সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বাংলার স্যার মুখ ভার করে বসে আছেন৷ হাতে একটা খাতা৷ হেডস্যার ছাতা হাতে দরজার বাইরে দুবার পা ঠুকে ঘরে ঢুকলেন৷ রবীন্দ্রনাথের ছবিকে নমস্কার করলেন৷ আর একটি ছবি হনুমানের৷ মাথায় গন্ধমাদন৷ এই ছবিটিকে বিশেষভাবে নমস্কার করলেন দেয়ালে মাথা ঠুকে৷ মৃদু গলায় বললেন, ‘হনুমানদের মানুষ করো মহাবীর৷ ঘরে ঘরে হনুমান৷’ ঘরের কোণে লাল রং করা মোটা একটা লাঠি৷ একবার স্পর্শ করলেন৷ এটি মহাবীরের দণ্ড৷ তারপরে হঠাৎ ভীষণ চিৎকার—‘মহাবীর’৷ বাংলার স্যারের হাত থেকে খাতাটা মেঝেতে পড়ে গেল৷ নীচু হয়ে কুড়োতে গেলেন, বুক পকেটের সমস্ত মাল নেমে এল৷ একটা ছোট্ট চিরকুট বাতাসে উড়তে উড়তে দরজার দিকে চলেছে৷ ‘ধর ধর’—চেয়ারে পা জড়িয়ে টাল খেয়ে হেডস্যারের পিঠে৷ তিনি হুমড়ি খেয়ে মহাবীরের দণ্ডের ওপর৷ দুজনেই মেঝেতে গড়াগড়ি৷ দণ্ডটা সপাটে মাথায় এসে পড়ল৷ বাংলার স্যার বললেন, ‘ছোটলোক৷’
হেডস্যার বললেন, ‘কে ছোটলোক? আমি না আপনি?’
—আপনাকে বলিনি৷ ওই চিরকুটটাকে বলেছি৷ ওতে একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নাম লেখা আছে—অন্তিম—কি যেন!
—অন্তিমকাল তো আমার৷ মাথাটা ফেটে যায়নি এই আমার ভাগ্য৷
ওষুধটার নাম—অ্যান্টিম ক্রুড৷ আমি একবার খেয়েছিলুম৷
দুজনে ধুলো ঝেড়ে উঠে, যে যার জায়গায় বসলেন৷ নিজের চেয়ারে বসে হেডস্যার বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আপনি কিঞ্চিৎ অপয়া৷ দুঃখের সঙ্গেই জানাচ্ছি৷’
—সেকথাটা আমিও তো আপনাকে বলতে পারি৷ এই দেখুন আমার চশমার অবস্থা!
—এই দেখুন আমার মাথা—গোল আলু৷
—তাহলে দুজনেই অপয়া৷
—কী কারণে বসে আছেন? ক্লাস নেই?
—আছে, করব না৷
—কারণ৷
—বাৎসরিক উৎসবে নাটকটা নামাতে হবে না?
—অবশ্যই, অফকোর্স৷ কোনও হেডমাস্টারের চোদ্দোপুরুষ এই উৎসব দেখেনি, পরের চোদ্দোপুরুষও দেখবে না৷ একজন রাজ্যপাল, তিনজন বাঘা মন্ত্রী, চারজনও হতে পারে, তিনি ঝুলিয়ে রেখেছেন, কারণ যে-কোনও মুহূর্তে পদত্যাগ করতে পারেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কী একটা ইস্যুতে শরিকদলের ঘ্যাঁচাঘেঁচি চলেছে৷ দুজন উপাচার্য আসছেন, একজন গলব্লাডার অপারেশান পেছিয়ে দিয়েছেন৷ আমরা তাঁকে সংবর্ধনা দোবো৷ বড় বড় অভিনেতা, শিক্ষাগুরু, টিউটোরিয়াল গুরু, ধর্মগুরু, যোগগুরু, ক্রীড়াবিদ, মল্লবীর, তিনজন প্রোমোটার—সব আসছেন৷ আমাদের এই নাটক প্রধান আকর্ষণ৷ বিশ্বভ্রান্ত্ব, বিশ্বপ্রেম, মানব কল্যাণ—মেন থিম৷ মিডিয়া আসছে৷ পাঁচটা টিভি চ্যানেল৷ রাতে বাজি পুড়বে৷ ভেসে ভেসে যাবে আলোর মালা, চুঁইয়ে চুঁইয়ে আগুন পড়বে৷ তিন কোম্পানি পুলিশ আসছে৷ র্যাফ মজুত থাকবে৷ ছাতে সানাই পার্টি৷ একজন আর্মি অফিসার আসতে পারেন৷ আমার শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক৷ আমার শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে আমি একটা কথাই বলতে পারি—ওই বাড়ির জামাই হওয়ার আমি অযোগ্য৷
—যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে৷ এখন নাটকের কথা৷ পল্টুকে দিয়ে হবে না৷ ডায়ালগ বলতে পারছে না৷
—কী ডায়ালগ? পড়ুন, শুনি৷
—নবদ্বীপে গিয়া দেখিলাম...
—স্টপ, স্টপ৷ গিয়া—এটা কী ধরনের বাংলা? নবদ্বীপে গিয়া৷ আপনি এত বড় একজন শিক্ষক৷ ডক্টরেট করেছেন৷ কীসের ওপর যেন?
—শ্মশান৷
—আপনি লিখছেন নবদ্বীপে গিয়া? আমার ‘হরিবোল’ বলতে ইচ্ছে করছে৷
—আপনি বড্ড কথা বলেন৷ গিয়ার জায়গায় কি লিখব যাইয়া?
—যাইয়া? ছ্যাঃ, ছ্যাঃ, ক্রিয়াপদের ব্যবহারটাই জানেন না৷ কেটে লিখুন, নবদ্বীপে গমন করিয়া৷
—নবদ্বীপে গমন করিয়া দেখিলাম নবদ্বীপচন্দ্র শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ঊর্ধ্ববাহু হইয়া উন্মত্ত নৃত্য করিতেছেন, থাকিয়া থাকিয়া অরণ্যচারী পশুরাজের ন্যায় গর্জন করিতেছেন, হুঙ্কারে মেদিনী কম্পিত হইতেছে, ভাবে বিহ্বল ভক্তগণ বেড়িয়া বেড়িয়া নৃত্য করিতেছেন৷ ক্ষণে ক্ষণে সংজ্ঞাহারা হইয়া ভূতলে পতিত হইতেছেন৷ মৃদঙ্গের আস্ফালন, করধৃত খঞ্জনির উন্মাদনা, মেঘগর্জনের মতো হরিধ্বনি শুনিয়া কাজি পাকশালে প্রবেশ করিয়া বেতস পত্রের ন্যায় থিরথির করিয়া কাঁপিতেছেন৷
হেডস্যার শুনতে শুনতে চেয়ারে ছটফট করছিলেন৷ পেছনটা একটু একটু তুলছেন, আবার ফেলছেন৷ পড়া শেষ হতেই বললেন, ‘ফেলে দিন, ফেলে দিন৷ নাটক ভারবাহী পশু নয়৷ কিস্যু হয়নি, কিস্যু হয়নি৷ কেউ শুনবে না৷ পালাবে, চোঁ চোঁ করে পালাবে৷’
—আপনি জানেন? এই নাটক পড়ে নাট্যসম্রাট মেঘনাদ কী বলেছেন! কিচ্ছু বলেননি৷ বুকে জড়িয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়েছিলেন৷ আরও কিছুক্ষণ রাখতেন যদি না মোবাইলটা বেজে উঠত৷ একটা অদ্ভুত ব্যাপার—ডাক্তারবাবু ভুল করে তাঁর বুকে পেসমেকারের বদলে মোবাইল বসিয়ে দিয়েছেন৷ নিজের মোবাইলে আর-এক পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অপারেশান করছিলেন৷ খেয়াল ছিল না৷ সেইটাই ঢুকিয়ে দিয়েছেন৷ মেঘনাদবাবুর বুকে ডাক্তারবাবুর কল আসে—কে, ডাক্তারবাবু? থেকে থেকে রিংটোন৷ নানারকম মেসেজ৷ ডাক্তারবাবু থানায় মিসিং ডায়েরি করে রেখেছেন৷ এদিকে নাট্যসম্রাটের প্রতিভা ভীষণ বেড়ে গেছে ইলেকক্ট্রো ম্যাগানেটিভ ওয়েভের গুণে৷ নাট্যসম্রাট আমার এই নাটককে শতাব্দীর বিস্ময় বলেছেন৷ এই নাটক বিশ্বমঞ্চে তিনি হাজির করবেনই৷ কেউ বাঁচাতে পারবে না৷ কোনও আশা নেই৷ তিনি নিজে মহাপ্রভুর ভূমিকায় অভিনয় করবেন৷ হাইট একেবারে মাপে মাপে, সমস্যা একটাই, বেধড়ক মোটা৷ শুনলুম, একবেলা খাচ্ছেন৷ অকারণে মাইলের পর মাইল হাঁটছেন৷ যখন যেখানে শুচ্ছেন, হাত-পা ছুড়ছেন৷ কোলাঘাটে দল নিয়ে গিয়েছিলেন, হোটেলের খাট ভেঙে পড়ে গেছেন৷ তেমন লাগেনি৷ লেগেছে ক্লাইভের৷’
—ক্লাইভ এতদিন পরে কোথা থেকে এল! শুনেছি, ছোকরা তো আত্মহত্যা করেছে!
—আপনার সমস্যা অতীত, বর্তমান এক করে ফেলেন৷ যে পালা নিয়ে গিয়েছিলেন—সেই পালাটার নাম ‘জাগো বাঙালি’৷ সেখানে ক্লাইভের রোল আছে৷ সেই ক্লাইভ কোথাও জায়গা না পেয়ে খাটের তলায় শুয়েছিল৷
—এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা৷ আপনি অতিরিক্ত মিথ্যা কথা বলেন৷ যদি আপনার নাটক সত্যি সত্যি বিদেশ ভ্রমণে যায়, তাহলে আপনি এই সুপ্রাচীন স্কুলের গৌরব, ওই অনুষ্ঠানে আপনাকে আমরা সংবর্ধনা জানাব৷ আপনি প্রমাণ দাখিল করুন৷
—পল্টু যখন ডায়ালগ পারছে না, তখন কী করব?
—বাদ দিয়ে দিন৷
—নাটকের আকর্ষণ কমে যাবে৷ আমাদের পল্টু টিভির ‘রিয়ালিটি শো’-খ্যাত স্টার৷ তাকে দেখার জন্যে সবাই আসবে৷ পল্টুর ডিগবাজি দেখার জন্যে৷ এই নাটকে আমি একটা যুগান্তকারী কাজ করে বসে আছি৷ মাঝে মাঝে ভাবি আমার মাথাটা কী দিয়ে তৈরি!
—ফাটিয়ে দেখুন৷ কী কাজ করেছেন?
—এই নাটকে পল্টু এক পর্যটক৷ যে কখনও চৈনিক হিউয়েন সাং, কখনও মার্কোপোলা, কখনও অতীশ দীপঙ্কর৷ সে আবার দেবতাও হবে—ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, সে তিনটে যুগ—সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর৷ সেইরকম তার সাজ-পোশাক৷ একেবারে কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷
—ঠিক, চূড়ান্ত কেলেঙ্কারি৷ বিশিষ্ট একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মহাপ্রভুকে নিয়ে ছ্যাবলামি৷ গ্র্যান্ট বন্ধ হয়ে যাবে৷ আপনাদের মোটা মোটা টাকা মাইনেও বন্ধ৷ মহাপ্রভু কে হচ্ছেন?
—আপনি৷ এই কলিতে আপনাকে ছাড়া আর কারোকে তো মহাপ্রভু বলে ভাবা যায় না৷ হাইট, খাড়া নাক, টানা টানা চোখ, আজানুলম্বিত বাহু, উজ্জ্বল গৌরবর্ণ৷ মেকআপ দিয়ে সাদা করতে হবে না৷ কেবল একটা চোখ একটু ট্যারা৷ দূর থেকে বোঝা যাবে না৷ আর আপনার গলা? একেবারে দেবকণ্ঠ, হংসধ্বনি৷
—হংস?
—এই আমার এক রোগ৷ এক বলতে আর এক বলি৷ আপনার গলায় শঙ্খ ধ্বনি৷ বারান্দায় দাঁড়িয়ে হরি, হরি বলে যখন দারোয়ানকে ডাকেন মনে হয় হরিনাম করছেন৷
—হুঁ! এখন শুনুন, আপনার এই বিস্ময়কর নাটকটি আমরা পরের দিন নামাব৷ প্রথম দিনে অত বক্তৃতার পর খুব অল্প সময় পাওয়া যাবে৷ দ্বিতীয় দিনে আমরা নাট্যসম্রাট মেঘনাদকে প্রধান অতিথি করব৷ আপনাদের দুজনকে বিপুল সংবর্ধনা জানাব৷ চলুন, এখুনি তাঁর কাছে যাই৷
—স্যার! তাঁকে আপনি পাবেন কোথায়? কোন দেশে আছেন কে জানে! একজন আন্তর্জাতিক মানুষ৷
—একবার দেখাই যাক না৷ কপাল ভালো হলে দেখা হয়ে যেতে পারে৷ এত বড় একজন মানুষ৷ আগে থেকে না বললে কেমন করে হবে৷ কোথায় থাকেন?
—কখন যে কোথায় থাকেন বলা মুশকিল৷
—বুঝতে পেরেছি৷ আচ্ছা, এই রকম কোনও মানুষ আছেন তো?
—আমাকে সন্দেহ করছেন?
—সন্দেহ করব কেন? একটু বাজিয়ে নিচ্ছি৷ আপনার খাতাটা একবার দেখতে পারি?
—বুঝতে পারবেন না৷ এলোমেলো হয়ে আছে৷ ফাইনাল করে আপনার টেবিলে ফেলে দোব৷ তখন দেখবেন কী জিনিস হয়েছে৷
—একটা সুখবর দি, নাটক হবে না৷
—তার মানে? আমরা তা হলে কী করব?
—ভ্যারেন্ডা ভাজবেন৷ নাটক এখনও লেখা হয়নি৷ নাটকের বিষয়টা কী—কোনও আলোচনাই হল না৷ অভিনেতার তালিকা কোথায়? রিহার্সাল কবে থেকে শুরু হবে? সব অন্ধকারে৷ গান, আবহ সঙ্গীত! হবে না, হবে না, একে বুড়ো, তায় মাস্টার—উৎসাহ কোথায়? শরীরে সব নোনা ধরে গেছে৷ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে৷ গতবারের কথা মনে আছে? ঠিক সময়ে কেমন ডুবিয়ে দিলেন! আপনি বাংলার মাস্টার নন, ডোবানোর মাস্টার৷ দেখে আসছি তো গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা৷ জ্বর আর পেটখারাপ একসঙ্গে হবেই হবে৷ সেই কারণে...
—বাকিটা আমি বলি স্যার৷ আজ ঠিক তিনটের সময় নিউ হলে উপস্থিত থাকবেন৷ রিহার্সাল৷ উপস্থিত থাকবেন এই নাটকের পরিচালক মেঘনাদ মল্লিক, আর সঙ্গীত পরিচালক মণিময়, আর থাকবে বালক অপেরার সভ্যবৃন্দ৷ এই নাটকে তারা নাচিয়ে সাপ্লাই করবে৷
—মেঘনাদ কে? এই তো বললেন, তাঁর দেখা পাওয়া যায় না৷
—যায়, যায়, আকাশে মেঘ না জমলে নাদ শোনা যায় কি? তিনি আজ আসবেন৷ আর এই দেখুন আর একটা খাতা৷ হাঃ হাঃ, ছোট্ট খাতা৷ এইতে আপনার পার্ট লেখা আছে৷ বসে বসে মুখস্থ করুন৷ সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ আসছেন হাতে বেত নিয়ে৷ বেত আর বাত—এই দুটোই তো চালাচ্ছে৷ বাত হাঁটু থেকে মুখে উঠে এসেছে৷ ঠিক তিনটে৷ ডায়ালগ মুখস্থ করুন৷ এর ওপর নির্ভর করছে আপনার আমেরিকা যাওয়া৷
—আমেরিকা?
—আজ্ঞে৷ মহাপ্রভুর ভূমিকায় যদি অকাতরে নিজের প্রতিভা দেখাতে পারেন, তাহলেই বোঁওও—নিউইয়র্ক৷
—অ্যাঁ, বলেন কী?
—হ্যাঁ, এখন টেবিলের বাইরে এসে এই জায়গাটায় দাঁড়ান৷ দুটো হাত এমনি করে আকাশের দিকে তুলে গোল হয়ে ঘুরুন আর বলতে থাকুন—হরি বোল, হরি বোল৷ আমি এখন চলি৷ চল রে, চল রে, চল—নওজোয়ান৷
—দেখুন, আপনাকে আন্ডার এস্টিমেন্ট করেছিলুম৷
—আজ্ঞে, ওই বিশ্রী স্বভাবটা হরিনাম করলে কেটে যাবে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন