সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আর একটু পরেই উত্তর কলকাতায় একটা গল্প শুরু হবে, এ কথা কেউ জানত না৷ ১৯৫৪ সাল, মার্চ মাস৷ ব্যতিব্যস্ত শ্যামবাজার৷ দোকানপাট খুলে গেছে৷ বাজারে বাজারে মানুষের গুঁতোগুতি৷ একতলা, দোতলা বাস৷ আঙুরের থোকার মতো মানুষ ঝুলছে, টুপটাপ খসেও পড়ছে৷ শ্যামবাজার ডিপোয় ট্রাম ঢুকে গোল হয়ে ঘুরে, বাইরে বেরিয়ে এসে ঠ্যাং-ঠ্যাং করে দক্ষিণ দিকে দুলতে দুলতে ছুটছে, ঘসঘস শব্দ৷ যেন ছোট একটা রেল গাড়ি, ফার্স্ট-ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস৷ চলে যাওয়া ইংরেজদের ব্যবস্থা৷ সমাজের মানুষকে আয় অনুসারে বিভক্ত করা—ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড৷ ট্রেনের থার্ড ক্লাসে গোটা ভারতের নব্বই ভাগ৷ যাক্, যা হয়ে আছে, তা হয়ে আছে৷ কিছু করার নেই৷
শ্যামল, ওই তো শ্যামল৷ পাঁচ মাথার জট কাটিয়ে হন্ হন্ করে হাঁটছে৷ কলেজে যাচ্ছে৷ যে-সে কলেজ নয়, প্রেসিডেন্সি৷ থার্ড ইয়ারে পড়ে৷ বিশ্রী রকমের ভালো ছেলে৷ এমন, এমন নম্বর পায় সবাই চমকে ওঠে৷ সব বিষয়ে নব্বই থেকে একশোর মধ্যে৷ কিছু করার নেই৷ মাস্টারমশাইরা অনেক চেষ্টা করেও আশির ঘরে নামাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছেন৷ তাঁরা একটি কথাই সমস্বরে উচ্চারণ করেন, ‘অপ্রতিরোধ্য! আমাদের কিছু করার নেই৷ মগজের বাঁধ বুদ্ধির ধাক্কায় ভেঙে গেছে৷’ শ্যামল যখন স্কুলে পড়ত, তখন অনেক অভিভাবক নিজের ছেলেকে এক ক্লাশ নীচে ভর্তি করতেন৷ একটা বছর যায় যাক৷ শ্যামলের বাবারও ক্ষমতা নেই শ্যামলকে টপকে যাবার৷ ওর মাথার ‘সিক্রেট’-টা কী? সব মাথা যেমন দেখতে, সেই রকমই তো৷ বড় সাইজের একটা বেল৷ কোঁকড়া কোঁকড়া চুল৷ খাড়া একটা নাক৷ বড় বড় দুটো চোখ, জ্বল জ্বল করছে৷ কান পর্যন্ত টানা টানা ভুরু৷ ব্লেডের মতো পাতলা দুটো ঠোঁট, ইঁদুরের কানের মতো দুটো কান৷ কী এমন আহামরি৷ একজন বললে, ‘স্টিমারের প্রপেলারে মাথা ঠুকে যাবার পর থেকেই ওর মাথার চাল উড়ে গেছে৷’
‘তার মানে? এ আবার কোত্থেকে নতুন এক থিওরি নিয়ে এল৷ ও চালা বাড়ি নাকি, যে চাল উড়ে যাবে?’
‘চাল উড়ে গেলে ভেতরটা আলোয় আলোয় হয়ে যায়৷ এক্সট্রা কিছু লেখাপড়া না করলে মাথার মাথামুণ্ডু জানা যায় না৷ ঝড়, জল, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, যাই হোক না কেন আমি দু’পাতা উপনিষদ পড়বই পড়ব৷ তমসো মা জ্যোতির্গময়৷ আমার বাবাদের কালে চুলকাটার পর ক্ষৌরকাররা ঘাড়ে পাক্কা আধঘণ্টা ধরে রদ্দা মারত, যাকে বলা হতো বোম্বাচাক৷ ক্ষুরধার বুদ্ধি কেন বলা হতো? ক্ষুরের সঙ্গে বুদ্ধির তুলনা? কেন? সমস্ত রহস্য ঘাড়ে, কানে, গালে আর মাথার চালে৷ সেকালের পণ্ডিতমশাইরা শাস্ত্র পড়ে এই সব জেনেছিলেন আর সেইভাবেই দাওয়াই দিতেন—কান টানো, চাঁদিতে গাঁট্টা মারো, বেত দিয়ে পিঠে ঢাকের বাদ্যি৷ এই ভাবে তাঁরা কত গাধাকে পণ্ডিত করতেন!’
