সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
জমিদার সুখেন্দু রায়ের গঙ্গার ধারের বিশাল বাগানবাড়িটা এতকাল খালিই পড়েছিল৷ হঠাৎ সেখানে একজন মহিলা এসেছেন৷ খুব সুন্দরী৷ মাঝবয়সি৷ বেশ শক্ত-সমর্থ৷ ফিটফাট৷ দেখলে বেশ শ্রদ্ধা হবে৷ আমার প্রাণের বন্ধু অনাথ বলল—‘মাতৃমূর্তি, মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে৷’ আমি বললুম, ‘আমার ভীষণ ভয় করছে৷ খুব বড়লোক৷ বড়লোকদের মেজাজ সব সময় চড়ে থাকে, অহঙ্কারে মট মট করে৷ আমাদের বাগানে ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল৷’
গঙ্গার দিকের পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকে বড় আমলকী গাছটার নীচে বসে থাকতুম৷ অনাথ রামপ্রসাদী গান গাইত৷ সুন্দর গানের গলা৷ অনেক কাঠবেড়ালি আছে৷ অনাথ বাদাম ছড়িয়ে দিত৷ বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল৷ খেলতে, খেলতে আমাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে চলে যেত৷ বাড়িটার প্রাইভেট ঘাটে আমরা রোজ চান করতুম, সাঁতার কাটতুম৷ অনাথ অঙ্কে খুব স্ট্রং৷ আমি ভেরি উইক৷ অনাথ বলে, ‘তুই আমার লজ্জা৷ দাঁত বের করা৷ পারি না৷ কেন পারিব না? পারতে হবে৷ ঘাটের পাথর বাঁধানো ধাপে চক দিয়ে লিখে আমাকে অঙ্ক শেখায়৷ আর ঘাটে গিয়ে বসা যাবে না৷ কী বলতে কী বলে দেবে৷ ভদ্রমহিলাকে বাঙালি বলে মনে হচ্ছে না, মেমসায়েব নয় তো! সোনালি চুল, খাড়া নাক৷ সিস্টার নিবেদিতার বোন নয় তো!
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি দু’জনে৷ ভাগ্যের কথা ভাবছি৷ আমাদের ভাগ্যে ভালো কিছু সয় না৷ অনাথ আমাকে সাইকেল শেখাচ্ছিল, সাইকেলটা চুরি হয়ে গেল৷ স্কুলে আমাদের ভালো, সকলের প্রিয় হেড স্যার অন্য একটা স্কুলে চলে গেলেন৷ তাঁর জায়গায় যিনি এলেন, যেমন চেহারা, সেই রকম মেজাজ৷ দাশুদের বাড়ির জামরুল গাছটা মরে গেল৷ কী জামরুল হতো৷ এই গ্রীষ্মের দুপুরে আমরা গণ্ডায় গণ্ডায় খেয়েছি৷ এই সব সাত-পাঁচ ভাবছি৷ হঠাৎ গেট খুলে একটি ছেলে বেরিয়ে এসে বললে, ‘মা, তোমাদের ডাকছে৷’
‘মা কোথায়?’
‘ওই তো দোতলার বারান্দায়৷’
অনাথ বললে, চল, চল, এই সুযোগ, জমিদার বাড়ির ভেতরটা কেমন হয় দেখবি আজ৷’
শ্বেত পাথরের মেঝে, হাতির দাঁত-এর কাজ করা পেল্লায় খাট, বেলজিয়ামের বড় আয়না, ঝাড় লণ্ঠন, আরো কত কী!’
সাত ধাপ সিঁড়ি ভেঙে চওড়া বারান্দা৷ পাথরের মেঝে৷ পর পর তিনটে ঘর৷ মাঝের ঘরটা বসার ঘর৷ বেশ বড়৷ গোল টেবিল, নানা রকমের চেয়ার, আলমারি, আয়না, দেওয়ালে বড় বড় ছবি৷ একটা সিঁড়ি একপাশ দিয়ে উঠে গেছে দোতলায়৷ অনাথ বললে, ‘সিনেমার মতো৷ সেকালের ইংরেজ আমলের পয়সা৷ কিন্তু যাই বল, বেশ ভালো লাগছে৷ মজা লাগছে৷ তোর কেমন লাগছে?’
‘ভ্যাবাচ্যাকা আমার ভাই। আমাদের বাড়িটাই ভালো লাগে৷ স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে, ড্যাম্প লাগা দেওয়াল৷ তক্তাপোশ৷ পুরোনো চেয়ার৷ এদিকে, সেদিকে সব ছড়ানো-ছেটানো...৷’
সিঁড়ির মাথায় দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেবীর মতো৷ ‘আয় আয়’৷
অনাথ আমার দিকে তাকালো একবার৷ আমি অনাথের দিকে৷
লম্বা একটা বারান্দা এ মাথা থেকে ও মাথা৷ ইচ্ছে করছিল, দৌড়োই৷ ছোটাছুটি করতে ভীষণ ভালো লাগে৷ আর পায়ে যদি থাকে ফুটবল!
অনাথ হল সাহসী৷ সেদিন গঙ্গার ধারে এক পাগলা ষাঁড়ের হাত থেকে আমাদের পাড়ার সকলের প্রিয় মধুমাসিকে জোর বাঁচিয়েছে৷ মাসি আবার ওর নামে পঞ্চাননতলায় বাবার চরণে পূজা দিয়েছে৷ এই রবিবার আমাদের কচুরি আর ঘুগনি খাওয়াবে৷ হাতের রান্না টেরিফিক৷ আমাদের দিয়ে মাঝে মাঝে বলে পাঠাতেন, এটা, ওটা, সেটা৷ মধুমাসি খাওয়াতে ভালোবাসে৷
অনাথের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, বাড়িটা যেন তার নিজের বাড়ি৷ সোজাসুজি প্রশ্ন, ‘আমাদের ডেকে পাঠালেন কেন?’
‘ভাব করব বলে৷ অনেক কাজ করতে হবে৷ দশ বছর মামলা লড়ে বাড়িটা আদায় করেছি৷ বড়লোকি করার জন্যে নয়৷ কালকে তোমরা আমাদের নির্জন ঘাটে বসেছিলে৷ সকালে গিয়ে দেখলুম ধাপে ধাপে অঙ্ক কষেছ৷ মধুমাসি বললে, এ পাড়ায় দুটো ছেলে আছে, একেবারে অন্যরকম৷ তা, আমিও তো অন্যরকম৷ আমি আমার কথা বলব না, দেখাবো৷ একটু, একটু করে কাজের মধ্যে দিয়ে কথা তৈরি হবে৷ এটা তো মানবে জীবন একটা গল্প৷ বেঁচে থাকতে বেশ মজা লাগে তাই না! তোমাদের?’
অনাথ বললে, ‘আমরা দু’জন বেশ মজা করে বেঁচে আছি৷’
‘শুনি কীরকম?’
‘আমরা আর ছোট নেই, অনেক বড়, বুড়োই হয়ে গেছি৷ আমাদের নাম জানেন? আমি অনাথ, আমার বাবা নেই, ও শ্যামল, ওর মা নেই৷ কী মজা! বাবা নেই, রোজগার নেই, আমার এক কাকা, খুব মজার মানুষ৷ শুধু হিসেব, আয় আর ব্যয়৷ জমা আর খরচ৷ আমাকে রোজ একবার করে ডেকে বলেন, ‘অঙ্ক একটাই। খরচ যত কমবে, জমা তত বাড়বে৷ যত পারিস নেমুন্তন্য খাবি৷ নিজের বাড়িতে ন’মাসে ছ’মাসে একবার হাঁড়ি চড়াবি৷ একটা জিনিস মনে রাখবি, বেলা বারোটা পর্যন্ত ডেঞ্জারাস সময়, ওটা পার করে দিতে পারলেই খিদে মরে যাবে, পিত্তি পড়ে যাবে৷ সেদিনের মতো বিপদ কেটে যাবে৷ স্টম্যাক একটা থলে, ওটাকে চুপসে দিতে পারলে আর খাবার ঢুকবে না৷ বেশি খেলেই বেশি কাজ করা যায় সম্পূর্ণ ভুল কথা৷ উপোস করলেই শরীর সেন্ট পারসেন্ট ফিট, তখন গাছ কাটো, মাটি কোপাও৷ ফ্রি রাখো৷ যে কোনো অভ্যাসেই পরাধীনতা৷ খাদ্যের দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখো৷ স্বাধীন হও৷ বাবা দু’হাতে রোজগার করতেন, কাকাবাবু দু’হাতে ওড়াতেন৷ কোনো কাজ কর্ম, পরিশ্রম করতেন না৷ বলতেন, এর পেছনে একটা বিজ্ঞান আছে৷ শরীরকে খাটালেই শরীর খেতে চাইবে৷ অকারণে খাটা-খাটুনি বদ অভ্যাস৷ ঝুল ঝাড়ছে, ঘর মুছছে, এসব বাতিক৷ ঝাঁট দিয়ে পৃথিবীর কতটা তুমি পরিষ্কার করতে পারবে৷ এই কাকাবাবু আমাদের পরিবারটাকে গিলে শেষ করেছেন৷’
‘তা হলে এখন কী অবস্থা!’
‘আমরা তিনজন, না আমরা চারজন৷ মা, আমি আমার এক বোন আর ভোলা৷ ভোলাকে সবাই কুকুর বলে, কেউ বলে কুত্তা, আমরা বলি ভোলাভাই৷ মা বলেন, ভুলু৷ বাড়ির পেছনে একটুকরো জমি, সেখানে একটা সজনে গাছ, একটা টগর আর জবা গাছ আর পাতকুয়া৷ ওইখানে থাকে ব্রজ বাবা, সে হল মস্ত বড় একটা ব্যাং, বৃদ্ধ হয়েছে, যে কোনো দিন চলে যাবে৷ সকালে রোদ পোয়োতে বেরোয়৷ বর্ষাকাল একেবারেই পছন্দ করে না৷ মা তার একটা সুন্দর নাম রেখেছে, ‘জবুথবু’৷ আমি আর আমার বোন নামটা ভাগ করে নিয়েছি৷ আমি ডাকি জবু ও ডাকে থবু৷ ওর ‘থবু’ নামটাই পছন্দ করে৷ ডাকলেই থপাক, থপাক করে বেরিয়ে আসে৷ চিঁড়ে ভিজে খেতে ভালোবাসে৷ মাঝে মাঝে ঘরে চাল ছাড়া কিছুই থাকে না, তাতে কী, আমরা অনেকরকম খাই৷ মা বলে বলে দেয় আমরা সেই মতো খাই৷ যেমন, নে ভাত ভাঙ৷ এই নে না এক চামচে গাওয়া ঘি, গরম গরম আলু ভাজা৷ এইবার মুগের ডাল ঢাল, একটা গন্ধরাজ লেবু, মাছ ভাজা, মৌরলা মাছের ঝাল, আলু পটলের তরকারি, সব শেষে চাটনি, শেষ পাতে দই৷ আমরা ততক্ষণে নুন ভাত অর্ধেক সাবাড় করে দিয়েছি৷ আমার বোনের আবার আর একটু চাটনি চাখার ইচ্ছে হয়েছে৷ তা নে না, কত নিবি নে৷ কোনো কিছুই তো ফুরবে না৷ মায়ের ভাঁড়ার বস্তা বস্তা চাল, ডাল, আলু৷ মায়ের খেতে কত সবজি, পুকুরে মাছ, গোয়ালে গরু৷ রাতে গাওয়া ঘিয়ে ভাজা ফুলকো লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম, ক্ষীর৷ আহা! দুটো শুকনো রুটি তো রয়েইছে৷ পেটে কিছু ঠুসতে হবে, এই কাজটা কী আর এমন শক্ত কাজ! গরু ঘাস খায়, শাকপাতা খায়৷ সেই সবই তো দুধ হয়ে বেরোয়, আমরা কিনে খাই৷ তবে! কোনো কোনোদিন কিছুই থাকত না, আমরা কিন্তু আসন পেতে, থালা, বাটি গেলাস সাজিয়ে খেতে বসতুম৷ মায়ের পরিবেশন, ‘হাত সরা, হাত সরা, গরম আগুন৷ ভাত ভাঙ, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল৷ মুড়োটা পুরোটা খাবি৷ তোর বাবা বলতেন, চোখের জ্যোতি বাড়ে৷ তা হলে এইবার একটু জল খাই৷ পৃথিবীতে জল ফ্রি! একটু মেহনত করলেই পাওয়া যায়৷ কত খাবে খাও না, আঁজলা ভরে, গেলাস গেলাস৷ মা আবার বলেন, থালা, বাটি, গেলাস ধুয়ে, মেজে, মুছে ঠিক জায়গায় রেখে আয়৷
মাঝে মাঝে বাজারে যাই৷ মা ফর্দ করে দেয়৷ বলে দিয়েছে, দরদস্তুর করে কিনবি, ওইটাই নাকি বাজার করার নিয়ম৷ দর করি, কিন্তু কিনি না কিছুই। অথচ দেখতে দেখতে ব্যাগটা ভরে ওঠে। আর যেন বইতে পারি না! গোটা বাজারটা কিনে ফেলেছি৷ তিন-চারদিন চলে যাবে৷ মা বলেছে, জগতের সবাই কি একসঙ্গে ভালো থাকতে পারে? কেউ ভালো থাকবে, কেউ খারাপ৷ মা আমাকে অনু বলে ডাকে৷ মা বলে, এসব কোনো ব্যাপার নয়৷ লড়াই না করে যুদ্ধজয় করা যায় না৷ শুয়ে শুয়ে গাড়ি চালানো যায় না৷ কিছু বড়লোক আত্মীয়-স্বজন আছে৷ মা বলছেন, ডাকলেও যাবি না৷ কেউ দয়া করে কিছু দিতে চাইলে বলবি, সরি, আমাদের প্রয়োজন নেই৷ আমাদের সব আছে৷ বেশ ভদ্রভাবে হাসতে-হাসতে বলবি৷ অনাথ জিগ্যেস করল, ‘আপনাকে আমরা কী বলব?’
‘কী বলতে ইচ্ছে করছে?’
‘মাতাজী৷’
‘বেশ, তাই বোলো৷ এখন, তোমার বন্ধু শ্যামলের কথা শুনি৷ মায়ের কী হয়েছিল?’
‘ক্যানসার৷ তিন মাস খুব লড়াই করে হেরে গেলেন৷ আমাকে বললেন, আবার দেখা হবে৷ জানি না কী ভাবে হবে! এমন হয় না কি? একবার চলে গেলে আর কি ফিরে আসা যায়৷ বাবা খুব দায়িত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেন৷ গম্ভীর৷ আমার খুব ভয় করে৷ মায়ের ওপর খুব রেগে আছেন৷ থেকে থেকেই বলেন, অকৃতজ্ঞ, আনাড়ি মহিলা৷ বাঁচতে না শিখে সংসার করতে এল৷ ব্যাড গোলকিপার৷ পেনাল্টি কিকে গোল খেয়ে টিমটাকে লিগ থেকে ছিটকে দিলে৷ চোখে জল এলে বলেন, ‘ভেবো না আমি কাঁদছি৷’ তারপরেই বলবেন, ‘কড়াটা উনুনে চাপাও, তেল ঢালো৷’ সকালে আমরা দুজনে রান্না করি৷ ঠিক ন’টার সময় বাবা বেরিয়ে যান, ফিরতে ফিরতে রাত সাতটা৷’
‘তোমাকে কে দেখবেন?’
‘দেয়ালে একটা বড় আয়না ঝুলছে, বাবা বলে দিয়েছেন, ওইটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই তাকে দেখবে। যে তোমাকে দেখবে, সারাজীবন দেখবে, অকৃতজ্ঞের মতো হঠাৎ পালাবে না৷ যেদিন দেখবে, ওখানে তুমি নেই, সেদিন জানবে এখানেও তুমি নেই৷’
মাতাজী বললেন, ‘কাল বড়দিন, তাহলে একটা গ্র্যান্ড ফিস্ট তো হতেই পারে আমরা সবাই মিলে রান্না করব৷ শ্যামল, তোমার বাবা কি আসবেন?’
‘আমি তো জানি না৷ আপনি যদি বলেন!’
‘সে তো বলবই৷’
অনাথ ফট করে বলে ফেলেছে, বড়লোকরা বড়দিনে বড় বড় পার্টি লাগায়৷ আর যায় কোথায়৷ মাতাজীর তেড়ে এক ধমক, ‘বড়লোক, বড়লোক, গরিব লোক, গরিব লোক, এক ঘেঁয়ে এক কথা৷ ঘ্যান, ঘ্যান৷ কত কোটি থাকলে বড়লোক হয় রে! রাজ পোশাক খুলে নিয়ে রাজাকে হাটের মাঝে বসিয়ে দিলে, লোক এসে বেগুনের দাম জিগ্যেস করবে৷ রাজাও মরবে, রাজার ঝাড়ুদারও মরবে৷ পুড়ে গেলে দুজনেই কেজি খানেক ছাই৷ একটু অন্য ভাবে ভাবতে শেখ৷’
হঠাৎ অনাথ কেমন যেন বেসুর হয়ে গেল৷ এই সময় ওর ফর্সা টকটকে মুখটা কেমন যেন গোলাপি হয়ে যায়৷ অনাথ বললে, ‘শুনুন মাতাজী, ওই সব বড়দিন, পার্টি, আলো মালা, হই-হল্লা—এসব কিছুই করবেন না৷ আপনি কি নির্বাচনের ক্যান্ডিডেট? দেখতে, দেখতে একদল ধান্দাবাজ এসে হাজির হবে, আপনার বারোটা বাজবে৷’
‘তা হলে?’
‘করার মতো কাজের কাজ অনেক আছে মাতাজী!’
‘কাজের কাজ৷ একটু খুলে বলো৷’
‘নীচের তলায় অনেকটা জায়গা, বিরাট একটা বাগান৷ আমাদের একটু দায়িত্ব দিন৷ মেয়েদের জন্যে একটা আলাদা ট্রেনিং সেন্টার করব৷ এই পাড়ার তিন-চারজন গুণী মানুষ আছেন, তাঁরা শেখাবেন৷ চিত্রাদি চমৎকার পুতুল তৈরি করেন৷ দয়ালদা আর্ট-পটারির কাজ শিখে এসেছেন৷ তাঁর কাজ দেখলে অবাক হবেন৷ চিত্রাদির এমব্রয়ডারি, মলিনাদির নকসী কাঁথা৷ এই সব কাজ শিখবে মেয়েরা, ছেলেরাও শিখতে পারে৷ ছবি আঁকার ক্লাস হবে৷ একটা চিকিৎসা কেন্দ্র হবে, আউটডোর৷ একটা সুন্দর শো-রুম করা হবে, বিক্রয় কেন্দ্র৷ বিনা পরিশ্রমে মানুষকে দিলে সে ভিখিরি হয়ে যায়, তার চরিত্র নষ্ট হয়ে যায় আলসে হয়ে যায়, মাথাটা হয়ে যায় বদবুদ্ধির কারখানা৷ আপনাকে মাতাজী বলেছি, কিছুই জানি না আপনার, হঠাৎ কোথা থেকে এলেন আপনি! এতদিন ছিলেন কোথায়! আমার মন বলছে, আপনার মধ্যে একটা শক্তি আছে৷’
‘অনাথ, আমি ভেবেছিলুম একটা ফ্রি-কিচেন৷’
‘না, না ম্যাডাম৷ আমি বলব, ঘাম ঝরিয়ে তোমার রুটি রোজগার করো৷ আয়াস করে কিছু হয় না৷ খেটে খাও৷’
‘বাঃ, অনাথ, তুমি যে দেখছি বাইবেলের উপদেশ বলছ৷ আচ্ছা অনাথ, আমরা তিনটে পরিবার একসঙ্গে একটা বড় পরিবার হয়ে এই বাড়িতে থাকতে পারি না?’
‘না ম্যাডাম, কয়েকদিনের মধ্যেই অশান্তি শুরু হয়ে যাবে, কারণ এক একজনের এক-এক রকম স্বভাব, অভ্যাস৷’
‘চলো না অনাথ, তোমার মা আর শ্যামলের বাবার সঙ্গে পরিচয় করে আসি৷’
‘চলুন, চলুন৷’
পথ চলে গেছে গঙ্গার দিকে৷ কতকালের প্রাচীন বটগাছ, কত ইতিহাসের সাক্ষী৷ প্রাচীন শিবমন্দির৷ কিছু দূরেই বাগানঘেরা কালীমন্দির৷ জায়গাটা ভারি সুন্দর৷ ‘অনাথ, আমি তোমার মাকে দেখতে চাই৷’
‘ম্যাডাম! ওই দেখুন আমার মা, জগতের মায়ের পূজার বাসন মাজছে, আর ওই দেখুন ওপাশে, ঝাঁটা হাতে শ্যামলের বাবা মায়ের দালান পরিষ্কার করছেন৷ আর এই দেখুন আমি, মায়ের হনুমান, বেলগাছে উঠছি বেলপাতা পাড়তে৷ একশো আটটা নিখুঁত বেলপাতা৷’
‘আর শ্যামল কী করবে?’
‘ওই যে বালতি৷ ঘাটের তিরিশটা সিঁড়ি ভেঙে গঙ্গার জল আনতে যাবে৷’
‘অনাথ! আমি কী করব?’
‘আপনি হাত জোড় করে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন, এখুনি পূজা শুরু হবে৷’
‘মাকে কী বলব?’
‘কিচ্ছু বলবেন না৷ শুনবেন, কান খাড়া করে শুনবেন, মা কি বলেন৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন