সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমার বন্ধু পলাশ আজ চলে যাবে৷ আমরা কালাচাঁদ স্কুলে একই ক্লাসে পড়ি৷ ক্লাস সেভেনে৷ সেই ক্লাস থ্রি থেকে আমরা পড়ছি৷ ওর সঙ্গেই আমার বেশি বন্ধুত্ব৷ সেই যে দুজনে পাশাপাশি বসে আসছি, সেই যে দুজনে দুজনকে প্রাণের কথা মনের কথা বলে আসছি, কাল থেকে শেষ হয়ে যাবে চিরকালের মতো৷ কাল থেকে ক্লাসে আমার বাঁ পাশে পলাশ আর বসবে না৷ টিফিনের সময় স্কুলের গাছতলায় দুজনে পাশাপাশি গাছে হেলান দিয়ে টিফিন ভাগাভাগি করে আর খাব না৷ গ্রীষ্মের ছুটিতে ওদের তিনতলার ছাদের ঘরে বসে দুজনে মিলে হোমটাস্ক করা আর হবে না৷ ফাইনাল পরীক্ষার আগে দুজনে মিলে মা কালীর মন্দিরে গিয়ে আর পুজো দোব না৷ দুর্গাপূজোর সময় দুজনে মিলে আর প্যান্ডেলে-প্যান্ডেলে ঘুরব না৷ কখনও ফুচকা খাওয়া কখনও শালপাতায় গরম ঘুগনি৷ ঝালের চোটে হু-হা৷ ঝাল কমাতে আইসক্রিম৷
আমরা দুজনে নৌকো চেপে বেলুড় মঠে যেতুম৷ সেখানে এক মহারাজ আমাদের খুব ভালোবাসতেন৷ মঠের সমস্ত বাগান তিনি দেখাশোনা করতেন৷ সুন্দর ছবি আঁকতেন৷ অসাধারণ ভালো গান গাইতেন৷ আমাদের সরষের তেলমাখা মুড়ি খাওয়াতেন৷ গ্রামের মুড়ি, ফুলো-ফুলো৷ সঙ্গে বাদাম৷ পোটাটো চিপস৷ আমাদের গাছের কথা বলতেন৷ গাছ চেনাতেন৷ ঠাকুর, স্বামীজির কথা বলতে-বলতে কেঁদে ফেলতেন৷ আমাদের বলতেন, লেখাপড়ার সঙ্গে ব্যায়াম করবে৷ গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে৷ দু-একজন ভালোমানুষ বন্ধু রাখবে৷ অনেকের সঙ্গে হইহই না করাই ভালো৷ ভালো-ভালো বই পড়বে৷ আলোচনা করবে৷ ভালো-ভালো কবিতা মুখস্থ করবে৷ আর চেষ্টা করবে বড় হয়ে সংসারে না ঢুকতে৷ পারলে, সন্ন্যাসী হয়ে সমাজসেবা করবে৷ কুয়োর ব্যাং হয়ে জীবন নষ্ট কোরো না৷ তিনটে মন্ত্র শিখেছিলুম তাঁর কাছে, বি কেয়ারফুল, বি গ্রেট, বি ওয়াইজ৷ মাছি নয়, মৌমাছি হও৷ গোলেমালে মাল আছে৷ গোলটা ফেলে মালটা নাও৷ সেই ফুল মহারাজও ক’দিন আগে বোম্বাই চলে গেছেন৷ সেখানকার আশ্রমে৷ পলাশরাও বোম্বাই যাচ্ছে৷ পলাশ তাঁর সঙ্গ পাবে৷ আমি পাব না৷
পলাশ আর আমার মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, দুজনে পরীক্ষায় এক নম্বর পাব৷ সাবজেক্টে এক-আধ নম্বর এদিক-ওদিক হলেও, টোটালে যেন এক থাকে৷ আর হতোও তাই৷ পলাশ ইংরিজিতে পাঁচ নম্বর বেশি পেলে আমি বাংলায় পাঁচ নম্বর বেশি পেয়ে যেতুম৷ অঙ্কে দুজনেই সমান-সমান৷ ইতিহাসেও সমান-সমান৷ ফারাকটা ইংরিজি আর বাংলাতেই হতো৷ দুজনে পরামর্শ করে পড়তুম৷ একই নোটস৷ পলাশ আমাকে সাহায্য করত, আমি পলাশকে৷ একই গৃহশিক্ষক আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পড়াতেন৷
পুজোর সময় পলাশের মা আমার জন্যে জামা-প্যান্ট কিনতেন৷ আমার মা পলাশের জন্যে৷ দুজনেরই এক রং, এক স্ট্রাইপ৷ অনেকের হিংসে হতো, এ আবার কী! একালে ভায়ে-ভায়েই মিল থাকে না, দু-পরিবারের দুটো ছেলের মধ্যে এত মিল কিসের! রাস্তায় দুজনকে একসঙ্গে পাশপাশি দেখলে সব ব্যঙ্গ করে বলত, এই যে মানিকজোড় চললে কোথায়! বেশ বুঝতে পারতুম, ভেতরে জ্বালা ধরেছে৷ একদল লোক শুধু খারাপটাই খোঁজে৷ মনে-মনে সব সময় জপ করে, তোদের সর্বনাশ হোক! অনেকে আবার এমনও বলত, হ্যাঁ রে! তোরা কি একসঙ্গে বাথরুমেও যাস৷
পলাশ একদিন একজনকে এর উত্তরে বলেছিল, ‘এতই যদি কৌতূহল, তাহলে একদিন আমাদের সঙ্গে থাকুন না৷ তাহলেই সব জানতে পারবেন৷’
ভদ্রলোক রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অতিশয় ডেঁপো ছোকরা৷’
কাল পলাশদের মালপত্তর সব বাঁধাছাঁদা হয়েই গেছে৷ পলাশ তার সব বইপত্র, খাতা আমাকে দিয়ে দিয়েছে৷ ওসব ওর আর কোনও কাজে লাগবে না৷ নতুন স্কুলে ভরতি হবে৷ নতুন পাঠ্যপুস্তক৷ নতুন জীবন শুরু হবে৷ আমরা কলম বদলাবদলি করেছি৷ সন্ধের সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে, যে-যে জায়গায় দুজনে একসঙ্গে যেতুম, সেই সব জায়গায় গেছি৷ কালীমন্দিরে৷ খেলার মাঠে৷ ফাঁকা মাঠ৷ মাঝখানটা কাদাকাদা৷ ধারে-ধারে কেঁচোর তোলা গুটলে-গুটলে মাটি৷ গোলপোস্টের পেছনে ঘাস আর আগাছার ঝোপ৷ ব্যাঙের কট্কট্ শব্দ৷ দিনের আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে৷ আকাশে শরতের মেঘ-এর চালান এসে গেছে৷ সোঁদা-সোঁদা, ভিজে-ভিজে গন্ধ৷ গোলপোস্টের শালকাঠ জলে ভিজে-ভিজে আর রোদে পুড়ে নব্বই বছরের বৃদ্ধের মতো চেহারা ধরেছে৷ আর তলায় আমরা, শুধু আমরা দুজনে দাঁড়িয়ে৷ পলাশ সেই সময় অদ্ভুত একটা কথা বললে,
পৃথিবীটা একটা খেলার মাঠ৷ সবাই খেলোয়াড়৷
কেউ গোল দেবে৷ কেউ গোল খাবে৷ আমরা
সকলেই যে যার গোলপোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে আছি৷
গোলকিপার সব সময় একা৷
যেই কথাটা শেষ হল সামনের বটগাছে সেই পেঁচাটা রাতের প্রথম প্রহরের ডাকটা ডেকে উঠল৷ ঠিক তিনবার, চ্যাঁ-চ্যাঁ-চ্যাঁ৷ পলাশ বলত, পেঁচা নয়৷ ওয়ার্ডেন৷ বলছে, আর খেলা নয়, এইবার বাড়ি যাও সব৷ হাত-মুখ ধুয়ে প্রার্থনা সেরে পড়তে বোসো৷ আমাদের খেলার মাঠের ওয়ার্নিং-বেল৷ কর্কশ, কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ৷ রোজই খেলার পর আমরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে গল্প করতুম৷ ঘাম মরে যাওয়ার পর বাড়ি ঢোকা হবে৷ কত রকমের গল্প! অলোক রবীন্দ্রসংগীত করত৷ প্রণব বলত তার ভবিষ্যৎ জীবন পরিকল্পনার কথা৷ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে জাহাজে চাকরি নেবে, পৃথিবীর বন্দরে-বন্দরে ঘুরবে৷ এডেন, সিঙ্গাপুর, পোর্টসমাউথ, বস্টন, ভ্যাঙ্কুভার, সিডনি৷ অনিমেষ বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে মেরিল্যান্ডে৷ পার্থ যাবে ভার্সাইতে৷ প্রবীর যাবে হারভার্ডে৷ শিবেন ভালো-ভালো ইংরিজি বই পড়ে৷ সুন্দর গল্প বলে৷ তার খুব ইচ্ছে স্যাটিলাইটে চেপে মহাকাশে যাবে৷ নবারুণ ইজিপ্টোলজি পড়ার জন্য কায়রোতে পাড়ি দেবে৷ পিরামিডে ঢুকে ফারাওদের সমাধি খুলে পুরোনো ইতিহাস বের করে আনবে৷ সত্যেন যাবে হিমালয়ে৷ এভারেস্টের মাথায় উঠবে৷ যার যা ইচ্ছে, সবই এই মাঠের আসরে বেরিয়ে আসে৷ প্রীতি কবিতা লিখতে পারে৷ মাঝে-মাঝে আবৃত্তি করে শোনায়৷ আমরা অবাক হয়ে শুনি, কেমন কথা দিয়ে কথার মালা গাঁথে, ছন্দে-ছন্দে৷ প্রীতির জীবনে খুব দুঃখ৷ এখানে মামার বাড়িতে মানুষ হচ্ছে৷ অনেক ছেলেবেলায় বাবা মারা গেছেন৷ সে বড় কিছু হতে চায় না৷ বিষ্ণুপুরে একটা নার্সারি করবে৷ ফুল ফোটাবে, আর কবিতা লিখবে৷ মাছ-মাংস-কালিয়া-পোলাও, এইসব কিছুই খাবে না৷ দু-বেলা দু-মুঠো ডাল-ভাত হলেই হবে৷ সে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখবে৷ রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে৷ বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর, টিনের চালের কোণ চুঁইয়ে বৃষ্টির জলের ফোঁটা পড়া দেখবে৷ নদী যেখানে নির্জনে দুটো পাথরের মাঝখানে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে, প্রীতি সেইখানেই যাবে৷ প্রীতি গভীর রাতে রেললাইনের ধারে বসে দূর থেকে আসা ঘুমন্ত ট্রেনের শব্দ শুনবে৷ অন্ধ সরীসৃপ৷ সারা জীবন একটা মুখের সন্ধান করবে, যে মুখে শুধু দুঃখ আছে৷ যে-চোখে দীঘির মতো জল টলটল করে৷ প্রীতি একদিন সন্ধেবেলা একটা কবিতা শুনিয়েছিল,
মস্ত বড় একটা গাছ আমার বাবার মতো
মাঠের শেষে নদীর কিনারায়৷
তার পাশে ছোট্ট একটা চালা
কেউ কোথাও নেই কয়েকটা শালিক৷
একটা নৌকো বাঁধা আছে বহু দিন
ওপারে গিয়েছে কেউ, সে আর আসেনি৷
এপারের নৌকো ওপারে যায়নি
কথা যে দিয়েছিল সে আর কথা রাখেনি৷
সময় সময়ের পথ ধরে সব নিয়ে গেছে৷
অপেক্ষা বসে আছে এই পারে ছায়া হয়ে৷৷
কবিতাটা আমরা তেমন বুঝিনি৷ পলাশ বুঝেছিল৷ বলেছিল, দেখবি, প্রীতি একদিন মস্ত বড় কবি হবে৷ কবিতাটা নিজের বড় ডায়েরিতে লিখে নিয়েছে পলাশ৷ এইসব গল্প হঠাৎ থেমে যেত, সেই প্যাঁচাটা চ্যাঁ-চ্যাঁ করে ডেকে উঠত৷ ছেলেরা সব বাড়ি যাও৷
প্যাঁচার ডাক শুনে পলাশ বললে, ‘কাল থেকে এই ডাক আর আমি শুনবো না৷ তোরা শুনবি৷’
মাঠ থেকে আমরা গণেশদার দোকানে গেলুম৷ একটা লক্ষ্মীর ভাঁড়ে আমাদের টাকা জমত৷ সেইটা দুপুরে ভাঙা হয়েছে৷ একান্ন টাকা বেরিয়েছে৷ পলাশ রাবড়ি আর কালাকাঁদ ভালোবাসে৷ গণেশদার দোকান এই দুটো জিনিসের জন্যে বিখ্যাত৷ কোণের দিকের চেয়ারে বসে চুটিয়ে খাওয়া হল৷ কিছু টাকা বেঁচে গিয়েছিল৷ সেই টাকায় একটা বড় পাঁউরুটি আর এক ভাঁড় রসগোল্লা কিনে আমরা সুধাদির বাড়িতে দিয়ে এলুম৷ সুধাদির কেউ নেই৷ এক সময় নাচ শেখাতেন৷ হঠাৎ চোখের দৃষ্টি কমে এল৷ এখন প্রায় অন্ধ৷ সুধাদিকে আমরা খুব ভালোবাসি, সুধাদিও আমাদের খুব ভালোবাসেন৷ প্রীতি একটা মুখ খুঁজছে৷ সুধাদির মুখ, সেই মুখ৷ পাঁউরুটি আর রসগোল্লা পেয়ে বললেন, ‘কী হল? আজ কি তোদের জন্মদিন?’
পলাশ বললে, ‘কাল আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি সুধাদি৷’
‘কোথায় রে! সল্টলেকে বাড়ি হল বুঝি!’
‘না গো, আমরা বোম্বাই চলে যাচ্ছি৷ বাবার অফিস এখান থেকে বোম্বাই চলে গেল৷’
‘আর আসবি না!’
‘যদি কখনও বেড়াতে আসি৷ এখানে তো আমাদের আর কিছু রইল না৷’ সুধাদির করুণ মুখ আরও করুণ হয়ে গেল৷ অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঝাপসা চোখে৷ শেষে নিজের মনেই বললেন, ‘কিছুই থাকে না, সবাই চলে যায়৷ ঠিক আছে, আমিই থাকি৷’
পলাশ বললে, ‘সুধাদি, বিভাস তো রইল৷’
‘তা রইল, দুটো চোখের একটা চোখ৷’
সুধাদি উঠে দাঁড়ালেন৷ আন্দাজে, সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে, দেয়াল ঘেঁষে ঘরের উল্টো দিকে যাচ্ছেন৷
পলাশ বললে, ‘যাচ্ছ কোথায়?’
কোনও উত্তর নেই৷ আমরা গিয়ে হাত ধরলুম, ‘কী করতে চাইছ, বলো?’
‘আলমারিটা খুলব৷’
আলমারি খোলা হল৷ সুধাদি বললেন, ‘ওপরের তাকে দেখো, একটা বেশ কাজ করা গয়নার বাক্স আছে৷ সেটা বের কর৷’
সুন্দর একটা বাক্স৷ পাশের টেবিলে রাখলুম৷ সুধাদি সামনে ঝুঁকে পড়ে, ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়ে এটা-ওটা দেখতে লাগলেন৷ নানা রকম জিনিস, ক্লিপ, চেন, সোনার সেফ্টি পিন, লকেট৷ এইসবের মধ্যে থেকে সুধাদি ডিমের মতো আকৃতির নীলচে রঙের দুটো কী বের করলেন!
‘জানিস এ-দুটো হল এক ধরনের পাথর৷ একবার হায়দ্রাবাদে নাচতে গিয়েছিলুম৷ এক মহারাজা আমার নাচ দেখে খুশি হয়ে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এই দুটো দিয়ে বলেছিলেন, লাকি স্টোন৷ এর একটা তোর, আর একটা বিভাসের৷ সব সময় কাছে রাখবি৷ লাকি স্টোন৷ যা চাইবি তাই পাবি৷’
পাথর দুটো সত্যিই অসাধারণ সুন্দর৷ নীলের আভা৷ যেন দুটো পায়রার ডিম৷ বিছানার চাদরে দুটোকে পাশাপাশি রেখে আমরা দেখতে লাগলুম৷ দুটো নীল চোখ ঝকঝক করছে৷ দেবীর চোখের মণি৷
পলাশ হঠাৎ বললে, ‘সুধাদি, এই দুটো তোমার কাছেই থাকবে, আমাদেরই জিনিস৷ আমরা দুজনে যেদিন আবার এক হতে পারব, এক জায়গায়, সেইদিন আমরা এই দুটো নেব৷ এর একটার নাম পলাশ আর একটার নাম বিভাস৷ দুজনে একসঙ্গে আবার যেদিন তোমার সামনে আসব সেইদিন৷’
আমরা এই কথা বলে চলে এলুম৷ রাতে আমরা একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলুম৷ আমাদের যত গল্প ছিল৷ এবারের পুজোয় কী হবে! বিন্ধবাসিনী তলার মেলায় বেলুন ফাটানো৷ সোনালিদের বাড়িতে ঘুগনি খাওয়া৷ ফুটবল টুর্নামেন্ট৷ শীতের সকালে নৌকো চেপে বেলুড়৷ যত কথা ছিল৷ রাত শেষ হয়ে গেল, তবু কথা শেষ হল না৷
সকালে মনে হচ্ছে, কেউ বুঝি মারা গেছে৷ পলাশদের বাড়ির মালিক শচীনবাবু এসে গেছেন৷ হাতে এক থোলা চাবি৷ মাঝে-মাঝে ঝনঝন শব্দ৷ পলাশরা চলে গেলেই ঘরে-ঘরে তালা মারবেন৷ ভদ্রলোকের আনন্দ হচ্ছে, না দুঃখ বুঝতে পারছি না৷ নিচের বাইরের ঘরে, মোটঘাট সব সাজানো৷ ক্যালেন্ডার কেটে এক-দুই-তিন, চার নম্বর সাঁটা৷ তিন দিন আগে এক ফার্নিচারওলা এসে সবই প্রায় কিনে নিয়ে গেছে৷ একটু পরে এসে খাট তিনটে নিয়ে যাবে৷ এরই মধ্যে আমরা দুজনে একটা স্টুডিয়োয় গিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তুলিয়েছি৷
দুটো গাড়ি এল৷ দুর্গা বলে যাত্রা৷ কারও মুখেই কথা সরছে না৷ পাড়া ছেড়ে বড় রাস্তায়৷ একটা গাড়িতে কিছু মালপত্র, আমি আর পলাশ পেছনের সিটে পাশাপাশি৷ হাতে-হাত ধরা৷ সব পরিচিত জায়গা পেছনে ছুটে পালাচ্ছে৷ আমরা ফ্যালফ্যাল করে দেখছি৷ হাওয়া স্টেশান৷ কত লোকের কত দিকে যাওয়া আসা৷ হাঁই-হাঁই ছোটাছুটি৷ গীতাঞ্জলি দাঁড়িয়ে আছে৷ মালপত্তর উঠে গেল৷ পলাশের মা-বাবা উঠেছেন৷ প্রণাম করেছি৷ আশীর্বাদ করেছেন৷ সবই নীরবে৷ চোখে টলটল জল৷ সবশেষে উঠছে পলাশ৷ ভালো করে দেখতেই পাচ্ছি না, দুজনে দুজনকে৷ জল, অনবরত জল৷ মানুষের চোখে এত জল আসে কোথা থেকে! পলাশ কোনও রকমে বলতে পারল, ‘চিঠি দিস, ছবিটা পাঠাস৷ খেলার মাঠের প্যাঁচাটাকে বলিস, সন্ধে হলেই বাড়ি ফিরব৷’
ট্রেন চলছে৷ জানলায় পলাশের মুখ৷ সরে যাচ্ছে৷ আমি ছুটছি৷ পলাশ হাত নাড়ছে৷ একটা আঁচলের মতো আমার মন আটকে গেছে ট্রেনের জানলায়৷ ছাড়াতে পারছি না৷ আমাকে টানছে৷ ট্রেনের গতি বাড়ছে৷ মনে পড়ছে প্রীতির কবিতার একটা লাইন, ‘ছুটতে-ছুটতে একদিন ছোটা শেষ হবে আকাশের কাছে এসে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন