এই পাড়ার যারা মজা দেখছে তাদের সব কটার বাড়ি আজ ভাঙচুর হবে৷ এক সঙ্গে দুশো ছেলে চিৎকার করে উঠল,—হবে৷
পটাপট দরজা জানালা বন্ধ হচ্ছে৷ রক, বারান্দা সব খালি৷
তপা বেরিয়ে এসেছে৷ হেডস্যার বললেন,—তুমি আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিলে৷ পরিচয় দিতে লজ্জা করে৷ তোমার বাবা ছিলেন সেক্রেটারি৷ লেখাপড়ায় তুমি ভালোই ছিলে৷ অধ্যাপক না হয়ে গুণ্ডা হয়েছ৷ খুব গর্বের কথা!
তপা মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে৷
হেডস্যার বললেন,—তোমার কাছে তো রিভলভার আছে, যে রিভলভার দিয়ে স্বদেশীরা অত্যাচারী ইংরেজদের মারত, তুমি আমাকে মেরে ফেলো৷ এ লজ্জা আর সহ্য হচ্ছে না৷
একে-একে সব মাল ভেতরে উঠে গেল৷ জগদা বললে,—কালই আমি বাড়িটা আপনাদের নামে রেজেস্ট্রি করে দেবো৷
বিষ্ণুর মা ধীর শান্তগলায় বললেন,—দান আমরা নিই না৷ উনি অসুস্থ, বিপদে পড়েছি, সময় হলেই উঠে যাব৷
জগদা বললে,—বাড়িটা তা হলে আমি সুন্দর করে সারিয়ে দোবো৷ যত দিন ইচ্ছে আপনারা থাকবেন৷ আমার অপরাধ মার্জনা করবেন৷
বাংলার স্যার,—ইস করলেন৷
ব্যায়ামস্যার বললেন,—কি হল গোবর মাড়ালেন?
—না-না, পরপর দুটো ক্রিয়া, আপনারা থাকবেন, মার্জনা করবেন৷
—দুটো নম্বর কেটে নিন৷
সঞ্জয় আমার কানে-কানে বললে,—ইস, আলুকাবলিটা৷
হেডস্যার উঁচু রকে দাঁড়িয়েছিলেন৷ আমরা সব রাস্তায়৷ রাস্তার আলো তাঁর মুখে এসে পড়েছে৷ সুন্দর, সুপুরুষ চেহারা৷ হাসছেন আর বলছেন,—আমি আমার পেসমেকারটা খুলে ফেলে দিতে পারি৷ তোমাদের সকলের হৃদয়ের শক্তিতে আমি আজ শক্তিমান৷ তোমরা আমার গর্ব৷
আমরা সবাই চিৎকার করে বললুম,—আপনাকে আমরা কোনওদিন ভুলব না স্যার, কোনওদিন ভুলব না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন