হাসি কান্না চুনি পান্না

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি যখন ছোট ছিলুম তখন আমার খুব কাশি হতো৷ হলেই হল৷ শুকনো কাশি, সে বড় ভয়ঙ্কর৷ তার কোনও কমা, ফুলস্টপ থাকে না৷ খ্যাকোর-খ্যাকোর চলছে তো চলছেই৷ যে কাশে তার তো কষ্ট হয়ই, যাঁরা শোনেন, তাঁদের কষ্ট আরও বেশি৷ কাশি তো আর গান নয়, যে সবাই শুনে মোহিত হয়ে যাবেন৷ কোনও কারণে থামলে বলবেন, ‘থামলে কেন, থামলে কেন, চলুক-চলুক, বেশ হচ্ছে৷’ কাশির ধর্মই হল সূর্য ডোবার পরই বাড়বে৷ অন্ধকারে যেমন প্যাঁচা বেরোয়, বাদুড় বেরোয়, সাপ, কীট-পতঙ্গ বেরিয়ে আসে৷ গর্ত ছেড়ে পিলিপিল করে, কাশিও তেমনি মনের আনন্দে গলার গর্ত ছেড়ে বেরোতে থাকে, যত রাত বাড়ে তত কাশি বাড়ে৷

আমার বাবা বলতেন, ‘ভাগ্য ভালো হলে এই রকমই হয়, বিনা আয়াশে কাশীবাস৷’ মাঝে-মাঝে গবেষণা করতেন, ‘আচ্ছা কীভাবে তুমি এটা করো? কায়দাটা কি? পড়ার ভয়ে নকল কাশি বলেও তো মনে হয় না৷ শতকরা একশো ভাগ খাঁটি কাশি৷ মুখ আড়াই ইঞ্চি ফাঁক, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, একেবারে খোলতাই কাশি৷ আচ্ছা, তোমার একটু বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে না৷ সিনেমার হাফটাইম আছে, ফুটবল খেলার হাফটাইম আছে, বড়-বড় যুদ্ধেও কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি হয়৷ তোমার কি একটু ইন্টারভ্যাল নিতে ইচ্ছে করে না?’

এর আমি কি উত্তর দোবো! কাশি একেবারে একটা স্বাধীন জিনিস৷ গলার গর্তে বসবাস করে৷ যেই রাত নামে খোল-করতাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে৷ বাবাকে উত্তর দিলেন জ্যাঠামশাই৷

তোমার মতো বুদ্ধিমান, বিবেচক এক মানুষ, এমন একটা ছেলেমানুষী প্রশ্ন করতে পারলে?’

‘হ্যাঁ, পারলুম৷ কাশিটা হল শুকনো কাশি৷ আসছে পেট থেকে৷ গঙ্গার উৎস যেমন গোমুখী, শুকনো কাশির উৎস হল তেমন পেট৷ পেট থেকে কাশি বেরিয়ে আসছে কী ভাবে? গরমে৷ উপমা ছাড়া তুমি বুঝবে না৷ আমাদের চৌকিতে ছারপোকা হলে কি করি? গরম জল ঢালি৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘প্রশ্ন আছে৷ পেট কি চৌকি? কাশি কি ছারপোকা? অসম উপমা হল৷ তুমি উপমা পালটাও৷ প্রাণীর সঙ্গে অপ্রাণী, অপ্রাণীর সঙ্গে প্রাণীর উপমা চলে না৷’

‘কেন চলে না? আমরা বলি না, খেয়েদেয়ে সে তাকিয়ার মতো পড়ে আছে৷ আমরা বলি না, শোকে পাথর হয়ে গেছে৷ আমরা পড়িনি, পলাশীর যুদ্ধে মিরজাফর দাঁড়িয়ে রইলেন কাষ্ঠপূত্তলিকাবৎ! রোগা, শীর্ণ মানুষকে আমরা বলি বৃষকাষ্ঠ৷ তোমার স্বভাবটাই হল, কারণে অকারণে প্রতিবাদ৷’

জ্যাঠামশাই হারবার মানুষ নন৷ তিনি বললেন, ‘ও-সব উপমাগুলো দীর্ঘদিন চলে আসছে৷ তুমি হঠাৎ একটা নতুন উপমা যথেষ্ট প্রচার ছাড়াই চালাতে চাইছ৷ সুধিজন নেবে কেন! তুমি যদি গায়ের জোরে বলতে চাও, শসার ইংরেজি শসকুইটো!’

‘সে আবার কি? আমি তা বলব কেন?’

‘কেন বলবে না! মশা যদি মসকুইটো হয়, শসা কেন শসকুইটো হবে না! তুমি বলতেই পারো৷ তোমার পক্ষে সবই সম্ভব৷’

‘আজ্ঞে না৷ সম্ভব নয়৷ ল্যাঙ্গোয়েজ পাল্টানো যায় না৷ উপমা আমি মাথা খাটিয়ে নতুন-নতুন বের করতে পারি৷ সে স্বাধীনতা আমার আছে৷ তোমারও আছে!’

‘বেশ, তাহলে আমার প্রতিবাদ তুলে নিলুম৷ বলো তুমি৷’

‘আর বলো! এমন ঘুরপাক খাইয়ে দিলে সব গুলিয়ে গেল৷ তার ওপর কানের কাছে এই ননস্টপ কাশি৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘আমার যতদূর মনে পড়ছে তুমি ভাগীরথীর উৎস সন্ধানের কথা বলছিলে৷’

আমি কোনওরকমে কাশির দমক চেপে বললুম, ‘আজ্ঞে না, কাশির উৎস-সন্ধানে৷’ বলার ফাঁকে-ফাঁকে ভুকভুক হচ্ছিল৷ শেষ হওয়ামাত্রই মাঝরাতের কুকুরের মতো ভৌ-ঔ-ঔ করে পেল্লায় এক ডাক ছাড়লাম৷

বাবা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ফ্যান্টাস্টিক! মানুষ যে এইভাবে ডাকতে পারে আমার কোনও ধারণাই ছিল না৷ তুমি একটা দেখালে বটে!’

জ্যাঠামশাই সংশোধন করে দিলেন, ‘ওটা ডাক নয়৷ কাশি৷ বাঁধ ভেঙে যেমন জল বেরিয়ে আসে সেইরকম৷ চাপা ছিল, তেড়ে বেরিয়ে এল৷’

‘পেট গরম হয়েছে৷ কেন হয়েছে? না কুপথ্য করেছে৷ তেলেভাজা, চানাচুর, আচার, ঝাল আলুর দম৷ পেঁয়াজি, পাঁপড়৷ এর পেছনে কাঁচা পয়সার খেলা আছে৷ দুপুরবেলা আইসক্রিম আছে৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘আইসক্রিম ঠান্ডা৷’

বাবা বললেন, ‘সংশোধনের প্রয়োজন আছে৷ ধারণার সংশোধন৷ আইসক্রিম ঠান্ডা নয়, গরম৷ যত আইসক্রিম খাবে ততই পেট গরম হবে৷ এখন একটু অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়ে পড়ছে৷ এর হাতে কাঁচা পয়সা দিচ্ছে কে? পয়সার উৎসটা কোথায়?’

‘তুমি তো কাশির উৎস সন্ধান করছিলে হঠাৎ পয়সায় চলে গেলে৷ পয়সার উৎস তো টাঁকশাল৷’

‘আবার আমাকে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে৷ এর কাশি৷ শুকনো কাশি৷ মানে পেট গরম৷ পেটে গরমাগরম জিনিস ঢুকছে৷ জিনিস এমনি আসে না৷ পয়সা লাগে৷ সেই পয়সা এ পাচ্ছে কোথা থেকে? কেউ দিচ্ছে আদর করে৷ সেই কেউটা কে?’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘সেই কেউ তো তোমার সামনে বসে আছে৷ আমিই তো সেই কেউ৷’

‘তুমি? তুমি এইভাবে ওর ফিউচারটা নষ্ট করছ! তুমি পয়সা দিচ্ছ, আর ও সেই পয়সায় যা-তা কিনে-কিনে খাচ্ছে৷ আর কেশে-কেশে আমাদের শুধু নয়, গোটা পাড়ার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে৷ কোনও অচেনা মানুষ আমাদের বাড়ি জানতে চাইলে, পাড়ার লোক কীভাবে চেনায় জানো, সোজা চলে যান, কাশির শব্দ শুনতে পাবেন৷ ওইটাই প্রকাশবাবুদের কাশীধাম৷ এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে অপমানের কি আছে!’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘এইটাই তো খাওয়ার বয়স৷ এই বয়সে খাবে না তো কোন বয়সে খাবে?’

‘কাঁচা পয়সা হাতে না দিয়ে, ঠান্ডা-ঠান্ডা জিনিস কিনে দাও৷’

‘কোন-কোন জিনিস ঠান্ডা?’

‘যেমন ধরো বাতাসা, কুমড়োর বরফি, পাকা পেঁপে, ডুমুর, মুড়কি, খই, চিড়ে, কদমা৷’

‘খাস্তা কচুরি, ঝুরিভাজা ডালবড়া৷’

‘বিষ, বিষ৷ ঘিয়ে ভাজা কোনও কিছু চলবেই না৷ হালকা, সহজে হজম হয় এমন জিনিস খেতে হবে৷’

‘আচ্ছা ওর টনসিলটা একবার দেখালে হয় না৷ কাশি টনসিল থেকেই হয়৷’

‘পেট থেকেও হয়৷’

‘বুক থেকেও হয়৷’

‘এটা পেটের৷’

‘এটা গলার৷’

‘আমি বলছি, এটা পেটের৷’

‘আই সে ইট ইজ থ্রোট৷’

‘আই সে দিস ইজ বেলি৷’

‘থ্রোট৷’

‘বেলি৷’

‘থ্রোট, বেলি, বেলি থ্রোট’ শুনে অন্দরমহল থেকে সবাই ছুটে এলেন৷ সবার আগে এলেন দাদু৷ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কীসের এই শব্দকল্পদ্রুম!’

আমি ভয়ে-ভয়ে বললুম, ‘কাশির৷’

‘ইংরিজি কাশি?’

‘বাংলা কাশিটাই হঠাৎ কী ভাবে ইংরিজি হয়ে গেল৷’

‘সায়েবদের কীর্তি৷ ছিল কাশী, হল বারাণসী, শেষে বেনারস৷ তা তোমাদের এই ভয়ঙ্কর ফাটাফাটির কারণটা জানতে পারি? আমার পুজো মাথায় উঠে গেল৷’

দাদু পুজোর কাপড় পরে আছে৷ হাতে জপের মালা দুলছে৷

বাবা বললেন, ‘এ কাশি পেটের৷’

জ্যাঠামশাই টেবিল চাপড়ে বললেন, ‘আলবাত নয়৷ এ কাশি গলার৷’

দাদু বললেন, ‘কার কাশি!’

বাবা আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে এক খ্যাঁকখেঁকে কাশি৷ আপনিই বলেছিলেন, শুকনো কাশি পেটের কাশি৷ পেট গরম হলেই হয়৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘ও আপনি বলেছিলেন, তাহলে আমি তর্ক করতুম না৷ বেশ, এটা পেটের কাশি৷ নেকস্ট পয়েন্ট, সারবে কীসে?’

দাদু বললেন, ‘ভেরি সিম্পল৷ নেচারোপ্যাথি৷ গঙ্গার মাটি গুঁড়ো করে, মিহি করে, তিলের তেল মিশিয়ে জল দিয়ে কাদাকাদা করে, তল-পেটে লেপে দাও৷ আর তিনদিন শুধু লাউপথ্য৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘লাউপথ্য কাকে বলে?’

দাদু বললেন, ‘ভেরি সিম্পল৷ লাউ যার পথ্য৷ তুমি তো আবার সায়েবমানুষ, নিরামিষের খবরই রাখো না৷ সাদা-সাদা, লম্বা-লম্বা এক ধরনের ফল আছে, তার নাম লাউ৷ সংস্কৃত হল অলাবু৷ চিংড়ির সঙ্গে ভোগীর প্রিয়, প্লেন অ্যান্ড সিম্পল হল যোগীর আহার৷ শুদ্ধসত্ত্ব৷ সেই লাউ সেদ্ধ করা থাকবে৷ খিদে পেলেই খাও৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘মরে যাবে৷ কাশির সঙ্গে কেশো দুজনেই চলে যাবে৷ তা ছাড়া পেটে ওই মাটির প্রলেপ, নিমোনিয়া হয়ে যাবে৷’

বাবা বললেন, ‘তোমার অ্যানাটমির জ্ঞান সাংঘাতিক৷ কোথায় পেট আর কোথায় লাংস! এগুলো তো একটু শিখতে পারো৷ ভাস্ট ইগনোরেন্স৷ অজ্ঞানের আটলান্টিক৷’

দাদু বললেন, ‘সংযম, সংযম৷ ব্রাইড্ল ইওর টাং৷ যে জানে না, তাকে তিরষ্কার কোরো না৷ তাকে বোঝাও৷ তবে হ্যাঁ, একটা সম্ভাবনা আছে, আমাশা হয়ে যেতে পারে৷ সে তবু মন্দের ভালো৷ বিনিদ্র রজনী কাটাতে হবে না৷ আর আমাশার সহজ ওষুধ, থানকুনি পাতা৷ বাটো আর খেয়ে নাও একদলা৷’

আমি বললুম, ‘দাদু, আপনি বলেছিলেন, আমাশার ওষুধ গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি৷’

‘হ্যাঁ, সেটাও হতে পারে৷’

‘তাহলে আজই আমার পেটে মাটি লেপে দিন৷’

‘এই রাতে তো তা সম্ভব নয়৷ কাল নিজে পুলটিস তৈরি করে তোমাকে অয়েল ক্লথে ফেলে হবে৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘হোয়াই নট হোমিওপ্যাথি?’

বাবা বললেন, ‘হোয়াই নট নেচারোপ্যাথি!’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘কারণটা রোগীর পক্ষে অতিশয় অপমানজনক৷ ওর বয়সের একটা ছেলে অয়েল ক্লথের ওপর উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে, আর তলপেটে একগাদা মাটি৷ সেই সময় ওর বন্ধুরা যদি কেউ ডাকতে আসে৷’

বাবা বললেন, ‘তখন বলা হবে, দেখা হবে না৷ ও এখন নেচার ক্লিনিকে মাড বাথ নিচ্ছে৷ হয়ে গেল, মিটে গেল ঝামেলা৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘এটা একটা টর্চার৷’

দাদু বললেন, ‘আর এক হয় কবিরাজি৷’

বাবা বললেন, ‘কবিরাজিতে আমার অ্যাবসলিউটলি কোনও ফেথ নেই৷ খল, নুড়ি ডালপালা৷’

দাদু বললেন, ‘তোমার তো কোনও কিছুতেই বিশ্বাস নেই৷ তা তুমি তাহলে তোমার মতেই চলো৷’

‘আজ্ঞে না, আমি ডিকটেটার নই৷ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী৷ ছেলে হল, একটা স্টেট, একটা রাজ্যের মতোই৷ এই বাড়ির সবাই যা ব্যবস্থা নেবেন তাই হবে৷ আর আমি তো আপনার কর্দমচিকিৎসা সমর্থন করেছি৷ এর পর তো আর কোনও কথা নেই৷’

অন্দরমহল থেকে ডাক পড়ল, ‘আর ভালো লাগছে না কাশিপর্ব, এইবার আহারপর্বে আসতে হবে৷ বাবা, আপনার পুজো শেষ করে নিন তাড়াতাড়ি৷’

দুই

খাবার ঘরে পরপর আসন পড়েছে৷ রান্নাঘরে বামুনদি প্রাণ খুলে লুচি ভাজছেন৷ গন্ধে জিভে জল এসে যাচ্ছে৷ নতুন ফুলকপি উঠেছে৷ বড়-বড় বেগুনভাজা৷ মা আর জ্যাঠাইমা খুব ব্যস্ত৷ আমি ছোট বলে, আমার ছোট থালা৷ দু-খানা ধবধবে সাদা ফুলকো লুচি পড়েছে পাতে৷ বেগুনভাজা পাশ ফিরে শুয়ে আছে৷ হঠাৎ বাবা বললেন, ‘না, না, অসম্ভব৷ লুচি খাবে কি? যার এই ভয়ঙ্কর কাশি৷ পেটে বেশি লোড চাপানো ঠিক হবে না৷ লাইট, ভেরি লাইট৷’

জ্যাঠামশাই ফুলকো লুচিতে একটা আঙুল ঢোকালেন৷ ফুস্ করে একটু ধোঁয়া বেরিয়ে গেল৷ দাদু চোখ বুজিয়ে ঈশ্বরকে নিবেদন করেছেন৷ দাদু চোখ খুলে বললেন, ‘কি বললে?’

‘ওর লাইট কিছু খাওয়াই উচিত৷ লুচি, কপি, ভেটকি মাছ রাত্তিরে চলবে না৷’

‘কি চলবে তাহলে?’

‘খই দুধ৷’

‘ও খই-দুধ খাবে৷ আমরা খাব রাজভোগ? এ যে দেখি কাজির বিচার!’

‘ওর কাশি ভদ্রতার সমস্ত লিমিট ছাড়িয়ে গেছে৷ এরপর আমাদের ওপর পাড়া ছাড়ার নোটিস আসবে৷’

‘শোনো, বাইবেলে আছে, হেট দি সিন, নট দি সিনার৷ কাশিকে মারো, ছেলেটাকে মেরো না৷ ও যা খাচ্ছে তাই খাবে৷ তোমাদের ঘরে শুলে যদি অসুবিধে হয়, ও আমার কাছে শোবে৷ আমি সারারাত জেগে থাকি, ও-ও সারারাত জাগবে আমার সঙ্গে৷ সংস্কৃতে উইক৷ সারারাত ওকে আমি সংস্কৃত পড়াব৷ দেখো অসুখটার নাম কাশি৷ মহাতীর্থের নাম কাশী৷ কাশির কল্যাণে যদি মহাপণ্ডিত হতে পারে, সেটা হবে শাপে বর৷’

সংস্কৃতের নাম শুনে লুচি আমার মাথায় উঠে গেল৷ বললুম, ‘থাক গে, আমি খাব না৷’

জ্যাঠামশাই আমার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘নির্ভয়ে খাও৷ আমি আছি, তুমি আমার কাছে শোবে৷ তেমন হলে সারারাত তোমাকে আমি গল্প শোনাব৷ এভারেস্ট অভিযানের গল্প অ্যান্টার্টিক অভিযানের গল্প৷ সাহারার গল্প৷’

‘সমস্ত দায়িত্ব তোমাদের৷’ বাবা আহার শুরু করেদিলেন৷

জ্যাঠামশাই আমাকে বললেন, নির্ভয়ে চালিয়ে যাও৷ লুচি তোমার ফেভারিট সাবজেক্ট৷ ফুল মার্কস পাওয়া চাই৷

শেষ পাতে এল ক্ষীর৷ বাবা বললেন, ‘চুড়ান্ত বাড়াবাড়ি৷ হোল ফ্যামিলি আজ জাগবে৷’

দাদু বললেন, ‘কেন অশান্তি করছ৷ তুমি তো সারারাত জেগে-জেগে অঙ্ক করো৷ কত ঘুমোও সে তো জানাই আছে৷ শেষ পাতে ক্ষীর শাস্ত্রের বিধান৷ অশাস্ত্রীয় কাজ কেমন করে হয়!’

‘আর একটু পরে শাস্ত্র, অশাস্ত্র সব বেরোবে গলা ফেঁড়ে৷’

খাওয়া শেষ হল৷ জ্যাঠামশাই কানে-কানে বললেন, ‘তুমি কিছুক্ষণ আমার ঘরে থাকো৷ দুম করে এখনি শুতে যেয়ো না৷’

লুচি দেখলে আমার জ্ঞান থাকে না৷ খেয়েছিও তেমনি৷ পরিণামের কথা না ভেবেই৷ পেট ফুলে জয়ঢাক৷ এতক্ষণ কাশি বন্ধ ছিল৷ লক্ষ করেছি অন্যমনস্ক থাকলে কাশতে ভুলে যাই৷ পড়তে বসলেই কাশি আসে৷ স্কুলে গেলেই কাশি পায়৷ আবার অঙ্কের স্যার ক্লাসে এলেই মারের ভয়ে কাশি চুপ করে যায়৷ আমার কাশিটা মহাপাজি আছে৷

সব কাজ শেষ করে জ্যাঠাইমা ঘরে এলেন৷ জ্যাঠাইমা আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন৷ আঁচল থেকে একটা কাগজের মোড়ক খুলে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এতক্ষণ বসে-বসে তোমার জন্যে এই দাওয়াইটা করে এনেছি৷ আমার মায়ের কাছে শেখা৷ তালমিছরি, যষ্ঠিমধু, মরিচ, পিপুল আর লবঙ্গ সব একসঙ্গে হামানদিস্তেতে ফেলে গুঁড়ো করা৷ খেতেও ভালো৷ যেই কাশি পাবে মুখে একচিমটে ফেলে দেবে৷ সঙ্গে-সঙ্গে কাজ৷’ জ্যাঠামশাইকে বললেন, ‘দুজনে মুখোমুখি বসে থ্রোট, বেলি, বেলি থ্রোট না করে, ছেলেটাকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও না৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘একার মতে হবে না৷ মিটিং কল করে সকলের পরামর্শ নিয়ে করতে হবে৷ কোন ডাক্তার? অনেক ডাক্তার আছেন৷’

‘তাহলে কাল সকালে, চায়ের সময় মিটিং ডাকো৷’

‘তাহলে আজ রাতেই নোটিস দিতে হবে৷’

‘দিতে হবে তো দিয়ে এসো৷ আর ফেলে রাখা যায় না৷ ছেলেটার কষ্ট হচ্ছে৷’

বাবা বলছিলেন, ‘ছোটরা যত কাশে ততই ভালো৷ পেট বড় হয়৷ বেশি খেতে পারে৷ এই বয়সে যত খাবে ততই স্বাস্থ্য বাড়বে৷’

‘আর পেট বেড়ে দরকার নেই৷ তুমি কাজের কাজ করো৷’

জ্যাঠামশাই ঘর ছেড়ে চলে গেলেন৷ জ্যাঠাইমা বললেন, ‘তোমার মাকে দিয়ে হবে না৷ নিরীহ, ভালোমানুষ৷ ব্যাটাছেলেরা কিছু না করলে, এইবার আমাকেই চেঁচামেচি করে একটা কিছু করতে হবে৷ ডক্টর ভট্টাচার্য আমাকে খুব চেনেন৷ চেম্বারে নয়, সোজা বাড়িতে নিয়ে যাব৷ তোমাকে একটা কায়দা শিখিয়ে দি, যখনই কাশি পাবে, একটা ভালো কিছু ভাববে৷ মনে করবে, তুমি একটা সমুদ্রে ভাসছ৷ ছোট্ট একটা নৌকো৷ ঘন কালো রাত৷ আকাশে ছড়িয়ে আছে খইয়ের মতো তারা৷ শুধু জল আর জল৷ ফসফরাস জ্বলছে ঢেউয়ের মাথায়৷ বহুদূরে একটা জাহাজ নাচছে৷ কেবিনে-কেবিনে পুটপুট আলো জ্বলছে৷ তোমার কাছে রেডিও সংকেত পাঠাবার একটা যন্ত্র৷ তুমি চেষ্টা করছ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার৷ মাঝে-মাঝে পারছ, মাঝে কেটে যাচ্ছে৷ ঢেউ ছিটকে আসছে৷ জাহাজটার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে মহাবিপদ৷ চোখের সামনে দেখার চেষ্টা করবে সমুদ্র, আকাশ, তারা, জাহাজ, ঢেউ৷ গায়ে তোমার ঠান্ডা বাতাস লাগবে৷ এইটা যদি করতে পারো, তোমার কাশি থেমে যাবে৷ আরও একটা কায়দা আছে, মনে করো তুমি একটা মই বেয়ে ধাপে-ধাপে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছ৷ নারকেল গাছের মাথা৷ মাথা ছাড়িয়ে আরও উঁচু৷ আরও-আরও উঁচু৷ পৃথিবীর বাড়ি-ঘর সব অদৃশ্য৷ মেঘের মধ্যে ঢুকে গেছে৷ মেঘ ছাড়িয়ে আকাশের আরও উঁচুতে৷ তারাগুলো ক্রমশই বড় হচ্ছে৷ চাঁদ ছাড়িয়ে উঠে যাচ্ছে আরও উপরে৷ তুমি উঠছ, তুমি উঠছ৷ কি মজা! জানো তো এই ভাবে ধ্যান করতে হয়৷ এতে মন ভালো হয়৷ মন একাগ্র হয়৷ লেখাপড়া ভীষণ ভালো হয়৷ তুমি রাতে শুয়ে-শুয়ে অভ্যাস করবে৷

জ্যাঠামশাই ঘরে এলেন, এসে বললেন, ‘ঘরে-ঘরে গিয়ে নোটিস জারি করে এলুম৷ সকাল সাড়ে সাতটায় মিটিং৷ তোমরা সব যোগ দেবে, উইদাউট ফেল৷’

আমার পেল্লায় একটা হাই উঠল৷ জ্যাঠামশাই আমাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘ঘুম আসছে বাপি?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘এই ছেলেটা ভীষণ ভালো৷ কাশি একটু কম?’

‘এখন আর হচ্ছে না৷’

‘তাহলে শোওয়ার চেষ্টা করে দেখবে?’

‘তাই দেখি৷’

‘গুড নাইট৷’

‘গুড নাইট৷ জ্যাঠাইমা গুড নাইট৷’

‘গুড নাইট সোনা৷’

দাদুর ঘরের সামনে দিয়ে যেতে-যেতে দেখলুম, দাবা-বোড়ের ছক সাজিয়ে বসেছেন৷ বৃদ্ধ মানুষ, রাতে ঘুম আসে না, একা-একা জাগেন৷ ভোরের দিকে শুয়ে পড়েন৷ ঘণ্টাখানেকের ঘুম৷ বাবা টেবিলে৷ টেবল ল্যাম্প জ্বলছে৷ গণিতের মোটা বই খোলা৷ অঙ্ক তাঁর খেলা৷

মায়ের পাশে আস্তে-আস্তে শুয়ে পড়লুম৷ টেবিলের আলোটা এমনভাবে ঢাকা দেওয়া যাতে আমাদের চোখে না লাগে৷ বাবার সামনে মা আমাকে আদর করার সাহস পান না৷ বাবা বলে দিয়েছেন, ছেলেদের বেশি আদর দেবে না৷ বেশি আদরে সব আলালের ঘরের দুলাল তৈরি হয়৷ আদর মনে রাখবে৷

বাবা অঙ্কে ডুবে আছেন৷ এই সুযোগে মা আমাকে একটু আদর করে নিলেন৷ মা আমাকে পাশ-বালিশের মতো জড়িয়ে ধরে শুতে ভীষণ ভালোবাসেন৷ আর ওই সময়টায় মনে হয়, আমি যেন স্বর্গে আছি৷ আমার মা তো ভীষণ ভালো৷ জ্যাঠাইমা বলেন, ‘ভগবান তোকে কোন মাটি দিয়ে তৈরি করেছিল রে উমা৷’ মায়ের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকার সময় মনে হয়, আমার কোনও ভয় নেই, দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, কাশি নেই, মা ছাড়া পৃথিবীতে আমার কেউ নেই৷ মায়ের একটা নরম হাত আমার পিঠের ওপর দিয়ে ওপাশে চলে গেছে৷ ভারী একটা পা আমার কোমরে৷ আলতো একটা হাত আমার চুলে৷ মায়ের শরীর সবসময় বরফের মতো শীতল৷ গা দিয়ে হালকা একটা গোলাপের গন্ধ বেরোয়৷ জ্যাঠাইমা বলেন, সারাক্ষণ যাঁরা ভগবানে মন ফেলে রাখেন, তাঁদের চেহারায় একটা আলো ফোটে, শরীর পদ্মফুলের মতো নরম, ঠান্ডা হয়৷ সুবাস আসে৷

মায়ের কোলের ভেতর আরামসে ঢুকে গিয়ে জ্যাঠাইমার শেখানো সেই ধ্যানটা অভ্যাস করতে লাগলুম৷ আমার মা যেন একটা সাদা নরম, পেঁজা তুলোর মতো মেঘ৷ আমি সেই মেঘে শুয়ে আছি৷ মেঘটা ধীরে-ধীরে আমাকে নিয়ে আকাশের দিকে উঠছে৷ ওপরে, আরও ওপরে৷ শেষে চলে এলুম চাঁদের কাছে৷

হঠাৎ বাবা, অঙ্কের খাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, ‘কি হল আর কাশছে না কেন?’

আমি তখন চাঁদের পাহাড়ে৷ পাহাড়টা রুপোর৷ হীরের ফুল ফুটে আছে৷ দুধের ঝরনা৷ মা বলছেন, ‘পেট খালি থাকলেই কাশি বাড়ে৷’

বাবা বলছেন, ‘অ্যাবসলিউটলি ভুল ধারণা, পেট ভরা থাকলে কাশি আরও বাড়ে৷’

মা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ আমি আমার দু-আঙুল দিয়ে মায়ের পাতলা-পাতলা ঠোঁট দুটো চেপে ধরলুম৷ মায়ের নাকে ছোট্ট একটা নোলক আছে৷ আমার দাদু পরিয়ে দিয়েছে৷ পাতলা নাকে নোলক নাকি ভীষণ মানায়৷ দুর্গা ঠাকুরের নাকে নোলক আছে৷ সেই নোলকটা আমার আঙুল ছুঁয়ে আছে৷

আমি কখন একসময় ঘুমিয়ে পড়লুম৷

তিন

দাদু সকালে বেশ কিছুক্ষণ গীতাপাঠ করেন অপূর্ব ভরাট সুরে৷ মা দাদুর সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজান৷ রাজস্থানি গালচে৷ সামনে বাগান থেকে তুলে আনা টাটকা কিছু ফুল সুন্দর একটা সাজিতে৷ দূরে ঘরের কোণে একটা ধূপ জ্বলছে৷ সামনের দেওয়ালে শ্রীকৃষ্ণের ছবি৷ রথ চালাতে-চালাতে অর্জুনের দিকে ফিরে তাকিয়ে কিছু বলছেন৷

বাবা এই সময়টায় ভয়ঙ্কর ব্যায়াম করেন৷ দেখলেই ভয় করে৷ ডন মারছেন তো মারছেন৷ লাফা-বৈঠক৷ আমি একদিন বাবার দেখাদেখি দুপুরে চেষ্টা করতে গিয়ে ঘাড়মুখ গুঁজরে অ্যায়সা উলটে পড়েছিলুম, শব্দে মা আর জ্যাঠাইমা দুজনেই বোনা ফেলে ছুটে এসেছিলেন৷ ধরাধরি করে তুলে, জিগ্যেস করলেন, ‘কোথা থেকে পড়লে? ঘরে তো কিছুই নেই৷ জানলায় উঠেছিলে বুঝি!’

‘বাবার মতো লাফা-বৈঠক মারার চেষ্টা করেছিলুম৷’

ব্যাপারটা কিন্তু বহুত সুন্দর, আর বাবা এত তাড়াতাড়ি মারেন, যেন ছবির মতো৷ এক লাফে সামনে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে বসে পড়েন, আবার এক লাফে পেছনের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েন৷ কোনও সময় গোড়ালি মাটিতে ঠেকে না৷ শরীরটা সামনে একটু ঝুঁকে থাকে৷ বৈঠকের স্পিড খুব সাংঘাতিক৷ পেন্ডুলামের মতো যাচ্ছেন, আসছেন, আসছেন, যাচ্ছেন৷

দুটো বিশাল মুগুর আছে৷ সব শেষে সেই মুগুর ভাঁজা৷ ঘেমে একেবারে নেয়ে যাবেন৷ সারা শরীরের গুলি ঠেলে-ঠেলে উঠবে৷ বুকটা পাথরের মতো চওড়া হয়ে যাবে তখন বাবার কাছে যেতে ভয় করে৷

জ্যাঠামশাই এই সময়টা সবচেয়ে ভালো কাটান, আমার মতে৷ ধবধবে সাদা একটা ধুতি দু-ভাঁজ করে পরা৷ দুধের মতো সাদা হাতলা গেঞ্জি৷ নিচের বাগানে বিশাল এক বাঁধানো চৌবাচ্চা৷ ভরতি জল, টলটল করছে৷ সেই জলে অসংখ্য মাছ৷ জ্যাঠামশাই একটা-একটা করে মুড়ি ফেলছেন৷ এক একটা মাছ লাফিয়ে উঠে কপাক-কপাক করে খাচ্ছে৷ কখনও এক মুঠো ফেলছেন, মাছের ঝাঁক তেড়ে আসছে৷ গাছের ডালে পাখি৷ নানারকম৷ দোয়েল, বুলবুলি, শালিক, গাংশালিক, ছাতারে, টুনটুনি, চড়াই৷ তাদের জন্যেও ব্যবস্থা আছে৷ মুঠো-মুঠো ডাল৷ জ্যাঠামশাই একবার পাখিদের দিচ্ছেন, একবার মাছেদের৷ আমি সবসময় জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গী৷

জ্যাঠাইমা এই সময় ব্যস্ত থাকেন চায়ের পাট নিয়ে৷ খুব ভোরে তাঁর স্নান হয়ে যায়৷ মা-জগদ্ধাত্রীর মতো জ্বলজ্বল করে তাঁর মুখ৷ পরিষ্কার শাড়ি৷ কুচকুচে কালো চুল৷ দাদু চায়ের ব্যাপারে ভয়ঙ্কর খুঁতখুঁতে৷ জ্যাঠাইমা চা না করলে তিনি খেতে পারেন না৷ একটু খেয়েই ফেলে দেন৷ জ্যাঠাইমার একেবারে ঘড়ি ধরা সময়৷ ঠিক সাতটা বাজল৷ জ্যাঠাইমা দোতলার বারান্দা থেকে ডাকলেন, ‘সব চলে এসো৷ চা হয়ে গেছে৷’

জ্যাঠামশাই সব মুড়ি একেবারে চৌবাচ্চায় ফেলে দিলেন, ডালগুলো ছড়িয়ে দিলেন মাটিতে৷ দিয়ে বললেন, ‘চলো চলো, মিটিং অ্যাটেন্ড করতে হবে৷’

‘আমার যে মাস্টারমশাই আসবেন৷’

‘আরে কতক্ষণের ব্যাপার! মাস্টারমশাইকেও আমরা মিটিং-এ নিয়ে নেব৷ তাঁর মতামতেরও দাম আছে৷ তিনি তোমার শিক্ষক৷ প্রবীণ মানুষ৷’

ঠিক সাড়ে সাতটার সময় শুরু হল৷ বাইরের ঘর একেবারে জমজমাট৷ দাদুর পাশে আমার মাস্টারমশাই৷ উলটোদিকে পাশাপাশি বাবা আর জ্যাঠামশাই৷ বাঁ-দিকে মা আর জ্যাঠাইমা৷ ডানদিকে আমি একা পড়ে গেছি৷ ভয়-ভয় করছে৷ অস্বস্তি লাগছে৷ হঠাৎ যদি সবাই বলেন, ‘একে হাসপাতালে ভরতি করে দাও৷ টনসিল অপারেশান৷’

দাদু বললেন, ‘কাঁটায়-কাঁটায় সাড়ে সাতটা৷ লেট আস বিগিন৷ শঙ্করবাবু...৷’

শঙ্করবাবু আমার মাস্টারমশাইয়ের নাম৷ ভয়ঙ্কর রাশভারী মানুষ৷ গম্ভীর গলা৷ তেমনি পণ্ডিত৷

দাদু বলছেন, ‘শঙ্করবাবু, আমাদের প্রধান সমস্যা হল কাশি৷ কাশি কমছে না৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘কার কাশি?’

‘আপনার ছাত্রের৷’

‘ছোটদের কাশি-সর্দি হতেই পারে৷ তার জন্যে এত চিন্তার কি আছে!’

বাবা বললেন, ‘কাশি সমস্ত ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছে৷ ও তো আর কথা বলারই সুযোগ পাচ্ছে না, শুধু কেশেই যাচ্ছে৷ ওর জন্যে তো তাহলে নতুন ভাষা তৈরি করতে হবে, কাশির ভাষা, পাখির ভাষার মতো৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘এই তো এতক্ষণ বসে আছে, একবারও কেশেছে?’

সবাই হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ আমি যেন এক বীর৷ না কেশে ফার্স্ট হয়েছি৷ সোনার মেডেল পেয়েছি৷ বাবা বললেন, ‘সত্যিই তো, তখন থেকে বসে আছে, খুক্-খুক্ খ্যাঁকখ্যাঁক কিছুই নেই৷ কি করে এমন হল?’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘বুঝতে পারলেন না, সাইকোলজিক্যাল কারণ৷ যখন নিজেতে নিজে থাকে মনটা চলে যায় কাশিতে৷ কাশি হল গলার ইরিটেশান৷ সেই জায়গাটা উত্তেজিত হয়৷ আর ও যখন দেহের বাইরে নিজেকে ভুলে থাকে তখন কাশি হয় না৷ এটা নার্ভের ব্যাপার৷’

বাবা বললেন, ‘তাহলে ও বাইরেই থাক না৷’ জ্যাঠামশাই মনে হয় একটু অন্যমনস্ক ছিলেন, চমকে উঠে বললেন, ‘বাইরে থাকবে কি? এই রোদে রাস্তায়-রাস্তায় কোথায় ঘুরবে!’

বাবা বললেন, ‘ঠিক এইরকম৷ তোমার দেহটা এইখানে, মনটা অন্য জায়গায়, আগের কথা কিছুই শোনেনি৷ সত্যি কথা বলবে, একটু আগে তুমি কোথায় ছিলে?’

‘নাটাগড়ের একটা পুকুরের ধারে৷’

‘সেখানে কি করতে গিয়েছিলে?’

‘মাছ ধরতে৷’

‘ঠিক সেইরকমের বাইরে থাকা৷ মনটাকে দেহের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘কাল ওকে আমি সেই কায়দাটা শিখিয়ে দিয়েছি৷ মনটাকে বেড়াতে পাঠিয়ে দেওয়া৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘ওয়েল ডান৷’

দাদু বললেন, ‘তাহলে তো হয়েই গেল৷ কাশি তো ওকে সাধনার দিকে নিয়ে যাবে৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘ওকে একবার জিগ্যেস করা যাক৷ আমি তো নাটাগড়ে বেড়াতে গিয়েছিলুম, ও তখন থেকে কোথায় গেছে৷’ জ্যাঠামশাই দুবার তালি বাজিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এই যে তুমি কোথায় আছো!’

আমি বললুম, ‘তখন থেকে আমি এখানে আছি৷’

বাবা প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে কাশছ না কেন?’

‘আজ্ঞে, মাস্টারমশাইয়ের ভয়ে৷ উনি কাল যে টাস্ক দিয়েছিলেন তার একটাও হয়নি৷’

বাবা আঁতকে উঠলেন, ‘টাস্ক করোনি? কি সর্বনাশ! কাল সারাদিন তাহলে কি করলে? মোস্ট ডিসগ্রেসফুল৷ অফুরন্ত ফাঁকি৷ এইভাবে তো কেরিয়ারটাই জখম হয়ে যাবে৷ আজ বাদে কাল কাশি ভালো হয়ে যাবে কিন্তু জীবন গঠনের জন্যে সময় বসে থাকবে না৷ দুপুরবেলা এর দায়িত্বে কে আছে? কাম ফরোয়ার্ড৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘আমি আছি৷’

বাবা একটু সমীহ হলেন৷ জ্যাঠাইমাকে ভয়, শ্রদ্ধা দুটোই করেন৷ বেশ নরম গলায় বললেন, ‘একটা দুপুর যে নষ্ট হয়ে গেল বউদি! অমূল্য একটা দুপুর!’

নষ্ট তো হয়নি ঠাকুরপো৷ তুমি যে টাস্ক দিয়েছিলে, সেই টাস্ক করতে-করতেই সন্ধে৷ ছেলে তো একটাই ঠাকুরপো!’

‘মাস্টারমশাই দিয়েছেন জানলে আমি দিতুম না৷ আমারটা না করলেই হতো৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘তাহলে কুরুক্ষেত্র হতো৷’

মাস্টারমশাই মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনারা কি আমার ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন?’

বাবা বললেন, ‘না, না, তা কেন, তা কেন?’

‘তাহলে আপনি কেন টাস্ক দিচ্ছেন? আমি তো একটা লাইন ধরে চলেছি, একটা মেথড৷ আমার পরিশ্রমের তো তাহলে কোনও মানে হয় না৷ এ তো আমার ইনসাল্ট! আমি আর পড়াব কি না, আমাকে ভাবতে হচ্ছে৷’

মাস্টারমশাইয়ের কথায় সকলের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল৷ দাদু হঠাৎ হাসতে-হাসতে বললেন, ‘মাস্টারমশাই, আপনাকে আমরা ভয়ঙ্কর শ্রদ্ধা করি৷ পরিবারেরই একজন ভাবি৷ আপনি জিনিসটাকে ওই ভাবে নেবেন না৷ না জেনে হয়ে গেছে৷ যেমন ভুল করে চায়ে দুবার চিনি, বা মনে করুন আমার দুই বউমা—রান্নাঘরে ডাল ফুটছে, এ একবার এক খাবলা নুন দিলে, ও আবার আর এক খাবলা৷ উদ্দেশ্য কারোরই অসৎ নয়৷ সবাই ভালো করারই চেষ্টা করছেন৷ একজন আর একজনকে সাহায্যই করতে চাইছেন৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘আপনাদের অনুমতি নিয়েই বলছি, টাস্কের ধরনটা সেই একই, অঙ্ক, ইংরেজি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ জ্যামিতির একস্ট্রা৷’

দাদু বললেন, ‘আহা তাই তো হবে! ভাত ডাল, তরকারি, তরকারি, ডাল ভাত, এই তো আমার পথ্য৷ মাস্টারমশাই, আপনি তাহলে প্রশান্ত চিত্তে মার্জনা করে দিন৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘দিলুম৷’

দাদু বললেন, ‘তাহলে আমরা পূর্ব বিষয়ে ফিরে যাই, কাশিতে৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘কেন অকারণ কালহরণ করছেন, এতক্ষণ ছেলেটাকে পড়ালে কাজ হতো৷’

দাদু বললেন, ‘আর পাঁচটা মিনিট৷ প্রসঙ্গটা যখন উঠেছে, তখন আপনার উপস্থিতিতে একটা সমাধান করে ফেলা যাক৷ ব্যাপারটা যখন নার্ভের, মানে মনস্তাত্বিক কারণ, তখন সেইরকম কোনও ডাক্তারের পরামর্শ নিলে কেমন হয়৷

বাবা বললেন, ‘মানে কোনও পাগলের ডাক্তার? এটা কি তাহলে পাগলের কাশি? শব্দটা করে কিন্তু ছাগলের মতো৷’

মাস্টারমশাই গম্ভীর মুখে বললেন, ‘পাগল কখনও কাশে না৷ পাগলদের কখনও কোনও অসুখ করে না, কারণ তারা অবোধ৷ বিশ্বাস করুন আমার আর কাশি-কাশি ভালো লাগছে না৷ পাগল ও নয়, পাগল আপনারা৷’

দাদু বললেন, ‘সংসারে একটিমাত্র ছেলে তো, তাই সবাই একটু বেশি উতলা হয়ে পড়ি৷’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘একটা কথা বলি মুকুজ্যেমশাই, বেশি মনোযোগ দেবেন না৷ ছেলেকে একটু হেলাফেলা করে মানুষ করাই ভালো৷ তাতে ভবিষ্যৎ ভালো হয়৷ আজ আপনারা ঘিরে আছেন, কাল যখন আপনারা থাকবেন না৷ কেউই চিরকাল থাকবে না৷ জগৎ-সংসারের নিয়ম আগে এলে আগে যেতে হবে, পরে এলে পরে৷ যাই হোক আমি এক কথায় সব সমাধান করে দিচ্ছি, ওকে আমি ডক্টর মজুমদারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি৷ শিক্ষার দায়িত্ব যখন আমার, স্বাস্থ্যের দায়িত্বও আমার৷’

বাবা বললেন, ‘পারফেক্ট সলিউশান৷’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘আমি বলেছিলুম, মাস্টারমশাই ঠিকই একটা রাস্তা বের করবেন৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘সকাল থেকেই আজ বেশ উত্তরের বাতাস ছেড়েছে, গলায় কি একটা মাফলার জড়িয়ে দেব?’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘হ্যাঁ, হঠাৎ একটু ঠান্ডা পড়েছে, সাবধান হওয়াই ভালো৷’

গলায় মাফলার জড়ালে ভীষণ বোকা-বোকা লাগে৷ তবু জড়াতেই হল৷ গুরুজনের আদেশ৷

চার

মাস্টারমশাইকে দেখেই ডাক্তারবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ গলায় স্টেথিসকোপ৷ ঘরভরতি রোগী৷ কেউ কোঁত পাড়ছেন৷ একজন অনবরত হেঁচেই চলেছেন৷ আমার কাশিরোগের মতো তাঁর হাঁচি রোগ৷ ডাক্তারবাবুকে খুব সুন্দর দেখতে৷

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘বলুন মাস্টারমশাই৷ কার অসুখ?’

‘এই ছেলেটাকে দেখতে হবে৷ আমার খুব প্রিয় ছাত্র৷ মুকুজ্যেমশাইয়ের নাতি৷ কাশি হয়েছে, কিছুতেই কমছে না৷’

‘আপনি পাশের ঘরে বসুন মাস্টারমশাই, আমি এখনি আসছি৷’

পাশের ঘরটা খুবই সুন্দর৷ বেশ সাজানো৷ দেওয়ালে মানুষের দেহের ভেতরের ছবি৷ আমাদের দেহের ভেতরটা বিশ্রী দেখতে৷ ঘেন্না করে৷ পেশী, শিরা, উপশিরা৷ দেখলেই ভয় করে৷ মাস্টারমশাই টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিলেন৷ আর দেখতে-দেখতে তলিয়ে গেলেন৷ আমি ছবি দেখছি৷ বাচ্চা ছেলে হাসছে৷ মায়ের কোলে ছেলে৷ বসে আছি৷ বসেই আছি৷ ঘরে একটা ঘড়ি৷ প্রায় একঘণ্টা পার হয়ে গেল মাস্টারমশাই তন্ময় হয়ে পাতার-পর-পাতা উলটেই যাচ্ছেন৷ গলায় আমার সাতপাট মাফলার৷ গরমে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে৷ দেড়ঘণ্টা হয়ে গেল৷ শেষে ভয়ে-ভয়ে মাস্টারমশাইকে বললুম, ‘দেড়ঘণ্টা হয়ে গেল৷’

পড়ায় ডুবে আছেন, বললেন, ‘হুঁ’৷

আরও পনেরো মিনিট পার হয়ে গেল, বললুম, ‘মাস্টারমশায়, দু-ঘণ্টা যে হয়ে গেল!’ এইবার চমকে উঠলেন, কারণ যে প্রবন্ধটা পড়ছিলেন, সেটা শেষ৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, সেকি দু-ঘণ্টা হয়ে গেল! আশ্চর্য! চলো দেখি৷’

পাশের রোগী দেখার ঘর একেবারে খালি৷ কেউ কোথাও নেই৷ পরিষ্কার সাজানো টেবিল৷ যেন ভোজবাজি৷ জাদুদণ্ড ঘুরিয়ে সব অদৃশ্য করে দিয়েছেন কোনও জাদুকর৷ মাস্টারমশাই বললেন, ‘কি হল ব্যাপারটা!’ ওপাশে আরও একটা ঘর৷ সেই ঘরে কম্পাউন্ডারবাবু ওষুধ তৈরি করেন৷ আমাদের গলা শুনে তিনি বেরিয়ে এলেন৷ মাস্টারমশাই প্রশ্ন করলেন, ‘আমাদের বসতে বলে কোথায় চলে গেল!’

কম্পাউন্ডারবাবু বললেন, ‘আপনারা বসেছিলেন পাশের ঘরে? ডাক্তারবাবু তো চেম্বার শেষ করে জরুরি কলে বেরিয়ে গেলেন৷’

‘কখন ফিরবে?’

‘তা তিনটে চারটে তো হবেই৷ অনেক কল আজ৷ আজকাল ওঁর ভীষণ ভুলোমন হয়েছে৷’

‘ডাক্তারের ভুলোমন হলে তো রোগীদের সমূহ বিপদ৷

‘আজ্ঞে, অল্প-বিস্তর বিপদ যে হচ্ছে না তাই বা বলি কেমন করে!’

মাস্টারমশাই আমার কাঁধে হাত রেখে সোজা রাস্তায় বেরিয়ে এসে বললেন, ‘জগৎটা কেমন মৌখিক, আন্তরিকতা-শূন্য, কমার্শিয়াল হয়ে যাচ্ছে দেখেছ! সবাই যেন সেলসম্যান৷ সবই যেন কথার কথা৷ আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রের ব্যবহার দেখে অবাক৷ কখনও আর এর কাছে আসব না৷ পসার হয়েছে, পয়সা হয়েছে৷ চলো, আমরা ক্যাপ্টেন মজুমদারের কাছে যাই৷ আমার সমবয়সি বন্ধু৷’

ক্যাপ্টেন মজুমদারের একখানা চেহারা বটে৷ আর্মিতে ছিলেন বোঝাই যায়৷ ক্রু-কাট চুল৷ সে আবার কি! জ্যাঠামশাই চুল কাটার সময় নানা ছাঁটের কথা বলেন৷ আমি শুনে শিখেছি৷ মাথার চারপাশ হোল সেল কামানো৷ মাঝখানে একেবারে টুথব্রাশ৷ দেখলে হাসিই পায়৷ ইচ্ছে করে নিজের মাথাটাকে কেউ এমন করে! কিন্তু করে৷ ক্যাপ্টেন মজুমদারের গোঁফ জোড়াও সেইরকম৷ এপাশে, ওপাশে দুপাশে শুঁড়ের মতো বেরিয়ে আছে৷ লোহার মতো পেটানো শরীর৷

‘মাস্টারমশাই আপনি?’ বললেন, যেন বোমা ফাটল৷

মাস্টারমশাই বললেন, ‘হ্যাঁ আমি৷ কোনও অসুবিধে আছে?’

‘না, অসুবিধে কীসের? তবে আপনার তো কখনও অসুখ করে না!’

‘করেও নি৷ অসুখ করেছে আমার এই ছাত্রটির৷’

‘দেখেই বুঝেছি৷৷ অসুখের ডিপো৷ ওই কয়লার ডিপো, কেরোসিনের ডিপোর মতো৷ ওর তো টনসিল৷ পুরোপুরি টনসিলের চেহারা৷ নার্ভেরও গোলমাল আছে৷’

‘টনসিলটা হয়তো ঠিক বলেছ, এইটুকু ছেলের আবার নার্ভ কি?’

‘জিগ্যেস করুন, ও ভীষণ নার্ভাস৷ খোকা, তুমি আরশোলা দেখলে দৌড়োও না?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, একবার এমন দৌড়েছিলুম বারান্দা থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিলুম আমাদের একতলার কলঘরের ছাতে৷’

‘আহা বেরিয়ে কেন বলছ? বলো রেলিং ভেঙে৷’

‘আজ্ঞে, তাই হয়তো হবে৷’

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘মাস্টারমশাই আপনার এই ছাত্রটি বড় উকিল হবে৷’

‘আমারও সেইরকমই ধারণা৷ এই বয়সেই যে-সব প্যাঁচ মারে, সাঙ্ঘাতিক৷ আমিই হেরে যাই৷ আচ্ছা! তুমি এইবার দেখো৷ আমার সময় খুব কম৷’

ডাক্তারবাবু ডাকলেন আমাকে, ‘কাছে এসো, হাতের নাগালের মধ্যে এসো৷’

পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলুম৷ একটানে আমার মাফলারটা খুলে ফেললেন, ‘এসব কি জড়িয়ে বসে আছ? ছাগল নাকি!’

কলার মতো মোটা-মোটা আঙুল দিয়ে নিচের চোয়ালে গলার কাছে খোঁচা মারতে লাগলেন আর প্রশ্ন করলেন, ‘লাগে, লাগে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘লাগবেই তো৷ লাগার জন্যেই তো খোঁচাচ্ছি৷ বেশ ভালোই৷ গ্ল্যান্ডের আড়ত৷ করেছ কি? এই বয়সেই এত, বুড়ো বয়েসে তো মা কালীর মুণ্ডমালার মতো হবে৷ ইস, শরীরটাকে একেবারে ড্যামেজ করে ফেলেছ হে৷ দেখি হাঁ করো৷ অমন পুঁচকে হাঁ নয়, জলহস্তীর মতো৷’

তাই করলুম, ভাগ্যিস চিড়িয়াখানায় জলহস্তী দেখা ছিল!

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘গুড, ভেরি গুড৷ আ করো, সা আ৷’

‘সা আ৷’

‘আরো জোরে—সা আ৷’

‘সা আ৷’

‘আরে বাপরে! গলার দু-পাশে দুটো ভোজপুরী দারোয়ান৷ যাও বোসো৷’

চেয়ারে বসলুম৷ সা আ করতে বেশ মজা লাগছিল৷ মনে হচ্ছিল, আবার করি৷ অনবরত করি৷

মাস্টারমশাই বললেন, ‘উপায়?’

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘কিছু না৷ একমাত্র উপায় ছুরি৷ ধরো আর কচাত করে কেটে ফেলে দাও৷’

‘কাটাকাটি চলবে না৷ অন্য কিছু ভাবো৷’

‘অন্য কিছু ভাবর নেই মাস্টারমশাই৷’

‘আমি সেদিন একটা মেডিকেল জার্নালে পড়লুম টনসিল হল গলার প্রহরী৷ তারও প্রয়োজন আছে৷ জার্মস আটকায়, কাটাটা ঠিক নয়৷ শরীরের ক্ষতি হয়৷ অন্য অসুখের আক্রমণ বাড়ে৷ বিদেশে আর কথায়-কথায় টনসিল কাটে না৷’

‘ঠিক বলেছেন মাস্টারমশাই৷ তবে সেপ্টিক টনসিল থেকে চোখ খারাপ হতে পারে, বাত হতে পারে৷ আপাতত একটা কাজ করি, একটা লোশান তৈরি করে দি৷ সকাল-সন্ধে তুলি দিয়ে লাগাক৷ আর একটা কথা বলি, যোগাসনে অনেক সময় উপকার হয়৷ আর হয় সাঁতারে৷ টনসিলের আর একটা মজা হল বয়েস বাড়লে সেরে যায়৷’

ওষুধের শিশিটা নিয়ে আমরা বেরিয়ে এলুম৷ মাস্টারমশাই বললেন, ‘মিলিটারি ডাক্তার তো, ছোরাছুরি ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে না৷ তোমাকে আমি আসন করাবো আর সাঁতার কাটা শেখাব৷’

বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে মাস্টারমশাই চলে গেলেন৷ মা বললেন, ‘ছেলেবেলায় আমার খুব কাশির ধাত ছিল৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘তোর কি ছিল না উমা! কাশির ধাত, পেট খারাপের ধাত, স্বপ্ন দেখার ধাত৷ সব তোর ছেলে পেয়েছে৷’

মা বললেন, ‘যাদের টনসিল থাকে তারা গাইয়ে হয়৷ শিল্পী হয়৷’

সেই কারণেই ডাক্তারবাবু আমাকে সা আ, সা আ করালেন৷ ওই করতে-করতেই গাইয়ে হয়ে যাব৷ ডাক্তারবাবুর দেওয়া সেই লোশানটার রং লালচে৷ আমার মা আমার মতোই ছেলেমানুষ৷ কোনো কিছুতেই তর সয় না৷ সঙ্গে-সঙ্গে কাঠির মাথায় জড়ানো হয়ে গেল, তুলো তৈরি হয়ে গেল তুলি৷ বারান্দার চড়চড়ে রোদের আলোয় টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হাঁ কর৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘উমা, কাশি এখন কম আছে৷ এখনই কেন থ্রোট পেন্ট লাগাচ্ছিস!’

‘লাগিয়ে দেখি না কি হয়!’

যা হল সে আর বলার নয়৷ গলায় ওষুধ লাগানো তুলি ঢোকা মাত্রই, মা বোধহয় একবার বুলিয়েছেন, পেটে যা ছিল সব ঠেলে উঠতে চাইল মুখে৷ কোনও রকমে সামলে বসে পড়লুম৷ মা তুলি ফেলে দৌড়৷ জ্যাঠাইমা বললেন, ‘কি হল রে উমা!’

মা বললেন, ‘খুব বাঁচা বেঁচে গেছি! কীরকম একটা শব্দ করে কামড়াতে আসছিল ভাই৷’

জ্যাঠাইমা সুন্দর গান গাইতে পারেন৷ গান ধরলেন ঃ

একদা এক বাঘের গলায়

হাড় ফুটিয়াছিল

এমন সময় বাঘামামা

বার করলে তার বুদ্ধির ধামা

শেষে কোস্তাকুস্তি ধস্তাধস্তি

প্যাঁ অ্যাঁক করে হাড় বেরিয়ে গেল৷৷

বাড়িতে যখন পুরুষরা কেউ থাকেন না, দুই বোনের খুব মজা৷ কোরাসে গান৷ মাঝে-মাঝে নাচ৷ চোর-চোর খেলা৷ সব ছেড়ে বাগানে গিয়ে পিকনিক৷ গাছে-গাছে কাপড় বেঁধে তাঁবু তৈরি করে স্টোভ জ্বেলে টুকটাক কিছু রান্না৷ আলুর দম, আলুকাবলি, ছোলার ঘুগনি, ছোট-ছোট ফুলকো লুচি৷ কখনও শুধুই ঝাল-ঝাল ডাঁটা চচ্চড়ি৷ খাওয়াটা বড় কথা নয়, বড় হল পরিবেশ৷ গাছ, পাখি, লতা, ঝুমকো ফুল, ঘাস৷ মাটির সঙ্গে সমান-সমান বাঁধানো বড় চৌবাচ্চা, সেই চৌবাচ্চায় পদ্মফুল করেছেন বাবা৷

চারপাশে বেঁচে থাকার এত আনন্দ! তার মাঝে একটুই নিরানন্দ, যত রাত বাড়ে, ততই বাড়ে আমার কাশি৷

পাঁচ

আমাদের স্কুলের প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশান৷ খুব ঘটা করে হয়৷ বিশাল প্যান্ডেল৷ এককালের বিখ্যাত জমিদার, পরে মন্ত্রী, রায়চৌধুরীমশাই সভাপতি৷ সাংঘাতিক ভারিক্কি চেহারা৷ চওড়া গোঁফ৷ মাঝখানে সিঁথে৷ দু-পাশে দু-ভাগ করা চুল৷ ফিনফিনে খদ্দরের পাঞ্জাবি৷ চওড়া পাড় কোঁচানো ধুতি৷ চোখে চশমা৷ কথা খুব কম বলেন৷ দেখলেই ভয় করে৷ বিশাল সভা৷ অভিভাবক, ছাত্র, প্রাক্তন ছাত্র, গিজগিজ করছে চারপাশ৷ হেডমাস্টামশাই তাল রাখতে পারছেন না৷ এদিক ছুটছেন, ওদিক ছুটছেন৷ স্কুলের সেক্রেটারি বিখ্যাত ব্যারিস্টার৷ অন্যদিন সায়েবি পোশাক, অনুষ্ঠান উপলক্ষে নিপাট বাঙালি৷ মঞ্চে সভাপতির পাশে বসে আছেন৷ মেজাজের লড়াই চলেছে৷ কে কতটা গম্ভীর হতে পারেন, তার প্রতিযোগিতা৷ টেবিলের দু-পাশে দুটো বিশাল ফুলদানি৷ থেকে-থেকেই উলটে যাওয়ার চেষ্টা করছে৷ সভাস্থ সকলে গেল-গেল করে উঠছেন৷ গেম টিচার নরেশবাবু শেষ মুহূর্তে বাঁচিয়ে দিচ্ছেন প্রতিবারই৷

ব্যারিস্টার সেক্রেটারি এক সময় বলেই ফেললেন, ‘টপ হেভি৷’

জমিদারমশাই মানবেন কেন৷ সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘বটম লাইট৷’

অঙ্কের স্যার পাশেই ছিলেন, বললেন, ‘দুটোই এক৷’

অঙ্কের শিক্ষক কুমুদবাবুও রাশভারী মানুষ৷ তেমনি অহঙ্কার৷ পৃথিবীর যত অঙ্ক সব মুখে-মুখে কষে ফেলতে পারেন৷ তাঁর চোখে আমরা ছাত্ররা সব দ্বিপদ গাধা৷ মাঝে-মাঝে দুঃখ করে বলেন, ‘তোদের বাপমায়ের কথা ভেবে আমার চোখ ফেটে জল আসে৷ তাঁরা হয়তো তোদের মানুষ ভেবেই খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন৷ ছেলে আমার বিলেত যাবে৷ এদিকে দুই আর দুয়ে কত? চুলকে-চুলকে মাথার সব চুল উঠে গেল৷’

আমাদের যে-ভাবে প্রায়ই ঘাড় ধরে ক্লাস থেকে বের করে দেন, সেই ভাবে দু-হাতে ফুলদানিদুটোর গলা ধরে টেবিল থেকে নামিয়ে দিলেন৷ সভায় হাততালি পড়ে গেল৷ অভিভাবকরা বলে উঠলেন, ‘ওয়েল ডান, ওয়েল ডান৷’

সামনের সারিতে নিচু ক্লাসের ছেলেরা, তারা হোও করে উঠতেই, পণ্ডিতমশাই ঠাঁই ঠাস ঠাঁই ঠাস করে পালের গোদাদের পিটিয়ে দিলেন৷ সবাই অমনি চিৎকার করলেন, ‘পিস, পিস৷ শান্তি, শান্তি৷’

হেডমাস্টারমশাই উইংসের কাছে গিয়ে কাকে বললেন, ‘ঘাড় ধরে ওটাকে একেবারে বাইরে বের করে দিয়ে এসো৷ সব ক’টা বাঁদরকে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে এসো৷ সব লুচি আলুর দম চুরি করে মেরে দিলে৷ আমার এত আর্টিস্ট, তাদের মুখে আমি কি দোবো! আমার স্কুলটা চোরে ভরে গেল৷ স্কুলের বদলে এইবার এটাকে থানা করে দিলেই হয়৷ আমি হেডমাস্টার না, থানার বড় দারোগা!’

উইংসের কাছ থেকে মাইকের সামনে সরে এলেন৷ হাতে একটা কাগজ৷ মাইকের সামনে বার কতক টুসকি মারলেন৷ মেরেই বললেন, ‘ভল্যুম, ভল্যুম৷’

সঙ্গে-সঙ্গে সামনের আসনে এক গাদা কুঁচো চিৎকার করে উঠল, ভল্যুম, ভল্যুম৷’

পণ্ডিতমশাই তেড়ে এলেন, ‘অ্যায়, চপ চপ৷’

এক ডেঁপো কোথা থেকে বলে উঠল, ‘কোথায় আলুর চপ স্যার?’

প্রেসিডেন্ট রায়চৌধুরী, ব্যঙ্গের হাসি হেসে হেডমাস্টারমশাইকে বললেন, ‘আপনার স্কুলের ডিসিপ্লিন একেবারে ভেঙে পড়েছে৷ আর কোনওমতেই স্কুল বলা যায় না৷ মোর এ গাশ হাউস, দ্যান এ স্কুল৷’

লজ্জায়, অপমানে হেডমাস্টারমশাইয়ের মুখ একেবারে লাল হয়ে গেল৷

ব্যারিস্টার সেক্রেটারি বললেন, ‘ভালোমানুষের যুগ শেষ হয়ে গেছে৷ আমাদের হেডমাস্টার, আওয়ার হেডমাস্টার ইজ এ সেন্টলি ম্যান৷ ওঁর স্থান হওয়া উচিত আশ্রমে৷ আমাদের এখানে টেগার্ট সায়েবের মতো জাঁদরেল একজন মানুষ দরকার৷’

হেডমাস্টারমশাই আর কোনও কথায় কান না দিয়ে ঘোষণা শুরু করলেন৷ সকলকে স্বাগত জানালেন৷ রায়চৌধুরীমশাই ও অন্যান্য মহামান্য, অভিভাবক ও প্রিয় ছাত্ররা সমবেত হয়েছেন, এর জন্যে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি সকলের কাছে অসীম কৃতজ্ঞ৷

এখন উদ্বোধন সংগীত৷ নবম শ্রেণীর ছাত্ররা পরিবেশন করবে৷

প্যাঁক করে বেজে উঠল হারমোনিয়াম৷ হারমোনিয়ামের বেলোতে ছেঁদা৷ অনেকবার ভটাস-ভটাস করে বেলো করলে, তবেই প্যাঁক করে একবার শব্দ বোরায় যেন হাঁসের পেট টেপা হল৷ ক্লাস নাইনের পরেশ অনেকক্ষণ প্যাঁক-প্যাঁক করছে, গান আর ধরছে না৷

তখন পেছনের আসন থেকে কে একজন হাঁক মারল, ‘অনেকক্ষণ প্যাঁক-প্যাঁক করছ এইবার ডিমটা পেড়ে ফেলো৷’

সঙ্গে-সঙ্গে তুমুল হাসি৷

সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার, ‘সাইলেনস, সাইলেনস, চুপ, একদম চুপ৷’

পরেশ গলা সাধা শুরু করল, সা, রে, গা, মা—

হেডমাস্টারমশাই আর পারলেন না, অবাক হয়ে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দিস৷ এটা কী হচ্ছে?’

আমাদের সঙ্গীতশিক্ষক নিত্যানন্দবাবু পাশেই ছিলেন, তিনি বললেন, ‘গলাটা একটু চৌরস করে নিক স্যার, তা না হলে চড়ার দিকে দেবে যাবে৷’

প্রেসিডেন্টমশাই বললেন, ‘গলা কি রাস্তা৷ রোলার চালাতে হবে!’

পরেশ কালবিলম্ব না করে ধরে ফেলল৷ যেন পড়ে যাচ্ছিল কপ করে কার্নিশ ধরে ফেলেছে৷

অ্যায় আগুনের পরোশমণি ছুঁয়াও প্রাণে

অ্যা জীবোন পূর্ণ করো দহোন-দানে৷৷

আমার এই দেহখানি তুলে ধরো৷

প্রেসিডেন্ট সঙ্গে-সঙ্গে প্রায় ঘুষি পাকিয়ে বললেন, ‘রামাধর ইসকো উঠাকে বাহার ফেক দো৷ গান গাইছে গান! উদ্ধোধন না উদ্বন্ধন সঙ্গীত৷ যেন গরুর লেজ মলছে গাড়োয়ান৷ অ্যায় জানোয়ার কাম হিয়ার৷’

পরেশ পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল৷

‘কান ধর৷’

পরেশ ইতস্তত করছে৷ জমিদারি মেজাজে এক ধমক,

‘কান পাকড়ো৷’

পরেশ কাঁপা-কাঁপা হাতে কান ধরল৷

‘দর্শকদের দিকে ফের৷’

পরেশ তাই করল৷

‘বল, জীবনে আমি আর কখনও গান গাইবার চেষ্টা করব না৷’

পরেশ কেঁদে ফেলেছে, ‘জীবনে, আমি আর কখনও গান গাইবার চেষ্টা করব না৷’

‘যাও৷ একেবারে ত্রিসীমানা ছেড়ে যাও৷’

সঙ্গীতশিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা কি রবীন্দ্রনাথের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান৷ অ্যায়, আগুনের পরোশমণি? অ্যায় কোথায় পেলেন?’

‘আজ্ঞে ওটা একস্ট্রা, ধরতাই হিসেবে ফিট করে দিয়েছিলুম৷’

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত চেয়ার না আলমারি! হাতল ফিট করছেন? আপনি সঙ্গীতশিক্ষক না ছুতোর৷ পরোওশমণি? পাপৌষ৷ গেট আউট৷ এক্ষুণি বেরিয়ে যান৷ ক্লিয়ার আউট৷ ক্লিয়ার আউট৷’

ছেলেরা আবার চিৎকার ছাড়ল, ‘ইসকো উঠাকে বাহার ফেঁক দো৷’

সৌম্য চেহারার এক অভিভাবক মাঝসারি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সাংস্কৃতিক ব্যাপারটা বন্ধ করে কাজের কাজে আসুন৷ বিজনেস অফ দি মিটিং৷’

প্রেসিডেন্টমশাই এক কালের জমিদার৷ এক্স জমিন্দার৷ অন্যের নির্দেশে চলবেন! অভিজাত হাসিতে মুখ ভরে গেল৷ ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা লিমিটেড কোম্পানির ডিরেক্টর বোর্ডের মিটিং নয়৷ হিতকারী সভার কমিটি মিটিং নয়৷ দিস ইজ অ্যান এডুকেশানাল ইন্সস্টিট্যুশান৷ সিট অফ লারনিং৷ হোয়্যার ইজ পণ্ডিতমশাই৷ পণ্ডিতমশাই কোথায়!’

একজন বললেন, ‘এই তো এখানে ছিলেন৷ বেত হাতে ছেলেদের ঠ্যাঙাচ্ছিলেন৷’

আর একজন বললেন, ‘মনে হয় পান খেতে গেছেন৷’

হঠাৎ যেন কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার হল, ‘এই তো পণ্ডিতমশাই৷ এখানে ঘুমিয়ে পড়েছেন৷’

প্রেসিডেন্টমশাই একটু বাঁকা গলায় বললেন, ‘সবাই মিলে উৎপাটন করে নিয়ে আসুন৷ পাণ্ডিত্যের সঙ্গে নিদ্রার ঘনিষ্ঠ সংযোগ৷’

পণ্ডিতমশাইয়ের কাঁচা ঘুম ভেঙেছে৷ তিনি হকচকানো মুখে মঞ্চে উঠলেন৷ হাতজোড় করে প্রেসিডেন্ট মহোদয়কে বললেন, ‘আমাকে যে প্রয়োজন হতে পারে, এ আমি বুঝিনি৷’

‘আপনাকেই তো প্রয়োজন৷ যান উদ্বোধন করুন৷’

‘আজ্ঞে কি উদ্বোধন৷ সম্যক অধিগম্য হল না৷’

‘এই সভার উদ্বোধন৷ সংস্কৃত স্তোত্র পাঠ করুন৷ যান, মাইকের সামনে৷’

‘অনুমতি করুন আমি তাহলে শাস্ত্রীয় বেশ ধারণ করে আসি৷’

‘কোনও প্রয়োজন নেই৷ বেশ আপনার চমৎকার আছে৷ একেবারে শাস্ত্রসম্মত৷’

মাইক্রোফোনের সামনে পণ্ডিতমশাই চোখ বুজিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ সভায় সবাই ফিসফিস করছেন, ‘আজ পণ্ডিতমশাইয়ের হয়ে গেল৷ জীবনে কখনও মাইকের সামনে দাঁড়াননি৷ নরঃ নরৌ, নরাঃ করেছেন ক্লাসে৷ আর ডাস্টার পেটা৷ আজ পড়েছেন ফাঁপরে৷’

‘ওঁ৷’

এক ওঙ্কার ধ্বনিতে সভা কেঁপে উঠল৷ ভরাট গলা তেমনি সুর৷ পণ্ডিতমশাইয়ের চেহারা পালটে গেল৷ শরীরে একটা জ্যোতি খেলছে৷ সভা একেবারে নিস্তব্ধ৷ সামনের সারির কুঁচোগুলোও চুপ৷ পণ্ডিতমশাই হাতজোড় করে অপূর্ব সুরে পাঠ করছেন ঃ

মুকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্৷

যৎকৃপা ত্বমহং বন্দে পরমানন্দমবিবম৷

যং ব্রহ্মা বরুণেন্দ্র-রুদ্র-মরুতঃ স্তুন্বন্তি দিব্যৈঃ স্তবৈর্বেদৈঃ৷

সাঙ্গপদক্রমোপনিষ যং সামগং৷

দীর্ঘ স্তব৷ প্রেসিডেন্টমশাই অবাক৷ হেডমাস্টারমশাই স্তম্ভিত৷ পাশেই গঙ্গা৷ হু-হু বাতাসে সরে উড়ে যাচ্ছে৷ কেউ জানত না, পণ্ডিতমশাইয়ের এত সুন্দর গলা, সুরের ওপর এত দখল৷ আগুনের ফুলকির মতো উচ্চারণ৷

পণ্ডিতমশাই শেষ করছেন ঃ

নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্৷

দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব তো জয়মুদীরয়েৎ৷

পণ্ডিতমশাই যেই শেষ করলেন, সভা একেবারে ফেটে পড়ল, ‘সাধু, সাধু৷’

প্রেসিডেন্টমশাই উঠে নিজের গলার পাট করার সিল্কের চাদর পণ্ডিতমশাইয়ের গলার পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অপূর্ব, অপূর্ব৷ আপনি আমাকে মোহিত করেছেন৷’ সভার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই ঋষিকে আমি দু-কাঠা দশ ছটাক জমি দান করলুম৷’

সভা আবার চিৎকার করে উঠল৷ ‘সাধু, সাধু৷’

পণ্ডিতমশাই চলে যাচ্ছিলেন৷ প্রেসিডেন্টমশাই বললেন, ‘না, না, আপনি মঞ্চে বসুন৷’

সভার সুরটাই পালটে দিলেন পণ্ডিতমশাই৷ এর পরেই শুরু হল সেই বিশ্রী ব্যাপার৷ সেক্রেটারি ইংরেজিতে পড়তে লাগলেন বাৎসরিক রিপোর্ট৷ সে আর শেষ হয় না৷ হাঁউ-হাঁউ করে সব হাই তুলছেন৷ কেউ আবার বলছেন, ‘ওরে বাবা৷ আর পারি না৷’

এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট৷ সেক্রেটারি বসলেন৷ ডাক পড়ল আমার৷ রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি৷ এতক্ষণ বেশ বসেছিলুম৷ কোনও কাশিটাশি ছিল না, শুরু হল গলা খুশখুশ৷ মঞ্চে ওঠার আগে কচমচ করে একটা লবঙ্গ চিবোলুম৷ ভীষণ ঝাল৷ নমস্কার করে শুরু করলুম, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, খুক, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, খুক্খুক্৷

আজি এ প্রভাতে রবির কর খ্যাঁক্

কেমনে পশিল প্রাণের’ পর, কোঁক

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে ঘকঘক

প্রভাতে পাখির গান, খক্ খকর খক্ খক্

খক্ খক্৷৷

প্রেসিডেন্টমশাই বলছেন, ‘এটা কি রবীন্দ্রনাথের কোনও স্পেস্যাল কবিতা?’

হেডমাস্টারমশাই বলছেন, ছেলেটি ভালো আবত্তি করে৷ খুব কাশি হয়েছে৷’

আমি বেশ একটু ভাব দিয়ে গলাটাকে টেনে বলতে গেলুম ঃ

না জানি কেন রে এতদিন পরে

খক্ খক্ খুক্ খক্ খাক্ খাক্ খাক্৷

প্রেসিডেন্টমশাই ভয়ঙ্কর বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তোমাকে আর জানতে হবে না, আমরা তোমার কাশি শুনতে আসিনি৷ দয়া করে বিদায় হও৷’

সভায় চিৎকার উঠল, ‘এতক্ষণ আপনাদের কেশে শোনাল...’

লজ্জায় অপমানে সোজা বাড়ি৷ আমারও পুরস্কার ছিল৷ সে সব ফেলেই চলে এলুম৷ জ্যাঠাইমার বুকে মুখগুঁজে অনেকক্ষণ কাঁদলুম৷ জ্যাঠাইমা বললেন, ‘আশ্চর্য কাশি! কিছুতেই কমে না৷’ আমার এই অপমান যেন সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ৷ সবাই বিষণ্ণ হয়ে বসে রইলেন রাত বারোটা পর্যন্ত৷

ছয়

কাশিটাশি সব মাথায় উঠে গেল৷ জ্যাঠামশাই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন৷ আমাদের পরিবারে কেন, আমাদের পাড়ায়, আমাদের গ্রামে জ্যাঠামাশাইয়ের মতো সুন্দর মানুষ, প্রিয় মানুষ আর দ্বিতীয় ছিলেন কি না সন্দেহ! সকলের ভালোবাসার মানুষ৷ নিজের জীবন দিয়ে অন্যের উপকার করেন৷ জ্যাঠামশাই যেখানে, সেখানেই জমজমাট পরিবেশ৷ গান, গল্প, হাসি, খাওয়াদাওয়া৷ চলে গেলেই সব শূন্য৷

অল্প-অল্প জ্বর আসে সন্ধের দিকে৷ ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছেন৷ অসুখটা ঠিক ধরা যাচ্ছে না৷ ডাক্তারবাবুরা দেখছেন৷ বড়-বড় প্রেসক্রিপসান৷ ওষুধের ছড়াছড়ি৷ বাবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে৷ মায়ের নাচ, জ্যাঠাইমার গান আর হয় না৷ দাদু ঠাকুরঘরে ঢুকলে আর বেরোতে চান না৷ মূর্তির মধ্যে যে ভগবান তাঁকে শোনাতে চান দুঃখের কথা৷ মানুষ ডাক্তার যা পারেন না, কেঁদে-কেঁদে ভগবানের কাছে তাই প্রার্থনা করেন৷ জ্যাঠামশাইয়ের আরোগ্য৷

বাড়ির সুর কেটে গেল৷ আমি খক্-খক্ কাশি, সে-কাশি কেউ শুনেও শোনে না৷ মাস্টারমশাই আসেন, পড়িয়ে চলে যান৷ আমি স্কুলে যাই৷ স্কুলের মাঠের বিশাল শিশুগাছ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকি৷ তোমরা কত বড় হলে৷ কত দিন বেঁচে আছ, আরো কত দিন থাকবে! মানুষ কেন পারে না৷ মানুষ কেন হেরে যায়৷ কেন মানুষের অসুখ করে, তোমাদের তো অসুখ করে না৷ গাছের বিশাল গুঁড়ি বেয়ে পিঁপড়ের ওঠা-নামা দেখি৷ উঁচু-উঁচু ডালে টিয়ার ঝাঁক৷ পশ্চিমের সূর্য গঙ্গার ওপারে নেমে যায় সোনার থালার মতো৷ কখনও সাদা, কখনও নীল পাল তুলে বড়-বড় নৌকো চলে যায় এক দেশ থেকে আর এক দেশে৷ ভরা গঙ্গার জল ঘাটের পৈঠায় ছলাত-ছলাত করে৷ শ্মশানের কাঠকয়লা ভেসে আসে৷ সন্ধ্যাতারার দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে ফেলি৷ বেলুড় মঠের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বলি, ভগবান রামকৃষ্ণ, আমার জ্যাঠামশাইকে সুস্থ করে দিন৷

সবাই বললেন, এই অসুখটার নাম কনসাম্পসান৷ শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে৷ অসুখটা ধরেছে লাংসে৷ একবার চেঞ্জে নিয়ে গিয়ে দেখা যেতে পারে৷ বেশ শুকনো কোনও পাহাড়ি জায়গায়৷ যেখানে বাতাসে ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধ৷ জলে ধাতুচুর্ণ৷ হজমির কাজ করবে৷ অল্প-অল্প বেড়ানো, ভালো খাওয়া৷ আর বিশ্রাম৷

হাজারিবাগ রোড স্টেশানে আমাদের সম্পর্কে এক কাকা থাকেন৷ সুন্দর বাগানবাড়ি৷ জায়গাটাও খুব স্বাস্থ্যকর৷ ঠিক হল, দাদু আমি জ্যাঠামশাই আর জ্যাঠাইমা যাবেন৷ আর যাবে এক শক্ত চেহারার যুবক৷ তার নাম প্রফুল্ল৷ জ্যাঠামশাই তাকে চাকরি করে দিয়েছিলেন৷ ধরা বাঁধার চাকরি তার ভালো লাগেনি৷ ছেড়ে দিয়েছে৷ আমাকে বলেছিল, দুপুরের মেঘ-ভাসা নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, হাঁস-ভাসা পুকুর, গাছের ডালে-ডালে পাখির ডাক ছেড়ে, সারাটা দিন কারখানায় বসে থাকতে ভালো লাগে? আমি তার সঙ্গে একেবারে এক মত৷ পেটের জন্যেই চাকরি৷ পেটটা কত বড়, যে তার জন্যে সব ছেড়ে দিতে হবে!

রাত ন’টার ট্রেনে আমরা উঠে বসলুম৷ বাড়ি থেকে বেরোবার আগে জ্যাঠামশাই গোটা বাড়িটা একবার ঘুরে-ঘুরে দেখে নিলেন৷ ছাতে গিয়ে টবের সব ফুলগাছের সঙ্গে কথা বললেন৷ ঘরের কোণে তিন জোড়া মাছ ধরার ছিপ৷ তাঁর বড় প্রাণের জিনিস৷ মাছ ধরার ভীষণ নেশা৷ ছিপগুলোকে বললেন, লক্ষ্মী হয়ে থাকো৷ ফিরে এসে মাছের সঙ্গে খেলা করতে নিয়ে যাব৷ জ্যাঠামশাইয়ের বুকে মাথা রেখে মা কাঁদছিলেন৷ মায়ের মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে জ্যাঠামশাই বলছেন, ‘পাগলি মেয়ে, আমি কি একেবারে চলে যাচ্ছি৷ এক মাস পরে তোমরা সবাই যাবে৷ এবারের পুজো আমরা বিহারে দেখব৷’

বলতে-বলতে, জ্যাঠামশাইয়ের চোখেও জল এসে গেল৷ কাজের মহিলাটির হাতে একশো টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন, ‘ছেলের অসুখ, ভালো করে চিকিৎসা করাও৷’

সে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে হাউ-হাউ করে কাঁদতে লাগল৷ পাড়ার প্রায় সবাই এসে দাঁড়ালেন ভিড় করে৷ সকলের চোখেই ছলছলে জল৷ আমার জ্যাঠামশাই বিদেশে যাচ্ছেন৷

আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল৷ বাবা, আরও অনেকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন৷ ক্রমশই তাঁরা ছোট হয়ে যাচ্ছেন৷ হঠাৎ প্ল্যাটফর্ম শেষ৷ রেল ইয়ার্ড, লোহালক্কড়, এখানে ওখানে কেন্নোর মতো গাড়ি৷ রেলের কেবিন৷ সিগন্যাল ঘর৷ সব পেছন দিকে ছুটছে৷ হঠাৎ ফাঁকা মাঠ৷ আকাশে একটা ঘোলের মতো চাঁদ৷ ট্রেনের ঘুমপাড়ানি শব্দ৷ জ্যাঠামশাই শুয়ে পড়লেন৷ পুরো একটা ক্যুপ রিজার্ভ করে আমরা চলেছি৷ আমার পাশে দাদু৷ জ্যাঠাইমার কোলে জ্যাঠামশাইয়ের পা দুটো৷ আমি হাঁ-করে তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে৷ পৃথিবীটা কী বিশাল আর কত সুন্দর৷ স্বপ্নের মতো রাত৷ নির্জন গ্রাম৷ ঘুম-ঘুম স্টেশান৷ ট্রেন চলেছে৷

প্রায় দুপুরবেলা খরখরে রোদে আমরা হাজারিবাগ স্টেশানে এসে নামলুম৷ প্রফুল্লদা একাই একশো৷ ঝপাঝপ মালপত্র সব নামিয়ে ফেলল৷ বুক চিতিয়ে বললে, ‘ওয়ান্ডারফুল জায়গা৷ সরু তারের মতো বাতাস৷’ জ্যাঠামশাই একটা বেঞ্চিতে বসতে গিয়ে লাফিয়ে উঠলেন৷ চাটুর মতো গরম৷ দাদু বিশাল ছাতাটা জ্যাঠামশাইয়ের মাথার ওপর মেলে ধরলেন৷ আমার টুকটুকে ফরসা জ্যাঠাইমা সিল্কের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছেন৷ বাতাসে চুল উড়ছে৷ আঁচল উড়ছে৷ রং যেন জ্বলছে৷

হঠাৎ ওভারব্রিজে বেশ মোটাসোটা এক ভদ্রলোকে এসে দাঁড়ালেন৷ সাদা টাউজার, সাদা হাফশার্ট, মাথায় শোলার হ্যাট৷ তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘চলে আসুন, চলে আসুন বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷’ সেই অত উঁচুতে রোদের আকাশ মাথায় দিয়ে রাজহাঁসের মতো এক মানুষ৷ তলায় এক জোড়া ইস্পাতের লাইন৷ রোদে ঝলমল করছে৷

জ্যাঠামশাইয়ের এক হাত আমার কাঁধে, আর এক হাতে ছাতা৷ ছাতার ওপর ভর রেখে সিঁড়ি ভাঙছেন৷ বিশাল উঁচু ওভারব্রিজ৷ অনেক সিঁড়ি৷ জ্যাঠামশাইয়ের উঠতে কষ্ট হচ্ছে৷ আমার ছাড়া আর কারোর সাহায্য নেবেন না৷ প্রফুল্লটা এগিয়ে এসেছিল৷ জ্যাঠামশাই বললেন, ‘তুই মোটঘাট সামলা৷’ জ্যাঠাইমা দাদুকে সাহায্য করছেন৷

আমাদের কাকাবাবুর মটরগাড়িটা বেশ সুন্দর৷ মাথার হুডটা ক্যানভাসের৷ দু-পাশে পাদানি৷ সামনে স্টিয়ারিং-এর ডানদিকে চোঙা লাগানো একটা বিশাল হর্ন৷ চারটে বড়-বড় চাকা৷ চকচকে চকোলেট রং৷ বেশ বড় গাড়ি৷ আসন বেশ চওড়া৷ হাঁটু রাখার অনেক জায়গা৷ দরজা ছোট-ছোট৷ পুরোটা খুলে যায়৷ ঢুকতে অসুবিধে হয় না৷ ভেতরটা বেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন৷ সুন্দর একটা গন্ধ৷

কাকাবাবু আমাদের জন্যে বেশ একটা ভালো বাগানবাড়ি ঠিক করেছিলেন৷ আমি আর প্রফুল্লদা সামনে বসেছি৷ কাকাবাবু গাড়ি চালাচ্ছেন৷ সোজা লম্বা রাস্তা৷ খাঁ-খাঁ রোদ৷ কোনও লোকজন নেই৷ তবু কাকাবাবু মাঝে-মাঝে হর্ন বাজাচ্ছেন ভ্যাঁক-ভ্যাঁক করে৷ হাসি খুশি মজার মানুষ৷ বলছেন, ‘মাঝে-মাঝে হর্ন না বাজালে গাড়ি বলে বোঝা যাবে কি করে! গরু যদি না ডাকে, আর গাড়ি যদি হর্ন না দেয় তাহলে কি মানায়!’

বাগানবাড়িটার নাম খুব সুন্দর, ‘ফুলের জলসা’৷ সত্যিই তাই৷ তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো বাগান৷ জ্যাঠামশাই বাগান, ফুল, পুকুর কত ভালোবাসেন৷ শরীর কত ক্লান্ত, যে একবার মাত্র থমকে দাঁড়িয়ে একবারই বাঃ বললেন৷ কাকাবাবুকে বললেন, ‘শরৎ, বাড়িটা তুমি বড় ভালো ঠিক করেছ৷ এর আগের বার আমরা যখন এসেছিলুম, তখন তো এই বাড়িটা ছিল না৷’

‘মেজদা এটা আমার হাতে তৈরি৷ কলকাতার এক ব্যারিস্টারের৷ কত খরচ করে করলে, একবারও আসে না৷ কেবল শুনি বিলেত গেছে৷ আচ্ছা, ভেতরে সব ছবির মতো করা আছে৷ কোনও কিছুর অভাব নেই৷ সাহায্য করার জন্যে একটি মেয়ে আছে৷ সুন্দর নাম, সুর্মা৷ আমি এখন একবার আমার কাজের সাইটে যাব৷ রাত্তিরে আসব৷’

জ্যাঠাইমা বললেন, ‘এত বেলা হল৷ খেয়ে যাবেন না৷’

‘বউদি, ব্যাচেলার মানুষ আমি৷ আমার সকালের দিকের খাওয়া টুকটাক৷ কন্ট্রাক্টার সকালে বেশি খেলে ব্যবসা লাটে উঠে যাবে বউদি৷ রাত্তিরে খাব৷ আমি পাম নদীর দিকে যাচ্ছি৷ আসার সময় ভেটকি নিয়ে আসব৷ দেখবেন কি টেস্ট!’

তিনবার হর্ন বাজিয়ে শরৎকাকুর গাড়ি চলে গেল৷ দুপুরের রোদে ঝিম মেরে জলসা করছে হরেক রকমের গোলাপ৷ ফর-ফর করে কাগজের টুকরোর মতো উড়ছে নানা রঙের প্রজাপতি৷ সাদা রং করা ইটের কেয়ারি৷ সাদা নুড়ি বিছানো চওড়া পথ৷ প্রফুল্লদা বললে, ‘তোমাকে বলছি, এতদিনে আমি আমার মনের মতো একটা দেশ খুঁজে পেয়েছি৷ এ ছেড়ে আমি আর যাচ্ছি না৷ তোমরা যখন ফিরবে, তোমাদের আমি ট্রেনে তুলে দিয়ে আসব৷ এই তো আমার স্বর্গ!’

হাজারিবাগে সেই ফুলের জলসায় আমরা তিন মাস ছিলুম৷ বড়-বড় ঘর৷ কুচকুচে কালো স্লেট পাথরের মেঝে৷ বিশাল ঘেরা বারান্দা চারপাশে৷ বারান্দায়-বারান্দায় বেতের সোফাসেট৷ আর্ম চেয়ার৷ ইজিচেয়ার৷ সামনে ফুল৷ পেছনে ফুল আর ফল৷ বাগানে ঘুরতে-ঘুরতে ক্লান্ত হলে বসার জন্যে সিমেন্ট বাঁধানো গোল-গোল বেদি৷ রোজ সকালে একজন মালি এসে গাছের পরিচর্যা করে যায়৷ আমাদের সঙ্গে ভীষণ ভাব হয়ে গিয়েছিল৷

সাত দিনের মধ্যেই জ্যাঠামশাইয়ের শরীরে বেশ জোর ফিরে এল৷ ফ্যাকাশে রঙে লাগল লালের আভা৷ দাদু আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক গড৷ শরীরে রক্ত লাগছে৷ বলতে নেই তোমার চেহারাও বেশ ইমপ্রুভ করেছে৷ তোমার কাশি কোথায় গেল?’

‘আর খুঁজে পাচ্ছি না৷’

‘ব্যাটা পালিয়েছে৷’

সে কি আনন্দের দিন৷ আট দিনের মাথায় আমাদের ভোরে বেড়ানো শুরু হল৷ ভোরের আকাশে আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গে প্রফুল্লদার প্রাইমাস স্টোভের সাঁ-সাঁ শব্দ৷ দাদুর স্তোত্রপাঠ৷ চা তৈরি হতে-হতেই আমাদের সাজগোজ শেষ৷

ফুটফুটে সকাল৷ সার-সার ইউক্যালিপটাস আর দেবদারু খাড়া উঠে গেছে আকাশের দিকে৷ আকাশের রং গা ধোয়া নীল৷ পাথর ছড়ানো পথে আমরা হাঁটছি৷ কোনও তাড়া নেই, উদ্বেগ নেই, উৎকণ্ঠা নেই৷ চামরের মতো বাতাস৷ কত রকমের গল্প, গান, প্রফুল্লদাকে নিয়ে দাদুর মজা৷ জ্যাঠাইমার নরম হাত আমার হাতে৷ যেন সুখের পালকি চলেছে৷

হাটের দিনে আমরা হাট ঘুরে বাড়ি ফিরে আসতুম৷ সঙ্গে বিশাল সওদা৷ আসার পথে হালুইকরের দোকানে একটা হল্ট৷ অপূর্ব কচুরি, মোহনভোগ, বালুসাই, দুধঘন চা৷ দুপুরে আমাদের খাওয়ার পরিমাণ এত বেড়ে গেল, প্রফুল্লদা বলতে শুরু করল, ‘এইবার আমাদের কোম্পানি ফেল করবে গো৷’ আমার যে ছোটখাটো একটা ভুঁড়ি হচ্ছে, সেটা আমি টের পেতুম প্যান্ট পরতে গিয়ে৷ আর কাশি! দিনে বার চারেক ইঁদারার জলে আমার ও প্রফুল্লদার হাতির চান হতো৷ তাতেও কাশির দেখা নেই৷

প্রফুল্লদা আর আমার রাতটাও ছিল সুন্দর৷ পাঁচ সেল-এর বিশাল একটা টর্চ আর হাতে একটা লাঠি নিয়ে আমরা হাঁটতে-হাঁটতে চলে যেতুম স্টেশানে৷ স্টেশান আজও আমাকে পাগল করে দেয়৷ জীবনের পরম সত্যের মতো৷ মানুষ আসে, মানুষ যায়৷ শেষ পর্যন্ত কেউই থাকে না৷ প্রাণহীন রেললাইন সবসময় ভীষণ একটা প্রতীক্ষা বুকে নিয়ে পড়ে আছে৷ ট্রেন আসবে৷ আমরা দেখার বা শোনার আগেই রেললাইন শুনতে পায়৷ রেললাইনের কান যে অনেক বড়৷ একা-একা আলো জ্বলে থাকে৷ দাঁড়িয়ে থাকে গাছ৷ ঝিম মেরে বসে থাকে দু-একজন দেহাতী যাত্রী৷ তারবাবু খটখট আওয়াজ করেন যন্ত্রে—টরে টরে টক্কা টরে, এই হল বর্ণপরিচয়৷ ঝাঁ-ঝাঁ করে টেলিগ্রামের তার৷

আমরা দুজনে ওভারব্রিজে উঠে মাঝখানটায় বসে থাকি, রেলিং ধরে নিচে পা ঝুলিয়ে৷ আমাদের আকর্ষণ, রাত এগারোটায় আসবে ডাউন মেল৷ বিশাল ট্রেন৷ আমাদের পায়ের নিচে এসে থেমে পড়বে৷ আমরা অনেকটা ওপর থেকে দেখতে পাব ট্রেনের ছাত৷ সার-সার ডুমো-ডুমো ডিম বসানো৷ পরিষ্কার ছাই-ছাই রং৷ শান্ত স্টেশান হঠাৎ ছটফট করে উঠবে৷ হকার হাঁকবে চাগ্রম৷ পানি পাঁড়ে বলবে জল৷ হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা বাঁশি বাজবে৷ ট্রেন তখন কয়লায় চলত৷ ইঞ্জিন বুককাঁপানো শব্দে স্টিম ছাড়বে৷ কোনও কিছু ছেড়ে যেতে হলে হয়তো এইরকম একটা শব্দ করতে হয়৷ কোনও শব্দ শোনা যায়, কোন শব্দ শোনা যায় না৷ যেমন মানুষ চলে যাওয়ার শব্দ৷ ট্রেনটা ধীরে-ধীরে প্ল্যাটফর্ম চলে যাবে৷ গার্ডের কামরা৷ একজন মানুষ, হাতে ফ্ল্যাগ৷ কে যেন পেছন থেকে তাঁর জামার কলার ধরে হিড়-হিড় করে টেনে নিয়ে চলেছে৷ তাঁর ঘরটা গোটা ট্রেনের তুলনায় রেলিং ঘেরা ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের বাক্স৷ ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর স্টেশান রাতের মতো ঘুমিয়ে পড়বে৷ কাঠের সিঁড়িতে আমাদের পায়ের শব্দ৷ ভীষণ নির্জন পথ, দু-পাশে নিঝুম বাগানবাড়ি৷ ঘুম-ঘুম চোখে বাড়ি ফিরে এসে সোজা বিছানায়৷ তিন মাসের মাথায়, বাবার যেমন আসার কথা ছিল মাকে নিয়ে, এসে গেলেন৷ পুজো সবে শেষ৷ শীত আসছে৷ সকালে আর সন্ধের পর বেশ ঠান্ডা৷ মরসুমি ফুলে বাগান হাসছে৷ গোলাপের বাহার৷ ভেলভেটের মতো পাপড়ি৷ তার ওপর মধুর মতো সকালের শিশির৷

জ্যাঠামশাইয়ের চেহারা দেখে বাবার কী আনন্দ৷ বহুবার হাজারিবাগে এসেছেন৷ সেইসব স্মৃতি মনে খইয়ের মতো ফুটছে৷ ভোরের বেড়ানো যেন আরও আনন্দের৷ রাস্তার বাঁকে-বাঁকে পুরোনো দিনের ঘটনা বাঘের মতো ওত পেতে আছে৷ মেজদা মনে আছে, বলে বাবা শুরু করছেন, আর অতীত উড়ে-উড়ে আসছে ঝাঁক-ঝাঁক পাখির মতো৷ মা আর জ্যাঠাইমা, দাদু বলছেন, ‘আহা! কতকালের দুই সখী৷ কেমন হাত ধরাধরি করে মশগুল হয়ে চলেছে দেখো৷’

আর তিন দিন৷ ফিরতে হবে কলকাতা৷ শরৎকাকু টিকিট রিজার্ভ করে দিয়েছেন৷ পাম নদীর ধারে পিকনিক হল একদিন৷ শরৎকাকুর গাড়ি হর্ন দিতে-দিতে চলল৷ যেন সিনেমার শুটিং পার্টি চলছে৷ কাচের মতো নদী৷ তলায় চিকচিক করছে বালি, অভ্রের কণা৷ ছোট-ছোট মাছ, যেন প্রকৃতির নিজস্ব অ্যাকোয়ারিয়াম৷ গাছের ছায়ায়-ছায়ায় সারাটা দিন কেটে গেল স্বপ্নের মতো৷ জ্যাঠামশাইয়ের কত রকমের গল্প৷ ছেলেবেলার গল্প, স্কুলের-কলেজের গল্প৷ মা আর জ্যাঠাইমা দাদুর জন্যে একটা বিছানা নিয়ে গিয়েছিলেন৷ গোল একটা বালিশ৷

সন্ধের কিছু পরে আমরা ফিরে এলুম৷ আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আমরা আছি৷ সকলেই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন৷ বেশ শীত এসে গেছে৷ অনেক দিন পরে মাকে জড়িয়ে শুয়েছি৷ স্বপ্নের মতো চোখে ভাসছে নদী, বন, রোদ, ছায়া, মাছ৷ কানে হাসি, গান, গল্প৷

মনে হয় সকাল হয়েছে৷ প্রফুল্লদা ভীষণ জোরে-জোরে ডাকছে৷ পাশে মা নেই৷ সবাই বাগানের দিকে ছুটছেন৷ সাদা গোলাপ গাছ৷ টাটকা ফুল ফুটে আছে৷ ঘামের মতো শিশির মাখা৷ গাছের গোড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন জ্যাঠামশাই৷ ডান হাতে একটা সাদা গোলাপ৷ জ্যাঠামশাই মারা গেছেন৷ চলে গেছেন তিনি একটি গোলাপ হাতে নিয়ে৷ ডাক্তারবাবু এসে বললেন, হার্ট অ্যাটাক৷

সাত

কাশি? এত বছর বয়স হয়ে গেল, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মানুষ কোনও-না-কোনও সময়ে কাশছে, আমি জানি, আমার আর যাই হোক কাশি কোনও দিন হবে না৷ কেন? নিজের জীবন দিয়ে আমার ছাগুলে কাশি সারিয়ে দিয়ে গেছেন আমার জ্যাঠামশাই৷ হাজারিবাগে তো কত মানুষই আগে-আগে চেঞ্জে যেতেন৷ একটু বায়ুপরিবর্তন৷ স্বাস্থ্যে সামান্য চেকনাই৷ এর বেশি কার কি হয়েছে! আমার যে ধাতটাই পালটে গেল৷ সে হাজারিবাগের জন্যে নয়৷ আমার জ্যাঠামশাইয়ের জন্যে৷

হাজারিবাগ হল আমার কাশী, আমার বারাণসী৷

বছরে একবার, শীতকালে আমি হাজারিবাগে যাবই৷ কয়েকদিন থেকে চলে আসি৷ প্রথমে যাই ফুলের জলসায়৷ সেই বাড়ি আর নেই! ধ্বংসাবশেষ৷ সুখের দিন, মানুষের বোলবোলা বেশি দিন থাকে না৷ সে বাগান নেই৷ স্থানীয় এক কাঠ-ব্যবসায়ী কিনে নিয়েছেন৷ বড়-বড় কাঠের গুঁড়ির ডাঁই৷ অমন সুন্দর বাড়ি যেন একটা খাটাল৷ তবু আমি সব দেখতে পাই৷ কল্পনায়৷ তারপর যাই পাম নদীর ধারে৷ নির্জন সেই জায়গাটায়, যেখানে জ্যাঠামশাইকে সৎকার করা হয়েছিল৷ গাছের ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়ে৷ বালি চিকচিক করে৷ নদী বছরের-পর-বছর আমার জ্যাঠামশাইকে গান শোনায়৷ সেদিন যাঁরা ছিলেন আমি ছাড়া আজ আর কেউ নেই৷ আমি শেষ প্রতিনিধি৷ আমি মৃদু গলায় ডাকি, ‘জ্যাঠামশাই!’

উত্তর পাই, ‘কী বাপি! কেমন আছ তুমি?’

আমি বলি, ‘আমার বয়েস বেড়ে গেছে জ্যাঠামশাই৷ এখনও আমাকে বাপি বলছেন?’

জ্যাঠামশাই হাসেন, না নদী হাসে, না গাছে হনুমান হাসে আমি বলতে পারব না৷ সেই অদ্ভুত মিষ্টি হাসি শুনতে পাই৷ জ্যাঠামশাই বলেন, ‘তুমি তো অতীতে চলে এসেছ৷ তোমার বারো বছর বয়েসটা এই গাছের ছায়ায় নদীর ধারে পড়ে আছে বাপি! খামে ভরা চিঠির মতো৷’

আমি তখন এক মুঠো বালি তুলে বাতাসে ছেড়ে দি৷ অভ্রের কণার মতো ছড়িয়ে পড়ে৷ হাসি কান্না হীরে পান্না৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%