‘তা তোমাকে কোন গাধা পণ্ডিত করেছেন? সরি, কোন পণ্ডিত গাধা করেছেন? সরি সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ শ্যামল কি তোমার পরামর্শে স্টিমারের প্রপেলারে মাথা দিয়েছিল?’
‘আজ্ঞে না, অ্যাক্সিডেন্ট৷ শ্যামল তো বিখ্যাত সাঁতারু৷ ও আর আমার ছোটভাই পলাশ, সাঁতরে গঙ্গাপার হয়৷ শ্যামল ডুব সাঁতারে এক্সপার্ট৷ ঢুপ্ করে ডুব দিল এখানে ডুস্ করে উঠল গিয়ে সেখানে৷ ছেলেটা তিমি মাছের মতো দমদার৷ সেদিনও ডুব মেরেছে৷ আর ঠিক সেই সময় স্টিমারটাও এসে পড়েছে৷ শ্যামল ভুস্ করে যেই উঠেছে, মাথার ওপর প্রপেলার৷ ভ্যাগ্যিস, মাথায় চুল ছিল না৷ চুল থাকলে প্রপেলারের ঘুরন্ত ব্লেডে আটকে মাথাটা ছিঁড়ে ধড় থেকে আলাদা হয়ে যেত৷ আমার একটা প্রতিভা হারাতুম৷’
‘চুল ছিল না কেন? এখন তো মাথায় প্রচুর চুল!’
‘আরে, তার কয়েকদিন আগেই তো ওর পৈতে হয়েছে৷ মনে নেই, আমরা সবাই গিয়ে খেয়ে এলুম৷ খুব ঘটা হয়েছিল৷ হবেই তো! একটা মাত্র ছেলে৷ সব পরীক্ষায় ফার্স্ট৷ মাথায় চোট পাওয়ার পর ব্রেনটা অ্যায়সা খুলে গেল, পড়ার আগেই দেখে সব পড়া হয়ে গেছে৷ গোটা বইটাই পড়া৷ পূর্বজন্মে পড়ে, এই জন্মে ল্যান্ড করেছে৷ স্বামী বিবেকানন্দেরও তো একই কেস৷ জীবনীতে পড়িসনি---খেলতে, খেলতে ঠাকুর দালানের সিঁড়ির ওপর থেকে পড়ে কপালটা কেটে গেল৷ তারপরে শুরু হল কাণ্ড৷ শেষ হল বেলুড় মঠে৷ হয়ে গেলেন বিরাট এক মন্দির৷’
শ্যামলকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই৷ তাকে ঘিরে অদ্ভুত, অদ্ভুত সব ঘটনাও ঘটবে৷ তার কোষ্ঠী একবার দেখা দরকার৷ গ্রহদের অবস্থান৷ রবি, চন্দ্র, বুধ, বৃহস্পতি, শনি, রাহু, কেতু৷ এই মুহূর্তে শ্যামল তিড়িং করে লাফিয়ে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে উঠে চটজলদি জানালার ধারের একটা সিটে বসেছে৷ দ্বিতীয় শ্রেণীর আসনে গদি নেই৷ ফালা ফালা কাঠ দিয়ে তৈরি চওড়া চিরুনির মতো একটা ব্যাপার৷ অফিস টাইম৷ ট্রামভর্তি ডালহাউসিগামী মানুষ৷ মোটা, রোগা, তেওড়া, তেঁএটে, সোজা, কুঁজো৷ ইংরেজদের সেরেস্তায় প্রতিপালিত বুদ্ধিমান, বুদ্ধিজীবী বঙ্গরত্ন৷ শ্যামলের পাশে বসেছেন বেশ মোটাসোটা এক ভদ্রলোক৷ শ্যামল বুঝতেই পারছে, পেটের থলিতে প্রচুর ঠেসেছেন৷ ঢুলতে শুরু করবেন৷ টালটা কোন দিকে হবে! বাঁদিকে শ্যামলের ঘাড়ে, না ডানদিকে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ভুঁড়িতে! কলকাতার ট্রাম হল, মধ্যবিত্ত বাঙালির কালচারের চলমান তীর্থ৷ কারো মুখে জর্দাপান, কারো মাথায় গন্ধতেল৷ জবা কুসুম, হিম কল্যাণ৷ সেই কলকাতার পোশাক, ধুতি, শার্ট, গোলগলা পাঞ্জাবি, পায়ে চপ্পল, নিউকাট অথবা কাবুলি৷ আঙুলে আংটি, ওপর বাহুতে তাগা, তাবিজ, কবচ৷ সব কথাতেই ঘুরে-ফিরে এই কথাগুলি আসবে, ‘সবই ভাই মায়ের ইচ্ছা’, ‘কপাল, কপাল’, ‘রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে৷’ শ্যামলের ভেতর একটা স্বদেশী ভাব৷ ছেলেবেলায় ব্রতচারী করত—‘চল কোদাল চালাই’৷ বিপ্লবীদের জীবনী মুখস্থ৷ প্যান্ট, পাজামা পরে না৷ কম বহরের ধুতি, টেনিস শার্ট অন্য নামে বাঙলা শার্ট। যেমন, তার প্রিয় গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পরেন, পায়ে সাদা কেডস জুতো৷ কেডস কেন? সেও এক ঘটনা৷ তার জীবন ঘটনা বহুল৷
বৈশাখের দুপুর৷ চচ্চড়ে রোদ৷ শ্যামবাজারের রাস্তার পিচ গলে গেছে৷ শ্যামল তর তর করে হাঁটছে৷ চ্যাট্ করে একটা শব্দ৷ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল৷ কী ব্যাপার? ডান পায়ের চটি পিচে রাস্তার গলা পিচে আটকে গেছে৷ এক পায়ে চটি, আর এক পা চটির বাইরে! কলকাতার মানুষের এই এক গুণ, কেউ কোনো সমস্যার পড়লে, এগিয়ে আসবে৷ কেউ উপদেশ দেবে, কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে৷ এটা হাতের ব্যাপার নয়, পায়ের ব্যাপার৷ বাগবাজার ব্যায়াম সমিতির এক যুবক সাহায্যের হাত নয়, পা নিয়ে এগিলে এলেন, ‘সরুন, সরুন৷ শক্তি চাই৷’ তিনি চটিতে পা গলিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘জয় বজরঙ্গবলি, ওয়ান, টু, থ্রি...৷’
যাঃ, চটির সাজটা খুলে বেরিয়ে গেল, তলাটা বুক পেতে সেঁটে রইল গলিত পথের বুকে৷ যুবক বললেন, ‘বাঙালি চটি দুর্বল৷ বিহারী চপ্পল হলে উঠে আসত, যা টান মেরেছিলুম৷ বিউটি, বিউটি৷ রাস্তাটার সৌন্দর্য বেড়ে গেল৷ গরুর পায়ের চাপে যে গর্ত তৈরি হয় তাকে বলে গোষ্পদ৷ মানুষের পায়ে খুর থাকে না, থাকে জুতো৷ পথের ওপর পড়ে থাকে এই শ্রীপদ চিহ্ন৷ আরো কয়েকটা চটি পেলে এখানে বেশ একটা নকশা করে থেবড়ে দিতুম, তিলোত্তমা কলকাতা৷’
পুলিশ এসে গেছে৷ কী হচ্ছে দেখার জন্যে ভিড় বেশ জমেছে৷ ট্র্যাফিক জ্যাম৷ পুলিশের প্রশ্ন, ‘কীসের জন্যে অবরোধ? কলে জল নেই, জলে কল নেই?’
বিশিষ্ট এক ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, ‘আপনার সরকারকে বলুন, রাজা হয়ে রাইটার্সে বসে থাকলে হবে, রাজপথের দিকে নজর দিন৷ হংকং-এ প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর রাস্তার ওপর মিহি করে জল স্প্রে করা হয়৷’
পাশ থেকে একজন বললেন, ‘গুল মারবেন না৷ পটলডাঙার টেনিদা!’
‘কে? কে বললে? সাহস থাকলে এগিয়ে আয়৷’
ভিড় থেকে উত্তর এল, ‘কাকাবাবু হংকং নয়, সিঙ্গাপুর! আমার মালিক পোদ্দার সায়েবের ভাই সিঙ্গাপুরে থাকে৷ সে একটা শহর বটে৷ বাড়ির ছাতার ওপর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে৷ রাস্তা ওপরে মানুষ নীচে৷ ওরা রাজপথকে মাথায় করে রেখেছে!’
শ্যামল আর দাঁড়ায়নি৷ ‘ইস্যুটা’ জনসাধারণের হাতে চলে গেছে৷ খালিপায়ে কলেজে ঢুকেছে, বাঙলার অধ্যাপক সহানুভূতির গলায় জিগ্যেস করেছেন, ‘কী হল শ্যামল, কেউ প্রয়াত হলেন?’
পরের দিন সংবাদপত্রে ছোট্ট একটি খবর, ‘চলমান চটি অচল, ব্যস্ত শহর কিছুক্ষণের জন্যে বিকল৷’
চটির তলাটা বেশ কিছুদিন ওই পথেই আটকে ছিল৷ তার ওপর দিয়ে গাড়ি, মানুষ চলাচল করত৷ শ্যামলও মাঝে মাঝে দেখতে যেত৷ একদিন গিয়ে দেখলে চটিটা নেই পড়ে আছে একটি পদচিহ্ন৷ কেউ জানতেও পারল না কার পদচিহ্ন!
মন্থর গতিতে ট্রাম চলছে৷ ভদ্রলোক বেশ ভদ্রভাবে শ্যামলকে বললেন, ‘তোমার ওদিকে আর ইঞ্চিখানেক সরা যাবে ভাই৷ অনেক চেষ্টা করেও ফ্যাট কমাতে পারছি না৷ আসলে আমার ফ্যামিলিটাই মোটাদের৷ আমার বাবার জন্যে অফিসে স্পেশাল চেয়ার করাতে হয়েছিল৷ শুনেছি, শিশু অবস্থায় আমি একদিন বাবার চাপা পড়ে মরেই যাচ্ছিলুম, পিসিমার জন্যে বেঁচে গেলুম৷ পরমায়ু ছিল৷’
শ্যামল যতটা সম্ভব সরে গিয়ে ট্রামের কামরার ‘বডি’র সঙ্গে সেঁটে গেল৷ ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, ‘কোন কলেজ?’
‘প্রেসিডেন্সি।’
‘তার মানে ব্রিলিয়েন্ট৷ আমারও ইচ্ছে ছিল, বাবা ঢুকিয়ে দিলেন ব্যবসায়৷ ইউনিভার্সিটিতে তিনশো, তোমাদের কলেজে দুশো৷’
‘মানে?’
‘মানে, পাখা৷ আমার কোম্পানি পাখা ভাড়া দেয়৷ কোম্পানির নাম ইলেকট্রা৷ হাজার, হাজার পাখা পনপন করে ঘুরছে, কলকাতার এখানে, ওখানে, সেখানে৷ সেবাই ধর্ম, তাই না! সবই মায়ের ইচ্ছা, তবে আমার দেবতা ভোলা পাগলা৷ সাতেও নেই, পাঁচেও নেই৷ একগুঁয়ে বউটা অকালে মারা গেল৷ বছরে একবার তারকেশ্বরে টাকে জল ঢালতে যাবই যাবো৷ বাবার মাথার ওপর পাখা ফিট করে দিয়েছি৷ বড়বাজারের সাতটা গোয়ালে আমার চোদ্দোটা পাখা৷ গো-মাতা৷ মায়ের সেবাই তো শ্রেষ্ঠ ধর্ম৷’
শ্যামল এইবার উঠবে৷ কলেজ এসে গেছে৷
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল৷
‘কী হল?’ শরীর খারাপ লাগছে?’
‘না, উঠতে দিচ্ছে না৷ টেনে ধরে রেখেছে৷’
‘কে ধরে রেখেছে? ভাগ্য?’
‘না পইতে৷’
‘পইতে কোথা থেকে এল? কার পইতে?’
‘আমার৷ জামার তলা দিয়ে বেরিয়ে, সিটের ফাঁক দিয়ে গলে কোথাও আটকে বসে আছে৷’
ভদ্রলোক জিগ্যেস করল, ‘কী গোত্র?’
‘কাশ্যপ৷’
‘সর্বনাশ করেছে৷ সামবেদ, এক হাত, এক বিঘত লম্বা৷ গায়ত্রীর পাওয়ারে চার্জড হয়ে আছে৷ আরে, আমারও তো সামবেদ৷ বড় বাজারে একটা ষাঁড়ের শিঙে আটকে গিয়েছিল৷ কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷ তারপর থেকে পৈতেটা আমি মশারির এক দিকে বেঁধে রেখেছি৷ তিনদিকে দড়ি, একদিকে পৈতে৷ ব্রাহ্মণ মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে বুকের সেন্টারে একশো আটবার গায়ত্রী৷ তারপর স্বপ্ন৷ রাতটা আমার কৈলাসেই কাটে৷ নন্দী, ভৃঙ্গীর সঙ্গে লুকোচুরি৷ আমি বাবার আড়ালে লুকিয়ে বসে চকলেট আইসক্রিম চুষি৷’
কলেজ পেছনে পড়ে রইল৷ ট্রাম চলেছে ধর্মতলার দিকে৷ শ্যামল নানা ভাবে চেষ্টা করছে৷ একবার করে উঠছে পুরোটা উঠতে পারছে না, টান পড়ছে৷ কড়কড়ে নতুন, মোটা, তিন দণ্ডী পৈতে, কদিন আগে পরেছে৷
সহযাত্রী ভদ্রলোক বলছেন, ‘পৈতে ছেঁড়া মহা পাপ, তাও যদি চাও, পারবে না৷ ও তোমার, আমার কাজ নয়৷ মহাভারতের দুর্বাসা মুনি পারতেন৷ কথায়, কথায় পটাং করে পৈতে ছিঁড়ে অভিশাপ দিতেন, নির্বংশ হঃ! সেই রকম রাগ চাই৷ মাথার তালু দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, নাকে বাইসনের মতো ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ৷ হাই ব্লাড প্রেশার চাই৷ তোমার প্রেশার কখনো দেখেছ? আমার চেহারাটা মোটাসোটা প্রেশার কিন্তু লো৷’
ট্রাম কার্জন পার্কের ডিপোয় ঢুকেছে৷ সব নামার জন্যে ব্যস্ত৷ একজন সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন, ‘আরে, জগদীশ না! কোথায় ডুব মেরেছিলে? নামবে না? আরাম করে বসে আছ? যেন নিজের বৈঠকখানা!’
সাহিত্যে যেমন লেখে, তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ, উন্নত নাসা, বিস্ফারিত চক্ষুদ্বয়, ভদ্রলোক ঠিক সেই রকম৷ শ্যামল পরে জানতে পারবে, ভদ্রলোকের নাম, নরনারায়ণ শাস্ত্রী৷ নাম্বার ওয়ান জ্যোতিষী৷ মানুষের দুর্ভাগ্যকে ছারপোকার মতো টিপে মারেন৷
জগদীশ বললেন, ‘নমস্কার, নমস্কার৷ কাজের চাপে যেতে পারিনি৷ গ্রহগুলো সব কেমন আছে?’
‘সবাই মোটামুটি ঠিক আছে, ওই যা হয় মঙ্গলটা বিগড়ে আছে৷ দেখি কী করা যায়৷ তা চলো নামি৷ বসে আছ কেন?’
‘টেকনিক্যাল প্রবলেম, আমার এই তরুণ বন্ধুটি আটকে গেছে৷ ওর পৈতেটা সিটের ফাঁক দিয়ে গলে একটা কিছুতে আটকে গেছে, খোলা যাচ্ছে না৷’
‘মূর্খ!’
‘আমি মূর্খ, অবশ্যই মূর্খ, একে মূর্খ বলা যাবে না৷ প্রেসিডেন্সির ফার্স্ট বয়৷ অক্সফোর্ড চেয়ার পেতে রেখেছে৷’
‘তবুও মূর্খ৷ গায়ত্রী বিদ্যা জানে না৷ গলায় পৈতে ঝুলিয়েছে৷ মূঢ়৷ রোজ গায়ত্রী জপ করে?’
শ্যামল এমনিই ঘাবড়ে ছিল, মিউ, মিউ করে বললে, একশো আট৷’
‘হাসালে, বডি ওয়েট কত? শরীরের ওজন অনুসারে ‘ডোজ’ ঠিক করতে হয়, শাস্ত্র না পড়েই সব শাস্ত্রী৷ তোমার ডোজ, মিনিমাম পাঁচ হাজার৷ তোমার ওটা পৈতে নয় দড়ি, গরুকে খোঁটায় বাঁধার কাছি৷ পাঁচ হাজার বার গায়ত্রী জপ কর, পৈতে খুলে যাবে৷ জীবন্ত কেউটে সাপের মতো ফোঁস করে উঠবে, রাজ গোখরোর মতো ফণা তুলে মাথার ওপর দুলবে৷’
এতক্ষণে ক্যাশ-ট্যাশ মিলিয়ে কন্ডাক্টার এসে দাঁড়িয়েছেন, ‘কী হল কী, আপনারা নামছেন না কেন? মিটিং করতে হলে মনুমেন্টের তলায় যান৷’
শাস্ত্রীমশাই এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কন্ডাক্টারকে বললেন, ‘খুব বোলচাল! তাই না? অর্শ ভালো হয়েছে? এরপর ফিসচুলা, তারপর ক্যানসার, তারপর বলো হরি৷ তিন বছর৷’
কন্ডাকটারের কাঁদো কাঁদো গলা, ‘আপনি? ভগবান?’
‘ভগবানের পোষ্যপুত্র নর-নারায়ণ শাস্ত্রী৷ সিটের পেরেকে এর পৈতে আটকে গেছে৷ কেন আটকেছে? তোমার কোম্পানি ভাড়া বাড়াতে পারে, যাত্রীদের নিরাপত্তা, যাত্রীদের ধর্ম রক্ষা করতে পারে না?’
‘আজ্ঞে, আমি তো সামান্য কর্মচারী, গোপালচন্দ্র দাস৷’
‘তোমার তো অ্যাজমা আর এগজিমা দুটোই আছে৷’
‘তা আছে বটে৷’
‘এখন যাও, পৈতে খোলার ব্যবস্থা করো৷’
‘দাঁড়ান ঠাকুর৷ না, না, বসুন ঠাকুর, আমি ছেলেটাকে ডাকছি৷ ভোলা, ভোলা!’
বাইরে হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরা একটা ছেলে ঘুরছিল৷ সে এল৷ ‘দেখ তো সিটের তলায় পৈতেটা কোথায় আটকে আছে৷’
ভোলা হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকলো৷ রিপোর্ট, ‘তোমার সিটের একটা কাঠ ভেঙে ঝুলছে৷ একটা ইস্কুরুপের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে৷’
‘খোল, খোল, ছিঁড়ে না যায়৷’
পৈতে খুলল৷ ভোলার দু’হাত, দু হাঁটুতে প্রচুর ধুলো৷ গলায় একটা ছোট লোহা ঝুলছে মটরদানার মতো৷ চলে যাচ্ছিল৷ জগদীশ ডাকলেন, ‘যাচ্ছিস কোথায়?’
ভোলা বিজ্ঞের মতো বললে, ‘দেখি, কোথায় যাওয়া যায়।’
জগদীশ একটা দশ টাকার নোট ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন৷ ভোলা নোটটা হাতে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললে, ‘তা ভালো৷ আজকের দিনটা আমাদের চলে যাবে৷ তবে রোজ রোজ তো আর পৈতে আটকাবে না৷ আমার ওই কাগজের বস্তাই ভালো৷ ছেঁড়া-ছেঁড়া কাগজ, কত কত কাগজ, কত রকমের ছবি৷ মধুবালা, সায়েরাবানু, হেমামালিনী৷ সব ফুটপাতে৷ আমার বাবাটাকে বাঘে খেয়েছে, মা-টা কোথায় হারিয়ে গেছে৷ রাতে ওই পোস্টাপিসের ফুটপাতে পাগলিমাসির পাশে শুয়ে থাকি৷ আর এই টেরামকাকু রোজ আমাকে রুটি-তরকারি খাওয়ায়৷ ভোলা ভোলা বলে ডাকে, তখন মনে হয় আমার বাবাই বুঝি ডাকছে৷ তোমরা তো কলকাতায় বেড়াতে আস৷ তোমরা কী জানো, এই কলকাতাটা কার, ‘আমার, আমার৷’
সবাই এতক্ষণ থমকে ছিল৷ ছেলেটা যেন নাটকের ডায়ালগ বলে গেল৷ ট্রামটা আর রুটে নামবে না৷ গুমটিতে ফিরে যাবে৷ কন্ডাক্টার গোপালচন্দ্র শাস্ত্রীমশাইকে বললেন, ‘আমাকে কৃপা করবেন?’
‘কৃপাময় কৃপা করবেন৷ কালীঘাটে চলে আসুন৷’
‘আমি কালীঘাটেই থাকি৷’
ভোলা বললে, ‘আমি তাহলে আমার লাইনে চলে যাই৷’
জগদীশ বললেন, ‘কোথায় যাবি? আমরা সবাই মিলে আজ একটা জায়গায় যাব৷ ভোলা, দেখি তো তোর কেমন ক্ষমতা, একটা ট্যাক্সি ধরে আন তো৷’
গোপালচন্দ্র বললেন, ‘ভোলা পারে না এমন কাজ নেই৷ পুলিশের সঙ্গে চোর চোর খেলে৷’
শাস্ত্রীমশাই বললেন, ‘কী পাগলামি করবে?’
‘করা হলেই বুঝতে পারবেন৷ আজ এই তরুণটির, যাঃ, নামটাই তো জানা হয়নি৷’
‘শ্যামল৷’
‘শ্যামল, শ্যামলের নতুন পৈতে হবে৷ যেটা পরে আছে, সেটা দূষিত হয়ে গেছে৷ কোথায় হবে? দেখা যাক কোথায় হয়!’
শাস্ত্রীমশাই বললেন, ‘পড়েছি এক পাগলের পাল্লায়৷ কোথায় নিয়ে গিয়ে তুলবে ওই জানে৷’
শ্যামনগর৷ বিশাল এক বাগান৷ ফল, ফুল৷ মাঝখানে সুন্দর একটি বাড়ি৷ কুড়ি-পঁচিশটা আম গাছ৷ পাকা-পাকা আম ঝুলছে৷ শাস্ত্রীমশাই বললেন, ‘বাঃ, ভারি সুন্দর৷’ গাড়ির শব্দে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে গেট খুলে দিল৷ জগদীশ বললেন, ‘আমার মেয়ে মৌ, বেথুনে পড়ে৷ মৌ, দেখ, আমরা অনেকে এসেছি৷ শাস্ত্রী জেঠুকে তুই চিনিস৷ এই হ্যান্ডসামের নাম শ্যামল, প্রেসিডেন্সি, আর এই হল ভোলানাথ, কলকাতার জমিদার৷’
ভোলা বললে, ‘দিদিটাকে আমি দেখেছি৷’
‘কোথায় দেখেছিস?’
‘সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেলে, বীণা হাতে, রাজ হাঁসের পাশে৷’
শাস্ত্রীমশাই বললেন, ‘এ ছেলেটা যে কোথায় গিয়ে থামবে?’
ভোলা গেল বাগানের পুকুরে চান করতে৷ জগদীশের একটি ছেলে ছিল৷ এই ভোলার মতো বয়সেই টাইফাইয়েডে মারা গেল৷ এই বাড়ির সর্বত্র তার স্মৃতি৷ বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে একটা কিছু হতো৷ কাঞ্চনের প্যান্ট-জামা পরে ভোলা সামনে এসে দাঁড়াল৷ ধুলো, ময়লা সব ধুয়ে গেছে৷ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ৷ এক মাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল৷ ভোলা বললে, ‘যাওয়ার আগে এগুলো খুলে, কেচে রেখে যাব, ততক্ষণে আমার প্যান্ট-গেঞ্জি শুকিয়ে যাবে৷’
মৌ গালে একটা চড় মেরে বললে, ‘বড্ড পেকে গেছিস, এদ্দিন ছিলিস কোথায়?’
অনেক দিন পরে, অনেক দিন পরে, অনেক অনেকদিন পরে ভোলা কাঁদছে, ‘দিদি-দিদি।’
জগদীশের স্ত্রী সামনে দাঁড়িয়ে৷ আজ তাঁর জন্মদিন৷ জগদীশ বললেন, ‘জন্মদিনের উপহার, বেশ মিল আছে, তাই না। আমাদের ছেড়ে এতদিন ফুটপাথে পড়ে ছিল, এই যে, এই ছেলেটির জন্যে খুঁজে পেলুম৷ এর এখন পৈতে হবে৷ শাস্ত্রীমশাই পৈতে দেবেন৷’
মৌ শ্যামলের একটা হাত খপ করে চেপে ধরে বললে, ‘এই যে, আপনি কথা বলতে পারেন? সেই থেকে লেটার বক্সের মতো দাঁড়িয়ে আছেন!’ শ্যামল অনেকক্ষণ ধরে অনেক কিছুই বলছিল, কেউ শুনতে পাচ্ছিল না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন