জ্ঞানী

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ওই যে মোড়ের মাথায় তিরিশ নম্বর বাড়িটা, ওই বাড়ির সবাই রাগী, বাড়ির বাইরে একটা মার্বেল পাথরের ফলক আছে৷ সেই ফলকে কে কবে লিখিয়েছিল ‘শান্তিধাম’৷ পাড়ার লোকেরা এখন বলাবলি করে যদি শান্তিধাম হয় তাহলে অশান্তিধাম কাকে বলে? পাড়ার কিছু-কিছু বদমাইশ ছেলে মাঝে মধ্যে শান্তিধামের আগে ছোট্ট করে একটা অ লিখে দিয়ে আসে খড়ি দিয়ে৷ মার্বেল পাথরটা ময়লা-ময়লা হয়ে এসেছে, তাই খড়ির লেখা ‘অ’ বেশ ভালোই বোঝা যায়৷ এই নিয়েও নিত্য অশান্তি৷ গেট খুলে প্রকাশবাবু মাঝেমধ্যেই প্রকাশিত হন৷ প্রথমেই দেখে নেন মার্বেল পাথরের ফলকটা৷ যেই দেখেন একটা অ লেখা আছে অমনি সামনের বাড়ির দোতলার খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমি সব ব্যাটাকে দেখে নোব৷ বাইরের দেওয়ালে আলকাতরা দিয়ে নিজের হাতে যা মনে আসবে তাই লিখে দেবো৷ এটা ভদ্রলোকের পাড়া না ছোটলোকের পাড়া? অনেক সহ্য করেছি, আর সহ্য করব না, এইবার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে৷’

প্রকাশবাবু যখন খুব হম্বিতম্বি করছেন সেই সময় বেরিয়ে আসলেন তাঁর স্ত্রী, সামনের বাড়ির সঙ্গে তাঁর একটু বেশি খাতির৷ ওই বাড়িতে রঙিন টিভি দেখতে যান, তালের বড়া খেতে যান, বেনারস থেকে পাকা পেয়ারা এলে দু-চারটে ভাগ পান৷ সবচেয়ে বড় কথা খুচখাচ টাকাপয়সার প্রয়োজন হলে ওই বাড়ির বউ মিলনমালা চুপি-চুপি ধার দেন, দেওয়ার সময় ফিস-ফিস করে বলেন, দেখবেন ও যেন না জানতে পারে৷ এই ও-টি হলেন বিনয়বাবু, ওই বাড়ির মালিক শান্তশিষ্ট, ভারি ভদ্র, কখনও জোরে কথা বলেন না, কিন্তু সুযোগ পেলেই মানুষকে চটিয়ে আনন্দ পান, যে যাতে রেগে যায় সেই কাজটি করে চুপ করে বসে-বসে মজা দেখেন৷

প্রকাশবাবুর স্ত্রী গেটের কাছে এসে স্বামীর চেয়েও জোরে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘তুমি কি ওই বাড়ির কাউকে লিখতে দেখেছ যে সাতসকালেই ভদ্রলোকের বাড়ির দিকে তাকিয়ে ষাঁড়ের মতো চেল্লাতে শুরু করেছ৷ আগে দেখবে তারপর বলবে৷’

প্রকাশবাবু বললেন, ‘না আমি আগে বলব তারপর দেখব৷ এর আর দেখাদেখির কী আছে? ওই বাড়ির খোকাটিকে আমি চিনি, বুড়ো খোকা৷ ও-ই এসে রোজ একবার করে ‘অ’ লিখবে আর আমি রোজ একবার করে সেই ‘অ’ মুছে দেব৷ আমার এই ফলকটা কি শ্লেট, আর উনি কি এখনও পাঠশালার ছাত্র? আমি এইবার ভোটের লোক ধরে এনে পয়সা খরচ করে ওদের বাড়ির গোটা দেওয়ালে বর্ণপরিচয় লিখিয়ে দেবো আলকাতরা দিয়ে৷ দেখি কেমন মুছতে পারে!’

গেটের সামনে ছোটখাটো ভিড় জমে গেল৷ কেউ হয়তো প্রশ্ন করলে, ‘কী হয়েছে প্রকাশবাবু?’ সঙ্গে-সঙ্গে যেন আগুনে ঘি পড়ল, প্রকাশবাবু তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘তাতে তোমার কী? আমার যা হয়েছে আমারই হয়েছে, তোমাকে তা বলতে যাব কেন? হু আর ইউ?’ প্রশ্নকারী প্রকাশবাবুকে চেনেন তাই রাগাবার জন্য ভালোমানুষের মতো বললে, ‘না ভীষণ উত্তেজিত হয়েছেন তো, আজকাল আবার উত্তেজিত হলে হার্ট হেঁচকি তুলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাই জিগ্যেস করছিলুম আমরা কোনও সাহায্য করতে পারি কি না!’

প্রকাশবাবু আরও রেগে গিয়ে বললেন, ‘ক্লিয়ার আউট, অয়েল ইউর ওন মেশিন৷’

প্রশ্নকারী বললে, ‘অয়েলটা দিন৷’

দোতলার জানালায় বিনয়বাবুর মুখ দেখা গেল৷ তিনি শুধু প্রশ্ন করলেন, ‘কী হল প্রকাশবাবু? আবার অ লিখে গেছে?’

প্রকাশবাবু জানালার দিকে তাকালেন, দাঁত কিড়মিড় করলেন, বুকের ছাতি ফোলালেন কমালেন কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরল না৷ ভীষণ রেগে গেলে প্রকাশবাবুর আর মুখ চলে না তখন হাত আর পা চলতে থাকে৷ পকেট থেকে রুমাল বের করে অ-টা মুছে ফেলে রাগের চোটে রুমালটা দূর করে রাস্তার নর্দমায় ফেলে দিলেন৷ সঙ্গে-সঙ্গে প্রকাশবাবুর স্ত্রী বললেন, ‘এটা কী হল? সাড়ে সাত টাকা দামের রুমালটা৷ যাও তোলো৷’ তখন প্রকাশবাবু করুণমুখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন৷ রুমালটা পদ্মফুলের মতো নোংরা জলে ভাসছে৷ যাঁরা জড়ো হয়েছিলেন তাঁরা সমস্বরে বললেন, ‘তুলুন, তুলুন৷’ বিনয়বাবু দোতলার জানালা থেকে বললেন, ‘স্ত্রী বাক্য অমান্য করবেন না, তুলে ফেলুন৷ ওই জামাকাপড়ে আর তুলবেন না, ভেতরে গিয়ে একটা গামছা পরে আসুন৷’ প্রকাশবাবুর স্ত্রী অমনি বললেন, ‘আপনারা বলার কে? রুমাল তুলবে কি তুলবে না সে হল গিয়ে আমাদের ব্যাপার৷’ স্বামীকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন৷ সেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজনে বলতে লাগলেন,

‘ফেললে কেন?’

‘বেশ করেছি৷’

‘কেন করেছ?’

‘আমার রুমাল৷’

‘আমি কিনেছি৷’

‘পয়সা আমার৷’

‘ফেলবে কেন?’

‘বেশ করব৷’

এই যখন চলেছে তখন বাড়ির কাজের মেয়েটি এসে বলবে, ‘সাড়ে আটটা বেজে গেল, আজ কি অফিস-টফিস নেই?’ তখন দুজনের চটকা ভাঙবে৷ প্রকাশবাবুর অফিসের বড়বাবু আবার প্রকাশবাবুর চেয়েও রাগী, প্রকাশবাবুকে এর আগে তিন-তিনবার পেপার ওয়েট ছুঁড়ে মেরেছেন, ‘কোনওবারই ঠিকমতো লাগাতে পারেননি৷ প্রত্যেকবারই টার্গেট মিস করার পর বলেন, ‘নেক্সট টাইম আপনার মৃত্যু আমার হাতে৷’

অফিস শব্দটা যেন মন্ত্রের মতো কাজ করল৷ জোঁকের মুখে নুনের ছিটের মতো৷ প্রকাশবাবু বাড়ির উঠানে গোল হয়ে ঘুরতে লাগলেন৷ তিনটে তিন ধরনের কাজের টানে৷ বাজার, দাড়ি কামানো, স্নান৷ কাজ তিনটে পরপর যে অর্ডারে করতে হবে, সেই ভাবেই মনে এসেছে৷ সামনে যে থলেটা পেলেন, সেইটা হাতে নিয়ে পায়ের কাছে যে চটি জুটল, সেই জোড়াটা গলিয়ে বাজারের দিকে ছুটতে গিয়েও থেমে পড়লেন৷ খেয়াল হল, কই আজ তো কেউ চা দিলে না, সকালের চা! চা ছাড়া মানুষের দেহ-ইঞ্জিন চলে!

আবার ভীষণ রেগে গেলেন৷ রাস্তা থেকে ফিরে এলেন, ‘চায়ের পাট উঠে গেছে? সকালের চা?’

স্ত্রী বললেন, ‘কেন তোমাকে চা দেয়নি? আমরা তো সবাই চা খেয়েছি৷’

‘তা তো খাবেই৷ তোমরা খেলেই আমার খাওয়া হয়ে গেল৷ যেমন আমি আজ ফিশফ্রাই খাব বিকেলে, তোমাদের খাওয়া হয়ে যাবে! আমি জানতে চাই এই সংসারের চাকায় কে তেল দিচ্ছে?’

স্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘আমি জানতে চাই কে শ্রম দিচ্ছে?’

তেল না শ্রম৷ তেল না চাকা৷ কীসের জোরে গাড়ি চলে এই নিয়ে প্রায় পনেরো মিনিটের একটা ফাইট হয়ে গেল৷ মেয়ে এসে বললে, ‘বাবা, তুমি তো চা খেয়েছ!’

‘সেটা আজ নয় কাল৷ তোদের দিন কি আজকাল আটচল্লিশ ঘণ্টায় হচ্ছে?’

‘ওই দেখো, তোমার খালি কাপ৷ টেবিলের ওপর৷’

‘ওটা কালকের৷’

স্ত্রী বললেন, ‘আজকের৷’

‘ওটা কালকের৷’

‘আজকের৷’

‘আই সে কালকের৷’ রাগে প্রকাশবাবুর দাঁত কিড়মিড় করছে৷

স্ত্রী বললেন, ‘আমরা মিথ্যেবাদী? আর তুমি একাই সত্যবাদী?’

একটা কিছু শুরু হলেই হল৷ চলছে তো চলছেই৷ তারপর যদি কেউ পাশ থেকে খোঁচা মেরে দিলে তো হয়েই গেল৷ বিনয়বাবু তখনও জানালার ধারে বসেছিলেন, খবরের কাগজ কোলে নিয়ে৷ তাঁর তো খুব শান্তির সংসার, সেই জন্যে তাঁর হাতে অনেক সময়৷ ভোর-ভোর উঠে বেড়ানো আর বাজার একইসঙ্গে সেরে ফেলেন৷ তারপর ছাদে সাজানো এক সার ফুলগাছের টবে ঝারি করে ফিসফিসে জল দেন৷ আধঘণ্টা যোগাসন করেন৷ দশ মিনিট বিশ্রাম৷ তারপর সুন্দর একটা কাপে চা আর বিস্কুট৷ তারপর কাগজ৷ বিনয়বাবু ওপর থেকে বললেন, ‘তর্কাতর্কির কী দরকার, পোস্টমর্টেম করলেই তো হয়৷ পেটে চা আছে কি না ধরা পড়ে যাবে৷’

পোস্টমর্টেম শব্দটা খুব পরিচিত৷ প্রকাশবাবু রাস্তায় নেমে ওপর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি এখন জলজ্যান্ত বেঁচে আছি মশাই৷ অপঘাতে মরিনি৷ পোস্টমর্টেমের প্রশ্নই আসে না৷ বোকার মতো কথা বলবেন না৷’

বিনয়বাবু বললেন, ‘আসুন ওপরে চলে আসুন৷ ফার্স্টক্লাস এক কাপ চা খেয়ে বাজারে যাবেন৷’

‘কোনও প্রয়োজন নেই৷ চা এমন কিছু ভালো জিনিস নয়৷ আমার চা খাওয়া না খাওয়ার সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?’

প্রকাশবাবু হনহন করে হাঁটতে লাগলেন৷ রেগে গেলে তাঁর এনার্জি বেড়ে যায়৷ পায়ের কাছে একটা পথের কুকুর চলে এসেছিল৷ মারলেন এক সুট৷ ভাগ্য ভালো নিরীহ কুকুর৷ ঘ্যাঁক করে কামড়াল না৷ ঘেউ করে একটা শব্দ করে দূরে সরে গেল৷ প্রবীণ এক মানুষ পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ বললেন, ‘কামড়ে দিলে কী হতো?’

প্রকাশবাবু বললেন, ‘দ্যাটস নট ইওর লুকআউট৷’

ভদ্রলোক থমকে দাঁড়ালেন৷ প্রকাশবাবু এতক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন৷ মুখ তুলে ভদ্রলোককে দেখে ঘাবড়ে গেলেন৷ স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষ৷ কাল এই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে হাতেপায়ে ধরেছিলেন, ছেলের ভরতির ব্যাপারে৷ তিন নম্বর কম আছে৷ ভদ্রলোক কথা দিয়েছিলেন, আপনার পিতা এই কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, আমি নিশ্চয় দেখব৷ মনে করুন হয়েই গেছে৷ প্রকাশ ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন৷ ভাবছেন ক্ষমা চাইবেন কি না! ভদ্রলোক তেমন গ্রাহ্যই করলেন না৷ শুধু বললেন, ‘আপনি খুব অসভ্য আর টেঁটিয়া লোক তো!’ বলে চলে গেলেন৷ অন্য কেউ হলে প্রকাশ ঝাড়া আধঘণ্টা ঝগড়া করতেন৷ ভদ্রলোকের মন্তব্য দাঁতে দাঁত চেপে হজম করলেন৷ এই তাঁর প্রথম পরাজয়৷ আর এই পরাজয় তাঁর ছেলের জন্যে৷ গবেটটা তিনটে নম্বর বেশি পেলে, ওই ভদ্রলোককে তিনি সহজে ছেড়ে দিতেন! রাস্তা সরকারি৷ কুকুর বেওয়ারিশ৷ আর পা তাঁর নিজের৷ হু আর ইউ৷

কোনও রকমে বাজার সেরে বাড়ি ফিরে এলেন৷ ঢুকেই শুনলেন, মায়ে ছেলেতে ধুম ঝগড়া৷ প্রকাশবাবু কোনও কথা না বলে ধমাধম ছেলেকে পেটাতে শুরু করলেন৷ আর বলতে লাগলেন, ‘কেবল ঝগড়া, কেবল ঝগড়া৷ দিনরাত শুধু ঝগড়া৷ বাড়িতে কাকপক্ষী বসার উপায় নেই৷ বাড়িটাকে একেবারে ছোটলোকের বাড়ি করে তুললে গো৷’

প্রকাশবাবুর ছেলে মার খেতে-খেতে বলতে লাগল, ‘আমি তো তোমার ফরেই ঝগড়া করছি৷ মা তোমাকে মিথ্যেবাদী বলেছিল৷ আমি তাই সেই থেকে প্রটেস্ট করে যাচ্ছি৷’

‘মিথ্যেবাদীকে মিথ্যেবাদী বলবে না তো কি সত্যবাদী বলবে?’

সবাই অবাক! এ যেন ভূতের মুখে রামনাম৷ মেয়ে এসে বাবাকে পিছন থেকে জাপটে ধরল৷ হাই প্রেশারের রোগী৷ মুখচোখ লাল হয়ে উঠেছে৷ প্রকাশবাবুর স্ত্রী মাথায় জল থাবড়াতে লাগলেন৷ পাখার স্পিড বাড়িয়ে দেওয়া হল৷ মেয়ে ভাবতে লাগল, বাবাকে এখন কী দেওয়া উচিত, চা না শরবত! ছেলেকে প্রথম চড়টা মারার সময় ডানহাতের প্রথম আঙুলটা মট করে মটকে গেছে৷ সেই আঙুলটা দেখতে-দেখতে ফুলে উঠল৷ প্রকাশের স্ত্রী ছুটলেন বিনয়বাবুর বাড়িতে বরফ আনতে৷ বরফের সঙ্গে ছুটে এলেন বিনয়বাবু৷ নিজেই তাঁর আঙুলে বরফ দিতে বসলেন৷ বিনয়বাবুর স্ত্রী এলেন আর্নিকা মলম নিয়ে৷ ছেলের চোখে আঙুলের খোঁচা লেগে গেছে৷ ছেলের মা তার চোখে শাড়ির আঁচলে মুখের গরম ধরে ভাপ দিচ্ছেন৷

বিনয়বাবু বললেন, ‘কেন এত অশান্তি করেন অকারণে?’

প্রকাশবাবু বললেন, ‘আমরা একেবারে ছোটলোক ইতর হয়ে গেছি৷ পালের গোদা হলুম আমি৷ আমি শুরু করি এরা শেষ করে৷ আমি কত বড় বংশের ছেলে একবার ভাবুন৷ আবার বাবা ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক৷’ কথা বলতে-বলতে প্রকাশবাবু ফোঁস-ফোঁস করে কেঁদে ফেললেন৷ কান্না জড়ানো গলায় বলতে লাগলেন, ‘সেই বংশের ছেলে হয়ে আমি কীভাবে নষ্ট করছি নিজেকে! আপনারাই দেখুন৷’

বিনয়বাবু বড় নরম মানুষ৷ কান্নাকাটি দেখলে তাঁর ভীষণ কষ্ট হয়৷ বিনয়বাবুর বাড়িতে কেউ কখনও মুখ ভার করে না৷ কাঁদে না৷ সব সময় একটা-না-একটা হাসির ঘটনা ঘটছেই ঘটছে৷ তাঁর স্ত্রীর নাম হাসি৷ মেয়ের নাম শুভ্রা৷ ছেলের নাম হর্ষ৷

বিনয়বাবু বললেন, ‘আপনার সব ভালো, কেবল একটাই খারাপ, কথায়-কথায় ভীষণ রেগে যান৷ কারণটা কী? সেই কারণটা দূর করতে পারলেই, আপনি সর্বাঙ্গসুন্দর৷ কারণটা ভাবুন তো৷’

প্রকাশবাবু সংযত হলেন৷ ভেবে বললেন, ‘প্রথম কারণ, এ বাড়ির কেউই আমার মনের মতো নয়৷ আমি যা চাই ঠিক তার উলটো৷ আমার ছেলে আর একটু চেপে পড়লে, আর একটু ভালো রেজাল্ট হতো৷ ভালো কলেজে ভরতি হতে পারত৷ আমার স্ত্রী কথায় চেয়ে কাজের দিকে মন দিলে এই বাড়ির ছিরি ফিরে যেত৷ আমার মেয়ে দেখতে সুন্দরী, মনটা সুন্দর হলে, সর্বাঙ্গসুন্দরী হতো৷ এইবার আমি? আমার অনেক আশা ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল কোনওটাই পূর্ণ হয়নি৷ আমার প্রোমোশন হয় না৷ আমার আয় বাড়ে না, আমার খরচ বেড়ে যাচ্ছে৷ আমার টাক পড়ছে, আমার চোখের জ্যোতি কমছে৷ আমার দাঁতের জোর কমছে৷ কেউ আমাকে কিছু দেয় না৷ শুধু চায়, সরকার ট্যাক্স চায়৷ আমি যে আর পারছি না বিনয়বাবু৷’

বিনয়বাবু বললেন, ‘আরে, আশ্চর্য! আমারও তো সেই একই ইতিহাস৷ একেবারে অবিকল আপনার মতো৷’

প্রকাশবাবু বললেন, ‘কই আপনি তো আমার মতো রেগে যান না৷’

‘তার একটাই কারণ৷ একবার আমাকে এক সাধু বলেছিলেন, দেখ বিনয়, আমরা যেমন ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে ছোট-ছোট স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্ন হল স্বপ্নের ভেতরে স্বপ্ন৷ জীবন হল দীর্ঘ এক স্বপ্ন৷ ধরো ষাট কি সত্তর বছর ধরে টানা একটা স্বপ্ন দেখে চলেছ৷ এর কোনওটাই সত্য নয়৷ সত্য যেদিন জেগে উঠবে সেইদিন তুমি জানতে পারবে, জীবনও নেই, মৃত্যুও নেই৷ দেহও নেই, নামও নেই৷’

‘আপনি এই আজগুবি, ছেলেমানুষি কথা বিশ্বাস করে সারা জীবন হ্যা-হ্যা করে হেসে যাবেন?’

‘আরে মশাই, ওই বিশ্বাসে আমি যদি ভালো থাকি, সুখে থাকি, শান্তিতে থাকি, পরমানন্দে থাকি, তাহলে ক্ষতিটা কী? ডাক্তারবাবু যখন বলেন, মশাই, রাসটাকস সিক্স তিন পুরিয়া খেয়ে দেখুন, কোমরের ব্যথা নিমেষে সেরে যাবে৷ তখন আমরা বিশ্বাস করি৷ বিশ্বাস করে খাই৷ দেহ-রোগের যেমন ওষুধ আছে, ভব-রোগের সেইরকম ওষুধ আছে৷ সেই ওষুধ হল, জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া৷ জীবনটাকে খেলা ভাবা, স্বপ্ন ভাবা৷ স্পোর্টসম্যানস্পিরিট৷’ বিনয়বাবু হেঁকে বললেন, ‘চা বোলাও৷ খেলার শেষে চা৷’

একটা পথের কুকুর প্রকাশবাবুদের শান্তিনিবাসে শান্তি এনে দিল৷ এই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আর কোনওদিন ঝগড়া হয়নি৷ কারোকে আর খড়ি দিয়ে শান্তির আগে ‘অ’ লিখতে হয়নি৷ প্রশান্তবাবু সেই কুকুরটিকে আদর করে বাড়িতে ডেকে এনে আশ্রয় দিয়েছিলেন৷ তাকে স্নান করিয়ে, সাবান মাখিয়ে, খাইয়ে দাইয়ে একেবারে চেহারা ফিরিয়ে দিয়েছেন৷ কুকুরের নাম রেখেছেন, জ্ঞানী৷ শান্তিনিবাসের গেটের সামনে জ্ঞানী এখন গম্ভীর মুখে বসে থাকে৷ সাদা আর বাদামি রং মেশানো তেল চুকচুকে একটি কুকুর৷ বাতাসে তার লোম ফুরফুরে হয়ে উড়ছে৷ শান্ত গম্ভীর এক কুকুর৷ শান্তিনিবাসের শান্তির প্রহরী৷ প্রকাশবাবু মনে-মনে বলেন, এই কুকুরই আমার গুরু৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%