দাদুর বাগান

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবী ঈশ্বরের সৃষ্টি আর উদ্যান হল মানবের সৃষ্টি৷’

‘কোন নেতা আবার এই জ্ঞানটি দিলেন?’

‘দাদুর মুখ খবরের কাগজের আড়ালে৷ পায়ের ওপর পা৷ এক পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি৷ মৃদু-মৃদু নাচছে৷’ উলটো দিকের সোফায় বসে আছেন মেজদাদু৷ থাকেন দেরাদুনে৷ অনেকদিন পরে কাল এসেছেন৷ ইচ্ছে, রিটায়ার করার সময় হয়েছে, দেরাদুনের পাট তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে আসবেন৷ মেজদাদুর স্বভাবই হল মানুষকে উশকে দিয়ে মজা করা৷ মা দুজনের সামনে দু-কাপ চা রেখে গেছেন৷ মেজদাদু দু-চার চুমুক চা চালিয়েছেন৷ বড়দাদু কাগজ থেকে মুখ তোলার অবসর পাচ্ছেন না৷ মাথা ডান থেকে বাঁ, বাঁ থেকে ডানে টানা পাখার মতো ঘুরেই চলেছে৷

বড়দাদু কাগজের আড়াল থেকে বললেন, ‘এ সব কথা নেতাদের বলার ক্ষমতা নেই৷ তাঁরা বলবেন, চলছে চলবে৷ এ হল আমার কথা৷’

‘হঠাৎ তোমার এইরকম একটা জ্ঞানোদয় হয় কেন?’

‘পৃথিবী একটা পাঠশালা৷ চোখ-কান খোলা রাখলে প্রতি মুহূর্তে মানুষ কিছু-না-কিছু শিখতে পারে৷ আর তোর মতো চোখ বুজে থাকলে পৃথিবী ঘুরেই যাবে, তুমি যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকবে৷’

‘তুমি বোধহয় আমার প্রশ্নটা বুঝতে পারলে না দাদা! কাগজ পড়তে-পড়তে, পৃথিবী, ঈশ্বর, উদ্যান তিনটে একসঙ্গে এসে গেল কীভাবে? দ্যাখো, কৌতূহল না থাকলে মানুষের জ্ঞানলাভ হয় না৷ শিশুদের কৌতূহল বেশি বলে তারা ঝটপট অনেক কিছু শিখে নিতে পারে৷’

‘তুমি যদি নিজেকে শিশু মনে করে থাকো, তা হলে আমার অবশ্য কিছুই বলার থাকে না৷’

‘আমি শিশু কি না নিজেই দ্যাখো৷ এই দ্যাখো, আমার একটাও দাঁত নেই৷’

মেজদাদুর দু-পাটি বাঁধানো দাঁত শোওয়ার ঘরে এক গেলাস জলে এখনও ভিজছে৷

বড়দাদু বললেন, ‘কাগজে আর একটা বিজ্ঞাপন রয়েছে, কলকাতার উপকণ্ঠে বাগানসহ বাড়ি বিক্রয়৷ তুই তো বলছিস দেরাদুনের পাট তুলে দিবি৷ এই বাগানবাড়িটা কিনে নিলে কেমন হয়?’

‘উঃ, ফাটাফাটি হয়ে যায়৷ ইউ আর গ্রেট দাদা৷ অ্যালফ্রেড দ্য গ্রেটের মতো, তুমি আমার দাদা দ্য গ্রেট৷ কাগজটা একবার দাও না৷’

‘উত্তেজিত হোসনি৷ সাফল্যের মূলে থাকে ধৈর্য৷’

মেজদাদু সোফায় এলিয়ে পড়ে চায়ে চুমুক দিতে-দিতে বললেন, ‘তোমার চা তো জুড়িয়ে জল হয়ে গেল৷’

‘যাক৷ চা আমি ঠান্ডা করেই খাই৷ গরম চা খেয়ে গায়ের রং কালো হয়ে যায়৷’

‘আরে, আমি তো চিরকাল গরমই খাই৷ তুমি তো আগে বলোনি৷ তাই আমার গায়ের রংটা কেমন যেন মাজা-মাজা হয়ে গেছে৷’

‘হ্যাঁ, এই নে তোর কাগজ৷’

বড়দাদু কাগজটা মেঝেতে ফেলে দিলেন৷ মেজদাদু কাগজটা তুলে নিয়ে কপালে ঠেকালেন৷ কাগজও তো মা সরস্বতী৷ দেশবিদেশের কত খবর থাকে! আমাকে বললেন, ‘চশমাটা শোওয়ার ঘর থেকে নিয়ে এসো তো৷ আমার দুটো চশমা, যেটার মাথা কাটা সেটাকে বলে রিডিং গ্লাস, তুমি সেইটা আনবে৷’

বড়দাদু বললেন, ‘হাফ চশমাটা৷’

শোওয়ার ঘরের আলনায় গোটা কুড়ি বিভিন্ন ধরনের ছড়ি ঝুলছে৷ মুসৌরির পাহাড় থেকে মেজদাদু কিনে এনেছেন৷ বৃদ্ধদের উপহার দেবেন৷ বড়দাদুকে একটা দিতে চেয়েছিলেন৷ তিনি বলেছেন, ‘আমি এখনও বৃদ্ধ হইনি৷ এখনও আমি যুবক৷’

চশমা চোখে দিয়ে মেজদাদু বিজ্ঞাপনটা জোরে-জোরে পড়লেন৷

‘দাদা, একটা ফোন নম্বর রয়েছে৷ একবার ফোন করে দেখলে হয় না? শুভস্য শীঘ্রং, অশুভস্য কালহরণম৷’

‘উঁহুঁ, ধৈর্য৷ চা শেষ করে আমি আবার একবার বিজ্ঞাপনটা পড়ব৷ দুবার পড়ব, তিনবার পড়ব৷’

‘কেন? এটা কি তোমার পরীক্ষার পড়া? অতবার পড়ার মানে?’

‘সে তুই বুঝবি নারে মানু! দিনকাল বড় খারাপ পড়েছে রে! ম্যাপ দেখে জায়গাটা চিনতে হবে৷’

‘কী যে বলো তুমি! সারা জীবন তিলকে তাল করে এলে৷ এ কি তোমার কুমেরু অভিযান না কি যে, ম্যাপ দেখে জায়গা চিনতে হবে! চবিবশ পরগনার আবার ম্যাপ কীসের!’

‘সে তুমি বুঝবে না ছোকরা! থাকো বিদেশে৷ যুগ কীরকম পালটেছে সে খবর রাখো?’

‘খুব রাখি৷’

‘অশ্বডিম্ব রাখো৷ সারা জীবন তো জঙ্গলে ঘুরে কাটালে৷ বাঘ, ভাল্লুক, বন্দুক, পাইনগাছ, এই তো তোমার জগৎ৷’

‘কেন, কেন? সতীদাহ বন্ধ হয়ে গেছে, এ খবর আমি রাখি৷ জাতিভেদ প্রথা উঠে গেছে, এ খবরও রাখি৷ ধুতি পাঞ্জাবি পরা উঠে গেছে, সে-খবরও রাখি৷ দেশে দু-রকমের ইস্কুল আছে, ইংলিশ আর বেঙ্গলি মিডিয়াম৷’

‘ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে সে খবর রাখো?’

‘তুমি কি আমাকে সত্যিই সদ্যোজাত শিশু ভাবলে? সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট, এ রেড লেটার ডে৷’

‘স্বাধীনতার মানে জানো?’

‘অফকোর্স, স্বাধীনতার মানে ফ্রিডম৷’

‘কীসের ফ্রিডম?’

‘কেন, শাসনের স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, কাজ করার স্বাধীনতা৷’

‘অকাজ করার স্বাধীনতার কথা শুনেছ?’

‘না৷’

‘দুষ্কর্ম করার স্বাধীনতার কথা শুনেছ?’

‘সে আবার কী?’

‘ওই তো মানুচন্দ্র, আকাশ থেকে পড়লে মানিক! এ-দেশে যে-কেউ যা-খুশি করতে পারে! চারটে লোক চেপে ধরে তোমার মাথাটা কামিয়ে দিয়ে যেতে পারে৷’

‘যাঃ, তা কখনও হয়?’

‘হয় মানিক৷ ইট মেরে তোমার জানলার সব কাচ ভেঙে দিয়ে যেতে পারে৷ তোমার বাগানের সব গাছ উপড়ে নিয়ে যেতে পারে৷’

‘রাইফেল চালাব, ডালকুত্তা লেলিয়ে দোব৷’

‘খুনের দায়ে পড়বে৷ শেষ জীবনটা জেলে কাটবে৷ তোমার বাগানে বাস্তু-ঘুঘু চরবে৷’

‘সে কী?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ দিনকাল পালটে গেছে ভাই৷ সেই শান্তশিষ্ট বাঙালির যুগ আর নেই৷ সবসময় কাড়ানাকাড়া আর দামামা বাজছে মানুষের রক্তে৷ সাধে ভদ্রলোক বাড়ি আর বাগান বেচতে চাইছেন?’

‘তুমি যখন জানোই, তখন আমাকে শুধু-শুধু নাচিয়ে দিলে কেন? আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়৷’

‘হতাশ হয়ো না৷ আমাকে একটু তলিয়ে দেখতে দাও৷ ধ্যানে সব ধরা পড়বে৷’

‘সে আবার কী?’

‘সে তুমি বুঝবে না৷’

‘তার মানে তুমি ভূত নামাবে?’

‘ভূত ছাড়তেও পারি৷’

‘তার মানে, তোমার কিছু পোষা ভূত আছে?’

‘ধরো, সেই রকমই৷’

‘তার মানে, তুমি মহাদেব?’

‘পাঁচজনে তো সেই রকমই বলে৷’ বড়দাদু বললেন, ‘ভূতো, টেলিফোন ডাইরেকটারিটা নিয়ে আয়৷’

আমার এক-এক দিন, এক এক নাম৷ কাল ছিল গজা, আজ হয়েছে ভূতো৷ কৃষ্ণের শতনামের মতো, আমার সহস্র নাম৷

দাদু বলেন, ‘তুই আমার নামাবলী৷ মাঝে-মাঝে আসল নামটাই ভুল হয়ে যায়৷’ দাদু জিগ্যেস করেন, ‘তোর আসল নামটা কী ছিল রে গবা?’ আমাকে তখন মায়ের কাছে ছুটতে হয়৷ স্কুলে, মাঝেমধ্যে এই নাম ভুলে যাওয়ার জন্যে পিটুনি খেতে হয়৷ সকাল থেকে যার নাম চলেছে অ্যাটলাস কি হটেনটট, সে বারোটার সময় অঙ্কের মাস্টারমশায়ের পিন্টু ডাকে সাড়া দিতে দু-চার মিনিট দেরি করলে কিছু বলার আছে? হয়তো আছে, তা না হলে ডাস্টার-পেটা খেতে হবে কেন?’

দাদু ফোনে অবনীকে ডাকলেন৷ ‘শোনা হে অবনী৷’

অবনীর ঘাড়ে একগাদা কাজ চাপল৷ গোয়েন্দাগিরি করতে হবে৷ যেমন, জায়গাটা কোন দলের এলাকা? আশেপাশে কী আছে? কলকারখানা আছে? বস্তি আছে? চায়ের দোকান আছে? ক্লাব আছে? নর্দমা কত দূর দিয়ে গেছে? পাকা, না কাঁচা? বড় রাস্তা কতদূরে৷ এলাকায় ছোট ছেলের সংখ্যা বেশি, না যুবকের সংখ্যা, না বৃদ্ধের? স্কুল কত দূরে!

দাদু এক-একটা ফিরিস্তি বের করছেন, আর মেজদাদু তারিফ করে উঠেছেন, ‘বাহবা, বাহবা!’

পাক্কা আধঘণ্টা লাগল টেলিফোন শেষ করতে৷

মেজদাদু বললেন, ‘কবে নাগাদ তোমার খবর আসবে?’

‘কালই এসে যাবে৷ অবনী কাজ ফেলে রাখার ছেলে নয়৷ তার নীতি হল, কাজ সেরে বসি, শত্তুর মেরে হাসি৷’

দাদু বললেন, ‘যাও টমেটম, ডাইরেকটারিটা যথাস্থানে রেখে এসো, তোমার ফাদার আবার এখুনি চেঁচাতে শুরু করবে৷ বড় মেথডিক্যাল মানুষ৷ আর হবে না কেন? মেথডিক্যাল না হলে জীবনে অত উন্নতি হয়? এই যেমন আমার কাজের ধারা দ্যাখো! সব আটঘাট বেঁধে ধীরে-ধীরে এগোই৷ তোর মতো অমন হালুম করে লাফিয়ে পড়ি না৷ সবসময় মনে রাখতে হবে, আমরা বাঘ নই, মানুষ৷’

‘তোমার কি মনে হয়, হালুম করে লাফিয়ে পড়ে বলে বাঘের কোনও ক্ষতি হয়? বাঘ কত বড় প্রাণী জানো? তুমি সামনাসামনি বাঘ দেখেছ?’

‘বাঘ দেখিনি? কী বলিস রে? ওই ব্যাটাকে নিয়ে প্রত্যেক বছর শীতকাল আমরা চিড়িয়াখানায় যাই৷’

‘হ্যাঁঃ, চিড়িয়াখানার বাঘ আবার বাঘ! ও তো এক-একটা শেয়াল৷ বাঘ দেখেছি আমি! কুমায়ুনের মানুষখেকো৷ যেমন তার রং, তেমন ব্যবহার৷ আহা!’

‘খুব ভদ্র, অমায়িক ব্যবহার?’

‘আরে, না-না। ভদ্র-অভদ্রের কথা আসছে কী করে? বাঘ কী ভদ্রলোক! বাঘের ব্যবহার বাঘের মতো৷ এক-একটা লাফ কী! এই এ পাড়া থেকে ও পাড়া৷ হালুম করে মারলে লাফ, মাথার ওপর দিয়ে কোথায় যে চলে গেল!’

‘মানে, ওভারবাউন্ডারি! ফিল্ডিং ভালো না হলে, সব বলই ওভারবাউন্ডারি হবে৷ ক্যাচ মিস করা আমাদের ইন্ডিয়ান টিমের একটা রোগ৷ এ সব প্লেয়ারদের দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত৷’

‘নাঃ দাদা, সত্যি তোমার বয়স হয়েছে৷ হচ্ছে বাঘের কথা, টেনে আনলে ক্রিকেট৷ বাঘ কি ক্রিকেট বল যে লাফিয়ে উঠে ক্যাচ ধরব, আর আম্পায়ার আঙুল তুলে বলবেন, হাউজ দ্যাট! তুমি রোজ একটা করে ভিটামিন খাও৷’

‘ভিটামিন তুই খা৷ আমি রোজ পুঁইশাক খাই৷ শিকারির হাতে রাইফেলটা কী জন্যে থাকে? সেইটা দিয়ে দুম করে মারা যায় না?’

‘আজ্ঞে না, যায় না৷ তুমি শিকারের কিছুই বোঝো না৷’

‘একটা রাইফেল দে না, দেখিয়ে দিচ্ছি শিকারের কী বুঝি আর না বুঝি৷’

‘এখন আর তেমন বাঘ নেই, থাকলেও মারা যাবে না৷’

‘কেন নেই?’

‘নেই তাই নেই৷’

‘তোমার মাথা৷ ওই গর্দভের মতো হালুম-লাফ মেরে-মেরেই জাতটা শেষ হয়ে গেল৷ বাঘের যদি আটঘাট বেঁধে কাজে নামার বুদ্ধি থাকত, তাহলে তোমাকে আর এখানে বসে-বসে ন্যাজ নাড়তে হতো না, বাঘের পেটে স্বর্গে যেতে৷’

‘তুমি যাই বলো, বাঘ মানুষের চেয়ে ঢের বড়৷’

‘বড় হলেই মানুষ হয় না৷ মানুষ বাঘের চেয়ে ঢের-ঢের-ঢের বড়৷ তিন ঢের বড়৷’

‘বাঘ তা হলে ছ’ঢের বড়৷’

‘মানুষ তা হলে বারো ঢের৷’

‘বাঘ তা হলে চব্বিশ৷’

‘মানুষ তা হলে আটচল্লিশ৷’

‘বাঘ ছিয়ানব্বই৷’

‘মানুষ তা হলে একশো বিরানববই৷’

বাঃ এ যেন নিলাম হচ্ছে! কার রেট কোথায় ওঠে! নাঃ, ব্যাপারটা ফয়সালা হল না৷ মা এসে পড়ল! মা এলেই সব গোলমাল হয়ে যায়৷ কোনও গোলমাল দেখলেই মা ছুটে আসবে৷ সেই বলে না, শান্তির শ্বেত পারাবত, দু-দেশের নেতা এক জায়গায় হলেই যা দু-হাতে আকাশে ওড়ান আর বলতে থাকেন, ভাই-ভাই৷ মাকে শান্তির জন্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত৷

মা ঘরে ঢুকেই বলল, ‘তোমাদের কোনও কাজ নেই?’

দু-দাদু এক সঙ্গে বললেন, ‘না আমাদের কাজ কী! সংসারের সব কাজ আমরা শেষ করে বসে আছি৷ আমরা এখন রিটায়ার্ড৷’

মা মেজদাদুর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তোমার দাঁত মাজা হয়েছে?’

মেজদাদা হে-হে করে হেসে বললেন, ‘দাঁত নিজেই নিজেকে মাজবে! সে হল স্বাধীন, আমার তোয়াক্কাই করে না৷’

মা বড়দাদুর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘বাবা, বেড়ানো হয়ে গেছে?’

‘আজ আবার বেড়ানো কীসের? আজ তো রবিবার৷ আমরা এখন বাঘ মারব৷’

‘দাঁড়াও, তোমাদের বাঘ মারা আমি বার করছি৷’ মা গলা ছেড়ে ডাকতে লাগলেন, ‘পুষ্প, পুষ্প, এই ঘরটা আগে ঝাঁট দিয়ে মুছে নে৷’

দাদু বললেন, ‘উঠে পড়ো ভায়া, ঝেঁটিয়ে বিদায় করার প্ল্যান৷ ঝগড়া না করে তুই যে এক জায়গায় চুপ করে বসতে পারিস না! বয়েস হচ্ছে, স্বভাবটা পালটা না৷’

‘বাঘের অপমান আমি সহ্য করতে পারি না৷ বাঘ ইজ এ বাঘ৷’

পুষ্পদি ফুলঝাড়ু বালতি আর ন্যাতা নিয়ে নেতার মতো ঘরে ঢুকল৷

সন্ধের দিকেই অবনীবাবু এসে গেলেন৷ ন্যাড়া মাথায় ক্রিকেট টুপি৷ টাইট প্যান্ট, জামা ভেতরে গোঁজা৷ স্বাস্থ্য বেশ ভালোই৷ দরজার সামনে আমাকে দেখে গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘এই যে খোকা ইহা কি গঙ্গাধরবাবুর বাড়ি?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ গেটের বাইরেই তো নাম লেখা আছে৷’

‘ছোটখাটো জিনিস আমার চোখে পড়ে না৷’

‘আমার দাদু ছোটখাটো মানুষ?’

‘আচ্ছা, আড়বোঝা ছেলে তো! দাদু বাড়ি আছেন?’

‘হ্যাঁ, আছেন৷’

‘গিয়ে বলো অবনী এসেছে৷’

‘এসেছে নয়, এসেছেন৷’

‘সে তো তুমি বলবে, আমি বলব কেন? কুকুর আছে?’

‘হ্যাঁ আছে৷’

‘তিনি কোথায়?’

‘তিনি নয়, সে৷’

‘ওই হল রে বাবা৷ সব কথায় অত ভুল ধরো কেন? সেই কুত্তাটা এখন কোথায়?’

‘কুত্তা নয়, কুকুর৷’

‘খাতির করলেও ভুল ধরবে, খাতির না-করলেও ভুল ধরবে৷ এ ছেলে বড় হলে দেখছি নির্ঘাত স্কুলমাস্টার হবে৷’

‘কুকুর এখন ছাতে দাদুর সঙ্গে হাওয়া খাচ্ছে আর গান গাইছে৷’

‘গান গাইছে নয়, ল্যাজ নাড়ছে৷ এইবার তোমার ভুল ধরেছি৷’

‘আমাদের কুকুর গানও গায়৷’

আমাকে আর যেতে হল না, দাদুই এসে গেলেন৷ ‘কার সঙ্গে বকবক করছিস রে হুলো? ও, অবনী এসে গেছো৷ এসো-এসো, ভেতরে এসো৷’

সেই অদ্ভুত অবনীবাবু হাতজোড় করে দাদুর পিছন-পিছন বসার ঘরে ঢুকে গেলেন৷ ভালো সোফায় না বসে একটা চেয়ারে বসলেন৷ দাদু বললেন, ‘ওখানে বসলে কেন?’

‘আজ্ঞে, যার যেমন জায়গা৷ ও সব বড় মানুষের জন্যে৷ আমাদের জন্যে এই ভালো৷’

‘তুমি কি ছোট মানুষ?’

‘আরেব্বাপ, কী বলছেন আপনি? আমার কোনও এডুকেশন নেই৷ আপনি বাঁচিয়েছিলেন বলে জেলের বাইরে আছি, করে খাচ্ছি৷’

‘তুমি আমাকে ভালোবাসো?’

‘আরেব্বাপ, জিন্দেগিতে আমি একজনকেই ভালোবাসি, সে হল আপনি৷’

ভদ্রলোক কীভাবে কথা বলছেন! কীরকম ভয়ে-ভয়ে বসে আছেন জড়সড় হয়ে৷

মেজদাদুর শুকনো কাশি হয়েছে৷ খকখক করতে-করতে ঘরে এসে ঢুকলেন৷ বড়দাদু প্রশ্ন করার আগে মেজদাদুই শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, তা হলে কী বুঝলেন?’

বড়দাদু বললেন, ‘তুমি একদম নাক গলাবে না৷ চুপ করে বোসো৷ খকখক করে কাশাও চলবে না৷’

‘যদি কাশি পায়?’

‘বাইরের বাগানে চলে যাবে৷ ঝাউগাছের তলায় দাঁড়িয়ে কেশে আসবে৷’

অবনীবাবু বললেন, ‘তা হলে আমি স্টার্ট করি৷’

‘না, আমার একটা প্রশ্ন আছে৷ তোমার কি কেউ মারা গেছেন?’

‘কই, না তো৷’

‘তাহলে মাথা মুড়িয়েছ কেন?’

‘আজ্ঞে, চুলের চিকিৎসা চলেছে৷ ভুশভুশ করে সব চুল উঠে যাচ্ছে৷ দুবার ন্যাড়া হয়েছি, আরও দুবার ন্যাড়া হব৷’

‘এবার তা হলে একটা টিকিও রাখ৷ ইলেকটিকসিটি খেলবে, খাড়া-খাড়া চুল বেরোবে৷’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই করব৷ তা হলে বলি৷’

মেজদাদু বাধা দিলেন৷ ‘চুলের বিষয়ে আমার কিছু বলার আছে৷ মাথা যখন মুড়িয়েছেন তখন আর-একটা কাজ করুন৷ রোজ সকালে মাথায় গরম গোবর লেপে দিন৷ পনেরো দিনের মধ্যে কচি-কচি চুল বেরিয়ে যাবে৷’

‘গরম গোবর আমি পাব কোথায়?’

‘একটা গোরু কিনে ফেলুন৷ পেটে দুধ, মাথায় গোবর৷’

‘অবনী!’ বড়দাদু কড়া গলায় ডাকলেন, ‘বড় বাজে বকছ হে, নাও শুরু করো, জানো আমার সময়ের দাম আছে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, চারপাশ ফাঁকা৷’

কোথায় ফাঁকা৷’

‘ওই যে, বাগানবাড়িটা যেখানে৷ চারপাশে ধু-ধু মাঠ, অচেনা পথঘাট৷ কাছাকাছি একটা নদী আছে৷ নাম, ইছামতী৷’

মেজদাদু বললেন, ‘ব্যস, ব্যস, আর আমার কিছু চাই না৷ নদী, বাগানবাড়ি৷ বহুদিনের ইচ্ছে, শেষ জীবনটা লিখে কাটাব৷ জীবনের অভিজ্ঞতা৷ প্রথম বইটার নাম হবে ‘ভদ্রলোক বাঘ, অভদ্র মানুষ৷’ দ্বিতীয় বইটার নাম, ‘সাহসী চিতা৷’

বড়দাদু বললেন, ‘আমি আগেই বলে রাখছি, তোমার ওই রাবিশ আমি পড়তেও পারব না, ভূমিকাও লিখতে পারব না৷’

‘কে বলছে তোমাকে ভূমিকা লিখতে? আমি বিলেত থেকে জেরালড জরেলডকে দিয়ে ভূমিকা লিখিয়ে আনব৷’

‘তাই এনো৷ অবনী, তুমি বলে যাও৷’

‘আজ্ঞে, আশেপাশে যখন মানুষই নেই, তখন ছেলে-বুড়ো, যুবক-যুবতীর প্রশ্নই আসে না৷ আসে কি?’

‘না, আসে না৷ রাস্তাঘাট?’

‘পিচের রাস্তা থেকে আর-একটা পিচের রাস্তা নেমেছে৷ সেই রাস্তা থেকে আর-একটা সরু রাস্তা, সেটা থেকে আর একটা৷ ঘুরপাক খেতে-খেতে সেই বাড়ি৷’

‘কতটা হাঁটতে হবে?’

‘মাইল দুয়েক৷’

‘চলবে না৷ ক্যানসেল৷’

মেজদাদু বললেন, ‘ক্যানসেল কেন?’

‘অতটা কে হাঁটবে?’

‘সাইকেল কিনব৷’

অবনীবাবু বললেন, ‘আপনারা অন্তত একবার দেখে আসবেন চলুন৷ আমার খুব পছন্দ হয়েছে৷ বাগানে খুব ভালো-ভালো গাছ আছে৷ পাখির ডাক কী, কানের কাছে যেন সারেঙ্গি বাজছে সারা দিন৷’

‘বেশ, তাই হোক৷ চলো, কাল ভোরেই বেরিয়ে পড়ি৷’

মেজদাদু বললেন, ‘খুবই ভালো কথা৷’

বড়দাদু বললেন, ‘তুমি চুপ করো৷ ভালো কথা কি খারাপ কথা, সে আমি বুঝব৷ অবনী, তুমি আজ রাতে এখানেই থাকবে৷’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, কিন্তু ছাতে শোব৷’

‘তাই শুয়ো৷’

‘মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খাব৷’

‘কেন, মাংস কেন?’

‘বড় লোভ হয়েছে৷’

‘আচ্ছা, তাই হবে৷’

‘একটু চাটনি৷’

‘তাও হবে৷’

‘শেষ পাতে একটু দই৷’

‘ব্যস, ওইতেই শেষ৷’

‘হ্যাঁ, আর না, শুধু এক খিলি পান৷’

‘এক খিলিতে তোমার হবে না বাপু, দু-খিলি পাবে৷’

মেজদাদু বললেন, ‘জরদা চলে না কি?’

‘আজ্ঞে, সে ব্যবস্থা আমার পকেটে আছে৷’

‘আমার স্ত্রীর কাছে লাখনোর এক নম্বর জিনিস আছে৷ তোমাকে দেব৷’

‘আচ্ছা, আমি তাহলে একটু বেড়িয়ে-চেড়িয়ে আসি৷’

‘হ্যাঁ, এসো, বুঝতেই পেরেছি, অনেকক্ষণ ধূম্পান হয়নি৷’

‘আজ্ঞে, ধরেছেন ঠিক৷’

সকাল না হতেই বাড়িতে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল৷ বাথরুম থেকে বড়দাদু বেরোন তো মেজদাদু ঢোকেন৷ মেজদাদু বেরোন তো বড়দাদু ঢোকেন৷ ওঁদের এই ঘনঘন আনাগোনা দেখে মা রেগে-রেগে উঠছে৷ বাবা বললেন, ‘তুমি আর আগুনে কাঠ গুঁজো না৷ দুজনেই নার্ভাস ডায়েরিয়ায় ভুগছেন, পারো তো ঘুমের ওষুধ খাওয়াও৷’

‘যাবেন বাগানবাড়ি দেখতে, অত ভয়ের কী আছে বাপু? সঙ্গে অমন ছেলে যাচ্ছে!’

অবনীবাবু এক রাতেই আমার দাদা হয়ে গেছেন৷ অবনীদা বুকটা একবার ফুলিয়ে নিলেন৷ বাবা বললেন, ‘দুই বৃদ্ধকে নিয়ে আজ তোমার বরাতে খুব দুঃখ আছে৷’

‘আজ্ঞে, দুঃখই আছে৷’

‘হ্যাঁ, বুঝবে ঠ্যালা৷ তখন এই কথাটা তোমার মনে থাকলে হয়৷’

বড়দাদু বাথরুম থেকে বেরোচ্ছেন, মেজদাদু ঢুকতে-ঢুকতে বললেন, ‘তোমার কী হল বলো তো দাদা৷ কাল কি জোলাপ খেয়েছিলে? এত বার যাচ্ছ আর আসছ৷’

‘তুই আর কথা বলিসনি মেজ! তোর কবার হল গুনেছিস?’

‘মাত্র তিন বার৷’

‘আজ্ঞে না, সাতবার৷ আমার এখনও এক কম আছে৷’

মা বললেন, ‘আর এক কম থাকে কেন? উনি বেরলেই তুমি সমান করে নাও৷’

‘করবই তো৷ বাথরুমে যাওয়ার স্বাধীনতা সকলেরই আছে৷’

অবনীদা বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আজ আর আপনারা যেতে পারবেন না৷ আমি বরং কাল সকালে আসি৷’

‘আরে, না-না৷ এটা আমাদের বংশগত রোগ৷ ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে না দিলে এ চলতেই থাকবে৷’

‘আজ্ঞে, ধাক্কা দেওয়ার কেউ নেই? এদিকে তো ন’টা প্রায় বাজল৷’

‘ধাক্কা কে দেবে বল, আমরা যে বড় হয়ে বসে আছি৷’

‘তা হলে নিজেরাই এবার নিজেদের ধাক্কা দিন৷’

‘হ্যাঁ, সেই ব্যবস্থাই করতে হবে৷ আমি মেজোকে দোব, মেজো আমাকে দেবে৷’

যাক দশটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লুম৷ দাদুর ব্যাপারে আমাকে সঙ্গে থাকতেই হবে৷ মাও তাই চায়৷

বাইরে একা-একা বেরোলে দাদু ভীষণ চানাচুর খান৷ সেবার দুশো গ্রাম চানাচুর খেয়ে ভীষণ কাণ্ড করেছিলেন৷

আমরা চলেছি টানা ট্যাকসিতে৷ মেজদাদুর গা থেকে ভুরভুর চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে! অবনীদার মুখ থেকে জরদার৷

হু-হু করে গাড়ি ছুটিয়ে প্রায় বারোটা নাগাদ আমরা সেই বাগানবাড়ির সামনে এসে পৌঁছলুম৷ মেজদাদু নেমেই বললেন, ‘আহা স্বর্গ!’

বড়দাদু ধমক দিলেন, ‘তুমি একটাও বাজে কথা বলবে না৷ স্বর্গ কি নরক সে আমরা বুঝব৷’

ট্যাক্সি ড্রাইভার বললেন, ‘ঠিক বলেছেন দাদু, বেশি লাফালাফি করলেই চড়া দাম হাঁকবে৷’

বড়দাদু ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমার ওই দাদু ডাকটা বদলানো যায় না? লেখাপড়া তো করেছ, কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া, বুড়োকে বুড়ো বলতে নেই, এ-শিক্ষাটা হয়নি?’

‘আজ্ঞে, তা হলে কী বলব?’

‘কিছুই বলবে না৷ না বলেও তো বলা যায়৷’

মেজদাদু যোগ করলেন, ‘যেমন না-বলা বাণী৷’

‘আবার বাজে বকছ?’

‘যাবব্বা, একটা কথাও বলা যাবে না?’

‘না, যাবে না৷ কোন কথায়, কী কথা বেরিয়ে আসে, কে বলতে পারে!’

গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল৷ আমরা আবার ফিরে যাব৷

বাগানটা সত্যিই বিশাল৷ বহু ধরনের গাছ৷ আমগাছে বোল এসেছে৷ গন্ধে মাত৷ মৌমাছি ভ্যানভ্যান করছে৷

বড়দাদু আপন মনে বললেন, ‘অ্যাসেট৷ এমন জিনিস কি কেউ ছাড়বে! কে জানে!’

মেজদাদু বললেন, ‘এবার কী হল দাদা! তুমি যে প্রশংসা করলে! দাম বেড়ে যাবে না?’

‘তুমি ছাড়া কেউ শুনেছে?’

‘আমি যখন স্বর্গ বলেছিলুম, তুমি ছাড়া কেউ শুনেছিল?’

‘তুই বড় তর্ক করিস৷’

‘হ্যাঁ, সত্যি কথা বললেই তর্ক হয়ে যায়!’

‘তোর বাড়ি তুই-ই তাহলে বোঝ, আমি তোর কোনও ব্যাপারে থাকতে চাই না৷ ফিরে চললুম৷’

বড়দাদু সত্যি-সত্যিই গাড়ির দিকে ফিরে চললেন৷ অবনীদা এক হাত ধরেছেন, মেজদাদু আর এক হাত, আমি জাপটে ধরেছি কোমর৷

মেজদাদু বলছেন, ‘তুমি চট করে বড় রেগে যাও৷’

অবনীদা বলছেন, ‘নিজেদের মধ্যে অশান্তি ঠিক নয়৷’

গাড়ির চালক বলছেন, ‘ওই করেই বাঙালি জাতটা শেষ হয়ে গেল৷’

বড়দাদু বললেন, ‘আমরা বাঙালি নই৷ দেখবে আমাদের একতা? চল মেজো, চল৷’

হাওয়া সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে গেল৷ লোহার গেটে তালা ঝুলছে চেন বাঁধা৷

বড়দাদু বললেন, ‘যাঃ, হয়ে গেল৷ বাড়িতে বোধহয় কেউ নেই৷ তুমি আসল খবরটাই নাওনি অবনী!’

‘কালও তো আমি লোক দেখে গেছি৷ দাঁড়ান, একবার দেখি!’

অবনীদা গেটের লোহার তালা বাজাতে লাগলেন৷ কী, তার শব্দ!

অনেক দূর থেকে কে একজন হেঁকে বললেন, ‘মেরে তক্তা করে দোব৷ আবার ফিরে এসেছিস!’

অবনীদা চিৎকার করে বললেন, ‘আমরা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি স্যার৷’

বড়দাদু মৃদু ধমক দিলেন, ‘স্যার বলছ কেন? আমরা কি চাকরি চাইতে এসেছি? আমরা কিনতে এসেছি৷ সেইভাবে ডাঁটে কথা বলো অবনী৷’

অবনীদা আবার চিৎকার করলেন, ‘আমরা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি মশাই৷’

‘মাথা কিনে নিয়েছেন!’ উত্তর এল জবরদস্ত৷

অবনীদা বড়দাদুর দিকে করুণ মুখে চেয়ে বললেন, ‘এর উত্তরে কী বলব?’

‘কিছু বলবে না৷ বড় মাছ তুলতে গেলে একটু খেলাতে হয়৷ এখন স্রেফ সুতো ছেড়ে যাও৷’

ঢলঢলে সাদা প্যান্ট আর হাফহাতা জামা পরা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন৷ সামনে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ঝুলছে৷ দেখলেই হাসি পায়৷ কোথাও কিছু নেই, এতখানি একটা দাড়ি৷ চোখে মোটা চশমা৷ গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বললেন, ‘সব কিছুর একটা সভ্যতা আছে৷’

বড়দাদু বললেন, ‘আমরা তো কোনও অসভ্যতা করিনি৷’

‘সভ্যতা, অসভ্যতার বোধটাই তো আপনাদের নেই৷ গেটে তালা বাজাচ্ছিলেন কেন? এটা কি আফ্রিকান বাদ্যযন্ত্র? আপনারা কি কনসার্ট পার্টি?’

‘আজ্ঞে না৷’

‘তবে?’

‘কীভাবে তা হলে ডাকব? কলিং বেল নেই যে!’

‘ডাকবেন না৷ গেটে তালা মানেই দেখা করার সময় চলে গেছে৷ সকাল ন’টা থেকে এগারোটা, বিকেল তিনটে থেকে পাঁচটা৷’

‘কই, কাগজে লেখেননি তো!’

‘সব কথা কি লেখা যায়! বিজ্ঞাপনের খরচ জানেন? সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু জিনিস বুঝে নিতে হয়৷’

‘মেজদাদু বললেন, ‘অলিখিত আইনের মতো!’

‘দ্যাটস রাইট৷’

বড়দাদু বললেন, ‘আমরা তা হলে কী করব এখন? ফিরে যাব?’

‘সে আপনাদের ইচ্ছে৷ ফিরেও যেতে পারেন, আশেপাশে ঘোরাঘুরিও করতে পারেন, তিনটে বাজলে আসবেন৷ হ্যাঁ, যাওয়ার আগে এক টিন রঙের দাম দিয়ে যেতে হবে৷’

‘সে আবার কী?’

‘এই যে তালা ঠুকে এই জায়গার রং চটিয়েছেন৷’

বড়দাদু বললেন, ‘প্রমাণ আছে?’

‘তার মানে?’

‘ওটা যে চটেই ছিল না তার কোনও প্রমাণ আছে!’

‘আমি বলছি, এই তো যথেষ্ট প্রমাণ৷’

‘তা হলে আদালতেই ফয়সালা হবে৷ এই নিন আমার কার্ড৷’

বড়দাদু গেটের এপাশ থেকে ওপাশে ভদ্রলোককে একটা কার্ড এগিয়ে দিলেন৷ আমি জানি কী লেখা আছে, দাদুর নাম, এম. এ, এল, এল, বি, অ্যাডভোকেট, ক্যালকাটা হাইকোর্ট৷ নাও, এবার বোঝো ঠ্যালা৷ আমার দাদুকে না চিনেই বড়-বড় কথা৷

ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি আইন ব্যবসায়ী?’

‘কী মনে হচ্ছে? একটা মানহানির মামলা তা হলে ঠুকে দি?’

মেজদাদু বললেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ঠুকে দাও দাদা৷ মেরে তক্তা করে দোব বলেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি৷’

ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি কে? অ্যাডিং ফিউয়েল টু দ্য ফায়ার?’

‘আজ্ঞে, আগুনটা জ্বেলেছে কে? এইবার বুঝুন ঠ্যালা৷ আমি উত্তরপ্রদেশের কনজারভেটার অব ফরেস্ট, বহু বাঘ মেরেছি জীবনে, বড়-বড় বাঘ, বড়-বড় বাঘ৷’

‘আমি কে জানেন?’

‘আপনি? আপনি একজন অভদ্র লোক৷’

‘তা হলে এই নিন আমার কার্ড৷’

উঃ, দারুণ জমেছে! কার্ডের খেলা চলেছে৷ তাস খেলা৷ টেক্কার ওপর টেক্কা পড়ছে৷

বড়দাদু কার্ডটা উলটে পালটে দেখলেন৷ মেজদাদু পাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছেন৷ আমি আর অবনীদা একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি৷

বড়দাদু বললেন, ‘আপনি ডক্টর ভবেশ মহাপাত্র? আমার বিশ্বাস হয় না৷’

মেজদাদু বললেন, ‘স্পেস সাইনটিস্ট ভবেশ মহাপাত্র, যিনি মহাশূন্যে রকেট ওড়ান? তাঁর তো এখন ফ্লোরিডায় থাকার কথা৷’

‘আঃ, তুমি চুপ করো৷ সব কথায় কথা বলো কেন? ফ্লোরিডা কি না জানি না, তবে ভারতে থাকার কথা নয়৷ বড়-বড় লোকেরা সব ভারতের বাইরে থাকেন৷’

ভবেশবাবু বললেন, ‘আমি ফিরে এসেছি৷ আমি ফিরে এসেছি৷ সবাই বলছে আমার মাথাটা নাকি একটু খারাপ হয়েছে৷’

‘প্রমাণ আছে?’

‘পাগলের প্রমাণ পাগলামি!’

‘যেমন?’

‘আমার বিশ্বাস ঢেঁকি স্বর্গে যেতে পারে৷ আমি সেই ঢেঁকির খোঁজে ভারতে এসেছি৷’

‘আমিও বিশ্বাস করি৷ নারদ যে ঢেঁকি চড়ে আসা-যাওয়া করতেন, সেই বিশেষ ধরনের ঢেঁকিটি খুঁজে বের করতে হবে৷ ভারতবর্ষের কোথাও-না-কোথাও অবহেলায় পড়ে আছে৷’

‘আফগানিস্তানেও থাকতে পারে৷’

‘এ আপনি কী বলছেন, ঢেঁকি হল ভারতবর্ষের জিনিস, বিশেষত বাংলার৷’

‘আরে মশাই, ঢেঁকি যে সময় বাহন ছিল, সেই সময় বিশাল আর-একটা মহাদেশ ছিল, ভারত, আফ্রিকা টাফ্রিকা নিয়ে৷’

‘আপনি কিস্যু জানেন না৷’

আপনি কিস্যু জানেন না, এ আপনার হাইকোর্ট নয়৷’

‘আপনি ঘোড়ার ডিম জানেন৷’

‘ঘোড়ারও যে ডিম হয়, তাই তো আপনি জানেন না৷’

‘তাই নাকি? কোন ঘোড়ার, আপনার ঘোড়ার?’

‘আজ্ঞে না, পক্ষীরাজের৷ আমার কাছে আছে, দেখতে চান?’

‘বাড়িতে ঢুকতেই দিচ্ছেন না তো ডিম দেখা!’

‘এইবার দোব, আপনি আমার মনের মানুষ, তবে একটা শর্ত৷ ঢেঁকি শুধু বাংলাদেশেই খুঁজলে হবে না, এলাকা বাড়াতে হবে৷ ওদিকে এশিয়া মাইনর, এদিকে আফ্রিকা৷’

‘বেশ, তাই হবে৷’

ঝলঝলে জামার পকেট থেকে এক গোছা চাবি বের করে তিনি তালা খোলার চেষ্টা করতে লাগলেন৷ একবার এ চাবি ঢোকান, একবার ও চাবি ঢোকান৷ তালা কিন্তু খোলে না৷ কী করে খুলবে! তালা একটা, চাবি পঞ্চাশটা৷ আমার দাদুর দেরাজ খোলার অবস্থা৷ ভুল চাবিটাই বারেবারে ঘুরে-ঘুরে আসে৷ অনেকক্ষণ চেষ্টার পর তিনি করুণ মুখে বললেন, ‘কী হবে, চাবি যে মিলছে না! আপনারা গেট টপকে ঢুকতে পারেন না? আমার ছেলে ঢোকে৷’

‘আজ্ঞে না, সে-বয়েস আর নেই৷ ছেলেবেলায় টিফিন আওয়ারের পর স্কুলে ঢুকেছি গেট টপকে, যৌবনে যাত্রা দেখে বাড়ি ঢুকেছি পাঁচিল টপকে৷’

‘আমার এই তালাটা মাঝে-মাঝে বড় ভোগায়৷ একটা কাজ করলে হয়, যখন খুলবে তখন যদি ঢোকেন৷’

‘তার মানে?’

‘মানে খুব সহজ। বাই চানস এক সময় চাবি লাগবেই, তালা খুলবেই, সে ধরুন আজও হতে পারে, কালও হতে পারে, তখন টুক করে ঢুকে পড়বেন৷’

‘তার মানে, সেই দুর্গ অবরোধের মতো সৈন্যসামন্ত নিয়ে আমরা বাইরে বসে থাকব দিনের-পর-দিন, বছরের-পর বছর! মামার বাড়ি আর কি?’

‘তা হলে আপনারা চেষ্টা করুন৷’

রাগ করে ভদ্রলোক চাবির থোলেটা আমাদের পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন৷

দাদু বললেন, ‘অবনী, চেষ্টা করো৷’

অবনীদা একের পর এক চাবি লাগাচ্ছেন আর খুলছেন৷ বিশাল দু-মানুষ উঁচু গেট৷ সহজে টপকানো যাবে না৷ মাথার দিকে খোঁচা-খোঁচা বর্শার ফলা৷ বেশ জম্পেশ গেট৷ অবনীদা ঘেমে উঠছেন৷ এতক্ষণ আমরা লক্ষ করিনি, পিছনে আর এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন৷

ভদ্রলোক বললেন, ‘ব্যর্থ চেষ্টা, ওই চাবির মধ্যে তালার চাবি নেই৷ চাবি আমার কাছে৷ এই দেখুন৷’

সুন্দর চেহারার যুবক৷ এক মাথা এলোমেলো চুল৷ চোখে রঙিন চশমা৷ দু-আঙুলে চাবিটি তুলে দাঁড়িয়ে আছেন৷

ভবেশবাবু চিৎকার করে বললেন, ‘ষড়যন্ত্র, ও হল বিদেশি এজেন্ট, আমার গবেষণার শত্রু, তোমাকে আমি মেরে তক্তা করে দোব৷ তোমাকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করে দিয়েছি, আবার এসেছ, আবার এসেছ!’

ভদ্রলোক করুণ মুখে বললেন, ‘আপনারা আমার বাবাকে ক্ষমা করুন৷ সম্প্রতি ওঁর মাথায় একটু গোলমাল হয়েছে৷ দূর থেকে এসেছেন, আপনাদের বাড়ির ভেতরে সাদরে নিয়ে যেতে পারছি না বলে ক্ষমা করবেন৷’

ভবেশবাবুর পিছনে এক বিদেশি মহিলা এসে দাঁড়িয়েছেন৷ ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার স্ত্রী লরা৷ লরা, তুমি ওঁকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো৷’

সেই বিদেশি মহিলা, অসীম স্নেহে দেশি বিজ্ঞানীকে মেয়ের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট ছেলেকে যে ভাবে ভোলাতে থাকে, সেই ভাবে ভোলাতে লাগলেন৷

ভবেশবাবু চিৎকার করে বললেন, ‘উড়ন্ত ঢেঁকি ছিল, এখনও আছে, এ-কথা আপনারা বিশ্বাস করেন কি না!’

দাদু বললেন, ‘না, করি না, ও হল গল্প-কথা৷ রূপক৷ আসলে ঢেঁকি হল রকেট৷’

‘ইউ আর অল লায়ারস, ফরেন এজেন্টস৷’

ভদ্রমহিলা ভবেশবাবুকে ভেতরে নিয়ে চলেছেন৷ তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে বলছেন, ‘তোমরা দেশের শত্রু৷’

বড়দাদু বললেন, ‘ভেরি স্যাড, খুবই দুঃখের৷’

ভবেশবাবুর ছেলে বললেন, ‘ভেরি স্যাড৷’

দাদু বললেন, ‘উড়ন্ত ঢেঁকি কিন্তু থাকতে পারে৷ একবার খোঁজপাতি করে দেখলে হয় না?’

‘মরেছে, পাগলামি দেখছি ছোঁয়াচে৷ আপনারা এখুনি এঁকে নিয়ে চলে যান৷ তা না হলে আমার বাবার মতো অবস্থা হবে৷ ইতিমধ্যে পঞ্চাশ হাজার টাকার ঢেঁকি কিনে ফেলেছেন৷ এই বাগানবাড়ি বেচে সারা পৃথিবীর ঢেঁকি কিনতে চান৷’

দাদু বললেন, ‘পৃথিবীর সমস্ত আবিষ্কারকই প্রথম দিকে পাগল বলে পরিগণিত হতেন৷ হঠাৎ একটা কিছু হয়ে গেলে, তোমরাই তখন এঁকে মাথায় তুলে নাচবে৷ পরশপাথর কি সত্যিই ছিল না? পক্ষীরাজ কি নিছক কল্পনা? নাগপাশ কি গাঁজাখুরি? পুষ্পক রথ কি গল্প-কথা?’

অবনীদা ফিসফিস করে বললেন, ‘যাঃ, হয়ে গেল! আর একটা উইকেট পড়ে গেল!’

আমি বললুম, ‘পরশপাথর কিন্তু সত্যিই আছে৷’

অবনীদা বললেন, ‘যাঃ আরও একটা উইকেট পড়ে গেল!’

মেজদাদু বললেন, ‘আমার কেমন মনে হয়, কামধেনু এখনও হয়তো আছে৷ কল্পতরুও থাকতে পারে৷’

অবনীদা বললেন, ‘যাঃ, হোল ফ্যামিলি আউট!’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%