সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দিদি আমার জন্যেই আজ মায়ের কাছে প্রচণ্ড বকুনি খেয়েছে৷ আস্ত দুখানা চড় খেয়েছে৷ আচ্ছা! আমার কী দোষ! আমি যে দিদিকে ভীষণ ভালোবাসি৷ পড়ে গেলে কী হত! কতবার বলছি, দিদি! পেয়ারা গাছের অত উঁচু ডালে উঠিস না৷ বর্ষাকাল৷ পা স্লিপ করে পড়ে গেলে! হাত-পা ভেঙে যাবে৷ দেখলি তো! সৌরভ সেদিন গাছ থেকে পড়ে গিয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে৷ গাছের উঁচু ডাল থেকে দিদি উত্তর দিলে, ‘ভিতুর ডিম!’
‘পড়ে গেলে কী হবে রে দিদি!’
আমি হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে শুরু করেছি৷ আমি ছেলে যে!
দিদির মতো ফোঁস ফোঁস করে ফুলে ফুলে কাঁদতে পারি নাকি? আমি দিদির জন্যেই কাঁদছি আর দিদি গাছের উঁচু ডাল থেকে বললে, ‘বাঁদর! আমি তোর জন্যে একটা পাকা পেয়ারা পাড়তে এত উঁচুতে উঠেছি৷ চেল্লাচ্ছে দেখ!’
বলতে, বলতেই মা ছুটে এসেছে৷ গাছের ওপর দিকে তাকিয়েই কড়া গলা, ‘নেমে আয়৷ শিগগির নেমে আয়৷ গেছো হনুমান!’ দিদি নেমে আসতেই, আস্ত দুটো চড়৷
দিদি মনের দুঃখে গাছের একটু দূরে আমাদের যে বড় পুকুরটা ছিল, তার ধারে গিয়ে বসল৷ কোঁচরে যে-কটা পেয়ারা ছিল, একটা একটা করে পুকুরের মাঝখানে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল৷
আমি পাশে বসে বললুম, ‘কী রে দিদি!’
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে অন্য দিকে মুখ করে বসল৷
অনেকক্ষণ বসে আছি, তবু কথা বলছে না৷
তিন-তিনবার কথা বলার চেষ্টা করলুম, তবু বললে না৷
মনের দুঃখে মানুষ কী করে আমি জানি৷ জলে ঝাঁপ দেয়৷
আমি তাই করলুম৷ ‘ঠিক আছে দিদি!’ বলেই সোজা জলে ঝাঁপ৷ সাঁতার জানি না৷ ডুবব বলেই তো ঝাঁপিয়েছি!
দিদি খুব সাঁতারু৷ ঝাঁপিয়ে পড়ে চুল ধরে টেনে টেনে তুলল ঘাটে৷ অনেকটা জল খেয়েছি৷ বুকে চাপ দিয়ে জল বের করে দিল৷ উঠে বসলুম৷ ঠাস ঠাস করে খানকতক চড় মেরেই বুকে জড়িয়ে ধরল৷ দুজনেই কাঁদছি৷
দিদির বিয়ে৷ মাঠে প্যান্ডেল হয়েছে৷ সকাল থেকেই হইচই৷ ধুমধাম৷ এই আসছে৷ সেই আসছে৷ এ আসছে৷ সে আসছে৷ রাত্তির বেলাতেই ভিয়েন বসে গেছে৷ দরবেশ আর পান্তুয়া ভাজার গন্ধ৷ এ বলছে ওই নিয়ে আয়৷ ও বলছে সেই নিয়ে আয়৷ মাঝেমধ্যে খ্যাচাখেচি৷ জাফরানের ডিবেটা এইমাত্র এখানে ছিল, গেল কোথায়? ঝুড়িটা কি হাওয়া খেতে গেল? ঘন ঘন সব চা খাচ্ছেন৷ প্রবীণরা একটু একটু কথা বলছেন, আর বেশি বেশি কাশছেন৷ বাবাকে বলছেন, একটা বড় কাজ করে ফেললে৷ মেয়ে পার করা কি কম কথা হে!
তা খরচখরচা কোথায় উঠল? লাখ ছাড়িয়েছে? এরই মাঝে হন্তদন্ত একজন, দেখলেন তো মাছ এখনও এল না৷
ঠাকুররা সব বসে আছে৷ কে গেছে? আনতে কে গেছে?
দেখ, ঘুমিয়ে পড়েছে!
এই সেই পুকুর ধার, ওই সেই পেয়ারা গাছ৷ দিদি আমার বড় হয়ে গেল৷ কোথাকার একটা ছেলে এসে কাল সকালেই আমার দিদিকে নিয়ে কোথায় চলে যাবে!
বর এসেছে৷ বর এসেছে৷
মাঠের ওধারে, বড় মসজিদটার ওপারে সূর্য সেই কখন অস্ত গেছেন! এ-পাশে বিয়ে বাড়ির কত আলো৷ ও-পাশে অন্ধকার৷ ছোট বাজার৷ কুপি জ্বেলে কেনা-বেচা৷ অনেক অনেক কুপি৷ সারি সারি আলো৷ সরু সরু পথ৷ সে বেশ লাগে! কতরকম মানুষের কতরকমের কথা৷
এই বিয়েতে আমি থাকতে চাই না৷ দিদির বরটাকে আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি৷ কীরকম লোহা-লোহা চেহারা! বন্ধুগুলোও বাজে৷ একজন বললে, ‘এই ছোঁড়া! এক প্যাকেট সিগারেটে কী হবে, একটা পেটি নিয়ে আয়!’
ছোট বাজারে আসলাম কাকুর দরজির দোকান৷ একেবারে এ-ক্লাস মানুষ! ফরসা ধবধবে৷ সাদা চুল, দাড়ি৷ সুরমা টানা চোখ৷ চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবি৷ তিন ওয়াক্ত নামাজ করেন৷ দরজির দোকান খুব ভালো লাগে আমার৷ কতরকম রঙের কাপড়ের টুকরো ছড়িয়ে থাকে মেঝেতে৷ কাঁচির কচকচ আওয়াজ৷ কল চলছে ঘড়ড়, ঘড়ড়৷ আসলাম কাকুর সামনে একটা টুলে বসে রইলুম৷ অনেকক্ষণ৷
‘কী মন খারাপ! দিদি চলে যাচ্ছে! দিদিরা থাকে না৷ কাকুরা থাকে৷’
দিদির বিয়েটা ভালো হয়নি৷ সেই লৌহদানবটা দিদিকে এমন কষ্ট দিলে, দু’বছরের মাথায় দিদিকে চলে আসতে হল৷ এ-দিদি আমার সে-দিদি নয়৷ বুঝতে পারি দিদির কোনও জায়গা নেই৷ বড়রা সবাই দিদির দোষ দেয়৷ মানিয়ে নিলেই হত! অত বড়লোক! কোল্ড-স্টোরের মালিক৷ মদ খায় তো খায়! রমার বর তো দিশি খায়, মেয়েটা তাও কেমন মানিয়ে আছে! আর তোর বর তো বিলিতি!
বেশিরভাগ সময় দিদি বাগানে বসে থাকে গাছতলায়৷ সময় সময় আমিও থাকি৷ একদিন পেয়ারা গাছটার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘বুড়ো, ওই গাছটার পেয়ারা কত খেয়েছি! এখন আর ইচ্ছেই করে না৷ জানিস তো বুড়ো, মেয়েদের সবাই মেরে ফেলতে চায়৷ আমার কোথাও থাকার জায়গা নেই৷’
‘আমি তো আছি!’
‘তুই তো পুরুষ!’
চুপ হয়ে গেলুম৷ সত্যিই তো! বড় হয়ে কোথায় চলে যাব! কে জানে!
দিদি বললে, ‘মনে আছে বুড়ো, তুই একদিন এই পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলিস?’
‘তুই না বাঁচালে আমি সেই দিনই মরে যেতুম!’
‘বুড়ো, আমি ঝাঁপালে কী করবি?’
‘আমি এখন সাঁতার জানি রে! চুল ধরে টেনে আনব৷’
‘বুড়ো৷ আমার নামে এই পুকুরটার নাম রাখবি, কৃষ্ণা সায়র৷’
সাঁতার জেনেও ঘুমিয়ে ছিলুম৷ দিদি ওই পুকুরেই ডুবে গেল৷ গলায় কলসি বেঁধেছিল৷ সকালে দেখা গেল, দীর্ঘ এলো চুল জলের ওপর ছড়িয়ে আছে৷ ছোট ছোট তরঙ্গে ঝিরঝির করছে৷ পাশ দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে নির্বিকার হাঁস৷
লোহার মানুষটা দেখতেই এল না৷ হীমঘরের মালিক!
দিদি ঠিকই বলেছিল৷ তুই আমায় দেখবি? তুই কোথায় থাকবি, তার নেই ঠিক৷ মা বললে, ‘দেখে নিয়েছিস তো! সব ঠিক আছে?’
‘আছে মা৷’
রাত দুটোয় প্লেন৷ দিদি রে! আমেরিকায় চললুম৷ দুপুরবেলায় বিদায়িভোজ হয়ে গেল৷ আত্মীয়স্বজন অনেকেই এসেছেন৷ শুয়ে, বসে কত গল্প! এই সুযোগ৷ নির্জন পুকুর-পাড়ে প্রদক্ষিণ করলুম৷ দিদির কত স্মৃতি! শেষে এলুম সেই পেয়ারা গাছের তলায়৷ বয়েস হয়েছে যথেষ্ট৷ প্রবীণ গাছ৷ আসলাম কাকুর মতোই প্রবীণ৷ গাছটার প্রত্যেকটা ডালে আমার দিদির স্পর্শ৷ গাছ! তুমিই আমার দিদি! গাছটাকে জড়িয়ে ধরলুম৷
ওটা কী?
গাছটার উঁচু ডালে ওটা কী ঝুলছে৷
যে-গাছে উঠলে দিদি আমার কান মলে শাসন করত, সেই গাছে উঠলুম৷ বড় হয়ে গেছি তো! ভয়ও করছে৷
একটা হার ঝুলছে৷ যতদূর জানি, এটা মঙ্গলসূত্র৷ সেই রাতে দিদি তা হলে শেষবারের মতো তার প্রিয় গাছে উঠেছিল৷ মঙ্গলসূত্রটা সবচেয়ে প্রিয় যে তাকেই দিয়ে গেছে৷ পকেটে রাখলুম৷
বিদায়ের সময় এগিয়ে এল৷ প্লেন উঠছে৷ ঊর্ধ্বে আরও ঊর্ধ্বে, মেঘলোকেরও ঊর্ধ্বে৷ দিদির মঙ্গলসূত্রটা মাথায় ঠেকালুম৷ স্পষ্ট শুনলুম কানের কাছে দিদির কণ্ঠস্বর,
‘বুড়ো! আমি তোর সঙ্গেই আছি রে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন