সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদু যখন সকালে বেড়াতে বেরোবেন তখন হাতে থাকবে পাকানো-পাকানো বেতের লাঠি৷ সে লাঠির কী বাহার! বাবা এনে দিয়েছিলেন মুসৌরি থেকে৷ আর যখন কোনও কাজে বেরোবেন তখন আর লাঠি নয়, তখন আমি তাঁর পাশে এক চলন্ত লাঠি৷ দাদুর ভারী ডানহাত আমার কাঁধে৷ আমার উচ্চতাও ওই লাঠিটার মতোই৷ দাদুর হাতে আমার কাঁধটা বেশ ফিট করে যায়৷ চলন্ত লাঠির গতি যখন বেড়ে যেতে চায় দাদুর হাত তখন কাঁধ খামচে ধরে পাশাপাশি টেনে আনে৷ আমার চেহারাটাও ঠিক লাঠির মতো৷ মা বলেন, খ্যাংরা কাঠির মাথায় আলুর দম৷ হবে না! অত খেলে কারুর চেহারা ভালো হয়৷ অষ্টপ্রহর মুখ চলছে৷ দুঃখ হয় কথা শুনে, কিছু বলতে পারি না৷ দেওকীনন্দন বলেছে, ঘাবড়াও মাত৷ চানা চালাও, বঠকি লাগাও, পবননন্দন বন যাও৷ ঘাড় হো যায়গা লোটা কা মাফিক৷ হাত হো যায়গা ডাম্বেল কা মাফিক৷ সমঝা ছোটাবাবু?
এখন আমরা চলেছি দাঁতের ডাক্তারের কাছে৷ আমাদের শহরে যেখানে বাজার সেখানে একটা জুতোর দোকানের পাশে ছোটমতো ডাক্তারখানা৷ ভাঁজ করা দরজার একদিকে একটা কাচের কেসে দু-পাটি দাঁত সবসময় আমার স্কুলের পণ্ডিতমশাইয়ের মতো শীত নেই গ্রীষ্ম নেই খিঁচিয়েই আছে৷ আর একপাশের দরজায় মাফলার জড়ানো গালফুলো এক মুখের ছবি৷ যন্ত্রণাকাতর৷ তলায় গোটা-গোটা অক্ষরে লেখা, দন্তশূল, তিন শূলের এক শূল৷ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না দিলে মরতে হয়৷ সামনের দিকে গালফুলোদের বসার জন্যে দুপাশে দুটো বেঞ্চ৷ ভেতর দিকে পরদার আড়ালে একটা উঁচু চেয়ার৷ সেইখানেই ঠেসে ধরে সাঁড়াশি দিয়ে দাঁত তোলা হয়৷ কোণের দিকে জলের কল, বেসিন৷ আমি দাদুর সঙ্গে চৌষট্টিবার এই দোকানে এসেছি৷ কোথায় কী আছে সব মুখস্থ৷
দাদুর ওপরের পাটিতে ষোলো, নিচের পাটিতে ষোলোটা দাঁত ছিল৷ সবই এই ডাক্তারবাবু একটা-একটা করে টেনে-টেনে তুলেছেন৷ বত্রিশ মাস সময় লেগেছে৷ দাদুর সে কী গর্ব৷ সকলের নাকি বত্রিশটা দাঁত থাকে না৷ ঠিক-ঠিক ওপরে ষোলোটা আর নিচে ষোলোটা, দুই মিলিয়ে ঠিক বত্রিশ দাঁত লম্বা খাড়া টানা-টানা চোখ, মহাপুরুষের লক্ষণ৷ দাদুর সবক’টা লক্ষণই স্পষ্ট৷ তবে একটাই যা দুঃখ, দাদুর সবক’টা দাঁতই এই সিধুডাক্তারের সাঁড়াশি শেষ করে দিয়েছে৷ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দাদু বোঝেননি৷ মা আমাকে বকেন৷ দাদুকে তো বকতে পারেন না৷ দাদু যে মায়ের বাবা৷ অত মিষ্টি খেলে কারুর দাঁত ভালো থাকে৷ দাদু আবার বাবাকে উপদেশ দেন, মিষ্টি খেয়েই বেশ ভালো করে কুলকুচো করে মুখ ধুয়ে ফেলবে, দেখবে দাঁত ঠিক থাকবে, একেবারে ছবির মতো৷ আশি বছরেও বসে-বসে ছোলাভাজা চিবোচ্ছে৷ কচি কলাপাতা থেকে চেটে-চেটে তেঁতুলের আচার খাচ্ছ টকাস-টকাস শব্দ করে৷ দাদু যখন এইসব বলেন, আমি মনে-মনে হাসি৷ যিনি বলছেন তিনি নিজেই এখন ফোকলা৷
সন্ধে-সন্ধে হয়ে এসেছে৷ সিধুডাক্তার লিকলিকে একটা ধূপ জ্বেলে দেয়ালে টাঙানো তাঁর গুরুদেবের ছবির সামনে কপালে দু-হাত ঠেকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ মাথার চুল ছুঁয়ে পিনপিন করে ধূপের ধোঁয়া উঠছে৷ গুরুদেবকে মোটেই ভালো দেখতে নয়৷ দাঁতের ডাক্তারের গুরুদেব বলেই বোধহয় দাঁত দুটো অত বড়-বড়৷ ছবির দিকে তাকালেই আগে চোখ পড়ে যায় দাঁতে, তারপর গলার রুদ্রাক্ষের মালায়, তারপরই ভুঁড়িতে৷ কাউকে বলিনি, ছবিটা দেখলেই আমার মনে হয়, একেই বলে টাস্ক ফোর্স৷ টাস্ক হল হাতির দাঁত, সেইটাই ফোর্সে বেরিয়ে এসেছে সামনে৷ নিশ্চয়ই দেহ রেখেছেন৷ মহাপুরুষদের মৃত্যুকে বলে মহাপ্রয়াণ৷ আহা, দাঁত দুটো ডাক্তারবাবু যদি খুলে নিয়ে ওই শো-কেসে রাখতেন, যেখানে দু-পাটি দাঁত মুখ ছাড়াই পড়ে পড়ে হি-হি করে ভূতের হাসি হাসছে৷ গুরুদেবের ছবির মাথার ওপর কাঠের ব্র্যাকেটে একটি মাটির গণেশ৷ ভারি ভালো মানিয়েছে৷ না বাবা, এসব ভাবব না৷ ওঁরা যেখানেই থাকুন যদি মনের কথা জেনে ফেলেন নির্ঘাত অঙ্কে ফেল করিয়ে দেবেন৷
আমি হুড়মুড় করে দোকানে উঠতে যাচ্ছিলাম৷ দাদু টেনে ধরলেন, ‘দেখছ না পুজো হচ্ছে! হুড়মুড় করে ঢুকলেই হল৷ একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যাবে৷’
দাদুর পাশেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম৷ কিছুক্ষণ পরেই সিধুডাক্তার ওইরকম কপালে ধূপসমেত হাত ঠেকানো অবস্থাতেই আমাদের দিকে ফিরলেন৷ চোখ আধবোজা! ঠোঁট নড়ছে বিড়বিড় করে৷ সেই ঠোঁটে আমাদের দেখে একটু হাসির রেখা উঠেই মিলিয়ে গেল৷ আমরা যে দিকে দাঁড়িয়ে আছি সেটা পশ্চিম৷ সূর্য ওইদিকে ডুবে গেছে অনেক আগে৷ উনি ওইদিকেই নমস্কার জানাচ্ছেন৷ ঘুরে গেলেন দক্ষিণে৷ দক্ষিণ থেকে পুবে৷ পুবেই সেই দাঁততোলার বিদঘুটে চেয়ার৷ ওইদিকে একটু বেশিক্ষণ নমস্কার হল৷ ও দিকে সূর্য ওঠে৷ তা ছাড়া ওইদিকেই তো দাঁত তোলা হয়৷ দেওয়ালে বড়-বড় করে লেখা, ফাইভ রুপিজ এ টুথ, টেন রুপিজ এ ফলস টুথ৷ নিজের দাঁত ফেলতেও টাকা, নকল দাঁত লাগাতেও টাকা৷ তবে আসলের চেয়ে নকলের দাম পাঁচ টাকা বেশি৷
ডাক্তারবাবু হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘আরে, মুকুজ্যেমশাই। আসুন, আসুন৷’
আমরা ভেতরে ঢুকে পাশাপাশি বেঞ্চিতে বসলুম৷ দাদু বললেন, ‘তোমার পিতৃভক্তি দেখে মুগ্ধ হলুম!’
ঘাড় কাত করে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে, ওই জোরেই তো করে খাচ্ছি৷ ঘুষি মেরেও তো দাঁত ফেলা যায়, কিন্তু এমন খুস করে দাঁত ফেলতে ক’টা লোক পারে৷ ওই তো বিলেতফেরত জোয়ারদর৷ টেন রুপিজ এ টুথ৷ এমন হ্যাঁচকা টান মারে চোয়াল উপড়ে চলে আসে৷ এক দাঁত তুলতে আর-এক দাঁত তুলে ফেলে৷’
‘সে যদি বলো, আমার বেলাতেও তোমার হাতে একবার সেই কেস হয়েছে৷’
‘আজ্ঞে না মুকুজ্যেমশাই, ওটা আমি ইচ্ছে করে করেছিলুম৷ আমার চয়েস৷ দুপাটি দাঁতই তো আমার হাতে ছিল৷ সবক’টাই তোলার কেস, আগে আর পরে৷’
‘ও যতই বলো তুমি, মানব না, আমি উকিল মানুষ৷ ও তোমাদের আদত৷ দাঁত বুঝতে পারো না৷ আমরাও যে কিছু বুঝতে পারব, সে উপায়ও রাখ না৷ ইনজেকশন দিয়ে অসাড় করে দাও৷ আর দাঁত তোলার সময় তোমাদের চোখ-মুখের চেহারাও অসুরের মতো হয়ে যায়৷’
‘হেঁ-হেঁ, কী যে বলেন৷’
‘হেঁ-হেঁ নয়, চিরকাল তাই হয়ে আসছে৷ চোখেও ওই এক কিত্তি৷ ডান চোখে ছানি বাঁ-চোখ কেটে ব্লাইন্ড করে দিলে৷ এরকম কেস আখচার হচ্ছে, যাক ওসব কথা৷ আমি এসে গেছি৷’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বসুন৷ আপনার দাঁত রেডি৷’
ডাক্তারবাবু ভেতর থেকে ভেলভেটে মোড়া দু-পাটি দাঁত নিয়ে এলেন৷ টেবিলে খুলে রাখতেই মনে হল মুখ ছাড়াই দাদু হেসে উঠলেন৷ জিনিসটা দেখতে আসল দাঁতের মতো অমন ধবধবে সাদা নয়, একটু হলদেটে৷ নকল দাঁতের সঙ্গে নকল মাড়ি লাগানো৷ ভেলভেট দিয়ে ডাক্তারবাবু দাঁত দু-পাটি দাদুর হাতে তুলে দিতে-দিতে বললেন, ‘ফাসক্লাশ৷’
দাদু ফোঁস করে উঠলেন, ‘তুমি ফাসক্লাশ বললেই তো আর ফাসক্লাশ হবে না, আমাকে পরে দেখতে হবে৷’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়, আপনি পরে দেখে নিন৷ পরে দেখে নিন৷’
দাদু এতবড় হাঁ করে দাঁত দু-পাটি একে-একে পরে ফেললেন৷ খটখট করে দুবার আওয়াজ হল৷ থলথলে মাংস ঝোলা ভালোমানুষ-ভালোমানুষ মুখটা কেমন যেন একটুখানি কঠোর-কঠোর হয়ে উঠল৷ দাদু আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী, কেমন বুঝছ?’
প্রত্যেকটা শব্দ উচ্চারণের সময় দাঁতের বাদ্য হল৷ দাদুর ভুরু কুঁচকে উঠল৷ অসুবিধে ধরে ফেলেছেন৷ আমি বললুম, ‘বেশ দেখাচ্ছে৷ তবে মুখটা যেন কীরকম বদলে গেল৷’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘বাঃ, তা দেখাবে না৷ যৌবন ফিরে এল যে৷ গালটাল সব ভরাট হয়ে গেল৷’
দাদু বললেন, ‘সে আমি আয়নায় দেখব; কিন্তু কথা বলতে গেলে দুইরকম দন্তবাদ্য হচ্ছে কেন! মনে হচ্ছে শীতকালে বরফজলে চান করে কথা বলছি৷’
সত্যিই তাই৷ কথার পরেও কথা থেকে যাচ্ছে৷
‘ও মুকুজ্যেমশাই প্রথম-প্রথম একটু হবেই৷ নিজের দাঁত আর পরের দাঁত৷ তাছাড়া এতদিন মাড়ি খালি পড়ে ছিল, সেখানে হঠাৎ দাঁত এসে গেছে৷ অ্যাডজাস্ট করে নিতে দু-একদিন লাগবে৷’
‘আরে, কালই যে আমার বড় আদালতে কেস আছে! ফ্রিডাম অফ স্পিচ না থাকলে বিপক্ষের উকিল তো আমাকে পথে বসিয়ে দেবে৷’
‘তা হলে কাল না-হয় দাঁত খুলেই সওয়াল করবেন৷
‘তুমি বুঝছ না ডাক্তার, ফোকলা মুখে আইনের ভাষা ফসকে যায়, যেমন ধরো জুরিসপ্রুডেন্স, ম্যালাফাইড, লিটিগেশন৷ সাবজুডিস, অ্যাবরিভিয়েশান, অ্যাডজোর্নমেন্ট, অ্যালিমনি, সবই তো দন্তোষ্ঠ্য বর্ণ৷ দাঁত ছাড়া সওয়ালে কামড় কমে যায়৷ আদালত তো কামড়াকামড়ির জায়গা৷ পাকা নয়, ডাঁসা পেয়ারার কামড়৷ কাল আবার সেশান, কোর্টে লড়াই৷’
‘তা হলে আজ বরং বাড়ি গিয়ে আপনি ঘণ্টা তিনেক অনর্গল কথা বলে যান, যত সব শক্ত-শক্ত ল্যাটিন, ফরাসি, গ্রিক আর ইংরেজি শব্দ৷ বেছে-বেছে৷ তারপর কাপের জলে দাঁত দু-পাটি ভিজিয়ে রেখে শুয়ে পড়বেন৷’
‘তা পড়ব, তবে কিছু একটু চিবিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে৷ নতুন দাঁতের স্ট্রেংথ একটু টেস্ট করে দেখব না৷ যেমন ধরো চালভাজা, ছোলাভাজা৷’
‘একেবারে অতটা শক্ত জিনিস দিয়ে বউনি করবেন? সেটা ঠিক হবে না৷ সবই পারবেন, তবে ধীরে-ধীরে, সইয়ে-সইয়ে৷ আজ আপনি ভাত বা রুটি খান চিবিয়ে-চিবিয়ে, সজনেডাঁটা খান৷ তারপর ধরুন লেড়ো বিস্কুটে উঠলেন৷ প্রথম-প্রথম কামড়াবার জন্যে দাঁত একেবারে নিশপিশ করবে৷ মাড়ি সুড়সুড় করবে৷ যতই হোক নতুন দাঁত তো৷ শিশুদেরও নতুন দাঁত ওঠার সময় ওই রকমই হয়৷ জ্বর হয়, ঘ্যানঘান করে, পেট খারাপ হয়, শক্ত বিস্কুট পেলে কড়মড় করে চিবোয়, আঙুল কামড়ে দেয়৷’
‘আমারও জ্বর, পেট খারাপ হবে নাকি ডাক্তারবাবু?’
‘জ্বর হবে না, তবে পেটটা একটু সামলে৷ আর একটা সাবধান করে দি, দাঁত দিয়ে কোনও কিছু কামড়ে ছিঁড়ে আনার চেষ্টা করবেন না৷’
যেমন?’
যেমন ধরুন শাঁকালুর খোলা, কিংবা হাড় থেকে মাংস, আখ৷ ওই কুকুরে যেমন ছেঁড়াছিঁড়ি করে না, জিনিসটি চলবে না, পাটি থেকে দাঁত খুলে যাবে৷’
‘তা হলে আর কী দাঁত বাঁধালে তুমি?’
‘আজ্ঞে, এ আপনি কী বলছেন৷ বাঁধানো দাঁত আর নিজস্ব দাঁতে একটু তফাত তো হবেই৷ নিজস্ব দাঁত এক-একটা মাড়িতে দু ইঞ্চি-তিন ইঞ্চি শিকড় চালিয়ে বসে আছে৷’
‘আচ্ছা ডাক্তার, নিমদাঁতন করা যাবে?’
‘সে কী৷ দাঁতন কেন করতে যাবেন শুধু-শুধু৷’
‘শুধু-শুধু? নিমদাঁতন শুধু-শুধু? তুমি কী বলছ ডাক্তার? ডু ইউ নো হোয়াট ইজ নিম৷’ দাদু ভীষণ চটে উঠলেন৷ সিধুডাক্তার মিউমিউ করে বললেন, ‘আজ্ঞে না, আমি সেভাবে বলিনি, তবে এ দাঁতের তো মাজন আলাদা, তাই আর কি!’
‘নিম কি শুধু মাজন, নিম হল অ্যানটিসেপটিক, নিম ইজ এ মেডিসিন, পঞ্চবটের এক বট৷ আমি এই দাঁতেই নিমদাঁতন করব, আই মাস্ট, নিম ইজ মাই হেলথ, ওয়েলথ অ্যান্ড ফ্রেন্ড৷’
কড়কড়ে তিনশো টাকা গুনে-গুনে ডাক্তারের হাতে গুঁজে দিয়ে দাদু আমার হাত ধরে উঠে পড়লেন৷ টেন রুপিজ এ টুথ হলে তিনশো কুড়ি হবে৷ কী জানি, পাইকারি দাম বোধহয় তিনশো!
বাড়ি ফিরে দাঁত পরে দাদু চেয়ারে বসলেন৷ মা তেল দিয়ে মুড়ি মাখছেন৷ প্রথমে মুড়ি চিবিয়ে দাঁত পরীক্ষা হবে৷ দেওকিনন্দন নারকেল ভাঙছে৷ দু-এক কুচি নারকেলও পরীক্ষা করবেন৷ বাবা এর আগে মুখ ভালো করে দেখে রায় দিয়ে গেছেন, ন্যাচারাল টিথে আপনার ফেসকাটিং যেমন ছিল, ফলস টিথে একটু বদলে গেছে৷ ঠিক সে-রকমটি হল না৷ সামনের ঠোঁট উঁচু হয়ে আছে৷ সেই শার্পনেসটা নষ্ট হয়ে গেল৷
ওপরের ঠোঁটে হাতের চাপ দিতে-দিতে দাদু থেকে-থেকেই বলতে লাগলেন, ‘ও একটু উঁচু আছে তো কী হয়েছে, হাতের চাপে চাপেই ঠিক করে দেব৷ ওটার জন্যে ভাবি না৷ ভাবছি খুলে না পড়ে যায়৷’
মা মুড়ি দিতে-দিতে বললেন, ‘বাঃ, বেশ হয়েছে৷ একবার হাসুন তো৷’
দাদু লাজুক-লাজুক মুখে হাসলেন৷ মা বললেন, ‘বাঃ কী সুন্দর হাসি৷ মুক্তোর মতো সাজানো দাঁতের সারি৷ আমাদের সকলের যদি এমন হতো৷’
‘আমি খুব তাড়াতাড়ি অমন করে ফেলব মা৷ সামনের দুটো দাঁতে পোকা ধরিয়ে ফেলেছি৷’
‘বেশ করেছ৷ মাথা কিনে নিয়েছ৷’ মা হাত-পা নেড়ে মুখ ভেংচালেন৷ দাদুকে বলে গেলেন, ‘বাবা, কাল থেকে নিমদাঁতন৷’
দাদু বসে-বসে নতুন দাঁতে মুড়ি পরীক্ষা করতে লাগলেন, সঙ্গে আবার নারকেলকুচি৷ মনে-মনে ভাবলুম, হয়ে গেল, নতুন দাঁতের আজই বারোটা৷ পরে জানতে পারব, এখন পড়তে বসি৷
পরদিন দাদু কোর্ট থেকে ফিরে এলেন৷ ফরসা রঙে কালো চকচকে কোট৷ কেমন মানিয়েছে৷ বড় আদালতে কেমন লড়ে এলেন কে জানে৷ দাদুর পাশে থেকে থেকে আইনের ভাষা আমিও কিছু শিখে ফেলেছি৷ আজ বোধহয় সেই কেসটা ছিল, ফেলারাম ভার্সাস নগেন দাস৷ একটা নারকেল গাছ নিয়ে দুই মক্কেলে দশ বছর ধরে লড়ে যাচ্ছে৷ দাদুর মুখ গম্ভীর৷ বেতের মোড়ায় বসে জুতোর ফিতে খুলছেন নিচু হয়ে৷ মা সামনে এসে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিতে-নিতে বললেন, ‘কী হল বাবা? এত গম্ভীর?’
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আর কী হল? এই দ্যাখো৷ কোটের পকেট থেকে দুপাটি দাঁত বেরোল৷ এ কী, দাঁত মুখ থেকে পকেটে! দুটো গোল-গোল চাকতি বেরোল৷ ‘দূর করে ফেলে দিয়ে আয় আস্তাকুঁড়ে৷’
মা আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘সে কী?’
দাদু ফেটে পড়লেন, ‘এই দাঁতের জন্যে আজ কনটেম্পট অফ কোর্ট হয়ে জেলে যেতে হচ্ছিল৷ নগেন দাসের উকিলকে আমি একেবারে ঠেসে ধরেছি নারকেলগাছ ফেলারামের দিকে প্রায় এনে ফেলেছি৷ জজসাহেবকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেছি৷ মুখ দিয়ে ইংরেজির তুবড়ি ছুটছে৷ হঠাৎ ওপর পাটির দাঁত ঠকাস করে খুলে পড়ে গেল টেবিলের ওপর, আর এই চাকতির একটা সুদর্শনচক্রের মতো ঘুরতে-ঘুরতে সোজা জজসাহেবের কপালে লেগে তাঁর টেবিলের ওপর৷ হোয়াট ইজ দিস? আমি উত্তর দেওয়ার আগেই উকিল বলে উঠলেন, দ্যাট ইজ ওয়াশার স্যার৷ জজসাহেব ইংরেজিতে জিগ্যেস করলেন কোত্থেকে এল, কে ছুঁড়েছে৷ তিনি বললেন, ইট কেম ফ্রম হিজ মাউথ৷ আপনার মুখ এঁটো করে দিয়েছে৷ আমি তখন আর একপাটি দাঁত নিয়ে টানাটানি করছি৷ না খুলতে পারলে কথা বলতে পারছি না, ক্ষমা চাইতে পারছি না৷ কী অপমানজনক ব্যাপার! বিরোধী উকিল বলছেন, ইট ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ স্পিটিং অন ইওর ফেস মিলর্ড৷ প্রমাণ করতে চায় আমি থুতু দিয়েছি জজসাহেবের গায়ে৷ কেস ঘুরে কনটেম্পট অফ কোর্টের দিকে চলে যায়-যায়৷ তখন ফোকলা মুখে শুরু করলুম৷ ঘণ্টাখানেক ধস্তাধস্তি করে সেই কেসকে টেনে আনলুম আমার দিকে৷ তরি ডুবতে-ডুবতে ভেসে উঠল৷ কী অপমানজনক ব্যাপার বল তো! ফেলে দে, ফেলে দে, ওই দাঁদানো বাঁত৷’
দাঁদানো বাঁত? সে আবার কী? উত্তেজনায় বাঁধানো দাঁত বলতে গিয়ে দাদু দাঁদানো বাঁত বলে ফেলেছে৷ সেই দাঁত রাগ কমে যেতে দাদু পরেছিলেন৷ অভ্যেসও হয়ে গেল, কিন্তু দাঁদানো বাঁত আর বাঁধানো দাঁত হল না৷ চিরকালের মতো উলটে রইল৷ সোজা আর হল না৷ যখনই বলেন, ওই ব্যাপার আমার দাঁদানো বাঁত৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন