সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
পরান মিত্তির খুব ভালো লোক৷ ভীষণ ভালো৷ খুব বড় সরকারি চাকুরে ছিলেন৷ ভারত সরকার৷ নদী বিশেষজ্ঞ৷ কোন নদী কোথা দিয়ে গেছে৷ যেতে-যেতে কোন নদী খামখেয়ালি হয়ে গতিপথ পালটেছে! কোন শাখা নদী মূল নদীর স্নেহ বঞ্চিত হয়ে শীর্ণ একটি খালে পরিণত হয়েছে, এই সবই তাঁর গবেষণার বিষয়৷ পণ্ডিত জওহরলাল, ডাক্তার বিধানচন্দ্র খুব পছন্দ করতেন৷ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বড়-বড় নদী দেখতে পাঠাতেন৷ কোন হিমবাহ থেকে কার উৎপত্তি৷ নদীর মধ্যে কত বিজ্ঞান, কত বিদ্যুৎ, কত ফসলের প্রতিশ্রুতি, কত নৃত্যগীত ভাষা৷ টুকটুকে ফরসা, লম্বা, বেতের মতো ছিপছিপে এই মানুষটি সকলের প্রিয়৷ এমনকী মানুষমারা রক্তপিপাসু মানুষেরাও এই মানুষটিকে ভালোবাসে৷ তাঁর জনপ্রিয় নাম ‘নদী মিত্তির’৷ সায়েবরা বলত ‘রিভার মিটার’৷ বাড়িতে একটা পাথরের মিউজিয়াম করে রেখেছেন৷ বিভিন্ন নদীর বুক থেকে কুড়িয়ে আনা রকম-রকম পাথর৷ নানা রং, নানা আকৃতি৷ এইসব নিয়ে নদী-পাহাড়ের সঙ্গে খেলা করে সারা দিনরাত৷ অনেক শালগ্রাম শিলাও আছে৷ কোনও-কোনও পাথর, দেবদেবীর মূর্তি ধারণ করেছে৷ অনেক ভক্তমানুষ এই ঘরের মেঝেতে আসন পেতে বসে ধ্যান করেন৷ পরানবাবু ইংরেজি সাহিত্যের ভক্ত৷ প্রচুর পড়েন৷ চতুর্দিকে শুধু বই আর বই৷ পাথরঘরের দেওয়ালে কবি টেনিসানের একটি উদ্ধৃতিঃ
I Chatter, Chatter, as I flow,
To join the brimming river,
For men may come and men may go.
But I go on for ever.
এই সুন্দর মানুষটি এখন খুব একা৷ মেয়ে কানাডায়, ছেলে আমেরিকায়৷ দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই৷ ওই কখনও-কখনও যদি আসে৷ তখন খুব আপনজন বলে মনে হয় না৷ নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত৷ স্ত্রী বাতে প্রায় পঙ্গু৷ ভেতরের একটা ঘরে থাকেন৷ একজন সেবিকা আছে৷ ভালো৷ মেয়েটি খুব ভালো৷ সহজ, সরল৷ কথায়-কথায় হাসি৷ বয়েস তিরিশের মধ্যে৷ একেবারে নিজেদের মেয়ের মতো৷ কী যে তার আনন্দ! কেন যে আনন্দ! পরান বুঝতে পারেন না৷ এই মেয়েটির নাম অপর্ণা৷ কে তার বাবা-মা কেউ জানে না৷ এক মাসির কথা তার মুখে শোনা যায়৷ সে অনেকটা বাঘের মাসির মতোই৷ খেয়ে-খেয়ে হাতির চেয়েও থপথপে৷ রাস্তায় বেরোলে দুর্দান্ত অটোও থেমে যায়৷ দশ হাত হাঁটতে দশ মিনিট সময় লাগে৷ অপর্ণা পরানকে বলেছে, ‘তুমি আমার বাবা হতে পারো না?’ দু-চোখে জল, ‘পারো না তুমি আমার বাবা হতে৷’ পরান বলেছিলেন, ‘পারি, পারি, পারি৷’ অপর্ণা বলেছিল, ‘তাহলে তুমি আমাকে টাকা দিতে এসো না৷’
এই মেয়েটাকে ভগবান যেন আকাশ থেকে ফেলে দিয়েছেন৷ বাড়িটা আনন্দে ভরিয়ে রেখেছে৷ এই পাড়ায় এগারো-বারো বছর বয়সের এক অসাধারণ বালক আছে৷ শুধুমাত্র তাকে নিয়ে একটা বই লেখা যায়৷ তার নাম শঙ্কর৷ এক মাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া পশমের মতো চুল৷ স্বপ্ন মাখা বড়-বড় ঝকঝকে দুটো চোখ৷ ফরসা রং৷ সুগঠিত শরীর৷ বড় হলে একজন বলবান মানুষ হবে৷ যেমন মেধা, সেইরকম স্মরণ শক্তি৷ সব পরীক্ষায় ফার্স্ট৷ অথচ সবসময় যে বই মুখে নিয়ে বসে আছে, তা নয়৷ একবার যা পড়ে, একবার যা শোনে, তা ভোলে না৷ সেই কারণে অন্য অনেক কাজ করার সময় পায়৷
শঙ্করের বাবাকে তার বাবা ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন৷ আবার তার বাবাকে তার বাবা ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন৷ সেকালের জমিদারদের ছিল এই এক রোগ৷ তিন-চারটে ছেলের একটাকে ত্যাজ্যপুত্তুর করবেনই করবেন৷ আবার ছেলে না হলে দত্তক নেবেন৷ কলকাতার অনেক বিকট বড়লোকই দত্তকপুত্র৷ হয়তো চালা বাড়ি থেকে রাজপ্রাসাদে৷ তারপর গোঁফ বেরোতে-না-বেরোতেই শুরু হল দু-হাতে টাকা ওড়ানো৷ এসব অনেক কাল আগের কথা৷ একালে এক-একটা ধ্বংসস্তূপ আর হাইকোর্টে মামলার পাহাড়৷ ধবংস স্তূপের ফোকরে-ফোকরে পূর্বপুরুষদের প্রেত নাক কাটা সুরে গলা সাধছে, সা রে গা মা পা ধা নি/তখন কেন বুুঝিনি৷ পরান যৌবন কালে এক গোঁফওয়ালা চুড়িদার পরা ভুঁড়িদারকে জিগ্যেস করেছিলেন, এত বড়লোক হলেন কী করে স্যার? বললেন, মোসাহেবি৷ একটা জমিদারকে কায়দা করে চুষতে পারলেই তিনপুরুষ নিশ্চিন্ত৷ জয় হিন্দ৷ শঙ্করের বাবা অত্যাচারী জমিদারের ছাতার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই তৈরি করেছিলেন৷ সে অনেকটা যেন স্বাধীনতা সংগ্রাম৷ সেই রক্ত শঙ্করের শরীরে৷ সোজা, খাড়া একটা ছেলে৷ শঙ্করের মায়ের চেয়ে পরান বয়েসে অনেকটাই বড়৷ তবু কখনও-কখনও মনে হয়, ‘মা’ বলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করি৷
পরান বাড়ির বাইরের দিকে রাস্তার ধারের একটা ঘরে থাকে৷ সামনের রাস্তায় বিশেষ তেমন ভেজাল নেই৷ উলটোদিকে বিরাট একটা পুকুর৷ দিঘিও বলা যায়৷ ওপারে ছোট্ট একটা বৈষ্ণব পল্লি৷ সেখানে সকাল-সন্ধে হরিনাম সংকীর্তন৷ ছোট্ট মন্দিরের চূড়া আকাশের দিকে ঠেলে উঠেছে৷ সাদা পায়রার ঝাঁক কখনও দুর্গা-নীল আকাশে চক্কর মারছে, কখনও মন্দিরের চূড়ায় ছড়িয়ে বসছে৷ একটা পায়ে-চলা পথ গাছপালার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে পল্লির ভেতরে চলে গেছে৷ ওখানকার জীবন অন্যরকম৷ ভীষণ শান্ত৷ জপ-তপ-পূজা-ধ্যান৷
জলের মানুষ পরান৷ সারাদিন জলের দিকেই তাকিয়ে থাকেন৷ গুনে দেখেছেন, ঠিক সতেরোটা হাঁস৷ দম দেওয়া কলের মতো এদিক থেকে ওদিকে ভেসে চলেছে৷ ভগবানের অবাক সৃষ্টি৷ মাঝে-মাঝে প্যাঁকপ্যাঁক করে হর্ন বাজায়৷ রোদে ডানা শুকোয়৷ হাঁসের মতো জীব আর হয় না৷ মা সরস্বতীর মতো দেবী৷ বইয়ের মতো বন্ধু৷ আকাশের মতো রং, জলের মতো আনন্দ, ঘাসের মতো বিছানা, বাতাসের মতো আহার৷
শঙ্কর বললে, ‘শোনো দাদা! তোমাকে আমি একটা লাইনটানা সুন্দর খাতা ও কলম দিয়ে যাব, আর তোমার এই টেবিলটা জানলার সঙ্গে লাগিয়ে দেব, তুমি সব দেখবে আর লিখবে৷ আমি আর একটু বড় হয়ে ওইসব লেখা ছেপে বই করব৷ দাদার কলকল কলম৷’
‘তুই আমাকে এত ভালোবাসিস কেন?’
‘একই কথা আমার, তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন? একদিন না এলে বলো,—এতদিন কোথায় ছিলিস? তোকে ঠেঙাব৷’
‘দ্যাখ শঙ্কর, রোজ সকালে ঘুম ভাঙা মাত্রই, এই জানলাটার সামনে দাঁড়াই আর ঝকঝকে দিঘির জল হাসতে-হাসতে বলে, গুড মর্নিং, সুপ্রভাত, সুপ্রভাত৷ ওই দূরে এক ঝাঁক পায়রা ডানার ঝিলিক তুলে চক্কর মারতে-মারতে বলে, কী আনন্দ, কী আনন্দ! রোজ দেখি৷ ঠিক সেই সময় তোকে একদিন না দেখলে মনে হয়—কী যেন একটা দেখা হল না৷ তুই যে আমার ছেলেবেলা৷’
‘শোনো না, বড় হই আগে৷ তারপর হাতে যখন টাকা আসবে, তখন তোমার জন্যে সুন্দর একটা নৌকো কিনব৷ হাঁসের পালকের মতো সাদা৷ তুমি সাদা পোশাক পরে মাঝখানে বসবে, আর আমি দাঁড় বাইব৷ ওই দিঘির এপার থেকে ওপারে চলে যাবে৷ একটা তক্তা পেতে দেব৷ তুমি নামবে৷ ওই যে মন্দিরটা৷ মাথায় সাদা পতাকা পতপত করছে৷ শ্যামসুন্দর ফুঁ-ফুঁ করে বাঁশি বাজাচ্ছেন৷ ওইখানে তুমি যাবে৷ চুপটি করে বসে গৌরদাস বাবাজির গল্প শুনবে৷ আমি যাই৷ সুন্দর-সুন্দর গল্প৷ মহাভারতের, ভাগবতের, পুরানের৷ কী সুন্দর বলেন৷ বড়-বড় চোখ৷ সবসময় জলে ভরে আছে৷ খাড়া নাক৷ ফরসা রং৷ খুব ভালো লাগে৷ এক-একটা গল্প শুনে আমারও ভীষণ কান্না পায়৷ চলো না, আমরাও সেই ঋষিদের কালে চলে যাই৷ এই কালটা মোটে ভালো নয়৷’
অপর্ণা ঘরে ঢুকতে-ঢুকতে বললে, ‘আমি তো যাবই৷’
শঙ্কর বললে, ‘সেখানে মনে হয় মেয়েদের ঢুকতে দেয় না৷’
‘তোকে বলেছে! শকুন্তলা কোথায় ছিল? মৈত্রেয়ী, গার্গী! কাঁচকলা পড়েছিস৷ আমার কাছে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনবি৷ সব মুখস্থ৷ আমার একটা মা ছিল৷ জানিস তো৷ কোথায় যে গেল! সেই থেকে আমি একটা খেজুর গাছ৷ খোঁচা-খোঁচা পাতা৷ গা ভরতি কাঁটা৷’
অপর্ণার মুখে আমার কেউ নেই, কেউ নেই, শুনলে পরানের অভিমান হয়৷
‘তোর এইটা কবে যাবে বল তো! খেজুর গাছ, বাবলা গাছ৷ আমি কি তোর কেউ নই!’
‘তাহলে তোমার কোলে বসতে দাও৷’
‘আয় বোস৷ এই তো পেতে রেখেছি৷’
পেছন দিক থেকে পরানকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অপর্ণা বললে, ‘আমার বুড়ো খোকা৷ অত ভালোবেসো না৷ পরে দুঃখু পাবে৷’
শঙ্করের মাথায় খটাস করে একটা গাঁট্টা মেরে বলল, ‘শিগগির চল, ঝুলন এসে গেছে৷ ঝুলন সাজাতে হবে৷’
পরান বললেন, ‘কোথায় হবে!’
‘পেছনের বাগানে৷ সেই সুন্দর জায়গাটায়—কদম, কৃষ্ণচূড়া, বকুল৷’
‘ঝুলনে যমুনা নদী থাকবে তো! একটা কুঞ্জবন৷ রাত্তির বেলা পাতায়-পাতায় টিপটিপ জোনাকি৷ আঁকাবাঁকা বৃন্দাবনের পথ৷’
‘তুমি চলো না৷ নদীটা করে দেবে৷’
‘তাহলে বাগানে বসে চা আর গরম আলুভাজা৷’
‘আলুভাজা নয় পাকোড়া৷’
শঙ্করকে বললে, ‘এই ছোকরা চল-চল৷ তোকেই আমার ভয়৷ কখন আবার লেখাপড়া পেয়ে যায়!’
‘আজ আর পাবে না৷ কাল সারারাত পড়েছি৷’
‘সে কী রে! ঘুমোবি কখন?’
তুমি যখন ঘুমোবে৷ তোমার পাশে পাশবালিস৷’
‘আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে খা না৷’
‘তোমাকে আমি বলেছি না, এখানে ভালো-ভালো রান্না হয়৷ কী করে খাই! আমার একটা মা আছে, ছোট একটা বোন আছে৷ তোমরা আমাকে কিছু দিয়ো না, ভালোমন্দ খাইও না৷ আমার লোভ বেড়ে যাবে৷ আর লোকে বলবে, পায় তো, তাই যায়৷’
‘না ভাই, তোর এই বুড়ো-বুড়ো, বড়-বড় কথা আমার একদম না পসন্দ৷ আমরা দুই ভাইবোন, এই বাড়িরই দুজন৷ কই আমি তো নিজেকে পর ভাবতে পারি না৷’
‘আমিও তো ভাবি না৷ তোমার তো অসুবিধে নেই৷ তুমি যে এই বাড়িতেই থাকো৷ সেদিন রাতে, ছাতে, তোমার পাশে শুয়ে ঘুমোবার আগে আমি তোমাকে বলিনি! আমাকে একা-একা বড় হতে হবে৷ মস্ত বড়৷ যারা আমার বাবা আর মাকে রাস্তায় বার করে দিয়েছিল, তাদের আমি দেখিয়ে দোবো৷’
পরান পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ তিনি যোগ করলেন, ‘গাড়ি নয়, বাড়ি নয়, জীবন দিয়ে দেখিয়ে দেব৷ কীরকম মানুষ হব! স্বামীজির মতো৷
শঙ্কর পরানকে বললে, ‘দাদাভাই, তুমি তো একটা ভালো কাজ করতে পারো!’
‘বল, কী কাজ?’
‘শ্যামসুন্দরের মন্দিরের পাশে একটা সুন্দর হলঘর করেছে, তুমি তো শনিবার-শনিবার ওখানে আমাদের স্বামীজির কথা, আর সব মহাপুরুষদের কথা, নদীর কথা, পাহাড়ের কথা, আরও কত কী কথা বলতে পারো৷’
‘কে শুনবে?’
‘কী বলছ তুমি? সে ভার আমার৷ তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো৷’
‘বেশ, ব্যবস্থা কর৷ আমারও খুব বলতে ইচ্ছে করে৷’
পরান হাঁটতে-হাঁটতে সবেদা গাছের দিকে চলে গেলেন৷ শঙ্কর অপর্ণাকে বললে, ‘আজ আমি খেতে পারি৷ মা বোনকে নিয়ে মামার বাড়ি গেছে৷’
‘উঃ! কী সাংঘাতিক ছেলেরে ভাই৷ আমি না বললে, আজ কী খেতিস? উপোস!’
‘আমি চিঁড়ে ভিজিয়ে রেখে এসেছি৷’
‘স্পেশাল কী খাবি বল?’
‘তুমি যা খাওয়াবে৷ অত স্পেশাল-স্টেশাল জানি না৷’
ঝুলনের জায়গায় পরান যমুনা তৈরির কাজ শুরু করলেন৷ বাগানের এই দিকটা খুব সুন্দর৷ এই দিকটায় তাঁর ছেলেবেলা ছোটাছুটি করে এখনও৷ খুব খরগোশের শখ ছিল৷ একটা মস্ত খোপ-খোপ ঘরে একসময় কুড়িটা খরগোশ থাকত৷ তার মধ্যে এক জোড়া ছিল কুচকুচে কালো৷ সবাই বলত রং করেছিস না কি! স্কুলে বাংলার শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় স্যার স্বামীজির ছেলেবেলার গল্প বলতেন৷ সিমুলিয়ার বাড়িতে একটা চিড়িয়াখানা করেছিলেন৷ সেই শুনে ভীষণ উৎসাহ এল৷ স্বামীজির ইঞ্জিনিয়ারিং, জিমন্যাসটিক, কুস্তি, সাঁতার, সাহস, ঘোড়ায় চড়া৷ স্বামীজিকে রোজ ধ্যান করা৷ কী সুন্দর সেই ছেলেবেলা! বাড়ি ভরতি কত লোক, কত কথা, হাসি, গান, গল্প৷ যাক গে! সব কিছুই এইভাবে ফুরিয়ে যায়৷
দুর্দান্ত পাকোড়া৷ একটু ঝাল৷ পরান ঝাল পছন্দ করেন৷ দক্ষিণ ভারতে থাকার সময় প্রচণ্ড ঝাল আর টক খাওয়া শিখেছেন৷ শঙ্করদের পরিবারে সব মিষ্টি-মিষ্টি৷ শঙ্করের ব্রহ্মতালু গরম আগুন৷ কপালে ঘাম৷ বড়-বড় চোখ দুটো আরও বড় দেখাচ্ছে৷ স্বামীজি খুব ঝাল খেতেন৷ মৃত্যুঞ্জয় স্যার একদিন বলেছিলেন, স্বামীজি ঝাল-ঝাল, রামকৃষ্ণদেব মিষ্টি-মিষ্টি৷
অপর্ণা নরম শাড়ির আঁচল দিয়ে শঙ্করের মুখটা মুছিয়ে দিতে-দিতে বললে, ‘একটুও ঝাল খেতে পারে না৷ এমন কিছু ঝাল হয়নি৷ লঙ্কাকুঁচি না দিলে হয়! তুই ক্যাচক্যাচ করে লঙ্কা চিবিয়েছিস৷ ওই ঝোপটার কাছে গিয়ে জিভটা ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক৷ আচ্ছা দাঁড়া তো৷ মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে৷ ওদিকে চল৷’
ঝাঁকড়া বকুলের ছায়ায় এসে অপর্ণা বললে, ‘তোর জিভটা লম্বা করে আমার মুখে পুরে দে৷’
পরান ওদিক থেকে উঁচু গলায় বলছেন, ‘বাঃ ভাই! বেশ মজা! আমাকে একলা বসিয়ে দিয়ে কে কোথায় পালাল!’
শঙ্কর ছুটতে-ছুটতে সেই দিকে গেল৷ বুঝতে পারছে না—তার ভেতর কিছু একটা হয়েছে৷ সেই ভেতরটা কত ভেতরে, সেখানে কে আছে, কী আছে, সে জানে না৷ যে আছে, তার নাম আনন্দ৷ সেই ঘরের চাবিটা আছে তার অপর্ণাদির হাতে৷
যমুনার বেড তৈরি হয়েছে৷ বালির বিছানার ওপর ছোট-ছোট কাঁকর৷ পাড় হয়েছে৷ উঁচু থেকে ঢালু৷ সত্যিকারের নদীতে যেমন হয়৷ এইবার জল আসবে৷ ওইটুকু নদী, তাও প্রায় তিন বালতির মতো জল খেয়ে ফেলল৷ ছোট্ট কুঞ্জবন৷ দোলনায় দুলছেন রাধা-কৃষ্ণ৷ নকল গাছের নকল ডালে নকল টিয়া৷ অবাক হয়ে দেখছে৷
শঙ্কর বললে, ‘দিদাকে আনতেই হবে, তা না হলে ঠিক জমছে না৷’
এক সময় যে মহিলা স্বামীর সঙ্গে মাইলের-পর-মাইল হেঁটেছেন৷ দুর্গম পথ ধরে গেছেন দামোদরের উৎস সন্ধানে, এখন তিনি অতি কষ্টে একটু-একটু হাঁটেন৷ পা দুটো যেন বলছে—অনেক হাঁটিয়েছ ম্যাডাম, এইবার আমাদের বিশ্রাম৷ কী সুন্দর দেখতে৷ রাজরানি যেন৷ অপর্ণা বলেছে, ‘তোমাকে যদি আমি হাঁটাতে না পারি, আমার নাম তাহলে অপর্ণা নয়৷ নামটাই বদলে ফেলব৷’ অপর্ণা কত কী যে জানে! রোজ দুপুরে এক ঘণ্টা অরুণার পায়ে নানারকম কসরত করে৷ ফিজিওথেরাপি, মাসাজ৷ অরুণাকে মাঝে-মাঝে হাঁটায়—হাঁটি-হাঁটি পা-পা/আমার সোনা হাঁটছে দেখে যা৷’
অরুণা অপর্ণার কাঁধে ভর দিয়ে বাগানে আসছেন ঝুলন দেখতে৷ অপর্ণা বলছে ‘মনে করো, তোমার পা নয়, হাঁটছে তোমার মন৷ মনকে দিয়ে বলাও ডান-পা এগোও, বাঁ-পা এগোও৷ পা-দুটোর কথা ভুলে যাও৷ মনকে বলো—আমাকে বাগানে নিয়ে চলো৷’
‘বাবারে বাবা! এই মেয়েটা কত কী যে জানে! তুই আগের জন্মে আমার কে ছিলিস?’
‘লাঠি৷’
‘লাঠি?’
‘হ্যাঁ৷ রেখে গিয়েছিলে৷ এসে তুলে নিলে৷ খটাস-খটাস লাঠি৷ লাঠি আর লাঠালাঠি, দুটোই মরে না৷ একথা কি তুমি জানো না!’
‘বাবা রে! কত কথাই না জানে এই মেয়েটা৷’
পাতলা রোদ, ঠান্ডা বাতাস৷ দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে৷ বাগানটাকে মনে হচ্ছে, যেন এইমাত্র জন্মাল৷ অপর্ণার কাঁধ থেকে হাত তুলে নিয়ে অরুণা নিজেই হাঁটছেন৷ কী আশ্চর্য!
শঙ্কর একটা পাথর নিয়ে যাচ্ছে৷ বেশ ভারী৷
‘পাথর কী হবে রে?’
‘এটা পাথর নয়, গিরি গোবর্ধন৷’
নিজের তৈরি যমুনার ধারে বসে পরান দেখছেন অরুণা কারও সাহায্য ছাড়াই টুকটুক করে তার দিকে হেঁটে আসছে৷ ‘ব্র্যাভো, ব্র্যাভো!’ এক সময় এই বাগানটা তারা দুজনে তৈরি করেছিল৷ ছুটির দিনে খেয়ালই থাকত না—দুটো বাজল, তিনটে বাজল চান খাওয়ার কথা মনেই থাকত না৷ জাপানে দেখেছিল, ছবির মতো বাড়ি৷ সব বাড়িতেই যত ছোট হোক ছবির মতো একটা বাগান৷ নানা রঙের চন্দ্রমল্লিকা৷ ছোট্ট নদী৷ তার ওপর সুন্দর বাঁশের সাঁকো৷ এধারে, ওধারে জাপানি লণ্ঠন ঝুলছে৷ ঝুলছে ছোট-ছোট টুংটাং ঘণ্টা৷ এক পাশে চা খাবার ঘর৷ সবটাই কাঠ দিয়ে তৈরি৷ মন্দিরের মতো করে৷ গালার পালিশ৷ ওদেশে চা পর্বটা একটা উৎসব৷ সবুজ চা৷ সেইরকম পরিষ্কার৷ কোথাও একটা কুটো পড়ে থাকার উপায় নেই৷ মেয়েরা সব সাদা আপেলের মতো৷ লাল-লাল ঠোঁট৷ দামি সিল্কের পোশাক৷ সাদা আর গাঢ় নীল রং খুব পছন্দ৷ সবসময় কাজ৷ কাজ ছাড়া কেউ থাকে না৷ ইউরোপ, আমেরিকা অনেক দেখেছে৷ ছোট দেশ জাপানের কোনও তুলনা নেই৷ পরানের খুব ইচ্ছে ছিল বাগানে একটা জাপানি ধরনের নদী করবেন৷ পাম্প দিয়ে জল চালাবেন৷ কুলুকুলু বয়ে যাবে৷ সেই কবিতার মতো ‘আমাদের ছোট নদী বহে কুলকুল/ পরপারে আম গাছে থাকে বুলবুল/’ সে আর হল না৷ অরুণা বিছানা নিল৷ ছেলে আর মেয়ে প্রবাসী৷ জীবনের কাছে প্রায় হারতেই বসেছিলেন, এমন সময় অপর্ণা এসে গেল৷ শঙ্করের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল৷ মা দুর্গারই তো আর-এক নাম অপর্ণা৷ অপর্ণা দু-হাতে দশ হাতের কাজ করে৷ আর শঙ্কর ছোট্টখাট্টো একটা মহাদেব৷
অপর্ণা অরুণাকে বললে, ‘থামলে কেন, টুকটুক করে চালা৷ আমরাও চা খাওয়ার একটা জায়গা করেছি৷ তুমি আজ উদ্বোধন করবে৷’ অনেকটা মন্দির৷ বেশ সুন্দর৷ চারপাশ থেকে মাধবীলতা ওপর দিকে উঠেছে৷ সঙ্গে উঠেছে জুঁই, লতানে বেল৷ সিমেন্টের বসার জায়গা, টেবিল৷ সামনে ঘাসে ঢাকা জমি৷ আসার পথের দু-ধারে পাতাবাহার গাছ৷ এপাশে, ওপাশে, টুসটাস ঝরে পড়ে আছে গুলঞ্চ ফুল৷
অরুণা বললেন, ‘বাঃ, বেশ চমৎকার হয়েছে৷ শীতকালে দারুণ লাগবে৷ কোথাও একটু জল থাকলে ভালো হত৷’
পরান বললেন, ‘ভেবেছি৷ একটা লিলিপুল৷ তুমি হাঁটায় পুরোনো উৎসাহে আবার ফিরে পেলুম৷’
‘এবার কি আমি একটু বসতে পারি?’
অপর্ণা বললে, ‘নিশ্চয়ই৷ বসতে তো হবেই৷ আমি চা আনছি৷ চা পান ও কথোপকথন৷’
‘আজকাল ভালো-ভালো বাংলা বলছিস৷’
‘গুরুর শিক্ষা৷’
‘গুরু কে?’
‘ওই যে ভোলা মহেশ্বর, বীর হনুমান, শঙ্কর নারায়ণ৷’
‘ছেলেটা অসম্ভব ভালো৷ ওকে তৈরি করতে হবে৷’
পরান বললেন, ‘ও তৈরি হয়েই এসেছে৷ সেদিন আমি একটা অঙ্ক কিছুতেই সমাধান করতে পারছি না৷ ধরতেই পারছি না কোন দিক থেকে ধরব৷ ও আমাকে বললে, দেখি দাও তো৷ অঙ্কটার এত বড় আস্পর্ধা, তোমাকে বোকা বানাতে চাইছে! বেশ কিছুক্ষণ অঙ্কটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর তিন স্টেপে ঝাঁ-ঝাঁ করে অঙ্কটা কষে ফেলে আমার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে কী বললে জানো, ‘‘আমাকে আশীর্বাদ করো৷’’ এমন ছেলেকে বুকে রাখতে হয়৷ ও দ্বিতীয় রামানুজ৷’
ওদিক থেকে শঙ্করের গলা ভেসে এল, ‘এমন বদমাইশ পাহাড় জীবনে দুটো দেখিনি৷’
পরান জানতে চাইলেন, ‘কী হল রে?’
‘দ্যাখো না, যে ভাবে বসাতে চাইছি কিছুতেই সেইভাবে তিনি বসবেন না৷ ভীষণ একগুঁয়ে৷ আর একটু হলেই যমুনার ঘাড়ে গিয়ে পড়ত৷ সাধে শ্রীকৃষ্ণ উপড়ে দিয়েছিলেন৷’
অপর্ণা চা আনতে-আনতে শুনে বললে, ‘তুই বল রাধিকা এখুনি আসছে৷ বেশি অবাধ্যতা কোরো না৷’
অপর্ণা চা দিয়ে এসে শঙ্করের পাশে ধপাস করে বসে পড়ল৷ ক’দিন আগে বেশ দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে৷ ঘাস এখনও ভিজে-ভিজে৷ সে থাক গে৷ ‘সমস্যাটা কী?’
‘আমি পাথরটাকে এইভাবে বসাতে চাইছি৷ বসবে না৷ টাল খেয়ে নিজের ইচ্ছেমতো হয় এদিকে না হয় ওদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে৷’
‘আমি ধরে আছি৷ মাটি খোঁড়াটা নিয়ে আয়৷’
মাটি খোঁড়া এল৷ এদিক থেকে ওদিক থেকে মাটি খানিক সরাতেই পাথরটা খাপে-খাপে বসে গেল৷ ‘নে, এবার ঘাসের চাবড়া, মাটির ঢেলা, গোটা-গোটা পাথর দিয়ে, পাহাড়টাকে পাহাড়ের মতো কর৷ বুঝলি সবসময় ছেলেদের বুদ্ধিতে কাজ হয় না৷ মেয়েদের বুদ্ধি নিতে হয়৷ মাথামোটা মহেশ্বর ষাঁড়ের পিঠে চড়ে ভস্ম মেখে ঘুরছেন-আর-ঘুরছেন৷ আর মা আমার সোনার অন্নপূর্ণা হয়ে সোনার কাশীতে অন্ন বিতরণ করছেন৷ নে প্রণাম কর৷ আরে ধুর আমাকে নয়, মা অন্নপূর্ণাকে৷’
‘তিনি কোথায়?’
এই যে এই মাটিতে৷ ওই জলে৷ মাটিতেই ধান৷ মাটিই তো সব—অন্নপূর্ণা, জগদ্ধাত্রী৷ মা আমার সব পারেন, কেবল বাউণ্ডুলে স্বামীটার কিছু করতে পারলেন না৷ বিলেত পাঠাতে হবে৷’
অপর্ণা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ‘যাই গো, আমার মেয়েটাকে এইবার ঘরে তুলি৷ সবে হাঁটতে শিখেছে৷’
‘তোমার শাড়ির পেছনে কাঠিকুটি, ঘাসমাস সব লেগে আছে৷’
‘ঝেড়ে দে না৷’
‘কী করে ঝাড়ব৷ আমার দুটো হাতই তো মাটি মাখা৷’
‘তা হলে থাক৷ যেমন আছে তেমন থাক৷ মাটিতে জন্ম আমার, মাটি তাই রক্তে মিশেছে৷’
‘কত কাজ বল তো, এটা করো, ওটা করো, এটা তোলো, ওটা ফ্যালো৷’ অপর্ণা এদিকে ছুটছে, ওদিকে ছুটছে৷ হিসেবের খাতা বের করে, দুধের হিসেব, মুদিখানার হিসেব৷ ‘কত টাকা রইল, কত টাকা গেল৷ কত টাকা আসবে৷ বাবা রে, বাবা রে! চা তেষ্টা পেয়ে গেল রে!’ অপর্ণার অনর্গল বাক্যঝারি৷ বর্ণমালা ঝুরঝুর ঝরছে৷ চিৎকার—‘মল্লিকা, মাই লাভ! মুখপুড়ি, কাজের সময় কোথায় গেলি৷’ মল্লিকা হল অপর্ণার হেলপিং হ্যান্ড৷ উনিশ-কুড়ি৷ একটু পাগলি টাইপ৷ ভীষণ ভালো মেয়ে৷ মুখটার মধ্যে কেমন একটা মায়া আছে৷
ওই যে ওই দিঘি৷ বয়েস যেন কত? বর্ধমানের প্রথম মহারাজার আমলে৷ আরও আগে! কে জানে কবে৷ সবাই বলে—যা গভীর, তল খুঁজে পাওয়া যায় না৷ ডুব দিলে সাঁসাঁ শব্দ, আর জল যা ঠান্ডা! মানস সরোবরের সমসাময়িক হলেও হতে পারে৷ দিঘির ওপারে শান্ত বৈষ্ণব পল্লি৷ সবচেয়ে সমতল ভূমি৷ ছবির মতো৷ এই কথার মধ্যে এতটুকু বাড়াবাড়ি নেই৷ বড়দের পোশাক—ধবধবে সাদা মাড় না দেওয়া ধুতি৷ চাঁপাফুল রঙের উত্তরীয়৷ মহিলাদের সাদা শাড়ি, চাঁপা রঙের পাড়৷ পরিষ্কার সরু, মাঝারি, চওড়া রাস্তা, এদিক দিয়ে ওদিক দিয়ে চলতে-চলতে শেষ হয়েছে একটা সমাধি উদ্যানে৷ এই পল্লি, এই তপোভূমি সেই ভয়ংকর মুসলমান আমলে যে মহা বৈষ্ণব তপস্বী গড়েছিলেন, সেই বৈষ্ণব দাস বাবাজির সমাধি স্থান৷ এই জায়গায় এলে মহা অশান্ত লোকও শান্ত হয়ে যাবে৷ দু-মাথায় দুটো হরিসভা৷ পূর্ব পল্লি, পশ্চিম পল্লি৷ ঝকঝকে ঘর, তকতকে বেদি৷ অষ্টপ্রহর সেখানে চাপা সুরে, মৃদু গলায় হরিনাম হচ্ছে৷ সেই পল্লিতে একটাও কাক নেই৷ কারণ, এখানে কেউ মাছ-মাংস-ডিম খায় না৷ বাইরে কোনও আবর্জনা ফেলে না৷ দু-একটা কাক ভুল করে এসে পড়েছিল৷ উপোস করে মারা গিয়েছিল৷
মল্লিকা এই পল্লিরই মেয়ে৷ এই বাড়ির ওপর তার একটা টান আছে৷ সময় পেলেই চলে আসে৷ অপর্ণার দোসর৷ সারাদিন থেকে বিকেলের দিকে চলে যায়৷ মেয়েটাকে নিয়ে সকলেরই খুব ভাবনা৷ ভবিষ্যতে কী হবে! শঙ্কর অতশত বোঝে না৷ বাবা, আজকের দিনটা বেশ ভালোভাবে খরচ করো না, কালকের কথা কালকে ভাববে৷ শঙ্করের খেয়াল৷ মাঝেমধ্যে হরিসভায় যায়৷ ভালো লাগে৷ বেশ কেমন একটা পুরোনো-পুরোনো ভাব৷ দেওয়ালে মহাপ্রভুর বড় ছবি৷ দু-হাত তুলে নাচছেন৷ পায়ের কাছে লুটিয়ে আছে কোঁচা৷ গলায় ফুলের মালা৷ মাথায় কত চুল৷ আবার আর-একটা ছবিতে কৌপীন্ধারী সন্ন্যাসী৷ শঙ্কর হাঁ করে দুটো ছবিই দ্যাখে৷ এইটা আবার ওইটা৷ এই সুন্দর মানুষটা সব ত্যাগ করে ওই মানুষ হয়ে গেল৷ পাঁচশো বছর হয়ে গেল মানুষ এখনও তাঁকে মনে রেখেছে—মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য৷ নবদ্বীপ থেকে সেদিন এক মস্ত পণ্ডিত এসেছিলেন৷ মাঝে-মাঝে খুব সুন্দর গলায় কীর্তন করছিলেন৷ কোনও দুঃখ নেই তবু কাঁদছিলেন৷ ভগবানের কথা মনে পড়লে মানুষ কাঁদে৷ ভগবান মারা যাননি, কোথাও লুকিয়ে আছেন৷ কেউই তাঁর দেখা পায় না৷ কেঁদে-কেঁদেই মরে৷ শঙ্করও খানিক কাঁদল৷ ইচ্ছে করে নয়৷ গুড়গুড় করে যেমন বৃষ্টি আসে অনেকটা সেইরকম৷ বুকের কাছটা কেমন করে উঠল৷ কত কী মনে পড়ল৷ সেই পণ্ডিত মানুষটি গানের ফাঁকে-ফাঁকে অনেক কথাও বলছিলেন! একটা কথা শঙ্করের খুব ভালো লেগেছে—দিনের রাখাল ভগবান৷ রাখাল যেমন মাঠে অনেক গরু চরায়, ভগবানও সেইরকম কালের রাখাল হয়ে দিন চরাচ্ছেন৷ মানুষের কী ক্ষমতা, কীসের গর্ব৷ এই কথাটা শুনে শঙ্করের চোখে জল এল৷ কেউ যে তাকে লক্ষ করছে, সে বোঝেনি৷ ভাবতেও পারেনি৷ পিঠের ওপর অনেকখানি জায়গা জুড়ে নরম একটা হাত এসে পড়ল৷ তাকিয়ে দেখল, মল্লিকা—তুই কাঁদছিস৷ তার মানে তুই ভক্ত৷ তুই ভক্ত৷ একদিন-না-একদিন তুই ভগবানকে দেখতে পাবি৷
চূড়ো করে খোঁপা বেঁধেছে৷ মালা দিয়েছে৷ নাকে রসকলি৷ কপালে হলুদের বেড় দেওয়া সাদা চন্দনের টিপ৷ কানে ঝুমকো৷ তপতপে মুখ৷ বাপরে! পিঠে যখন হাত রেখেছিল, চেটোটা কী গরম! বাপরে!
‘তোমাকে দেখে ভয় করছে কেন? তুমি কি কোনও দেবী?’
‘আমি নেশা করেছি৷’
‘কী নেশা?’
‘কৃষ্ণ নেশা!’
মল্লিকার মাঝেমধ্যে মাথা কেমন হয়ে যায়, একথা শঙ্কর শুনেছে৷ তাই শঙ্কর পালিয়ে যেতে চাইছিল৷ মল্লিকা খপ করে তার ডান হাতটা চেপে ধরে বললে, পালাচ্ছিস কোথায় ভীতু ছেলে৷ কেউ ভীতু বললে শঙ্করের খুব রাগ হয়৷ শ্মশানে সে একা রাত জাগতে পারে৷ মুস্তাফিদের ইট বের করা পোড়ো মন্দিরে একা রাত কাটিয়েছে ইচ্ছে করে৷ গভীর রাতে একটা পেল্লায় সাপ এসেছিল৷ এসেছে আসুক৷ মায়ের সাপ মায়ের কাছে এসেছে৷ সে যদি আসতে পারে সাপও আসতে পারে৷ আর-একটা ব্যাপার হয়েছিল, সেটা অলৌকিক না বিজ্ঞান—শঙ্কর এখনও ভাবে৷ মাঝ রাতে পাথরের থালার ওপর রাখা শাঁখটা হঠাৎ পোঁপোঁ করে বাজতে শুরু করল৷ না, মিথ্যে কথা বলব না, সত্যিই একটু ভয় পেয়েছিলুম৷ শীত-শীত করতে লাগল৷ নেশার মতো ঘুম জড়িয়ে এল শরীরে৷ সেদিন সেই সাধক আরও কিছু কথা বললেন, যা বিজ্ঞান৷ চোখ যা দেখতে পায় তার বাইরেও অনেক কিছু আছে, যা দেখতে পায় না৷ অনেক শব্দ কানের পাশেই হচ্ছে, শুনতে পায় না৷ এই নবদ্বীপের সাধককে শঙ্কর মনে রেখেছে৷ তুলসীর মালা, তুলসী গাছ, দু-হাত তোলা মহাপ্রভুর ছবি, শ্রীকৃষ্ণের ছবি, অর্জুনের রথের ছবি, শঙ্করের খুব ভালো লাগে৷ সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের ছবি—তাকে ডাকেন৷ আয়, চলে আয়৷
যাব তো বটেই, তবে আগে আপনার মতো লেখাপড়া শিখি৷ চাকরি, ব্যবসা এসব করব না, ভিক্ষেও করব না৷ কী করব, তার আমি কী জানি৷ আপনি যা বলবেন তাই করব৷
অপর্ণা তাকে সাঁতার শিখিয়ে দিয়েছে৷ আর জলে ডুবে যাওয়ার ভয় নেই৷ শঙ্কর দিঘিতে নেমেছে৷ জলকে সবসময় মনে হয় অচেনা৷ পৃথিবীর অন্য কোনও জিনিসের সঙ্গে একেবারেই মিল নেই৷ বিশ্বাসও করা যায় না৷ তবে সাঁতার কাটতে খুব ভালো লাগে৷ ঘাট থেকে দূরে...আরও দূরে৷ এদিকটা যত দূরে চলে যাচ্ছে, ওদিকটা তত কাছে এগিয়ে আসছে৷ লোকজন, পথ-ঘাট সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যেন নতুন কোনও দেশ৷
এপারে আসতে-আসতে হাত ভেরে যায়৷ দম ফুরিয়ে আসে৷ তখন এপারের অপরিচিত ঘাটে খানিক পা ছড়িয়ে বসা৷ এদিকের মানুষের সব অন্যরকম কথা৷ কেউ আবার বলেন, বাহাদুর ছেলে বটে তুমি, এতটা সাঁতার কেটে এলে! তোমার মতো বয়েসে আমিও সাঁতরে এপার-ওপার করতুম৷ এখন আর পারব না৷ সে দম নেই, কাঁধ দুটোয় আর সে জোর নেই৷ এখন ওই কোনওরকমে বেঁচে থাকা৷ এই সব কথা শুনতে শঙ্করের ভালো লাগে না৷
দিঘির কিনারায় রাধুমাসির কুঁড়ে ঘর৷ একেবারে একা একটা মানুষ৷ সঙ্গী একটা গরু—গরু যে জায়গায় থাকে সেই জায়গাটাকে কেমন আশ্রম-আশ্রম মনে হয়৷ খড়ের গাদা৷ এপাশে-ওপাশে পড়ে আছে খড়ের কুঁচি৷ এত বড় একটা ডাশা৷ গরুর খাবার৷ ভেলিগুড়ের মিষ্টি গন্ধ৷ সাদা একটু গরু৷ পৃথিবীর কোনও খবরই রাখে না৷ গোবরের গন্ধ৷ দেওয়ালে চাকা-চাকা ঘুঁটে৷ গোয়ালের চালে লাউ গাছ৷ তিন-চারটে বড়-ছোট লাউ সবসময় পাতার ছায়ায় শুয়ে থাকে, বড়-বড় ফুলের দিকে তাকিয়ে৷ হয়তো ভাবে, ছিলুম ফুল, হয়ে গেলুম ফল৷ একপাশে ছোট্ট মাচায় উচ্ছে গাছ৷ ঝাঁক-ঝাঁক প্রজাপতির মতো হলুদ-হলুদ ফুল ঝাঁপিয়ে পড়েছে৷ গাছের উঁচু-উঁচু ডালের কোনও একটায় ছোট্ট ঘণ্টা বাঁধা আছে৷ টিংটিং শব্দ৷ এই রাধুমাসি একদিন ঘাটে এসে বললে, ‘কোত্থেকে এলি রে ছেলে! এ যেন আমার সেই পালিয়ে যাওয়া গোপাল৷ এখন চলো ঠাকুর৷ বেলা যে অনেক হল৷ ভোগের সময়৷’
শঙ্করের খুব ভালো লাগছিল৷ এইরকম সাদাসিধে দিদাদের মধ্যে অনেক গল্প থাকে৷ একটা ধবধবে সাদা ধুতি দিয়ে বললেন গায়ে জড়া৷ ভিজেগুলো দে রোদে দিয়ে আসি৷ এদিকে আয়, মাথাটা মুছিয়ে দি৷ তোর মায়ের কী ভাগ্য রে, এমন একটা ছেলে পেয়েছে! বাঃ, ধুতিটা পরে বেশ দেখাচ্ছে রে! নে বোস, এইবার ভোগ লাগবে৷ সরু চালের ভাত, খাঁটি গাওয়া ঘি, কলমি শাক, উচ্ছের ঝাল, লাউ দিয়ে মুগের ডাল আর দই৷ কেমন হবে?
এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে৷ হাতের রান্নাও খুব সুন্দর৷ ভেসে-ভেসে প্রজাপতি চলে আসছে৷ কাঠঠোকরার কাঠফাটা ডাক৷ এক জোড়া টুনটুনির কথা আর শেষই হতে চায় না৷ খাওয়ার পর দাওয়ায় একটা মাদুর পাতা হল৷
‘পান খাবি?’
‘না বাবা৷’
‘আমি একটা পান খাব৷ দ্যাখ না, কী কাণ্ড করে খেতে হবে৷ তবু খাব৷’ একটা ঝকঝকে সুন্দর ডাবর৷ তার মধ্যে ছোট-ছোট পানের খিলি৷ ছোট্ট একটা হামান-দিস্তা৷ ছ্যাঁচ-ছ্যাঁচ করে দু-খিলি পান ছেঁচা হল৷ পান-পান গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল দুপুরের বাতাসে৷ সুন্দর জর্দার গন্ধ৷ পান ছেঁচতে-ছেঁচতে বললেন, ‘বুঝলি গোপাল, ছিলুম ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মেয়ে, হলুম পণ্ডিতের বউ, এখন গয়লানি৷ দুধ বেচি, ঘুঁটে বেচি, শাক-ভাত খাই, দিনে একবার, আর হরে কৃষ্ণ গাই৷’
ছেঁচা পানের ছোট্ট একটা ডেলা শঙ্করের হাতের তালুতে রেখে বললেন, ‘মুখে রাখ, যা খেয়েছিস হজম হয়ে যাবে৷ বাবা, পেট পুরে খেয়েছিস তো!’
শঙ্কর বলল, ‘এঁটো বাসনগুলো ঘাটে গিয়ে মেজে ফেলি না!’
‘না গোপাল, এক্ষুনি পাগলি আসবে, নাচতে-নাচতে, গাইতে-গাইতে৷ ভাত খাবে৷
এদিক-ওদিক কাজ করবে৷ বকবক করবে৷ তারপর খড় কাটতে বসবে৷ তুই একটু আরাম করে বস তো৷ আমি হাওয়া করি৷’
‘আমাকে তুমি হাওয়া করবে, না তোমাকে আমি হাওয়া করব!’
‘কথা শোনো ছেলের৷ আমাকে বাতাস করবেন ভগবান৷ গাছের পাতার চামর দুলিয়ে৷’
দূর থেকে একটা গান ক্রমশই কাছে আসছে৷ বৃদ্ধা নড়েচড়ে বসলেন, ‘ওই আসছে ঝড়৷ সব এইবার নেচে উঠবে৷ ও যেই এসে দাঁড়াবে গরুটা অমনি হাম্বা করে উঠবে৷ তারপরে দেখবে আদরের ঘটা৷ গরুটা চেটে চুটে সারা শরীর ভিজিয়ে দেবে৷’
এমন সুন্দর একটি মেয়ে পাগলি হয় কী করে! শঙ্কর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল৷ গরুটা হাম্বা, হাম্বা করছে৷
যেন তার মা এসেছে৷ খোঁপাটা মাথার ওপর উঁচু করে বেঁধে, আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে শঙ্করের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘ছোট কত্তাটি এলেন কোন নগর থেকে৷ আবার পান খাওয়া হয়েছে৷ দেখি গাল দুটো একটু টিপে দি৷ টুসটুসে দুটো গাল৷’
বৃদ্ধা বললেন, ‘এই গায়ে হাত দিবি না৷ কী না কী কাপড়! আগে চান করে জামাকাপড় ছেড়ে আয়৷ বেলা কত হল, আর কখন খাবি! শরীরের ওপর আর কত অত্যাচার করবি সুধা!’
‘এ শরীর শকুনে খাবে৷ এর হাড়ে ঢাকের কাঠি হবে৷ বেশি কথা বলবে তো ছুঁয়ে দেব৷ আবার চান করতে হবে৷’
দুপাশে দুহাত ছড়িয়ে ঘুরপাক খেয়ে দিঘির দিকে চলে গেল৷ কিছুক্ষণ পরেই ঝপাং করে একটা শব্দ৷
‘ওই পড়ল, এখন কখন ওঠে!’
ও-পাড়ার সকলের রাধু মাসি, শঙ্করের দিদা৷ ওই বাড়িতে শঙ্করের একপ্রস্থ জামাকাপড় আছে৷ তার ওটাও একটা বাড়ি৷ যখনই সময় পায় যায়৷ চ্যাঁকচোঁক করে দুধ দুইতে শিখেছে৷ দেওয়ালে ঘুঁটে দেওয়াটাও শিখতে চেয়েছিল৷ দিদার ভীষণ আপত্তি৷ এ হাত আমার রাখাল রাজার হাত৷ দেশ-বিদেশে গিয়ে কলম ধরবে৷ কাগজের জমিতে কলমের লাঙল, বুদ্ধির বলদে হাল টানবে, অক্ষরের ফসল৷ শঙ্কর মই বেয়ে চালে উঠে যায়৷ লাউ পেড়ে আনে৷ ঢ্যাঁড়শ গাছ লাগিয়েছে৷ মাচা করেছে, শসাগাছ উঠছে৷ মাটি আর বীজ৷ সার হল গোবর৷ জীবন যেন নাচছে! হরি নাম শোনালে তরতর করে বাড়ে৷ আজ ছিল এখানে তো কাল চলে গেল ওখানে৷ বইতে যেসব জ্ঞান আছে, সেসব একরকম৷ মরা জ্ঞান৷ আর এই যে জ্ঞান, একেবারে জীবন্ত৷ গাছের ডালে, লতায় আর যেমন-তেমন করে হাত দিতে পারে না৷ এরা তো মানুষের চেয়েও জীবন্ত৷ বড় হচ্ছে, দিক পরিবর্তন করছে সূর্যের দিকে, আলোর দিকে চলেছে৷ কুঁড়ি, ফুল, ফল, বীজ৷ কতরকম! আম, জাম, কাঁঠাল, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, শসা, উচ্ছে৷ এক লেবুই কতরকম৷ বাঃ ভগবান, বাপরে জীবন৷
সুধা পাগলি পায়ের খোঁচা মেরে বললে, ‘বিড়বিড় করে কী বলছিস পাগলা?’
‘লাউ, কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, পাতিলেবু, করমচা৷’
‘গাধা, গরু, ঘোড়া, ছাগল৷’
‘শসা, পটল, উচ্ছে, আলু৷’
‘পানকৌড়ি, কাঠঠোকরা, বউ কথা কও, টুনটুনি৷’
দিদা মাদুরে শুয়েছিলেন, একটু আমেজ এসেছিল৷ চোখ না খুলেই বললেন, ‘কী হচ্ছে! দুটো পাগল নিয়ে মহা জ্বালা!’
সুধা হুড়ুম করে রাধুমাসির ঘাড়ে গিয়ে পড়ল৷ রাধুমাসির চিৎকার, ‘পাগলি, কাতুকুতু দিবি না৷ কামড়ে দেব৷’
‘তোমার দাঁত আছে যে কামড়াবে? চলো তোমাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে আসি৷’
‘যদি পারিস তো আপদ চুকে যায়৷ তোদের হাত থেকে শান্তি পাই৷’
‘শান্তি পাওয়াচ্ছি৷ ওঠো শিগগির, আমার চুল বেঁধে দাও৷’
‘চুল শুকলো না, চুল বেঁধে দাও!’
‘চুল শুকিয়ে দাও৷’
‘আমি ভগবান না কি? রোদ হয়ে চুল শুকিয়ে দেব?’
‘আজ যদি ক্ষীর না খাওয়াও তা হলে ওই চালায় তুলে দেব, লাউ হয়ে সারারাত গড়াগড়ি যাবে৷ বেশ হবে, বেশ হবে৷’
ক্ষীর করতে গেলে কতটা দুধ লাগবে জানিস?’
‘তোমার গোরু থেকে আমি বের করে দেব৷ কম পড়লে জল মিশিয়ে দেব৷’
‘ওরে আমার বুদ্ধির বেষ্পতি রে! নরম আঁচে বসিয়ে দুধটাকে জ্বাল দিতে হয়৷ সব জল উড়ে গেলে তবেই না ক্ষীর৷’
দুপুরবেলা বাড়িটা বেশ নির্জন হয়ে যায়৷ পরানের বয়েস তো কম হল না৷ খাওয়াদাওয়ার পর ইজি চেয়ারে কিছুক্ষণ ঝিমিয়ে নেন৷ মাঝেমধ্যে ছোটখাটো স্বপ্নও দেখে ফেলেন৷ স্বপ্নের একটা আলাদা আকর্ষণ৷ কোথাও না গিয়েও কত সুন্দর-সুন্দর জায়গায় যাওয়া যায়৷ স্ত্রী অরুণা দুটো বালিশ দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে বই পড়েন৷ বইয়ের নেশা খুব৷ সেইরকম মনে রাখতেও পারেন৷
অপর্ণার একটা সুন্দর হাত-বাক্স আছে৷ মাসে একবার-দুবার বাক্সটা খোলে৷ অনেক কাগজপত্র আছে৷ বাক্সটা আজ খুলেছে৷ পোস্টকার্ডে লেখা চিঠি৷ তা কুড়ি-পঁচিশটার কম নয়৷ মোটা সুতো দিয়ে বাঁধা৷ শঙ্কর এক পাশে বসে আছে৷ খুব মন দিয়ে একটা বই পড়ছে—উপনিষদের গল্প৷ স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়েছে৷
অপর্ণা বললে, ‘এখনি তোর একেবারে ভীষণ পড়ার চাড় এসে গেল৷ এদিকে আয় না৷’ শঙ্কর বসে-বসেই সরে এল৷ পিঠে চুল ছড়িয়ে দিয়েছে৷ খোপ-খোপ ডিজাইনের শাড়ি৷
‘এই বাক্সটার মধ্যে আমার সব কিছু৷ রাক্ষসীদের প্রাণভোমরা কৌটোর মধ্যে থাকত৷ রূপকথায় পড়িসনি?’
‘পড়েছি৷’
‘ঠিক সেইরকম৷’
‘ওটা কী? ওই বড় কাগজটা৷ সার্টিফিকেট মনে হচ্ছে৷’
অপর্ণা তাড়াতাড়ি লুকোবার চেষ্টা করছে৷ শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢাকছে৷
‘শিগগির দেখাও৷’
‘না, না, ওটা সিক্রেট৷’
শঙ্কর দেখে অবাক৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি৷ অপর্ণাদি বিএ পাশ৷
শঙ্করের এত আনন্দ হয়েছে, চোখে জল এসে গেছে৷
‘তুমি কী গো! তুমি কী?’
‘এর কোনও দাম নেই রে শঙ্কর৷ কথাটা ভালো করে বোঝ—কাচ কখনও হিরে হয় না৷ মানুষ চিনতে পারে না বলেই ঠকে যায়৷ একটা ভালো মানুষ হতে হবে৷ আর আনন্দ—আনন্দ হল ঝলমলে রোদের মতো৷ মন হল সুন্দর একটা প্রজাপতি৷ ফুল থেকে ফুলে, পাতা থেকে পাতায় ভেসে-ভেসে চলে যায়৷ ঘুড়ির মতো উড়তে থাকে নীল আকাশে৷ টান, টান সুতোয়৷’
‘তুমি এখানে কেন?’
‘তুই এখানে ছুটে-ছুটে আসিস কেন? এখানে দুটো ভালো মানুষ আছে তাই তো!’
‘ঠিক৷’
‘তোর বাবা নেই৷ আমার মা-বাবা দুজনেই নেই৷ আমার অতীত জানতে চাস না শঙ্কর৷ তোর ঘেন্না করবে৷’
‘তোমাকে ঘেন্না করব? জানো ভেতরে-ভেতরে আমি অনেক বড় হয়ে গেছি৷ তুমি আমার চোখে একটা পরি৷ আমি রোজ রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখি৷ নীল জলে ছোট-ছোট সাদা ঢেউ, অনেক-অনেক চাঁদের আলো, চারপাশে কত-কত গাছ, তুমি জল থেকে উঠছ, চোখ দুটোয় হিরে বসানো, মুক্তোর দাঁত, কী ফরসা, ঢেউয়ের মতো চুল৷ তোমার কাছে এলে আমার কেন এত ভালো লাগে! আমার বলতে লজ্জা করে৷’
‘চল, চল, তোকে সাইকেল শেখাব, তারপর ড্রাইভিং, তারপর শ্যুটিং৷’
‘তুমি এইসব জানো?’
‘কিছু জানি, কিছু জানি না৷ সব শিখতে হবে৷ বাইরের শিক্ষা, ভেতরের শিক্ষা৷ শিখতে হবে আত্মরক্ষার কায়দা৷ তোকে আমার শরীরে একটা দাগ দেখাব৷ ভয় পাবি না৷ দরজাটা বন্ধ করে আয়৷’ শঙ্কর দরজাটা বন্ধ করে ভয়ে-ভয়ে ফিরে এল৷ অপর্ণা ততক্ষণে মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে৷ পা দুটো টান-টান৷
‘আয়, দেখ৷ ভয় পাবি না৷’
অপর্ণা পেটের কাপড়টা সরাল৷ ‘ঠিক এই জায়গাটায় ছুরিটা ঢুকিয়ে আড়াআড়ি টেনে দিয়েছিল যতটা সম্ভব নীচে একেবারে—এই দ্যাখ কুঁচকি পর্যন্ত৷ আমি জ্ঞান হারাইনি৷ একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি৷ বুঝতে পারছি একটা-একটা করে ভেতরে যা আছে কাটছে৷ লিভারটা একটুর জন্যে বেঁচে গেল৷ আমি ভয় পাইনি৷ ভয় পেলে মরে যেতুম৷ আমি রমণ মহর্ষির শিষ্য৷ তিনি বলে গেছেন, প্রত্যেককে তার পাওনা বুঝিয়ে দেবে৷ আক্রমণকারীকে আঘাত করার সব চেয়ে দুর্বল জায়গা হল তার দুটো চোখ৷ লোকটার চোখ দুটো আমি খুবলে নিয়েছিলুম৷’
শঙ্কর সাহসী৷ কিন্তু তার মাথা ঘুরছে৷ একটা রাক্ষস অত সুন্দর জায়গাটা চিরকালের জন্যে কী করে দিয়েছে! অপর্ণার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে সে কাঁদছে৷ ঠিক, ঠিক বলেছে—একটা বন্দুক চাই৷ শ্রীরামচন্দ্র ভগবান, সাধু-সজ্জনের জন্যে ন্ক ধর্ম কথা, রাক্ষসদের জন্যে অস্ত্র৷
‘তুমি কী মরেই যেতে!’
‘মরিনি৷ তোর সঙ্গে দেখা হবে বলে৷ আমি দেখব, তোকে দেখব৷ তুই আমার স্বপ্ন৷ তুই আমার একমাত্র বন্ধু৷ আর কিছু জানতে চাস না৷ সবকথা বলা যাবে না৷ এইটুকু জেনে রাখ, আমি লুকিয়ে আছি৷ এইভাবে যদ্দিন থাকা যায়!’
বাইরে পায়ের শব্দ৷ চেনা পা৷ সদানন্দময় পরান আসছেন৷
‘দরজা খোল, দরজা খোল৷’
অপর্ণা বাক্সটা খাটের তলায় ঠেলে দিল৷
পরানের গলা, ‘বাড়িটা অসময়ে এমন নিঝুম হয়ে গেল কেন? কোথায় সব গেলে?’
অপর্ণা বললে, ‘আমরা সব এখানে ঢুকে আছি৷ উপনিষদের গল্প শুনছি৷’
‘বাঃ! স্বার্থপরের মতো নিজেরাই সব ভালো-ভালো জিনিস শুনছ৷’
‘আপনিও আসুন না৷’
‘ঘরে কেন? বাগানে চলো৷’
পশ্চিমে ঢলেছে সূর্য৷ পাখিদের মতো বাসায় ফিরছেন৷ সারাদিন অনেক তাপ দিয়েছেন এদিকটায়৷ খাল, বিল, ডোবা, দিঘির অনেক জল শুষেছেন৷ ভীষণ তেষ্টা৷ শেষ বক শেষ মাছটা মুখে নিয়ে বাসায় ফিরছে আজকের মতো৷ হাঁসগুলো চিন্তা করছে জল ছেড়ে ওঠার সময় হল কি!
পরান বেশ জুতসই করে বসেছেন৷ খুব দুঃখ তাঁর, হিমালয়টা অনেক দূরে৷ কাছাকাছি হলে এই পড়ন্ত বেলায় পাহাড়ের চড়াই-উতরাইয়ে কী সুন্দর হাঁটা যেত৷ বড়-বড় পাইন গাছ৷ ধ্যানমগ্ন পাহাড়৷ ঝরনা শুধু ঝরেই চলেছে৷ রাতের জীবজন্তুরা সাজগোজ করছে৷ এলাকার দখল নেবে৷ আর দেরি নয়, এবার পাহাড়ে যেতেই হবে৷ পাহাড়ের ঢালে একটা কাঠের বাড়ি, কাঠের মেঝে৷ হুহু বাতাস৷ বড়-বড় ফোঁটার বৃষ্টি৷ কুঁজো হয়ে ভাল্লুক কেমন হাঁটে, যেন গুরুতর কোনও কাজে চলেছে৷ চশমা চোখে বাঁদর গাছের ডালে বসে দেখছে৷ ওই দিকের পাহাড়ে চ্যাঁচ্যাঁ করে তিতির ডাকছে৷
‘নাঃ, আর ভালো লাগছে না৷ একটুও না৷’
কিছু দূরে একটা মসজিদ আছে৷ আজানের শব্দ উঠল৷ আকাশের তলায় পৃথিবীর লক্ষ-কোটি মানুষ ভীষণ একা৷
শঙ্কর বললে, ‘আজ তোমার মনটা খুব খারাপ৷ আমার সঙ্গে চলো, একটা জায়গা থেকে তোমাকে বেড়িয়ে আনি৷’
‘বা রে ছেলে, আমার মনটাও আজ মেঘলা, কেন কে জানে! আমাকে ফেলে রেখে বেড়াতে চললি৷’
‘তুমিও চলো৷’
‘মাকে এই সন্ধেবেলা একা রেখে যাব?’
‘তা হলে?’
‘তা হলে তোমরা আরামসে ঘুরে এসো৷’
দিঘির দুপাশ দিয়ে দুটো পায়ে-চলা পথ চৈতন্য পল্লিতে এসে পড়েছে৷ যে জায়গায় এসে মিলেছে, সেই জায়গাটা যেন বিশাল একটা উঠোন৷ সব মানুষের মিলন স্থান৷ ছোট-ছোট ছেলেদের খেলার জায়গা৷ বল জাতীয় সব কিছু এখানে নিষিদ্ধ৷ কেন? কেউ বলতে পারে না৷ মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শক্তপোক্ত একটা লম্বা বাঁশ৷ সারারাত সেই বাঁশের আগায় একটা লণ্ঠন জ্বলে৷ কপিকল দিয়ে নামানো-ওঠানো হয়৷ আজ ওই প্রাঙ্গনে জন্মাষ্টমীর মেলা বসেছে৷ একটা মঞ্চ তৈরি হয়েছে৷ রাত আটটার সময় মন্দিরের আরতির পর কৃষ্ণযাত্রা হবে৷
পরান বললেন, ‘খুব ভালো দিনে নিয়ে এসেছিস শঙ্কর৷ অনেকদিন পর অনেক লোক দেখছি৷ কেউ আর ঘরে নেই৷ সবাই বেরিয়ে এসেছে৷ কত কী এসেছে৷ ওই কৃষ্ণনগরের নানারকম পুতুল আমার খুব ভালো লাগে৷ হাঁ করে তাকিয়ে থাকি৷ আজ আমরা অনেক কিছু কিনব৷ তোর মতো ছোট হয়ে যাব৷’
‘নিজেদের জন্যে কিছু কিনব না৷’
‘তা হলে?’
‘তুমি তো মেলায় তেমন যাও না৷ আমি যাই৷ কত-কত মেলা৷ গিয়ে দেখি মেয়েরা এটা-ওটা নেড়েচেড়ে দেখছে৷ আর যেই দাম শুনছে আস্তে-আস্তে নামিয়ে রেখে মুখটা কেমন করে সরে যাচ্ছে৷’
‘তুই এইভাবে দেখিস? তোর ভেতর কে বসে আছে রে শঙ্কর!’
‘ওসব বোলো না৷ আমি স্বামীজির মতো সন্ন্যাসী হব৷ ওই লাঠিটা আমার চাই৷’
‘ওই লাঠিটা দিয়ে যত ভণ্ডামি আর চোট্টামি ঠেঙিয়ে তাড়াতে পারবি! একদল খেয়ে-খেয়ে মরছে, আর একদল না খেয়ে৷ নির্লজ্জ বড়লোকদের কবে লজ্জা হবে রে শঙ্কর?’
‘হবে না দাদাই, কোনওদিন হবে না৷ ওটা একটা ভয়ঙ্কর অসুখ৷ দাদাই ওই মেয়েটার দিকে নজর রাখো৷ সাজার জিনিস দেখছে৷ হার, দুল, চুড়ি৷ অনেকক্ষণ ধরে নাড়াচাড়া করছে৷ সঙ্গে যে টাকা আছে, তাতে কোনওটাই হবে না৷’
‘তা হলে? কিনে দেব?’
‘নেবে না৷ অন্যরকম ভাববে৷’
‘তা হলে?’
‘দাঁড়াও৷’
শঙ্কর দোকানে ঢুকে বিক্রেতাকে বললে কানে-কানে—‘যা চাইছে নিতে বলুন, যা দেয় দিক, বাকিটা আমরা দিয়ে দোব৷ ওকে বুঝতে দেবেন না৷’ মেয়েটি হাসি-হাসি মুখে কেনাকাটা করছে৷ হাত তুলে-তুলে এটা-ওটা দেখাচ্ছে৷ পরান বললেন, ‘শঙ্কর! তুই আজ আমাকে একটা নতুন পথের সন্ধান দিলি৷ আজ থেকে তুই আমার গুরু৷ এতকাল নিজের জন্যে বেঁচেছি, এইবার অন্যের জন্যে বাঁচব৷’ ‘এইসব কথা বোলো না তো! আমার শুনতে ভালো লাগে না৷ জানো তো, সেদিন ওই হরিসভায় এক সাধু বলছিলেন, শুরুটা কিছুই নয়, শেষটাই সব৷’
মেয়েটি এক লাফে দোকান থেকে বেরিয়ে এল৷ আনন্দ ধরে রাখার জায়গা পাচ্ছে না৷ পারলে একটু নেচে নেয়৷ পরান জিগ্যেস করলেন, ‘কীসব কিনলে? দারুণ, দারুণ জিনিস! পয়সা থাকলে আমিও কিনতুম!’
‘যাও না, যাও না৷ কাকুটা খুব ভালো৷ আমাকে বললে, ‘‘পয়সার জন্যে ভেবো না৷ যা তোমার পছন্দ বেছে নাও৷’’ আমার কাছে মাত্র কুড়িটা টাকা৷ সেই কবে থেকে জমিয়েছি৷ মেলায় কিছু কিনব বলে৷ কুড়ি টাকায় কত কী হয়েছে৷ বললে, সব তোমাকে কেনা দামে দিলুম৷ বউনির সময় তো! দেখবে তুমি, কী-কী কিনেছি! ওই দিকে চলো, কোথাও বসে দেখাচ্ছি৷’
‘সুন্দর মেয়ে, তোমার নাম কী গো?’
‘রেখা গোস্বামী, বাবার নাম, প্রভাত গোস্বামী, মায়ের নাম উমা৷ বাবা আদর করে ডাকে, উআ, উআ! তোমার পেছন-পেছন হ্যাংলার মতো ঘুরছে, ছেলেটা কে?’
‘এই! ও হ্যাংলা নয়৷ আমার নাতি শঙ্কর৷’
‘কেমন ছেলে, ভালো? না গুন্ডা? লেখাপড়া করে?’
‘করে৷ খুব ভালো ছেলে৷’
‘হ্যাঁ, পড়াশোনা না করলে নিজেই মরবে৷ যা দিনকাল পড়েছে বলো? তোমাদের কাল শেষ৷ মরেচে!’
‘কী হল আবার?’
‘ওই দ্যাখো না, কড়ায় জিলিপি ঘুরছে—চাকা-চাকা চাকার মতো৷ মা ঠিকই বলে, রেখা রে! তোর বড় নোলা!’
‘আমি খাওয়ালে খাবে?’
‘না, একা খাব কী করে! বাড়িতে আমার একটা বোন আছে, মা, ঠাকুমা৷ একা-একা খেলে চলবে?’
‘এক চ্যাঙারি কিনে দি৷ সবাই মিলে খাবে৷’
‘তবেই হয়েছে৷ উআকে চেনো না৷ পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নেবে—তুই গোস্বামী বংশের মেয়ে হয়ে ভিক্ষে করেছিস? তুমি বুঝি খুব বড়লোক?’
‘কী করে বুঝলে?’
‘সোনার চশমা৷ ধবধবে পাঞ্জাবি, ঝকঝকে চটি৷’
‘ধুস! বড়লোকরা মেলায় আসে না৷ তাদের অত সময় নেই৷’
‘ঠিক বলেছ৷ মা বলে হাঙরের জাত—খালি টাকা-টাকা—গপগপ৷ এখানে বোসো৷ একটু ঘাস-ঘাস আছে৷ ওই দ্যাখো নাগরদোলা৷ চড়েছ কোনওদিন?’
‘তুমি?’
‘বাবা, ভয় করে? এই হুস করে উঠল তো হাস করে পড়ল৷ তোমাকে দাদু বললে রাগ করবে না কি?’
‘রাগ করব কেন?’
‘ও বাবা! জানো না, বুড়োদের দাদু বললে মারতে আসে, কে তোর দাদু? তোর বাপকে দাদু বলগে যা৷ দ্যাখো না, চুলে কালো রং লাগিয়ে হ্যাহ্যা করে ঘোরে৷ মা কী বলে জানো! যারা চুল রং করে তাদের চরিত্র নিকেল৷’
‘নিকেল মানে?’
‘ভালো নয় গো৷ ব্যাড৷ তুমি আমার ভালো দাদু৷ গুড বয়৷’
‘তুমি আমার গুডগার্ল৷’
‘না গো, অঙ্কে ভীষণ কাঁচা৷ বানানে উইক৷ কত মার খাই৷ টেনে-টেনে আদ্দেক চুল ছিঁড়েই দিলে৷ তবু মানু বানানে দন্ত্যস দাঁত বের করেই রয়ে গেল৷ এ মেয়ের ভবিষ্যৎ ঘোর অন্ধকার৷ বাড়ি-বাড়ি বাসন মাজতে হবে৷ বরাত গো দাদু—বরাত! কপাল যার মন্দ—তার তুমি কী করবে!’
ছোট্ট-ছোট্ট নাকের ফুটো দিয়ে ভোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরল৷
‘নাও কোঁচাটা বিছিয়ে দাও, জিনিসগুলো দেখাই৷ আর ক’দিনই বাঁচব!’ পরান বললেন, ‘এসব কী কথা! আমার মনে কষ্ট দিচ্ছ!’
‘না গো, আমার মতো মেয়ের বেঁচে থাকা উচিত নয়৷ সুলেখা অঙ্কে কত পায় জানো? নব্বই, ইংরিজিতে আশি৷’
‘তুমি আমার নাতি শঙ্করের সাহায্য নাও৷ ও অঙ্কে একশোতে একশো৷’
‘ওকে কাছে আসতে বলো না, দূরে-দূরে ঘুরছে কেন? অহংকার!’
পরানের ডাকে শঙ্কর কাছে এসে বসল৷ মেয়েটি দেখাতে লাগল৷
‘এই দ্যাখো, এই হারটা আমার মায়ের জন্যে৷ মেয়েদের গলায় একটা হার না থাকলে কেমন খালি-খালি লাগে৷’ গলাটা খাটো করে বললে, ‘মায়ের গলার সোনার হারটা সেবার বিক্রি হয়ে গেল না, বাবার অসুখের সময়৷ বাইপাস হল৷ অনেক টাকা গো৷’
‘বাবা এখন ভালো আছেন তো!’
‘সেই আগের মতো কি আর হবে! সাবধানে থাকতে হবে৷ এই দ্যাখো, এই দুল আমার বোনের জন্যে৷ কান ফুটো করিয়েছেন তিনি৷ দুল-দুল করে মায়ের মাথা খাচ্ছে৷ আচ্ছা বলো, বাবা টাকা না দিলে মা কোথা থেকে টাকা পাবে৷ মা কি চাকরি করে! বাচ্চা তো! এখনও বুঝতে শেখেনি৷ তিনটে আংটি কিনলুম৷ বেশ দেখতে না?’
‘খুব সুন্দর৷ তোমার পছন্দ আছে৷’
‘সে আছে৷ মা বলে, তোর পছন্দ খুব৷ একটা কথা বলব, রাগ করবে না তো!’
‘বলো না, রাগ করব কেন?’
‘তুমি তো এই ভালো ছেলেটাকে কিছুই কিনে দিলে না৷ এই আংটিটা আমি ওকে দেব?’
‘আগে বলো তিনটে কার-কার জন্যে কিনেছিলে?’
‘একটা বাবার জন্য, একটা মায়ের জন্য আর একটা বলতে পারো আমার জন্য৷ ভেবে দ্যাখো সেই কবে ওরা দুজন বিয়ে করেছে, একবারও বিবাহবার্ষিকী হল না৷ আমি করব৷ সারপ্রাইজ৷ ঠাকুমাকে বলেছি, আমাকে তুমি একশোটা টাকা দেবে—তোমার ছেলের বিবাহবার্ষিকী করব৷ সে কী ফিকফিক হাসি৷ কী, খারাপ হবে? তুমি কী বলো?’
‘খুব ভালো হবে৷’
‘বেশি কিছু করব না৷ দুটো মালা কিনব৷ আর যা থাকবে লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম আর মিষ্টি আর দু-খিলি পান৷ কেমন হবে?’
‘চমৎকার৷ তাহলে কার আংটিটা দেবে?’
‘কার আবার? আমারটা৷ আমার আবার আংটি? লেখাপড়া পারি না, মুখ্যু৷’ পরান অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ চোখ ছলছল করছে৷ মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘আমি বলছি, তুমি খুব বড় হবে৷ আমি তোমাকে পড়াব৷ তুমি রোজ আমার কাছে পড়তে আসবে৷ তোমার বাড়িতে গিয়ে তোমার বাবা-মাকে বলে আসব৷’
‘তোমার বাড়ি কোনটা?’
‘ওই যে দিঘির ওপারে দু-পাশে দুটো কদম গাছ, মাঝখানে সাদা বাড়ি৷ লেখা আছে ‘রাম ভবন’৷’
‘আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো, তুমি কি পরানদাদু!’
‘হ্যাঁ মা৷’
‘তাই বলো, আমি সেই থেকে ভাবছি, এত ভালো একটা লোক কোথা থেকে এল রে ভাই! ইশ্!’ মেয়েটি দু-হাতে মুখ ঢাকল, যেন খুব একটা অপরাধ করে ফেলেছে৷
‘কী হল বলো তো?’
‘আর কী হল! সেই এক ভুল! মা কি সাধে বলে—এত মার খাস তবু তোর আক্কেল হয় না রে! মা বলেছে, কোনও মানুষকে লোক বলবি না, অসম্মান করা হয়, সেই তোমাকে লোক বলে ফেললুম৷ ছি, ছি, রেখা তোর মরণ হয় না রে!’
‘ও নিয়ে অত ভেবো না৷ রেখার মানে জানো?’
‘হ্যাঁ, দাগ, লাইন৷’
‘তাহলে? তোমাকে একটা দাগ রেখে যেতে হবে৷’
‘আমার দাদু তো শিল্পী ছিল৷ কত-কত সুন্দর ছবি! এখন তো খুব বয়েস৷ হাত কাঁপে৷ বলে, উঃ বয়েসই হল মানুষের এক নম্বর শত্রু৷ একটা রেখাও আর সোজা টানতে পারি না, কেঁপে যায়৷ ওই—আমার নাম রেখা৷ খুব একটা খারাপ নাম নয়, কী বলো?’
‘খুব ভালো নাম৷ শিল্পীর দেওয়া নাম কখনও খারাপ হয়!’
‘শোনো, তুমি না খুব চালাক, আংটিটা ওকে আমি দেবই দেব৷ আমাকে চেনো না৷ আমি যা ভাবি তাই করি৷’
‘সে খুব ভালো৷ তা হলে ও-ও তোমাকে একটা আংটি দেবে৷’
‘ও বাবা! সে তো বিয়ে গো!’
‘বিয়ে নয়, এনগেজমেন্ট৷’
‘সে আবার কী?’
‘ও সায়েবরা বলে—একটা কথা দেওয়া রইল৷ পরে বড় হয়ে যদি মনে করো তাহলে বিয়ে করতে পারো৷ সে অনেক পরের কথা৷ তবে, আমার ইচ্ছেটা বলে রাখি—তুমি আমার নাতবউ হলে খুব—খুব খুশি হব৷’
‘দেখো বাবা, তোমরা কী করবে, মুখ্যু নাতবউ!’
‘মুখ্যু তো থাকবে না৷’
এক মুখ লজ্জা নিয়ে মেয়েটি বললে, ‘একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু লজ্জা করছে৷’ পরান সাহস দিলেন, ‘বলে ফ্যালো৷ দাদুর কাছে সব কিছু বলা যায়৷’
‘তাহলে চোখ বুজিয়ে বলেই ফেলি, ওকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে৷ একবার জিগ্যেস করো তো, আমাকে পছন্দ হয়েছে কি না৷’
শঙ্কর দুদ্দাড় করে একদিকে ছুট লাগাল৷
রেখা বলল, ‘পালাল কেন?’
‘লজ্জা হয়েছে৷’
‘সকলেরই লজ্জা হয়, কী বলো৷ তাহলে আমি এখন কী করি!’
‘তুমিও যাও৷ ধরে আনতে পারছ না?’
‘খুব ছটফটে, তাই না? এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারে না৷ এমন করলে লেখাপড়া হবে! আমার মা কী বলে জানো, তুই পড়িস-না-পড়িস বই হাতে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকার অভ্যাস কর৷ কাশীর পণ্ডিতের নাতনি৷ বাপরে! তুমি তোমার নাতিটাকে বেশি আদর দিও না৷ মাঝে-মাঝে শাসন করবে৷ শাসন আর আদর দুটোই চালাবে দফায়-দফায়৷ মা কী বলে জানো—রুটি দু-পিঠে সেঁকতে হয়!’
‘তোমার মা আসবেন না? আজ এখানে কত কী হবে৷ আমি ভাবছি সারারাত থাকব৷ সেই কবে রাত জেগে যাত্রা দেখেছি মনেই পড়ে না৷ আজ যাত্রা দেখব৷ পরেশ অধিকারীর যাত্রার দল খুব নামকরা৷’
‘শোনো না—আমি তো তোমার ঘরেরই মেয়ে৷ ধরো, আর দশবছর পরে তোমার কাছে সবসময়ের জন্যে এসে যাব, তাই তোমাকে বলতেই পারি৷ তোমার বয়েস হয়েছে, এখন রাত জাগবে না—ঠিক দশটার মধ্যে আলো নিবিয়ে বিছানায়৷ নিয়ম করে না চললে শরীর থাকবে কী করে!’
হঠাৎ কথা বন্ধ৷ মুখে দুঃখের ছায়া৷ পরান দেখছেন মেয়েটির চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে৷
উদ্বিগ্ন হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল দিদি! চোখে জল এল কেন?’
ধরা-ধরা গলা৷ রেখা বললে, ‘দশটা বছর, দশটা বছর! তখন কি তুমি...৷’
আর বলতে পারল না৷ মাথাটা নেমে এল বুকের কাছে৷
পরান কাছে টেনে নিলেন মেয়েটিকে৷ মাথাটা বুকের কাছে৷ অনেক চুল ছড়িয়ে আছে পিঠে৷ মেয়েটি বড় হলে বেশ বলিষ্ঠ হবে৷ শরীরের গঠন তাই বলে৷ মেয়েরা নদীর মতো৷ দুকূল ছাপানো আবেগ৷ এরা আছে বলেই ঘরসংসার৷ পাথরের বুকে ঝরনা৷ রেখা বললে, ‘দেখছ তো এল না৷ পালিয়ে গেল৷’
‘আসবে, আসবে, না এসে যাবে কোথায়! তোমার জন্যেই গেছে৷’
কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি শঙ্কর এল৷ মেলার ওই মাথায় আরও ভালো একটা দোকান ‘নবদ্বীপ গোল্ড’৷ সেই দোকানে সবসময় নরম সুরে সানাই বাজছে, যেন বড়লোকের বিয়ে বাড়ি৷ একজন সুন্দরী মেয়ে সবরকমের গয়না পরে দোকানে রাজকন্যার মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ সবাই হাঁ করে দেখছে৷ তাকাতে-তাকাতে যেতে গিয়ে ইটে ঠোক্কর খাচ্ছে৷ জায়গাটা খুব জমে গেছে৷ লাল পাথর বসানো একটা আংটি কিনেছে৷ ছোট্ট একটা ভেলভেটের বাক্স দিয়েছে৷ নানারকম দেখে পছন্দ করে কিনেছে৷ ডিজাইনটা খুব সুন্দর৷ তিন বছরের গ্যারান্টি৷ তখন তো শঙ্কর কলেজে পড়বে৷
শঙ্কর বলল, ‘এই যে, আপনার আংটি পরার আঙুলটা বাড়িয়ে দিন৷’
রেখা পরানকে বললে, ‘দেখেছ, এখন থেকেই কীরকম ভাবে কথা বলছে! তুমি বকবে না?’
‘নিশ্চয়ই বকব৷ এই কেন রে! তুই ওইরকম করে কথা বলছিস কেন?’ আংটিটা যখন পরাচ্ছে, ঠিক তখনই শ্যামসুন্দর জিউর মন্দিরে কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি শুরু হল৷ রেখা বললে, ‘এ কী গো! আমরা রাধাকৃষ্ণ না কি!’ তারপর নিজের মনেই বলতে লাগল, ‘নাঃ, ছেলেটার পছন্দ আছে ভাই৷ দারুণ, দারুণ৷’ পরানের চোখের সামনে আঙুলটা তুলে ধরে বললে, ‘দ্যাখো, দ্যাখো৷ ভালো মানিয়েছে না?’
‘খুব ভালো৷’
‘এবার তাহলে আমি পরাই৷ মহারাজকে আঙুলটা দিতে বলো৷ আচ্ছা, কোনও মন্ত্রতন্ত্র নেই?’
‘ওই তো মন্ত্র, মন্দিরে আরতি!’
মেয়ের কী কথা! নিজের মনেই শুনিয়ে-শুনিয়ে বলছে, ‘দেখি এখন কোথায় যাই, বাপের বাড়িতে না শ্বশুর বাড়িতে!’
পরান হাসছেন আর বলছেন, ‘এখন বাপের বাড়িতে বড় হও, তারপর পালকি চেপে শ্বশুর বাড়িতে আসবে৷’
‘কাল থেকে আমি কি পড়তে যাব স্যার?’
‘ইয়েস ম্যাডাম৷’
‘কখন?’
‘তুমিই বলো৷ তোমার স্কুল আছে৷ ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করা আছে৷’
‘সন্ধে সাতটা?’
‘ভালো সময়৷’
‘সব বই আনব?’
‘হ্যাঁ, সব বই৷’
খুব খুশি মনে শঙ্করকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন৷ ইচ্ছে আছে যাত্রা দেখবেন৷ আবার ভাবছেন অরুণাকে একা রেখে স্বার্থপরের মতো যাওয়াটা ঠিক হবে না৷ শঙ্করের মা মামার বাড়িতে৷ বিষয় সম্পত্তি ভাগ হচ্ছে৷ বড়মামা মাকে ভালোবাসেন৷ মাকে একটা অংশ দেবেন৷ তিনি চাইছেন মাকে নিজের কাছে আনতে৷ হুগলির নাম করা ডাক্তার৷ বিয়ে করেননি৷ ইচ্ছে ছিল, পর্যটক হয়ে বিশ্বভ্রমণ করবেন৷ হয়তো করবেন, এখনও করা হয়নি৷ ভাগনে শঙ্করকে ভীষণ ভালোবাসেন৷ বড় একজন ডাক্তার করার ইচ্ছে৷ রিসার্চ করবে৷ এমন একটা কিছু আবিষ্কার করবে—জগতের তাক লেগে যাবে৷ মানুষটা সারাদিন রুগি দেখেন, আর স্বপ্ন দেখেন৷
শঙ্কর বাড়িতে এল৷ পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট একতলা বাড়ি৷ সামনে, পেছনে খানিক জায়গা৷ বড়, ছোট, মাঝারি কিছু গাছ৷ বাবার গাছের শখ ছিল৷ ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ বাড়িটার সামনে সাঁসাঁ একটা মাঠ৷ বিকট একটা পোড়ো বাড়ি৷ কোনও এককালে আগুন লেগেছিল৷ বাড়িটা ঝলসে গেছে৷ রাত্তির বেলা দেখলে ভয় করে৷ ভেতরে কারা যেন অট্টহাসি হাসে গভীর রাতে৷ প্রেতের চোখে ঘুম নেই৷ শঙ্করদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা খড়খড়ে রাস্তা পশ্চিম দিকে কুমোর পাড়ায় গিয়ে ঢুকেছে৷ বলাই পালের মূর্তি জগদ্বিখ্যাত৷ মানুষটা কাঁটায়-কাঁটায় সাত ফুট লম্বা৷ তাঁর সবই সাত৷ সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠেন৷ সাত মাইল হাঁটেন৷ সাত নম্বর জুতো পরেন৷ রাত্তিরবেলা সাতখানা রুটি খান৷ সাতটি মা দুর্গার মূর্তি গড়েন৷ সব মিলিয়ে পরিবারে সাতজন মানুষ৷ সাত বছর বয়সে প্রথম মূর্তি গড়েছেন—শ্রীগণেশ৷ পূর্বপুরুষ সাতক্ষীরা থেকে এই বাংলায় আসেন৷
এই রাস্তাতেই শঙ্করদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বাড়ি৷ ভীষণ গম্ভীর মানুষ৷ কারও সঙ্গে কথা বলেন না৷ মুখ গোঁজ করে রাস্তা হাঁটেন৷ কেউ কিছু জিগ্যেস করলে বুকের কাছে ডান হাতটা তুলে বুদ্ধদেবের মতো একটা ভঙ্গি করেন৷ সকলেই বলে কোনও কারণে ভীষণ মনখারাপ নিয়ে জন্মেছেন, মনখারাপ নিয়েই মারা যাবেন৷ কাতুকুতু দিলেও হাসেন না৷ মনে হয় গত জন্মে পরীক্ষাতে কেবলই ফেল করতেন৷ এ জন্মে শিক্ষক হয়ে তাই সকলকেই ফেল করান৷ সহ প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, এরকম করলে আপনার স্কুল উঠে যাবে৷ উত্তরে বলেছিলেন, যায় যাবে৷ দেশে স্কুলের অভাব নেই৷ কোনও বছর বেশি ছেলে পাশ করলে আঁতকে ওঠেন, না, না, না, এত ছেলে পাশ করবে কী! এটা স্কুল না পাঠশালা! হাফ করে দিন, হাফ করে দিন৷ শঙ্করকে একবার ডেকে জিগ্যেস করেছিলেন, তোর এত ভালো রেজাল্ট হয় কী করে? খুবই সন্দেহজনক৷ স্কুলের একজন, তার নাম সনাতন কখনও ফেল করে না, করবেও না কোনওদিন৷ যাত্রার দলের কাছ থেকে ভূতের পোশাক চেয়ে এনেছিল৷ অমাবস্যার রাত৷ একটা কি দুটো হবে৷ সেই পোশাক পরে মাথার দিকের জানলায় সনাতন৷ হাতে একটা পিচকিরি৷ পিক করে খানিকটা জল৷ ‘কে, কে?’
নাকি সুরে—‘ভুবন! আমি সনাতনের বাপের বাপ, বাপরে বাপ৷ সামনের তেঁতুল গাছে ভূত হয়ে আছি তিন নম্বর ডালে৷ সনাতনকে ফেল করালে ঘাড় মটকে দেব৷ আমি যে এসেছিলুম তার প্রমাণ এই জানলার বাইরে রেখে গেলুম৷’ লাল আলতায় চোবানো একটা পাঁঠার টেংরি ফেলে রেখে গেল৷ হেডস্যার পরের দিন স্কুলে এলেন৷ চোখ লাল৷ তখনও মাথার চুল খাড়া৷ সব স্যারকে ডেকে বলে দিলেন, ‘সনাতন হাতি ঘোড়া যাই লিখুক, খাতা দেখার দরকার নেই, পাস মার্ক দিয়ে যাবেন৷ দৈবাদেশ৷’ লজ্জায় বলতে পারলেন না—ভূতের আদেশ৷ সনাতন লেখাপড়ায় তেমন খারাপ নয়৷ অঙ্কে তাকে ফেল করানো মুশকিল৷ সমস্যা আর্টস সাবজেক্টে! প্রত্যেকটা বানান ভুলে এক নম্বর কাটতে-কাটতে দেওয়ার মতো আর কিছুই থাকে না৷ সনাতন বলেছিল, ‘তোরাও তো আমার মতো একটু খাটলে পারিস৷ মাসে একটা করে অমাবস্যা তো আছেই৷’ সে থাকলেও, সকলের ঠাকুরদাই ভূত হলে স্যার বিশ্বাস করবেন না৷ সনাতনের কেসটাও কেঁচে যাবে৷
শঙ্কর তালা খুলল৷ থইথই অন্ধকার৷ সুইচে হাত দিতেই আলো যেন মায়ের কোলে শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ সাজানো ঘরসংসার৷ মা খুব গুছোনে৷ সব যেন ছবি! কোথাও এমনটি পাওয়া যাবে না৷ শঙ্কর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মা, মা, বলে কয়েকবার ডাকল৷ ভীষণ মন খারাপ৷ মাকে ছেড়ে কি থাকা যায়! মা যদি হুগলিতেই চলে যায়, শঙ্করও চলে যাবে৷ নিজের বাড়ি নিজের বাড়ি, পরের বাড়ি পরের বাড়ি৷
মা যেমন বলে গেছেন, শঙ্কর ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যা দিল৷ একটা আসন পেতে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ৷ চিন্তাভাবনা সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ আসনে বসেই সংকল্প করল, কালই সে হুগলি যাবে৷ দরজা খুলে বাড়ির পেছন দিকটায় গেল৷ হুহু করে বাতাস বইছে৷ মেলার দিক থেকে সুন্দর গান ভেসে আসছে৷ কখনও জোরে কখনও আস্তে৷ ঢেউয়ের মতো৷ আঙুলের আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ৷ মনে-মনে বলল, ‘রেখা, রেখা! মেয়েটা বেশ সুন্দর, বেশ মজার৷ এখন, এইখানে যদি থাকত৷ কত গল্প হত৷ রান্নাঘরে গিয়ে কিছু না—শুধু খিচুড়ি রান্না হত৷ তারপর খাওয়া৷ তারপর পেছন দিকের কলতলায় গিয়ে দুজনে মিলে থালা, গেলাস, বাটি ধোয়া৷ বেশ হত৷ তেমন হলে বেশ হত৷’
বাইরের সদরে খসখস পায়ের শব্দ৷ অনেক পাতা পড়ে আছে৷ এই বাড়িটায় আলো কম৷ বাইরের পঁচিশ পাওয়ারটা ফিউজ হয়ে গেছে৷ শঙ্কর দরজাটা খুলেই অবাক হয়ে গেল৷ রেখা!
‘তুমি?’
‘দেখতে এলুম, একা-একা তুমি কী করছ?’
‘আগে ভেতরে এসো৷ বিশ্বাস করো, তোমার কথাই ভাবছিলুম৷’
‘ধূপ জ্বেলেছ? কী সুন্দর গন্ধ৷ কী পরিষ্কার! মন্দির-মন্দির লাগছে৷’
‘মা কবে ফিরবেন?’
‘মামার বাড়িতে আদরে আমাকে ভুলেই গেছে৷’
‘মামার বাড়ি তো তোমার, মায়ের তো বাপের বাড়ি৷’
‘ও বাবা, জানো না বুঝি, মামারা মাকে ভীষণ ভালোবাসে৷ পারলে বেঁধে রাখে৷’
‘তোমার মাকে আমি দেখেছি৷ খুব সুন্দর৷ তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো!’
‘সেই প্রশ্ন তো আমারও৷ তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো! কলেজে পড়বে, কত বন্ধু হবে!’
‘তোমারও তো কত বান্ধবী হবে!’
‘কিন্তু, রেখা যে একজনই রাখল!’
‘আমার আর বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না৷ তবু যেতে হবে৷ তুমি আমাকে একটু এগিয়ে দেবে৷ ওই পুকুরটাকে আমার ভীষণ ভয় করে৷ ওই পুকুরেই আমার বন্ধু নীতা ডুবে গিয়েছিল৷’
অন্ধকার, তারাভরা আকাশ উপুড় হয়ে দেখছে—মাঠের পথে ভালোবাসা হেঁটে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে, চপল বাতাসে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন