সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
হেডস্যার, হেডস্যার!’ হইচই পড়ে গেল৷ হেডস্যার আমাদের সরস্বতী পুজো দেখতে এসেছেন৷ এবারে একটু বেশি ঘটা৷ স্কুলের পুজোর পঞ্চাশ বছর৷ খুব ডেকরেশান হয়েছে৷ প্রত্যেকবার খিচুড়ি ভোগ হয়৷ আলুর দমের আলু হাফসেদ্ধ৷ বোঁদের দানা শক্ত শক্ত, প্যাট-প্যাটে৷ এবারের ব্যবস্থা খুব ভালো৷ স্কুলের এক্স-স্টুডেন্ট আমেরিকায় গেছে বিরাট চান্স পেয়ে৷ তার বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, কাগজে বড় করে ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দেবেন, পরে মত বদলেছেন, সরস্বতী পুজোয় স্কুলের ছেলেদের আচ্ছা করে খাওয়াবেন৷ ‘সারা বছর তোমরা পিঠে খাও, একদিন অন্তত পেটে খাও৷’ ভদ্রলোকের নাম, সুব্রত মৈত্র৷ স্টাউট চেহারা, খুব ফরসা৷ নাকের ডগায় ছোট্ট একটা আঁচিল৷ ভেরি বিউটিফুল৷ তাঁর ক্যাটারিং বিজনেস৷ বলেছেন, ‘বিয়েবাড়ির ভোজ খাওয়াব, বুফে সিস্টেম৷’ তাঁর ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের নামটা খুব ইন্টারেস্টিং—‘ধারাপাত’৷ পাত-শব্দটা আছে৷ পাত মানে পাতা৷ আর ধারাপাতে সব সংখ্যা৷ খাওয়াও সংখ্যা—রাধাবল্লভী পেটে একটা গেল, দুটো গেল, সঙ্গে এন্ট্রি নিল ঘুগনি৷ অ্যায়! ফিশ ফ্রাই লাও! একের পর দুই, দুইয়ের পরে তিন, আর না, আর না, লাগাও বিরিয়ানি—আনি নয়, দোআনি নয়, বিরিয়ানি৷ কিছু না মানি, মানি বিরিয়ানি৷ চাঁপ দিয়ে চেপে ধর, কোঁত করে গিলে মরো৷
আমাদের নিউ হলে পুজো কমিটির মিটিং হয়েছিল—‘ফিফটি ইয়ার্স অফ মা সরস্বতী৷’ মা সরস্বতী ইংরিজি উচ্চারণে একটু ডিফিকাল্ট৷ বলো—ম্যা সোরোয়াস্বতী৷ স্বতী না শ্বেতী—এই নিয়ে কিছুক্ষণ ঝামেলা হল৷ শেষে সিদ্ধান্ত হল, শ্বেতী শব্দটা নট গুড, একটা স্কিন প্রবলেম—দ্যাটস হোয়াই স্বতী৷ পাঁচ-দশ মিনিট সবাই প্র্যাকটিস করলেন—সোরোয়াস্বতী৷ মা ক্রমশই ইংরেজ রমণী হয়ে উঠলেন৷ হেডস্যার বেশ জোর দিয়ে বললেন—শি ইজ ডিভাইন ম্যাম—দেবী সুরেশ্বরী...৷
বাংলার স্যার বললেন—ওটা গঙ্গার দিকে চলে গেল—ভগবতী সঙ্গে৷ বলতে হবে—জয় জয় দেবী চরাচর সারে৷
উঁহু, উঁহু, মেক ইট ইংলিশ মিডিয়াম—জ্যা জ্যা দেয়াবী চোয়ারা চোয়ারে স্যারে৷
বড্ড বেয়াদবি হয়ে যাচ্ছে স্যার—কি সব চেয়ার-টেবল?
কান্ট্ হেল্প—ইয়া!
সুব্রতবাবু কোনো বিয়েবাড়িতে ক্যাটারিং আছে, অধৈর্য হয়ে বললেন, লেটস কাম ডাউন টু বিজনেস৷ প্রতিমা আমার ছেলে পাঠাচ্ছে আমেরিকা থেকে৷ অলরেডি পোস্ট করে দিয়েছে৷
পোস্ট করে দিয়েছে মানে? অত বড় প্রতিমা! লেটার বক্সে ঢুকবে কি করে? হেডস্যার ভীষণ চিন্তিত!
সুব্রতবাবু বললেন—মির্যাকল্! যখন আসবে দেখবেন, ওদেশে বিজ্ঞান মানুষকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছে—মার্সে, জুপিটারে, স্যাটার্নে!
সে পৌঁছক! দেব-দেবী তো ওদিক থেকে এদিকে আসেন, বছর-বছর আসেন৷ জলপথে ফিরে যান৷ ইন ফ্যাক্ট ডিজল্ভ করে যান৷ পড়ে থাকে খড়কুটো, বাঁশ-বাঁখারি৷
ছোট্ট একটা প্যাকেট আসবে—ইউ নো৷ জাস্ট ফুঁ দিয়ে ফোলাবেন, ইয়া বড় ম্যা সোরোয়াস্বতী৷ পুজু শেষ, ফু-উ-উ-স্, নো সোরোয়াস্বতী৷ কিপ ইট ইন আলমিরা৷ পুট ন্যাপথালিন অ্যারাউন্ড৷ পোকারা এতকাল বই কেটে এসেছে, বইয়ের দেবীকে বাগে পেলে কি যে করবে না করবে!
—অত লাইট ওয়েট বেদীতে স্থাপন করবেন কী করে?
—ঝোলাব৷ ঝুলিয়ে দোবো৷ সেন্টারের ওই পাখাটা নামিয়ে দিয়ে মাকে ঝুলিয়ে দেবো৷ পা দুটো স্ট্র্যাপ করে দেব নিচের তক্তায়৷ সে আমি দেখিয়ে দোবো৷ নো প্রবলেম৷
সেই আমেরিকান মা সরস্বতীতে পূজা হল না৷ পুরোহিতমশাই রেগে গিয়ে বললেন, ‘সীমা ছাড়িয়ে যেয়ো না৷ দেব-দেবী নিয়ে ইয়ারকি চলে না৷ বুঝলে?’
লাস্ট মোমেন্টে প্রতিমা এল৷ তাড়াহুড়ো করে তৈরি৷ আধ-কাঁচা৷ কুমোরপাড়ার বিশুদার ছেলে আমাদের সঙ্গে পড়ে৷ বিশুদা আধুনিক রং চাপিয়ে বললেন, ‘কোনওরকমে ম্যানেজ করে দিলুম৷ সারা রাত পাখার তলায় রাখবি৷’
ভোরবেলা কেলেঙ্কারি কাণ্ড৷ মায়ের সারা গায়ে লাল পিঁপড়ে থুক্থুক্ করছে৷ কাঁচা রঙে সব সেঁটে গেছে৷ বিশুদা শুনে খুব খানিক রাগারাগি করলেন, ‘বলবি তো স্কুলে পিঁপড়ে আছে তাহলে রসগোল্লার রস মাখাতুম না৷’
‘রস মাখালেন কেন?’
‘রূপচর্চায় মেয়েরা মুখে সিরাপ মাখছে৷ রঙের কামড়ি বাড়াবার জন্যে এক কোট রস মেরেছিলুম৷’
যাই হোক, পিঁপড়ে জড়ানো মাকে আবার রং করে কাপড়-টাপড় পরিয়ে সে একরকম হল৷ পিঁপড়ে গেল তো মাছি এল৷ একটা মাছি নাকের ডগায় বসেই রইল৷ মনে হয় আটকে গেছে৷ হিস্ট্রির স্যার মাকে দেখে বললেন, ‘অসাধারণ, বিশুর আইডিয়া, নাকের ডগায় নাকছাবি ফিট করে দিয়েছে৷ একেই বলে আর্টিস্ট! ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে এমন ব্যস্ত--নাকছাবি নাকের মাথায় উঠে গেছে—খেয়াল নেই৷’
অঞ্জলি শুরু হয়েছে, মন্ত্রোচ্চারণে হল গমগম করছে, এমন সময় হেডস্যার এলেন৷ আবার প্রথম থেকে অঞ্জলি শুরু হল—সরস্বতী মহাভাগে...৷ হেডস্যার এখন বেশিক্ষণ থাকবেন না৷ আরও তিনটে স্কুলে যেতে হবে৷ দুপুরে আসবেন, খাওয়ার সময়৷ সুব্রতবাবু ফাটিয়ে রান্না করাচ্ছেন৷ একটাই দুঃখ—শ্রাদ্ধবাড়ির খাওয়া৷ নিরামিষে কি আর খেলাব!
হেডস্যার বাইরে বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘যাঃ, আমার জুতো৷ নিউ পেয়ার অফ শু৷ এখানেও জুতো-চোর এন্ট্রি নিয়েছে!’
‘স্যারের জুতো কে চুরি করবে?’
‘করেছে, বলে কে করবে! নিঃশেষে চুরি৷’
ধীরাজ হঠাৎ বলে বসল, ‘স্নিফার ডগ আনলে কেমন হয়?’
হেডস্যার রেগেই ছিলেন, আরও রেগে গিয়ে বললেন, ‘ইয়ারকি হচ্ছে? কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে?’
আমরা কয়েকজন বাইরের রাস্তায় ইনভেস্টিগেশান-এ গেলুম৷ গোটা কতক তাগড়া কুকুর নিজেদের ঘেউ-ঘেউ কাজে ব্যস্ত৷ জুতো নেই৷ কুকুররা আজকাল জুতো নিয়ে মাথা ঘামায় না৷
হেডস্যার বললেন, ‘এখানে ক’জোড়া জুতো আছে?’
শঙ্কর গুনে বলল, ‘ফিফটি পেয়ারস৷’
‘সেই পঞ্চাশজনকে ডাকো৷’
পঞ্চাশজন হাজির৷ হেডস্যার বললেন, ‘যার যার জুতো পরে ফেল৷’
প্রত্যেকে জুতা পায়ে লাইন দিয়ে দাঁড়ালেন৷ পড়ে রইল একজোড়া৷ পুরোনো৷
হেডস্যার বললেন, ‘হুজ পেয়ার ইজ দিস! তার পায়েই আছে আমার জুতো৷ আইডেন্টিফাই৷’
জুতো পরীক্ষা হচ্ছে৷ ধীরাজ আমাদের শার্লক হোমস৷ সে হঠাৎ আবিষ্কার করলে জুতোর তলায় হলুদ গুঁড়ো৷ মুখ তুলে বললে, ‘সুব্রতবাবুর জুতো৷’
রান্না হচ্ছে একেবারে শেষের দিকের একটা ঘরে৷ সুব্রতবাবু নিজেই কি একটা রাঁধছেন৷ ধীরাজের চোখ পায়ের দিকে, ‘ওই দেখ৷ হেডস্যারের জুতো না হয়ে যায় না৷ ব্র্যান্ড নিউ৷’
ধীরাজই বললে, ‘স্যার! আপনি হেডস্যারের জুতো পরে চলে এসেছেন৷’
‘অ্যাঁ, সে কি! তাই ভাবছি, জুতোটা যেন এক সাইজ ছোট হয়ে গেছে৷ গোড়ালি বেরিয়ে যাচ্ছে৷ আসলে, আমি কখনো নিচের দিকে তাকিয়ে জুতো পরি না৷ পায়ে গলিয়ে চলে আসি৷ আমি কখনোই বলতে পারব না যে—এই জুতোটাই আমার!’
শালপাতার থালায় হেডস্যারের জুতো৷ থালাটা সুব্রতবাবুর মাথায়৷ নিউ হলের সামনে গুঞ্জন—‘জুতো আসছে, জুতো আসছে৷’
পুরোহিতমশাই বাইরে এসে রাগ-রাগ গলায় বললেন, ‘তাহলে এবার জুতো পুজোই হোক, মায়ের পুজো বন্ধ থাক৷’
তাঁর কথা কেউ শুনতেই পেলেন না৷
হেডস্যার বললেন, ‘একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল৷ নিন, আপনার জুতোটা পরে নিন৷ ওই যে৷’
পুরোহিতমশাই লাফিয়ে উঠলেন, ‘তার মানে? আমার জুতোটা উনি পারবেন কেন?’
এদিকে হেডস্যারও লাফিয়ে উঠলেন, ‘এ কি! এ তো আমার জুতো নয়৷ আমার তো ব্ল্যাক! এ তো ব্রাউন৷’
সকলে সমস্বরে বলে উঠলেন—‘যা, আ, আ—৷’
‘শার্লক হোমস’ ধীরাজ পুরোহিতমশাইকে জেরা করছে, ‘আপনার জুতোর তলায় হলুদ লেগে আছে কেন?’
‘কাল একটা গায়ে হলুদ ছিল৷’
হেডস্যার বললেন, ‘মাথায় করে এটা তাহলে কার জুতো নিয়ে এলেন?’
সুব্রতবাবু বসে পড়েছেন—‘তাই তো ভাবছি!’
‘আর ভেবে কি হবে—মাই জুতো ইজ গন৷ পাঁচশো টাকা৷’
সুব্রতবাবু উঠে দাঁড়ালেন৷ নিজের মনেই বলছেন—‘অঞ্জলির সময় এলুম৷ বেশ৷ তারপর জুতো গলালুম৷ রাইট৷ বাইকে চেপে সাধুখাঁদের বাড়ি৷ বিয়েবাড়ি৷ জুতো খুলে ঢুকলুম৷ একটা কথা৷ ঝট্, বাইরে৷ জুতো৷ বাইক৷ ব্যাক৷ ইউরেকা! ইউরেকা! আপনার জুতো সাধুখাঁদের বাড়ির বারান্দায়৷ ধীরাজ৷ কাম উইথ মি, কাম, কাম৷’
‘এই জুতোটা নিয়ে যান৷’
‘না, না, ওটা থাক৷ আগে আপনারটা পাই কি-না দেখি, এ বার্ড ইন হ্যান্ড ইজ ওয়ার্থ টু ইন দ্য বুশ!’
পুরোহিতমশাই নিজের জুতো পায়ে গলালেন৷ জুতোকে বলছেন—‘খুব বেঁচে গেলি৷ চল, নিরাপদ জায়গায় রেখে আসি৷’
হেডস্যার ব্রাউন জুতোয় পা গলিয়ে বললেন, ‘বাঃ, হচ্ছে তো, বেশ হচ্ছে৷ কনফাটের্বল, আমারটার চেয়েও ভালো৷ তাহলে ঘুরে আসি৷ দুটো স্কুল পথ চেয়ে বসে আছে৷’
আমাদের আরতি শুরু হল৷ মাসিমা ভোগ নিয়ে আসছেন৷ প্রত্যেকবার ভোগের দায়িত্ব তাঁর৷ পাশেই বাড়ি৷ মায়ের সামনে ভোগ ধরে দিয়ে মাসিমা বাইরে এসে জিগ্যেস করলেন, ‘সুবীর কোথায়? একটু আগে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল গরমমশলা দিতে৷ করেছে কি আমার বড় ছেলের নতুন জুতো জোড়া পরে চলে এসেছে৷ ওরটা ছেড়ে রেখে এসেছে৷’
অঙ্কের স্যার এতক্ষণ ঘটনার গতি রাখছিলেন, হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘অসম্ভব! এ পাজল-এর সমাধান নেই৷ তাহলে সুবীরের জুতোটা গেল কোথায়? সে তো খালি পা!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন