সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বয়স্ক কণ্ঠ ও বাব্বা, কুকুর আছে যে, মরেছে৷ অলেস্টারটা তাহলে খুলে
ফেলাই ভালো৷ কুকুর আবার অলেস্টার সহ্য করতে পারে না৷
সেবার দেরাদুনের রাস্তায় কী কেলেঙ্কারি হয়েছিল৷ তিনটে তাগড়া
কুকুর কিছুতেই পিছু ছাড়ে না৷ মাঙ্কিক্যাপটা কী করব? খুলে
ফেলব, না থাকবে! ক’টা বাজল দেখি! দুটো বেজে পাঁচ—৷ সে
কী রে বাবা! এই তো সবে ভোর হল৷ টেনে বসে-বসেই তো
সূর্যোদয় দেখলুম৷ এরইমধ্যে দুটো পাঁচ৷
[ দরজা খোলার শব্দ৷ জোরে কুকুরের ডাক ]
শান্ত হও৷ শান্ত হও বৎস৷ অত উত্তেজনা ভালো নয়৷
নারী কণ্ঠ কাকে চাই?
বঃ কণ্ঠ তুমি কে?
নাঃ কণ্ঠ আমি কাজ করি৷
বঃ কণ্ঠ আই সি, এমপ্লয়ি! ইউনিয়ান করো?
নাঃ কণ্ঠ মুখ্যু মানুষ৷ ইংরেজি জানি না বাবা৷
বঃ কণ্ঠ ধম্মঘট করো?
নাঃ কণ্ঠ আজ্ঞে না৷ আপনি কি পুলিশের লোক?
বঃ কণ্ঠ আজ্ঞে না৷ আমি মিলিটারি ম্যান৷ মনোরমা কোথায়?
নাঃ কণ্ঠ মা বাথরুমে৷
বঃ কণ্ঠ মার স্বামী কোথায়?
নাঃ কণ্ঠ বাজারে৷
বঃ কণ্ঠ লেড়কা-লেড়কিরা কোথায়?
নাঃ কণ্ঠ বিছানায়৷
বঃ কণ্ঠ বিছানায়? কান পাকাড়কে আভি উতার দেও৷ দুটো পাঁচ বেজে
গেল৷ আভিতক লেটকে পড়ে থাকা হায়৷ মামার বাড়ি পা গিয়া৷
নাঃ কণ্ঠ দুটো পাঁচ কি বলছেন গো বাবু? এই তো সবে আটটা বাজল৷
মনোরমা কে গো শঙ্করীর মা?
শঙ্করীর মা বুড়ো মতো একটা লোক৷ মাথায় হনুমান টুপি৷ বলছেন মিলিটারি৷
মনোরমা ওমা, দাদা তুমি! কখন এলে?
দাদা দুটো পাঁচে—৷ রাত কি দিন বলতে পারব না, ঘড়িতে লেখা থাকে না৷
মনোরমা এই তো সবে আটটা বাজল গো দাদা৷ বাজনা শুনে বাথরুমে
গেলুম৷ ভেতরে এসো, ভেতরে এসো৷
দাদা নো নেভার৷ কুকুর থেকে আমি দূরে থাকতে চাই৷ দে আর
ডেঞ্জারাস৷ কামড়ালেই পেটে ইঞ্জেকশন৷
মনোরমা দাদা, এই তুমি মিলিটারি ম্যান! কুকুরের ভয়ে কাবু! সারা জীবন
তাহলে কী লড়াই করলে?
দাদা মেয়েদের মতো বোকা-বোকা কথা বলিসনি তো৷ আমি কি তোর
বাড়িতে এতদিন পরে কুকুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এলুম? কী যে
বলিস মনা?
মনোরমা তুমি নির্ভয়ে ভেতরে এসো৷ কুকুর বাঁধা আছে৷
দাদা কীরকম বাঁধা? খুলে বেরিয়ে আসবে না তো? ডাক শুনে মনে
হচ্ছে মানুষ-খেকো কুকুর৷
মনোরমা মোটা চেন দিয়ে জম্পেশ করে বাঁধা আছে!
দাদা ভেরি ওয়েল৷ আমাদের আর্মিতে কী বলে জানিস?
সাবধানের মার নেই৷
মনোরমা আমাদের শাস্ত্র কী বলে জানো? মারের সাবধান নেই৷ রাখে
কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে৷
দাদা সদরে চৌকাঠ করিসনি কেন? বাইরে থেকে সাপ-খোপ ঢুকতে
পারে!
মনোরমা আজকালকার হাল ফ্যাশানের বাড়িতে চৌকাঠ থাকে না দাদা৷
দাদা বড় ভয়ংকর কথা! জীবন নিয়ে খেলা৷
মনোরমা সুটকেসটা হাত থেকে নামাও৷ কী আশ্চর্য, তুমি কি দাঁড়িয়ে
থাকবে সারাদিন!
দাদা বসব কিরে! ফার্স্ট আমার একটা বাথরুম চাই এক বালতি গরম
জল চাই৷ এক শিশি disinfectant চাই৷ একটা ভালো সাবানচাই,
একটা স্পঞ্জ চাই এবং একঘণ্টা সময় চাই৷ তারপর তুই আমাকে
বসার অনুরোধ করবি৷ হ্যাঁ, বিফোর দ্যাট এক গেলাস ভেরি
ওয়ার্ম—ভেরি ওয়ার্ম চা চাই৷
মনোরমা চা আমি এখুনি সাপ্লাই করছি৷ বাথরুম তোমার চোখের সামনে৷
তোমার যা চাই সব ওখানে আছে৷
দাদা এইবার আমার গোটাকতক প্রশ্ন আছে—৷
মনোরমা করে ফেলো৷
দাদা তুই দরজা না খুলে তোমার কাজের লোক কেন দরজা খুলল!
তার মানে আমার আসার জন্যে তোমরা প্রস্তুত ছিলে না৷ কেন
ছিলে না? why? ক্যা হাম অচানক আ গিয়া? অ্যাম আই
আনওয়ান্টেড? রিপ্লাই৷ জবাব লাগাও৷
মনোরমা ও মা! তুমি যে আজই আসবে জানব কী করে দাদা?
দাদা হোয়াই? তোকে আমি চিঠি দিয়ে জানিয়েছি৷ দিইনি?
মনোরমা হ্যাঁ দিয়েছ, তবে চিঠি নয়, একটা প্রেসক্রিপশন৷ ওপরে ছাপমারা
দেরাদুন মিলিটারি হসপিট্যাল৷ সেইটুকুই পড়া যায়৷ বাকিটা ডাক্তারেই
পড়তে পারে৷ মানুষের কম্ম নয়৷
দাদা সে কীরে? চিঠিটা তাহলে কাকে পাঠালুম! সর্বনাশ করেছে, সেটা
তাহলে প্রেসক্রিপশন ভেবে ছুটির দরখাস্তের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছি৷
আমি চললুম৷
মনোরমা সে কী কোথায় চললে?
দাদা দেরাদুনে৷ দরখাস্ত থেকে চিঠিটা খুলে প্রেসক্রিপশনটা লাগিয়ে
দিয়ে আসি৷ তা না হলে আমার কোর্ট মার্শাল হয়ে যাবে৷
(দরজা খোলার শব্দ)
মনোরমা-স্বামী কি ব্যাপার, শশাঙ্কদা যে৷ কখন এলেন?
শশাঙ্কদা তোমাদের ঘড়ি অনুসারে আটটার সময়৷ আমার ঘড়ি অনুসারে
দুটো বেজে পাঁচে৷ আচ্ছা তাহলে চলি৷
মনোরমা-স্বামী চলি মানে? কোথায় যাবেন?
শশাঙ্ক দেরাদুনে সব গোলমাল করে ফেলেছি ভাই৷ ছুটির দরখাস্তের
সঙ্গে যে প্রেসক্রিপশনটা অ্যাটাচ করার কথা ছিল সেটা মনোকে
পাঠিয়ে দিয়েছি৷ আর মনোকে লেখা চিঠিটা দরখাস্তের সঙ্গে পিন
আপ করে কর্নেল মোরোর টেবিলে রেখে এসেছি৷
মনোরমা-স্বামী তা কী করে হয়? আপনি তো ছুটি মঞ্জুর করিয়ে এসেছেন?
তা না-হলে এলেন কী করে!
শশাঙ্ক হ্যাঁ, তাও তো ঠিক (হাসি)৷ ওরা তো আমাকে বললে—একমাস
ছুটি মঞ্জুর করা হল৷ সে চিঠিটা তো আমার সঙ্গেই রয়েছে৷
ভাগ্যিস বললে উদয়ন৷ তা না হলে আবার আমাকে কলকাতা
থেকে দেরাদুন ছুটতে হতো৷ গড সেভ দ্য কিং৷ আচ্ছা, তাহলে
আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দে মনোরমা৷ তোর ছেলেমেয়েরা
এত বেলা পর্যন্ত বিছানায় পড়ে আছে কেন?
উদয়ন টিভি৷ টিভি হেড-এক৷ কাল টিভি-তে ফিল্ম ছিল সেই ছবিতেই
কাত৷
শশাঙ্ক সে কী উদয়ন? তোমার মতো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কী বলে টিভি
ঢোকালে? পড়ুয়াদের সর্বনাশ!
উদয়ন আমি ঢোকাইনি দাদা৷ আপনার বোন আমদানি করেছে৷
শশাঙ্ক না-না মনোরমা, ওসব আমি অ্যালাউ করব না৷ আজই ওটাকে
আমি অকেজো করে দোবো৷ মেজর শশাঙ্ক ওসব বরদাস্ত করবে
না৷
মনোরমা দাদা৷ বরং কন্ট্রোল করে দিও৷
শশাঙ্ক আমি বাথরুমে ঢুকছি৷ ও দুটোকে ঠেলে তোল৷ তারপর আমি
এসে দেখছি৷ এ বাড়িতে আর্মি ডিসিপ্লিন চালু করতে হবে৷ এত
ঢিলে-ঢালা চলবে না বাপু৷
মনোরমার ছেলে কে এসেছেন মা?
বোধয়ন
মনোরমা তোমার মামা এসেছেন৷ বড় মামা৷ সেই যাঁর গল্প তোমাদের
করতুম৷ মিলিটারি মামা৷ ছ’ফুট লম্বা, ইয়া বড়-বড় গোঁফ৷ তোমাদের
ওপর ভীষণ রেগে গেছেন৷
সোমা দাদা, দাদা দেখবি আয় কী বিরাট জুতো!
মনোরমা জুতো দেখা বেরোবে৷ মানুষটা বাথরুম থেকে বেরোক, তারপর
তোমাদের মজা বেরোবে৷ বেলা ন’টা অবদি পড়ে-পড়ে ঘুম৷
বোধয়ন সোমা, মামার সুটকেসটা দেখেছিস? তোকে শুইয়ে রাখা যায়
ওর ভেতর৷
মনোরমা তোমরা রেডি হয়ে খাবার টেবিলে চলে যাও৷ মামা এসে তোমাদের
ধরবেন৷
সোমা কী ধরবেন মা? পড়া?
বোধয়ন পড়া ধরবেন কেন রে বোকা৷ উনি কি মাস্টারমশাই?
মনোরমা তোমাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করবেন৷ হ্যান্ডশেক করবেন৷
শশাঙ্ক অ্যাবাউট টার্ন৷ হল না, হল না৷
মনোরমা কী করে হবে দাদা? তুমি যা জোরে চিৎকার করলে!
শশাঙ্ক অ্যাবাউট টার্ন কি আস্তে ফিসফিস করে বলে? ইংরেজিতে বলে
শাউট ইওর অর্ডারস৷ তাও তো আমি গলা অনেক খাটো করে
বলছি৷
মনোরমা কই, তোমরা নমস্কার করো৷ প্রণাম করো৷
শশাঙ্ক না-না প্রণাম নয়৷ হাত মেলাও, শেক হ্যান্ডস৷ বাঃ, তোর ছেলেটার
হাতের গ্রিপ তো বেশ ভালো৷ এ হাতে রাইফেল বেশ ভালো
জমবে৷ কী নাম রেখেছিস?
মনোরমা বোধয়ন (কাশি), মেয়ের নাম সোমা৷
শশাঙ্ক বোধয়ন৷ ইংরেজিতে নাম লিখতে গিয়ে চেত্তা খেয়ে পড়ে যাবে
যে রে৷ এঃ৷ ছেলেটাকে নামের ফাঁদে ফেলে দিয়েছিস রে৷
হাঁপানির রুগি তো এ নাম ধরে ডাকতেও পারবে না৷
মনোরমা আধুনিক নাম এইরকমই হয় দাদা৷ ওর বাবা নাম রাখার বই
দেখে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছে৷ ডাক-নাম বুড়ো৷
শশাঙ্ক বাঃ, এই নামটা বেশ হ্যান্ডি৷
মনোরমা নাও চলো৷ ব্রেকফাস্ট তৈরি৷
শশাঙ্ক ব্রেকফাস্ট? দাঁড়া-দাঁড়া, তার আগে আমাদের অনেক কাজ বাকি৷
প্রথমে চেক আপ৷ সোম আর বুধ এদিকে এসো৷ ফলো ইন৷
সোমা ফলো ইন মানে কী মামা?
শশাঙ্ক তোমরা দুজনে পাশাপাশি আমার সামনে সোজা হয়ে পা-জোড়া
করে দাঁড়াও৷ মনা তুইও দাঁড়াতে পারিস৷ উদয়ন কোথায়? সেও
দাঁড়াতে পারে৷ ডাক তাকে৷ এই একমাসে তোদের স্বভাব আমি
পালটে দোব৷ বিলকুল চেঞ্জ করে দোব৷ সবক’টাকে আমি কর্নেল
বিশ্বাস বানিয়ে ছেড়ে দোব৷
বোধয়ন কর্নেল বিশ্বাস কে মামা?
শশাঙ্ক বাঙালি বীর৷ বাঘের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করেছিলেন৷
সোমা মল্লযুদ্ধ কী মামা?
শশাঙ্ক কুস্তি৷ কুস্তি লড়েছিলেন৷
মনোরমা যাঃ, তুমি সব ভুল বলছ৷ কর্নেল বিশ্বাস ছিলেন ভূপর্যটক৷
শশাঙ্ক এইরে, তাই নাকি? তাহলে বাঘ মেরেছিল কোন বাঙালি? তুই
ঠিক জানিস?
মনোরমা কি জানি বাবা৷ আমার তো তাই মনে হচ্ছে৷
শশাঙ্ক ঠিক আছে৷ সন্দেহ হচ্ছে যখন ওটা ছেড়ে দাও৷ আরও বাঙালি
আছে৷ আশানন্দ ঢেঁকিকে ধর৷ জেনারেল চৌধুরীকে ধর৷ নেতাজীকে
ধর৷ স্বামীজিকে ধর৷ উদয়নটা আবার গেল কোথায়?
মনোরমা সে আবার বাজারে গেছে৷
শশাঙ্ক ওর ভুঁড়িটাকেও কমিয়ে দিয়ে যেতে হবে৷ এই বয়েসে অত বড়
পেট! আরে, ছি-ছি! তুই একটু নজর রাখিস না মনা৷ আচ্ছা
এইবার চেক আপ৷ দেখি দাঁত দেখি৷ তোমরা সকলে ঈ কর৷
মনা কর৷ আরে, দাঁত খিঁচো না৷ হ্যাঁ-হ্যাঁ, জাস্ট লাইক দ্যাট৷
মনোরমা৷ তোর দাঁতের অবস্থা ভেরি ব্যাড৷ ভেরি ভেরি ব্যাড৷
ওয়ার্স্ট৷ তুই দাঁত থাকতেও দাঁতের মর্যাদা বুঝিসনি৷ এই দাঁত
থেকেই বাত আসবে৷
মনোরমা আসবে কি দাদা এসে গেছে৷
শশাঙ্ক ছি-ছি, তুই আমার বোন হয়ে আমাদের বংশের মুখ ডোবালি৷
বাবা আমাদের আটাত্তর বছর বয়েসেও দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে-ছাড়িয়ে
আস্ত একটা আখ খেতেন৷ কিসের জোরে? দাঁতনের জোরে৷ নিম
দাঁতন৷
মনোরমা এখানে দাঁতন পাচ্ছি কোথায়?
শশাঙ্ক বুড়ো, তোমার দাঁত ভালো পরিষ্কার হয়নি৷ তোমার দাঁতও মার
লাইনে যাচ্ছে৷ বি কেয়ারফুল৷ বেশি মিষ্টি খাচ্ছ৷ আজ থেকে নো
সুইটস৷ খাওয়ার পরই দাঁত মাজার অভ্যেস করবে৷ মনে রাখবে
ওয়ার্লডে হাতি তার দাঁতের জন্যেই বিখ্যাত৷ মিলিটারিতে বলে
টাস্ক ফোর্স৷ টাস্ক মানে হাতির দাঁত৷ সোমা তোমার দাঁত এখনও
ভালো আছে৷ বেস্ট অফ দ্য লট৷
উদয়ন একি তোমরা সব দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
শশাঙ্ক দেখি তোমার দাঁত৷ শো মি ইওর টিথ৷
উদয়ন দাদা আমার সে গুড়ে বালি৷ দু-পাটিই ফলস৷
শশাঙ্ক ও তুমি তাহলে ফোকলা দিগম্বর৷ বয়েজ, লেট আস গো৷
মনোরমা এখন কোথায় যাবে?
শশাঙ্ক খোলা জায়গায়৷ সামান্য ব্যায়াম৷ ব্যায়াম ছাড়া কারুর আহারের
অধিকার থাকে না৷ উদয়ন তোমার ল্যাঙোট আছে তো?
উদয়ন ল্যাঙোট?
শশাঙ্ক হ্যাঁ-হ্যাঁ লেঙোটি৷
উদয়ন ল্যাঙোট কী হবে দাদা?
শশাঙ্ক তোমার ভুঁড়ি কমাব৷ তোমাকেও ব্যায়াম করতে হবে৷ দুদিনে
তোমার শরীরের বাড়তি মেদ কমিয়ে দোবো৷ ওই কি একটা
শরীর! গোলগাপ্পা৷
উদয়ন এই বয়েসে আমি করব একসাইজ! অ্যাম আই ম্যাড—?
শশাঙ্ক সেই নীতিবাক্যটি স্মরণ করো উদয়ন, আপনি আচরি ধর্ম৷ নিজেকে
ঠিক না করলে তুমি এদের ঠিক করবে কীভাবে! যাও-যাও
ল্যাঙোট না থাকে, জাঙিয়া পরে এসো৷
মনোরমা দাদা সাহস করে একটা কথা বলব?
শশাঙ্ক বল!
মনোরমা আজ ওসব থাক৷ তুমিও ট্রেনে এলে এতটা পথ, আজ রেস্ট
নাও৷ কাল থেকে সব হবে৷
শশাঙ্ক কাল? কাল-কাল করে কালক্ষেপে পৃথিবীর কত মহৎ প্রচেষ্টা
বানচাল হয়ে গেছে? জীবন থেকে একটা দিন চলে গেলে তুই
ফিরিয়ে দিতে পারবি? নো কাল৷ আজ থেকেই শুরু হবে৷
মনোরমা এসব ভোরবেলা করতে হয় দাদা৷ আজ অনেক বেলা হয়ে গেছে৷
শশাঙ্ক ভোর! তোদের ভোরই তো হয় সকাল ন’টায়? পড়েই এলি সূর্য
পূর্ব দিকে ওঠে৷ জীবনে সূর্যোদয় আর দেখতে হল না৷ (হাসি)
হাও ফানি! হাও ফানি!
মনোরমা ঠিক আছে দাদা৷ কাল থেকে ভোর-ভোরই হবে৷
শশাঙ্ক অলরাইট৷ তোদের কথায় আর একটা দিনও ডাস্টবিনে গেল৷ কী
আর করা যাবে বল৷ অভ্যাস৷ হ্যাবিট৷ সহজে কি তাড়ানো যায়?
Habit সবচেয়ে বড় ক্রিমিন্যাল৷ বয়েজ, ফল আউট৷
বোধয়ন, সোমা হো-ও-ও....
শশাঙ্ক হোয়াট ইজ দিস? চিৎকার করছ কেন৷ হঠাৎ এই উল্লাসের কারণ?
মনোরমা ওরা মাঝে-মাঝেই এইরকম চিৎকার করে দাদা৷ ছোট তো! ছোটরা
একটু চেঁচাবেই৷
শশাঙ্ক তা বলে যখন-তখন চেঁচাবে? আমি চেঁচাবার অর্ডার দিয়েছি?
আমি কি বলেছি ফল—আউট৷ আর্মি হলে এই ইনডিসিপ্লিনের
জন্যে ব্রেকফাস্ট বন্ধ হয়ে যেত৷ ইস্-স্-স্৷ টেবিল ক্লথটা কী
অপরিষ্কার, জায়গায়-জায়গায় হলুদের ছোপ৷ কে যেন হাত মুছেছে৷
মোস্ট ইনডিসেন্ট!
উদয়ন আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন দাদা৷ যে-কোনও সংসারেই ওরকম
একটু-আধটু দাগ পাবেন৷ ওসব উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ৷
শশাঙ্ক টাইম টেবল আছে?
মনোরমা টাইম টেবল কী হবে দাদা?
শশাঙ্ক আজই চলে যাব৷ তোদের সঙ্গে আমার মিলবে না রে৷ অশান্তি
হয়ে যাবে৷
মনোরমা তুমি একটু ধৈর্য ধরে দেখোই না৷ কাল থেকে সব তোমার মনের
মতো হয়ে যাবে৷
শশাঙ্ক ওকি, ওকি? ওই ফুলো-ফুলো জিনিসগুলো কী আসছে!
উদয়ন লুচি৷ লুচি আপনি দেখেননি?
শশাঙ্ক অ্যাঁ! লুচি? তোমরা লুচি খাও! বিষ৷ এ কাইন্ড অফ পয়েজন৷
গুড লর্ড! শিশু হত্যার পরিকল্পনা!
বোধয়ন আমি লুচি আর আলুভাজা খেতে ভীষণ ভালোবাসি৷
সোমা আমি চাটনি আর চানাচুর৷
উদয়ন আমি কাবাব আর পরোটা৷
মনোরমা আমি মোগলাই পরোটা আর কষা মাংস৷
শশাঙ্ক তোদের ইকমিক কুকার আছে? এই একমাস নিজের রান্না আমি
নিজে করে নেব৷ খাদ্যহীন খাদ্য আমি খেতে পারব না৷ এসব
লুচি-ফুচি সরিয়ে নে৷ আমাকে প্লেন অ্যান্ড সিম্পল এক কাপ চা
দে৷
সোমা লুচি খেলে কী হয় মামা?
শশাঙ্ক স্বামী বিবেকানন্দের নাম শুনেছিস?
সোমা হ্যাঁ৷
শশাঙ্ক তিনি বলে গেছেন, বাঙালি লুচি আর পরোটা খেয়ে-খেয়েই
পরকালটা খাবে৷ গান্ধীজি বলে গেছেন, চিনি হল হোয়াইট পয়েজন৷
এসব কুখাদ্য৷ খেতে-খেতে এত বড় একটা লিভার হবে৷ অজীর্ণ,
অম্বল, ইয়া ভুঁড়ি, ঢ্যাবঢ্যাবে অকর্মণ্য শরীর৷ বাত, ন্যাবা অম্লশূল,
পিত্তশূল৷
মনোরমা লুচি ছুটির দিনেই হয় দাদা৷ অন্যদিন পাউরুটি, মাখন, জেলি৷
শশাঙ্ক ফল ঢোকে বাড়িতে? না! সে সবের পাট নেই৷ সকালে ফল
হল সোনা৷ একটা করে আপেল, কমলা, কলা, পেয়ারা৷ এক
গেলাস দুধ—৷ বয়েলড ভেজিটেবলস, হাফ-বয়েলড ডিম, মধু,
খেজুর, সোয়াবিন, কিসমিস৷ না ওসব মুখে রুচবে না৷
সোমা দুধ রুগির খাদ্য৷
বোধয়ন সোয়াবিন রিয়েল অখাদ্য৷
উদয়ন খাওয়াটা দাদা আপরুচি৷ অত পথ্য অপথ্য খাদ্যগুণ মেনে খেতে
গেলে ওষুধ খাওয়াই ভালো৷
শশাঙ্ক ইয়েস, এই হল শিক্ষিত মানুষের ধরন৷ জ্ঞান পাপী৷ তাল কানা৷
মুখ্যুর মুখ্যু৷ শেম শেম৷
উদয়ন যাই৷ আয়৷ আয়৷
বহিরাগত বুঝলে কড়কড়ে বিলিতি তাস৷ ছেড়ে দিলে সবক’টা সড়াক করে
পিছলে যাবে৷
কী পালিশ!
উদয়ন ওরা কোথায়?
বহিরাগত সব আসছে৷ সব আসছে—
উদয়ন বস, আমি আসছি—
শশাঙ্ক কী ব্যাপার? কারা এল?
মনোরমা তাসপার্টি, এইবার বেলা দুটো পর্যন্ত হইচই চলবে৷
সোমা মাঝে-মাঝে দাঙ্গাও বেধে যায়৷
উদয়ন তাস আর দাবাতে একটু দাঙ্গা হাঙ্গামা হবেই৷ তা না হলে ঠিক
জমে না৷
শশাঙ্ক আই সি৷
মনোরমা তুমি তাস খেলতে বসছ কিন্তু আজ দুটোর মধ্যে খাওয়াদাওয়ার
পাট চুকোতে হবে৷ আমার সিনেমার টিকিট কাটা আছে৷
উদয়ন সিনেমা-সিনেমা আর সিনেমা৷ টিভিতে সিনেমা, সিনেমায় সিনেমা৷
বোধয়ন তুমি বেশ আছ মা৷ রবিবার হলেই তোমার সিনেমা৷
সোমা চল দাদা, আমরাও আজ যাব৷
বোধয়ন দাঁড়া না, আর একটু বড় হই!
মনোরমা (শাসনের গলায়) ছোটরা ছোটদের মতো থাকবি৷ বড়দের কাজের
সমালোচনা করতে আসবি না৷
শশাঙ্ক আই সি৷
বোধয়ন বাবা, তুমি রেডিয়োর ব্যাটারি এনেছ?
উদয়ন এই যাঃ, ভুলে গেছি রে৷ দু-দুবার বাজার গেলুম৷ ইস একদম
মনে ছিল না৷
বোধয়ন বাঃ কি করে রিলে শুনব৷ আমি তাহলে সারাদিন আজ পার্থদের
বাড়িতে থাকব৷
মনোরমা না! পরের বাড়িতে রিলে শুনতে যেতে হবে না৷
বোধয়ন তাহলে ব্যাটারি আনিয়ে দাও৷
মনোরমা ক্রিকেটের কী বুঝিস তুই? কাল ইস্কুল আছে৷ আজ সব টাস্ক
বসে-বসে তৈরি কর৷ একদিন রিলে না শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ
হয়ে যাবে না৷
বোধয়ন তোমাকেও তাহলে সিনেমা দেখতে যেতে দেব না৷
মনোরমা (ধমকের সুরে) বুড়ো৷
বোধয়ন (একইরকম সুরে) কী!
মনোরমা বাপের আদরে বাঁদর তৈরি হচ্ছে৷
উদয়ন এর মধ্যে আবার বাপকে ধরে টানাটানি কেন? ঠিক আছে, আমি
শঙ্করীর মাকে দিয়ে ব্যাটারি আনিয়ে দিচ্ছি৷
মনোরমা (ব্যাজার গলায়) হ্যাঁ, তাই দাও৷ তবু ছেলেকে একটু শাসন করবে
না৷
শশাঙ্ক আই সি৷
সোমা নাও, সকালেই ঝগড়া শুরু হল৷ আঃ, শান্তি নেই৷ দাদা, তুই
চুপ কর না বাপু৷
বোধয়ন পাকামো করিসনি সোমা৷ মার আদরে বাঁদর তৈরি হচ্ছে৷
সোমা বাঁদর নয়রে বোকা, বাঁদরি৷
শশাঙ্ক আই সি!
বোধয়ন বাবা, আজ তুমি মুরগি এনেছ?
উদয়ন না রে, আজ পাঁঠা—
বোধয়ন এঃ, রোববারটাই মাটি করে দিলে৷
শশাঙ্ক আই সি৷
মনোরমা তোমাদের ভীষণ নবাবি অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে৷ এই খাই না, সেই
খাই না৷
উদয়ন কী যে বলো না? ওদের তো এখন খাবারই বয়েস৷ তাজা লিভার
কী বলেন দাদা?
শশাঙ্ক আই সি৷
মনোরমা কী দাদা? তখন থেকে তুমি আই সি, আই সি করে যাচ্ছ৷
শশাঙ্ক আই সি৷
সোমা মা, আই সি মানে তো আমি দেখি, তাই না?
বোধয়ন হ্যাঁ রে সোমা৷ মামা, ওই একটা ইংরেজিই জানেন৷
উদয়ন তুমি তাহলে বাইরের ঘরে চার-পাঁচ কাপ চা পাঠিয়ে দিও৷
(চেয়ার সরানোর শব্দ)
শশাঙ্ক আমি তাহলে বাগানের দিকের বারান্দায় ইজিচেয়ারে একটু বসি৷
ভালো বই-টই কিছু আছে?
বোধয়ন ডিটেকটিভ বই পড়বেন মামা, থ্রিলার কমিকস!
শশাঙ্ক কেন, অন্য কোনও বই নেই? রামায়ণ আছে রে?
মনোরমা না দাদা৷
বোধয়ন আমার কাছে ছোটদের ইংরেজি রামায়ণ আছে৷ পড়বেন?
শশাঙ্ক মহাভারত আছে রে?
মনোরমা না দাদা—
শশাঙ্ক গীতা আছে?
মনোরমা একটা পকেট সাইজ আছে৷
শশাঙ্ক ভালো কোনও জীবনী আছে?
সোমা ফিল্ম ম্যাগাজিন পড়বেন মামা?
শশাঙ্ক আই সি৷ তাহলে আজকের কাগজটাই দে৷
বোধয়ন মামা, আমি আগে খেলার পাতাটা একটু দেখেনি, প্লিজ!
শশাঙ্ক বেশ! তোমার দেখা হয়ে গেলে আমাকে দিয়ে এসো৷
বোধয়ন আয়-আয় শ্যামল আয়, পার্থ কোথায় রে?
শ্যামল ওই তো আসছে৷ ওর বাবা ওকে একটা বাইক কিনে দিয়েছে৷
বোধয়ন আয় না ভেতরে আয়৷
শ্যামল কী চাপিয়েছিস রেকর্ড প্লেয়ারে! আমার তো নাচতে ইচ্ছে করছে৷
বোধয়ন নাচ না! এটা তো নাচেরই মিউজিক৷
পার্থ বোধয়ন—তোর কাছে কাটায় লাগাবার কোনও ওষুধ আছে রে!
তিনবার আছাড় খেলুম৷
বোধয়ন ভেতরে আয় না৷ দিচ্ছি লাগিয়ে৷
পার্থ কী বাজাচ্ছিস? একটা সিনেমার গান লাগা না৷
বোধয়ন লাগাচ্ছি, লাগাচ্ছি তুই বস না—
পার্থ বেশিক্ষণ বসব না রে৷ সেলুনে চুল কাটতে যাব৷ দাদুটা ভীষণ
ফ্যাচ-ফ্যাচ করছে৷ বুড়োটা বড় চুল দেখতে পারে না৷
বোধয়ন আমার মিলিটারি মামা এসেছে রে৷ মাথার চুল দেখলে তোদের
হাসি পাবে৷ এইটুকু-এইটুকু করে ছাঁটা৷ তেমনি মেজাজ৷ কাল
থেকে আমাদের পিটি করাবে৷ ভোরবেলা বিছানা থেকে টেনে
তুলবে! কোনওদিন আমার চুলগুলোও কপচে দেবে রে৷
শ্যামল তোর খুব বিপদ রে বোধয়ন৷
বোধয়ন তেমনি মিলিটারি মেজাজ৷ ইয়া লম্বা৷ ইয়া গোঁফ!
পার্থ ছোটদের জীবনে কোনও সুখ নেই রে৷ তোর যেমন মামা, আমার
তেমনি দাদু৷ শ্যামল তোর কে রে?
শ্যামল আমার সব ক্লিয়ার! আমি তো মামার বাড়িতেই পড়ে আছি৷
আমার বাবা তো মারা গেছেন ভাই৷ আমাকে কে আর শাসন
করবে বল? মা কেবল মাঝে-মাঝে দুঃখু করে বলে, ভালো
করে লেখাপড়া কর খোকা৷
পার্থ তুই তো লেখাপড়ায় ভালোই রে ভাই৷ অঙ্কে তুই তো একশোর
মধ্যে একশো পাস!
শ্যামল আমি যে তেমনি ইংরেজিতে কাঁচা৷ তোরা সব ইংলিশ মিডিয়ামে
পড়িস, আমাকে কে পড়াবে বল! তোদের সকলের টিউটর আছে,
আমার কে আছে বল!
শশাঙ্ক তোমার ভগবানে আর বিশ্বাস আছে শ্যামল৷
বোধয়ন মামা আপনি? এই তো দেখলুম আপনি রোদে বসে আছেন৷
শশাঙ্ক তুমি আমার পা-দুটো বোধহয় দেখোনি৷ মানে, যে পায়ে মানুষ
দেহটাকে খাড়া রাখে, চলে বেড়ায়৷ আমি তো উদ্ভিদ নই, যে
এক জায়গায় গজিয়ে থাকব৷ (শ্যামল বোধয়নের মামাকে গিয়ে
প্রণাম করে) আরে থাক থাক৷ তুমি দীর্ঘজীবী হও শ্যামল৷ তোমার
এখনও সাবেক অভ্যেসটা আছে দেখছি৷ আধুনিক ছেলেরা তো
কেউ মাথা নিচু করে না৷ তারা তো জন্মেই মিলিটারি৷
শ্যামল আমার মা যে বলে দিয়েছেন গুরুজনদের প্রণাম করে মাথা
পেতে আশীর্বাদ নেবে, তাতে তোমার ভালো হবে৷ রোজ সকালে
আর ঘুমোবার আগে ভগবানকে ডাকবে, বাবাকে মনে-মনে চিন্তা
করবে৷ তিনি যেখানেই থাকুন তোমার পাশে এসে দাঁড়াবেন৷
(শ্যামলের কথা শুনে বোধয়ন ও পার্থ হাসবে)
শশাঙ্ক তোমরা দুজনে হাসছ কেন?
পার্থ ও কীরকম পাকা-পাকা কথা বলছে৷ শ্যামল, তুই সেই কবিতাটা
আবৃত্তি কর৷ সকালে উঠিয়া আমি মনে-মনে বলি৷ সারাদিন আমি
যেন ভালো হয়ে চলি৷
শশাঙ্ক তোমরা বুঝি ভগবান-টগবান মানো না!
পার্থ আমার দাদা বলেন, ও সব কুসংস্কার৷ ভগবান আবার কী? কারুর
কাছে মাথা নিচু করবি না৷ সবসময় মাথা উঁচু করে চলবি৷ কেউ
কারুর চেয়ে বড় নয়৷
শশাঙ্ক তোমার দাদা কী করেন?
বোধয়ন পলিটিকস করেন৷
শশাঙ্ক আই সি! তা তোমাদের সকালবেলা পড়াশোনা নেই?
পার্থ রবিবার আবার পড়া কী৷ ছুটির বার৷
শশাঙ্ক রবিবার তাহলে কী করো?
পার্থ (মজা করে) বাবা গেছেন মাছ ধরতে৷ মা গেছেন মামার বাড়ি৷
আমরা এখন রিলে শুনব৷ হইহই করব!
শশাঙ্ক কেন, কত ভালো-ভালো বই আছে৷ ইতিহাস, ভূগোল, জীবনী,
ভ্রমণ কাহিনি, এসব পড়তে ভালো লাগে না?
পার্থ ধুস৷ ওসব বাজে৷ ভালো লাগে না মোটেই৷
শ্যামল জানেন, আমি পড়ি৷ জীবনী, ভ্রমণ কাহিনি, ইতিহাস, ভূগোল
পড়তে আমার ভীষণ ভালো লাগে৷ আমি বড় হলে সুইজারল্যান্ডে
যাব৷
পার্থ তুই গোবরডাঙায় যাবি৷
শশাঙ্ক কেন ও যেতে পারে না?
বোধয়ন কী করে যাবে! ও তো সাধারণ স্কুলে পড়ে৷ ভালো চাকরি-বাকরি
পাবে না৷ স্কুল মাস্টারি করবে৷
শশাঙ্ক তাই নাকি? কে বলেছে!
বোধয়ন বাবা বলেছে৷
শশাঙ্ক আই সি৷ তা শ্যামল, তোমার ওই রিলে শোনার বাতিক নেই?
সারাদিন কানের কাছে রেডিও খুলে বসে থাকা?
শ্যামল আমার ও সব ভালো লাগে না মামা৷ আমার বাবা বলতেন,
সব সময় নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখবি৷ কাজ না থাকলে পড়ে-
পড়ে ঘুমোবি৷ হুজুগে মাতবি না৷
পার্থ সেই কথাটাও বলে দে৷ আইডল ব্রেন ডেভিলস ওয়ার্কশপ৷ মামা,
ও কিন্তু ভালো ক্রিকেট খেলে৷ ব্যাট ধরলে আউট করা যায়
না৷ বল করলে সামনে দাঁড়ানো যায় না৷
শ্যামল না মামা, ও বাড়িয়ে-বাড়িয়ে বলছে৷ আমাকে কেউ খেলতে
শেখায়নি৷
শশাঙ্ক তবে তুমি ভালো খেলো কী করে?
শ্যামল আমার কীরকম একটা রোখ চেপে যায়৷ মনে হয় কিছুতেই হারব
না৷
শশাঙ্ক গুড, ভেরি গুড৷ তোমার হবে ভাগনে৷ তুমি জীবনে অনেক বড়
হবে৷
শ্যামল আমি এখন আসি৷ বাড়ি গিয়ে জামাকাপড় কাচতে হবে৷
শশাঙ্ক তুমি বুঝি নিজেই নিজের জামাকাপড় কাচো, বাঃ! সুন্দর অভ্যাস৷
বোধয়ন তুমিও তোমাদের টেবিল ক্লথটা কেচে ফেলো না৷
বোধয়ন না-না, ওটা তো লন্ড্রিতে যাবে৷
শশাঙ্ক তাহলে চলো, না চারিদিকে ভীষণ ঝুল হয়েছে, ঝেড়ে ফেলা
যাক৷
বোধয়ন ও তো শঙ্করীর মার কাজ৷
শশাঙ্ক তাহলে চলো বই গুছাই৷ চারিদিক বড় এলোমেলো হয়ে আছে!
বোধয়ন আমাদের তো ওই রকমই থাকে মামা৷
শশাঙ্ক আই সি! তাহলে তোমরা মজা করে গানই শোনো৷ কই, কাগজটা
তো আমাকে দিয়ে গেলে না!
বোধয়ন ভুলেই গেছি মামা৷ ওই যে সোফার ওপর রয়েছে৷
শশাঙ্ক ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক৷ সকাল থেকেই বন্ধু, বান্ধব নিয়ে ব্যস্ত
হয়ে পড়েছ৷ নিষ্ঠার বড়ই অভাব৷
(মামা চলে গেলেন)
পার্থ সত্যিই তোর মিলিটারি মামা৷ কী মেজাজ রে বাবা! ক’দিন
থাকবেন?
বোধয়ন শুনছি একমাস৷
পার্থ এই একমাস তোদের বাড়ি আর আসব না৷
(দৃশ্য পরিবর্তন৷ উদয়ন বন্ধুদের নিয়ে তাস খেলছে)
উদয়ন টু হার্টস৷ তখন থেকে হাতে কী যে তাস আসছে৷ আজ গ্রহ
লেগেছে৷ নাও কল দাও৷
(মামার প্রবেশ)
শশাঙ্ক কি হে এখনও তোমাদের চলছে!
উদয়ন আরে, দাদা যে। আসুন, আসুন৷
শশাঙ্ক অনেক বেলা হল৷ এইবার রাখো না৷
উদয়ন এই তো একটাই রবিবার দাদা৷ রোজই তো নাকে মুখে গুঁজে
সকাল ন’টার সময় দৌড়োই৷
শশাঙ্ক রবিবারটা তো আর একটু অন্যভাবেও খরচ করা যায় উদয়ন?
যেমন ধরো সপরিবার কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে গেলে৷ একটু
আউটিং হল সকলের৷
উদয়ন এ আপনি কী বলছেন? থিওরেটিক্যাল কথাবার্তা৷
উদয়নের বন্ধু এ যেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক প্রবন্ধ শুনছি৷ সারা
সপ্তাহ বাস ঠেঙিয়ে কারুর ইচ্ছে করে মশাই, রোববার লটবহর
নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে নাচতে! ওই বছরে একবার চিড়িয়াখানা৷
আর মাঝে মধ্যে বিয়ে-টিয়ের নেমন্তন্ন৷ আরে মশাই, আর বছর
খানেক পরে ওরা তো নিজেরাই হিল্লি-দিল্লি করবে৷
শশাঙ্ক বেশ, বাইরে না গেলেও বাড়িতে থেকেও তো ছেলেমেয়েদের
একটু সঙ্গ দেওয়া যায়৷ সারা সপ্তাহ দেখতে পারো না, এই
একটা দিন ওদের সঙ্গেই বই-টই নিয়ে একটু বসতে পারো তো!
উদয়ন কেন? ভালো ইস্কুলে ভরতি করে দিয়েছি, ভালো শিক্ষক রেখেছি!
আমি বই নিয়ে বসে কী করব?
শশাঙ্ক পড়ার বই ছাড়াও তো অনেক ভালো বই আছে উদয়ন৷ আজকাল
ভালো-ভালো সচিত্র শিশুপাঠ্য ভূগোল, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনি,
সাধারণ জ্ঞানের বই বেরিয়েছে৷ সেই সব বই নিয়েও তো একটু
বসা যায়, নানা দেশের গল্প বলা যায়৷ পড়ার একটা নেশা ধরিয়ে
দেওয়া যায়৷ যায় না?
উদয়নের বন্ধু নাও, নাও, টু স্পেডস৷
উদয়ন আমার অত সময় কোথায় দাদা? নো কল৷
শশাঙ্ক তা ঠিক৷ সময় কোথায়৷ সত্যিই তো সময় কোথায়!
(দৃশ্য পরিবর্তন—রাস্তার দৃশ্য)
(ঢং ঢং করে চারটে বাজল)
শশাঙ্ক বাঃ, এদের বাড়ির কাছের এই রাস্তাটা বেশ ভালো৷ পড়ন্ত বেলার
রোদ পড়েছে গাছের ফাঁক দিয়ে৷ যাই, একটু বেড়িয়ে আসি৷
শ্যামল মামা, কোথায় যাচ্ছেন?
শশাঙ্ক কে, শ্যামল? কোথায় গিয়েছিলে?
শ্যামল কেরোসিন তেল আনতে৷ বিশাল লাইন৷ দুটোর সময় লাইন দিয়ে
এই পেলুম৷
শশাঙ্ক যাই, একটু বেড়িয়ে আসি৷ তোমাদের এই রাস্তাটা ভারি সুন্দর৷
শ্যামল হ্যাঁ মামা৷ এটা সোজা গঙ্গার দিকে চলে গেছে৷ একটু দাঁড়াবেন,
আমিও তাহলে আপনার সঙ্গে যাব৷ টিনটা বাড়িতে ছুটে দিয়ে
আসি৷ বেশি দেরি হবে না৷ ওই তো আমাদের বাড়ি৷
শশাঙ্ক যাও, যাও, আমি দাঁড়াচ্ছি৷ (শ্যামল চলে গেল) ছেলেটি ভারি
মিশুকে৷ বোধয়নকে বললুম চলো না বেড়িয়ে আসি৷ কোনও
উৎসাহই দেখাল না৷ কী নিয়ে মেতে আছে তাও বুঝলাম না—
নাঃ, ছেলেটাকে ওরা নষ্ট করে ফেলল৷ আরে বাবা, ছেলে মানুষ
করা কি অত সহজ! ত্যাগ চাই, নিষ্ঠা চাই৷
শ্যামল (হাঁপাতে-হাঁপাতে শ্যামলের প্রবেশ) চলুন মামা!
শশাঙ্ক তুমি যে হাঁপাচ্ছ!
শ্যামল খুব জোর দৌড়েছি তো পনপন করে৷ ছোলা খাবেন মামা?
শশাঙ্ক কোত্থেকে পেলে?
শ্যামল মা আমার জন্যে ভিজিয়ে রেখেছিলেন৷ নিয়ে এসেছি৷
শশাঙ্ক দাও, দাও, ভিজে ছোলা অমৃত সমান৷
শ্যামল ওই দেখুন৷ গঙ্গার জল দেখা যাচ্ছে—রোদ পড়ে কীরকম চকমক
করছে দেখুন মামা৷
শশাঙ্ক একি শ্যামল, তুমি কাঁদছ কেন? তুমি কাঁদছ কেন বাবা? এসো
এই ঘাটের পৈঠেটায় কিছুক্ষণ বসি৷ তোমার হাতের ছোলাগুলো
সব রাস্তায় পড়ে গেল৷ এসো বসো৷
হঠাৎ কী মনে হল তোমার?
শ্যামল হঠাৎ আমার বাবার কথা মনে পড়ে গেল৷ এইরকম এক বিকেলে
বাবা চলে গিয়েছিলেন হঠাৎ৷ ওই তো শ্মশান৷ ওই যে ধোঁয়া
উঠছে৷ সেই দিন গঙ্গার জলে দাঁড়িয়ে আছি—চিতার ছাই নিয়ে,
আর দেখছি টলটলে জলে শেষ বেলার রোদ খেলা করছে৷
ছাইগুলো ভাসতে-ভাসতে কোথায় চলে গেল৷ জানেন মামা, বাবা
আমাকে শ্যাম বলে ডাকতেন৷ মৃত্যুর আগের দিন রাতে আমাকে
হঠাৎ কাছে ডেকে ফিসফিস করে বললেন, শ্যাম, জীবনে কখনও
ভয় পাবি না৷ ভয়ই হল মৃত্যু!
শশাঙ্ক ঠিক বলেছেন৷ আসল কথাটাই তোমাকে বলে গেছেন৷ আমাদের
শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ উপনিষদে বারে-বারে ওই একটি কথাই আছে৷ অভী!
ভয়শূন্য হও৷ পৃথিবীতে যে ক’জন মানুষ বড় হয়েছেন তাদের
সকলেরই ছিল দুর্জয় সাহস৷ তোমাকেও বড় হতে হবে শ্যামল৷
দেশে অনেক দিন তেমন সাহসী লোক জন্মাননি৷
শ্যামল কী করলে বড় হওয়া যায় মামা?
শশাঙ্ক মহাপুরুষের জীবনী পড়ে নিজের জন্যে একটা আদর্শ বেছে নাও৷
নিজেকে হারিয়ে ফেলো না৷ মিশিয়ে ফেলো না৷ সবসময় মনে
রাখবে, তুমি এখানে এসেছ কিছু একটা করে যাওয়ার জন্যে৷
স্বামীজি বলতেন, একটা দাগ রেখে যা৷ আমাদের বেঁচে থাকার
সময়টা বড় কম শ্যামল, ওই দেখ সূর্য ডুবলেই দিন শেষ৷ দিনের
কাজ তাই দিনে-দিনেই করে ফেলতে হবে৷ কাল করা যাবে বলে
কিছু ফেলে রেখো না৷
শ্যামল আমার মা বলেছেন, তুইপড় খোকা৷ যতদূর পড়া যায় তুই ততদূর
পড়ে যা৷ আমি গয়না বাঁধা দিয়ে, লোকের বাড়ি কাজ করে
টাকার ব্যবস্থা করব৷ আমার মার বড় কষ্ট৷ শীতকালে হাঁপানিটা
বেড়ে যায়৷ ভোরবেলা উঠে রাঁধতে হয়৷ সকলের মা কেমন
সুখে আছে, আমার মারই যত কষ্ট!
শশাঙ্ক তাই তো তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমি বড় হবই৷ মাকে
বলবে একটু ধৈর্য ধরো মা, আমি আসছি৷ তখন তোমার কত
সুখ৷ শ্যামল, আমাদের বড়মাও ভীষণ কষ্টে আছেন৷
শ্যামল বড় মা?
শশাঙ্ক আমাদের দেশমাতা৷
শ্যামল মাঝে-মাঝে মনে হয় আমি বেশ সন্ন্যাসী হয়ে যাই৷ গেরুয়া পরে
হাতে মস্ত একটা লাঠি নিয়ে পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই৷ ওই
দেখুন ওপারে সূর্য নেমে পড়েছে৷ মন্দিরের চুড়োটা কেমন স্পষ্ট
দেখা যাচ্ছে৷ এখন কোথাও তো দিন হচ্ছে! কী মজা!
শশাঙ্ক তুমি বাইরে সন্ন্যাসী হবে কেন৷ মনে সন্ন্যাসী হও, ত্যাগী হও,
লোভশূন্য হও, ভালোবাসতে শেখো৷ সংসারে থেকেই তো তোমাকে
সংসারের সমাজের কাজ করতে হবে৷ তোমাকে রাতেও চলতে
হবে, দিনেও চলতে হবে৷
শ্যামল মামা, ভগবান কি আছেন?
শশাঙ্ক নিশ্চয়ই আছেন! সব ভালোর মধ্যে, ‘সু’-এর মধ্যেই ভগবান৷
তোমার মধ্যে আছেন৷ আমার মধ্যে আছেন৷ সকলের মধ্যে
আছেন৷ ঘুমিয়ে আছেন! তাঁকে জাগাতে হবে৷ ভালো কাজের
মধ্যে, ভালো চিন্তার মধ্যে তিনি জেগে ওঠেন৷ তোমাকে আমি
যাওয়ার সময় কিছু ভালো বই দিয়ে যাব৷ পড়বে৷ দেখবে পৃথিবীটা
কত বিশাল৷
শ্যামল আরতি হচ্ছে৷ যাবেন মামা—মন্দিরে যাবেন?
শশাঙ্ক চলো-চলো৷ আজকের সন্ধেটা ভারি সুন্দর৷ তুমি থাকাতে আরও
সুন্দর হয়েছে৷
(দৃশ্য পরিবর্তন—বাড়ির বাইরে)
মনোরমা কী গো দাদা৷ তুমি এখানে একা চুপ করে বসে আছ?
শশাঙ্ক তোদের এই বারান্দাটা বেশ ভালো৷ মাঝে-মাঝে মানুষের একটু
নির্জনে থাকা ভালো, মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর৷
মনোরমা ভেতরে চলো৷ খাবার দেওয়া হয়েছে৷
শশাঙ্ক চল৷ ক’টা বাজল?
মনোরমা সাড়ে ন’টা বোধহয়৷
(কুকুরের ডাক)
[শশাঙ্কের প্রবেশ—বাড়ির ভেতরে]
উদয়ন আসুন দাদা৷ আপনি যেন কেমন মিইয়ে পড়েছেন৷ বলুন, আপনাদের
আর্মির গল্প একটু বলুন৷
সোমা জানো মা, মামার বোধহয় রাগ হয়েছে৷
মনোরমা রাগ হবে কেন? তোরা রাগাবার মতো কিছু করেছিস?
সোমা দাদার সঙ্গে একবার খালি ঝগড়া করেছি৷
মনোরমা কি নিয়ে?
সোমা ওই শয়তানটা আমার পেনসিল নিয়ে নিয়েছে৷
মনোরমা আবার শয়তান বলছ!
বোধয়ন কান ধরে তুলে দাও না মা!
মনোরমা তোমরা একদম অসভ্যতা করবে না৷ ভীষণ মাথা ধরেছে আমার৷
মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে৷
উদয়ন মাথার আর কী দোষ৷ সিনেমা দেখলেই তো তোমার মাথা ধরে৷
চিরকালের রোগ৷
মনোরমা রবিবার হলেই তো তোমার তাস! অবেলায় খাওয়া, রাতে পেটভার,
অম্বল, সোমবার সকালে মেজাজ সপ্তমে৷ ওটাও তোমার চিরকালের
রোগ৷
সোমা মা, দাদাকে সাবধান করো৷ পা দিয়ে তখন থেকে আমার পায়ে
খোঁচা মারছে৷
মনোরমা (উত্তেজিত ভাবে) এই তোরা উঠে যা তো৷ দুজনেই বেরো৷
আমাদের একটু শান্তিতে খেতে দে৷
উদয়ন দাদা! একটু গল্প-টল্প বলুন৷ ওয়ারের গল্প৷
শশাঙ্ক এই তো ওয়ার৷ এখানেই হচ্ছে৷ শোনার চেয়ে দেখাই তো ভালো৷
উদয়ন একে ওয়ার বলে না৷ এ হল স্কারমিশ, অনবরতই হচ্ছে৷
শশাঙ্ক এইভাবেই তো যোদ্ধা তৈরি হয়৷ আমি উঠি৷
মনোরমা সেকি! তুমি তো কিছুই খেলে না৷
শশাঙ্ক আমি সন্ধেবেলা একগাদা ভিজে ছোলা খেয়েছি৷
উদয়ন ছোলা? পেলেন কোথায়?
শশাঙ্ক ভালোবেসে একটি ছেলে আমাকে খাইয়েছে, তার নাম শ্যামল৷
উদয়ন ও, শ্যামল৷ নাইস বয়৷ আমার ছেলেটা যদি শ্যামলের মতো
হতো!
শশাঙ্ক (হেসে) হ্যাড আই বিন দ্য উইংস অফ এ ডাভ৷ আমার যদি
পাখির মতো দুটো ডানা থাকত৷ তাহলে উড়তে পারতুম৷ গুড
নাইট!
শশাঙ্ক (গান গাইছে)—
যদি কুমড়োর মতো ডালে ধরে রত
পান্তুয়া শত শত
ওরে যদি কুমড়োর মতো ডালে ধরে রত
(হাসি)
সব এই সি তো আয়ে গা—তা না উদয়ন৷ সব আই সি হো
যায় গা৷ তুমি সারাদিন তাস পিটবে৷ তোমার স্ত্রী যাবে সিনেমায়
তোমার ছেলেমেয়েরা একা-একা বাড়িতে হুল্লোড় করবে৷ ছেলে
মানুষ হচ্ছে৷ আবার ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে আপনি ভূদেব
মুখোপাধ্যায়৷ ভোগ বিলাসিতা প্রাচুর্য সব আছে, তবু এই শূন্য
উদ্যান৷ ঠিক আছে, বুঝবে-বুঝবে, কত ধানে কত চাল!
(দৃশ্য পরিবর্তন)
শশাঙ্ক শুয়ে পড়ি, গুড নাইট৷ আহা, এক আকাশ তারা৷ আরে, আজ
আবার একফালি চাঁদ উঠেছে৷
মনোরমা (চিৎকার) শঙ্করীর মা, শঙ্করীর মা৷
শঙ্করীর মা যাই দিদি৷ কী বলছেন৷
মনোরমা সবকটাকে ঘুম থেকে টেনে-টেনে তোলো তো৷ দাদা উঠেছে!
দেখো তো ও-পাশের বারান্দায়৷ ডাকা-হাঁকা মানুষ, সাড়া শব্দ
পাচ্ছি না কেন?
শঙ্করীর মা (দূর থেকে) বারান্দায় নেই গো দিদি৷
মনোরমা ঘরের দরজা ঠেলে দেখো তো৷
শঙ্করীর মা দেখেছি৷ ঘর খালি গো দিদি—
মনোরমা সে কী? গেল কোথায়৷ বাথরুমেও তো নেই৷ চা হয়ে গেল৷
তুমি একবার সদরটা দেখো তো৷
উদয়ন হল কী! দাদা মিসিং? এই নাও! চিঠিটা পড়ো৷
মনোরমা কার চিঠি—
উদয়ন তোমার দাদার৷ খাবার টেবিলে চাপা দেওয়া ছিল৷
মনোরমা চিঠি কেন? দাদা কোথায়?
উদয়ন পড়ছি, শোনো৷ মনু, যেখান থেকে এসেছিলুম, সেখানেই ফিরে
চললুম৷ যাওয়ার পথে খুশিদের বাড়িতে কয়েকদিন থাকার চেষ্টা
করব৷ জানি না থাকা যাবে কি না! আমরা পুরোনো আমলের
মানুষ৷ আধুনিক কালটাকে বুঝতে পারি না বলেই বোধহয় সহ্য
করতে পারি না৷ ভেবেছিলুম ভাগনের মধ্যে মামাকে দেখতে
পাব৷ দেখলুম ভবিষ্যৎহীন একটি মানুষকে৷ তোমাদেরও মনে হল
জেগে ঘুমোচ্ছ৷ আমাকে খুব অসহ্য মনে হওয়ার আগেই সরে
পড়লুম৷ ঘরের টেবিলের ওপর শ্যামলের জন্যে কয়েকটা বই
আছে৷ ডেকে দিয়ে দিও৷ এনেছিলুম আমার ভাগনে-ভাগনির
জন্যে৷ ওদের কাছে এ জিনিসের কোনও দাম নেই৷ আমাকে
ভালো না বাসলেও তোমাদের জন্যে ভালোবাসা রইল!
শুনলে তো চিঠিটা? ফানি ম্যান! নাটকীয় প্রবেশ, নাটকীয় প্রস্থান৷
সাবেক কালের মাস্টারমশাইয়ের মতো মেজাজ৷
মনোরমা যাকে বোঝা যায় না সেই তো আমাদের কাছে মজার লোক৷
ফানি ম্যান!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন